গল্প: অন্তরের স্পর্শ (০২)

লেখিকা: আয়াত বিনতে নূর

পর্ব:০২


রাত প্রায় সাড়ে দশটা ছুঁই ছুঁই।
শহরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা।গাড়িটি শেখ বাড়ির বড় গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
গাড়ির ভিতরে তানভীকা চুপচাপ বসে আছে—
হাত দুটো আঁকড়ে ধরে আছে নিজের ওড়নার কোণা।
মুখে ভয়ের ছাপ এখনও মিলিয়ে যায়নি।
চোখদুটি লাল—যেন বহুক্ষণ কান্না চেপে রেখেছে।
ফাহিম আয়নায় তাকিয়ে ওর মুখটা দেখছিল।
বোনটা সাধারণত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি।
আজ তার ঠোঁট শুকনো,
চোখে এক ধরনের আতঙ্ক।

ফাহিমের কণ্ঠ নরম হয়ে গেল—
— “তানভী, তুই কিছু বলবি? এভাবে চুপচাপ আসিস কেন?”

তানভী মাথা নিচু করে, খুব আস্তে বলল—
— “ভাইয়া… আমি ঠিক আছি।”

কিন্তু সে যে ঠিক নেই—
ফাহিম হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল।
ওর এই আচরণ স্বাভাবিক না।
তানভী তো এমন না—একটু কিছু হলেই কথা বলে, হাসে, বোঝায়।
আজ সে কেমন যেন গুটিয়ে আছে…
যেন নিজের ভেতরে লুকিয়ে গেছে।

একটু পরে ফাহিম আবার বলল—
— “তুই ভয় পেয়েছিস, তাই না?”

তানভী শুধু মাথা নেড়ে বলল—
— “হুঁ…”

গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
ড্রাইভারও কিছু বলছে না—
কিন্তু সেও আয়নায় দেখে বুঝতে পারছিলো তানভী খুব ভয় পেয়েছে।


গাড়ি গেট দিয়ে ঢোকার সাথে সাথেই মালিহা শেখ,
তানভীকার মা, দৌঁড়ে বেরিয়ে এলেন।
মালিহার চোখে ভয়, উদ্বেগ—
মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন দম ফেলে অপেক্ষা করছিলেন।
গাড়ির দরজা খোলা মাত্রই তিনি তানভীকার হাত ধরে টেনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।

— “তানভী মা… কোথায় ছিলি? এত দেরি? কিছু হয়েছে? আল্লাহ! !”

তানভী কিছু বলতে না পেরে কেবল মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফেলল।সেই স্পর্শে তার বুকের মধ্যে জমে থাকা ভয় হঠাৎ আবার জেগে উঠলো।
মালিহা গলাটা কাঁপিয়ে বললেন—
— “ফাহিম বলল তুই হসপিটালে । তোকে কে নিয়ে গেল মা? এতো রাতে কী হয়েছিল?”

এই প্রশ্নেই তানভীর ভিতরটা হঠাৎ কম্পিত হলো।
কারণ সে জানে—
যদি আজ রাতের ঘটনা একটুও জানানো হয়,
তাহলে পরিবারের সবাই কেঁপে উঠবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
সে চাইছে না সেই ছেলেগুলার কথা কেউ জানুক।
মেয়েটি চোখ নিচু করে বলল—
— “মা, মাথা একটু ঘুরে গিয়েছিল… রাস্তার পাশে পড়ে গিয়েছিলাম। কেউ একজন হাসপাতালে নিয়ে যায়। এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।”

মালিহা সন্দেহভরা চোখে তাকালেন।
কারণ তানভীর গলার স্বরটা স্বাভাবিক ছিল না।
পালসেও যেন ভয় লেগে আছে।

তবুও তিনি মেয়েকে আর চাপ দিলেন না।
— “ঠিক আছে মা, আজ আর কিছু বলিস না। তুই খুব ক্লান্ত। যা, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়।”

তানভী আস্তে মাথা নেড়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল।


— রাত ১১:৪০ রুমের দরজা বন্ধ করতেই
তানভী শ্বাসটা ভারি হয়ে উঠলো।
চারিদিকে গভীর নীরবতা—
কিন্তু তার বুকের ভেতর ঝড় বইছে।

হাসপাতালের সেই মুহূর্ত…
অচেতন অবস্থায় থাকা…
ধূসর বাদামি চোখের সেই যুবক…
তার কোলে মাথা…তার খটখটে কণ্ঠ…
সবকিছু মিলিয়ে যেন বুকের মধ্যে এক অস্থির কাঁপুনি।
বিছানায় বসে তানভী নিজের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলো, যেন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।

— “আমি কেন এতো ভয় পাচ্ছি?”
নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।

কিন্তু তার বুকের ভিতর আরেকটা প্রশ্নও ছটফট করছে—
“ও কে ছিল?”

ওর চোখের রঙ… মুখের কঠোরতা…
অচেনা, কিন্তু নিরাপদ লাগা এক অনুভূতি…
তার মনে হলো—
যেন কোথাও আগে দেখেছে তাকে। স্বপ্নে? নাকি অতীতে?

কিন্তু নিজেকে ঝাড়লো সে।
না… অতীত মানে তো কেবল—
১৩ বছর আগের সেই রাত।সেই অসম্পূর্ণ, অন্যায় বিয়ে।সেই রাতের কান্না।
সেই ছেলেটির চলে যাওয়া।
তারপর আর কিছু নেই।

সে মাথা নাড়িয়ে উঠতে যাচ্ছিল,
ঠিক তখনই দরজায় টোকা।

— “তানভী? ঘুমাস নাকি?”

রিহানের কণ্ঠ।
তানভী দরজা খুলতেই রিহান সন্দেহমিশ্রিত চোখে তাকাল।

— “তুই ঠিক আছিস তো? আজকে যা ঘটেছে… আমি জানি কিছু একটা ঠিক হয়নি।”

তানভী কষ্ট করে হাসল।
— “ঠিক আছি ভাইয়া।”

রিহান ভ্রু কুঁচকে বলল—
— “আগামী এক সপ্তাহ আমি নিজে তোকে কলেজে দিয়ে আসব। তুই একা কোথাও যাবি না।”

তানভী চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। রিহান চলে যেতেই তানভীকা দরজা লাগিয়ে ব্যাডে গিয়ে আজকের সকল ঘটনা গুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো।


অন্যদিকে বিলাস বহুল একটা হোটেলে রিদওয়ান আহিল শেখ। শীতল মুখে সোফায় বসে আছে। হ্যাঁ সেই ধুসর বাদামী চোখের মালিক আর কেউ নয় সেই লোকটি হলো। রিদওয়ান আহিল শেখ।
রিদওয়ানের হাতে সেই ছোট কাগজ—
যা তানভী হাসপাতালের নার্সের হাতে দিয়ে গিয়েছিল।
একবার, দু’বার…
সে সেই ছোট্ট লাইনগুলো পড়ছে।
“আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।”

এত ছোট একটি লাইন—
কিন্তু রিদওয়ানের বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা টান তৈরি করে দিয়েছে।

তার মনে বারবার সেই মেয়েটির মুখ ভেসে উঠছে—

লাল পোশাক…
টানাটানা হরিণী চোখ…সুন্দর চুল…
অচেতন মুখে নিরপরাধ শান্তি।

হঠাৎ মনটায় সাঁড়াশির মতো একটা চিন্তা চেপে বসল।
— “না… এটা কি সত্যি হতে পারে?”

১৩ বছর আগের সেই রাত…
সেই ছোট্ট মেয়েটি…তার চোখেও ছিল এমন আলো…

কিন্তু সে নিজেকে ঝারলো—
— “না, এটা কাকতাল। সেই মেয়েটা এত সহজে সামনে আসবে না।”আর ওই মেয়েকে আমি ছাড়ব না, যেই কাজটার জন্য বাংলাদেশে আসা সেই কাজটার দিকে ফোকাস করতে হবে।

তবুও…
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
যেন ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ ড্রাইভার ফোন করে বলল—
— “স্যার, আগামীকাল সকালে আপনি যে জায়গায় যেতে বলেছিলেন… সেটার ঠিকানা ঠিক আছে তো?”

রিদওয়ান ব্যালকানি -তে দাঁড়িয়ে নিচের শহরটা দেখছিল।
মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

— “হ্যাঁ। শেখ বাড়ির উউদ্দেশ্যে যাব। তাই রেডি থেকো।

ড্রাইভার অবাক—
— “আপনি ওদিকে যাবেন?”

রিদওয়ান আস্তে বলল—
— “হ্যাঁ। সেইটা তোমার না জানলেও চলবে নিজের কাজে মন দেও। ”

এইবলে ফোন রেখে দেয়।
“আমি আসছি খুব তাড়াতাড়ি “দীর্ঘ ১৩ বছরের হিসাব বাকি।
এই বলে বাকা হেসে ফোন রেখে দেয়।

………

চলবে…..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments