গল্প: আরো আঁধারি (০২)

পর্ব:০২

মুখের সামনে থেকে ভাতের প্লেটটা কেড়ে নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে মারলো লাবনী বেগম। রাগে, ক্ষোভে ফোঁপাতে লাগলো সে। পূর্ণা মাত্রই সকল কাজ শেষ করে খেতে বসেছিলো, প্লেট থেকে একটা দলা মেখে মুখে নিতে যাবে অমনি আচমকা মায়ের এমন ব্যবহারে হকচকিয়ে উঠলো সে।
এক পলক হাতে থাকা এক দলা ভাতের দিকে তাকিয়ে, নিচে পড়ে থাকা ভাঙা প্লেটের দিকে তাকালো পুনরায় ব্যথিত নয়নে মায়ের দিকে তাকালো।

ভাতের প্লেট ঢিল ছুড়েও যেন রাগ কমছে না লাবনী বেগমের। এগিয়ে গিয়ে পূর্ণার চুল টে*নে ধরলো সে, হিসহিসিয়ে বলল,

” এই মু*খ পু*ড়ি তুই আমার ছেলের কাপড়ে ধরছিস কেন? অ*ল*ক্ষি, অ*প*য়া একটা। আমার এক ছেলেকে তো খা*ই*ছি*স। আরেকটারেও খা*ইতে চাস? তোর কি পেট ভরে না? জলজ্যান্ত একটা মানুষ খা*ইলি, আমার সোনার টুকরো ছেলে! শেষ কইরে দিছিস। শান্তি হয় নাই তোর? এখন আর কি চাস? ম*র*তে পারস না তুই? দুনিয়াতে এতো মানুষ ম*রে তুই ম*রি*স না কেন? খোদা তোরে দেখে না? অ*ল*ক্ষি একটা “

পূর্ণা দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ব্য*থা সহ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সারাদিন না খাওয়ায় শরীর টাও দূর্বল। মুখ দিয়ে কথাও যেন বের হতে চাচ্ছে না। খুব কষ্ট করে হাত বাড়িয়ে মিসেস লাবনী বেগমের হাতের উপর হাত রেখে নিজের চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ধীর কন্ঠে বলল,

” আম্মা লাগছে! ছেড়ে দেন আম্মা। আর কক্ষনো ধরবো না পিয়ালের কাপড়। আপনি যা বলবেন তাই শুনবো। তবুও ছাইড়া দেন আম্মা। “

লাবনী বেগম শুনলো, পূর্ণার চুল থেকে নিজের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে আনলো। রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

” আজকের মতো ছাইড়া দিলাম। ফের কোন দিন যদি তুই আমার ছেলের কোন জিনিস ধরিস তো তোর হাত আমি বটি দিয়ে কু*প মে*রে আলগা করে দিবো। মনে রাখিস। “

বলেই ত্রস্ত পায়ে পূর্ণার ঘর ছাড়লেন লাবনী বেগম। পূর্ণা মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। চোখে জল নেই তার। হয়তো জল পড়তে পড়তে এখন শুকিয়ে গেছে কিংবা মনটাই পাথর হয়ে গেছে। আজকাল খুব সহজে চোখ বেয়ে জল টা তেমন একটা গড়ায় না। সেই আট বছর বয়স থেকে আজ তেইশ বছর মায়ের এমন ব্যবহারের সাক্ষী সে প্রতিনিয়তই। কষ্ট লাগে না এখন।

নিজের হাতে থাকা এক দলা ভাতের দিকে বেশ কিছু ক্ষন তাকিয়ে রইলো। সেটা মুখের ভেতর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। ভাত চাবাতে চাবাতে মাটি থেকে প্লেটের ভাঙা কাঁচ আর খাবার গুলো পরিষ্কার করে বিছানায় পিঠ ঠেকালো।
পুনরায় ভাত বেড়ে খাওয়ার মন মানসিকতা বা ধৈর্য শক্তি কোনটাই নেই। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে তার। বিছানার উপর ওভাবেই এলোমেলো হয়ে পড়ে রইলো । বেশ কিছু ক্ষন ওভাবেই পড়ে থাকার পর, হঠাৎ মনে হলো এশার নামাজ পড়া এখনো বাকি। আজ খোদার সাথে ও কিছু বোঝাপড়া আছে।

