লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
পর্ব — ৪
— আ..আপ…আপনি…
জিহ্বার ডগায় থাকা শব্দটুকু কোনোভাবেই শেষ করতে পারলোনা নীতি। বারবার চোখের পলক ঝাপটে, বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়েই থাকলো কুয়াশা গায়ে মেখে স্টেশেনের রঙচটা পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো স্বপ্লপরিচিত যুবকের দিকে। নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারেনা নীতি। আজ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতিতে নীতি কোনোদিন পড়েনি। মস্তিষ্ক শূন্য লাগছে কেন এমন? শব্দগুলো যেন বাক্যগঠন করতে ভুলে গিয়েছে নীতির নিউরণের অভ্যন্তরে । আচ্ছা এই মুহুর্তটাকে কি বলে? বাকহারা? হ্যাঁ বাকহারাই তো। ইংরেজিতে যাকে বলে স্পিচলেস। সামান্য ট্রেনে মোলাকাত হওয়া এক বাটপার কিনা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল প্রস্ফুটিত জার্নালিস্ট নীতিপ্রিয়া শাহকে স্পিচলেস করে ছেড়েছে? এই লোকের এত সাহস হয় কিভাবে? রাত-বিরেতে একা সুন্দরী মেয়ে দেখলো আর অমনি প্রেমে পড়ে গেলো! গুলি মেরে লোকটাকে উড়িয়ে দেবে সে লোকটাকে। অবশ্যই দেবে।
অন্যদিকে পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান হিসেব কষে চলেছে সময়ের৷ সন্ধ্যে থেকে ননস্টপ সম্প্রচারিত হওয়া লাইভ লাউডস্পিকার সার্ভিসকে কিছুসময়ের জন্য ভ্যাবাচেকা খাওয়াতে পেরে নিজেকে নিয়ে বড়ই গর্বিত হলো সে। এমন গর্বিত নীরব যেদিন মিলিটারি একাডেমি থেকে ‘সোর্ড অফ অনার’ পেয়েছিল সেদিনও হয়নি। তবে লাউডস্পিকার বেশিক্ষণ থেমে থাকবে না অবশ্য-ই। সামান্য সময়ের জন্য মিউট হয়েছে শুধুমাত্র। এটা মেয়ে নয়, ল্যান্ডমাইন। নীরব সেই ল্যান্ডমাইনে কদম রেখেছে জেনেবুঝে । এখন বাক বিস্ফোরণে পুড়ে ছারখার হওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
নীতি বিমূঢ়ভাব ততক্ষণে সামলে উঠলো অল্প সময়ে। তার চোখ অবিশ্বাস৷ কপাল কুঁচকে সন্দিহান হয়ে ফের কোমলভাবে শুধায়,
— আপনি আমায় কি বললেন?
নীরবের ঠোঁটের কোনের হাসিটা তখনও অমলিন। সিগারেটের ছাই ফেলে আবারও ঠোঁটে চেপে ধরলো। লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ছেড়ে বললো,
— ইউ হার্ড মি রাইট মিস নীতি?
