গল্প: যদি আবার ভালোবাসো(০২)

লেখনীতে:আইরা নূর

পর্ব:০২

 

‼️কার্টেসি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ‼️

কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে মেয়েটার। গায়ের রং আগের থেকেও বেশি উজ্জ্বল হয়েছে। র’ক্ত জবার ন্যায় ঠোঁট জোড়া হালকা হালকা কাঁপছে তার। ঠোঁটের কোণে আবার হালকা একটু র’ক্ত ও জমাট বেঁধে আছে। চুল গুলো খোপা করা ছিলো।

কিন্তু হাঁটু অব্দি লম্বা আর ঘন ঘন চুলের ভার চুলের কা”টা” টি ঠিক সামলে উঠতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছে কখনোই। এতে সাইনা কে যেনো আরো বেশি মায়াবী লাগছে ছেলেটির কাছে। ছেলেটি গাড়ি থামিয়ে সাইনার ঠোঁটের কোণে জমে থাকা র’ক্ত হালকা হাতে পরিষ্কার করে দেয়।

কাজটা ছেলেটি এতটাই সতর্কতার সাথে করে যেনো সাইনা টের টি ও না পাই। এরপর ছেলেটি গাড়ি থেকে নেমে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সাইনার দিকেই তাকিয়ে থাকে। পূর্ব দিগন্তে কেবলই সূয্যি মামা উকি মা’র’তে শুরু করেছে। ছেলেটি আর দেরি না করে সাইনা কে ডাকতে শুরু করে। দুইবার ডাকার পর সাইনা পিট পিট করে চোখ মেলে তাকায়। সাইনা ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,

সাইনা:- আমরা কোথায় এসেছি?

ছেলেটি নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দেয়,

—কাজী অফিসে।

সাইনা চমকে কিছুটা উঁচু স্বরেই বলে,

সাইনা:- কিহ কাজী অফিসে, কিন্তু কেনো…?

ছেলেটি আবারো গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,

—বিয়ে করবো বলেই তো এখানে এনেছি। তো আর কোথায় যাওয়ার আশা করছ তুমি..!!

ছেলেটির মুখে এখনো সেই কালো মাস্ক হয়েছে। সাইনা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে ছেলেটি আসলে কে। সাইনা কিছুটা কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,

সাইনা:- মানে..!! এই দেখুন আমাকে আপনি কমলাপুর রেলস্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসুন আমি একা একাই চলে যেতে পারবো।

—হুম তা তো যেতে পারবেই কিন্তু তোমার সাথে আমার পুরোনো কিছু কাজের হিসাব মিলাতে হবে। সেগুলোর হিসেব দিয়ে তারপর নাহয় যেও। যতদিন না আমি আমার হিসেব মিলাতে পারছি ততদিন তুমি আমার কাছেই থাকবে কেমন। (বাঁকা হেসে)

সাইনা:- মা~মানে..?? যা বলার একটু ক্লিয়ার করে বলুন তো। আর আপনি কে যে আমি আপনাকে হিসেব দিতে যাবো। হ্যাঁ আপনি আমাকে আমার বিপদে সাহায্য করেছেন। তার মানে এই নয় যে আমাকে একা একটা মেয়ে মানুষ পেয়ে আপনি উল্টো পাল্টা কিছু করবেন।

ছেলেটি এবার সাইনার কথা শুনে জোরে জোরে হাসতে শুরু করে। ছেলেটিকে হাসতে দেখে সাইনার তো ভয়ে হাত পা সব জমে গিয়েছে। সাইনা নিজের মনে সাহস জুগিয়ে ছেলেটির উদ্দেশ্যে বলে,

সাইনা:- এই কে আপনি..?? এইভাবে হাসছেন কেনো..?? আপনি তাড়াতাড়ি মাস্ক টা খুলুন। আমি দেখতে চাই কে আপনি..!!

সাইনার কথার প্রতিউত্তর ছেলেটি নিজের হাসি থামিয়ে সাইনার দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে,

—আমাকেই ভুলে গেলে..!! কিভাবে পারলে আমাকে ভুলতে..?? ও তুমি তো আবার অন্য কাউকে ভালোবাসো। আমাকে তো ধোঁ’কা দিয়েছ তুমি। ঠিক আছে চলো আমি আর তোমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছি না।

বলেই ছেলেটি সাইনার কাছ থেকে সরে এসে নিজের সানগ্লাস আর মাস্কটা একটানে খুলে ফেলে। সাইনা তো ছেলেটি কে দেখেই ৪৪০ ভোল্টের ঝটকা খাই। তার মুখ দিয়ে অস্পষ্ট ভাবে বের হয়ে আসে,

