লেখনীতে:আইরা নূর
পর্ব:০৩
পর্ব:০২ এর লিংক
ফায়াজ দাঁড়িয়ে আছে কবরস্থানের গেটের সামনে। তানি এখানকার ঠিকানায় তাকে দিয়েছে। কবরস্থানের দিকে তাকাতেই ফায়াজের হৃদপিণ্ড টা ধড়াস করে উঠে। তার জীবনে ও কেউ এলো কিন্তু সে যখন জানতে পারলো ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গিয়েছে।
তারা একই হসপিটালে ছিল। তাদের কেবিন ও পাশাপাশি ছিল অথচ শেষ দেখা তাদের হয়ে উঠেনি। ফায়াজের চোখ দিয়ে আপনাআপনি জল গড়িয়ে পড়ছে।
কাঁপা কাঁপা পায়ে ফায়াজ গেট দিয়ে কবরস্থানের ভেতর প্রবেশ করে। এই কবরস্থানেই তার বাবা মায়ের কবর আছে। ফায়াজ ধীর পায়ে নিজের বাবা মায়ের কবরের দিকে এগিয়ে যায়।
দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাওয়ার পর সে রোজ তার বাবা মায়ের কবর জিয়ারত করে। নিজের বাবা মায়ের কবর জিয়ারত করে দোয়া করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
এই মাটির নিচেই ঘুমিয়ে আছে কত মানুষের প্রিয়জনেরা। ফায়াজ সামনে যেতেই দেখতে পাই একটা নতুন কবর। কবরের মাথার কাছে নাম লেখা আছে।
{নাম:- আইরিন সুলতানা
বাবার নাম:- তাজউদ্দীন খান
জন্ম:- ৩ ই জানুয়ারি ২০০৬
মৃত্যু:- ১৭ ই মার্চ ২০২৬}
ফায়াজ হাঁটু গেড়ে বসলো। আইরিন লেখাটা তে হাত ঠেকালো। হাত ঠেকাতেই বুকটা আরো ভারী হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে আবারো টপ টপ করে পানি পড়তে শুরু করলো।
ফায়াজ একহাতের সাহায্যে চোখের পানি মুখে আইরিনের কবরের ওপর হাত রাখলো। এই মাটির নিচেই শুয়ে আছে ফায়াজের অজান্তেই যে তার মনের পুরো জায়গাটা দখল করে নিয়েছে।
ফায়াজ ধীরে ধীরে হাত বোলাতে শুরু করে। কবরের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে নিজের সব স্বপ্নের কথা মনে পড়ে যায়। কতটা ক’ষ্টে ছিল মেয়েটা। ফায়াজের সেই স্বপ্ন গুলোর কথা মনে পড়তেই আবারো চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে।
তখনই পিছন থেকে আইরিন বলে উঠে,
আইরিন:- তাহলে চলেই এলেন।
ফায়াজ দ্রুত নিজের চোখ মুছে পিছনে তাকাই। পিছনে তাকাতেই দেখতে পাই আইরিন ঠোঁটে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আজকে ও আইরিনের শরীর থেকে অদ্ভুত রকমের আলো বের হচ্ছে।
এই আলো যেনো চারিদিকটা কে আলোকিত করছে। ফায়াজ উঠে দাঁড়িয়ে আইরিনের কাছে আসে। আইরিন হাসি থামিয়ে বলে,
আইরিন:- আপনার খুব বড় একটা জিনিস আমি চুরি করে ফেলেছি। আপনাকে অনেক আগেই বলেছিলাম যে আপনার বড় একটা জিনিস আমি চুরি করে নেবো।
ফায়াজ:- তু~তুমি কিভাবে..??
আইরিন:- আমাকে শুধু আপনিই দেখতে পাবেন। অন্যকারো ক্ষমতা নেই আমাকে দেখার। আমি শুধু আপনার কল্পনাতেই বিরাজ করবো। না না ভুল বললাম শুধু কল্পনা নয় তো। আপনার ঐ মনে ও ইতিমধ্যে বিরাজ করতে শুরু করে দিয়েছি।
বলেই আবারো মুচকি হাসে।
ফায়াজ:- কি চুরি করেছো তুমি.?