‘টিক..টিক..টিক..নীতির বিস্মিত দৃষ্টির চাপা ক্রোধ মিশ্রিত চাহনিতে ট্রেনিং-এর দিনগুলো মনে পড়ে যায় নীরবের। বোম ডিফিউজাল কোর্সে যেমন ধুকপুকানি নিয়ে বোমের ডিফিউজ ওয়ার কেটে অপেক্ষা করতো..নীতির বিস্ফোরণের জন্যও তেমন আগ্রহভরে অপেক্ষায় না থেকে পা বাড়ালো সামনের দিকে। কি দরকার অকালে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার৷
নীরবকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে দেখে মাথায় রক্ত উঠে গেলো নীতির। আজ এই হুলোটাকে ও বুঝিয়েই ছাড়বে নীতির সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ জিততে পারেনি। তেজী গলায় বললো,
— এইই…ইউ ব্লাডি ছ্যাচড়া। সুন্দরী মেয়ে তার উপর হাই আই-কিউ দেখে লোভে পড়ে গিয়েছিস? কি বললি তুই আমাকে? নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছিস কোনোদিন? কুজোর আবার সোজা হয়ে শোবার শখ! নাক তো নয় যেন তোতা পাখির ঠোঁট। এই নাক নিয়ে প্রপোজ করতে এসেছিস? তোর নাকের জন্য তো কেউ তোকে কিসও করতে পারবে না। কিস করারও যোগ্যতা নেই এসেছে প্রপোজ করতে! প্রথম দেখায় হাংকি পাংকি করলেও আমি তোকে ভালো ভেবেছিলাম।কিন্তু তুই শালা শেয়ালের লেজ। সুযোগ পেতেই অমনি লাইন মেরে দিলি? তা-ও ডাইরেক্ট বিয়ের প্রপোজাল? তোর মতো বাটপারকে আমি নীতি জীবনেও বিয়ে করবো না। কত দেখলাম তোদের মতো ঠকবাজদের। গুলিস্থানের জ্যাকেট পরে ভাব দেখাস যেন বিরাট কোনো আর্মি পারসন। তুই জানিস আমার জন্য পাত্রপক্ষের লাইন থাকে। আমি কাউকে পাত্তা দিইনা। আমি? প্রয়োজনে আমি এখন বাড়ি ফিরে যাবো। থলথলে ভুড়িওয়ালাকে হ্যাঁ বলে দেব। ওই লোকের সঙ্গে সুইজারল্যান্ড হানিমুনে যাবো। তা-ও তোকে আমি একবিন্দুও ছাড়বো না। ওই টোকাই গুলোর পাশের বেডে তোকেও ভর্তি করিয়ে দেবো। আমি এমনিতেই জার্নালিস্ট হইনি। কুংফু শিখেছি। ক্যারাটে পারি। কিছু নার্ভ-এটাক মুভসও জানি। উদয়ীমান জার্নালিস্ট দেখে বসে খেয়ে থলথলে ভুড়ি বানানোর জন্য এইটুকু সময়ের মধ্যে প্রেমের নকশা তৈরি করে ফেলেছিস। শালা বাটপারের বাটপার৷ তোকে এমন ডলা দেবো না যাকে বলে বাংলা ডলা। চিনিস না আমাকে?
বাকি কথা গুলো শোনার প্রয়োজন অনুভব করলো না নীরব৷ সে এগিয়ে গেলো নীতিকে একদম অদেখা করে, পাশ কাটিয়ে। বোলতার চাঁকে ঢিল মেরে সেখানে দাঁড়ালে হূলের গুতো খাওয়াটা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। নীরব অবশ্যই হূল ফোটানো খেয়ে ইচ্ছুক নয়। সুতরাং বাচাল বোলতার হূল থেকে বাঁচতে নীরব বেশ দ্রুতই হাঁটছিল। ট্রেনিংয়ে ঘন্টায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটানোর অভ্যস করেছে ওদের। সুতরাং হাঁটতে বেশি অসুবিধা হলোনা ওর। বরং শীত গায়ে মেখে হাঁটতে ভালো লাহছে। এই লাউডস্পিকার না থাকলে নীরব সময়টা উপভোগ করতো। ওর জীবন চলে রোবটিক ওয়েতে। আজ কিছুটা ব্যতিক্রমে ভালো লাগছে। নীতির বেশ কষ্ট হলো তাল মেলাতে। মুখ আর পা দুটো একসঙ্গে চালানো তো আর যাই-তাই কথা নয়। ওদিকে হুলোটা হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। হাপাতে হাপাতে একটু জোরেই চেঁচালো,
— এখন পালিয়ে যাচ্ছিস কোথায়? বিয়ে করবি না? তুই নাকি মরে যাবি আমাকে না পেলে? এতটুকু দম নিয়ে আমার প্রপোজ করেছিস? এখনো বুঝে উঠতে পারিস না আমি কি জিনিস? বলি কি যাত্রাপালা করিস নাকি? দম সব শেষ। তোর চোখ আমি পেপার স্প্রে দিয়ে গেলে দেবো। দাড়া বলছি…
হাঁটার গতি খানিকটা কমিয়ে পিছু ফিরে এলো নীরব। বেশ ভদ্রভাবে ঠোঁট টিপে হাসলো। যেন নীতিকে রাগিয়ে দেয়ার মতো এহেন কোনো কথা তার কণ্ঠনালি হতে নিঃসৃত হয়নি কখনোই । ঠোঁটের হাসিটা অমলিন রেখে নীরব ফের ভদ্রভাবে বললো,
— আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেন মিস নীতি? একা ভয় পাচ্ছেন? ইউ ওয়ান্ট মি টু হেল্প?
