পর্ব:০২
এসির ঝিম ঝিম শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার কী বোর্ডের উপর চলা অশান্ত হাতের বিচরণে শব্দ শুনা যাচ্ছে কেবিন রুম জুড়ে । সুন্দর করে সজ্জিত কাচের টেবিলটার উপর রাখা নেইম প্লেটে ইহতেশাম
চৌধুরী মেঘালয় নামটা ঝলমল করছে। চেয়ারে বসে যে ব্যক্তি জুরুরি কাজে কী বোর্ডের উপর অত্যাচার চালাচ্ছেন মুলত উনার নামই ইহতেশাম চৌধুরী মেঘালয়। অফিসে উনার পরিচয় ইহতেশাম সাহেব হলেও বাইরে জগতে উনি মেঘ হিসেবেই পরিচিত।
মেঘ তার অশান্ত হাত থামিয়ে দিয়ে চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে আয়েশ করে বসল। সাদা শার্টের সাথের কালো টাইটা ঢিলে করল।স্যুটটা ডিভানে ঘড়াঘড়ি খাচ্ছে।চুল গুলো আলোতালো হয়ে এসে কপাল ঢেকে দিচ্ছে। লম্বা চওড়া দেহের অতাত্ত্বিক সুদর্শন পুরুষ। মেঘ ঠোঁট গোল করে একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলল। ডান হাত দিয়ে ঘাড় মাসাজ করতে করতে বাম হাতের ব্র্যান্ডের ঘড়িতে সময় দেখলো। এশার আজানে এখনও একটু সময় বাকি আছে। কিছু দিন ধরে একটু বেশিই ব্যস্ত সে। অফিস আওয়ার শেষ হওয়ার পরও কিছু কাজ করে কাজ এগিয়ে রাখছে।মেঘ একটু ঘাড় বাকিয়ে ডান পাশের সচ্ছ কাচের গ্লাস ভেদ করে আরেকটা ছোট কেবিনের পানে তাকাল।সেখানের পরিবেশ এখানকার পরিবেশ থেকে বেশ আলাদা।না অতিরিক্তই আলাদা।মেঘ বিরক্ত হয়ে ঠোঁটের এক পাশ বাকালো। সেই কেবিনের অবস্থানরত মানুষটা বসে বসে ঝিমুচ্ছে। মেঘ দুষ্টু হেসে ফোনটা হাতে নিয়ে ” শা*লা দুইনাম্বার” দিয়ে সেইভ করা নাম্বারটায় কল লাগাল।কয়েকবার রিং হতেই ওপর কেবিনে অবস্থানরত মানুষটা দরফর করে উঠলো। মেঘ সেদিকে তাকিয়ে হাসলো। অর্কের তন্দ্রা কা*টতেই তীব্র শব্দের উৎস খুঁজে বের করলো। খুঁজে ফোনটা হাতে নিয়ে বিরক্ত মুখ দিয়ে চ সুচক শব্দ বের হয়ে আসলো। “ধান্দাবাজ” লেখে সেইভ করা নাম্বার থেকে কল এসেছে। অর্ক নাক মুখ কুঁচকে একাকার করে মেঘের দিকে তাকাল। মেঘ হাত উচিয়ে হ্যালো’ জানালো।অর্ক ফোনটা ধরে খ্যাকিয়ে উঠলো -” কি রে? তোর জানে শান্তি নাই?”
