ছেলের ডাক্তার হিসেবে তিন বছর আগে চার মাসের সংসারে ফেলে আসা স্বামীকে দেখে বড়সড় ধাক্কা খেলো নওমি। দ্রুত হাতে ফাইল ঘেটে ডাক্তারের নাম চেক করলো সে ‘ডক্টর আযলান আজওয়াদ’ সে মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে স্বামীর নাম মনে করার চেষ্টা করলো শুধু মনে আসছে ‘আহিল’। ডক্টর দেখাতে আসার আগে নাম দেখলেও মাথায় আসেনি এই ডক্টর ওই ডক্টর হতে পারে।
– আপনি কি ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকার জন্য এসেছেন? তাহলে একটু সাইড হয়ে দাঁড়ান আমার আরও রোগী আছে!
ডাক্তারের আওয়াজে নওমি ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। ডেস্ক স্ট্যান্ডে নামটা দেখলো, ‘ডক্টর আযলান আজওয়াদ আহিল’ ঠিকই চিনেছে তাহলে! কোলে থাকা ছেলেকে আরো জোরে বুকে চেপে নিলো যেন কেউ কেড়ে নিয়ে যাবে!
– বসুন।
নওমি বসলে ডক্টর তাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নওমি মাথা নিচু করে থাকলেও বুঝতে পারলো আহিলের চাহনি, নওমির বুক ধক করে উঠলো। চিনে যাবে না তো? ডক্টর আযলান ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে মনে হলো সামনে বসে থাকা নারী ভীষণ রকমের টেন্সড। সে সময় দিয়ে নরম সুরে জিজ্ঞাসা করলো,
– কি সমস্যা?
আযলানের গলায় এমন নরম সুর কত বছর পর শুনলো নওমি। অবশ্য সবার সাথেই এভাবেই কথা বলত শুধু নওমি ছাড়া। নওমি কথার তাল হারিয়ে বললো,
– হ্যাঁ? সমস্যা?
নিচু স্বরটা ভীষণ চেনা লাগলো আহিলের কাছে কিন্তু বুঝতে পারলো না কার কণ্ঠ!
– জ্বি আপনি চেম্বারে এসেছেন নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে?
– আমার কোনো সমস্যা নেই।
– তাহলে আমার চেম্বারে?
– আমার.. না মানে ওর খুব জ্বর। কিছুতেই কমছে না!
কোলে থাকা ছেলেকে দেখিয়ে বললো কিন্তু আহিলের সামনে নিজের ছেলে বলে সম্বোধন করলো না। আহিল প্রেসক্রিপশন প্যাডে লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করলো,
– নাম কি?
নওমি চুপ করে আছে।
– কি হলো? দেখুন সময় নষ্ট করবেন না আমার। রোগীর সিরিয়াল অনেক!
– আ…আদনান আজ…
বলতে বলে থেমে গেল।
– আদনান?
– শুধু আদনান লিখুন।
– ওকে। বাবার নাম?
– নেই!
আহিল এবার মাথা তুলে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মেয়েটার বয়স অনেক কম মনে হচ্ছে এই বয়সেই…?
– নেই মানে?
– নেই মানে নেই। চিকিৎসা করতে কি এতো কিছু লাগে?
– আচ্ছা তাহলে মায়ের নাম বলুন গার্ডিয়ান তো লাগবে।
– নূ…নূর।
– পুরো নাম বলুন? আপনার ছেলে কিংবা আপনাদের কি একটাই নাম?
– পুরো নাম কেন লাগবে? নাম হলেই তো হলো।
– কারণ এই আচরণটা কি অস্বাভাবিক না?
নওমি চুপ করে গেলো। ঠিক তো নার্ভাসনেসে অস্বাভাবিক আচরণ করে ফেলছে সে। নওমিকে চুপ থাকতে দেখে আহিল আর কথা বাড়ালো না।
– ওকে বেডে শুইয়ে দিন।
আহিলের কথায় নওমি চোখ তুলে তাকালো। নিকাবের আড়ালের নীল চোখ জোড়া দেখে আহিলের বুকটা কেমন যেন করে উঠলো। সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললো,
– প্লিজ একটু দ্রুত করুন!
– কি করবো?
– আদনানকে বেডে দিন আমি চেকআপ করবো।
নওমি এটা শুনে কেমন যেন করে ছেলেকে চেপে ধরলো যেন সে দিবে না। আহিলের চাহনি দেখে সে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ছেলেকে বেডে শুইয়ে দিয়ে হাত শক্ত করে ধরে রাখলো। আহিলের চোখ এড়ালো না সেটা। এই মহিলা কি চাইছে সেটা বুঝছে চাইছে সে।
– হাতটা ছাড়ুন।
নওমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
– হ্যাঁ?
আহিল এবার নওমির দিকে পূর্ণদৃষ্টি রেখে গম্ভীর গলায় বললো,
– বললাম যে ওর হাতটা ছাড়ুন আমার চেকআপ করতে সমস্যা হচ্ছে।
– আপনি তো হাতে চেকআপ করছেন না তাহলে সমস্যা কেন হবে?
