লেখিকা:সানজিদা আক্তার মুন্নী
পর্ব:০১
| সৎ বোনের বিয়েতে অতিথি হয়ে এসে,নিজেকেই সেই বোনের হবু স্বামীর নামে ‘কবুল’ পড়তে হচ্ছে আনভিকে। চোখের পলকে ঘটে গেল সব। আনভির সৎ বোন সারা, বিয়ের ঠিক আগমুহূর্তে নিজের প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গেছে। সে চিরকুটে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে এই বিয়ে সে করবে না। এদিকে আনভির বাবা যিনি একজন নামকরা বিজনেস টাইকুন আজ নিজের মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়ার ভয়ে ভীত। যে মেয়েকে তিনি সারাজীবন লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছেন, নিজের সন্তান হিসেবে সমাজ ও পরিবারের কাছে অস্বীকার করেছেন, আজ নিজের মুখরক্ষা করতে সেই আনভিকেই তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। আনভির যার সাথে বিয়ে হয়েছে, তিনি কোনো সাধারণ পুরুষ নন। তিনি বর্তমান বাংলাদেশের প্রতাপশালী, তরুণ প্রেসিডেন্ট। লোকমুখে যার নামের পাশে কেবল একটিই বিশেষণ জুড়ে দেওয়া হয় ‘স্বৈরাচার’। বিয়ের আসরে বসে আনভি কিছুতেই সমীকরণ মেলাতে পারছিল না। তার সৎ বোন সারা এত হ্যান্ডসাম একজন পুরুষ, তার ওপর স্বয়ং দেশের প্রেসিডেন্টকে পেয়েও কেন হাতছাড়া করল? কী এমন আছে ওই প্রেমিকের মধ্যে, যার জন্য সারা সব তুচ্ছ করে পালালো? হয়তো একেই ভালোবাসা বলে। অবশ্য আনভি এসব ‘হারাম’ ভালোবাসায় বিশ্বাসী নয়। আনভি তার পরিবারের সাথে থাকে না, সে সম্পূর্ণ আলাদা থাকে। আজ এসেছিল কেবলই সৌজন্য রক্ষা করতে। ভেবেছিল বিয়ে পড়ানো শেষ হলেই চলে যাবে। গত রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি, বাসায় গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দেবে। কিন্তু কে জানত, এক ফোঁটা ঘুমের বদলে তার জীবনের ঘুম আজ সারা জীবনের জন্য হারাম হতে চলেছে? বাবা তাকে খুব বেশি কিছু বলেননি, শুধু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে বলেছেন, “বাবা হিসেবে যতটুকু তোমার জন্য করেছি, তার বদলে আজ আমার সম্মানটুকু ফিরিয়ে দাও। আমি একজন বিজনেস টাইকুন। আমার বাড়ি থেকে আজ যদি প্রেসিডেন্ট বর সেজে বউ না নিয়ে ফিরে যান, তবে সমাজে আমার আর মুখ দেখানোর পথ থাকবে না। প্রেসিডেন্ট নিজের অপমানের প্রতিশোধ কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেবেন।” আনভির বিয়েতে রাজি হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। রাজি না হওয়া ব্যতীত উপায়ও নেই। তার জন্মের সময়ই তার মা আত্মহত্যা করেন কেন করেন, তা অবশ্য পরেই জানা যাবে। আনভির জন্মের পর তার বাবাই তাকে বড় করেছেন। তবে ‘বড় করেছেন’ বলতে শুধু টাকা-প পয়সা আর ঐশ্বর্য দিয়ে বাবা হিসেবে তিনি তার পাশে কখনোই ছিলেন না। আনভির খালামণিই আনভিকে