গল্প:চেইন্ড বাই ডেস্টিনি(০১)

ভার্সিটির গেইট পেরোতে শুরুতেই ভেতরে একটা বড় ঝটলা দেখা যায়। সেখানে একটা মেয়ে একটি ছেলের চুল ধরে টানাটানি করছে। এমন কাহিনী দেখে অন্যান্য স্টুডেন্টরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ভার্সিটির অন্যতম সুদর্শন ছেলের চুল ধরে টানাটানি করছে সদ্য ভর্তি হওয়া একটা ফ্রেশার্স মেয়ে। এ-ও কি ভাবা যায়!

একটু আগের ঘটনা….

” হেই মিস. ট্রাবলবান, হোয়াটস আপ? “

ভার্সিটি গেইট পার হতেই এমন ডাক শুনে রায়া আশেপাশে তাকায়। গেইট দিয়ে মাত্র সে-ই প্রবেশ করলো। তার মানে তাকেই ডাকা হয়েছে। আজই তার ভার্সিটির প্রথম দিন। মাত্রই বাবা তাকে গেইটে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গেলো। আর সে পরম আনন্দ নিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে যাচ্ছিলো। তখনই তার ডাক পরায় সে থমকে দাঁড়ায়। আশেপাশে তাকালে কিছুটা দূরেই একদল ছেলেমেয়েকে দেখতে পায়। দেখেই বুঝা যাচ্ছে এরা সিনিয়র। নিশ্চয়ই র্যাগ দেওয়ার জন্যই ডাকছে তাকে। রায়ার মনটা খারাপ হয়ে যায়। প্রথমদিনই তাকে এসবের সম্মুখীন হতে হলো!
তবে ‘ট্রাবলবান’ ডাকটা শুনে তার একটু সন্দেহ হয়। তাকে তো একজন ছাড়া আর কেউ এই নামে ডাকে নাহ।

তখনই রায়া একটু ভালোভাবে সিনিয়রদের দলটার দিকে তাকায়। আর যা ভেবেছিলো তাই। তাদের মধ্যে লিডার হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখেই রায়ার রাগে গা জ্বলে উঠে। ছেলেটা বাড়িতে, রাস্তায় আর শেষে এখন ভার্সিটিতেও তাকে জ্বালানো শুরু করেছে!

নাইফান খান নাফি, ভার্সিটির অন্যতম সুদর্শন স্টুডেন্ট। ভার্সিটিতে তার বেশ প্রতিপত্তি রয়েছে। সর্বদা একটা গ্রুপ নিয়ে চলাচল করে। তার সেই গ্রুপে রয়েছে কতগুলো নামধারী অসভ্য ছেলেপেলে। সুদর্শন বলেই নাফি মেয়েদের পছন্দের তালিকায় আছে। নয়তো নাফির কথার স্টাইল দেখে একটা মেয়েও তার ধারের কাছে আসতে চায় নাহ। সে কখনো কারও কথা ছাড়ে নাহ। সবসময় সকল কথার ধারালো উত্তর দিয়ে ছাড়বে। তাই অপমানিত হওয়ার ভয়ে মেয়েরা সহজে তার ধারের কাছে আসে নাহ। এখন পর্যন্ত যারাই নাফির কাছে ভালেবাসার কথা বলতে গিয়েছে, তারাই অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছে। এই নিয়ে ভার্সিটিতে নাফির বেশ নেগেটিভিটিও রয়েছে।

রায়া নাফির ডাককে পাত্তা না দিয়ে সোজা নিজের মতো করে ডিপার্টমেন্টের দিকে আগাতে থাকে। তবে এটা যেন নাফির একদমই পছন্দ হয় নাহ। সে পাশে থাকা তার বন্ধুর নিলয়ের দিকে তাকাতেই নিলয় হেড়ে গলায় পুনরায় রায়াকে ডাকে।
” এই মেয়ে, তোমাকে যে ডাকা হচ্ছে। শুনতে পাচ্ছো নাহ? বয়রা নাকি? “