আইরিন:- এখনো বুঝতে পারলেন না। সমস্যা নেই কিছুদিন পর ঠিকই বুঝে যাবেন। সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে এখন আপনি চলে যান। আর কতক্ষণ এখানে থাকবেন..?? নিজের মূল্যবান সময় গুলো এইভাবে নষ্ট করবেন না। মৃ’ত মানুষের জন্য শুধু কবর জিয়ারত আর দোয়া করাই যথেষ্ট। তাদের আর কারোর কাছে কোনো কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার থাকে না। আর থাকবেই বা কিভাবে কারণ তারা তো আর জীবিত থাকে না।
ফায়াজ:- কিন্তু আমি এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
আইরিন:- তানির কাছেই আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আছে। ওর কাছে গেলেই আপনি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।
ফায়াজ:- তাহলে ও আমাকে তখন সবটা কেনো বললো না।
আইরিন হালকা হেসে বলে,
আইরিন:- সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোনোকিছুই হয়না। এখন আপনি যান।
বলেই আইরিন আবারো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ফায়াজ চারপাশে তাকাতেই দেখতে পাই সত্যি আশপাশটা কেমন অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। ফায়াজ আর দেরি করে কবরস্থান থেকে বের হয়ে যায়।
,,,,,,,
ফায়াজ:- তোমার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। যেগুলোর উত্তর আমার আজকেই চাই।
তানি বুঝতে পারে যে ফায়াজ তাকে ঠিক কি জিজ্ঞেস করতে এসেছে। তাই তানি বলে,
তানি:- আপনি একটু বসুন। আমি আসছি।
বলেই তানি ভেতরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর একটা লাল রঙের ডাইরি নিয়ে ফায়াজের সামনে দাঁড়ায় আর ডাইরি টা এগিয়ে দিয়ে বলে,
তানি:- এটার ভেতর আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন।
ফায়াজ তানির হাত থেকে ডাইরি টা নিয়ে বলে,
ফায়াজ:- কি আছে এই ডাইরি তে..??
তানি:- আইরিনের না বলা কিছু কথা আর আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর।
ফায়াজ আর কথা না বাড়িয়ে ডাইরি টা নিয়ে বের হয়ে যায় নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে। ফ্ল্যাটে পৌঁছিয়ে ফায়াজ ফ্রেশ হয়েই ডাইরি টা নিয়ে বসে।
ডাইরির পাতা উল্টাতেই ফায়াজ দেখতে পাই সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে, 𝐘𝐨𝐮𝐫 𝐄𝐲𝐞𝐬…….
ফায়াজ লেখাটার ওপর হাত বোলাই। কি সুন্দর হাতের লেখা গুলো। ফায়াজ নিজের অজান্তেই লেখাটির ওপর ঠোঁট ছোঁয়ায়। লেখাটার ওপর ঠোঁট ছোঁয়াতেই তার চোখ দুইটা আবারো ভিজে যায়।
ফায়াজ চোখ মুছে পরের পাতা উল্টে পড়তে শুরু করে,,,,
“এই ডাইরি টা আপনার হাতে গিয়েছে তার মানে নিশ্চই আপনি আমার আগের ডাইরি টা পড়েছেন। হয়তো মন দিয়েই পড়েছেন, আমাকে খুঁজতে এসেছেন। অনেক গুলো প্রশ্ন আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তাই না।