বড় করেছেন, আর সব খরচ তার বাবা দিয়েছেন। আনভি যে বিখ্যাত বিজনেস টাইকুন মিস্টার ইয়াহিয়া দেওয়ানের মেয়ে, সেটাও কেউ জানে না। এবার বুঝে নিন, বাবার কাছে সে কতটা ‘গুরুত্বপূর্ণ’। আনভি উনার করা দয়াগুলোর হিসেব চুকাতেই বিয়েতে রাজি হয়েছে। অবশ্য রাজি হওয়ার সাথে এটাও বলে দিয়েছে, “এই শর্তের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ক শেষ। এতদিন আপনি খাইয়েছেন-পড়িয়েছেন, তার বিনিময়ে এই বিয়ে করলাম। এবার এই বিয়ে যদি নাও টেকে।” আনভির এ কথা শুনে মিস্টার ইয়াহিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আনভি দিতে দেয়নি। নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে বলেছিল, “আমার আর আপনার সম্পর্কটা শুধু রক্তের, আর কিছুর না। স্নেহের বা মমতার না। তাই মিথ্যা প্রেম দেখাতে আসবেন না। আমি আপনার অবৈধ সন্তানের মতোই।” ইয়াহিয়া নিজের হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। মেয়ের বলা কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে খাঁটি, তাই প্রতিবাদ করারও কোনো সুযোগ নেই। বিয়ে হওয়ার পর আনভি তার স্বামী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনানের দিকে এক পলক তাকিয়েছিল। আনভি তার চোখ-মুখে একরাশ রাগ আর শূন্যতা দেখেছিল। এটাই তো স্বাভাবিক। তার মতো একজন মানুষকে কেউ এভাবে রিজেক্ট করবে, তা কি কখনো ভাবা যায়? তার ওপর চেনা নেই, জানা নেই, দেখা হয়নি এমন একটি মেয়ের সাথে বিয়ে হয়ে গেল! আনভিকে ওয়াহেজ আগে দেখেনি আনভি বোরকা পরা অবস্থায় ছিল, চোখ-মুখ ঢাকা। ওয়াহেজের মা, বোন আর চাচি তাকে দেখেছেন এবং দেখার পর বিয়েতে সম্মতি দিয়েছেন। ওয়াহেজ হয়তো বিয়েতে রাজি ছিল না। আনভির মতে, কেবল সম্মান বাঁচাতে আর সমালোচনা এড়াতেই বিয়ে করে বউ বাড়ি নিয়ে ফেরা। বিয়েটা ধুমধামে হয়নি বিধায়, লোক জানাজানিও হয়নি বিষয়টা এখন পর্যন্ত। বাসর ঘরে বসে আনভি এসবই ভাবছিল। ফুল দিয়ে সাজানো ঘর, চারদিকে ‘ওয়াহেজ’ আর ‘সারা’ লেখা ফ্রেম, ক্যান্ডেল কত কিছু! যাদের জন্য এত আয়োজন, তাদেরই মিলন হলো না। মাঝখান দিয়ে ভাগ্য আনভিকে এই নিন্দার সংসারে ফেলল। ‘নিন্দা’ বলছি কারণ, ইবনান পরিবারের কেউ খুশি নয় আনভিকে বউমা হিসেবে পেয়ে। ওয়াহেজের মা-চাচি তো আনভির সামনেই বলে দিয়েছেন আনভি নাকি তার বাবার পালিত, নয়তো অবৈধ সন্তান না হলে সে এত দূরে থাকত না। সেটা মূলত তার বাবাই তাদের বলেছেন, তারা নিজেরা ধারণা করেনি। আনভি নিজের সাথে পরার মতো কিছু নিয়ে আসেনি। ওয়াহেজের বড় বোন ওয়াজিফা তাকে কিছু ড্রেস, টাওয়াল আর প্রয়োজনীয় সব দিয়ে এই ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। ওয়াহেজ আসার সময় আনভির সাথে এক গাড়িতে আসেনি সে আলাদা গাড়িতে গার্ডসহ চলে