পর্বঃ২৯
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔
সকাল সকাল চৌধুরী ভিলা যেন কেঁপে উঠলো ঐশীর চিৎকারে। সদা শান্তশিষ্ট মেয়েটির রণমুর্তি ধারন করা দেখে বাড়ির সকলেই হকচকিত। অত্যাধিক রাগে ঐশীর চোখের কোটরে পানি জমেছে। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য সে। কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— আমার মতামতটুকু নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেনা তোমরা? আম্মু, ভাইয়া আমি এডাল্ট। অন্তত আমাকে একবার জানাতে পারতে।
ঐক্য এগিয়ে এসে ঐশীকে বুকে আগলে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
— শান্ত হ ঐশী। সোহেলী আন্টি অনেক আগেই সোহানের জন্য তোর হাত চেয়েছিলেন। আমরা ভেবে দেখব বলে জানিয়েছিলাম। তোর অনুমতি ছাড়া আমরা সব ঠিক করে ফেলব এটা ভাবলি কি করে? তোর যদি সোহানকে পছন্দ নাহয় বলতে পারিস৷ কিন্তু সোহান অনেক ভাল ছেলে সোনা। তোকে খুব ভাল রাখবে। এটার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি তোকে৷
ঐশী ঐক্যর বুকে মাথা রেখে টিশার্ট মুঠো করে ধরলো। বিরবির করে বললো,
— আমি এই বিয়ে করতে চাইনা ভাইয়া। করতে চাইনা।
— আচ্ছা আচ্ছা করতে হবে না বিয়ে। আমার বোনকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে আমি এমনিতেও দেব না।
এতসব কিছুর মধ্যেও জোবায়দা চৌধুরী মৌন রইলেন। কেবলমাত্র তীক্ষ্ণ চোখে মেয়ের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলেন। ঐশীর অশ্রুসজল চোখ, এমন আকষ্মিক এমন উদ্ভব প্রক্রিয়া ওনার জহুরি চোখ এড়ালোনা। মেয়েটা কি তবে? ঐশী পুনরায় ফোপাঁতে ফোঁপাতে বললো,
— আমি কি ছোট বাচ্চা? কিছু বুঝিনা ভেবেছ? সোহেলি আন্টি এমনভাবে কথা বলছেন যে….
— তোমার কোন নিজস্ব পছন্দ আছে ঐশী?
জোবায়দা বেগম ঠান্ডা নিরেট স্বরে শুধালেন। ঐশী আঁতকে উঠে তাকায় উনার অবিচল থমথমে আননে। একটা শুষ্ক ঢোক গিলে খানিকটা তুতলে বলো,
— মানে?
— মানে হচ্ছে তোমার নিজস্ব পছন্দ থাকলে বলতে পারো। আমাকে এতটাও জাঁদরেল ভেব না। আমি আমার সন্তানদের উপর কোনদিনও কিছু চাপিয়ে দেইনি আর না কখনো দেব। কিন্তু অবশ্যই সেই পছন্দের মানুষটাও শতভাগ খাঁটি মনের হতে হবে৷ একবার ভুল মানুষকে জীবনে জড়িয়ে আমার ছেলে এখনো তড়পাচ্ছে। সেই একই ভুল আমি তোমার বেলায় করবনা। এখন বলো ছেলেটা কে? তোমার ভাইয়া খোঁজ খবর নেবে।
ঐশী চোখ উঁচিয়ে মা ভাইকে দেখলো। ঐক্য চোখের ইশারায় ওকে আশ্বস্ত করলো। তার বোন যদি কাউকে পছন্দ করে অবশ্যই সে সঙ্গ দেবে। সোহানকে নাহয় পরে বুঝিয়ে বলা যাবে। ঐশী মাথা নিচু করে নিল। কি বলবে এই মুহুর্তে? ঐশীর মন জানে আহানও ওকে ভালোবাসে। কিন্তু নিশ্চিত ভাবে কোনদিন নিজের ভালবাসার স্বীকারোক্তি তো ও দেয়নি। তাহলে আম্মু, ভাইয়াকে এখন কি বলবে? ঐশীর ফ্যাকাশে চেহারা পরখ করে অভিজ্ঞ ঐক্য অনেক কিছু বুঝে নিল। বললো,
— আম্মু ওকে এখন ছেড়ে দিন। ওর কলেজের জন্য লেইট হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয় নিয়ে নাহয় পরে ভাবা যাবে। এমনিতেও তো ফাইনাল প্রফের আগে ওর বিয়ের চ্যাপ্টারে যাচ্ছি না আমরা৷ আপনি নাহয় সোহেলি আন্টিকে ফোন করে জানিয়ে দিন।
— ঠিক আছে।
ঐশী কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে চাইলো ভাইয়ের দিকে তাকে এই যাত্রায় বাঁচিয়ে নেওয়ার জন্য। সাথে ভীষণ রকম রাগ জন্মালো আহানের উপর। এই লোকটাকে ও ছাড়বেনা একদম।
.
