গল্প: প্রেম সমাচার (০৩)

লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা

পর্ব — ৩

 


স্টেশনের ওয়েটিং লাউঞ্জে মাথায় হাত দিয়ে অনুভুতি শুন্য হয়ে বসে আছে নীতি। হাতে তখনো ধরে রাখা সিঙ্গারার প্যাকেট। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকাটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। সুতরাং উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে থাকে লাউঞ্জে। ফের এসে বসলো বেঞ্চিতে। তবে নিজেকে কোনোভাবে দমিয়ে রাখতে পারছেনা সে। ওদিকে খালি মুখে বেশি টেনশন করতে পারেনা। টেনশন করাটাও একটা কাজ। কাজ করলে এনার্জি প্রয়োজন। আর খাবার ছাড়া এনার্জির মধ্যম মানুষের জন্য এখনো আবিস্কৃত হয়নি। নীতি গাছ হলে ভালো হতো। সালোকসংশ্লেষণ করে মাটি থেকে খাবার বানিয়ে নিত। বিজ্ঞানীদের উচিত এমন কোনো প্রসেস আবিষ্কার করা। তাহলে আর কাউকে অনাহারে থাকতে হতো না।অন্য হাতে কপাল চাপড়ালো কয়েকবার। চেহারাটা ভীষণ করুণ লাগছে ওর। ব্যথাও পেলো বেশ কপালে। ফোনটা রেখে এসেছে ট্রেনে। ব্যাকপ্যাক সহ যাবতীয় জিনিসপত্র রয়ে গিয়েছে সেখানে। সেসব ফেরত পাবার আশা না চাইতেও বাদই দিতে হবে। সবচেয়ে বেশি রাগ হলো হুলো বেড়াল নীরবের উপর। শালা যদি ট্রেনের চেইন টানতো তাহলে হয়তো এখানে সবকিছু বিসর্জন দিয়ে নীতিকে বাসি সিঙ্গারা চিবুতে হতোনা। নীরবের কথা মাথায় আসতেই রাগ আরো বেড়ে গেলো নীতির। বিড়বিড়িয়ে বললো,

— পৃথিবী গোল। দ্যা আর্থ ইজনট ফ্ল্যাট নীরব সাহেব। ঘুরেফিরে তুই ব্যাটা হুলো আমার সামনে নির্ঘাত পড়বি একদিন। সেদিন তোকে বুঝিয়ে দেবো নীতি কি জিনিস? তুই কি ভেবেছিস শালা ছ্যাচড়া..নীতি সুন্দরী বলে ওর ব্রেইন নেই? হাহ!জানিস না রে পাগলা। বোঝার খেলায় তুই গো হারা হেরেছিস। নীতি বিউটি উইথ সুপার শার্প ব্রেইন। আই-কিউ ১৫০। ওমন জ্যাকেট দুশো টাকা দিলে গুলিস্থানে অহরহ পাওয়া যায়।সেই তুই কি না সামান্য জ্যাকেট দেখিয়ে নিজেকে আর্মি দাবি করে আমার জিনিস চুরি করবি আর আমি ছেড়ে দেবো? তোকে যদি জেলের ভাত না খাইয়েছি তো আমার নামও নীতি নয়৷ পৃথিবীর একজন গুণী জার্নালিস্টকে ধোঁকা দেয়া এত সহজ না। তোর পুরো খানদানকে আমি এক্সপোজ করবো। বিবিসি নিউজে প্রতিবেদন জমা দেবো। এমনভাবে প্রতিবেদন জমা দেবো না, অস্কার থেকে লোক এসে তোকে সেরা চোরের এওয়ার্ড বাড়ি বয়ে দিয়ে যাবে….

বিড়বিড় করে কথা বলার ফাঁকে দেখলো স্টেশনে থাকা কতগুলো টোকাই এক জায়গায় হয়েছে। লাউঞ্জের বাইরে হুড়োহুড়ি করছে। বিশ্রীভাবে হেসে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে নীতিকে৷ ভাগ্যিস ছোট পার্সখানা নিয়ে বেরিয়েছিল নামার সময়। নয়তো এখন যে কি হতো! চোখ সরু করে ওদের দিকে তাঁকিয়ে কড়া গলায় বললো,

— এই-ই টোকাই এ-র দল? এখানে কি প্ল্যাস্টিক পড়ে আছে? উঁকিঝুঁকি দিয়ে কি খুঁজছিস? ভাগ এখান থেকে? মেরে এই ট্রেন লাইনে শুয়ে রেখে যাবো। একা মেয়ে দেখলি আর অমনি সুযোগ নিতে চলে এসেছিস? আমার স্বামী আর্মিতে আছে। সামনের দোকানে চা নিতে গিয়েছে আমার জন্য। ওর টাফ লুক দেখলে না প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবি। যা এখান থেকে।হুশ..হুশ।

এবারে সুযোগ পেলো টোকাইয়ের দল। ওদের মধ্যে একজন বুক চিতিয়ে এগিয়ে এলো। বলল,

— আপনার স্বামী তো আপনারে রাইখাই গেলো গা আফামনি। খারাপ লাগে বুঝলেন আফা। আপনের মতো সুন্দরী বউ পাইয়াও হেই কদর বুঝলো না। একলা আছেন। তাই আইলাম।

— এই তুই আগে এখান থেকে বিদায় হ। আমার স্বামীর ব্যপার আমি বুঝে নেবো। বের হ। কত বড় কলিজা তোদের হ্যাঁ? আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিতে আসিস? আজ পর্যন্ত আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে কেউ পারেনি। মাইর খেতে না চাইলে দূর হ আমার সামনে থেকে। নইলে স্টেশনে টোকাইগিরি না করে ল্যাংচায়ে ভিক্ষা করে বেড়ানো লাগবে। পলিথিন শুকতেও পারবিনা। নাকটাও থাকবে না। য-আ এখান থেকে ভাগ।

এবারে এলো বাকি ছেলেপুলেরা। তারাও বিশ্রীভাবে হেসে বললো,

— চল আপারে আমাগোর বাড়ি দেখায় আনি। গরীব বলে নাক সিটকাইয়েন না। বলেই অপেক্ষা না করে নীতিকে ঘিরে ধরলো ওরা। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে টুল উঠিয়ে মারতে গিয়েও ওদের কাছে মার খেলো নীতি। পার্স ব্যাগটা ছুটলো হাত থেকে। ওকে টেনে স্টেশনের পেছনের দিকে নিতে থাকে ছেলে গুলো।

 আচমকা লাউঞ্জে পড়ে থাকা প্ল্যাস্টিকের টুল উঠিয়ে ওদের মধ্যে থাকা একটা ছেলের মাথায় মারলো নীতি। এতে করে রক্তাক্ত হলো জায়গাটা। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। কান দিয়ে বের হলো সরু রক্তের ধারা। ছেলেটার অবস্থা পরোখ করে তীক্ষ্ণ গলায় বললো,

— তোদের এতক্ষণ ধরে সাবধান করছি অথচ শুনলি না আমার কথা। যা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যা। নয়তো বাঁচবে না। বলে ছেলেটার পিঠ বরাবর একটা লাথি দিতেই কেমন যেন ধনুকের মতো বেঁকে গেলো ছেলেটা। শ্বাস নেয়ার জন্য হাসফাস করতে থাকে৷ আর হতবম্ভ হয়ে গেলো বাকি ছেলেপুলেরা। এই মেয়ের এত তেজ!

পার্সটা কুড়িয়ে বাইরে এসে প্ল্যাটফর্মের উপর হাঁটতে থাকে নীতি। হইচই করে আহত ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলো বাকি তিনজন। ওদের দেখে আবারও খেঁকিয়ে উঠলো নীতি,

— আজ তোদের ভাগ্য ভালো আমার যাবার তাড়া আছে। নয়তো মেয়েদের অসম্মান করার চেষ্টায় তোদের সবকটাকে জ্যান্ত পুতে ফেলতাম আমি। বলেছি না আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ জিততে পারেনি। কথাটা বিশ্বাস হয়নি? ছোট একটা ট্রেইলার দেখালাম। এখন আবার ফুল মুভি দেখতে চাস না। তাহলে আর মাটির উপরে থেকে দেখতে পাবিনা,বুঝেছিস? পালা.. নাক বরাবর যাবি। আতিপাতি করবিনা। যা পালা।