মেঘ অর্কের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল-” নাহ।নাই। “
অর্ক ক্ষোভ নিয়ে শুধালো -” তাহলে নিজের কাজ শেষ কর। আর আমারে মুক্তি দে আমার বাপ।অফিস আওয়ার সেই কখন শেষ হয়েছে। এখানে বসে বসে আমার ঘুম চলে আসছে।”
-” তাহলে কাজ গুলো কর না।”
অর্ক ভ্র কুঞ্চিত করে বলল -” কেন? কেন? এর জন্য আলাদা একটা পে ও দিবি না। শা*লা কিপ্টা।”
-” এর বদলে তো এক সপ্তাহের ছুটি দিবো। মাইশার বিয়েতে নাচার জন্য। “
অর্ক এখন মুখটা স্বাভাবিক করে মেঘকে বুঝাতে চাইল -” দেখ মেঘ,এই কাজ গুলো পরে থাকবে না। হিমু তো আছেই। তুই একবার ভরসা করে দেখ।তোর ভাই তোর থেকে আগায়ে যাবে। “
মেঘ ভ্র উচিয়ে শুধালো -” কি রে?তেল মারোস না কি? এসবে কাজ হবে না।আমি তোরে একশবার বলছি ও ছোট।মাত্রই অফিস জয়েন করেছে। ও এসব পারবে না। আমাকেই কাজগুলো এগিয়ে রেখে ছুটিতে যেতে হবে। “
মেঘের ভাষণ শুনে অর্ক দাঁতে দাঁত চাপলো। এই ঘাউড়াকে বুঝিয়ে লাভ নেই। নিজের ক্ষোভ মেটাতে অর্ক বলল-” দূর হয়। শা*লা হাঁ*দারাম। তোর মতো একরোখা মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। তুই জীবনে আমারে শান্তি দিবি না? তোর কোম্পানিতে জয়েন হওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পা*প ছিল । “
মেঘের মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। তা দেখে অর্ক বলল-” এখন যদি তোর রগচটা রগটা ত্যাড়ামি করে খবর আছে বলে দিলাম। “
মেঘ গম্ভীর স্বরে বলল -” তোর জন্য চা পাঠাচ্ছি। “
-” এত এত টাকা কিসের জন্য কামাছিস? যদি তোর অফিসের মানুষদের সস্তা চা খাওয়াবি। কফি পাঠা।”
-” ওই ওইটাই পাঠাইতাম। “
-” তোর মাথা। শুধু টাকা বাচাঁনোর ধান্দা। শা*লা ধান্দাবাজ। “বলে অর্ক কলটা রেখে দিয়ে আবার ড্রেসকের উপর মাথাটা রেখে দিলো। করবে না সে কাজ। মেঘ ঘাড়ত্যাড়া হলে ও তার থেকে আরও বেশি। মেঘ তার বন্ধুত্বের এমন বাজে ফায়দা লুটবে তা সে হতে দিবে না।
মেঘ অফিসের পিয়নকে ডেকে দুই কেবিনে কফি দেওয়ার জন্য বললো।নিজের কাজ সে অন্যের ভরসায় রাখতে পছন্দ করে না। তাই হিমুকে দিলে ওর কাজের বারোটা বাজিয়ে দিবে বলে তার বিশ্বাস। মেঘ সোজা হয়ে বসে আবার কাজে মনোযোগ দিতেই ফোনটা তারস্বরে ডেকে উঠলো। কু*ত্তি লেখাটা কত সুন্দর ভাবেই না ঝলমল করছে। মেঘ ফোনটা তুলে কানে চাপলো।-” কি রে খবর সবর কেমন? “
-“ভালোই?”
-” ভালো? তাহলে আমার কান পঁচাইতে কল দেছ ক্যান?”
-” দরকার আছে। দরকারটা অবশ্য তোর। তা তুই এখন কোথায়?”
-” অফিসেই।”
-” টাকা বাঁচাতে এখন কি তুই তোর অফিসের গার্ডেরও কাজ নিয়ে নিয়েছিস?”
-” হ্যা, তাতে তোর সমস্যা?”
