পর্ব:০৯
লেখিকা:নুসরাত পুতুল
আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ায় ফুফু নাদিম ভাইকে অনেক কথা শুনালেন।
নাদিম ভাই একটি শব্দও করলেন না।
বাবা সাফসাফ বললেন,
” ছামির ছোট। তুমি না নিয়ে গেলে সে দ্বিতীয়বার বাড়িতে ওই জায়গায় যাওয়ার কথা বলার সাহস পেতো না। তুমি বুঝদার হয়ে এমন ভুল করলে কীভাবে?
ফুফু তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন,
“বেশি লায়েক হয়ে গেছে, আজ রাতের খাবার বন্ধ দু’জনের। আর দু’দিন ঘরে বন্দী করে রাখলে সব ঠিক হয়ে যাবে । তখন স্বপ্নেও ভাববে না এমন কিছু করার।
আরও অনেক কথা বলে আমাদের ঘরে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলো।
নাদিম ভাই আগে আগে ঘরে চলে গেল। আমার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল
এ কথা তো আমি কাউকে বলিনি। শুধু ম্যাডামকে বলেছিলাম। তাহলে বাড়ির লোক জানল কীভাবে? তবে কি ম্যাডাম বলে দিয়েছেন? না, তা কেন হবে? ম্যাডাম তো আমাকে কত ভালোবাসেন, তিনি এমন টা করতেই পারে না।
আমি বসার ঘরে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। সে রাতে আমাদের খাবার দেওয়া হয়নি। সবাই যখন নিজ নিজ ঘরে চলে গেল, আমিও তখন ঘরে ঢুকলাম।
নাদিম ভাই রাগান্বিত চোখে তাকালেন। উঠে দরজা বন্ধ করে কোনো কথা না বলে স্টিলের একটি স্কেল দিয়ে আমাকে মা*রতে শুরু করলেন। আমি ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম।
ঝুমুর কোথা থেকে যেন দৌড়ে এলো। জানালা দিয়ে দেখছে
‘নাদিম ভাই আমাকে মা*রছেন।
ঝুমুর চিৎকার করে বলছে,
‘ভাইয়া, ছেড়ে দাও, ব্যথা পাবে।
কিন্তু নাদিম ভাই শুনলেন না। ঠাস ঠাস করে আরও কয়েকটি আঘাত করে তবে ক্ষান্ত হলেন। তারপর আগের মতো গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
ঝুমুর ফুফুর কাছে গেল। বাবা, ফুফু, দাদি সকলেই তখন দাদির ঘরে বসে কথা বলছেন। হয়তো কোনো গোপন বৈঠক।
“আম্মু, ছামির ভাইয়া কাঁদছে…
ঝুমুরের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ফুফু ধমক দিয়ে বললেন,
“বড়রা কথা বলছে দেখছো না? যাও, বাইরে যাও এখন।
ধমক খেয়ে ঝুমুর বেরিয়ে এলো। এবার ক্লাস ওয়ানে উঠেছে। এতটুকু মেয়ে আর কতটাই বা বুঝবে
আমার পাশে বসে সেও কাঁদ’তে লাগল, আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এমনিতেই মার খাওয়ার ব্যথা, তার ওপর ঝুমুরের কান্না বি”ষের মতো লাগছিল আমার কাছে।
অসহ্য হয়ে কা’ন্না থামিয়ে বললাম,
“কাঁ’দছিস কেন? মে’রেছে তো আমাকে। তোর কী হয়েছে?
হেঁচকি তুলে কাঁ’দতে কাঁ’দতে বলল,
“বড় হয়ে তুমি আমার বর হবে না? তাই তোমার কষ্টে আমারও কষ্ট হচ্ছে।
ঝুমুরের কথায় আমার হাসি পেল। মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,
“বিয়ে হবে
এ কথা ফুফু বলেছে তোকে?
