গল্প: যদি আবার ভালোবাসো(০১)

পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে বিরামহীন ভাবে ছুটে চলেছে সাইনা। যার পরনে রয়েছে একদম লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি। দেখেই মনে হচ্ছে বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে মেয়েটা। বাবা মা ম’রা অনাথ মেয়েটাকে জোর করেই তার ফুপি মিলা বেগম এক মাঝ বয়সী লোকের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন।

যেই লোকের মধ্যে খারাপ গুণের কোনো অভাবই নেই। লোকটি মা’তা’ল, নে’শা’খো’র, ম’স্তা’ন, দুশ্চরিত্র। লোকটির আগের ঘরের স্ত্রী সন্তান থাকলে ও সে সাইনা কেই বিয়ে করতে চাই। কারণ তার কু নজর পড়েছে এই অভাগী মেয়েটার দিকে।

অবশ্য মিলা বেগমের এতে কোনো সমস্যা নেই। ছেলে যেমনি হোক না কেনো, বড়লোক তো আছে। আর মিলা বেগমের ভাষ্য মতে বড়লোক ঘরের ছেলে, হাতে টাকা আছে তাই একটু আকটু নে”শা করতেই পারে। তাতে দোষের কি আছে। আর বয়স সেটা তো কেবল সংখ্যা। লোকটির বাবা তার ছেলের জন্য প্রায় ৫০ বিঘা জমি ও রেখে গিয়েছেন।

ঐ মাঝ বয়স্ক, খারাপ লোকের সাথে সাইনা কিছুতেই বিয়ে করবে না তাই তো মেয়েটা বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে তবে ঐ বুড়ো লোকটা এতো সহজে তো খ্যান্ত হবে না। তার তো সাইনা কেই চাই। তাই তো নিজের চ্যালা ব্যালা কে পাঠিয়েছে সাইনার পিছনে তাকে ধরে আনার জন্য।

সাইনা দৌড়াচ্ছে আর বারবার পিছনে দেখেছে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তার শ্বাস ফুরিয়ে আসছে। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে সে আর কত দৌঁড়াবে..!!! বাবা মায়ের মৃ’ত্যু’র পর থেকে তার উপর যেনো গজব নেমে এসেছে। অবশ্য বাবা মা বেঁচে থাকতে ও কেউ তাকে সহ্য করতে পারতো না।

মেয়েটা নিজের এই করুন অবস্থার কথা ভাবছে আর দৌড়াচ্ছে। হঠাৎই সাইনার সামনে একটা গাড়ি এসে ঠিক সময়ে ব্রেক কষে। আর একটু হলেই হয়তো এক্সিডেন্ট হয়ে যেতো তার। গাড়ি থামিয়ে ভিতর থেকে একটা ছেলে বের হয়ে আসে।

কালো লং কোর্ট পরিহিত একটা ছেলে। ছেলেটার হাইট কত হবে এই ৫ ফুট ১০ বা ১১। চোখে সানগ্লাস আর মুখে কালো মাস্ক। সাইনা ছেলেটির এমন সাজসজ্জা দেখে অবাক হয়েছে। কারণ ছেলে টা এই রাতের বেলায় সানগ্লাস পড়েছে।

তবে সাইনার জানা মতে তো রাতের বেলায় কেউ সানগ্লাস পরে না। কিন্তু এই ছেলেটা তো দিব্বি তার সামনে সানগ্লাস পরে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি পলকহীন ভাবে সাইনার দিকেই তাকিয়ে আছে। সাইনা ও ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে।

–––

এবার সাইনার পরিচয়ে আসা যাক। পুরো নাম হলো সাইনা চৌধুরী, বয়স ২০ বছর। দেখতে মাশাআল্লাহ বেশ সুন্দর। দুধে আলতা গায়ের বরণ তার। চোখের মনি টাও গায়ের রঙের সাথে বেশ মানিয়েছে। একদম হালকা খয়েরি রঙের।

সাইনার বাবা মা তানভীর চৌধুরী আর লিনা চৌধুরী। ২ বছর আগেই একটা কার এক্সিডেন্ট এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন তাঁরা। বাবা মায়ের মৃ’ত্যু’র পর তার ফুপি মিলা বেগমই তার দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব নিয়েছেন বললে ভুল হবে। কোনো রকমে মেয়েটা বেঁচে আছে। ফুপির বাড়িতেই এখন এই অনাথ মেয়েটার জায়গা হয়েছে।