গেছে। কোথায় নাকি জরুরি কাজ পড়েছে। কাজ তো থাকবেই, স্বাভাবিক প্রেসিডেন্ট মানুষ বলে কথা। ওয়াজিফা তাকে যা দিয়ে গেছেন পরার জন্য, তা আনভির কাছে বেশ বেমানান। সে সবসময় লম্বা ফুল হাতা থ্রি-পিস পরে অভ্যস্ত, অথচ তাকে দেওয়া হয়েছে শুধু কুর্তি সেট। আনভি অনেকক্ষণ বোরকা পরা অবস্থাতেই অপেক্ষা করেছে, যদি কেউ আসে। আসলে বলবে থ্রি-পিস দিতে। কিন্তু নাহ, কেউ এল না। সত্যি বলতে, কেউ তাকে নতুন বউ হিসেবে ততটা মূল্যায়ন করছে না। আনভি অপেক্ষার প্রহর গুনে যখন দেখল তা কেবল ভুল, তাই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় বদলে একটা নীল রঙের কুর্তি পরে, হাত-মুখ ধুয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে সে ঘরের সাজসজ্জা দেখছে আর ঘটে যাওয়া সব ঘটনা ভাবছে। আনভি দেয়ালে লাগানো ওয়াহেজ আর সারার ‘বিয়ে ঠিক হওয়ার দিনের’ ছবির দিকে তাকায়। যেদিন তাদের বিয়ের ফাইনাল ডেট পড়ে, সেদিন এই ছবিটা তোলা। সেদিন আনভিও দেওয়ান বাড়িতে ছিল, কিন্তু তাকে কারো সামনে আসার জন্য নিষেধ করা হয়েছিল। সামনে আসলে তো তার বাবার পরিচয় দিতে হতো এই মেয়েটি কে? তাই আসতে দেওয়া হয়নি। আনভিও এসবে কোনোদিন আগ্রহ দেখায়নি। আনভি একদৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়ে আছে, ঠিক এমন সময় কেউ পিছন থেকে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “এই ছবিটা ছুড়ে মারো। বিশ্বাসঘাতকদের আমার ঘরের দেয়ালে জায়গা নেই।” দরজা খোলা ছিল, যার জন্য ওয়াহেজের ভেতরে আসার আওয়াজ টের পায়নি আনভি। তবে এখন ওয়াহেজের গলার স্বর শুনে কিছুটা থমকে যায় সে। জীবনের প্রথম কোনো পুরুষের সামনাসামনি হবে আজ। শুধু ‘নামে আর দায়িত্বে বাবা’ নামক মানুষটার সামনে ছাড়া, নিজের বুঝ হওয়ার পর থেকে কোনো পুরুষের মুখোমুখি নিজেকে সম্পূর্ণ না ঢেকে হয়নি। আজ এই প্রথম হতে হবে। আনভি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওয়াহেজের দিকে তাকায়। যথেষ্ট কনফিডেন্স নিজের মধ্যে টেনে ধরে সে। সে যে আতঙ্কিত, সে যে ভয় পাচ্ছে তা ওয়াহেজকে বুঝতে দেওয়া যাবে না। আনভি ওয়াহেজের মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলে, “আমি আসলে খুলতে চাই না। ছবিটা ভালোই লাগছে। আপনার যদি মর্জি হয়, খুলতে পারেন।” আনভির কথা শুনে ওয়াহেজ তার দিকে এগিয়ে আসে। আনভি ওয়াহেজকে এগিয়ে আসতে দেখেই সতর্ক হয়ে দু-কদম পাশে সরে যায়। ওয়াহেজ রুমের এক কোণ থেকে ডাস্টবিন নিয়ে দেয়ালে লাগানো ছবি, আর সারা ও তার নামের যতকিছু আছে, সব ডাস্টবিনে ভরে বেলকনির বাইরে ‘টাশ’ করে ফেলে দেয়। ওয়াহেজ বেশ শান্ত আর সাবলীলভাবেই এই কাজটা করল কোনোপ্রকার রাগ বা ক্ষোভ ঝাড়ল না। আনভি তো ভেবেছিল ওয়াহেজ হয়তো রাগ দেখাবে এখন, কিন্তু নাহ, ওয়াহেজ তার উল্টো