লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০৫
~
খাওয়া শেষে সবাই একে একে রুমে চলে গেল। বসে রইল কেবল ফায়াজ আর তনিমা। রিনা রহমান এখনো তার জা’র রুম থেকে বের হননি। তনিমা বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে। অস্থির হয়ে হাত কচলাচ্ছে। তার এই অস্থিরতায় ফায়াজ ভীষণ বিরক্ত। সে ব্রু কুঁচকে তনিমার দিকে তাকিয়ে আছে। তনিমাও এবার শুকনো মুখে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আমি কি একবার যাবো জেঠীমার রুমে?’
ফায়াজের কুঁচকানো ব্রু এবার সোজা হলো। টেবিলের উপর কিছুটা ঝুঁকে এসে ফায়াজ বললো,
‘আমার না খিদা লেগেছে। দয়া করে এবার আমাকেও একটু খেতে দে।’
তনিমা ফায়াজকে কিছু বলতে গিয়েও কি ভেবে বললো না। একটা প্লেটে ভাত নিয়ে ফায়াজকে দিল। ফায়াজের আলুভর্তা ভীষণ প্রিয় সেটা তনিমা জানে। তাই সে ফায়াজের প্লেটে একটু বেশিই ভর্তা দিল। ফায়াজ এক লোকমা মুখে তুলতেই তনিমা অস্থির কন্ঠে বললো,
‘তুই খা, আমি একটু জেঠীমার রুমে গিয়ে দেখি।’
তনিমার কথায় ফায়াজের কিছুটা রাগ হলেও সে সেটা প্রকাশ না করে নিজের খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তনিমা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ফায়াজের প্রতিত্তরের অপেক্ষায়। কিন্তু ফায়াজ তাকে পাত্তাই দিল না। ফায়াজের উপেক্ষা দেখে তনিমাও নাকের পাল্লা ফুলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। জেঠীমার রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে তার কন্ঠ শুনতে পেল,
‘না আমি খাবো না। আগে আমি কামালকে ফোন দিয়ে সবকিছু জানাবো, কামাল এই সব কিছুর একটা হ্যস্তন্যস্ত করবে তারপর আমি খাবো। তার আগে আমি এক দানাও কিছু মুখে দিবো না।’
জা’র কথা শুনে রিনা রহমান পড়লেন মহা বিপাকে। চোখ মুখে ভর করলো তার বিশাল অসহায়ত্ব। তিনি অনুনয়ের সুরে বললেন,
‘ভাবি, দয়া করে আপনি কিছু খেয়ে নিন। তারপর আপনি যা খুশি করিয়েন, আপনাকে কেউ বাঁধা দিবে না। আর ফায়াজের কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি ওর হয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। প্লিজ ভাবি, মাফ করে দিন ছেলেটাকে।’
শেফালি খাতুন মুখ ঘুড়িয়ে রিনা রহমানের দিকে তাকালেন। থমথমে কন্ঠে বললেন,
‘না না এতে ফায়াজের দোষ কোথায়? এটা তো হওয়ারই ছিল। যে মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছ.. কথায় আছে না, ‘সৎ সঙ্গে সর্গবাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ তোমার ছেলের দশাও হয়েছে তা। এতে আর ওর দোষ কোথায় বলো?’
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তনিমার কথাটা ভীষণ মনে লাগল। জেঠীমা চোখে সে এতই খারাপ যে তিনি এইভাবে বললেন। কান্না পেয়ে গেল তনিমার। কিন্তু সে কাঁদল না। কাঠের দরজাটার গায়ে দুটো টোকা দিয়ে ফ্যাচফ্যাচ কন্ঠে বললো,
‘আসবো?’
জেঠীমা সতর্ক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন। দরজার বাইরে তনিমাকে দেখে আবারও আরেক দফা রেগে গেলেন তিনি। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
‘কি চাই তোমার এখানে?’
তনিমা কিছু না বলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জেঠীমার কাছে। অতঃপর তার পায়ের কাছে বসে ধরা গলায় বললো,
‘আমাকে মাফ করে দিন জেঠীমা। আমার জন্যই তো আপনি কষ্ট পেয়েছেন? আমি সরি, আর কখনোই আপনাকে কষ্ট দেওয়ার মতো কোন কাজ আমি করবো নো, প্রমিস। প্লিজ, জেঠীমা এবার কিছু খেয়ে নিবেন চলুন। খাবার না খেয়ে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন তাই না? আর আপনার যদি এসব খেতে ইচ্ছে না করে তবে আমি বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে নিয়ে আসবো। আপনি কি খেতে চান বলুন, আমি এক্ষুণি অর্ডার দিচ্ছি।’
জেঠীমা তখন ঝাঁজাল কন্ঠে বলে উঠলেন,
‘লাগবে না। আমার জন্য তোমাদের এত না ভাবলেও চলবে। নিজেদের নিয়ে ভাবো। সবেই তো সংসার শুরু, এর মধ্যেই আমাদের ছেলেকে নিজের দলে করে নিলে। এখন তো সে বউ ছাড়া আর কিছু চোখেই দেখবে না।’
কথাটা শুনে খুব রাগ হলেও তনিমা তার রাগটা চেপে গেল। চোখ মুখ শক্ত করে মাথা নিচু করে ফেলল। আপাদত এখন আর কোন ঝামেলা চায় না সে। রিনা রহমান এবার কিছুটা রাগান্বিত সুরে বললেন,
‘অযথায় আপনি এসব বলছেন ভাবি। কেউ কারো দলে যায়নি। সংসারটা কোন খেলা না যে এখানে সবাই দল ভাগাভাগি করবে, সংসার হলো একটা সত্তা, এক বিশাল ভালোবাসার খন্ড। যাকে আগলে রাখতে হয়, দল দিয়ে ভাগাভাগি করতে হয় না।’
শেফালি খাতুন তখন মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এসব কথা তোমার এই বউমাকে বোঝাও। তাতে যদি তার একটু সুবুদ্ধি হয়।’
তনিমা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
‘হ্যাঁ জেঠীমা আমার সুবুদ্ধির খুব প্রয়োজন। আর আপনি হলেন সেই সুবুদ্ধির কারখানা। আজ থেকে প্রতিদিন একঘন্টা আমি আপনার কাছে সুবুদ্ধি শিখবো। দারুণ হবে না ব্যাপারটা?’
কপালে চওড়া ভাজ ফেলে জেঠীমা তনিমার দিকে তাকালেন। তনিমা তখন ফিচেল হেসে বললো,
‘এবার চলুন জেঠীমা। আপনি না খেলে মা আর আমিও খাবো না।’
জেঠীমা ব্রু কুটি করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। রিনা রহমান আর তনিমাও হতাশ হয়ে তার পাশে বসে রইল। এক পর্যায়ে তার রাগ কিছুটা পড়ল। সে গম্ভীর সুরে বললেন,
‘যাও গিয়ে টেবিলে খাবার দাও। আসছি আমি।’
তনিমা চট করে উঠে দাঁড়াল। খুশি খুশি মনে তার শ্বাশুড়িকে বললো,
‘মা, তুমি জেঠীমাকে নিয়ে নিচে এসো। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’
তনিমা ছুটে নিচে নেমে গেল। রিনা রহমান তখন মৃদু সুরে বললেন,
‘দেখেছেন তো ভাবি, মেয়েটা অল্পতেই কত খুশি!’
রিনার কথার পিঠে তার জা আর কিছু বললো না। চুপচাপ নিচে খেতে চলে গেল।
______________________________________
ফায়াজ ডিভাইনে লেপটপ নিয়ে বসতেই তনিমাও চট করে তার পাশে বসে গেল। ফায়াজ কপাল কুঁচকে বললো,
‘কিরে তুই কোথ থেকে উদয় হলি?’
তনিমা অত্যন্ত বিরক্তির সুরে বললো,
‘কোথ থেকে মানে? নিচ থেকে আসলাম মাত্র। মা আর জেঠীমাকে খাইয়ে।’
ফায়াজ লেপটপটা খুলতে খুলতে বললো,
‘তা খাবারের কেমন প্রশংসা পেলি?’
‘মা তো অনেক প্রশংসা করেছে তবে জেঠীমা কিছু বলেনি। শুধু চুপচাপ খেয়েই গিয়েছে।’
ফায়াজ মৃদু হেসে বললো,
‘যাক ফাইনালি খেয়েছে তাহলে?’
‘হুম।’
ফায়াজ লেপটপে তার ভিডিও ইডিটে মনোযোগ দিল। তনিমা কিছুক্ষণ বসে বসে ফায়াজের ইডিটিং দেখল। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থেকে তনিমা বলে উঠল,
‘এই চল না কোথাও একটা ঘুরতে যাই?’
ফায়াজ যেন পাত্তাই দিল না তার কথায়। সে তার মনোযোগ লেপটপেই মনোনিবেশ করে রেখেছে। তনিমার নাক ফুলিয়ে কড়া গলায় বললো,
‘এই আমি তোকে বলছি?’
ফায়াজ বাঁকা চোখে একবার তনিমার দিকে তাকিয়ে আবারও লেপটপের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। তারপর ক্ষীণ সুরে বললো,
‘কোথাও ঘুরতে যাওয়া লাগবে না। এত রান্না বান্না করেছিস, এখন গিয়ে একটু রেস্ট নে।’
তনিমা ক্ষেপে উঠল ফায়াজের কথায়। ঝারি মেরে বললো,
‘না রেস্ট নিতে হবে না। আমি এখন ঘুরতে যাবো। আর তুই আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবি। উঠ তাড়াতাড়ি।’
ফায়াজ মুখের উপর বলে দিল,
‘পারবো না।’
তনিমা এবার রেগে যায়। গলার স্বর চওড়া করে বলে,
‘কেন পারবি না? বউকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারবি না তো বিয়ে করলি কেন? সারাদিন খালি একটা লেপটপ নিয়ে বসে থাকিস। আমি কিন্তু মাকে বিচার দিব বলে রাখলাম।’
হুট করেই ফায়াজ তনিমার হাত ধরে হেচকা টান মেরে তার খুব কাছে নিয়ে আসে। তনিমা হঠাৎ ভয় পেয়ে যায়। আকস্মিক এই টানে তনিমা ফায়াজের খুব কাছে চলে আসে। হয়তো আর কিছু ইঞ্চির দূরত্ব তাদের দুজনের অধর জোড়ার মাঝে। তনিমা তখন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
‘ক-কি হলো?’
ফায়াজ চোয়াল শক্ত করে কিছুক্ষণ তনিমার চোখ, ঠোঁটে দৃষ্টি বুলালো। ফায়াজের এমন চাহনিতে তনিমা ছোট্ট একটা ঢোক গিলল। ফায়াজ শক্ত কন্ঠে বললো,
‘নিজের বেলায় তো খুব ভালোই বুঝিস। তুই আমার বউ বলে তোকে নিয়ে আমার ঘুরতে যেতে হবে, তাই না? তাহলে আমিও তো তোর হাসবেন্ড তাহলে আমাকেও আমার স্বামীর অধিকার দে।’
তনিমার চোখ মুখ কুঁচকে গেল ফায়াজের কথা শুনে। হঠাৎ করেই ফায়াজ এমন সিরিয়াস হয়ে উঠল কেন? তনিমা মাথা নিচু করে আস্তে করে বললো,
‘হাতটা ছাড়, ব্যথা লাগছে।’
সঙ্গে সঙ্গে ফায়াজ তার হাত ছেড়ে দিল। তার থেকে কিছুটা দূরে সরে বসে বললো,
‘যা এখন, রুমে গিয়ে রেস্ট নে। কালকে ঘুরতে যাস।’
তনিমা নিরুত্তর বসে রইল। ফায়াজ তার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘কি হলো? যাচ্ছিস না যে?’
তনিমা কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। বারান্দা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ফায়াজ তাকে ডাকল। ব্রু কুঁচকে তনিমা ফিরে তাকাতেই ফায়াজ বললো,
‘হাতে ব্যাথা পেয়ে থাকলে, সরি।’
তনিমা কোন উত্তর দিল না, বড় বড় পা ফেলে বারান্দা থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের শ্বাশুড়ির রুমে চলে গেল।
চলবে..