সাইনা:- নী~নীর তুমি।

সায়ের চোয়াল শক্ত করে আবারো সাইনার দিকে ঝুঁকে কাঠ কাঠ গলায় বলে,

সায়ের:- চিনতে পেরেছ তাহলে। আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে চিনতেই পারবে না। যাক ভালোই হলো। এখন তাড়াতাড়ি নামো কাজী সাহেব বেশিক্ষণ থাকবেন না। তোমাকে বিয়ে করে তারপর আবার বাড়ি ফিরতে হবে আমাকে।

সাইনা:- বি~বিয়ে মানে..!! কি~কিসের বিয়ে কা~কার বিয়ে..??

সায়ের:- কেনো তোমার মনে নেই, তুমি আমাকে কি কথা দিয়েছিলে। আমি নিজের পড়াশোনা শেষ করে তোমাকে বিয়ে করবো। তুমি তো আমার এই শর্তে রাজি হয়েছিলে। মনে পড়ছে না সেই কথা। সমস্যা নেই আমার তো মনে আছে। এখন নিজের কথা রাখো।

সাইনা ও কাঠ কাঠ গলায় উত্তর দেয়,

সাইনা:- অসম্ভব, ২ বছর আগে আমি এটা ও তো বলেছিলাম যে আমার আর তোমার প্রতি কোনো ফিলিংস নেই। আমি তোমাকে আর ভালোবাসি না। ভুলে গিয়েছ নাকি। সমস্যা নেই এই যে আমি মনে করিয়ে দিলাম। এবার আমাকে ছেড়ে দাও।

সাইনার মুখে এই কথা শুনে সায়েরের রাগে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। ২ বছর আগে ও সাইনা তাকে এইসব কথা বলে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল আর আজ ২ বছর পর ও একি কথা বলছে মেয়েটা তাকে। সায়ের এবার জোরে গাড়ির দরজা টা খোলে আর সাইনার বাঁ হাতের কব্জি শক্ত করে চে”পে ধরে গাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে তাকে নামাই।

টানা হেঁচড়া করাই হাতে বেশ ব্য’থা ও পাই সাইনা। যার ফলে তার চোখ গুলো ভিজে ওঠে। সায়ের, সাইনা কে একদম নিজের সামনে এনে দাড় করাই আর তিক্ত স্বরে বলে,

সায়ের:- ও হ্যাঁ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। তোমার তো আবার আশিক আছে। কি যেনো নাম ওর, হ্যাঁ ইরাজ। এবার বুঝেছি তুমি বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছো ঐ ইরাজের সাথে বিয়ে করবে বলে তাইনা..!!

সাইনা আর সায়েরের চোখে চোখ রাখতে পারলো না। কারণ সায়ের তার চোখের ভাষা খুব ভালো ভাবেই পড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সাইনা তো চাইনা যে সায়ের ২ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো জানতে পারুক। সায়ের যদি জানতে পারে তাহলে সে একদম শেষ হয়ে যাবে।

সাইনা কে নিজের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে দেখে সায়ের একটা তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে আবারো সাইনার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,

সায়ের:- এখন চোখে চোখ রাখতে পারছো না তাইনা। রাখবে কিভাবে, একটা সহজ সরল ছেলেকে বোকা বানিয়ে তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে এখন দিব্বি নিজের প্রেমিকের সাথে বিয়ে করার ধান্দায় আছো জা,,,,, (কিছুক্ষণ থেমে) সাইনা।

সাইনা কিচ্ছু বলছে না। সাইনার এই নীরবতা সায়ের কে যেনো ভেতর থেকে একদম দুমড়ে মুছড়ে শেষ করে দিচ্ছে। তার জানপাখির মনে হয়তো এখন আর তার জায়গা নেই। কিন্তু সায়ের তো হেরে যাওয়ার মতো ছেলে নয়।

মনটা না পাক, অন্তত সাইনা কে সারাজীবনের মতো নিজের কাছে বেঁধে তো রাখতে পারবে। সাইনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায়েরের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু সায়ের তো তাকে ছাড়বে না।

সাইনা যতবার চেষ্টা করছে সায়ের ঠিক ততবারই শক্ত করে সাইনার হাতখানা আঁকড়ে ধরছে। এতো শক্ত করে হাত ধরায় সাইনার হাতে থাকা কাঁচের চুড়ি গুলো শব্দ করে ভেঙ্গে রাস্তায় পড়ে যেতে শুরু করে। সাথে কিছু কাঁচের টুকরো তার কোমল হাতে গেঁথে ও যায়। ব্য’থা’য় সাইনার জান যাই যাই অবস্থা। সাইনা এবার নিজের মুখ খোলে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,

