গল্প:নীভৃতে প্রেম আ...
 
Notifications
Clear all

গল্প:নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা


Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

মিহাল আর এক মুহূর্তও দেরি না করে অত্যন্ত পরম মায়ায় নীলার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে নিজের দিকে তুলে ধরল। তার চোখে তখন এক মহাসমুদ্র সম্বলিত ভরসা। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আশ্বাসের মুচকি হাসি ফুটিয়ে সে গভীর স্বরে বলল,

    “আমি আছি তো নীলাঞ্জনা, তোমার বন্ধু, তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তোমার সবটুকু ভালোবাসা হয়ে।”

 

মিহালের এই গভীর ভালোবাসার বাণী যেন আশ্বাসের বদলে নীলার মনের গহীনে এক অজানা, সুপ্ত আতঙ্কের জন্ম দিল। অতীতের সব হারানোর ক্ষতগুলো এক লহমায় জ্যান্ত হয়ে উঠল তার বুকের ভেতর। সে প্রচণ্ড ছটফট করে, এক বুক আতঙ্ক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,

    “না, না, না, না! আমি... আমি চাই না আপনাকে বন্ধু বানাতে! আমি চাই না আপনাকে ভালোবাসতে! আমি কোনোভাবেই চাই না আপনাকে হারাতে... পারব না, আমি আপনাকে হারাতে পারব না মিহাল! আমি জীবনে যা কিছু ভালোবেসে চেয়েছি, তার সবকিছুই হারিয়েছি। দুনিয়ার মানুষ জানুক আমি খুব স্ট্রং, খুব শক্ত... কিন্তু এতটা শক্ত বা সাহসী আমি নই যে আপনাকে হারানোর ধকল সহ্য করার ক্ষমতা রাখব! আমার চাই না এই ক্ষমতা পেতে... চাই না আপনাকে হারাতে, চাই না, চাই না।"

 

 জনরা_______রোমান্টিক, সামাজিক, সাসপেন্স।

গল্প:নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা 

লেখিকা:নাজনীন নেছা নাবিলা

 

 

  

Loading spinner

Reply
4 Replies
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
রাত পোহালেই চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হবে নিলা মির্জার।সে খুশিতে ঘুমাতে পারছে না সে।কত ঝড় ঝাপটা পার করে সে কাল সুখের মুখ দেখতে পাবে তা কেবল সেই জানে। ছোট্ট থেকে যাকে ভালোবেসে এসছে কাল তার সাথেই বিয়ে হবে কথাটি ভাবতেই এক শিহরণ বয়ে যাচ্ছে নীলার শরীর দিয়ে।
 
চলুন পরিচয় টা দিয়ে নেই।#নীলা_মির্জা হলো মির্জা পরিবারের একমাত্র মেয়ে।তাই সে সবার আদরের।তার বাবার নাম নিলয় মির্জা আর মায়ের নাম লায়লা ইসলাম। নিলয় মির্জারা তিন ভাই।নিলয় মির্জা হলো মেজো।আর উনার বড় ভাইয়ের নাম ইমরান মির্জা‌ এবং তার স্ত্রীর নাম ইরিন। ইমরান মির্জা‌র দুই ছেলে‌। একজনের নাম #ইরফান_মির্জা আরেক জনের নাম ইবাদ মির্জা। ইরফান সবে পড়াশোনা শেষ করে প্যারিস থেকে বাংলাদেশে ফিরেছে। এবং বাবার ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে।তার বয়স ২৭ বছর। লম্বায় ৫ ফুট ৮। গায়ের রং শ্যামলা। তারপরও কোনো মেয়ের নজর কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।মূলত তার সাথেই নীলার বিয়ে হবে।আর ইবাদের বয়স ১০ বছর। নিলয় মির্জার ছোট ভাইয়ের নাম আকাশ মির্জা এবং স্ত্রীর নাম রুবিনা আক্তার। আকাশ মির্জার এক ছেলে যার নাম আবির মির্জা সে ঢাকা মেডিকেলে ডাক্তারী নিয়ে পড়াশোনা করছে।বয়স তার ২৬।তিন ভাই মিলে এক কম্পানি চালায়।আর তা ছাড়াও নিজেদের ব্যক্তিগত দোকান আছে যা কর্মচারীরা দেখভাল করে।বেশ নাম ডাক আছে তাদের এই শহরে।পুরান ঢাকার ফরিদাবাদ এলাকায় থাকে তারা।নিজেস্ব দোতালা বাড়ি যা তিন ভাই মিলে বানিয়েছে এবং এখনো যৌথ ভাবে বসবাস করে যাচ্ছে 
 
"নাহ ঘুম আর আসছে না শুধু শুধু শুয়ে থেকে লাভ নেই।"
কথাটি বলে আলসেমি ছেড়ে উঠে বসলো নীলা। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ভোর তিনটা বাজে। চারদিকে অন্ধকার এবং ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। এখন তেমন শীত পরেনি কেবল শীতের আবাশ তাতেই এই অবস্থা।নীলা বিছানা ছেড়ে সুইচ বোর্ডের দিকে গেল এবং রুমের লাইট জ্বালিয়ে ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।পরনে তার লং টপ যার হাতা কব্জি পর্যন্ত। এবং নরমাল পায়জামা।ওরনা সোফার উপর রাখা।নীলা নিজেকে বেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিল।গোল গাল চেহারার মাঝে খারা নাক। গায়ের রং উজ্জল শ্যামলা।কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল।হাসলেই বাম পাশের গ্যাজা দাঁত দেখা যায়। এবং তাকে যেন ভালোই মানিয়েছে এই গ্যাজা দাঁতে। নীলার বয়স ২১ বছর।সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স থার্ড ইয়ারে অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করছে। অনেক স্বপ্ন ছিল দেশের বাইরে যাবার কিন্তু ইরফান না করেছে বিধায় যায়নি। ভালোবাসার মানুষটির জন্য এতটুকু তো করতেই পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি সে বাবার কম্পানি দেখে মাঝে মধ্যে। একমাত্র মেয়ে তো তাই। কিন্তু পেশায় তার শিক্ষিকা হবার ইচ্ছা এবং চাকরির জন্য পড়াশোনাও শুরু করে দিয়েছে। সে খুব প্রতিবাদী এবং সাহসী একজন মেয়ে।কথায় কথায় কান্না করা যেন তার সহ্য হয় না।
 