শরীরকে টেনে হিঁচড়ে ওয়াসরুমে নিয়ে ওযু করে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লো। দুই হাত তুলতেই
চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা অবাধ্য অশ্রু ও গড়িয়ে পড়লো। আচমকা ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো, মাথা নাড়াতে নাড়াতে বিরবির করে বলল,

” হে মাবুদ, আপনি আপনার হাত দিয়ে আমার ভাগ্যটা
নতুন করে লিখে দেন না!আপনি যেই ভাগ্য আমার জন্য লিখে রেখেছেন, সেই ভাগ্যের যন্ত্রণা আমার শরীরে আর বহন করতে পারছি না..

যদি আপনি আমার ভাগ্যটা পরিবর্তন করতে না পারেন তবে আপনার দেওয়া প্রাণ টা আপনি ফিরিয়ে নিন। লাগবে না আপনার দেওয়া প্রাণ আমার..

খানিকটা সময় নিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে দুই হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

মায়ের উপর রাগ নেই আমার। তবে মাঝে মাঝে দুঃখ হয় নিজের জন্য। রাগ হয় নিজের ভাগ্যের উপর। আমার কেন একটা মানুষ থাকলো না? কেন কেউ বুঝলো না আমাকে? এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর চাই আমার মাবুদ.. “

শরীর ক্লান্ত লাগছে তাঁর। চোখ বুজে আসছে। বিছানায় যাওয়ার শক্তি ও নেই তাই জায়নামাজেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো পূর্ণা।

______________

তালুকদার বাড়ির মেইন গেইটে গাড়ির শব্দ পেতেই বারান্দা দিয়ে সরু দৃষ্টিতে তাকালো মেহেরিন শিকদার। রকিং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বারান্দা দিয়ে সরাসরি তাকালো তাহরিমের নিজস্ব নেভি ব্লু রঙের গাড়িটার দিকে। ততক্ষণে তাহরিম গাড়ি থেকে নেমেছে। পিছনে পিছনে নেমেছে আরেকটা ছায়ামূর্তি।

মেহেরিন শিকদার রুম থেকে বের হয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে অন্ধকার। তাহরিম ধীরে ধীরে মেইন ডোরের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ফোনের ফ্লাস লাইট জ্বালিয়ে সাবধানে দোতলার সিড়িতে উঠতেই আচমকা পুরো ড্রয়িং রুমের আলো জ্বলে উঠলো। তাহরিম হকচকিয়ে পিছনে তাকালো, মেহেরিন শিকদার ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাহরিম ঘাড় চুলকে মায়ের দিকে তাকালো।

” এখন কয়টা বাজে তাহরিম? “

মায়ের শক্ত কন্ঠে তাহরিম হাত ঘড়ির দিকে তাকালো, ঘড়ির ঘন্টার কাটা টা বারোটা এবং একটার মাঝামাঝি গিয়ে থেমেছে। তাহরিম মুচকি হেসে বলল,

” সাড়ে বারোটা “

” একটা ভদ্র বাড়ির ছেলেরা কি রাত বারোটা করে বাড়ি ফেরে? তা তোমার চামচা কোথায়? যাকে খুঁজতে গিয়ে এতো দেরি করলে? “

তাহরিম এবার ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। মেহেরিন শিকদার বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

” ওই বাঁদরটাকে প্রতিদিন খুঁজে আনা কি তোমার ডিউটি হয়ে গেছে তাহরিম? তুমি সারাদিনের ব্যস্ততা শেষ করে আবার এই বাঁদরটার জন্য আরোও তিন ঘন্টা ব্যয় করবে? ও তো বড়ো হয়েছে। নিজের দায়িত্ব এবার নিজেকে নিতে দাও। “

তাহরিম কিছু বলতে নিবে ঠিক তখনই দেখলো তানজিম উপর থেকে নেমে আসছে। চোখে মুখে এমন ভাব যেন মাত্র ই ঘুম থেকে উঠে এলো। চোখ মুখ কচলাতে কচলাতে মায়ের দিকে তাকালো, ঘুমু ঘুমু কন্ঠে বলল,

” কি ব্যাপার আম্মাজান? এতো রাতে এখানে কিসের গোল মিটিং করছো?”