জানি না কখনো কি আপনি আমার খোঁজ করতে আসবেন নাকি। আপনি আসুন আর না আসুন আমি আমার দায়িত্ব টা ঠিকই পালন করে যাবো। সেই সুবাদেই এই ডাইরি টা লেখা। যদি সত্যি সত্যি কোনোদিন আমার খোঁজ করতে আসেন তাহলে তানি এই ডাইরি টা আপনার হাতেই তুলে দেবে।”
এই পৃষ্ঠায় আর কিছুই লেখা নেই। তাই ফায়াজ পরের পৃষ্ঠা উল্টাই। সেখানে লেখা আছে…
“আমি সবসময়ই চেয়েছিলাম একটা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে। ভালো ভাবে বাঁচতে। কিন্তু একটা দমকা হাওয়া আমার আর আম্মুর জীবন থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমার বাবাই আমাদের জীবন থেকে চলে যাওয়ার পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।
বাবাইয়ের মৃ’ত্যু’র পর আমি আম্মুকে নিয়ে চলে যায় আমাদের গ্রামের বাড়ি রতনপুর। সেখানে আমার চাচা চাচী আমাদের কে সহ্য করতে পারেননি। আমরা ছিলাম তাদের চোখের কা’টা।
সবসময় তারা চাইতেন কীভাবে এই কা’টা কে একেবারে নির্মূল করবেন। তবে প্রতিবারই আমার অলৌকিক শক্তির কাছে হার মেনে গিয়েছেন তারা। এই শক্তির জন্যই আমার জীবনখানা আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এখন নিশ্চই জানতে ইচ্ছা করছে যে আমি এক্ষণই কি বললাম। হুম ঠিকই দেখেছেন আমার সত্যি একটা অলৌকিক শক্তি আছে। যেটা আমি বংশগত ভাবে পেয়েছি। আমার বাবাইয়ের ও এই শক্তি ছিল।
আর দাদাভাইয়ের ও এই শক্তি ছিল। তবে আমার চাচার এই শক্তি ছিল না। এখন হয়তো আপনার কৌতূহল জাগছে যে কি সেই শক্তি।”
ফায়াজের সত্যিই কৌতূহল জাগছে জানতে যে কি এমন শক্তি আইরিনের কাছে আছে যেটার জন্য তার জীবন টা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ফায়াজ পরের পৃষ্ঠা উল্টাই।
“সাধারণত মানুষ যা দেখতে পাই না আমি সেই সব কিছুই দেখতে পেতাম। মানে বুঝতে পারছেন না নিশ্চই। কোনো মানুষকে দেখলেই তার সম্পর্কে কিছু আজব আজব ভিসন ভেসে উঠত আমার চোখের সামনে।
যেগুলোর সব কিছুই সত্যি হয়ে যেতো। প্রথম প্রথম এই সব ভিসন দেখলে আমার খুব ক’ষ্ট হতো। যন্ত্রণায় মাথা তুলতে পারতাম না। মনে হতো মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। এরপর আম্মু কে সব খুলে বলি। আম্মু আমাকে বলেন এটা নাকি আমার বংশগত ভাবে পাওয়া এক শক্তি।
আস্তে আস্তে এইসব কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। গ্রামে যাওয়ার পর এইসব ভিসন যেনো আরো বেশি বেশি দেখতে পেতাম।
তখন মাথা টা আরো বেশি ব্য’থা করত। মাঝে মাঝে এইসব কিছুকে একটা অভিশাপ মনে হতো আমার কাছে। মাথা ব্য’থা’য় কোনো কাজই করতে পারতাম না। কিন্তু চাচী তো আমাকে বসে থাকতে দেবেন না। ক’ষ্ট হলেও কাজ করতে হতো আমাকে।”
ফায়াজ আবারো পরের পৃষ্ঠা উল্টাই।