নীলা সোফার উপর থেকে ওড়না নিয়ে মাথায় ঘোমটার মতোন করে দিল।এখন তাকে অনেকটা বউ বউ লাগছে। নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল। তারাতাড়ি করে বিছানায় বালিশের পাশে থাকা ফোন হাতে নিয়ে টপাটপ করে নিজের কয়েকটা ছবি তুলে নিল।সে আবার খুব স্ব-প্রেমী। নিজেকে সে সব থেকে বেশি ভালোবাসে তাই তো সব সময়ই খুশি। তারপর হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কে মেসেজ দিল। কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে তার বেস্ট ফ্রেন্ড এখনো তার আগের মেসেজের রিপ্লাই দেই নি।গত তিনদিন যাবত সে তার বেস্ট ফ্রেন্ড কে মেসেজ দিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু কোনো উত্তয় পায়নি। তার বেস্ট ফ্রেন্ডের নাম আরশি ইসলাম।নীলা বেস্ট ফ্রেন্ডের কাছ থেকে মেসেজের রিপ্লাই না পেয়ে মনক্ষুণ্ণ হয়ে বিছানায় বসে পরে। কিন্তু পরক্ষণেই ফোনের ওয়াল পেপারে দৃষ্টি যেতেই মন ভালো হয়ে উঠে। কারণ সেখানেই তো তার সুখ, ভালোবাসা ভেসে আছে।
 
________________
 
“প্যারিসের ৭ম অ্যারোন্ডিসমেন্টে, আইফেল টাওয়ারের থেকে অনেকটা দূরে নিজেস্ব এপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে #মিহাল_খান।সে এখানে তার পরিবার সমেত বসবাস করে।জানালার সামনে দাঁড়ালেই পুরো Champ de Mars আর Eiffel Tower এক নজরে দেখা যায়।প্যারিস শহরের নরম সকালবেলার আলো তার ঘরে সবসময়ই একটা কাব্যিক ছোঁয়া এনে দেয়।তার বাসার নিচের রাস্তাটা ঠিক সিনেমার মতো—পাথরের রাস্তা, পাশেই ছোট একটা বেকারি, যেখানে সকালবেলা croissant-এর গন্ধ ভেসে আসে।
American University of Paris-এ সে Economics বিভাগের অধ্যাপক। অবশ্য এক সময় সে এই ইউনিভার্সিটির টিচার ছিল।তার বাড়ি থেকে AUP খুব কাছেই।গাড়ি দিয়ে গেল সর্বোচ্চ ৬ কি ৭ মিনিট।
বসয় তার ৩০। উচ্চতায় ৬ ফুট হবে। গায়ের রং উজ্জল। চোখের সামনে এত সুন্দর দৃশ্য থাকতেও তার চোখে স্পষ্ট প্রতিশোধে আগুন ধাও ধাও করে জ্বলছে।যার কারণ কেবল সে এবং আর একজন ব্যক্তিই জানে।বাকিটা পরিচয় গল্পে পাওয়া যাবে।
 
__________________
 
সম্পূর্ণ মির্জা বাড়ি ফুল এবং লাইট দিয়ে সাজানো।আর সাজানো থাকবে নাই বা কেন? বাড়ির বড় ছেলে এবং একমাত্র মেয়ের বিয়ে হচ্ছে বলে কথা। অবশ্য বিয়েটা এখন খুবই সাধারণ ভাবে হবে।কাল বিকেলে গায়ে হলুদ হয়ে গেছে ঘরোয়া ভাবে।আজ দুপুরে আকদ করানো হবে।মাস দেড়েক পর ঘটা করে অনুষ্ঠান হবে।সকাল থেকেই সবাই কাজে ব্যস্ত। বাড়ি ভর্তি কুটুম‌।ঘটা করে অনুষ্ঠান না হলেও বাড়ি কুটুম দিয়ে ভরে গেছে। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী যাদের না বললেই নয় সবাই উপস্থিত আছেন। বাবুর্চিরা বাগান ঘরে রান্না করছে। মানুষদের কে বাগানে এবং ছাদে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।নীলা নিজ ঘরে বসে আছে।তার ঘরে তার সকল বান্ধবী এবং কাজিনরা মিলে আড্ডা দিচ্ছে। পার্লারের মহিলারা তাকে সাজিয়ে দিচ্ছে। ইরফান বেশি সাজ পছন্দ করে না বলে নীলা তেমন সাজলো না।তার আবার সাজগোজ খুব পছন্দ কিন্তু নিজের পছন্দের মানুষের জন্য নিজ পছন্দকে প্রায়শই নীলা বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করে না।তার নামে যেযন নীল আছে তেমনি তার মনেও আছে। অর্থাৎ তার নীল রং ভীষণ প্রিয়। ছোটবেলার থেকেই শখ ছিল নিজের বিয়েতে সে নীল রঙের শাড়ি পরবে। অন্য মেয়েদের ছোটবেলায় স্বপ্ন থাকে বিয়ের সময় লাল টুকটুকে শাড়ি পড়বে কিন্তু সে আবার একটু ভিন্ন ছিল।কিন্তু ইরফানের নীল রঙ একদম পছন্দ না তাই ইরফানের জন্য আজ সে খয়রি রঙের শাড়ি পরলো। নিজের পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে হচ্ছে এর থেকে বেশি আর কি লাগে।
 