মেহেরিন শিকদার কপাল কুঁচকে তাকালো তানজিমের দিকে, শান্ত কন্ঠে বলল,

” শার্টের হাতার ময়লা ঝাড়েন ধুলো বালি লেগে আছে। আর আপনি এখনো সেই ছোট বাঁদর নন যে পাইপ বেয়ে উপরে উঠতে পারবেন। বাড়ির পাইপ ভাঙলে আপনাকে আমি ভেঙে ফেলব এই লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম। “

তানজিম ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। মা যে এতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে বুঝে ফেলবে ধারণার বাহিরে ছিল। মেহেরিন শিকদার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল,

” আশা করি খেয়ে এসেছেন। না হলে ফ্রিজে খাবার আছে গরম করে খেয়ে রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তানজিমের কাল ভার্সিটি আছে সকালে উঠতে হবে। “

দুই ভাই মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। মা যেতেই তাহরিম তানজিমের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,

” বান্দর একটা! তোর জন্য আমাকে এত্তো গুলা কথা শুনতে হয়েছে। ফের যদি দেখছি কোন মেয়ের পিছনে গেছিস আর কোন মেয়ে ঘটিত ঝামেলায় জরাতে তো তোর একদিন কি আমার একদিন। যাহ্ রুমে যা”

তানজিম ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ” হ্যা হ্যা তোমার মতো চিরকুমারের খেতাব নিয়ে ঘুরবো তো! দেখো ব্রাদার আগামী এক বছরের ভিতরে যদি আমি ভাবি না পাই তাহলে কিন্তু এর পরের বছর তোমাকে চাচা হবার সুখবর আমি নিজে দেবো। “

তাহরিম তানজিমের কাঁধ জড়িয়ে বাহু দিয়ে গলা আঁকড়ে ধরে বলল, ” আমি তোর বড়ো ভাই। ভুলে গেছিস? নাকি মাথায় বাড়ি দিয়ে মনে করাতে হবে। “

তানজিম তার গলা থেকে তাহরিমের বাহু সরাতে সরাতে বলল, ” মাত্র তিন বছরের বড়ো। এটা কোন বড়ো হলো! হুদাই!”

তাহরিম তানজিমের গলা থেকে হাত সরিয়ে পান্জাবির পকেটে হাত গুঁজে সিড়ি দিয়ে নিজের রুমে যেতে যেতে বলল,

” ভালো হয়ে যা তানজু। ভালো হইতে টাকা পয়সা লাগে না “

তানজিম ও ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
” সেম টু ইউ ব্রো। “

তাহরিম দাঁড়ালো না। গটগট পায়ে নিজের রুমে চলে গেলো। ফ্রেস হয়ে টিশার্ট আর টাউজার পরে বিছানায় বসতেই সন্ধ্যার সেই অদ্ভুত মেসেজের কথা মনে পড়লে তার। চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বিছানার উপর থেকে ফোন নিলো, কৌতূহল বশত সেই আননোন নাম্বারটাও বের করে মেসেজটা আবারো পড়লো। শেষ মেষ চোর উপাধি? মন্ত্রী তাহরিম তালুকদারকে চোর উপাধি দিলো শেষ অব্দি? মানা যায় এটা?