“একদিন চাচী আমাকে অনু আপুদের বাড়ি থেকে দুধ আনতে পাঠান। আমি যেতে চাইছিলাম না। কারণ বাইরে বের হলেই আমি ভিসন দেখতে পাবো আর আবারো আমার মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু চাচী তো নাছোড়বান্দা।
আমাকে পাঠাবেনই। উপায় না পেয়ে আমি অনু আপুদের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ি। তখনই হঠাৎ করে একটা ছোট্ট বাচ্চা আমার সামনে এসে পড়ে আর আমি ভয়ে নিচে পড়ে যায়।
বাচ্চাটার দিকে তাকাতেই আমি চোখের সামনে একটা ভিসন দেখতে পাই। বাচ্চাটা একটা পুকুরে ডুবে যাচ্ছে। ব্যাস এর চেয়ে বেশি কিছুই আমি দেখতে পাইনি।
বাচ্চাটা আবারো ছুটে চলে যায়। আমি দেরি না করে মাথা যন্ত্রণা নিয়েই বাচ্চাটির পিছু করি। আমার হাঁটতে ও খুব ক’ষ্ট হচ্ছিল। তবু ও আমি ছুট্টে যায় ওর পিছনে। বাচ্চাটিকে পিছন থেকে অনেক বার ডাক দেয় তবে ও কিছুতেই দাড়াই না।
এই রাস্তাটা খুব একটা কোলাহলপূর্ণ ছিল না। তাই আশেপাশে মানুষ জন ও ছিল না। আমি বাচ্চাটিকে খুঁজতে খুঁজতে বেশ অনেক দূর এসে পড়ি তবে ওকে খুঁজে পাইনা। তাই আবারো ফিরে যেতে শুরু করি তখনই কয়েক জন মহিলা আর পুরুষ আমার দিকে এগিয়ে আসে।
আমি ও তাদের দিকে ছুট্টে যায়। আমি কিছু বলতেই যাবো তার আগে এক মহিলা আমার গালে সজোরে এক থা’প্প’ড় বসিয়ে দেন। আমি তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়।
একে তো মাথায় বেশ যন্ত্রণা করছে তার ওপর মহিলার চড় খেয়ে আমার ওঠার ক্ষমতা টাও চলে যায়। আমি সেখানেই পড়ে থাকি। কিন্তু ঐ মহিলা আমার হাত ধরে টেনে তুলে বলেন,
—এই ডাইনী মেয়ে, বল আমার ছেলে কোথায় বল। ওকে কোথায় ফেলে এসেছিস বল..?? চুপ করে আছিস কেনো বল।
আমি উনাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু উনারা একাধারে আমাকে একই প্রশ্ন করে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই একজন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে বলেন,
—ভাবী গো সর্বনাশ হইয়া গেছে।
মহিলাটি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলেন,
—কি হয়েছে আলী বল কি হয়েছে।
—তোমার বেটা, মনির পানি তে ভাইসা উঠছে। শরীর পুরা সাদা হইয়া গেছে। তাড়াতাড়ি চলো।
কথাটা শোনা মাত্রই মহিলাটি নিজের জ্ঞান হারান। সবাই উনাকে ধরে সেখানে নিয়ে যায়। আমি ও তাদের পিছন পিছন যায়। সেখানে গিয়ে দেখি বাচ্চাটা মা’রা গিয়েছে।
আমার নিজের ভেতরই খুব খারাপ লাগছিল। আমি এইরকম কিছু একটাই আন্দাজ করেছিলাম। আর সেটাই হলো। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এক মহিলা বের হয়ে এসে আমাকে টানতে টানতে সবার মাঝখানে এনে ফেলেন আর বলেন,
—এই ডাইনী মা’র’ছে আমগো মনির রে। এই ডাইনী রেই আগে মা’র’তে হইবো।
—হহ এক্কারে ঠিক কইছেন ভাবী। এই মাইয়া আমগো গেরামের আহনের পর থেক্কাই একটার পর একটা বিপদ লাইগ্গা ই আছে।
—এই ডাইনী রে আইজকে ফিডায়ে মাইরা ফেলতে হইবো।
তখন আমি তাদের কাছে হাত জোড় করি আমাকে যেনো তারা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাদের শরীরের একটু ও দয়া মায়া ছিল না। তারা সবাই মিলে আমাকে টেনে হিঁচড়ে একটা গাছের কাছে নিয়ে যায়।
গাছের সাথে আমাকে বেঁধে রেখে এক মহিলা হাতে চা’বু’ক এনে আমাকে মা’র”তে শুরু করেন। প্রতিটা চা’বু’কে’র আ’ঘা’তে আমার শরীর ক্ষ’ত বি’ক্ষ’ত হয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের কাছে আকুতি মিনতি করেছি আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু তারা আমাকে ছাড়ে না।
আমার খুব ক’ষ্ট হচ্ছিল। বাড়িতে থাকতে পারি না একটু কিছু হলেই চাচী আমাকে মা’র’তো আর এখন তো গ্রামের মানুষ ও আমাকে মা’র’ছে। তখন একমুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমার বাবাই কেনো আমাকে উনার সাথে নিয়ে যান নি।
ওরা সবাই খুব খা’রা’প। আমাকে এত বাজে ভাবে মে’রে’ছে যে কথা বলার শক্তি টুকু আমার হচ্ছে না। হঠাৎ করেই আমার কানে ভেসে আসে আমার আম্মুর কান্নার আওয়াজ।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন,
—আমার মেয়েকে ছেড়ে দিন আপনারা। ওকে আর মা’র’বে’ন না। আমার মেয়েটা তো এবার ম’রে’ই যাবে।
তখন আরেক মহিলা বলেন,
—ম’রা’র জন্যই তো মা’র’ছি এই ডাইনী কে।
আমার আম্মু ওদের পায়ে পর্যন্ত পড়েন। অনেক চেষ্টা করে আম্মু ওদের থেকে আমাকে বাঁচান। ঐ মা’র খাওয়ার পর ৫ দিন যাবত বেশ চড়া জ্বর ছিল আমার। শরীর ব্য’থা’য় খাট থেকে উঠতেই পারতাম না।
কিন্তু তবু ও উঠতে হতো। কারণ আমি যদি কাজ না করি তাহলে আমার আম্মু কে ওরা অনেক ক’ষ্ট দেবে। বাবাই কে হারিয়েছি কিন্তু আম্মু কে হারাতে চাইনি তাই নিজের হাজার ক’ষ্ট হলেও মুখ বুজে সব টা সহ্য করেছি। কাজ করে গিয়েছি।”
এই পাতার লেখা গুলো পড়ে ফায়াজ নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। মানুষ কতটা নির্দয় হলে কাউকে এইভাবে ক’ষ্ট দেয়। সত্যি মেয়েটার জন্য ফায়াজের খুব খারাপ লাগছে।
ফায়াজ চোখের পানি মুছে আবারো পড়তে শুরু করে।
“এইভাবেই আমার জীবন চলছিল। হাজার ব্য’থা, হাজার ক’ষ্ট সহ্য করে কোনো রকমে বেঁচে ছিলাম। আমার বাড়ি থেকে বের হওয়া একদম বন্ধ হয়ে যায়। সারাটা দিন শুধু কাজ করেই যেতাম।
এইরকমই একদিন চাচীর জন্য তার রুমে চা নিয়ে যাওয়ার সময় আমার কানে ভেসে আসে চাচা আর চাচীর কিছু কথপোকথন। সেগুলো শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়।
আপনার হয়তো জানতে ইচ্ছা করছে যে তারা কি এমন বলেছিলে যা শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। তারা যে এতো টা জঘন্য আর নিকৃষ্ট সেটা আমি জানতাম না।