টুংটাং করে মেসেজের নোটিফিকেশন এল নীলার ফোনে।তার ফোন ড্রেসিং টেবিলের উপরই রাখা ছিল।নীলা যেই না নিজের ফোন নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় ওমনি তার খালাতো বোন রুমি তার ফোন নিয়ে নেয় এবং মজার ছলে বলে___
"না না না নীলু,আজ আর তোকে ফোন দিচ্ছি না। বিয়ের পর নিজের প্রাণ প্রিয় বরের সাথে অনেক কথা বলতে পারবি।এখন শুধু অপেক্ষা কর।এত উতলা হলে চলবে?"
 
তারা দুজনেই সমবয়সী।রুমির কথার প্রেক্ষিতে নীলা কিছু বলল না কেবল লাজুক হাসল। কিন্তু মনটা আনচান করছে। কাল রাত থেকে আর তার ইরফানের সাথে কথা বলা হয়নি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যেই মানুষটি সম্পূর্ণরূপে তার হয়ে যাবে সেই মানুষটির সাথে কথা বলার জন্য নাহয় আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো সে। 
 
তার সাজ সম্পূর্ন করে পার্লারের মহিলারা যেতে না যেতেই নীলা নিজের ক্লাসমেট ইকরা কে বলল___
আরশির খবর জানিস? গত তিনদিন যাবত আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। হঠাৎ কি হলো তার? আমার বিয়ে অথচ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অনুপস্থিত। ভালো লাগে না।
 
নীলার কথা শুনে ইকরা আমতা আমতা করতে লাগলো।ইকরা কে আমতা আমতা করতে দেখে নীলা বুঝে গেল ইকরা কি বলতে চায়।সে ইকরা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজে বলে উঠলো ___
দেখ ইকরা তুই আমার ফ্রেন্ড।আমি তোকে বিশ্বাস করি। কিন্তু তার থেকেও বেশি বিশ্বাস আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড কে করি।তাই তার সম্পর্কে কোনো গুজব আমি কানে তুলব না। হয়তো সে কোনো সমস্যায় আছে।আমি পরে এই বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছি। বিয়ে খেতে এসেছিস চুপচাপ খাওয়া দাওয়া কর আর আনন্দ কর।দয়া করে আনন্দ মাটি করার চেষ্টা করবি না।
নীলার রূঢ় কথা শুনে ইকরার মুখ চুপসে যায়। কিন্তু সে তো নীলার ভালো চায় বলেই নীলা কে বার বার একটি বিষয় সম্পর্কে অবগত করে আসছে। অথচ নীলা অন্ধবিশ্বাস করে নিজের ক্ষতি নিজেই করছে।ইকরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রুম ত্যাগ করল।
 
হুড়মুড় করে নীলার রুমে তার মা এবং বাবা প্রবেশ করল। মেয়েকে বউ সাজে দেখে চোখ ভরে উঠলো তাদের।লায়রা ইসলাম কাছে এসে মেয়েকে বুক জড়িয়ে নিলেন।কত দোয়া, কত মানত করে তারা এই কন্যা সন্তান পেয়েছেন কেবল তারাই জানেন। ভেবেছিল হয়তো নিসন্তান থাকতে হবে কিন্তু নীলা জন্ম গ্রহণ করে তাদের প্রমাণিত করে। নিলয় খান মেয়েকে নিজের স্ত্রীর কাছে থেকে নিয়ে নিজের বুকে আগলে ধরেন। মেয়ের মাথায় পর পর চুমু খান। তারপর বলেন___
"একদম মিনুর মতোন লাগছে আজ তোকে।"
 
তিনি কি বলেছেন তা উপলব্ধি করতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে জিভে কামড় বসান।লায়লা খান আতংক জনক দৃষ্টিতে একবার স্বামীর পানে চান তো আরেকবার নিজের মেয়ের পানে চান। নীলা নিজের বাবার বুক থেকে থেকে মাথা তুলে কৌতুহল জনক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল___
মিনু কে বাবা? 
 
নিলয় খান থমকে যান‌। পুরোনো ক্ষত আবার জেগে উঠে। চোখের সামনে ভেসে উঠে পুরোনো স্মৃতি। লায়লা ইসলাম স্বামীর অবস্থা বুঝতে পেরে কথা কাটানোর জন্য তড়িঘড়ি করে বলেন___
এসব কথা পরে হবে। কিন্তু একটা জিনিস দেখ আমরা কতটা ভাগ্যবান বিয়ের পরেও নিজের মেয়েকে নিজের চোখের সামনে দেখতে পাবো। এই তো মনে হচ্ছে সেই দিন জন্মগ্রহণ করলি, অথচ দেখ আজ তোর বিয়ে। আর বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই চুপচাপ বস আমরা এসে নিয়ে যাব। তোর বর সেই সকালে বাহিরে গেছে এখনো আসেনি। আমরা গিয়ে দেখছি সে এখন কোথায় বিয়ের সময় তো ঘনিয়ে এলো। 
 
এই বলে নীলার কপালে চুমু খেয়ে স্বামীর হাত ধরে রুম থেকে বের হয়ে গেল লায়লা ইসলাম। কিন্তু নীরব রুমে একা রয়ে গেল নীলা। মনে রয়ে গেল হাজারো প্রশ্ন। সেই একই খটকা যা তার মনে আগেও লেগেছিল। মনে মনে বলল___
কে এই মিনু? বাবার মুখে এই নামটি আমি আরো অনেকবার শুনেছি। শুধুমাত্র বাবা নয়, বড় চাচ্চু এবং ছোট চাচ্চুর মুখেও শুনেছি। কিন্তু এই সম্পর্কে আমি কেন কিছু জানি না। 
 