-” না নাই। আচ্ছা।আবোল তাবোল না বকে কাজের কথায় আয়।”
-” আসবি তো তুই। “
-“হুম। এই তুই এখনই অফিস থেকে বের হও। আর সোজা আমাদের বাড়ি আয়। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।”
-” আমার জন্য?বাহ! তবে আমি এখন ব্যস্ত আছি। আসতে পারবো না। অনেক কাজ। তোর মতো চিনি পুঁটির বিয়ের জন্য আমার কাজের এতো চাপ নিতে হচ্ছে। “
মাইশা দাঁতে দাঁত চেপে বললো -” অযথা বকবক না করে বল তুই আসবি কিনা? “
-” হুম, নাহ আসবো না। “
-“এলে না কিন্তু অনেক আফসোস করবি। আর পরে এটা বলতে পারবি না আমি কেন তোকে বললাম না। “
-” আসতেই হবে। “
-” হ্যা। স্পেশাল সারপ্রাইজ। “
-“তাহলে বলে দে।”
-” বললাম না সারপ্রাইজ? সারপ্রাইজ আবার বলে কিভাবে? বললে কি আর সারপ্রাইজ থাকে? তুই আয়। দেখবি খুব খুশি হবি। “
-” না রে পারবো না। “
মাইশা দাঁত কিড়মিড় করে বলল -” তুই আসবি তোর ঘাড়ও আসবে। তোকে আসতেই হবে। “
মেঘ কিছুক্ষণ ভেবে বললো -” এতো জুড়ে কথা বলিস না আমার কানের কাছে। কান তোর বাপের না।
-“আমার বাপের এসব অহেতুক জিনিস দিয়ে কাজ নেই। এই আয় না। একবার ম্যানেজ করে চলে আয়।
-“আসতেই হবে?”
মাইশা কথায় জোর দিয়ে বলল -” হ্যা। আসতেই হবে। “
-” তাহলে….. “বলে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে মেঘ বলল-” যাহ আসবোই না। বায় বায়। “বলে মেঘ কল রেখে দিলো। মাইশা ফোনের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে মেঘের গুষ্টি উদ্ধার করল। সে মর*ছে ওর কথা ভেবে আর সে নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে।
*********
হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে ।বৃষ্টির পানি গাড়ির গ্লাসে পরে গ্লাস ঝাপসা করে তুলছে। উইন্ডশিল্ড বার বার পরিষ্কার করে দিয়ে গাড়ির চালককে স্পষ্ট রাস্তা দেখতে সাহায্য করছে। ফাইয়াজ ভেজা গ্লাসের দিকে লক্ষ রেখেই স্টিয়ারিং ঘুড়াল।বাড়িতে পৌঁছে গেছে সে।হর্ন বাজাতেই দারোয়ান হাট করে গেইটা খুলে দিলো।ফাইয়াজের গাড়িটা মর্তূজা বাড়িতে প্রবেশ করল। রাত গভীর বলে বাড়িটাও যেন ঘুমিয়ে পরেছে। ফাইয়াজ গাড়িটা পার্কিং করে ক্লান্তি নিয়ে বাড়ির পথে প্রবেশ করলো।কলিংবেল বাজানোর আগেই দরজাটা খুলে গেল।হাফসা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। ফাইয়াজ ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো -” কি হাফসা আপা? আজ এতো রাতে জেগে আছেন যে। ঘুমিয়ে পরতেন।”
হাফসা পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসলেন। অতি উৎসাহ নিয়ে বললেন-” কি করমু বড় ভাইজান? আপনেই কন? আমার তো খুশিতে ঘুম আসতাছে না। “
ফাইয়াজ ক্লান্ত পায়ে হেটে গিয়ে ড্রইং রুমের সোফায় বসলো। জান মানছে না তার। মন চাচ্ছে রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে। কিন্তু একটা মানুষের উৎসাহ নষ্ট করতে চাইল না। সোফাই বসে জিজ্ঞেস করল-” এতো কিসের খুশি তোমার শুনি? “
হাফসার মুখের হাসি আরও চওড়া হলো। -” আপনের জন্য ছারপারাইজ আছে ভাইজান।”
ফাইয়াজ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল -” আমার জন্য? “
-” হ ভাইজান। আপনের লাইগা। তয় আপনে আইতে এতো দেরি করলেন। সকালে পাইবেন। বিদেশী বেডাটা কি সুন্দর কথা কয় গো ভাইজান। “
-” বিদেশি? বিদেশি কে?”