সকাল আটটা
টেবিলে কেবলমাত্র তখন জোবায়দা চৌধুরী,ঐক্য আর তার আম্মাজানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। ঐক্য সাদা রুটি ছিড়ে মাংসের গ্রেভিতে চুবিয়ে মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছে পটু হাতে। সাথে নিজেও খেয়ে নিচ্ছে। নাহলে মেয়ের খাওয়ার যে গতি। ওকে খাইয়ে নিজে খেতে খেতে দশটা পার হয়ে যাবে। অফিসে আর যাওয়া লাগবেনা। জোবায়দা চৌধুরী ছেলে আর নাতনীর দিকে চেয়ে কিছু ভাবলেন। তার মেয়ে যে কোন সম্পর্কে আছে সেটা তিনি নিশ্চিত৷ কিন্তু মেয়েকে নিয়ে কিছু ভাববার আগে ওনাকে নিজের এই হতভাগা ছেলেটাকে নিয়ে ভাবতে হবে। ঐশীর বিয়ের ঝামেলায় একবার পড়লে ঐক্যকে আর এত সহজে বিয়ে করানো যাবে না। এর চেয়ে আগে ভালোয় ভালোয় ছেলের একটা গতি করতে হবে। ভাগ্যিস ছেলেটা অন্তত এত বছরে বিয়েটা করতে রাজি হয়েছে। মনে মনে ঠিক করলেন বড় ভাইকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠাবেন আবৃতিদের বাড়িতে। ঐক্যর তো বাবা চাচা কেউ নেই। ছেলের মতটা আগে জেনে নেওয়া জরুরী মনে করে তিনি মৃদু গলা খাঁকারি দিলেন ঐক্যর মনোযোগ আকর্ষণে। ঐক্য মায়ের দিকে চেয়ে নম্র স্বরে বললো,
— কিছু বলবেন আম্মু?
— ঐক্য কিছু ভাবলে?
ঐক্য ভ্রুকুটি করে শুধায়,
— কি নিয়ে?
জোবায়দা চৌধুরী একপলক চোখ পিটপিটিয়ে তাদের দিয়ে চেয়ে থাকা ওয়াফাকে দেখলেন। তারপর জোরে জোরে একজন সারভেন্টকে ডাকলেন৷ মহিলা আসতেই তিনি বললেন,
— দাদুভাইকে মুখটা ধুয়ে রুমে নিয়ে যাও। ওয়াফা দাদুভাই তুমি রুমে যাও। পাপা আসছে। কেমন?
ওয়াফা বাধ্য বাচ্চার মতো একপাশে মাথা এলিয়ে স্বায় দিল। সারভেন্টটি ওকে কোলে তুলে নিয়ে গেল বেসিনের দিকে। ওয়াফা যেতেই তিনি সোজাসুজি ছেলের মুখে চেয়ে বললেন,
— তুমি তো বলেছ তুমি এবার বিয়েতে রাজী। আর যেহেতু ডিভোর্সি মেয়েই বিয়ে করবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার জন্য আবৃতির হাত চাইব তার পরিবারের কাছে৷
ঐক্য একটু লজ্জিত বোধ করলো ওনার সোজাসাপটা বচনে। জোবায়দা চৌধুরী ফের বললেন,
— বিয়ে করবে তুমি। তাই সবার আগে তোমার মতামত বা পছন্দটা জানা জরুরী। আমার মেয়েটাকে প্রথম দেখায় ভাল লেগেছে। আমি যতদূর দেখেছি বা বুঝেছি ওয়াফা আবৃতির প্রতি অনেক দূর্বল। আমার নাতনি ওই মেয়েটার মাঝে নিজের মাতৃ মমতা খুঁজে পেয়েছে। যেটা এত বছরে মানুষের হাজার সহানুভূতিতে ও পায়নি। আমার মন টানছে মেয়েটা ভাল হবে তোমার আর ওয়াফার জন্য। আর বাকি সব আল্লাহর ইচ্ছে। কারো মনে তো আর ঢুকে যেতে পারিনা। এখন তুমি কি বলো,
ঐক্য মাথা নিচু করে বললো,
— আম্মু আপনি যা ভাল মনে করেন।
জোবায়দা চৌধুরী হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। ঠোঁট প্রসারিত করে বললেন,
— তাহলে আজই প্রস্তাব পাঠাই কি বলো?
— আম্মু?
— বলো বাবা?
ঐক্য জোবায়দা চৌধুরীর দিকে চেয়ে ক্ষীণ স্বরে বললো,
— আমি মিস আবৃতির সাথে আরশানকেও এই বাড়িতে নিয়ে আসতে চাই৷
জোবায়দা চৌধুরী থমকালেন। ঐক্য মাথা নিচু করে আছেন৷ ছেলের কাচুমাচু মুখে চেয়ে হঠাৎ তিনি হেসে দিলেন। ঐক্য মাথা তুলে অবুঝ দৃষ্টিতে তাকাল।
— তোমার আম্মুকে কি এত ছোট মনের মনে হয় বাবা যে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে আমি তার জন্মদাত্রীর থেকে আলাদা করে ফেলব?
— না মানে অনেকে তো…
— অনেকে হয়তো একটা মেয়ের আগের সংসারের সন্তানকে মেনে নিতে পারেনা। কিন্তু এটি অত্যন্ত নিচু মানসিকতার কাজ বলে আমি মনে করি৷ একটা মেয়েকে যদি তার নাঁড়িছেঁড়া ধন তার সন্তানের থেকে ছিনিয়ে আনি তাহলে সেই মেয়েটা শত চাইলেও তার স্বামীর সন্তানকে আপন করে নিতে পারেনা৷ কিন্তু এই সমাজের মানুষ গুলো তো সেটা কখনো ভেবে দেখবেনা৷ তারা সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে উটকো ঝামেলা মনে করে। কিন্তু আমি সেটা কখনোই করবনা৷ আরশানকে আবৃতির থেকে আলাদা করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা। ও এখানে আমাদের সাথেই থাকবে।
ঐক্যর মুগ্ধ চোখ তার জননীর দিকে নিবদ্ধ। তার আম্মুটার মতো যদি সবাই এমন মনোভাবের হতো, তাহলে হয়তো কতগুলো বাচ্চাকে মা বিহীন অনাদরে বড় হতে হতো না৷
— তুমি জানো কাল আমাকে আরশান দিদুন বলে ডেকেছে। আমার এত মায়া লেগেছে বাচ্চাটাকে। ওয়াফার সাথে সাথে একটা নাতি ফ্রি পেলে মন্দ না।
বলতে বলতে জেবায়দা চৌধুরীর জোরে জোরে হাসলেম। ঐক্য নিজেও হাসলো। বললো,
–আরশান এরকমই মা৷ খুব সহজেই অপরিচিত কাউকে আপন করে নিতে পারে বাচ্চাটা৷ ঠিক মিস আবৃতির মতো। তোমার নাতনি তো আর এমনিতেই মিস আবৃতির নেওটা হয়ে যায়নি৷
— ভাল কাজে দেরী করতে নেই বাবা৷ আমি অতি দ্রুত আবৃতির জন্য প্রস্তাব নিয়ে যাব। আশাকরি ওনারা আমাকে ফেরাবেন না।
★