সাইনা:- আমাকে ছাড়ো নীর, হাতে লাগছে আমার।

সায়ের কিচ্ছু বলে না। বরং আরো শক্ত করে সাইনার হাত ধরে। ফলে সায়েরের হাত ও সাইনার র’ক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে। সাইনা কষ্ট ভরা কন্ঠে বলে,

সাইনা:- কি হলো ছাড়ছ না কেনো..??? আমি যাবো আমাকে যেতে দাও নীর।

সায়ের, সাইনার হাত খানা ছেড়ে দেয়। সায়েরের বাঁধন থেকে ছাড়া পেয়েই সাইনা চলে যেতে নেয় তখনই সায়ের বলে উঠে,

সায়ের:- তোমার মতো ক্যারেক্টার লেস মেয়ে আর কি বা করতে পারে। এখন নিশ্চই নিজের প্রেমিকের কাছে যাবে..?? ওর সাথেই থাকবে নিশ্চই। আরে নিজেকে আর কত নিচে নামাবে তুমি বলতে পারো। এবার তো গায়ে বে’শ্যা’র ট্যাগ লেগে যাবে তোমার।

সাইনার পা গুলো থমকে যায় সায়েরের কথা গুলো শোনা মাত্রই। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। যাকে এতটা ভালোবাসে তার মুখেই এইসব কখনো শুনতে হবে সেটা সাইনা আশা করেনি। অবশ্য তার জীবনে আর কি বা বাকি আছে।

যে যেভাবে পারে তাকে আ’ঘা’ত করে চলে যায়। সে তো সকলের হাতের পুতুল। এখন তো সায়েরের হাতের ও পুতুল হয়ে যাবে সে। একবার যখন সে সায়েরের হাতে ধরা পড়েছে তখন মৃ’ত্যু’র আগ অব্দি তার নিস্তার নেই। সাইনা এখনো অব্দি সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সাইনা কে তার জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সায়ের আবারো বলে উঠে,

সায়ের:- কি হলো যাচ্ছো না যে। কথাটা গায়ে লাগলো বুঝি। অবশ্য গায়ে লাগার ই কথা। গায়ে লাগার মতোই কথা বলেছি আমি।

সাইনা এবার ও কিচ্ছু বলে না। হঠাৎ করেই তার নাক দিয়ে র’ক্ত পড়তে শুরু করে। সাইনা টের পেতেই দ্রুত শাড়ির আঁচল দিয়ে র’ক্ত পরিষ্কার করে ফেলে। সাইনা কে কিছু বলতে না দেখে সায়ের, সাইনার সামনে এসে দাঁড়ায়।

সাইনা, সায়ের কে নিজের এতো কাছে দাঁড়াতে দেখে কিছুটা পিছিয়ে যায়। সায়ের তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

সায়ের:- অনেক হয়েছে তোমার এইসব তামাশা। আমি না জাস্ট নিতে পারছি না আর এগুলো।

বলেই সায়ের আবারো সাইনার বাঁ হাতের কব্জি শক্ত করে চেপে ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে লাগে। সাইনা হাত মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলে,

সাইনা:- ছাড়ো আমার হাত। আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তুমি..??

সায়ের থেমে গিয়ে সাইনার দিকে ঘুরে দাঁড়ায় আর বলে,

সায়ের:- কেনো দেখতে পাচ্ছ না এটা কাজী অফিস। বিয়ে করতেই তোমাকে নিয়ে এখানে আসা।

সাইনা:- কিন্তু আমি তোমাকে বিয়ে করবো না। ছাড়ো আমাকে, আমার সাথে তুমি এইরকম জোর জবরদস্তি করতে পারো না নীর।

সায়ের:- আমি আরো কি কি করতে পারি সেটা তোমার কল্পনার ও বাইরে সাইনা।

বলেই আরো জোরে সাইনার হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যেতে লাগে। সাইনা বার বার সায়েরের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু সায়ের তার হাত খানা এত শক্ত করে ধরেছে যে মনে হচ্ছে সাইনার হাতের হাড় এই বুঝি ভেঙ্গে যাবে। এমনিতেই কাচের চুরি গুলো ভেঙ্গে তার হাতে গেঁথে গেছে যার জন্য হাতে অনেক ব্য’থা হচ্ছে। তার উপর এতো শক্ত করে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার ফলে কাঁচের টুকরো গুলো যেনো আরো বেশি করে বিধে যাচ্ছে তার নরম হাতে।

~চলবে~

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x