হাফসা দাঁত দিয়ে জিহবা কামরে ধরলো। আম্মারা কতবার বলে দিয়েছে তাকে সে যেন মুখ থেকে একটা শব্দও বের না করে। অথচ সে করে ফেলেছে। ফাইয়াজ কৌতূহলী চোখ মেলে হাফসার দিকে তাকিয়ে। হাফসা ফাইয়াজের দিকে চাই ভ্যাবলাকান্তের মতো হাসলো। কথা ঢাকতে বলল -” তেমন কিছু না ভাইজান। আপনে গিয়া ঘুমান। আমার সেই রইকমের ঘুম আইতাসে। “
কথাটা বলে আঁচলটা টেনে মাথায় দিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন। ফাইয়াজ ভ্রু কুঁচকে ওনার এই অদ্ভুত আচরণ দেখে গেল।হাফসা যেতেই ফাইয়াজ ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাড়াল ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে। বাড়িতে সামনে একটা বিয়ে বলে অফিসের সকল কাজ এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। বাবা চাচাকে বাড়িতে পাঠিয়ে রাতেও কাজ করছে সে। বিয়ের সময় সবকিছু এমপ্লয়িরা সামলাবে। ফাইয়াজ আবার ওদের উপর প্রেসার দিতে চাচ্ছে না।ফাইয়াজ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই তার কানে একটা সুমধুর কন্ঠ ধাক্কা খেল।কেউ তাকে -” বড়ভাইয়া “বলে ডাকছে। ফাইয়াজের হাত থেকে ব্যাগটা পরে গেল। পিছন না ফিরেই সে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো। হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক কাঁপছে তার। হ্যালিসুলেশন হলে সে কষ্ট পাবে। অনেক কষ্ট পাবে।
আবার ডাকটা ভেসে আসতেই ফাইয়াজ ধীরে ধীরে পিছন পিরল। খুব মিষ্টি একটা মেয়ে ওর পানে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ফাইয়াজের মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত গেল। তড়িৎ গতিতে এগিয়ে গেল সে। জড়িয়ে ধরে মেয়েটার মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। চোখ ভিজে গেল। -” আমাকে কি মে*রে ফেলার প্ল্যান করছিস?”
তানিশা ফাইয়াজের দিকে মুখ তুলে দাঁত বের করে হাসলো। ফাইয়াজ তানিশার গাল টেনে দিলো। -” দুই দিন ধরে কোনো খবর নেই কারো। আমি তোর খরব না পেলে কতটা ছটফট করি জানিস না? “
তানিশা ঝুকে ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল-” তোমাকে সারপ্রাইজটা কেমন দিলাম বলো তো?”
ফাইয়াজ ব্যাগটা নিজের হাতে নিলো। তানিশার ডান হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল-” এমন পাগলামি আর করিস না রে গাধী রাজকুমারি।”
তানিশা ঘাড় কাত করে সায় দিলো। সে আর এমনটা করবে না। ফাইয়াজের ক্লান্ত মুখটা দেখে বলল-” নিজের উপর এতো প্রশার নিচ্ছো কেন? এতো রাতে বাড়ি ফিরছো। ভাবিও বোধহয় তোমার জন্য ঘুমায়নি। “
ফাইয়াজ ঘাড় বাকিয়ে রুমের পানে তাকাল। রুমের লাইট এখন জালানো।-” নাহ ওদের বলে দিয়েছি আসতে দেরি হবে। ওরা ঘুমিয়ে গেছে। “
-” আলো তো এখন জ্বলছে।”
-” মা বেডা আলো ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এখন বউয়ের জ্বালায় আমারও অভ্যাস হয়ে গেছে। তোর ভাইটাও এখন দিব্বি আলোতে ঘুমাতে পারে।”
-” তাই না কি? “
-” হুম।তুই গিয়ে ঘুমা। “
-” সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছি। এখন আর ঘুম আসবে না। আমি এখন ভুতের মতো হাঁটবো। তুমি যাও ফ্রেস হও। ক্লান্ত লাগছে দেখতে। খেয়ে দেয়ে ঘুম দাও। “
ফাইয়াজ গা ঝাড়া দিলো। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বললো -” কে? কে ক্লান্ত শুনি। আমি এখন ফকফকা চাঙা। তুই একা হাটবি তাহলে আমি কি করবো? মাত্র পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা কর আমি আসছি। “
তানিশা আশ্চর্যান্বিত হলো।চোখ বড় করে বললো-” কি বলছো এসব? যাও তো। ঘুমাতে যাও। “
ফাইয়াজ ধমকে বললো-” তুই চুপ থাক! আমি আসছি। ” তানিশাকে অপেক্ষায় রেখে ফাইয়াজ লম্বা লম্বা কদম ফেলে রুমের দিকে অগ্রসর হলো। তানিশা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদু একটা শ্বাস ফেললো।জেগে থাকার কথাটা না বললেও পারতো সে।
*****************
ফাইয়াজ চুলার দিকে ধ্যান ধরে তাকিয়ে আছে। গোসল সেরে এসেছে চুলগুলো এখন ভেজা।কপালের সাথে লেপ্টে আছে। তানিশা খানিকটা সময় দেখলো ফাইয়াজকে কতটা স্নিগ্ধ লাগছে।স্নিগ্ধতম পুরুষ। ফাইয়াজের হাতের কাছে চিনি,দুধ, চা পাতার ডিব্বা খুলে রাখা। চা কখন না কখন উতলে আসে। তানিশা কিচের চারপাশ লক্ষ করে বললো-” বাড়ির তো কিছুই পাল্টেনি। “
তানিশারে কথা শুনে ফাইয়াজ পিছন ফিরে তাকাল। এতোক্ষণ সে একা একাই ছিল। তানিশা চুপিসারে কখন এসেছে দেখেনি। মেয়েটাকে সে দুতালার বারান্দায় রেখে এসেছিল।এখন এখানে এসে তাঁকে এর উপর উঠে বসে আছে ।-” পাল্টে গেলে খুশি হতি? “
-” নাহ।”
ফাইয়াজ ফির নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। -” তাই কিছু পরিবর্তন করিনি।”
তানিশা লাফ দিয়ে নিচে নেমে এলো। ফাইয়াজের পাশে এসে দাড়িয়ে বললো-” ছেলেরা বউয়ের কথা শুনে বেশি। তা তুমি আমাকে হাতানাতে প্রমাণ দিলে। “
ফাইয়াজ অবাক হয়ে বলল -” তা কেন মনে হলো? আমি আবার কি করলাম? “
তানিশা মুচকি হাসলো। কিছু বললো না।ফাইয়াজ অতিষ্ট হয়ে বলল-” তুই বলবি না কি? “
তানিশার হাসি উঠছে তবে সে বললো না।রাইশা যখন এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে ঘরে বসে ছিল। তখন আসফিয়ার কাছে হুট করে মনে হলো উনার মেয়ে বড় হয়ে গেছে। তাই তিনি অভিযানে লাগলেন মেয়েকে রান্না শিখাবেন।প্রথম ক্লাস ছিল ডিম ভাজা। কয়েকটা ডিম নষ্ট করে পরে রাইসা শিখলেন ডিম ভাজা।নিজে শিখে ফেলেছে তো কিন্তু ওর মনে জেদ লাগলো। মেয়ে ছেলে তো সমানই তাহলে ফাইয়াজ তো তার বড়। তাই সে ফইয়াজকেও ডিম ভাজি শিখাবে। রাতে সবাই যখন গভীর ঘুমে তখন বাড়ি সব বিচ্ছু কিচেনে ডিম ভাজিতে ব্যস্ত।ফ্রিজের সবগুলা ডিম নষ্ট করে ছিল ফাইয়াজ। পরের দিন বড়মার কাছে সব কয়টা উত্তম মাধ্যম পেয়েছিল।সেই কথাটা মনে হয়েছে তানিশার। তখন সে ছোট্ট ছিল। এসব চোখে না দেখলেও কেলানি দেওয়ার সময়টা সে সেখানেই উপস্থিত ছিল।আর এখন বউ চা খায় বলে নিজের হাতে বেস্ট চা করতে শিখেছে। নিজের হাতের চা বোনকেও খাওয়াচ্ছে। তানিশা কথা ঘুরিয়ে ফেললো -” তেমন কিছু না।ওহহ তোমার জন্য আরেকটা সারপ্রাইজ আছে। “
ফাইয়াজ চা কাপে ঢালতে ঢালতে বললো-” তোর থেকেও তো আর স্পেশাল না। না কি তোর থেকে বেশি স্পেশাল? “
তানিশা মুচকি হেসে বলল -” নাহ আমার থেকে বেশি না।তবে স্পেশাল। তুমি একদম চমকে যাবে। “
ফাইয়াজ চায়ের কাপ তানিশার হাতে তুলে দিলো। তানিশা আবার গিয়ে তাঁকের উপর উঠে বসলো। পা ঝুলিয়ে দুলাতে দুলাতে কাপে চুমুক দিলো। ফাইয়াজও তানিশার পাশে উঠে বসলো -” তাই না কি? আমি খুব ইন্টারেস্ট পাচ্ছি তো। তা কি সেই সারপ্রাইজ? “
-“হুমম! এখন বলবো না। সকাল হউক দেখবে। “
-” বলে দে। তুই ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আমি ভ্যানিস হয়ে যাবো রে বনু।”
-” ওহহ তাই। তাহলে বলে দেই। আমি জোহানকে সাথে করে নিয়ে এসেছি। “
ফাইয়াজ মাত্র একটা চুমুক দিয়েছিল চায়ে। তানিশার কথায় জিবহা পুরিয়ে ফেললো।বিষ্ময়কর মুখ ভঙ্গিতে বললো-” তুই ওরেও নিয়ে এসেছিস?”
তানিশা নির্বিকার চিত্তে জবাব দিল -” হ্যা।আমিও প্রথমে ভাবছিলাম আসবে না। এটা ভেবেই দাওয়াত দিয়েছিলাম। কারণ আমারও তো আসার কথা ছিল না।হঠাৎ করে মন পাল্টে ফেললাম। আমি কাউকেই বলিনি।তোমাদের জন্য শপিং করতে গিয়ে ওর সাথে শপিংমলে টক্কর খেলাম।দেখি ও হাত ভরে শপিং করছে। জিজ্ঞেস করতেই বলে সে নাকি বিয়েতে আসছে। দেখো কত বড় শয়তান লোক। “
ফাইয়াজ হালকা হাসলো। -” তোর থেকে একচামচ এগিয়ে। “
তানিশা হঠাৎ চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো-” একটা অদ্ভুত ব্যপার কি জানো। “
-” কি?”
-” মাইশা আপু! মাইশা আপু জোহানকে দুচোখ সহ্য করতে পারছে না।সন্ধ্যায় নাস্তায় দেবার সময় নাস্তা ঝাল বাড়িয়ে দিয়েছে।তবে জোহান চালাকচতুর। ও বুঝে ফেলেছে।জোহান তো হেসে মাইশা আপুকে বলেছে সব সাদা চামড়ারা এক হয় না।সে ঝাল খেতে পারে। “
ফাইয়াজ কপালে ভাজ ফেলল -” ও কি করে জানলো?”