উদাস ভঙ্গিতে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে ডিপার্টমেন্টসের করিডোর ধরে হাঁটছিল ঐশী। এখন একটা ওয়ার্ড ক্লাস এটেন্ড করতে হবে। বড় কথা সেটা নয়। ওয়ার্ড ক্লাসে আহানের মুখোমুখি হতে হবে। সেখানেই ঐশীর ভয়৷ কালকের ওই অনাকাঙ্খিত ঘটনায় আহান যে ওর উপর বেশ চটে আছে ঐশী জানে। এখনো ভুলতে পারেনি কালকে পার্টি থেকে ফেরার পূর্বের আহানের চোখ দিয়ে সেই ভস্ম করা দৃষ্টি। ঐশী নিজের আপন দুনিয়ায় বিভোর ছিল। হঠাৎ একটা রুম থেকে দুটো বলিষ্ঠ হাত ওকে আঁকড়ে ধরে রুমে ঢুকিয়ে নিল। ঐশী আঁতকে উঠে চিৎকার করার আগেই অতি পরিচিত মুখটা দেখে থামতে বাধ্য হলো। আহানের রণচণ্ডী মুখটা দেখে ঐশীর আত্মা শুকিয়ে গেল৷ এই রে এই ছেলে কালকের ঘটনা নিয়ে রেগে আছে বোধহয়৷ ভয়ে ঐশী খানিকটা দরজার দিকে সিঁটিয়ে যায়৷ আহান বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো,
— এসব কি?
ঐশী মেকি অবুঝ গলায় শুধায়,
— কোন সব ?
আহান নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
— ওই মুলা.. আই মিন ওই ছেলেটা হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলো?
— কোন ছেলে? ওহ সোহান ভাইয়া? উনি ভাইয়ার স্কুল ফ্রেন্ড। ভাইয়া জার্মানের একটা স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটির প্রফেসর৷ দেখতে শুনতেও খারাপ না। তাই দুই পরিবার থেকে চাচ্ছে আমাদের বিয়ে দিতে।
ঐশীর হাসিহাসি মুখ আহানের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সময়, পরিস্থিতি ভুলে খপ করে ঐশীর বাহু খামচে ধরে নিজের কাছে এক টান দেয়। ঐশী ‘আহ’ সূচক শব্দ করে টাল হারিয়ে ঠিক আহানের বুকে পড়ে। আহান ওর বেদনাময় মুখের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
— বিয়ের কথা শুনে অনেক খুশি মনে হচ্ছে? খুব পছন্দ হয়েছে ওই বিদেশী মুলা টাকে?
ঐশীর গোটা শরীরটা তিরতিরিয়ে কাঁপছে। আহানের এত সন্নিকটে, ওর হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শুনে নিজেকে কেমন অবশ অবশ লাগছে। কোন মতো কম্পিত গলায় বললো,
— কেন? আমি বিয়ে করলে আপনার কি?
— আমার কি জানোনা তুমি?
— না জানিনা। আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।
আহানের চোখ ঐশীর শ্যামলা বরণ সারা মুখে বিস্তার করে। ওর কাজলকালো মায়াবী দৃষ্টিতে নিজের বিমোহিত দৃষ্টি রেখে কাটকাট গলায় বললো,
— বিকজ ইউ আর মাইন। অনলি মাইন। এই কথাটা ওই বিদেশী মুলা টাকে ভালোভাবে বলে দিবে৷ আর নিজের মাথায় ও সেট করে নেবে।
ঐশীর চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বের হয়ে খুলে পড়বে। মোহবিষ্ট চোখ দুটো এঁটে আছে আহানের রাগে লাল বর্ণ ধারণ করা ফর্সা মুখে। এতদিন যে স্বীকারোক্তি টা পেতে ও মরিয়া ছিল আজ সেটা শুনেই নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছে। বুকের ধুকপুকানি নিয়ে ঐশী চারদিকে এলোমেলো চোখের পাতা ফেলে। আহান ঐশীর অস্থিরতা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠে,
— এতদিন পড়াশোনার ক্ষতি হবে চুপ ছিলাম। ভেবেছিলাম বিসিএসটা দিয়ে একেবারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাব। কিন্তু কে জানত যে এখানে বিয়ের জন্য নাচানাচি শুরু হয়ে যাবে?