প্রতিক্রিয়া দিল। ওয়াহেজ ঘরে ফিরে আসতেই আনভি তাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করব কিছু মনে না করলে?” ওয়াহেজ দাঁড়িয়ে গিয়ে আনভির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় আর বলে, “জি, করো। ‘তুমি’ করে বলছি, কারণ এখন তুমি… এখন তুমিই। মানে আমার জন্য তুমি আরকি।” এমন অদ্ভুত কথা শুনে আনভি মাথা নাড়িয়ে বলে, “আচ্ছা সমস্যা নেই, বলুন। আমার প্রশ্নটা হলো প্রথমত আমার মতো এমন একজন অচেনাকে বিয়ে হলো, তার মধ্যে আসল যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সে পালিয়ে গেল… আপনার কি রাগ হচ্ছে না?” ওয়াহেজ আনভির কথায় মুচকি হেসে বলে, “এমন তুচ্ছ বিষয়ে রাগ করা কি আমার সাথে যায়? একটা দেশের দায়িত্বে আছি আমি, আর ঘরের এমন তুচ্ছ বিষয়ে রাগ করলে কি আমার হবে? তুমিই বলো? দেখে তো বুদ্ধিমতী মনে হচ্ছে।” “বিষয়টা তুচ্ছ মনে হচ্ছে আপনার কাছে? এটা একটা বিয়ের বিষয়, আর এটা তুচ্ছ মনে হচ্ছে?” ওয়াহেজ আনভির কথায় হাসে। হেসে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে আনভির দিকে তাকায়। এই হয়েছে একটা জ্বালা আনভি লম্বায় পাঁচ ফুট তিন, আর ওয়াহেজ ছয় ফুট। কাছ থেকে কথা বলার সময় মাথা নিচু করে কথা বলতে হয়। এখন আনভির দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে ওয়াহেজ বলে, “তুমি কি আমাকে বোকা ভেবেছো? আমি তোমাদের চাল ধরতে পারিনি মনে হয়? বিয়ে তো তোমাকেই দেওয়ার কথা আমার কাছে। মাঝখানে তোমার বোনকে দেখানো, তার পালিয়ে যাওয়া সবই তো তোমাদের নাটক। তুমি তোমার বাবার অবৈধ সন্তান, তোমাকে নিজের মেয়ে বলে তো ধুমধামে বিয়ে দিতে পারবে না, তাই এই খেলাটা খেললে তোমরা আমাদের সাথে। খেলেছো যখন, ভালোই হয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, বিয়ে যতই হোক, বউ কখনো হতে পারবে না। আমি ওয়াহেজ ইবনান এমন বেইমান নারীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে কখনোই স্বীকৃতি দেব না।” আনভি কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কী বলা উচিত এখন? এসব কী বলছে ওয়াহেজ? সে কীভাবেবোঝাবে এসবের কিছুই সে জানে না! আনভি অনেকক্ষণ চুপ থেকে ফিকে হেসে ওয়াহেজকে বলে, “আমার ঈমান নিয়ে কথা বলার অধিকার আপনার নেই। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। ইভেন মিস্টার ইয়াহিয়া মানে সম্পর্কে যে শুধু আমার বাবা তার সাথেও আমার এসব নিয়ে কথা হয়নি। দাওয়াত পেয়েছিলাম,এসেছিলাম দোষ কাটাতে। দোষ কাটাতে এসে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাব, ভাবিনি। আপনার যদি মনে হয় আপনার ধারণাই সঠিক, তাহলে আমাকে ডিভোর্স দিতে পারেন। আপনি ডিভোর্স দিলে আমি চিরতরে মুক্তি পাই ‘বাবা’ নামক মানুষটার থেকেও।” চলবে………… |