প্রত্যন্ত গ্রাম, মানুষজন ছিল খুব সহজ সরল। তারা এতো প্যাচগোজ বোঝে না। আমার দাদা ছিলেন জমিদার। সেই সুবাদে দাদা ছেলেদের গ্রামের বাইরে পাঠিয়েছিলেন ভালো ভাবে শিক্ষিত হওয়ার জন্য। তবে আমার চাচার এইসব পড়াশোনা একদমই পছন্দ ছিল না।
উনার তো লোভ ছিল আমার দাদা ভাইয়ের সম্পত্তিতে ওপর। তাই শহরে যাওয়ার কিছুদিন পরই গ্রামে ফিরে আসেন। দাদা ভাইয়ের থেকে সমস্ত জমি জমা বুঝে নেন আর সেখানেই রাজত্ব করতে শুরু করেন।
গ্রামের মানুষদের চাচা যা বলতেন তারা ও সেটা মুখ বুজে সহ্য করতেন। ভুল বোঝালে ভুল বুঝত ঠিক বোঝালে ঠিক। এতে চাচার বেশ সুবিধাই হয়েছে। নিজের কাজ তো ঠিকই করতে পারছেন।
এইভাবেই চাচা আর চাচী আমার নামে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে বেড়িয়েছেন পুরো গ্রাম জুড়ে। তারা পুরো গ্রামে ছড়িয়েছেন যে আমি একটা অশুভ মেয়ে। আমি তাদের গ্রামে থাকলে তারা সবাই শেষ হয়ে যাবে। আমি নাকি তাদের সবাই কে ধ্বংস করে দেবো।
চাচা আর চাচী আমাকে আর আম্মু কে গ্রাম বাসীদের হাতেই খু’ন করতে চান। সবাই কে ভুল বুঝিয়ে আমাদের কে মে’রে আমাদের সব সম্পত্তি তারা নিজের নামে নিতে চাইতেন।
সবকিছু শোনা মাত্র আমি আর একমুহুর্ত ও দেরি করি না। আম্মু কে নিয়ে ওইদিনই সবার অগোচরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এরপর আম্মুকে নিয়ে শহরে চলে আসি। এখানে আমার ছোট বেলার বেস্ট ফ্রেন্ড তানি ছিল। যে আমার আর আমার আম্মুর খেয়াল খুব ভালো করেই রাখতে পারবে।
শহরে এসেই আমি কাজের খোঁজ করতে লাগি। তবে কোনো জায়গাই তেমন কাজ পাচ্ছিলাম না। কারণ আমার শিক্ষা গত যোগ্যতা ছিল খুব কম। আমি HSC পরীক্ষা টা ও দিতে পারিনি।
ইচ্ছা ছিল প্রফেসর হওয়ার কিন্তু সব কিছুই শেষ হয়ে গিয়েছে ততদিনে। এখন শুধু একটাই লক্ষ্য আমার আম্মু কে সুস্থ করে তোলা।”
ফায়াজ আবারো পরের পৃষ্ঠা উল্টাই।
“এতো ক’ষ্টে’র মাঝে ও আপনি এলেন আমার জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো। কালবৈশাখী ঝড়ে তাণ্ডবের পর যখন সব কিছু শান্ত হয়ে যায়, পরিবেশটা একদম শান্ত থাকে। আপনি ও আমার জীবনে এলেন কালবৈশাখী ঝড়ের পর সেই শান্ত আর মিষ্টি বাতাস হয়ে।
সেইদিন আমি আমার আম্মুর জন্য ঔষুধ কিনতে গিয়েছিলাম। আপনি রাস্তার একদম ধারে চলে গিয়েছিলেন। আপনার হাতে ছিল ব্লাইন্ড স্টিক।
বুঝতে পারলাম আপনি হয়তো দেখতে পান না। আপনি স্টিক টা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার মাঝখানে যেতে লাগলেন। রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে একটা গাড়ি আসছিল। তখন আমার বাবাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়।
বাবাই কে ও গাড়ি চাপা দিয়ে চলে গিয়েছিল আমার চোখের সামনেই। বাবাই কে সেইদিন বাঁচাতে পারিনি কিন্তু আপনাকে ঠিকই বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। আমি সব কিছু ফেলে দৌড়িয়ে যেতে লাগলাম আপনার কাছে। হাত ধরে টান দিয়ে সরিয়ে আনলাম আপনাকে। আর আমার চোখের সামনে থেকে গাড়িটা সাই সাই করে চলে গেলো।
তখন আপনার এক বন্ধু এসে আপনার নাম ধরে ডাকে। সেখান থেকেই জানতে পারি আপনার নাম ফায়াজ। আপনাকে দেখা মাত্রই মনের মধ্যে এক অজানা অনুভূতির ঢেউ খেলে যায়।
বাড়ি ফিরে সব সময় আপনার মুখটা চোখের সামনে ভাসতে শুরু করে। এইভাবেই দিন চলছিল আমার।
এরপর হঠাৎই একদিন আমি আপনাকে দেখলাম আপনি সেই রেস্টুরেন্টে এলেন যেখানে আমি কাজ করি। আপনি আপনার সেই বন্ধুর সাথেই বসে বসে গল্প করেছিলেন। তখন আমি শুনতে পাই যে আপনি চোখের অপারেশন করবেন।
আপনার কর্নিয়ার প্রয়োজন তবে কোথাও ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। আমার সেই সময় নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। নিজেকে এতটা ইউজলেস মনে হচ্ছিল যে কি আর বলবো।
না মায়ের খেয়াল রাখতে পারছি আর না নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে কোনো সাহায্য করতে পারছি। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। আপনাকে প্রথম দেখায় আমি খুব ভালোবেসে ফেলি। আপনাকে ও নিজের জীবনের একটা অংশ মনে করতে শুরু করেছিলাম।
হঠাৎ করেই আমার মাথাটা ব্য’থা করে উঠে। আমি বুঝতে পারি হয়তো আবারো কোনো ভিসন আসবে। আর আমার আন্দাজই ঠিক হলো। আপনাকে নিয়ে একটা ভিসন দেখলাম। আপনি একটা কবরের পাশে বসে কাঁদছেন।
এরপর আরেকটা ভিসন দেখলাম একটা গাড়ি আমাকে চাপা দিয়েছে। আমার র’ক্তা’ক্ত শরীর টা পড়ে আছে রাস্তার মাঝে। বুঝতে পারলাম হয়তো আমার সময় শেষ হয়ে আসছে। একটা মুচকি হাসি দিয়ে কাজ করতে শুরু করলাম।”
ফায়াজ আরো আগ্রহ নিয়ে পরের পাতাটা উল্টালো।
“বাড়ি পৌঁছিয়ে ডাইরি নিয়ে বসলাম। যেটা আজকেই কাস্টোমাইজ করে বানিয়েছি। আমার সময় হয়তো ফুরিয়ে আসছে। ডাইরি লেখাটা খুব দরকার ছিল।
সবকিছু আমি আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম। রেস্টুরেন্টে আপনাদের সব কথাই আমি শুনেছিলাম। আজকে আরো একটা কাজ করে এসেছি। হসপিটালে ডাক্তারের সাথে কথা বলে এসেছি।
আমার মৃ’ত্যু’র পর আমি সব কিছুই বিক্রি করে দেবো। তাতে যা টাকা হবে আমার আম্মুর হয়তো চলে যাবে। শুধু একটা জিনিস বিক্রি করব না আর সেটা হলো এই চোখ।
আমার ভালোবাসার মানুষটাকে আমি পৃথিবীর আলো দেখাতে চাই। আমি চাই সে আমার মাধ্যমেই পুরো পৃথিবী টাকে দেখুন উপভোগ করুক। অতি নগণ্য একটা উপহার আপনার জন্য রাখলাম। এটাই আমার ভালোবাসার মানুষটি কে দেওয়া আমার প্রথম আর শেষ উপহার।
সেই অনুযায়ী ২ দিন পর আপনার অপারেশনের ডেট পড়ে। আমি রেডি হয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ি। তানি কে আমি সবটা বলেছিলাম। ও সব শুনে প্রচুর কান্না করেছিল। এই কথা গুলো শুধু মাত্র আমার আর তানির মধ্যেই ছিল। আর আজকে আপনি ও জানলেন।