ঐশী দুরুদুরু বুক নিয়ে কেটে কেটে অস্পষ্ট স্বরে বললো,
— প্লিজ একটু দূ… ইয়ে মানে আমার অস্বস্তি হচ্ছে খুব।
আহান চকিতে দূরে সরে গেল। নিজের কান্ডে নিজেই লজ্জিত হলো ভীষণ। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থমথমে আওয়াজে বললো,
— আমি মা আর চাচ্চুকে পাঠাব তোমাদের বাড়িতে।
ঐশী জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আহানের কথাটা বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে শুধালো,
— কেন?
আহান ফিরে চাইলে ঐশীর অবুঝ মুখে। বললো ধীরেসুস্থে,
— বিয়ে করতে।
ঐশীর চোখ জোড়া গোল্লা গোল্লা হলো। একটা শুষ্ক ঢোক গিলে তুতলে শুধায়,
— মানে।
— খুব শীঘ্রই ডক্টর আহান খন্দকারের বৌ হওয়ার জন্য রেডি হোন মিস ঐশীতা চৌধুরী।
ঐশী বিহ্বলিত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো দুপল।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বুকের কাঁপন। শরীর ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে যেন। কি বলছে এসব এই ছেলে? টাল হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে দুটো বলিষ্ঠ হাত ওকে ফের আগলে নেয়। কিন্তু এবার আর ঐশীর অস্বস্তি হচ্ছেনা৷ ঐশী নিজের মাথাটা আহানের বুকে রাখলো স্বেচ্ছায়। । আহান ইতস্ততভাবে হাত দুটো ঐশীর পিঠে রাখে। ঐশী চোখ বুজে নেয় প্রশান্তিতে। অনুভব করে মানুষটার হৃদয়ের সমানতালে ধক ধক করা শব্দ। অবশেষে ও বহুল আকাঙ্খিত প্রিয় মানুষটির স্বীকারোক্তি পেল। সামান্য এই ভালবাসার স্বীকারোক্তিটাও যেন ওকে পৃথিবীর সকল সুখ এনে দিল । বুজে রাখা লোচন বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রুজল গড়ালো আহান তা টেরই পেলনা।
★
সময়টা অপরাহ্নের শেষবেলা। আবৃতি ছাদে বসে ওর চাচাতো বোন আর আরশানকে পড়াচ্ছিল। হঠাৎ করে সেখানে আগমন ঘটে আহানের। আহানকে দেখে আরশান দৌঁড়ে গিয়ে কোলে ঝাঁপ দেয়। আহান হেসে ভাগ্নেকে আদর করে দেয়। সাথে আনা স্ন্যাকসের ব্যাগটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— ইনজয় মামু।
এতগুলো চকোলেট, চিপস, জুস পেয়ে আরশান খুশিতে আত্মহারা। এগুলো সে সচারাচর খেতে পারে না। এই বাড়িতে আনহাইজেনিক কোন খাবার এলাউড না। কিন্তু ইদানীং স্কুলে ঐক্য আর ওয়াফার থেকে অনেক চকোলেট খেতে পারছে।
— কিরে সব ওর জন্য আনলি?
— তোর জন্যও আচার এনেছি।
আবৃতির চোখ চকচক করে উঠে আচারের কথা শুনে।
— কই দে।
— দেব এক শর্তে।
— কি শর্ত৷
আবৃতি ভ্রু কুঁচকে শুধায়। আহান গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
— আমার একটা কাজ করে দিতে হবে৷
আবৃতি সরু নেত্রে ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললো,
— কাজটা কি শুনি?
আহান চারদিকে এলোমেলো চোখের পাতা ফেলে। আরশান আর নিজের চাচাতো বোন আরুহিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— তোমরা ওইদিকে গিয়ে এগুলো ইনজয় কর।
ওরা স্বায় জানিয়ে চলে গেল। আবৃতি সন্দেহি গলায় জিজ্ঞেস করে,
— কিছু প্রয়োজনীয় বলার আছে নাকি?
আহান উশখুশ করে বললো,
— হুম। ইয়ে মানে…
— আমার কাছে এত ইতস্ততার কি আছে আহান। বলে ফেল নিঃসংকোচে।
— আ..আমি ঐশীকে ভালোবাসি।
আহান চোখমুখ খিচে বললো।
— ওহ।
আহান হতবাক বনে যায় আবৃতির নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়ায়। আহানকে নিজের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবৃতি হাই তুলে বললো,
— তুই কি সবাইকে নিজের মতো গাধা ভাবিস?
— মানে?
— সবসময় দেখা হলে বাংলা সিনেমার নায়ক নায়িকাদের মতো চোখে চোখে কথা, মুচকি হাসা। ভাই আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম তোর আর ঐশীর মধ্যে কোন ঘাপলা নিশ্চয়ই আছে । কিন্তু কাল একেবারেই সিওর হলাম ওই সোহানের সাথে ঐশীর বিয়ের কথা শোনার পর তোর রিয়েকশন দেখে। বাপরে বাড়ি আসা অবধি কি গজগজ করছিলি আমি দেখিনি ভেবেছিস?
আহান থম মেরে বসে আছে। তার বোনটা যে অতি ডেনজারাস সে কিভাবে ভুলে গেল। যে মেয়ে তার বাড়ির বাইরে একটা দুটো সিগারেট খাওয়ার খবর বাবাকে বলে ক্যালানি খাওয়াতে পারে সেই মেয়ের কাছে
এসব জানা তো দুধভাত। একটা হতাশ নিঃশ্বাস ছেড়ে আহান বললো,
— এখন আমি কি করব?
— কি করবি মানে? মাকে এক্ষুনি জানা ঐশীর কথা।
— আমি কি…
আবৃতি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
–দেখ আহান নিজের ভালোবাসার দাবি পরিবারের সামনে রাখা এটুকু সৎ সাহস একজন পুরুষের থাকতে হয়। দেখলিনা বেচারা ধ্রুব নিজের ভালবাসার কথাটা বাবাকে বলতে পারেনি। কিন্তু বিয়ের পর সেই প্রেমিকাকে ডেট ঠিকই করতে পেরেছে। তোরা পুরুষরা আসলেই হারামী৷
আবৃতি নাক সিটকে বললো। আহান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গনগনে স্বরে বললো,
— সবাইকে ধ্রুবর মতো ক্যারেক্টাসলেস ভাববিনা আবৃতি। আমি ঐশীকে ভালবাসি। এন্ড ও আমারই হবে। এটা কেউ আটকাতে পারবেনা৷ তুই শুধু মাকে গিয়ে জানা। আমার লজ্জা লাগছে৷
আবৃতি হো হো করে হেসে বলে,
— মাকে আমি অলরেডি জানিয়ে দিয়েছি৷
আহান অবাক গলায় বললো,
— কখন?
আবৃতি হেসে বলে,
— আজ সকালে ঐশী কল করেছিল৷ মেয়েটা তোর মতো হাভা আব্বাসের জন্য কেঁদেকুটে একশেষ। ভাবা যায় তোর মতো রোবটের প্রেমেও কেউ এমনভাবে পিচলেছে। যার বই ব্যাতিত দুনিয়ার কোন কিছুতেই আকর্ষণ নেই।
আহান স্তব্ধ হয়ে বললো,
— সকালে ফোন দিয়েছিল?
— হুম। অনেক ভয় পেয়েছে বেচারী। তুই নাকি সিরিয়াস না সম্পর্কটা নিয়ে। এখানেই ওর ভয়। ঐক্য সাহেব আর আন্টি আজ জিজ্ঞেসও করেছিল ওর কোন পছন্দ আছে কিনা। মেয়েটা জোর গলায় কিছু বলতে পারেনি।
— তার মানে ম্যাডাম তখন ভাব নিয়েছিল আমার সামনে।
— কি?
— আজ থেকে পারবে জোর গলায় জানাতে।
আবৃতি বললো,
— ঐশী অনেস্টলি তোকে ভালবাসে। এই নিখাঁদ ভালবাসাটা হারিয়ে যেতে দিসনা৷ জানিস একটা সম্পর্কে ভালবাসা বিহীন শ্বাস নেওয়াও দুষ্কর।
আহান হেসে বললো,
— যা মাকে বল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে। জলদি তোর ভাবিকে ঘরে নিয়ে আসার প্রস্তুতি নিতে চাই।
চলমান…..