ছেলেগুলো পালিয়ে গেলো দৌড়ে। সেদিকে চেয়ে আরও কিছুক্ষণ কটমট করলো নীতি।

রাত বাড়তেই কুয়াশাও বেড়েছে। শীতটা পড়লো বেশ জাঁকিয়ে। স্টেশনে সিমেন্ট দিয়ে বানানো ফলকে জায়গার নাম দেখাচ্ছে ‘চাতালগাও’। এমন জায়গার নাম এর আগে কোনোদিন শোনেনি নীতি। সুতরাং এটা কোথায় উপরওয়ালা জানেন শুধুমাত্র।

— দ্যাট ওয়াজ গুড।

একাকী স্টেশনে কুয়াশাভেদ করে আসা কন্ঠস্বর শুনে ভ্রু কুঁচকে গেলো নীতির৷ বলল,— ‘আবার কোন উজবুক এসে হাজির হলি ভাই? তোরা বুঝতে পারছিস না কেন? আমার পালানোটা জরুরি। সরকারি চাকরিজীবীর থলথলে ভুড়ির দিকে আমার ঠেলে পাঠিয়ে দিতে সবাই একযোগে যড়যন্ত্র লিপ্ত হয়েছে কেন? হে খোদা? আমি তো বিয়ে করব না বলে পণ করিনি। শুধু বলেছি একটু হ্যান্ডসাম লোককে বিয়ে করতে চাই।এতে আমার দোষ কোথায়? সবাই একযোগে আমার সর্বনাশে মত্ত হলো কেন? ‘

নীতির বকবকানির মাঝে সামনে এলো নীরব৷ তার ঠোঁটের কোনে রহস্যময় হাসি। হাতে জলন্ত সিগারেট।

নীরবকে দেখতেই চিড়বিড় করে উঠলো নীতি। তেড়েমেড়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কোমরে হাত দিতে। আরেক হাতে নীরবের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল,

— আপনি? আপনি এখানে এলেন কিভাবে?

তবে প্রত্যুত্তরে কিছু বললোনা নীরব৷ শুধু ঠোঁটের কোনের হাসিটা চওড়া হলো খানিকটা।

— কথা বলছেন না কেন? আপনি মানুষ তো? নাকি আমার ট্রেনের প্রতিবেশীর রুপ ধরে কোনো জ্বীন হাজির হয়েছেন? দেখুন ভাই সাহেব? আপনি জ্বীন হোন কিংবা ইনসান আপাতত আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিবেন না। আমার মেজাজ প্রচন্ডরকম খারাপ। যাকে সামনে দেখছি তাকেই মারতে ইচ্ছে কোরছে।এই যেমন এখন মন চাইছে আপনার মাথার চুল টেনে সব ছিড়ে উপড়ে ফেলতে। পেট ফাসায়ে তাতে কিছু রেলের পাথর ভরে দিতে। আরও অনেক কিছুই আছে আমার কাছে বিপদের সামগ্রী সেসব যদি একবার বের করিনা? ভয়েই অজ্ঞান হয়ে যাবেন। বাই দ্যা ওয়ে আপনি যার রুপ ধরে এসেছেন না? তার বিষয়ে একটা সিক্রেট বলি? আমি আবার মানুষ দেখলেই তার সিক্রেট ধরে ফেলতে পারি। আমার আই-কিউ দেড়শ। অনেক বেশিনা? সবাই ভাবে সুন্দরী মেয়েদের আই-কিউ লো। জানবেই বা কিভাবে সবাই বলুন? আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তবেই না তাদের ধারণা পালটে যাবে। পৃথিবীতে এখনো আমার মতো বিউটি উইথ ব্রেইন এক্সজিস্ট করে। আর ওই লোকটা যার কথা বললাম সে একটা বাটপার, পকেটমার। আমার পার্স চুরি করতে গিয়ে ধরা খেলো। আমার তো মনে হয় সে একজন ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল।

সিগারেটটা পায়ে পিষে আরো একটা সিগারেট ধরালো নীরব৷ ধোঁয়াটা ছেড়ে বলল,

— আপনি সবসময় এমন বাচালগিরি করেন মিস নীতি?