— আপনি আমাকে কি বলে এসেছেন খেয়াল আছে? আমাকে যা-তা বলে পার পেয়ে যাবেন ভেবেছেন?
— নাহ। পার পেতে চাইলে কি ফিরে আসতাম। তো এখন কি চাইছেন? আমাকে বিয়ে করবেন? যার কারণে পিছু নিয়েছেন?
— আপনাকে আমি কোন দুঃখে বিয়ে করতে যাবো?
— বিয়ে মানুষ সুখের জন্য করে৷ ইউ নো শারিরীক সুখ। আফটার অল আপনি একজন জার্নালিস্ট। জানারই কথা..
— দেখুন?
— সত্যিই দেখাবেন?
— স্যার রুম লাগবে?
নীতি প্রতুত্তরে কিছু বলবে তার আগে কুয়াশার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মধ্যবয়স্ক এক লোক। পরণে লুঙ্গি। তারউপরে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা রঙজ্বলা উইন্ডব্রেকার। এধরনের শীত-পোশাক আমাদের দেশীয় নয়। উচ্চবিত্ত দেশ গুলো থেকে আসে রি-ইউজের জন্য। নাক-মুখ মাফলার দিয়ে ঢেকে রেখেছে লোকটি। তার উপর আবার জড়ানো বড় শাল চাদর। লোকটাকে দেখে বুঝতে বাকি রইলো না নীরবের। কোন রুমের দিকে ইঙ্গিত করেছে। মুহুর্তে বেরিয়ে এলো মিলিটারির কড়া মেজাজ। ধমকে উঠে লোকটিকে বললো,
— না।
তবে সেই লোকও নাছোড়বান্দা। মাফলারটা মুখের উপর থেকে নামিয়ে পান খাওয়া দাঁত বের করে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসলো। বললো,
— আপনাগোর অনেকক্ষণ ধইরা দেখতাছি৷ আমার কাছে একেবারে সেভ জায়গা আছে।কাক-পক্ষীও টের পাইবো না। স্টেশনে দাঁড়ায়া আর কতক্ষণ থাকবেন।
— ইউ? ধমকে উঠে নীরব। ট্রেন থেকে নেমে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল আজ সে করে ফেলেছে! ডিপার্টমেন্টের কোনো ট্র্যাপ যদি এটা হয়েই থাকে তবে লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান শুণ্য পেয়েছে। নিজের লক্ষ্য পূরণে অনেকাংশে পিছিয়ে গেলো নীরব। নিজ সিদ্ধান্তে প্রথমবারের মতো আফসোস হলো নীরবের।
নীরবকে চুপ থাকতে দেখে এবারে নীতিকে উদেশ্যে করে লোকটা বললো,
— আপামনি? ভাইয়ে রাজী হইতাছে না? রেট বেশি চাইতাছেন? লন আমি আপনাগো মিমাংসা কইরা দিতাছি। ভাই? আপনে আর পঞ্চাশ টাকা বাড়ায় দিয়েন। আমারে কিছু চা-পানি খাওয়ার জন্য দিয়েন তাতেই হইবো। নতুন কাস্টমারদের আমি ছাড় দিয়া চলি। হাজার হোক ব্যবসা করতে আইছি। সবার খেয়ালই রাখন লাগে…
ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙলো নীরবের। লোকটা আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না। কেননা নাক বরাবর একটা ঘুষি মেরে দিয়েছে নীরব। মিলিটারি একাডেমিতে বক্সিং চ্যাম্পিয়ন লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ানের এক ঘুষিতে জ্ঞান শুণ্য অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লো লোকটা।
শুকনো একটা ঢোক গিললো নীতি। এমন ডেঞ্জারাস লোককে উল্টোপাল্টা কথা বলা মোটেও ঠিক হয়নি। তবে নীতি যে ভয় পেয়েছে এটাও বুঝতে দেবেনা। কোমর গলায় বললো,
— আপনি বক্সিং জানেন নীরব সাহেব?