-” আরে! ও ঝাল খেতে পারে দেখে বলে ছিলাম যে আমরা জানি ওরা ঝাল খেতে পারে না । আমাদের মতে সাদা চামড়ার মানুষ ঝাল খেতে পারে না। ওর সেটা মনে আছে। আপু তো লজ্জা পেলো।পরে জোহানকে খেয়ে ফেলার মতো লুক দিলো। হা হা।”
ফাইয়াজ ক্ষীণ হাসলো। তানিশার হাসি মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে তাকলো। তানিশা তা খেয়াল করে হাসি বন্ধ করে দিলো।নিশ্চুপ হয়ে চা চুমুক দিলো। -“তোকে হাসতে দেখে আমার মনে প্রশান্তি আসে। তুই এখন আর হাসিস না কেন? সবকিছু তো ঠিক আছে। “
তানিশা ফাইয়াজের দিকে ফিরেও তাকাল না কথাটা শুনে। যেন ফাইয়াজ কি বলছে তা সে শুনেইনি। ফাইয়াজের বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে আসলো।তানিশাকে আর না ঘাঁটিয়ে সময়কে উপভোগ করতে ব্যস্ত হলো।
******************
দরজায় ঠকঠক করে শব্দ হচ্ছে খানিক্ষণ পর পর। তানিশা চোখ টেনে খুলতে খুলতে দরজার ওপর পাশের মানুষটা আবার গায়েব হয়ে গেল। তানিশা উঠে বসলো। পাশে মাইশা ঘুমিয়ে ছিলো। সে এখন নেই সেখানটায়। তানিশা ফোন হাতে নিয়ে সময় দেখল। সকাল দশটা! রাতে ঘুমাতে পারেনি। ফাইয়াজের কাছ থেকে এসে পুরো রাত ঘুমায়নি। ঘুমাতে যে তার এখন ঘুমের ঔষধ লাগে। ইচ্ছে করে আজ আর খায়নি। ফজরের নামাজ পরে একটু ঘুমিয়েছে। তানিশা উঠে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসলো।টাওয়ালটা নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ মুছতে মুছতে নিজের দিকে তাকাল। উজ্জল শ্যামলা গায়ের রং, কুঁকড়া চুল গুলো বব কাট করে কাধ পর্যন্ত এসে আটকেছে।চুল ধরে টানলে হয়ত আরেকটু নিচে নামবে।কিন্তু ছাড়লে যেই সেই। তানিশার হাত চুলে চলে গেল।বাড়ির সবাই তার উপর নারাজ চুল কাটায়।সবচেয়ে বেশি মানজুম আরা। তানিশা নিজের চুল ছেড়ে দিয়ে মুখ বাকালো। ওর যা ইচ্ছে সে নিজের সাথে তা করতে পারে।তানিশা সাদা শাড়ীটার কুঁচকে যাওয়া অংশটা টেনে ঠিক করে রুম থেকে বের হবে তখনই কানে এসে হর্নের শব্দ লাগল।তানিশা শব্দটা ভালো করে চেনে।জিপ গাড়ি!
তানিশা দৌড়ে রুমের বড় জানালা কাছে গেল। জানালা দিয়ে গেইটের পানে তাকাল। কালো একটা জিপ গাড়ি সগৌরবে প্রবেশ করছে বাড়িতে। জিপে দিয়ে মর্তুজা বাড়ি দুজন সুপুরুষ
এসে পৌঁছালেন।বাড়িতে প্রবেশ করার সময় গাড়ির গতি কম ছিল বিধায় বয়সের দিক দিয়ে কম বয়সী ছেলেটা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামলো।গায়ে তার এখন আর্মি পোশাক। কাঁধ ব্যাগটা কাঁধে চরিয়ে লম্বা লম্বা কদম ফেলে বাড়ি চৌকাঠ মাড়িয়ে গেল।তার যে উচিত ছিল গাড়িটা সে চালিয়ে এনে গাড়িটা পার্কও করবে তাতে তার কোনো খেয়াল নেই।সে তার তার খেয়াল খুশি মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করছে। একজন মানুষ যে তার সাথে এলো তাকে রেখে চলে গেল। নিজের আইডলকে রেখে চলে গেল। তাতে তোয়াক্কা করার মতো সময় তার নেই।তানিশা স্থির দৃষ্টিতে আলোতালো লোকটাকে দেখে গেল। যতসময় দেখা যায়। মানুষটা যে তার জীবন অনেক স্পেশাল একজন।গাড়ির লাগানোর ঠাস করে শব্দ হতেই তানিশা সেই দিকে তাকাল। একজন আর্মি অফিসার খুব নিপুণ তার কাজগুলো করছে। লোকটা নাম কর্নেল নাহিদ মর্তুজা ।