তাহরিম কিছু একটা ভেবে কল করলো সেই নাম্বারে। কানে লাগাতেই বুঝলো রিং হচ্ছে।

এদিকে পূর্ণা জায়নামাজে পড়েই গভীর ঘুমে মগ্ন। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে ঘুম পাতলা হয়ে এলো। পিটপিট করে চোখ খুলে উঠে বসলো, মাথার হিজাবটা এলোমেলো হয়ে মুখ ঢেকে গেছে সেটাও এক টানে খুলে বিছানার উপর খুজলো মোবাইল। হাতের নাগালে পেয়েও গেলো, স্ক্রিনে ভাসছে আননোন নাম্বার। কল টা এসেছেও নতুন নাম্বারে। নিশ্চয়ই এটা ইলমির কাজ। রাত বিরাতে না জ্বালালে শান্তি লাগে না বদমাশটার। রিংটোন বন্ধ হওয়ার আগ মূহুর্তে কল পিক করলো পূর্ণা। ক্লান্ত শরীরে ঘুমের রেস টাও কাটে নি।

ঘুমু ঘুমু কন্ঠে বলল, ” হ্যালো”

ওপাশ থেকে কোন শব্দ আসছে না। পূর্ণা বিরক্ত হয়ে বলল,
” ইলু, আমি জানি এটা তুই। প্লিজ ইয়ার এরম করিস না। সারাদিন কিচ্ছু খাই নি, ক্লান্ত লাগছে তুই নিজেও ঘুমা আমিও ঘুমাই। কাল বাঁদরামি করিস সখিনার মা। এখন রাখ। “

বলেই কল কেটে দিলো পূর্ণা। এদিকে তাহরিম অবাক হয়ে শুনছিলো মেয়েটার কন্ঠ। একদম বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠ, মিষ্টি ছিল ভীষণ। পুনরায় সেই কন্ঠ শোনার লোভ সামলাতে না পেরে তাহরিম তালুকদার পুনরায় কল করলো,
এবারো পূর্ণা সবে লাইট অফ করে বিছানায় শুয়েছে। ফোনের রিংটোনে এবার রাগ উঠলো তার। অসভ্য টাকে এতো সুন্দর করে বলল তবুও বারবার ফোন করছে! ফোন পিক করলো পূর্ণা। ধমকে উঠে বলল,

” কি সমস্যা তোর, বা*ন্দি। রাত বিরাতে কু*ড়*কু*ড়া*নি উঠছে? অ*স*ভ্য, জা*নো*য়া*র কোথাকার! রাখ ফোন। “

পূর্ণার ধমকে খানিকটা হকচকিয়ে উঠলো তাহরিম। গলা পরিষ্কার করে বলল,

” হ্যালো “

পূর্ণা থতমত খেলো ফোনের ওপাশের পুরুষালি কন্ঠ শুনে। অবাক হয়ে বলল,

” কে? ইলু তোর কন্ঠ এমন বেডা বেডা লাগছে কেন?”

তাহরিম শান্ত কন্ঠে বলল,
” আমি তাহরিম তালুকদার। “

পূর্ণা কপাল কুঁচকে উঠে বসলো,
” কোন তাহরিম তালুকদার? “

তাহরিম খানিকটা ভাব নিয়ে বলল,
” মন্ত্রী তাহরিম তালুকদার। “

পূর্ণা বিরক্ত হলো ভীষণ। এমন রাত বিরাতে ফোন করে মজা নেওয়ার কোন মানে হয়। নিশ্চয়ই ইলু কোন এ্যাপ ব্যবহার করে কন্ঠ চেঞ্জ করে কথা বলছে!
পূর্ণা বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,

” তুই মন্ত্রী তাহরিম তালুকদার হলে আমি বিখ্যাত সিঙ্গার রানু মন্ডল। রাখ ফোন এবার। ফের যদি ফোন করেছিস তো ফোনের ভেতর দিয়ে গিয়ে দুই গালে গুনে গুনে একটা থাপ্পড় দিয়ে আসবো। বেয়াদব কোথাকার! “

তাহরিম ভাবলো দুই গালে গুনে গুনে একটা থাপ্পড় কিভাবে দিবে?
তাহরিমের এবার রাগ হলো, দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল,

” তোমা….”

চলবে…

[ কেমন লাগলো জানাবেন কিন্তু আর সুন্দর সুন্দর গঠন মূলক মন্তব্য করবেন ]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments