ফাদিন লম্বা লম্বা কদম ফেলে মর্তুজা বাড়িতে প্রবেশ করলো।মর্তুজা বাড়ির সবাই ড্রইং রুমেই। ফাদিন ঘরে প্রবেশ করেই চেঁচিয়ে বলল-” হেইই জনগন’স।মে আগেয়া।”
মানজুম আরা টেবিল পরিষ্কার করছিলেন। ফাদিনকে দেখে মুখ মৃদু কুঁচকে বললেন -” ওই দেখো এসে গেছে। বাড়িতে এখন আর শান্তি বজায় থাকবে না। “
পাশে আইরা আর সুলতানা হায়দার বসে ছিলেন। মানজুম আরার কথা শুনে তারা মুখ টিপে হাসলেন। ফাদিন মাকে লক্ষ্য করতেই এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। -” আমার আম্মা কি করেন?”
মানজুম আরা মুড়ামুড়ি শুরু করলেন। এতো লম্বা চওড়া দেহের ছেলে ঝাপটে ধরলে ওনার মতো ছোটখাটো মানুষের দমবন্ধ হয়ে আসে। -” ছাড়, ছাড় আমারে শয়তান ছেলে। তোর জন্য একজনের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার কাছে যা।”
ফাদিন মানজুম আরাকে ছেড়ে দিয়ে অবাকতা মিশ্রিত স্বরে শুধালো -” ওমা তাই? কার এই অধমের জন্য গলা শুকাচ্ছে শুনি?” ফাদিন আইরার পানে তাকিয়ে বললো -” নিশ্চয়ই ভাবির। ভাবি আবার আমাকে একটু বেশি ভালোবাসে কিনা? ভাবি, তাই বলে পানি না খেয়ে থাকবেন!”
আইরা একসাথে দুহাত তুলে মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে বললো- ” না রে ভাই। মেজোআম্মা আমার কথা বলেননি। তোমার জন্য আমার ততটাও টান নেই। “
ফাদিন মেকি হতাশা দেখিয়ে বললো -” হ্যা গো, তুমি কেন আমায় মনে করতে যাবে।আজ আপন কেউ নাই বলে। “
আইরা দুষ্টুমি মাখা কন্ঠে বললো -” আনবো না কি কাউকে? “
ফাদিন মা চাচির সামনে কথা কাটিয়ে দিলো। -” তা আমার লাড্ডু কই?নিশ্চয়ই আমার বাবাটার আমার জন্য বুক পুরে।”
মানজুম আরা আশার ঝলক নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন ছেলের মুখের পানে। কিন্তু ওনার ছেলেটা কথা ঘুরিয়ে নিয়েছে দেখে মুখ বাঁকিয়ে কিচেনের দিকে হাঁটা ধরলেন।বজ্জাত ছেলেটার মুখ থেকে কথা বের করানো যায় না।এবার তানিশা দেশে এসেছে, এবার দেখবেন কিভাবে কথা বের না হয়।কথাটা ভেবে মানজুম আরা নিজে নিজেকে বাহ বাহ দিলেন।
মাইশা আইয়াজকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে শ্লেষাত্মক স্বরে বলল -” মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ো না ফাদিন ভাই।তোমার চেহারাও ওর মনে নেই।”
ফাদিন তার লম্বা লম্বা পা দিয়ে কয়েকপা হেঁটে নিমিষেই মাইশার কাছে চলে গেল। দশমাসের আইয়াজ ফুপির কোল থেকে দানব আকৃতির লোকটার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকালো।ফাদিন মাইশার মাথায় একটা গাট্টা মে*রে বললো-” তুই চুন্নিকে কে কথা বলতে বলছে? মনে রাখেনি তো কি? এবার এমন ডোজ দিয়ে যাবো। আমার কলিজার বাবা আমাকে ভুলবে না।তাই রে বাপ? আয় আমার কোলে আয়। “
মাইশা নাক ছিটকে সরে গেল -” ছিহ! এইভাবে ওকে কোলে নিবে তুমি? যাও গা থেকে বস্তা বস্তা ময়লা পরিষ্কার করে আসো।”
ফাদিন এগিয়ে গিয়ে একেবারে মাইশার গা ঘেঁষে দাড়াল পরনের শার্টটা উঁচিয়ে মাইশার মুখের কাছে নিলো।মাইশা নাক ছিটকে সটকে পরল। এগিয়ে গেল আইরার পানে।ফাদিন পিছন ফিরে নিজের গা নিজেই শুকলো।-” আহ! কি স্মেল? আমি যে পারফিউম ব্যবহার করি তোর হবু জামাই জীবনে তা ব্যবহার করতে পারবে না। “
-” বড় খুশি হলাম। এই কারণে আমি আমার জামাইরে বলবো। জামাই তুমি একশতে একশ।”
ফাদিন তা শুনে কোমরে হাত রেখে আসফিয়াকে ডাকল-” ওও বড় মা। দেখো দেখো তোমার মেয়ের কান্ড।বিয়ের আগেই শশুরবাড়ি টান টানছে।পরে আবার বলিও না। আমরা ভাইয়েরা বোনটারে আলাদা করছি। “
মানজুম আরা বিরক্ত হয়ে কিচেন থেকে বের হয়ে এলেন -“এই তুই বকরবকর বন্ধ করবি? উপরে যা ফ্রেস হয়ে আয়, খাবি।”
ফাদিন মায়ের কথায় সিঁড়ি দিকে মুখ ফিরিয়ে দুতলায় তাকাতেই থমকে গেল। চোখ তার বড় বড় আকার ধারণ করল।সাদা শাড়ী পরিহিতা মানবীর পানে তাকিয়ে তার শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার অবস্থা হলো। কিশোরী ভাব কে*টে গিয়ে এখন সে পরিপূর্ণ নারীতে রূপ ধারণ করছে। লস্যময়ী রূপে এখন যে কাউকে পথ হারাতে বাধ্য ।পরিপাটি শাড়ী আর বব কাট হেয়ার স্টাইলে আধুনিকা।আমেরিকার হাওয়া লেগেছে দেখে অনুভব করা যায়।তানিশা ফাদিনের দিকে হাত উচিয়ে হ্যালো দিলো।ফাদিন গলা ফাটিয়ে মাইশাকে ডাকলো-” মাইশা!! এইই মাইশা।”
মাইশা কর্কষ স্বরে জবাব দিলো -” কি হয়েছে? ষাঁড়ে মতো চেঁচাচ্ছো কেন?”
-” আরি আজব! আমি কখন তোর মতো চুন্নির বিয়ে নিয়ে এতো এক্সাইটেড ছিলাম?এক্সাইটেডর ঠেলায় ভুলভাল চোখে দেখছি। হা হা। “
তানিশা মুচকি হেসে বলল -” ফাদিন ভাই, এটা আমিই। “
ফাদিন যেন তোয়াক্কাই করল না তানিশার কথা।মাইশাকে বলল-” দেখছিস? আমার কল্পনায় গাধার রাজকুমারী কথাও বলছে। আজিব লিলাখেলা!”
তানিশার মুখ কালো করে ফেললো। তানিশা নিচে নেমে এলো। ফাদিন ভ্রু কুঁচকে এক ভ্রু উচিয়ে রেখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তানিশা ফাদিনের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকালো।ফাদিন তা দেখে হাসলো-” ওরি বাবা! ভয় পেলাম না মনে হয়। “
তানিশা ফাদিনে দিকে তাকাল না। মাইশার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো-” জোহান ঘুম থেকে উঠেছে মাইশা আপু? “
মাইশা এমন মুখ ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকাল যেন তার মুখে কেউ করলার রস দিয়ে দিয়েছে। ভোতা মুখ জবাব দিলো -” ওই বেক্কলের সেক্রেটারি লাগি আমি? আমারে জিজ্ঞেস করছিস কেন? “
তানিশা অবাক হয়ে কিছু বললো না।পিছন থেকে কেউ আঁচল ধরে টানাটানি করছে দেখে সেদিকে ধ্যান দিল। ফাদিন ডান হাতের মাত্র দুটো আঙুল দিয়ে তানিশার আঁচলের এককোনা ধরছে। ফাদিন তানিশার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল -” এসব কি? “
-” কেন? তুমি চেনো না?”
ফাদিন তানিশার চারপাশে এক চক্কর দিয়ে পরখ করে দেখলো। হাতের আঁচল দ্বারা তানিশাকে পেঁচাল।তানিশা ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছে ফাদিনের দিকে। -” চিনি তবে তুই কেন পরে বসে আছিস? তোর তো বিয়ে এখন দিবো না। ইনফ্যাক্ট তোকে বিয়েই দিবো না। এসব শাড়ি টারি পরে যদি মনে করিস মা চাচিদের দৃষ্টি আকর্শন করবি। তাহলে বলে রাখি তা ফালতু চিন্তা ভাবনা। “
-” ফালতু তোমার চিন্তা ভাবনা। আর এসব আমার ফ্যাশন বুঝলে?”
-” হায় রে ফ্যাশন রে! দেখতে তো ছুলা মুরগী লাগছে। “
তানিশা চোখ রাঙিয়ে বলল-” কিইই? কি বললে তুমি?”
ফাদিন লম্বা লম্বা কদম ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিমেষেই উপরে চলে গেল।যেতে যেতে চেঁচিয়ে বললে গেল-” যা সত্যি তাই।গাধার রাজকুমারীকে কুঁকড়া চুল যা পিঠের মাঝ দরমিয়ানে এসে আটকাবে তেমনই সুন্দর লাগে। “
তানিশা ফাদিনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।সবার মতো ফাদিনও যে এই বিষয়ে নারাজ হয়েছে। তা তার কথার ইঙ্গিতে বুঝা যাচ্ছে।
**********************
তানিশা শাড়ীর কুঁচি ধরে একসাতে দুই দুইটা সিঁড়ি পার করে লাফিয়ে লাফিয়ে ছাঁদে উঠলো।রোদ নেই তেমন।মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশ জুড়ে। তানিশা চারপাশ দেখে যাকে খুঁজছে তাকে পেয়ে এগিয়ে গেল।জোহান ছাঁদ থেকে রাস্তা দিকে তাকিয়ে আছে। তানিশা পাশে গিয়ে দাড়াতেই তানিশার পানে হাসোজ্জল মুখে তাকাল।কিন্তু তানিশার গোমড়া মুখ দেখে একটু চিন্তিত হলো। তানিশা স্মিথ স্বরে বলল -” কোথায় ছিলে তুমি?ঘুম থেকে কখন উঠলে?”
-” আশেপাশেই হাঁটতে গিয়ে ছিলাম। তোমার ফাহিম ভাইয়ের সাথে। “
-” ওহহ।ফাহিম ভাইয়ের সাথে তোমার কিছুটা জমতে পারে।তবে ফাদিন ভাইর সাথে বেশি জমবে।তোমারই বয়সী। ফাদিন ভাই ছুটিতে এসেছেন আজ।”
জোহান ফির রাস্তায় দৃষ্টি দিলো।-” দেখেছি।তোমার বাবার সাথেও কথা হয়েছে। তোমার মা-বাবা দুজনই একরকম।তবে কর্নেল নাহিদ মর্তুজা থেকে এডভোকেট সুলতানা হায়দার একটু বেশিই গম্ভীর। দুজনই স্ট্রং এন্ড স্ট্রিক্ট।দুজনের ভালোই জমছে কি বলো? “কথাটা বলে জোহান ক্ষীণ হাসলো। তানিশার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তা মিইয়ে গেল -” প্রিন্সেস?”
-” কি?”
জোহান রাস্তার দিকেই তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো -” হোয়াটস রং উইথ ইউ? আরেন্ট ইউ হ্যাপি বিইং ইন বাংলাদেশ?”
-” নাথিং মাচ।”
-” সো হাউ ইজ ইট?
এবার তানিশা উত্তর করলো না।তানিশার দৃষ্টিও রাস্তা পানে। জোহানের বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে এলো।কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ সময় কাটাল।নিরবতা ভেঙ্গে তানিশাই বললো-” জোহান! সবাই আমার উপর নারাজ।”
জোহান অবাক হয়ে তানিশার পানে তাকিয়ে বললো-” তোমার এটা কেন মনে হলো? আমি তো দেখছি সবাই তোমাকে পেয়ে কতটা খুশি। কাল রাতে সবার সাথে তুমি কত কথা বললে। আড্ডা দিলে।তোমার চাচারা পারলে তোমায় মাথায় তুলে। আমি তো কারো মধ্যে সেই রকম কিছু দেখলাম না।”
তানিশা কাতর স্বরে বলল -“জোহান, আমার চুল।সবাই এটা নিয়ে নারাজ। “
জোহান মুচকি হেসে বলল -” এই বিষয় নিয়ে মন খারাপ? “
তানিশা শান্ত কন্ঠে বললো -” হ্যা।আমি তো নিজেই এমনটা চাইনি।শুধু তোমার জন্য।তুমি সবসময় বলো আমাকে এভাবে আসল প্রিন্সেসর মতো দেখাচ্ছে। অথচ আমাকে বাজে দেখায় তুমি একদিনও বলোনি।”
-“কারণ আমার প্রিন্সেসকে আমি সবসময় সুন্দর চোখে দেখি।তার লম্বা চুল, খাটো চুল এটা এখানে ব্যাপার না।ব্যাপার হলো তুমি। “
তানিশা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল -” আমি আমার চুলগুলোকে অনেক ভালোবাসি। শুধু তোমার কথা শুনে আমার চুলের এই অবস্থা। “
জোহান তানিশার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললো-” চিন্তা করো না। তোমার মেজোমা তো বলেই দিয়েছেন যতদিন দেশে আছো তত দিনে চুল লম্বা করাইয়ে ছাড়বেন।হা হা। কাল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি কোনো ঔষধ জানি কিনা ।”
তানিশা প্রত্যত্তুর করল না। ভালো লাগছে না তার কিছু। সবাই কেন তার উপর চুলের জন্য নারাজ। আজিব! তার ইচ্ছে হলে কি সে নিজের চুল কাটতে পারবে না!
********
অর্ক মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটার মনিটরে দিকে তাকিয়ে আছে। অফিস আওয়ার শেষ হয়েছে আধ ঘন্টা আগেই।মাগরিবের নামাজ পরে এসে সে ঘুমাবে আজ অর্ক।নেক পিলো নিয়ে এসেছে।ফুল প্লানিং কমপ্লিট। হঠাৎ দরজায় ঠোকা পরতে সেই পানে তাকাল অর্ক।দরজাটা আধখোলা করে মেঘ মাথাটা ঢুকিয়েছে তার কেবিনে। মেঘের মুখটা হাসজ্জোল।আকাশি রাঙা শার্টটা ইন করে রাখা। প্রিয় কালো টাইটা গলায় ঝুলছে।হাতের মধ্য স্যুট রাখা।অর্কের মাঝে মাঝে এই ঘাউড়া বন্ধুটার উপর হিংসা লাগে।এতো ফিটবাবু কেন দেখাতে হবে তার? অর্ক জিজ্ঞেসুক দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল -” কি? কাজ করছি কিনা দেখতে এলি? “
-“হুমম,নাহ।যাহ আজকে তোর ছুটি। “
মেঘের কথাটা শেষ হবার আগেই অর্ক বিস্মিত হয়ে উঠে দাড়াল। দাড়াতে গিয়ে ডেক্সের সাথে ধাক্কা খেল।সেথায় হাত বুলাতে বুলাতে সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -” সত্যি? সত্যি বলছিস? দেখ ভাই মজা করিছ না। মনটা এমনেই আমার ভাঙা। “
মেঘ এগিয়ে এলো হাতের স্যুটটা ছুড়ে মারলো অর্কের পানে।অর্ক ক্যাচ ধরল।-“কথা সত্য। তবে তোকে আমার সাথে একটা জায়গায় যেতে হবে। “
অর্ক মেঘের কাধ জড়িয়ে ধরল। -” যেথায় ইচ্ছে নিয়ে যা কিছু মনে করবো না। “
মেঘও ওর কাধ জড়িয়ে ধরে বলল -” চল।”
চলতে চলতে অর্ক জিজ্ঞেস করল -” তা আমরা যাচ্ছি কোথায়? “
-” মাইশাদের বাসায়। রেগে বুম হয়ে আছে। কাল যেতে বলেছিল।যাইনি তাই।কল তুলছে না।এখন যার বিয়ের জন্য এতো আয়োজন তাকে যদি রাগিয়ে বসে থাকি। তাহলে তো বিয়েতে রোস্ট পাবো না রে হাদা।”
-“ওই চুন্নির রাগ ভাঙাতে হবে এখন আমার।আমার এমন দিনও এলো।হায়! কপাল।”
-“মুখ বন্ধ কর শা*লা। “
-“দুইটা দুইটার সাথে টম এন্ড জেরির মতো লেগে থাকে তাতে কিছু না। শুধু আমরা কিছু বললে তাদের গায়ে হুল ফোটে। হাহ!”
-“কথা বলতে হলে মাইশার সামনে গিয়ে বলিস।এখন আমার এনার্জি খতমের পথে। “
********************
দুতলার লম্বা করিডর লাগোয়া বড়সড় একটা বারান্দা। বাচ্চারা বড় হবার আগে এখানটায় মা চাচিদের আড্ডার জায়গা ছিল।ফাইয়াজ রাইশারা বড় হওয়ার সাথে সাথে বারান্দার হকদার পাল্টে গেল। মা চাচিদের সরিয়ে বাড়ির বাচ্চাগুলোর আড্ডা মহলে পরিবর্তন হলো।বাড়ির বাচ্চাগুলো বড় হয়ে যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় পুনরায় বাড়ির রমনিদের আড্ডার জায়গা ফিরে এসেছে সেথায়। তানিশা আসায় পুনরায় আড্ডামহল বাচ্চাদের হাতে গেল। মাইশা একমনে ফোনে টাইপ করছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। ফাদিন তানিশা মেয়েটাকে একদম ইগনোর করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। তানিশা প্রতিবারের মতো ফাদিনের লিসেনার হিসেবে অবদান রাখছে। ফাদিন তার এই আড়াই বছরের যত নতুন নতুন অভিজ্ঞতার গল্প আছে তা শোনাচ্ছে। তানিশা একমনে কথা গুলো শুনছে। একটু দূরে বেতের চেয়ারে বসে দুই চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ কথা বলছেন নিজেদের মধ্যে।
ফাদিন চায়ের কাপে একটু চুমক দিয়ে বললো -” এখন তুই কিছু বল। আব মে তোহ তাকগেয়া।”
-” আমি কি বলবো? কি শুনতে চাও তুমি? “
ফাদিন একটু ভাবুক হলো।জোহানের দিকে তাকাতেই সকাল থেকে মাথায় ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটাই করলো-” এই গবেটকে পাইলি কেমনে? “
তানিশা একবার জোহানের দিকে তাকাল। জোহান খুব মনোযোগ সহকারে ফাহিমের কথা শুনছে। তানিশা ফাদিনের দিকে তাকিয়ে বললো -” অনেক লম্বা কাহিনী।তবে শর্টকাটে বলি।ও খালার নেইবার। আবার একই হসপিটালের একজন ডাক্তার হওয়ার ফলে খালাখালুর সাথে সম্পর্ক ভালো। সেখান থেকেই পরিচিত। পরে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব।”
-“আমি ভাবতাছি তুই এমন হাঁদা বন্ধু কিভাবে তৈরি করলি পরে মনে হলো…”
ফাদিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই মাইশা ফোনটা রেখে বললো-” ও তো নিজেই গাধি।আরেক গাধাকে বন্ধু বানিয়েছে।এখানে ভাবার মতো কি আছে? “
মাইশার কর্কষ স্বর শোনে ফাহিম জোহান কথা থামিয়ে ওদের পানে তাকাল।ফাদিন মাইশাকে উদ্দেশ্য করে বললো-” তোর হয়ত একটু বেশিই পছন্দ হয়নি? “
ফাহিম বিরক্ত স্বরে শুধালো -” তোমরা কি এই পার্টটা স্কিপ করতে পারো না। যখনই দেখি তখনই ওকে নিয়ে কথা বলছো।বেচারা বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছে। তোমরা তার সাথে ভালো ব্যবহার করবে তা না। “
মাইশা মুখ বাঁকালো ফাহিমের কথা শুনে। ফাহিম চোখ রাঙালো মাইশাকে। ফাদিন হাসতে হাসতে বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে মুখে পুরলো-” আহ! আমার সোনা ভাইটা বিদেশি বেআক্কলকে বেচারা বলছে। “
জোহান অবুঝ চোখে তানিশা পানে তাকাল। এখানকার কথোপকথনের কিছুই সে বুঝতে পারছে না। তানিশা ইশারায় বুঝালো তোমার না বুঝলেও চলবে। ফাহিম ফাদিনের কথার পরিপেক্ষিতে কিছু বলতে যাবে কিন্তু বাড়িতে একটা গাড়ির প্রবেশের আওয়াজে টপিক সেদিকে চলে গেল।ফাদিন কৌতূহল হয়ে উঁকি দিলো নিচে -” ফাইয়াজ না কি? আরে! এটা তো মেঘ?”
মাইশা তড়িঘড়ি করে উঠে এলো। বারান্দার রেলিং ধরে নিচে
তাকালো।গাড়ি থেকে অর্ক মেঘ নেমে এলো। মাইশা দাঁত কিড়মিড় করে একটা ভয়ংকর গালি দিলো বন্ধুদের।মাইশা নিচে দেখতে দেখতে ফাদিন লম্বা লম্বা কদম ফেলে এই এড়িয়া থেকে আউট হয়ে গেছে। মাইশা তানিশার পানে চেয়ে বলল -” এই তুই এক ঘন্টার আগে নিচে নামবি না। “
তানিশা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -“কেনো?”
-” তোকে এতোসব বুঝতে হবে না। তুই এখানেই থাকবি মানে থাকবি। আর তোর বিদেশি ফ্রেন্ড যদি নিচে নামছে তুই নামার আগে, তাহলে দুই দুইটার ঠাং ভেঙে দেবো আমি। “
কথাটা বলে মাইশা দুপদাপ শব্দ করে করিডর দিয়ে চলে গেল।তানিশা বিস্মিত মুখ নিয়ে ফাহিমের দিকে তাকালো।ফাহিম মুখ কুঁচকে বললো-” বাদ দে। মাথায় সমস্যা আছে। “
মাইশা নিচে এসে দেখে মেঘ উপরে যাওয়ার জন্য সিড়ি বেয়ে উঠছিল।মাইশা পথরোধ করে দাঁড়ালো।-” আমি চলে এসেছি। আপনাকে উপরে যেতে হবে না। “
মেঘ একটা নির্মল হাসি দিয়ে বললো-” তুই তো দেখি ভালোই আছিস। “
মাইশা খ্যাক করে উঠলো -” কেন আমার আবার কি হবে? “
-” না মানে ভাবলাম আর কি?ওই! “
-” রেগে আছি কিনা? নাহ রেগে নাই। চল নিচে চল। “
-” আমার সারপ্রাইজ কই?”
মাইশা টেনে টেনে বললো -” ওরেএএ বাবাহ! এতো উতলা কেন? আমি অপেক্ষা করতে পারলাম আর ওনার অপেক্ষা হচ্ছে না। “
-” তাহলে কি আমি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে নিবো?”
-” তোর মুখ ভেঙে দেবো আমি। গিয়ে বস। সময় হলে আমি দিয়ে দেবো। “
মেঘ বিনা অভিযোগে ড্রইং রুমে গিয়ে বসলো।অন্য সময় হলে জোরাজোরি করতো। কিন্তু এখন টেম্পারেচারে গন্ডগোল আছে।বসতে বসতে মেঘ বিরক্ত হলো। চা নাস্তা খাওয়ার পর্ব শেষ হলো।আধ ঘন্টা বসেও মাইশার দেখা নেই।ফাদিনের মজাদার গল্পেও কান দিতে পারছে না। একবার উঠে গিয়ে কিচেনে উঁকি দিলো।মাইশা তাকে আবার বসতে পাঠিয়ে দিলো। মাইশার উপর বিরক্ত হয়ে মেঘ যখন আবার সোফায় গিয়ে বসলো তখন মাইশা এলো। হাতে তার ফোন। মাইশা মেঘের পাশে এসে দাড়াল। মেঘ চোখে দিয়ে শাসিয়ে তাকাল ওর পানে। মাইশার মুখে মিটিমিটি হাসি। মেঘ মাইশার দিক থেকে মুখ সরিয়ে সিঁড়ি দিকে তাকাল।
মেঘ সেদিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হতবাক হয়ে উঠে দাড়াল। বুকে তার হাতুড়ি পেটা শুরু হয়েছে। আড়াই বছর পর! কিশোরী তানিশার সাথে এই তানিশার ব্যাপক তফাত। নারী রূপে মেয়েটা যেন আরও বেশি সুন্দর, আরও বেশি আকর্ষণীয়।গাড় নীল শিফন শাড়ী পরনে,কানে নীল রঙের ছোটো কানের দুল, গলায় চিকন সোনার চেইন সাথে বাম হাতে রূপোর ব্রেসলেট। মেয়েটা এক একটা সিঁড়ি বেয়ে নামছে।আর তার বুকের হাতুরি পেটা একদাপ বাড়ছে। মাইশা মেঘের কানে ফিসফিস করে বলল -” বলেছিলাম না পরে আফসোস করবি।কাল না আসায় আফসোস হচ্ছে তো?”
মেঘ শুধু মাথা ঝাঁকাল। মাইশা আবার বললো-” আরেকটা আছে। “
মেঘ তানিশার পানে চেয়েই স্মিথ স্বরে শুধালো -” আর কি? “
-” সারপ্রাইজ। তানু এসেছে না?ওটাও সুরসুর করে নিচে চলে আসবে। “
তানিশা ওদের দিকে এগিয়ে গেল। অর্ক তাকে লক্ষ্য করে বললো-” আরে! আমাদের তানিশা নাকি! তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না। বড় হয়ে গেছে বাচ্চাটা তা কবে দেশে এলে?”
তানিশা মৃদু হেসে বলল -” হ্যা, আমিই।কাল এসেছি অর্ক ভাই।কেমন আছেন আপনি? “
অর্ক ক্ষীন হেসে জবাব দিল -” আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। “
তানিশা এবার মেঘের পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল -” আপনি কেমন আছেন মেঘ ভাইয়া?”
মেঘ নিচের দিকে তাকিয়ে ডানে বামে মাথা ঝাঁকাল। ঘাড় চুলকে ভালো বলতেই নিয়েছিলো কিন্তু কানে অস্বাভাবিক কিছু এসে লাগতেই ভ্রু কুঁচকে সিঁড়ি পানে তাকাল। একেবারে উপরে সিঁড়ি থেকে জোহান তানিশাকে গলা ছেড়ে ডাকছে -” প্রিন্সেস! “
-“কি?”
আর তানিশাকে জবাব দিতেই দেখে মেঘের চোখ বড় হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে মাইশার পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস -” এসব কি? এই বিদেশিটা কে? “
মাইশা ক্ষীণ হেসে বলল -” তোর সতীন।আরে না তোর সতান হবে। “
মেঘ চেঁচিয়ে উঠলো -” হোয়াট? “
মেঘের চেঁচানোতে তানিশা মাইশা কেঁপে উঠলো। ফাদিন উঠে দাড়াল। -” কি হয়েছে মেঘ?
চলবে……….