– রক্ত নিশ্চয়ই পুরো শরীরে চলাচল করে? হাত নড়চড় হচ্ছে যেটা আমাকে ডিস্টার্ব করছে।
নওমি তখনও হাত ছাড়ছে না দেখে আহিল নওমির দিকে তাকিয়ে দেখলো। প্রথম থেকেই দেখে মনে হচ্ছে ছেলেকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছে কেন যেন। সে নরম গলায় বললো,
– দেখুন, আপনার ছেলের কোনো ক্ষতি আমি করবো না। প্লিজ নিশ্চিন্ত থাকুন। কো-অপারেট করুন।
আহিলের নরম স্বর শুনে নওমি হাত ছেড়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– মা এখানেই আছি আব্বু! তোমাকে কারো কাছে যেতে দিবো না কেউ নিবে না তোমায়। চেকআপ হলেই আবার নিয়ে যাবো বাসায়।
আহিল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ওনি এমনসব কথা বলছে কেন? ওনার ছেলেকে এখানে কার কাছে যেতে দিবে? কি অদ্ভুত!
নওমি কিছুটা সরতেই সে চেকআপ করতে থাকল।
– মা মা, বাবা বাবা!
আদনানের এমন কথায় নওমির কলিজার পানি শুকিয়ে গেল। ছেলে বাবার ছবি দেখেছে কয়েকবার। একটু হলেও চেনা স্বাভাবিক কিন্তু এভাবে আহিলের সামনে পড়তে হবে সেটা ভাবতে পারেনি। এখন যদি ও বুঝে যায়? সে হাসার চেষ্টা করে এগিয়ে বললো,
– বা…বাবা নেই আব্বু! ওনি…ওনি তোমার বাবা নয়।
এই কথাটা বলতেও নওমির বুক ফেটে যাচ্ছে। গলায় কথা আটকে যাচ্ছে। বাবার সামনে ছেলেকে তার বাবা নয় বলে অস্বীকার করা কি সহজ?
– বাবা!
আদনান পুরোপুরি কথা বলতে পারে না। একটু আধটু যা উচ্চারণ পারে আর বাবা মা এইটুকুই। নওমি অবশ্য দাদা দাদু শিখানোর চেষ্টা করেছে তবে নানা নানু শিখায়নি। যে নেই সেটা শিখিয়ে কি হবে? নানা আছে তবে নেই! কি অদ্ভুত কথা হাহা!
– সে বোধহয় আমাকে তার বাবা ভাবছে। বাবাকে খুব ভালোবাসতো বোধহয়।
– বাসে!
– হু?
নওমি আনমনে উত্তর দিয়ে থতমত খেয়ে যায়। প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলে,
– স্যরি। আমি বলে দিচ্ছি ও আর ডিস্টার্ব করবে না আপনি চেকাপ করুন।
নওমি ছেলেকে আদর করে বুঝিয়ে বললো। আশ্চর্যজনকভাবে বাচ্চা ছেলেটা মেনেও নিলো আর টু শব্দ করলো না। আহিলও আর মাথা ঘামালো না। সে খুব মনোযোগের সাথে ছেলেটাকে পর্যবেক্ষণ করলো। আযলান আদনানের বুকে স্টেথোস্কোপ রাখতেই আদনান খিলখিল করে হেসে উঠল।ছেলেটা খুব আদুরে লাগছে তার মন চাইছে একটু আদর করি কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের সাথে এটা যায় না। একজন অচেনা পেশেন্টকে এভাবে আদর করা যায় নাকি। তবুও আদনানের চুলে বিলি কেটে আযলান অবাক হয়ে ভাবল, বাচ্চাদের প্রতি তার কোনোকালেই তেমন টান ছিল না, কিন্তু এই ছেলেটার জন্য তার হাত কেন বারবার কপালে চলে যাচ্ছে?
সে সম্পূর্ণ চেকআপ শেষ করে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসলো। নওমি আদনানকে নিয়ে এসে চেয়ারে বসলো। কলমটা হাতে নিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে গম্ভীর গলায় বলল,
– জ্বরটা বেশ কদিন ধরে আছে বলছেন, লাংসের কন্ডিশন খুব একটা ভালো ঠেকছে না। আমি কিছু পরীক্ষা আর একটা এক্স-রে দিচ্ছি। রিপোর্টগুলো আগামীকাল বিকেলের মধ্যে নিয়ে আসবেন।
প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিলে নওমি কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা নিলো। আযলান সেটা লক্ষ্য করলো কিন্তু কিছু বললো না।
– রিপোর্ট ছাড়া কোনো কড়া ডোজের ঔষধ দিব না। একটা কথা জিজ্ঞেস করি? কিছু মনে করবেন না, ডাক্তার হিসেবে অনেক সময় আমাদের অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হতে হয়।
নওমির বুক ধ্বক করে উঠল। নিজেকে সামলে বললো,
– জ্বি বলুন।
– আপনার ছেলের নাম কি বললেন যেন? আদনান? আর কিছু নেই?
