
লেখিকা: জান্নাত রাহমান হৃদি
পর্ব:০১
তুষার ভাইকে আমরা সবাই চিনি ম্যাচমেকার নামে। এলাকার সিনিয়র অথবা জুনিয়র যে কেউ কোনো মেয়ে পছন্দ করলে তাদের প্রেম করিয়ে দেওয়ার মতো গুরু দায়িত্ব টা তিনিই নেন। তুষার ভাই দাবি করেন; প্রেম আসে স্বর্গ থেকে, প্রেম পবিএ,তাই এই প্রেমের ঘটকালি করায় উনার নাকি সওয়াব হয়। যদিও প্রেম করিয়ে দেওয়ায় সওয়াব পাওয়া যায় এমন ধরণের হাদিস এখন পর্যন্ত তন্য তন্য করেও কোথাও খুঁজে পাইনি আমি। যেটা পেয়েছি সেটা হলো, বিয়ের ঘটকালি করলে সওয়াব পাওয়া যায়। তুষার ভাই বিয়ের ঘটকালি করলেও মানা যেতো। কিন্তু ব্যাটা বজ্জাত লোকটা তা করছে না। করছে পাপের কাজ। আর সে পাপ কাজ করেও, গর্বের সহিত দাবি করছেন প্রেমের ঘটকালি করা সওয়াবের কাজ।
বিনা পারশ্রমিকে ঘটকালি করলেও হতো। কিন্তু এই লোক প্রত্যেকটা ঘটকালির জন্য দু হাজার টাকা পারশ্রমিক নেন। এছাড়াও যতদিনে প্রেম ঘটানোর কার্য সম্পন্ন না হয়, ততদিন পর্যন্ত বাইকের তেলের খরচ থেকে সিগারেট, চা নাস্তা সব হাতায় উক্ত গ্রাহকের থেকে। গ্রাহকই বলছি আমি। এর থেকে ভালো শব্দ আপতত আমার মাথায় আসছে না। আর আমার মনে হয়; গ্রাহক শব্দটাই ঠিক আছে। তুষার ভাই হলেন ব্যবসায়ী। আর যে লোকগুলো তার কাছে প্রেম করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব গুলো নিয়ে আসে তারা হলো গ্রাহক। সে যাই হোক! এই লোকের উপর আমার চাপা ক্ষোভ রয়েছে একটা। কলেজের এক সিনিয়রকে পছন্দ হয়েছিল আমার। প্রেম করার ও সাধ জেগেছিল খুব। ওমন সুদর্শন ছেলের সঙ্গে প্রেম করতে চাওয়ার সখ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কি সুন্দর গলা তার। কলেজের অনুষ্ঠানে গান গাইতে উঠলে হাবাতের মতো তাকিয়ে থাকতাম আমি। নজর ফেরাতে পারতাম না। ছেলেটার জন্য উথাল পাথাল প্রেম জাগলো আমার মনে। প্রেম রোগটা যখন তুমুল বেগে আমাকে আকড়ে ধরলো, তখন আমি উপায়ন্তর না পেয়ে শরণাপন্ন হয়েছিলাম তুষার ভাইয়ের কাছে। গিয়ে খুব ব্যথিত গলায় বললাম, ‘তুষার ভাই আমাকে প্রেম রোগে পেয়েছে! কি করি বলুন তো?’
তুষার ভাই নির্বিকার কন্ঠে জবাব দিলেন,‘ কি আর করবি? প্রেম রোগে ধরলে প্রেম করা ছাড়া তো উপায় নেই আর!’
‘সেই প্রেমটাই তো করতে পারছি না। লাজ লজ্জার কারণে সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও পারছি না পছন্দের মানুষটার। আপনিই বলুন একটা মেয়ে হয়ে একটা ছেলেকে আগে গিয়ে প্রপোজ করাটা নির্লজ্জতা হয়ে যায় না?’
‘তা হয় বটে।’
উনাকে এবার বিনতি কন্ঠে বললাম, ‘আপনি কি আমার প্রেমের ঘটকালি টা করে দিতে পারবেন তুষার ভাই?’