ফুপির বাড়ি বললেও ভুল হবে। এটা সাইনার নিজের বাড়ি কিন্তু সাইনার ফুপি মানে মিলা বেগম তার ভাই ভাবী, তানভীর চৌধুরী আর লিনা চৌধুরীর মৃ’ত্যু’র পর এই বাড়িটা জোর করে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছেন।

তানভীর চৌধুরী এবং লিনা চৌধুরী ছিলেন নাম করা ডাক্তার। সেই সুবাদে তাদের অনেক টাকা পয়সা ও ছিলো। আর সাইনা তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তাই এই সব টাকা পয়সা, সম্পত্তির একমাত্র অংশীদার হলো সাইনা নিজেই।

কিন্তু সাইনার ফুপি মিলা বেগমের এই সম্পত্তির ওপর অনেক লোভ ছিলো সেই শুরু থেকেই। কারণ তার স্বামী, মিস্টার কায়সারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। মিলা বেগম নিজের ইচ্ছাই পরিবার, বড় ভাই ভাবির বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেম করে মিস্টার কায়সার কে বিয়ে করেছেন।

তাই আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে ও মা অথবা বড় ভাইয়ের কাছে হাত পাততে পারেনি। তবে বড় ভাইয়ের সম্পত্তির উপর লোভ তার একটু ও কমেনি। তখন থেকেই তিনি তক্কে তক্কে থাকতেন যে কিভাবে ভাইয়ের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা যায়।

আর মিলা বেগম, সাইনার বাবা মায়ের মৃ’ত্যু’র পর তার দায়িত্ব নেওয়ার নামে সাইনা কে নিজের কাছে রেখে সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখিয়ে নেওয়ার পর অ’মা’ন’বি’ক অ’ত্যা’চা’র শুরু করে মেয়েটার উপর। দিনের পর দিন এই অ’ত্যা’চা’র যেনো বেড়েই চলছিল সাইনার উপর। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মা’রে’র দাগ এখনো স্পষ্ট।

সাথে তো পান থেকে চুন খসলেই শাস্তি বরাদ্দ আছে মেয়েটার জন্য। তেমনই একদিন, মিলা বেগমের একটা চায়ের কাপ ভুল বশত সাইনার হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে যায়। আর এটাই যেনো তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সেইদিন আকাশ টা ও বেশ মেঘলা ছিল। কালো মেঘে পুরো আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল।

ভুল বশত সামান্য একটা চায়ের কাপ ভাঙ্গাই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই বাড়ি থেকে বের করে মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেন মিলা বেগম। যেনো বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

সাইনার বৃষ্টির পানি একদমই সহ্য হয় না। হালকা একটু বৃষ্টির পানি গায়ে পড়লেই শরীর কাপিয়ে জ্বর চলে আসে মেয়েটার। তবুও মিলা বেগমের সাইনার উপর একটুও মায়া হয়নি। তিনি সাইনা কে টানা ২ ঘণ্টা বৃষ্টির মধ্যে দাড় করিয়ে রেখেছিলেন।

আর তখনই সাইনার ওপর কুনজর পড়ে মা”তা”ল, নে”শা”খো”র, ম”স্তা”ন, দুশ্চরিত্র মাঝ বয়স্ক মাহবুব রহমানের। প্রথম দেখাই তার সাইনা কে ভালো লেগে যায়। তাই সে মিলা বেগমের সামনে সাইনা কে বিয়ের করার প্রস্তাব পেশ করে। মিলা বেগম প্রথমে এই বিয়েতে সম্মতি দেন না। তবে মাহবুব রহমান যখন তাকে ২৫ বিঘা জমির লোভ দেখাই তখন মিলা বেগম, মাহবুব রহমানের সাথে সাইনার বিয়ে দিতে রাজি হয়ে যান।

–––

মাস্ক পরার জন্য সাইনা ছেলেটির মুখ ভালো করে দেখতে ও পাচ্ছে না। কিন্তু ছেলেটা সাইনা কে খুব ভালো করে চিনতে পেরেছে। সাইনা বেশি কিছু না ভেবে ছেলেটির উদ্দেশ্যে কম্পিত স্বরে বলে,

সাইনা:- আমাকে প্লিজ হেল্প করুন। আমি অনেক বড় বিপদে পড়েছি। ও~ওরা ওরা আমাকে ঐ বাজে লোকটার কাছে নিয়ে যাবে। ঐ বাজে লোকটা, ঐ বাজে লোকটা আমাকে বিয়ে করতে চাইছে। আমি ঐ লোকটা কে বিয়ে করতে চাইনা। আমাকে প্লিজ হেল্প করুন। প্লিজ আমাকে ওদের থেকে বাঁচান, প্লিজ।