যদি কখনও সময় হয় একবার আমার কবর টা জিয়ারত করে আসবেন। আর পারলে একটু দোয়া ও করে দিবেন।”
সবটা পড়ে ফায়াজ ডাইরি টা বন্ধ করলো। বুঝল মেয়েটা তাকে খুব ভালোবাসতো। তার জন্য, নিজের মায়ের জন্য মেয়েটা নিজের জীবন কে ত্যাগ করেছে।
ফায়াজ উঠে আইরিনের রেখে যাওয়া ডাইরি দুইটা নিয়ে খুব যত্নের সাথে আলমারিতে তুলে রাখলো।
,,,,,,,,
ফায়াজ:- 𝐑𝐞𝐯𝐞𝐧𝐠𝐞 𝐨𝐟 𝐍𝐚𝐭𝐮𝐫𝐞 বলে পৃথিবীতে কিছু একটা আছে জানো তো চাঁদ। যারা যারা তোমার সাথে অ’ন্যা’য় করেছে তাদের কেউই এখন ভালো নেই। তোমার চাচা চাচী আর তার মেয়েরা কেউই ভালো নেই জানো তো চাঁদ। তোমার চাচার পুরো শরীরের পচন ধরেছে। ব্য’থা’য় সারাটা দিন কাতরাচ্ছে। তোমার ঐ অমানুষ চাচী সিঁড়ি থেকে পড়ে দুই পায়ের হাড় ভেঙ্গে পড়ে আছে। ঐ মহিলা ও ব্য’থা’য় কাতরাচ্ছে। যেই মেয়েদের জন্য উনারা এতো সম্পদ গড়েছে সেই মেয়েরাই এখন আর তাদের দেখে না। সব সম্পত্তি নিয়ে তাদের কে এক কুড়ে ঘরে ফেলে এসেছে। কোনো রকমে দিন যাচ্ছে তাদের। আর তোমার চাচাতো বোনেরা ও ভালো নেই। ওদের স্বামীরা ওদের থেকে সব সম্পত্তি নিয়ে বিক্রি করে রাস্তায় বসেছে। ওদের কারোর জীবনেই এখন আর সুখ নেই।
আইরিন:- আপনি এসেছে আমার কবর জিয়ারত করতে।
ফায়াজ পিছনে ঘুরে চোখ মুছে আইরিন কে বলে,
ফায়াজ:- রোজ নিয়ম করে এই তিনটা ব্যক্তির কবরই তো আমি জিয়ারত করি। এখন আমার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইরিন:- বিয়ে করবেন না.?? এইভাবে একা একা চলা যায় না তো।
ফায়াজ:- মানুষ চাইলে সবই পারে আর বিয়ে করলে কি আমার মনের দুঃখ গুলো ঘুচে যাবে..!! কখনোই যাবে না। আর আমি চাই ও না যে সেই দুঃখ গুলো ঘুচে যাক। আমি এতেই বেশ আছি।
আইরিন:- রোজ ডাইরি গুলো পড়েন তাইনা..!!
ফায়াজ মুচকি হেসে বলে,
ফায়াজ:- ঐ ডাইরি দুইটাই তো তোমার ছোঁয়া আছে। ঐ ডাইরি দুইটা পড়লে আমি তোমাকে ফিল করতে পারি।
আইরিন হালকা হেসে বলে,
আইরিন:- রোজ একি ডাইরি পড়তে ভালো লাগে আপনার..??
ফায়াজ:- ভালো লাগে বলেই তো পড়ি।
আইরিন:- আপনি ভালো আছেন তো..??
ফায়াজ:- হুম দিব্যি আছি। এই যে রোজ তোমার ডাইরি দুইটা পড়ি, তোমাদের কবর জিয়ারত করতে আসি। সত্যি আমি খুব ভালো আছি।
আইরিন:- মৃ’ত মানুষ কে কি কেউ ভালোবাসে..!!
ফায়াজ:- হয়তো বাসে না। সবাই তো তাদের প্রিয়জনের মৃ’ত্যু’র পর তাদের কে ভুলে যায় কিন্তু আমি না ভুলি নি। যত দিন যাচ্ছে ততই তোমার স্মৃতি গুলো প্রখর হচ্ছে। কাউকে না ছুঁয়ে, কাউকে না দেখে ও যে ভালোবাসা যায় সেটা আমি এখন হারে হারে টের পাচ্ছি গো চাঁদ। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি ভালোবেসে যাবো তোমাকে চাঁদ।।
~~~সমাপ্ত~~~