ঝুমুর কোনো উত্তর দিল না। উঠে গিয়ে ঠান্ডা বরফ এনে আমার ক্ষতস্থানে লাগাল। আমি সেদিন আর বাধা দিলাম না। একটু আরাম লাগছিল।
পরদিন দাদির ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। দাদি বারবার ফুফুকে বলছেন,
“সবকিছু ভেবে-চিন্তে করছিস তো? আরেকটু ভেবে দেখ বিষয়টা। অন্ধের মতো যা ইচ্ছে করে বসিস না।
ফুফু গম্ভীর স্বরে বললেন,
” আমি কি এ সংসারের খারাপ চাই? সবার ভালোর জন্যই তো এমন সিদ্ধান্ত। আর তোমার ছেলেরও তো মত আছে। তাই তো এত কিছু…
_________
বার কয়েক কলিং বেল বাজতেই বিরক্ত মুখে দরজা খুলল হাসনা। সকাল সাতটা বাজে। রান্নাঘরে নাস্তা বানাচ্ছিল সে। স্বামীর কষ্টের টাকায় ছোট্ট এই দু’কামরার বাড়িটি করেছে তারা। বাড়ি ভাড়ার টাকায় কোনোমতে সংসার চলে।
দরজা খুলতেই এক লোক একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।
কোর্টের নোটিশ।
খাম খুলতেই হাসনা বেগমের চোখ বড় হয়ে গেল।
ডি’ভোর্স লেটার
সত্যিই কি তাহলে ননদের সংসার ভেঙে যাচ্ছে?
রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়লেন তিনি।
লিহাব সাহেব নাস্তার টেবিলে বসতে বসতে বললেন,
“কই, খাবার হলো? তাড়াতাড়ি আনো। আমার আবার একটা নালিশে যেতে হবে।
গরম তেলে পানির ফোঁটা পড়লে যেমন ছিটকে ওঠে, তেমনি করে উঠলেন হাসনা।
“আমার মাথাটা খাও এবার, সারাদিন তোমাদের খাটুনি খাটতে পারব না আমি। বাড়িতে কাজের লোক রেখে নাও। নালিশে যাবে বলছ,;লজ্জা লাগে না? কোন মুখে যাবে নালিশ করতে? যে নিজের বোনের সংসার বাঁচাতে পারে না, সে নাকি অন্যের সংসারের ঝামেলা মেটাবে.
তোমাদের সুখের শেষ নেই সবাই বসে বসে থাকবে, আর আমি চাকরানির মতো খাটব, সব ঠেকা আমার ।
লিহাব বুঝতে পারলেন না, স্ত্রী কী ইঙ্গিত করছেন। এমনভাবে তো হাসনা কথা বলেন না।
প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলেন,
“কে এসেছিল?
হাসনা খামটি এনে ছুড়ে মা’রলেন তার দিকে।
“তোমার বোনের সংসার ভাঙার নোটিশ। সই করে দিলেই হবে।
ভাবির চিৎকারে ইতোমধ্যে তনিমাকে কোলে নিয়ে রুমি এসে দাঁড়িয়েছে। ভাবির শেষ কথাটা শুনে তার পা কেঁপে উঠল।
দীর্ঘ সাত বছরের সংসার, সত্যিই কি ভেঙে যাবে তবে?
লিহাব চুপ করে রইলেন। হাসনা আরও রেগে গেলেন এই নীরবতায়। কাগজটা নিয়ে রুমির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“এই যে ডি’ভোর্স লেটার। সই করে দিন। তারপর আরামে বসে বসে খাবেন শুধু । আর কোনো চিন্তা থাকবে না।
বলেই তিনি রান্নাঘরে চলে গেলেন।
লিহাব বোনের দিকে তাকানোর সাহস পেলেন না। সেভাবেই বসে রইলেন।
রুমি নিজের ঘরে চলে গেল। তনিমা ঘুমাচ্ছে। আস্তে করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল।
তারপর ডি’ভোর্স লেটারের কাগজটি নিয়ে টেবিলে বসে পড়ল। কলম হাতে নিল।
সই করতে যাবে—ঠিক তখনই কী মনে করে থেমে গেল।
চলবে ইনশাআল্লাহ