– বললাম তো নেই!
– বাবা নেই বলছেন। অথচ বাচ্চার সারনেম বা বংশের নামটাও কি রাখা হয়নি? নাকি বাবার পরিচয়টা আপনি নিজেই মুছে দিতে চাইছেন?
নওমি চকিতে তাকালো। কি বলতে চাইছে ওনি? সে রাগ দেখিয়ে বললো,
– আশ্চর্য কি বলতে চাইছেন আপনি? আপনাদের কাজ তো পেশেন্ট দেখা! বাবার নাম ছাড়া কি আপনারা চিকিৎসা দেন না?
– না তা নয়। আমি বলতে চাইছি বাচ্চাটা কি আসলেই আপনার? মানে, আপনিই কি ওর জন্মদাত্রী মা?
নওমি যেন আকাশ থেকে পড়ল। স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল আযলানের দিকে। আযলান থামল না, তার ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল যা নওমির কলিজা কাঁপিয়ে দিল। আযলান আবার বলল,
– আপনার আচরণ বড্ড বেশি অস্বাভাবিক। যেভাবে ওকে লোকানোর চেষ্টা করছেন, বাবার নাম বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছেন মনে হচ্ছে কোনো অপরাধবোধ আপনাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আজকাল তো বাচ্চা চু’রি বা পা’চারের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আমি কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি যে আপনি ওকে হাসপাতাল থেকে তুলে আনেননি?
আযলানের এই কুৎসিত অভিযোগে নওমির কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল। যে সন্তানকে সে তিন বছর ধরে তিল তিল করে নিজের সবটুকু দিয়ে বড় করেছে, তাকে নিয়ে এমন কথা! নওমির ইচ্ছা করল চিৎকার করে বলতে, “আহিল, ও আপনারই রক্ত! নিজের সন্তানকে নিয়ে এমন কুৎসিত কথা বলতে বুক কাঁপলো না আপনার!” কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। আদনানকে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– ডক্টর আযলান আজওয়াদ, একটা বাচ্চার মা ছাড়া আর কারোরই তার প্রতি এত মমতা থাকে না। আর আপনি ডাক্তার হয়ে এইটুকু তফাৎ বুঝলেন না? ও আমার ছেলে, আমার কলিজার টুকরো। চু’রি করা বাচ্চা হলে নিশ্চয় টাকা খরচ করে ডক্টর দেখাতে আনতাম না! তাছাড়া আপনাকে আমি এই বিষয়ে কিছু বলার অধিকার দিই নি! আপনার দরকার ফী! সেটা আপনার ডেস্কে রাখলাম!
নওমি পার্স থেকে ভিজিটিং ফির টাকাটা বের করে সজোরে ডেস্কের ওপর রাখল। টাকার নোটগুলো ডেস্কে রাখার শব্দটা যেন আযলানের আত্মসম্মানে গিয়ে আঘাত করল। আযলান বসা থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার ফর্সা মুখ রাগে রি রি করে উঠেছে। কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠলো,
– টাকার গরম দেখাচ্ছেন, মিসেস নূর? আপনি ডক্টর আযলান আজওয়াদকে চেনেন না! আমার এখানে ফী-এর চেয়ে পেশেন্টের সিকিউরিটি আর লিগ্যালিটি অনেক বেশি ম্যাটার করে।
– টাকার গরম দেখাচ্ছি না! আর না তো কখনো পারবো! কোথায় আপনি কোথায় আমি! কিন্তু আমার আর আমার সন্তানকে নিয়ে বাজে কথা বললে সেটার প্রতিবাদ করার মতো ক্ষমতা আমার আছে!
নওমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। আযলানের রাগ মিশ্রিত চাহনিকে উপেক্ষা করে আদনানকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে সে হনহন করে চেম্বারের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আযলান রাগে ফুঁসতে লাগল। একজন সাধারণ পেশেন্টের এত বড় সাহস যে তার মুখের ওপর এভাবে কথা বলে চলে যায়? আর ওই টাকা ছুড়ে মা’রা!
আচমকাই তার চোখ গেল ইন্টারকম ফোনের দিকে। সে রিসিভারটা তুলে গম্ভীর গলায় অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলল,
– শুনো, একটু আগে যে নিকাব পরা মহিলা আমার চেম্বার থেকে বের হলো, পেশেন্টের নাম আদনান। সিরিয়াল দেওয়ার সময় ওনার যে ফোন নাম্বার আর ডিটেইলস এন্ট্রি করা হয়েছে, সেই স্লিপের কপিটা এখনই আমার কেবিনে নিয়ে এসো। আই নিড দ্যাট।
গল্প টা কেমন হয়েছে সবাই জানাবেন আর রেটিং দিবেন ধন্যবাদ।