তুষার ভাই কেমন জানি আঁতকে উঠে বললেন, ‘মেয়ে মানুষের ঘটকালি? মেয়ে মানুষের জন্য ঘটকালি তো আমি কোনোদিন করিনি মানসী। আমি ঘটকালি করি শুধু ছেলেদের। মানে মেয়ে পটিয়ে দিই। ছেলে পটানোর কাজ করিনি কখনো।’
আমি খুব অননুয় বিনয় করে তখন বললাম, ‘ আগে না করলে কি হয়েছে তুষার ভাই? আমার জন্য এবার করেন প্লিজ। এতে আপনার অভিজ্ঞতাও হবে। প্লিজ, প্লিজ তুষার ভাই। আমি না আপনার বোনের মতো? আমাকে এ বারের মতো এ প্রেম রোগ থেকে বাঁচিয়ে তুলুন প্লিজ।’
আমার আকুতি মিনতি দেখে শেষমেষ ভেবে চিন্তে রাজি হলেন তুষার ভাই। বললেন, ‘আচ্ছা তোর জন্য না হয় করে দিবো, কিন্তু..’
-‘কিন্তু কী?’
-‘টাকার পরিমানটা একটু বেশি লাগবে!’
-‘কত টাকা লাগবে?’
-‘বেশি না চার হাজার হলেই হবে।’
টাকার এমাউন্ট শুনেই মুখ চুপসে গেলো আমার। বললাম, ‘আমার বেলায় ডাবল কেনো তুষার ভাই?’
‘কারণ মেয়েদের ঘটকালি এই প্রথম বুঝিস ই তো।’
আমি কর টিপে গুণে দেখলাম বাবার পকেট মারা টাকা, টিউশনী ফাঁকি দেওয়া টাকা, সব মিলিয়ে বাইশ’শ টাকা হাতে আছে আমার। মুখ মলিন করে বললাম, ‘টাকা কি কাজ হয়ে গেলে দিতে হবে?’
তুষার ভাই বললেন,
‘না সেটা অন্যদের থেকে নিই! আর মেয়ে পটানো আমার বা হাতের খেল। তাই ওটা অনেক ইজি কাজ। তবে তোরটা একটু কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। তাই ফুল পেমেন্ট ও আগে করতে হবে তোকে।’
‘তুষার ভাই, অগ্রিম দুই হাজার টাকা দিলে হবে? বাকিটা কাজ শেষ হলে দিবো হ্যা? আমার হাতে এখন দু হাজার-ই আছে।’
তুষার ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে তোর মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নিলাম তোর কথা। দু হাজার-ই দে এখন।’
তুষার ভাইয়ের কথা শুনে গদগদ হয়ে এক দৌড়ে গিয়ে বাসা থেকে কচকচে নোটের দু হাজার টাকা এনে হাতে তুলে দিলাম তার। মনে কেমন জানি আমার শত শত প্রজাপতি ডানা মেলে উড়তে লাগলো। এবার প্রেমের সাধ নিতে পারবো সেই আনন্দে। আহা আমিও এবার জানবো প্রেম কি? সে কি মাথায় দেয়? না গুলে খায়? আনন্দে রাতে ঠিকঠাক ঘুমও হলো না আমার। পরের দিন সকালে উড়ু উড়ু মন নিয়ে ক্লাসে গেলাম। ওয়াহিদ কে দেখলাম মাঠে বন্ধুদের নিয়ে বসে বসে গল্প করছে। আমি তার দিকে তাকাতে তাকাতে ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ধরাম করে বারি খেলাম একটা। কপাল ফুলে উঠলো আমার। অথচ ব্যথাটা টের ও পেলাম না মনে হলো, আহা ইহাই মনে হয় প্রেমে পড়ার ম্যাজিক, ব্যথাও ব্যথা মনে হয়না।
ওয়াহিদের বন্ধুরা আমার অবস্থা দেখে হেসে লুটোপুটি খেলো সবাই। ওয়াহিদ কে টিটকারি ও মারলো, তবে ওয়াহিদ নির্বিকার হয়ে রইলো, যেনো আমার মতো চুনুপুটিকে নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। ব্যাপারটায় আমার মন খারাপ হলো একটু। আমার কপাল ফুলে উঠেছে দেখেও মায়া হলো না তার? সেদিন বাড়ি এসে গোসল সেরে ছাঁদে উঠতেই দেখতে পেলাম ওপাশের ছাঁদে দাঁড়িয়ে তুষার ভাই ব্রাশ করছেন। আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, ‘তুষার ভাই আপনি এই বিকেল বেলা ব্রাশ করছেন কেনো?’
