গল্প: রাগে অনুরাগে(০৪)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

পর্ব:০৪

~

রান্নাঘরের জানলা টপকিয়ে ফায়াজ ভেতরে আসে। ফায়াজকে দেখে তনিমা রিতীমতো অবাক। সে ব্রু কুঁচকে ফায়াজকে বলে,

‘তুই এখানে কি করছিস?’

‘তোকে হেল্প করতে এসেছি।জানিতো কিছু পারবি না।’

ফায়াজের কথায় তনিমা রেগে গিয়ে বলল,

‘তোকে কে বললো যে, আমি আমি কিছু করতে পারবো না।যা ভাগ এখান থেকে তোর কোনো হেল্প আমার লাগবে না।’

ফায়াজ কপাল কুঁচকে বললো,

‘শোন,তনু আমি জানি তুই কোনো কিছুতেই হার মানতে রাজি না। তাই তুই জেঠীমার কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিস। কিন্তু আমি এও জানি এত রান্না করা তোর পক্ষে সম্ভব না। তাই আমার মনে হলো,তোর হেল্পের প্রয়োজন। আমিও আহামরি রান্না জানি না,তবে যতটুকু জানি ততটুকুই আজকের জন্য এনাফ। সো এখন আর কোনো কথা না বলে তুই রান্নাঘরের দরজা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দে আর এই ফাঁকে আমি রান্নাটা সেড়ে ফেলি।’

তনিমা ফায়াজের কাছে এসে দাঁড়াল। কোমরে হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,

‘এই যে মি. ফায়াজ রহমান আপনার কি মনে হয়, আপনি বলবেন আর আমিও আপনাকে রান্না করতে দেবো? নো,নেভার। ভালোই ভালোই এখান থেকে কেটে পড় নয়তো আমি এখন তোর জেঠীকে ডাকবো।’

ফায়াজ বিরক্ত হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করলো না। তনিমাকে পাশ কাটিয়ে সে চুলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে গিয়ে সে রীতিমতো অবাক! এক চুলায় বড় পাতিলে ভাত বসানো আর অন্যটাতে আলু সিদ্ধ। ফায়াজ কিছু বলবে বলে পেছনে তাকাতেই তনিমা বলে উঠল,

‘শোন,আমাকে এতটাও অকর্মণ্য ভাবিস না। হ্যাঁ, আমি হয়তো অত রান্না জানিনা তবে যা জানি তাতে আশা করছি আজ দুপুরে তোদের না খেয়ে থাকতে হবে না।’

ফায়াজ অবাক চোখে তনিমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,

‘কি রেঁধেছিস?’

তনিমা চোখ মুখ কুঁচকে বললো,

‘সেটা এখন তোকে বলা যাবে না। খাওয়ার সময়ই দেখতে পারবি। এখন শোন, আমার একটা কাজ করে দে; এসেই যখন পড়েছিস তখন এই ভাতের মারটা গেলে দে। অত বড় পাতিল আমি আলগাতে পারবো না।’

পাতিলের ভাত হয়েছে কিনা তা চেক করে ফায়াজ মার গেলে দেয়। মার গালা শেষ হতেই তনিমা বললো,

‘ব্যাস, এবার যা তুই। বাকি কাজ আমি একাই করতে পারবো।’

ফায়াজ বললো,

‘আমি কিছু হেল্প করি?’

তনিমা ক্ষেপে গিয়ে বললো,

‘বললাম তো লাগবে না। যা তো এখান থেকে।’

ফায়াজ আর কিছু বললো না। তনিমার কথা শুনেই সে বুঝে গিয়েছে, মেয়েটা পারবে। ফায়াজ তাই আলতো হেসে জানলা টপকে ওপাশে বাগানে নেমে দাঁড়ায়। চলে যেতে নিয়েই আবার কি ভেবে পেছন ফেরে সে মুচকি হেসে তনিমাকে ডাকে,

‘এই তনু!’

‘আবার কি?’