— আপনি সারারাত এখানে দাঁড়িয়ে আর কোনো উদ্ভট লোকের পাল্লায় পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবেন মিস নীতি?
মিলিটারির ধমক খেয়েও দমলো না নীতি। সেও সমান তেজ নিয়ে বললো,
— এসব কিছুর জন্য আপনি দায়ী। এবার আমাকে ট্রেন পর্যন্ত পৌছানোর দায়িত্ব আপনার। নয়তো আমি আপনার নামে কেইস করবো। ফ্রড আর্মি সেজে সিভিলিয়ানকে ভয় দেখিয়ে বেড়ান আমি জেনে গিয়েছি৷ আপনি বক্সিং পারেন, আমিও ক্যারাটে পারি। সুতরাং আপনার ভয়ে আমি পিছপা হবো না৷
এতটুকু বলেই থামলো না নীতি। তারপর করুণ স্বরে কাকুতিমিনতি করে নীতি দু-হাত জোড় করে বললো,
— আমাকে পঞ্চগড় পৌছে দিন নীরব সাহেব।একজন জার্নালিস্টকে থলথলে ভুড়িওয়ালা সরকারি চাকরিজীবীর চর্বির নিচে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিন। আমি জানি মনুষ্যত্ব আজও বেঁচে আছে। সেজন্যই তো নিজের কথা চিন্তা না করে আপনি চলন্ত ট্রেন থেকে আমার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। প্লিজ হেল্প মি। প্লিজ। প্লিজ প্লিজ প্লিজ..
নীতির শেষ কথাগুলো শুনে একটু বিব্রত হলো নীরব। শিথিল হলো মেজাজের পাল্লা। আসলেই এই বাচাল মেয়েটির জন্য সে চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যদিও এটা ওর জন্য বড় কোনো বিষয় নয়। ট্রেনিংয়ের সময় জাপানের বুলেট ট্রেন থেকে লাফানোর ট্রেনিং করেছে নীরব। ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি এসে এই মেয়ের জন্য হেরে যেতে পারেনা সে। অতএব ক্লু খোঁজার জন্য হলেও ওকে নাটক চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। গম্ভীরমুখে শুধু বললো,
— চলুন যাওয়া যাক।
— কোথায়? কিভাবে? কখন? ট্রেন তো আমাদের ফেলে চলে গেলো। আপনি চেইন টানলে ঠিকই দাঁড়াতো ট্রেইন। আমার চৌদ্দশত টাকার টিকিট! সবটা জলে গেলো। ওহ.. জলে নয়। ট্রেনে গেলো। ট্রেন আছে,সিট আছ্র, ব্যাগপত্র আছে কিন্তু মানুষ নেই।
— আপনি একটু কম কথা বলতে পারেননা মিস নীতি?
— আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলিনা নীরব সাহেব। আই নো দ্যাট।
বলেই প্ল্যাটফর্মের উপরে জ্বলতে থাকা বাতির আলোয় লাফিয়ে লাফিয়ে সামনে এগোতে থাকে নীতি। গুণগুন করে গানও গাইছে,
— শ্যাম রে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম
এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম
একেলা পাইয়াছি হেতা পলাইয়া যাবে কোথায় ..
চৌদিকে ঘিরিয়ারে রাখবো
সব সখি সনে
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম
প্ল্যাটফর্মের আলোতে তীক্ষ্ণ নজরে নীতিকে দেখে নিয়ে পকেট থেকে নিজের সেল ফোন বের করে ছোট ভাই নীলয়ের নাম্বারে ম্যাসেজ পাঠালো নীরব৷ বাংলায় গোটা গোটা অক্ষরে লিখলো,
— দাদাভাইকে জানিস দিস মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি বিয়েতে রাজী। অনশনে বসতে হবেনা। তবে আমার একটা শর্ত আছে। বিয়েটা হবে আগামী শুক্রবার। অর্থাৎ তিন দিন পরে। বিয়ে আমি এই মেয়েকেই কোরবো। নয়তো পাঁচ বছরের জন্য মিশর শান্তি মিশনে যাবার অফারটা এক্সেপ্ট করে নেবো৷ আই মিন ইট।
চলবে……