‘আর বলিস না মানসী। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করতে মনে ছিল না। একটু আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম দাঁত গুলো হলুদ লাগছে। তাই এখন ব্রাশ করছি!’
আমি চোখ মুখ খিচে বললাম,‘ইয়াক ছিহ! আপনি তো প্রচন্ড গিদর টাইপের লোক।’
‘ইয়াক ইয়াক করিস কেনো? তুই জানিস আমি কত ব্যস্ত লোক? কাজের চাপে নিজের যত্ন নিতেও ভুলে যাই।’
‘আপনার আর কাজ কি ঐ প্রেম ঘটকালি ছাড়া। আর তুষার ভাই, আপনি কি কাজের চাপে ছুচু করতেও ভুলে যান?’
তুষার ভাই আমার কথায় মুখ গম্ভীর করলেন। বললেন, ‘তুই কি বলতে চাইছিস মানসী? আমি বিশেষ কাজ সেড়ে পানি ইউস করিনা?’
‘আমি তো তা বলিনি ভাই। শুধু বললাম যে ভুলে যান কি-না।’
তুষার ভাই শক্ত কন্ঠে বললেন, ‘না যাই না!’
‘ও তাহলে তো ভালো!’
‘হ্যা ভালোই। আর ছুচু না করলেও বিশেষ একটা অসুবিধা দেখছি না আমি। বিদেশের বড় বড় লোকেরা বছরেও ছুচু করে না জানিস তুই? তারা শুধু টিসু ইউস করে।’
‘ইয়াক থু!’
তুষার ভাই আর কোনো কথা বললেন না। তিনি পুনরায় তার দাঁত ঘষে সাঁদা বানানোর কাজে মনোনিবেশ করলেন। আমি তাকে কিছুক্ষন পর্যবেক্ষন করে বললাম, ‘তুষার ভাই, আপনি কি ওয়াহিদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?’
তুষার ভাই যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। এমন ভাব করে বললেন, ‘ওয়াহিদ টা কে?’
‘আরে কাল যার কথা বললাম। মনে নেই আপনার?’
‘ও হ্যা হ্যা মনে পড়েছে। তার সাথে কথা বলবো কি? তুই তো বায়োডাটাই দিলি না। সন্ধায় আমার হোয়াটস অ্যাপে তার বায়োডাটা পাঠিয়ে দিস। আমার হোয়াটস অ্যাপ নম্বর আছে তো নাকি?’
‘তা আছে।’
‘থাকলে আর কি? পাঠিয়ে দিস। আমি কালকেই কাজে লেগে যাবো। টাকা খেয়েছি তোর, বেইমানি তো করতে পারি না। তাইনা?’
আমি মাথা নাড়লাম। ‘না পারেন না।’
‘সেটাই! তুই কোনো টেনশন নিস না মানসী। মনে কর তোর কাজ হয়ে গিয়েছে।’
‘আচ্ছা টেনশন নিবো না।’
তুষার ভাই এবার বললেন, ‘এই খুশিতে তাহলে একটু চটপটি বানিয়ে খাওয়া না মানসী। তোর হাতের চটপটি টা মজা হয় অনেক।’
শুরু হয়ে গেছে লোকটার আবদার। তার কাছে ঘটকালি নিয়ে আসার দ্বিতীয় ধাপেই তিনি এই ছেছড়ামিটা শুরু করেন সবার সাথে। আমি দাঁতে দাঁত পিষে মেকি হেসে বললাম, ‘এখন চটপটি বানাতে বললে কি বানানো যায় তুষার ভাই? চটপটির ডাল আগে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তা তো রাখিনি। আপনাকে অন্য একদিন খাওয়াবো। কিছু মনে করবেন না।’
‘না না কি মনে করবো আর।’
আমি লোকটার সঙ্গে কথা বাড়ালাম না আর। নিচে চলে এলাম। কলেজ থেকে কতগুলো এসাইনমেন্ট দিয়েছে আজ। সেগুলো নিয়ে বসলাম। একটু পরেই মনে এলো তুষার ভাইকে বায়োডাটা পাঠানোর কথাটা। এসাইনমেন্টের খাতা উল্টে পাল্টে আমি ফোন খুঁজলাম। হোয়াটস অ্যাপ খুলে তুষার ভাইয়ের ইনবক্সে ঢুকলাম। বায়োডাটা লিখলাম,
নাম: ওয়াহিদ মূর্তুজা,
ডাকনাম:ওয়াহিদ,
উচ্চতা:জানিনা,
ঠিকানা: জানি না,
নম্বর:জানিনা,
ছবি:নেই,
কলেজ: বাগেরহাট পি:সি কলেজ,
ক্লাস:এইচএসসি পরীক্ষার্থী,
গ্রুপ: কমার্স,
টেক্সট টা পাঠিয়ে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম তুষার ভাইয়ের রিপ্লাই আসার। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে নখ খুটছি আর অপেক্ষা করছি। তুষার ভাইয়ের রিপ্লাই এলো টানা পনেরো মিনিট পরে। তিনি লিখলেন, ‘মাথামোটা এটা কেমন বায়োডাটা দিয়েছিস? সব জানি না, জানি না।’
আমি তাৎক্ষনিক রিপ্লাই দিলাম। ‘তা, না জানলে কি বলবো?’