এবার রায়া থামে। তারপর এদিকে তাকিয়ে সোজা তাদের দিকে এগিয়ে আসে। সরাসরি নাফির সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
” কি সমস্যা? ডাকছেন কেন? “

নাফি একটু মিচকে হেসে উত্তর দেয়,
” একটু খাতিরযত্ন করার জন্য ডেকেছি। ফ্রেশার্স বলে কথা। সিনিয়র হিসেবে তোমাদের খাতিরযত্ন করা তো আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। “

পরপরই রায়ার দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে,
” যতই হোক, আমার চাইল্ডহুড এনিমি বলে কথা। আই সুড গিভ ইউ এ প্রোপার ওয়েলকাম, মাই সুইট ট্রাবলবান। “

আবারও ট্রাবলবান? রায়ার মাথা গরম হয়ে যায়। সে কোন কথা ছাড়াই হটাৎই হাসতে থাকা নাফির মাথার চুল দুই হাতে আঁকড়ে ধরে কয়েকবার জোরে ঝাঁকি দেয়। নাফি ব্যাথা পেয়ে কোন রকমে দু’হাতে রায়ার দুই হাত চেপে ধরে। অতঃপর চিল্লিয়ে বলে,
” ইউ লেডি মন্সটার, তোর সাহস তো কম নাহ। আমার এত সুন্দর করে গোছানো চুলগুলো তুই এলোমেলো করে দিলি? “

রায়া তাতে একদমই ঘাবড়ায় নাহ। উল্টো নাফির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে,
” তোর মাথার চুল সবগুলোই ছিড়ে ফেলবো আমি৷ তুই আমায় ট্রাবলবান বললি কোন হিসেবে? তুই ট্রাবলবান, তোর চৌদ্দগুষ্টি ট্রাবলবান৷ “

রায়া যেভাবে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, যেন সুযোগ পেলেই নাফির একটা চুলও আর মাথায় রাখবে নাহ। নাফির এমন নাজেহাল অবস্হা দেখে নাফির বন্ধুরা সবাই ঘাবড়ে যায়। তারা ভাবতেও পারে নি, দেখতে সাধারণ গোছের একটা মেয়ের এমন রণচণ্ডী রুপ দেখতে হবে তাদের। তার উপর নাফির মতো ছেলেকে কিনা এভাবে নাজেহাল করে ফেলছে।
আবার নাফিও কেমন মেয়েটার থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য লাফালাফি শুরু করেছে। বন্ধুরা নিজেরা বাঁচতে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে যায়। না জানি মেয়েটা কখন তাদের উপরও আক্রমণ করে বসে। মান-সম্মানের ব্যপার বলে কথা।
ভার্সিটির গেইটের কাছে এতক্ষণে একটা বড়সড় ঝটলা পেকে গেছে। সবাই অবাক হয়ে দুটো ম্যাচিউর ছেলেমেয়ের হাতাহাতি করা দেখছে।
কিছুক্ষণের মাঝে রায়া ঝটকা মেরে নাফির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। সে নিজে কিছুটা পিছিয়ে যেতেই নাফির বন্ধুরা তার কাছে এগিয়ে আসে। নীলয় কন্ঠে অবাকের রেশ প্রকাশ করে বলে,
” দোস্ত, কে এই মেয়ে? তোর সাথে এমন ব্যবহার করার সাহস পেলো কোথা থেকে? “

পাশ থেকে সাঈম বলে, “মেয়ে তো নয়, পুরোই যেন এক ঝাঁঝ লবঙ্গ। “

নাফি বন্ধুদের কথার উত্তর না দিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে। সে চোখ রাঙিয়ে রায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। রায়া তাকে আঘাত করলেও সে পাল্টা কোন আঘাত করে নি। বরং নিজেকে বাঁচাতে রায়ার হাত চেপে রায়াকে সরানোর চেষ্টা করছিলো। তাই রায়ার কোন সমস্যা হয় নি। বরং সে নাফির চুল ধরো টেনে দিতে পেরেছে বলে আরও হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আশেপাশে কিছু স্টুডেন্টের ঝটলা পাকানো দেখে নাফি চিল্লিয়ে বলে,
” কি সমস্যা? সার্কাস চলছে এখানে? “

সবার মধ্য থেকে একটা ছেলে এগিয়ে এসে বলে,
” ভার্সিটির অন্যতম সুদর্শন ছেলে একজন ফ্রেশার্সের কাছ থেকে চুল টান খেলো। এটা কি সার্কাসের থেকে কোন অংশে কম নাকি! “

মুহুর্তের মাঝেই নাইফান সবার হাসির পাত্র হয়ে গেলো। ছেলেরা কয়েকজন জোরেই হেসে দেয়। মেয়েরাও হাসছে, তবে কয়েকজন আবার রায়ার উপর হিংসেও করছে। কারণ এখনও পর্যন্ত তারা নাফফানের ধারের কাছে পর্যন্ত আসতে পারে নি। সেখানে একটা নতুন মেয়ে এসে নাইফানের এত কাছে চলে গেলো। এমনকি এত সুন্দর চুলগুলোতে টাচও করে ফেললো। কি সাহস মেয়ের!

নাফি হটাৎই রায়ার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে,
” বাসায় আসবে নাহ আজকে! পরে তোমায় শায়েস্তা করবো আমি। তোমার জন্য আমায় এই সবার সামনে হাসির পাত্র হতে হলো। “

রায়া ভয় না পেয়ে পাল্টা জবাব দেয়,
” আপনার বাড়িতে আপনার থেকেও আমার সাপোর্টার বেশি৷ তাই বুঝে শুনে কাজ করিয়েন। আপনি ইট ছুড়লে আমি কিন্তু আপনার পরিবারকে সাথে নিয়েই উল্টো পাটকেল ছুড়ে দিবো। তারা কিন্তু আমাকেই সাপোর্ট করবে। “

” বড্ড তেজ নাহ তোমার! এই তেজ কিন্তু আমি ভেঙে গুড়িয়ে দিবো বলে দিচ্ছি। তুমি এখনও আমায় সম্পূর্ণ চিনো নি। ”
” আর আমিও হাতুরি নিয়ে প্রস্তুত আছি। যতবার আসবেন আমার তেজ ভেঙে গুড়ো করতে, ততবারই আমি পাল্টা আঘাত করবো। আমায় সেই ছোটবেলার মতো নাদান শিশু মনে করবেন নাহ। আপনার জীবনটাকে তেজপাতা বানিয়ে, সেই তেজপাতা দিয়ে চা বানিয়ে খেয়ে নেবো। জানেনই তো, তেজপাতা চা আমার কতটা ফেবারিট। “

” আর এটাও জানি, সেই তেজপাতা চায়ে তুমি দুধ মিশিয়ে খাও৷ হয়েছে, আর ভাব দেখাতে হবে নাহ। “

রায়া নাক ফুলিয়ে নেয়। নাফি জিতে গিয়ে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে চুলগুলো ঠিকঠাক করে নেয়। তারপর আগের মতো ভাব বজায় রেখে বলে,
” শুধু তো ডেকেছিলাম মাত্র, কোন যার্গ তো দিই নি। এখন দিবো। এসেই আমার উপর হাত তুললে নাহ, তার শাস্তিস্বরূপ তোমায় এখন একটা টাস্ক দেওয়া হবে, মিস ফায়ারক্রেকার। “

” আবার উল্টো পাল্টা নামে ডাকছেন আমায়। আমি করবোনা কেন টাস্ক পূরণ। কি করবেন আপনি? “

নাফি গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলে,
” আমি কিন্তু আগের কথা কিছুই ভুলি নি রায়া। তুমি…আমায়..কি যেন বলেছিলে? বলে দিই সবার সামনে? তারপর তোমার মানসম্মান থাকবে তো? “

রায়া পুরনো কথা মনে করে মিইয়ে যায়। নাক ফুলিয়ে তেজের সহিত বলে,
” কিসের টাস্ক? তাড়াতাড়ি বলুন। “

নাফি বিজয়ের হাসি দেয়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কলার উঁচিয়ে স্বশব্দে বলে,
” এখন পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে “নাইফান খান ইজ দ্য বেস্ট” এটা সাত বার জোড়ে জোড়ে বলতে হবে তোমায়। “

রায়া ভ্রু উঁচিয়ে কিছুক্ষণ নাফির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হটাৎই জোড়ে হেসে উঠে। কন্ঠে তেজ রেখে বলে,
” আপনার কিভাবে মনে হলো, আমি.. সিয়ারা ইসলাম রায়া, আপনার দেওয়া এই সিলি টাস্ক পূরণ করবো? ইট’স ইম্পসিবল। “

নাইফান তার মতোই ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
” বলবে নাহ তুমি? করবে নাহ এই টাস্ক পূরণ? “

” নাহ। করবো নাহ। কি করবেন আপনি? ”
কন্ঠে তার তেজ স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। রায়া তেজী হলে, নাইফানও কোন অংশে কম নাহ। সে হটাৎই রায়ার কাধ থেকে ব্যাগ টেনে হাতে নিয়ে নেয়। তারপর সেটা নিলয়ের দিকে ছুড়ে দেয়।

” টাস্ক পূরণ না করলে ব্যাগ পাবে নাহ। ব্যাগে নিশ্চয়ই ফোন সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আছে! টাস্ক পূরণ করো আর ব্যাগ নিয়ে চলে যাও। “

রায়া একটু মুচকি হেসে তার পড়নের কুর্তির একপাশে হাত গলায়। দেখা যায় কুর্তিতে একটা সাইড পকেট রয়েছে। সে সেখান থেকে নিজের ফোনটা বের করে নাইফানের দিকে উঁচিয়ে দেখায়। তারপর বিজয়ের হাসি হেসে বলে,
” ব্যাগে একটা খাতা আর কলম ছাড়া আর কিছুই নেই। ওসব আপনার কাছেই রেখে দিতে পারেন৷ প্রয়োজনে ব্যবহারও করতে পারেন। আমার ওসবের আর কোন প্রয়োজন নেই। আর হ্যাঁ, সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে। দেখবো আমার তেজ কমাতে আপনি কোন পদ্ধতি ইউস করেন। “

এক দাম্ভিক হাসি হেসে রায়া ফোন আবারও পকেটে ডুকিয়ে ডিপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পেছন থেকে সবাই রায়াকে দেখতে থাকে। এতটা তেজ নিয়ে সে নাইফান খানকে হারিয়ে দিয়ে চলে গেলো!

একমাত্র নাফির মুখেই একটা বাঁকা হাসি লেগে আছে। সে বিরবির করে বলে,
” ওকেই মিস. স্পাইসি পিক্সি। এতদিন যুদ্ধটা ঘরের ভেতর ছিলো। এখন সেটা ঘর পেরিয়ে ভার্সিটি অব্দি পৌছে গেছে। স্হান বদলেছে, তবে তোমার তেজ আর কমলো নাহ। ব্যাপার নাহ, যুদ্ধের ধরণ হয়তো বদলাবে, তবে পুরোপুরি থামবে নাহ। নতুনভাবে না হয় এই নামহীন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া যাক৷ “

চলবে………

(ছোট্ট করে লিখে ফেললাম। রেসপন্স পেলে কন্টিনিউ করবো। নয়তো নাই😐
যারা নাওরাকে পরেছেন, তারা নাওরার ঘাউরামি সম্পর্কে ভালেই জানেন। তবে এই নায়িকা হবে নাওরার থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সো নাওরার উপর দিয়ে যাবে।)

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x