সাইনার মুখে বিয়ের কথা শুনে ছেলেটির কপালের সমস্ত রগ ফুলে ফেঁপে উঠে। ছেলেটিকে দেখে মনে হচ্ছে যে সে বেশ রেগে গিয়েছে। ছেলেটি তার হাতটা মুষ্ঠি বদ্ধ করে নেয় নিজের রাগ কে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। সাইনা ছেলেটিকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার উদ্দেশ্যে বলে,

সাইনা:- কি হলো আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না। ওরা এখনি চলে আসবে। ওরা এসে গেলেই আমাকে নিয়ে যাবে। আমাকে প্লিজ বাঁচান। অনেক কষ্টে ওদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছি আমি।

সাইনার কথাই ছেলেটি এবার হুস ফেরে। ছেলেটি সাইনার উদ্দেশ্যে বলে,

—গাড়িতে ওঠো।

সাইনা ছেলেটির কন্ঠ শুনে বেশ অবাক হয়ে যায়। সাইনা মনে মনে বলে,

সাইনা:- এতটা মিল কিভাবে হতে পারে..?? ওর তো এখানে আসার কথা নয়। ওর সাথে সব সম্পর্ক তো আমি ২ বছর আগেই শেষ করে চলে এসেছি। না না আমি এইসব কেনো ভাবছি। ও এখানে কেনো আসবে। ওর তো এখানে আসতেই পারবে না।

সাইনার ভাবনার মাঝেই ছেলেটি বলে উঠে,

—কি হলো দাঁড়িয়ে আছো যে। উঠতে বললাম তো। ওরা চলে আসলে আমি আর তোমাকে ওদের থেকে বাঁচাতে পারবো না।

সাইনা ও আর দেরি না করে গাড়িতে উঠে পড়ে। ছেলেটি গাড়ি স্টার্ট দেয়। তার গাড়িটি রাস্তার ধুলো উড়িয়ে সাই সাই করে চলতে শুরু করে।

,,,,,,,,

মাহবুব রহমান:- কি রে পেলি তোদের হবু ভাবীকে..??

—না ভাই, ভাবী যে এই রাতের বেলায় কোথায় লুকালো খুঁজেই পাচ্ছি না।

মাহবুব রহমান:- কি খুঁজে পাচ্ছিস না মানে টা কি। ভালো করে খোঁজ ওকে। ২০-২৫ জনের মতো লোক আছিস আর একটা বাচ্চা মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারছিস না তোরা। তোদের কে কি আমি এমনি এমনি টাকা দিয়ে রেখেছি নাকি। যদি ঐ মেয়েটাকে না পাস তাহলে আমি তোদের একটারও মাথা আস্ত রাখবো না মনে থাকে যেন। (হিংস্র কন্ঠে)

—ঠিক আছে ভাই আপনি একদমই চিন্তা করবেন না। আমরা ভাবীকে যেখান থেকেই হোক খুঁজে নিয়ে আসবো।

মাহবুব রহমান:- হুম যত তারাতারি পরিস ওকে নিয়ে আই। স্যার এখনো অব্দি কিছুই জানেন না। যদি উনি জানতে পারেন যে মেয়েটা আমাদের ডেরা থেকে পালিয়েছে তো আমাদের সব কটা কে উনি পুড়িয়ে মা’র’বে। তাই যেভাবেই হোক ঐ মেয়েকে খুঁজে বার কর।

,,,,,,,,

গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে। ছেলেটা কোনো দিকে না তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছে। সাইনা কে সে মাহবুব রহমানের লোকেদের দৃষ্টি সীমানার একদম বাইরে নিয়ে চলে এসেছে। দীর্ঘ ৬.৩০ ঘণ্টা ড্রাইভ করে তারা সিলেট থেকে ঢাকায় পৌঁছিয়েছে। সাইনা অনেক ক্লান্ত তাই গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিতেই তার চোখ জুড়ে নেমে আসে ঘুম। সাইনা এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু গাড়িতে থাকা ছেলেটি তো সাইনা কে দেখতেই ব্যস্ত।

~চলবে~

সূচনা পর্ব

লেখনীতে:আইরা নূর

 

একটা মাঝারি আকারের পর্ব পড়তে আপনাদের হয়তো ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে তবে আমার লিখতে অনেক সময় লাগে। আশা করছি আমার দিকটা ও আপনারা বিবেচনা করবেন‼️

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x