‘তোকে না একদম গিন্নি গিন্নি লাগছে রে।’

কথাটা বলেই ফায়াজ উল্টো দিকে দ্রুত হাঁটা শুরু করে। আর ঐদিকে ফায়াজের কথাটা মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই তনিমার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠে। চোখ ঘুরিয়ে নিজেকে একবার পরখ করে অনু মনে মনে ভাবলো,সত্যিই তাকে আজ অন্যরকম লাগছে। কেমন একটা গিন্নি গিন্নি ভাব সেও পাচ্ছে। কোমরে গুজা শাড়ির আঁচল, ঘর্মাক্ত শরীর, আর এইভাবে খুন্তি ঘুরিয়ে রান্না করা যেনো তাকে এক কর্মঠ বধূর রূপ দান করেছে। তনিমার হঠাৎই মন খারাপ হয়ে গেলো। মুভিতে কত দেখেছে রান্নাঘরে এমন কাজ করা অবস্থায় বউকে এসে স্বামী জড়িয়ে ধরে,কত রোমান্টিক রোমান্টিক কথা বলে,একটু আধটু দুষ্টুমি করে কিন্তু এই ফায়াজটা তো কিছুই করলো না; তনিমা চলে যেতে বললো আর সেও চলে গেলো।কেন, থাকতে পারল না একটু,তার সাথে একটু..

হঠাৎই তনিমা ভাবল, এসব কি ভাবছে সে? নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পেয়ে যায়। নিজের লজ্জাটাকে কোনোরকমে সংবরণ করে তনিমা আবারও তার কাজে মনোযোগ দিল।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুল মুছছে তনিমা। মনটা এখন ভীষণ ফুরফুরে তার। রান্না-বান্না করা শেষ। এখন শুধু খাওয়ার অপেক্ষা। রুমে ঢুকেই গলা ঝেরে কাশলো ফায়াজ। তনিমা পেছন ফেরে ফায়াজকে দেখে রুমে এসে বললো,

‘কোথায় ছিলি এতক্ষণ?’

হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে ফায়াজ জবাব দিল,

‘তোকে কেন বলতে যাবো?’

তনিমা ব্রু কুঁচকালো।বললো,

‘হুম, সেটাই তো আমাকে কেন বলতে যাবি।’

ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় তনিমার অভিমানী মুখটা ফুটে উঠল। মেয়েটার চুল থেকে এখনও টুপটাপ করে পানি পড়ছে। আর তনিমা মুখ কালো করে হাতের টাওয়ালটা দিয়ে চুলের পানি মুছে যাচ্ছে। এদিকে আয়নায় তার স্নিগ্ধ প্রতিবিম্ব দেখে কেউ যে আহত নিহত হয়ে যাচ্ছে সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। একপর্যায়ে চুল মুছা শেষ হলে তনিমা টাওয়ালটা বারান্দায় রেখে এসে ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়ায়। ফায়াজ তখনও সেখানেই দাঁড়ানো। তনিমা কপাল কুঁচকে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘তখন থেকে এখানেই দাঁড়িয়ে আছিস,সমস্যাটা কি?’

ফায়াজ স্বাভাবিক গলায় বললো,

‘আমার ড্রেসিংটেবিলের সামনে আমার যতক্ষণ মন চায় ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব, তোর কি?’

তনিমা এবার ভীষণ বিরক্ত হলো। এই ছেলেটার সাথে কথা বললেই তার সুন্দর মুডটাও বিগড়ে যায়। চরম লেভেলের অসভ্য একটা ছেলে। তনিমা আর কথা বাড়ালো না। ফায়াজকে পাত্তা না দিয়ে সে ড্রেসিংটেবিলের উপর থেকে লোশন নিয়ে শরীরে মাখতে লাগল। ফায়াজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তনিমার কার্যকলাপ গুলো দেখছে। ফায়াজের এমন পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকাতে তনিমা এবার কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। গলার স্বর খানিকটা চওড়া করে সে ফায়াজকে বলে উঠে,

‘ঐ, তোর সমস্যাটা কি বলতো? এমনে তাকাই আছোস কেন? জীবনে কি কাউকে ক্রিম লাগাতে দেখিসনি।’

ফায়াজ তখন দুষ্টু হেসে বললো,

‘অন্য সবাইকে দেখলেও নিজের বউকে তো আর দেখেনি।’

তনিমা এবার রাগি গলায় বললো,

‘কি তখন থেকে বউ বউ করছিস।কালকের রাতের কথা কি ভুলে গেছিস? আমি তোকে স্বামী হিসেবে মানি না আর জীবনেও মানবো না।’

ফায়াজ মুচকি হাসলো,বললো,

‘সেটা সময় আসলেই বোঝা যাবে। এমনটাও তো হতে পারে যে একদিন তুই নিজেই আমার কাছে ভালোবাসা চাইবি। আমি কখনোই তোকে জোর করবো না কিংবা কোনোরকম অধিকার ফলানোরও চেষ্টা করবো না। আর আমরা তো বেস্ট ফ্রেন্ড তাই না, আমাদের এই বন্ধুত্বের কোনো অপমান আমি করবো না। তবে একটা জিনিস আমি বিশ্বাস করি, দুজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষ যখন একসাথে থাকে তখন প্রাকৃতিক ভাবেই তাদের মধ্যে একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। আর যদি ঐ মানুষ দুজন স্বামী স্ত্রী হয় তাহলে তো সেই আকর্ষণটা আল্লাহ প্রদত্ত হয়।’

কথাগুলো বলেই ফায়াজ স্মিত হেসে ওয়াশরুমে চলে যায়। আর তনিমা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফায়াজের বলা কথাগুলো ভাবতে থাকে। আচ্ছা,যদি ফায়াজের কথা সত্যি হয়? সত্যিই যদি কোনোদিন তনিমাকেই বাধ্য হয়ে ফায়াজের কাছে ভালোবাসা চাইতে হয়? কপালের উপর লম্বা দুখানা ভাজ পড়ল। ব্রু যুগল কুঁচকে এলো। তনিমা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বললো,

‘কখনোই না। আমি কখনো তোর কাছে ভালোবাসা চাইবো না। তুই চাইবি। আমি কেন আগ বাড়িয়ে ভালোবাসা চাইতে যাবো? মানছি আমি তোকে ভালোবাসি,তাই বলে কি আমাকেই আগে তোকে ভালোবাসার কথা বলতে হবে? কেন, তুই বলতে পারিস না?’

লাস্টের কথাটা ভেবেই তনিমার হঠাৎ মনে হলো,

‘আচ্ছা, আদৌ ফায়াজ আমাকে ভালোবাসে তো?’

পরক্ষণেই সে আবারও ভাবলো,

‘হ্যাঁ, অবশ্যই বাসে। নয়তো এমন বউ বউ করতো না। আর না বাসলেও সমস্যা নেই, স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা আল্লাহই তৈরি করে দেয়। কারণ এই ভালোবাসার মাঝে যে কোনো পাপ নেই আছে কেবল একরাশ পূর্ণতা।’

কথাটুকু বলেই নিজের মনেই হাসলো,তনিমা। ফায়াজকে নিয়ে কত জল্পনা কল্পনা তার। না জানি তার মতো ফায়াজও তাকে নিয়ে এত ভাবে কিনা?

.

.

.

খাবার টেবিলে গম্ভীর মুখে বসে আছে শেফালি খাতুন। তনিমার রান্না গুলো মুখে না নিয়েই চেহারার বারোটা বাজিয়ে বসে আছেন। আর মুখে দিলে যে কি হবে আল্লাহই জানেন। তনিমা বেশ উৎফুল্ল মনে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। ইলিশ মাছ ভাজা, আলু ভর্তা আর ডাল এই হলো আজকের দুপুরের খাবার। ব্যাপারটাতে ভীষণ ভাবে ক্ষেপে গেলেন শেফালি খাতুন। বাড়ির বউ কিনা শ্বশুড় বাড়িতে পরদিন এসে এসব ভর্তা,ডাল রান্না করে। তবে এইটুকুতেই ভীষণ খুশি আর অবাক হলো তনিমার শ্বাশুড়ি আর ফায়াজ। ফায়াজ যেনো এইটুকুও তনিমার কাছ থেকে আশা করেনি। সকলেই প্লেটে প্রথমে আলুভর্তা নিয়েছে। তনিমা শেফালি খাতুনের প্লেটেও একটু আলুভর্তা দিতে নিলেই এবার তিনি চেঁচিয়ে উঠেন। হঠাৎ করেই এমন হুংকারে ভয় পেয়ে যায়।তনিমা। শেফালি খাতুন রাগি গলায় বললেন,

‘এসব কি রেঁধেছো তুমি। বিয়ের পর দিন কোন বউ এসব আলুভর্তা,ডাল রেঁধে তার শ্বশুর বাড়ির মানুষকে খাওয়াই? এই রান্না শিখেয়েছে তোমার মা? এই সামান্য মাছ ভাজি,আলু ভর্তা,ডাল এসব?’

তনিমার এবার ভীষণ খারাপ লাগে। এত কষ্ট করে রান্না করার পরও জেঠীমা তাকে এত কথা শুনাচ্ছে। চোখ ভিজে উঠে তার। আলুভর্তার প্লেটটা টেবিলের উপর রেখে তনিমা তার শ্বাশুড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ফুঁপিয়ে উঠে বলে,

‘মা, আমি যা রান্না করেছি তা কি খাওয়ার যোগ্য না? আমি কি কোনো অখাদ্য কুখাদ্য রান্না করেছি যে এগুলো খাওয়া যাবেনা?’

রিনা রহমান তনিমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। মেয়েটা এবার ভালোবাসার পরশ পেয়ে কেঁদেই ফেলল। রিনা রহমান তনিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

‘মোটেও না মা,তুই যা রেঁধেছিস সেটাই যথেষ্ট। আর আমি পরখ করে বলতে পারি তোর রান্নাগুলো ভীষণ সুস্বাদু হয়েছে।’

শেফালি খাতুল আবারও চেতে উঠলেন। কর্কশ গলায় বললেন,

‘হ্যাঁ,হ্যাঁ দাও দাও বউকে প্রশ্রয় দিতে দিতে মাথায় তুলো।তারপর দুদিন পর যখন এই বউই তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসবে তখন হায় হায় করবে।’

নিজের রাগকে এবার আর সংবরণ করে রাখতে পারলো না।অনেকক্ষণ ধরে চুপ থাকলেও এবার ফায়াজ রেগে গেলো। সেও এবার রাগ দেখিয়ে বললো,

‘কি শুরু করেছো,জেঠীমা? তোমার কি মনে হয়না তুমি এবার একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছো?’

জেঠীমা তেতিয়ে উঠলেন। কাটকাট গলায় বললেন,

‘কি বললি তুই? আমি বাড়াবাড়ি করছি, এত বড় কথা?’

ফায়াজ এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জেঠীমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো,

‘হ্যাঁ, তুমি এবার সত্যিই বাড়াবাড়ি করছো। ইচ্ছে করে তুমি মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছ। তোমরা বলেছো রান্না করার কথা,কি রান্না করবে সেটা তো বলে দাওনি। আর তুমি এমন ভাবে বলছো যেনো ও যা রান্না করেছে সেটা কোনো খাবারই না। এই আলুভর্তা আর ডাল এখনো বাঙালির প্রিয় খাবার। আর তুমি এমন ভাবে বলছো যেটা এটা কোনো খাবারের পর্যায়েই পড়ে না। কেন,জেঠীমা?’

শেফালি খাতুন এবার কিছুটা দমে গেলেন। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বললেন,

‘খুব বড় হয়ে গেছিস তাই না? আমাকে কথা শুনাচ্ছিস? আচ্ছা আমিও দেখে নিব কে কত বড় হয়েছে। আজ খালি কামাল ফোন দিয়ে নেক, তারপর আমিও দেখে নিব সবাইকে।’

কথাটুকু বলেই শেফালি খাতুন হনহন করে উপরে উঠে গেলো। আর ফায়াজ তখন ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,

‘ঐ সেই এক কথা। কিছু হলেই বাবার কাছে কল লাগিয়ে দেই। আচ্ছা মা, তুমি কেন কিছু বলো না বলতো? তোমার মনে হয়না জেঠীমা মাঝে মাঝে একটু বেশিই করে।’

রিনা রহমান শুকনো মুখে তার ছেলের দিকে তাকালেন। চোখের কোণটা তার খানিকটা ছলছলে। অধর জোড়া খানিকটা প্রসারিত করে শুকনো হাসি দিলেন, বললেন,

‘তোর বাবা আদৌ আমার কোনো কথা শুনেছে, ফায়াজ?’

মায়ের শুকনো মুখটা দেখে ফায়াজের রাগটা নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেল। মনে ভর করলো কিঞ্চিত বিষন্নতা। ফায়াজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিনা রহমান বলে উঠেন,

‘তোর জেঠীমার রাগ সম্পর্কে তোর তো ধারণা আছেই, ফায়াজ। জানিসই তো মানুষটা একটু রগচটা। থাক না বাবা উনার কথা এত ধরিস না। আর তনিমা, আমি জানি তোর খুব খারাপ লেগেছে এত কষ্ট করে এতসব রান্না করেছিস; মন খারাপ করিস না, তুই দাঁড়া আমি ভাবিকে বুঝিয়ে নিয়ে আসছি।’

রিনা রহমান চলে গেল তার জা’র রুমে। খাবার টেবিলে উপস্থিত বাকি মানুষেরা এতক্ষণ নিরব দর্শক ছিল। এখন তারাও যেন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচল। এই উড়নচন্ডালি মহিলার আচরণে সবাই হতভম্ব। ফায়াজের ছোট মামি এক লোমকা ভাত মুখে তুলে বললো,

‘শেফালি আপার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। রিনা আপার সময়ও কম জ্বালাননি!’

তনিমা গোল গোল চোখে তার মামি শ্বাশুড়ির দিকে তাকাল। সকল গম্ভীরতা ভাব কাটিয়ে ফিহা ফিক করে হেসে দিয়ে বললো,

‘আরে সব সংসারে একটা ভিলেন থাকে না, যে সংসারের মধ্যে খালি প্যাঁচ লাগায়, জেঠীমাও হলো আমাদের সংসারের সেই ভিলেন।’

ফিহার কথায় এবার বাকি সবাইও হেসে উঠল। হাসির মাঝেই মামি বলে উঠল,

‘উমম!তনিমা ভর্তাটা ভীষণ মজা হয়েছে। কেমন গ্রাম্য গ্রাম্য একটা ভাব পাচ্ছি।’

মামির কথার সাথে তাল মিলিয়ে ফিহাও বলে উঠল,

‘আসলেই ভাবি খুব মজা হয়েছে। আমি কিন্তু এমনিতে ভর্তা টর্তা খাই না তবে এখন মনে হচ্ছে পুরো ভর্তাটাই আমি একাই খেতে পারবো।’

তনিমার মুখেও এবার এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। একজন মানুষ তাকে কষ্ট দিলেও বাকি সবাই তো তাকে আনন্দ দিচ্ছে। তনিমার এই মুহূর্তে তার মায়ের একটা কথা মনে পড়ছে, তার মা প্রায়ই বলতো যে, ‘বিয়ের পর মেয়েরা তার শ্বশুর বাড়ির সকলের মন জুগিয়ে চলতে পারে না। তার যে কাজটা একজনের চোখে ভীষণ খারাপ অন্য জন আবার সেই কাজটার জন্যই তাকে ভীষণ ভালোবাসবে। তবে হ্যাঁ, একটা কাজ আছে যার মাধ্যমে তুমি সবার মন জয় করতে পারবে আর সেটা হলো ভালোবাসা। তুমি তোমার আশেপাশের মানুষগুলোকে একটু ভালোবাসা দিয়ে দেখো তারা কিভাবে তোমায় আগলে রাখে।’ তনিমা ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে। আর মনে মনে ভাবে, ‘হ্যাঁ, ভালোবাসা; এই অস্ত্র দিয়েই সে সবাইকে কাবু করবে।’

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x