— আপনি আমার নাম জানলেন কিভাবে? তার মানে আপনি জ্বীন নন। নাকি কোনো গুপ্ত জাদু করে নাম জেনেছেন? তাহলে একটু সাহায্য করুন প্লিজ। কিছুক্ষণ আগে একটা ট্রেন পাস হয়েছে না এদিক দিয়ে? আমাকে উড়িয়ে ট্রেনে দিয়ে আসুন। A-2 সিট নাম্বার আমার। চৌদ্দশত টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিলাম। প্রথমে অবশ্য এক ভবঘুরে আমাকে জায়গা দিতে চায়নি। কিন্তু আমি জায়গা ছাড়িনি। আদায় করে নিয়েছি। পঞ্চগড় যাচ্ছি। বান্ধবীর কাছে। ফেসবুকে পরিচয় হয়েছে। বারবার যাবার জন্য বলে, এবার সুযোগ পেলাম, সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছি। আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ট্রেনটা আপনাকে রেখে চলে গেলো নাকি আমায় মিস করছিলেন?

— আপনাকে মিস করছিলাম।

— দেখুন? কেবল একপাল টোকাই বিদেয় করেছি। আবার আপনি শুরু হয়ে যাবেন না। এই দেখুন আমার কাছে কি আছে? পেপার স্প্রে। চোখে দিয়ে দেবো কিন্তু। আপনাকে একটা কথা শেয়ার করি আমার কাছে লাফিং গ্যাস আছে। সালফিউরিক এসিডও আছে এক বোতল। এই টোকাই গুলোকে মে রে কাজ না হলে এসিড ঢেলে দিতাম৷ তার আগে অবশ্য লাফিং গ্যাস ছাড়তাম। হেসেই মরে যাক টোকাই গুলা। এতে কাজ না হলে তখন সালফিউরিক ইউজ করতাম। দেখছেন আমি বলেছিলাম না আম বিউটি উইথ ব্রেইন। প্রমাণ পেলেন?

— পেলাম। কিন্তু আপনার ব্যাগ তো ট্রেনে ফেলে এসেছেন।

— আপনার আই-কিউ এত কম কেন?

এইযে পার্স ব্যাগ এখানে রেখেছি সব। চলুন না নীরব সাহেব এখন।

— যেতে পারি। বাট আই হ্যাভ আ কন্ডিশন। ইউ হ্যাভ টু কিপ ইয়োর মাউথ সাট। ক্যান ইউ ডু দ্যাট?

নীরবের সামনে একটু এগিয়ে দাঁড়ালো নীতি। ঠোঁট টিপে একটু রহস্যময় হেসে বললো,

— শর্ত! ট্রেন থেকে হিরোর মতো লাফিয়ে নামার আগে খেয়াল রাখা উচিত ছিলো। আমি মোটেও বেশি কথা বলিনা। বরং আমার সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে আমার শর্ত মেনে নিতে হবে। নয়তো আমি আপনাকে চিনি না।

— আচ্ছা?

— জী। এইযে কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগীর চেহারা নিয়ে আমার সামনে আসবেন না। আপনাকে দেখলেই আমার গায়ের মধ্যে চিড়বিড় করছে। আপনাকে উথাল-পাতাল মারতে মন চাইছে। আপনার জন্য আমার ট্রেন মিস হয়েছে। আপনি ট্রেনের চেইন টানলে আমার এখন আপনার চেহারা দেখা লাগতো না। নাহ। আমারই ভুল। শোনেন নীরব ভাই। আপনাকে আমি চিনি না। আমাকে ফলো করবেন না। আপনার রাস্তা, আমার রাস্তা ভিন্ন। আপনি একটা কুফা।

বলেই সেখান থেকে চলে এলো নীতি। প্ল্যাটফর্মে টানা পায়ে হেঁটে এগিয়ে যেতে থাকে।

নীরবের ঠোঁটে তখনও রহস্যময় হাসি। সেই হাসি নিয়েই ফিচেল গলায় বললো,

— কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি নীতি। আপনাকে ছাড়া বাঁচব না। প্লিজ ম্যারি মি।

চলবে…

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x