‘তোর ঘটকালির দায়িত্ব নিয়েই ভুল করেছি আমি, গাঁধা কোথাকার।’
‘এমন কথা বলবেন না তুষার ভাই। আপনি না থাকলে কি হবে আমার বলুন তো? নাম বলেছি না আপনাকে? পি:সি কলেজে গিয়ে নাম ধরে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।’
‘হ, এখন আমি জনে জনে ধরে ধরে প্রশ্ন করবো যে ওয়াহিদ মূতুর্জা কে?’
আমি দাঁত কেলিয়ে বললাম। ‘একটু করলেন না হয়? আপনার কি এতে বেশি এনার্জি যাবে? আপনাকে আমি সেলাইন গুলে খাওয়াবো তুষার ভাই।’
তুষাড় ভাই আমার ম্যাসেজটা সিন না করেই অফলাইন হলেন। তার রিপ্লাই পাওয়া গেলো টানা দুদিন পরে। ‘তোর ওয়াহিদকে পেয়েছি এই কথাটা বলেই অফলাইন হলেন তিনি আবার। আমি তার অনলাইন হওয়ার ধৈর্য্য ধরতে পারিনি আর। চলে গেলাম তার বাসায়। দরজা খোলাই ছিলো। আন্টিকে দেখলাম পাকের ঘরে। আমি সেই ফাঁকে সোজা তুষার ভাইয়ের রুমে ঢুকে পড়লাম। তুষার ভাই তখন একটা ট্রাউজার পরে উদাম গায়ে রুমে বসে মোবাইল টিপছে। আমি তার দিকে বিশেষ একটা খেয়াল না দিয়ে বললাম, ‘আমার কথা বলেছেন আপনি?’
তুষার ভাই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘ না আজই তো পরিচয় করে এলাম। এক্ষুনি বলা যায়? কদিন পরেই বলবো।’
আমি তার কথা মেনে নিয়ে বাসায় চলে এলাম। তবে তুষার ভাইয়ের সেই ক’দিন পর আর শেষ হলো না। ইতোমধ্যে এক মাস কেটে গিয়েছে। তুষার ভাইকে প্রশ্ন করলে সে বলে, ‘ আরে বলেছি, হয়ে যাবে।’
কিন্তু কিছুই হয়না। তাই বাধ্য হয়েই আজ আমি ওয়াহিদকে গিয়ে প্রশ্ন করেছি। তুষার নামের কেউ আমার কথা আপনাকে বলেছে কি-না। জবাবে ওয়াহিদ বলল, ‘তুষার কে? তোমার কথা কি বলবে?’
ওয়াহিদের কথাটা শুনে যা বোঝার বুঝে গেলাম আমি। মুখ মলিন করে চলে এলাম ওয়াহিদের সামনে থেকে। বেশ বুঝতে পারলাম তুষার নামের ধান্দাবাজ লোকটা আমার টাকা গুলো মেরে দিয়েছে। সে থেকেই আমি ক্ষেপে আছি তার উপর। আজ হাতের কাছে পেলে হয়তো তার মাথায় ইট ভাঙবো নয়ত আমার টাকা উসুল করে ছাড়বো। অথচ সারা বিকেল খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পেলাম না আমি।
চলবে…