তার চিন্তার ভাবনার মাঝে ছেদ ঘটায় তার বান্ধবী এবং কাজিনরা। যখন তার বাবা রুমে ঢুকেছিল তখন তাদেরকে প্রাইভেসি দিয়ে সবাই বাইরে চলে গিয়েছিল। তার মা বাবা চলে যেতেই সবাই আবার রুমে প্রবেশ করে। নীলাও নিজের চিন্তা ভাবনা ছেড়ে চুপচাপ খাটে বসে থাকে। এখন তার মনের কেবল আনন্দ কে সে জায়গা দিবে কোন চিন্তাভাবনাকে না। 
 
___________________
 
একের পর এক ফোন করে যাচ্ছে আবির ইরফান কে। কিন্তু ইরফান কারোর ফোনই ধরছে না।সবাই খুবই চিন্তিত। বাড়ির পুরুষরা মিলে আত্মীয় স্বজনদের সামলাচ্ছে।যেই যায়গায় বিয়ে হবার কথা ছিল দুপুরে সেই যায়গায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল অথচ বরের আসার কোনো খবর নেই। এতক্ষণে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে।কেউ বলছে হয়তো ছেলের কোন বিপদ হয়ে গেছে, কেউ বলছে হয়তো ছেলে এই বিয়েতে রাজি ছিল না, আবার কেউ বলছে হয়তো মেয়েতেই কোন সমস্যা আছে। ঘুরেফিরে আমাদের সমাজের মানুষ মেয়েদের কেই দোষারোপ করে। সবাই মিলে আত্মীয় স্বজনের মুখ বন্ধ করতে পারছে না। কারণ মানুষের মুখ বন্ধ করা কখনই সম্ভব না। নীলা নিজের রুমে বসে বসে কান্না করছে এবং ইরফানের জন্য দোয়া করছে। তার মন বলছে কিছু একটা খারাপ হতে চলেছে।ইকরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। হঠাৎ করেই বাহির থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শোনা গেল।নীলা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তার বড় চাচ্চু ইরফান কে ধমকাচ্ছে।নীলা আর দেরি না করে পরনের শাড়ির কুচি ধরে দৌড় লাগালো ড্রয়িং রুমের দিকে। সে দোতালায় থাকে দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়িয়ে নিচে নামে।চোখে মুখে তার আনন্দের ছাপ স্পষ্ট। সে চায়না কেউ তার ইরফান কে বকা দেক। তার ইরফান তার কাছে ফিরে এসেছে এতেই সে খুশি। এখন বিয়ে হয়ে গেলেই হবে। কিন্তু দরজার কাছে যাওয়ার পর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন ব্যক্তিকে দেখে সে থমকে যায়। তার পুরো পৃথিবী যেন তার সাথে থমকে যায়। মুহূর্তেই সে নিজেকে নিঃস্ব মনে করে। দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, কিন্তু তারপরও অনেক কষ্টে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা তার ঘুরতে শুরু করে। কিন্তু নিজেকে শক্ত রাখার জন্য শাড়ির আচল অনেক শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। চোখ অশ্রুতে ভরে গেছে উপলব্ধি করতে পেরে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি চোখেতেই শুকিয়ে ফেলল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড আরশি এবং তার ভালোবাসার মানুষ, তার বাগদত্তা, ইরফান যার সাথে আজ তার বিয়ে হবার কথা ছিল। আরশি বিয়ের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান শক্ত করে আরশির হাত ধরে রেখেছে। দুজনের দৃষ্টি মাটির দিকে। বাড়ির সকলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। কেবল ইরফানের পিতা চিৎকার চেঁচামেচি করছে। নিলয় মির্জার বুক ফেটে যাচ্ছে মেয়ের কষ্টের কথা ভেবে। কিন্তু সবাই কে অবাক করে দিয়ে নীলা বলল___
বাড়ির ছেলে আর ছেলের বউকে বরণ করে তোমরা ঘরে তুলো। আর কতক্ষণ এভাবে বাহিরে দাঁড়া করিয়ে রাখবে? 
 
নীলার কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল। থেকে বেশি অবাক হয়েছে আরশি এবং ইরফান। তারাতো ভেবেছিল নীলা কান্নাকাটি করবে, চিৎকার চেঁচামেচি করবে অথচ নীলার এমন ঠান্ডা ব্যবহার দেখে সবাই অবাক।
 
নীলা কিছু না বলে খাবার টেবিলে চলে গেল তারপর জোরে চিৎকার দিয়ে বলল___
উফ্ মা সেই সকাল থেকে না খেয়ে বসে আছি আমাকে তাড়াতাড়ি খাবার দাও।
 
লায়ালা বেগম শাড়ির আঁচল মুখে চেপে কেঁদে উঠলেন। মেয়ে তার উপর উপর যতই শক্ত থাকা নাটক করুক না কেন কিন্তু মনে মনে যে একেবারে ভেঙে পরেছে তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। নীলা যখন দেখল তার মা তাকে খাবার না দিয়ে কান্নাকাটি করছে তখন সে নিজেই উঠে পড়ল এবং প্লেট হাতে নিয়ে সব জায়গা থেকে একটু একটু করে খাবার তুলে নিল এবং সুন্দর করে খেতে লাগলো। খাবার খাওয়ার সময় কি প্রশংসাটাই না করল সে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই প্রতারক অবাক দৃষ্টিতে কেবল চেয়ে রইল তার দিকে।
 
 ------
 
 
নতুন গল্প আশা করি সবাই রেসপন্স করবেন। গঠনমূলক কমেন্ট করবেন। ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন 
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

 পর্ব:০২

 

 

 

"লজ্জা করে না নিজের বিয়ের দিন অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে আনতে?"

হুংকার দিয়ে কথাটি বলল ইমরান মির্জা‌ নিজের ছেলে কে। ইরফান এখনো চুপ আছে।ইমরান মির্জা‌র স্ত্রী ইরিন একবার নীলার দিকে দৃষ্টিপাত করলো।দেখলো নীলা তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে। প্রত্যেকদিন যেমন ভাবে খাবার খায় তার থেকে আরাম দায়ক ভাবে বসে খাচ্ছে। নীলার ধৈর্য্য, সাহস আত্মমর্যাদা বোধ দেখে যেমন খুশি হলেন তিনি, ঠিক তেমনি মনক্ষুণ্ণ হলেন নিজের ছেলের করা কাজে।নীলাকে উনার ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। মেয়ে হিসেবে নীলা যেমন ভালো বউ হিসেবেও হতো। কিন্তু উনার কপালে এমন লক্ষী বউ জুটলো না। রাগে দুঃখে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ছেলেকে 

বললেন ___

"দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে হয়। বানরের গলায় মুক্তোর মালা মানায় না রে তাই তো নীলা কে ছেড়ে এই সাদা চামড়ার কাছে গেলি।না আছে চেহারা না আছে গুণ, খালি পারে পেওপেও করতে।তুই যেমন তোর পছন্দও তেমন।কি আছে এই মেয়ের মাঝে? শুধু সাদা চামড়াই তো।আরে তোকে যে নীলা বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল এইটাই তো তোর চৌদ্দ গুষ্টির ভাগ্য।"

 

নিজের মায়ের কাছ থেকে এমন অপমান আশা করেনি ইরফান। লজ্জায় সে মুখ তুলে তাকাতে পারছে না।বেশি কিছু বললে দেখা যাবে বাবা তাকে ত্যাজ্য পুত্র করে দিবে।সকল আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী সবাই মিট মিট করে হাসছে ইরফান আর তার স্ত্রীর উপর।নীলা মুখে থাকা খাবার খেয়ে পানি গিলে তারপর বাম হাত দিয়ে টেবিলের সাহায্য তালি দিতে দিতে বলল___

"ওয়াহ্ বড় আম্মু জিও।তুছি গ্ৰেট হো।"

 

নীলা তার বাবার বড় ভাই এবং তার স্ত্রীকে বড় আব্বু ও বড় আম্মু বলে ডাকে। এবং ছোট ভাই এবং তার স্ত্রীকে ছোট আম্মু এবং ছোট আব্বু বলে ডাকে।

 

নীলার কথা শুনে ইরফান রাগী দৃষ্টি নীলার দিকে তাকালো। সেটা ইমরান মির্জা লক্ষ্য করতেই ইরফান কে ধমক দিয়ে বলল__

লজ্জা করছে না নীলার দিকে এইভাবে তাকাতে? তোকে তো আমার নিজের ছেলে বলতে লজ্জা করছে। 

 

নীলা এইসব দেখে মিটি হাসছে আর খাবার খাচ্ছে। মেয়ের এমন সাহসীকতা দেখে নিলয় মির্জা নিজের ছোট ভাইকে বলেন___

আকাশরে আমার মেয়েটা একদম মিনুর মত হয়েছে। মিনু আমাদের মাঝে না থাকলেও তার এক ফিমেল ভার্সন রেখে গেছে। আমার মেয়েটিকে যখন মিনু হসপিটালে কোলে নিয়েছিল তখন হয়তো নিজের গুন মেয়েটির মাঝে রেখে চলে গিয়েছিল। 

কথাগুলো বলতেই দুই ভাইয়ের চোখ ভরে উঠলো।আবির আর ইবাদ হেঁটে হেঁটে নীলার কাছে গেল।আবির বোনের মাথায় হাত দিয়ে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল__

বনু ঠিক আছিস তুই? 

 

আবির নীলা কে একদম নিজের বোনের মতোন দেখে।

নীলা খাবার খেতে খেতে বলল__

আমার একটা কাজ করে দিলে হয়তো ঠিক থাকব।

 

আবির কী কাজ করতে হবে তা জিজ্ঞেস না করেই রাজি হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো ___

আমি আমার বোনের জন্য সব কিছু করতে পারি।

 

নীলা আবিরের কথা শুনে দাঁত বের করে হাসি দিল। তারপর আবির কে কানাকানি কিছু একটা বলল।আবিরের চক্ষু চড়কগাছ নীলার কথা শুনে। এমন পরিস্থিতিতেও যে এই মেয়ের মাথায় এমন বুদ্ধি আসতে পারে তা কারোর কল্পনার বাইরে।ইবাদ নীলার কথা শুনে মিটি মিটি হাসছে।সে নীলা কে খুব পছন্দ করে।বাড়ির কারোর কথা না শুনলেও নীলার কথা শুনে কেবল।আর আরশি অনেক বার এই বাড়িতে এসেছিল।ইবাদ আরশিকে সেই প্রথম থেকে অপছন্দ করে এসেছে।আবির আর ইবাদ বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল নীলার বলা মতন কাজ করতে।

 

নীলার খাওয়া শেষ হতেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে

 বলল ___

ছোট আম্মু চা দাও তো।

 

রুবিনা আক্তার দেরি না করে চলে গেলেন রান্নাঘরে।

বাড়ির সকল আত্মীয় স্বজনরা এখন ইরফান আর আরশিকেই ছিঃ ছিঃ করছে।

 

লায়লা ইসলাম স্বামীর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন___

এখন যদি আমাদের মেয়ে কান্নাকাটি করতো, ভেঙে পরতো তাহলে সবাই তাকে দোষারোপ করতো।অথচ দেখো মেয়ের এমন কঠিন রূপ দেখে কেউই মেয়েকে দোষারোপ করার সাহস করছে না। মেয়েদেরকে সমাজে টিকতে হলে শক্ত থাকতে হবে। ভেঙে পরলে সবাই তাদের মাটির সাথে পিষে ফেলবে।

নিলয় মির্জা স্ত্রী কথায় সায় দিলেন। মেয়ের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে গর্ব বোধ করলেন।এখন আর কোনো আক্ষেপ নেই তার। তার মেয়ে যেই যায়গায় ঠিক আছে সেই যায়গায় সে ভেঙে পরা মানে মেয়েকে ছোট করা।তাই নিলয় মির্জা নিজেকে স্বাভাবিক করে স্ত্রী কে বললেন শক্ত থাকতে।

 

__________________

 

"মম খাবার দাও তো।"

শার্টের হাতা ফ্লোট করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নিজের মাকে বলল মিহাল।বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান সে।

মিহালের মা ছেলের আওয়াজ শুনে রান্না ঘর থেকে খাবারের ট্রে ড্রয়িং রুমে আনতে আনতে রাগান্বিত কন্ঠে ছেলে কে বললেন___

"বেশি ইংরেজি ছাড়বি না আমার সামনে।মম টম না বলে মা বল রয়েবি নয়তো ডাকার প্রয়োজন নেই।"

 

মিহাল মায়ের কাছে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল___

"সব একই মম।"

ইসরাতুল ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন_

 হয়েছে আর তেল মালিশ করতে হবে না বাবু।খেতে বস।

 

মিহাল ভদ্র ছেলের মতোন খেতে বসে পরল। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল মিহালের বাবা মুবিন খান। তিনি খবরের কাগজে মুখ গুঁজে ছিলেন। কিন্তু ছেলে আর বউয়ের কথাবার্তা ঠিকই তার কানে পৌঁছেছে। এইটা অবশ্য নিত্যদিনের ঘটনা তাই তিনি বেশি পাত্তা দিলেন। খবরের কাগজ থেকে মুখ বের করে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিলেন। তিন জন চুপচাপ বসে খাবার খাচ্ছে। কেবল প্লেট এবং চামিচের শব্দ।

 

মিহাল পানি খাচ্ছিল।মুবিন খান গলা খাঁকারি দিয়ে মিহালের উদ্দেশ্যে বললেন___

তোমার সেই বেস্ট ফ্রে...

 

উনার কথা সম্পূর্ণ হবার আগে মিহাল হাতে থাকা কাচের গ্লাস ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে কাচের গ্লাস বিকট শব্দে ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল। ইসরাতুল ভয়ে কেঁপে উঠলেন।মুবিন খান নিজের ছেলেকে কিছু বলতে যাবে তার আগে মিহাল হনহনিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো এবং সামনের দিকে হাটা ধরল। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো এবং পিছনে না ফিরেই শান্ত কন্ঠে বলল ___

"আইম সরি ফর মাই রফ বিহেবিয়ার।"

সে যতই রুড হোক না কেন বাবা মাকে ভীষণ ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে।

 

কথাটি বলেই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে গেল মিহাল। পিছনে রেখে গেল একজোড়া চিন্তিত মুখ। যদি সে পিছনে ফিরে তাকাতো তাহলে তার মা বাবা তার রক্তিম চোখ দেখে হয়তো ভয় পেয়ে যেত। সে আ্যপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পাড়ি দিল তার গন্তব্যে। 

মুবিন খান স্ত্রীর হাতের উপর হাত রেখে সান্তনা দেওয়ার জন্য বললেন__

চিন্তা করোনা দেখবে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। 

ইসরাতুল নিরবে চোখের পানি মুছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। মুবিন খান ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন মা নামে সেইভ করা। নিজের স্ত্রীর দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন ___

এই নাও মায়ের ফোন এসেছে। মার সাথে কথা বলে মন হালকা হবে। 

এই বলে তিনি স্থান ত্যাগ করলেন।

 

__________________

 

"বড় আম্মু এবং বড় আব্বু শুধু শুধু তোমরা নিজের ছেলে এবং ছেলের বউকে বাহিরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছো। তাদেরকে বরণ করে ভিতরে আনো।"

 

নীলার কথায় অবাক হলেন ইমরান মির্জা‌। কিন্তু কিছু বললেন না। এতক্ষণে রুবিনা গরম চা বানিয়ে নিয়ে এসেছে নীলার জন্য। নীলার হাতে চা ধরিয়ে দিতেই নীলা আবার অনুরোধের স্বরে বলল___

"ছোট আম্মু একটু কষ্ট করে নতুন বর এবং বউকে বরণ করার ব্যবস্থা কর।"

 

নীলার কথা শুনে রুবিনার চোখ ভরে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না চেপে ধরলেন। এই মেয়েকে এখন তার সালাম করতে ইচ্ছে করছে। এমন পরিস্থিতিতে এতটা কঠিন থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করলো আজ নীলা। রুবিনা দেরি না করে বরণ করার জিনিস পত্র রেডি করতে লাগলেন। তারপর নিজের বড় জা এর কাছে নিয়ে এসে ধরিয়ে দিলেন।ইরিন একবার নীলার দিকে তাকাল।নীলা নিজের চাচি কে চোখ দিয়ে আশ্বাস দিতেই তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। মুখে গম্ভীরতা বজায় রেখে ছেলে এবং ছেলের বউকে বরণ করে নিলেন। মিষ্টি খাওয়ানোর সময় ইরফানের মুখের ভেতর জোরে চামচ গুঁজে দিলেন। ইরফান কিছুটা পিছিয়ে গেল। ব্যথা ও পেয়েছিল বটে।নীলা চেয়ারে বসে বসে চা খাচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে মুখ দেখে চা পড়ে গেল। আশেপাশে সবাই হেসে উঠলো। নীলাও হাসতে লাগলো। ইরফান চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব কিছু সহ্য করে গেল। অন্যদিকে আরশির কোন কিছুই সহ্য হচ্ছে না। ভেবেছিল বাড়ির বড় ছেলেকে বিয়ে করেছে সবাই তার মন মত চলবে। অথচ এত বড় ছেলেকে নিজের মা-বাবা সবার সামনে অপমান করছে আর সে তো পরের বাড়ির মেয়ে। এইসব কথা ভাবতেই আরশির চেহারায় বিরক্তের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।যা কেউ খেয়াল না করলেও নীলা করেছেন।নীলা আরশির চেহারায় বিরক্তের ছাপ দেখে বাঁকা হেসে মনে মনে বলল ___

যত যাই হোক দিন শেষে তুই আমারই বেস্ট ফ্রেন্ড।তোর সকল সমস্যা, দূর্বলতা সব কিছুর খবর আমার জানা আছে। আমি তাইলে এক্ষুনি তো নতুন সংসার শুরু হওয়ার আগেই শেষ করে দিতে পারি। কিন্তু এই নীলা মির্জা ভীতু দের মতোন দূর্বল যায়গায় আঘাত করে না। পিছন থেকে ছুড়ি চালানোর অভ্যাস তোর এবং তোর নব্য স্বামীর হতে পারে কিন্তু নীলা মির্জার না।আমি ময়দানে নেমে চোখে চোখ রেখে সোজা গুলি করব।

 

______________

 

প্যারিসের “Seine(সেইন) নদীর ব্রিজের উপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিহাল। তার দৃষ্টি পানির ঢেউতে।

"বেস্ট ফ্রেন্ড মাই ফুট।মিহাল খানের সাথে প্রতারণাল ফল তো তাকে হারে হারে টের পেতে হবে।মিহাল খান কাউকে ক্ষমা করে না যতক্ষণ না পর্যন্ত তার প্রাপ্য শাস্তি নিজ হাতে দেয়।"

কথা গুলো বলার সময় মিহালের কপালে রগ ফুলে উঠলো। দাঁতে দাঁত চেপে একা একা কথা গুলো বলল সে।তাকে কেউ কখনো এভাবে ঠকাইনি।তাই প্রথম বার ঠকে যাওয়ার মিহাল ঠিক মেনে নিতে পারছে না।পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল দিল।কল রিসিভ হতেই মিহাল বলল____

আই ওয়ান্ট এভরি সিঙ্গেল ডিটেইলস।

 

ওপর পাশের মানুষ থেকে উত্তর শুনে বাঁকা হাসলো মিহাল।ফোন কেটে পকেটে পুরে ফেলল। মুখের বাঁকা হাসি বজায় রেখে বলল ___

স্টারট কাউন্টিং ডাউন টু দ্যা বিগেনিং অফ ইউর বেড টাইম।

কথাটি বলেই ভয়ংকর হাসি দিল মিহাল।তার হাসির শব্দে আশে পাশে থাকা কবুতর ভয়ে একত্রে ঝাঁক বেঁধে উড়ে গেল।

 

 

Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 পর্ব:০৩
 
 
 
মুনভি? 
পেছন থেকে এক পুরুষালি কন্ঠ ভেসে এলো মুভির কানে। মুনভির কন্ঠটি চিনতে সমস্যা হলো না।এ যে তার অতি প্রাণ প্রিয় বন্ধুর কন্ঠ।মুনভি চেয়ার সমেত পেছনে ফিরল।তার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে বাঁকা হাসলো। পরনের সাদা এপ্রোন খুলে চেয়ারের উপর রাখল।চেহারা ছেড়ে উঠে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। তার পুরো নাম শাহরিয়ার মুনভি।পেশায় সে একজন ডাক্তার।Hôpital Européen Georges-Pompidou(ইউরোপীয় হাসপাতাল জর্জেস পম্পিডো) তে সে একজন Cardiologist.(হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ) ব্যক্তিটির একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বলল ___
মিহাল খান মাই ডিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড।আই মিন এক্স বেস্ট ফ্রেন্ড।উই মিট আফটার আ লং টাইম।তো এখানে কি করে আসা? 
 
মুনভির বলা কথাগুলো শুনে মিহালের ঠোঁটেও স্মিত হাসি ফুটে উঠল।এক জীবনে দুজন দুজনের জন্য জান দিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল।আর এখন দুজন দুজনের জান নিয়ে নিতে প্রস্তুত।কি অদ্ভুত এই বন্ধুত্ব।মিহাল নিজের মস্তিষ্ক হতে অন্যান্য চিন্তা ভাবনা দূর করে বলল___
"এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম ভাবলাম নিজের শত্রুর খোঁজ খবর নিয়ে যাই।যত যাই হোক এক জীবনে তো বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম।"
 
মিহালের কথা শুনে মুনভির ঠোঁট তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।সে বিদ্রুপ করে বলল ____
ছিলাম তো বেস্ট ফ্রেন্ড।(বেস্ট ফ্রেন্ড কথাটি সে জোড় লাগিয়ে বলল।)এক সময় অনেক ভালো বন্ধু ছিলাম।সেই বন্ধুত্বের হত্যা নিজ হাতে করেছিস তুই মিহাল।তাই এখন আমার তোকে মারতেও হাত কাঁপবে না। ঠিক যেমন তোর আমাদের বন্ধুত্বকে হত্যা করতে হাত কাঁপেনি।
 
মুনভির কথা শুনে মিহাল ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হলেও তা প্রকাশ করল না। বরং শব্দ করে হেসে উঠলো।তার এহেন কান্ডে অবশ্য মুনভি অবাক হলো না। ছোট বেলা থেকেই তাদের বন্ধুত্ব ছিল তো তাই সে মিহাল কে যতটা চেনে মিহাল নিজেও নিজেকে ততটা চেনে না।মিহাল নিজের হাসি আয়ত্তে এনে বলল___
যখন বন্ধুত্ব ছিল তখন যদি সেই বন্ধুর জন্য মরতে পারি, তাহলে এখন না হয় বন্ধুত্ব শেষ হয়ে জন্মে উঠা শত্রুতামিতে শত্রুর হাতে মরব।তফাত নেই তো কোনো।
 
মিহালের কথায় মনক্ষুণ্ণ হলো মুনভি।এত সহজেই কি বন্ধুত্ব শেষ করা যায় যত সহজে মিহাল বলল কথাটি। কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলল না।মুনভি কে চুপ থাকতে দেখে শায়ান শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল___
মিনু আন্টি কেমন আছেন? 
 
মিহালের কথা শুনে মুনভি কিছুটা স্বাভাবিক হলো। তারপর সেও শান্ত কন্ঠে উত্তর দিল ___
আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আমার সাথে যাই হোক না কেন মা তোকে খুব ভালো বাসে।সময় করে বাড়ি আসিস।
 
মিহাল যেন এই কথাটি শোনার অপেক্ষায় ছিল।কেবল মাথা নাড়িয়ে মুনভির কেবিন থেকে বের হয়ে এলো।বের হয়ে বাইরে থেকে দরজা মিশিয়ে দিল এবং নিজে দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।চোখ বন্ধ করে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলো এবং যথাসম্ভব নিজের আবেগ কে নিজের আয়ত্তে আনার চেষ্টা চালালো।যখন বুঝতে পারলো সে স্বাভাবিক হয়ে গেছে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলো ___
মিহাল খান নিজের আয়ত্তে সব কিছু রাখতে পারে এমনকি নিজের আবেগও।
 
কিন্তু পরক্ষণেই আহত কন্ঠে বলল___
আমি না হয় সত্য জানি না, আমি না হয় সব কিছু শেষ করেছি। কিন্তু চাইলেই তো একবার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারতি, "মিহাল আমি কিছুই করিনি।তুই যা জানিস সব মিথ্যে।"ট্রাস্ট মি মুনভি সকল প্রমাণ কে প্রত্যাখ্যান করে কেবল তোর কথা বিশ্বাস করতাম। কিন্তু তুই কি করলি? আমাদের বন্ধুত্বের উপরে নিজের ইগো কে বেছে নিলি? এক্সপ্লেইন পর্যন্ত করলি না।
 
কথা গুলো বলে মিহাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর গলার টাই ঢিলা করতে করতে বলল__
সত্য কখনো লুকানো যায় না। খুব শীঘ্রই আমি সত্যি জেনে ছাড়বো। কিন্তু এই সবের মাঝে যে আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়েছে তা কখনোই ঠিক হবে না।
কথা গুলো বলেই মিহাল হসপিটাল থেকে হনহনিয়ে বের হয়ে গেল।
 
অন্যদিকে কেবিনের ভেতর বসে থাকা মুনভি আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। তারপর তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল____
ঠিকই তো আগের মতোন অধিকার দেখিয়ে পারমিশন না নিয়ে আমার কেবিনে ঢুকে পরলি।অথচ যাওয়ার আগে একবারও পিছনে ফেরার প্রয়োজন বোধ করলি না? এই ছিল তোর বন্ধুত্ব? সত্য একদিন ঠিকই প্রকাশ পাবে কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে মিহাল।
 
_____________
 
নীলা, আবির এবং ইবাদ মিলে ইরফান আর আরশির বাসর ঘর সাজাচ্ছে। বাড়ির সবাই অবাক না হয়ে পারছে না নীলা কে দেখে।নীলয় মির্জা দরজার ফাঁক দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখছেন।চোখ উনার অশ্রুসিক্ত। 
হারিয়ে গেলেন পুরোনো স্মৃতির মাঝে___
 
অতীত ____
বড় আব্বু দেখো না ইরফান ভাইয়া তার এক বান্ধবীর সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ি আসছে।
 
৭ বছরের নীলা নিজের বড় চাচারা কাছে এসে উনার ছেলের নামে বিচার দিল।নীলার কথা শুনে উপস্থিত সকলে নীলার দিকে দৃষ্টিপাত করল। সেখান নীলয় মির্জা, ইমরান মির্জা, আকাশ মির্জা সকলের উপস্থিত ছিলেন। 
 
ইমরান মির্জা নিজের ভাইজি কে কাছে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে আদুরে স্বরে বললেন___
কেন আমার নীলা মার বুঝি কষ্ট হচ্ছে? 
 
নীলা মাথা নাড়িয়ে বলল___
"তুমিই তো বলেছিলে ইরফান ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ে দিবে তাই যাতে বড় হয়ে কখনো অন্য কোনো ছেলের সাথে কথা না বলি। তাহলে ইরফান ভাইয়া কেন অন্য মেয়ের সাথে কথা বলছে? কই আমি তো কোন ছেলের সাথে কথা বলি না। আমি আমার জিনিস অন্য কারোর সাথে ভাগ করতে পারবো না।আমার মানে সেইটা সম্পূর্ণ আমার।"
নীলার এমন অধিকারী কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল।
 
পুরোনো কথা মনে পড়তেই নীলয় মির্জার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল‌।সাত বছরের নীলা তার ইরফান ভাইয়ার সাথে অন্য কোনো মেয়েকে দেখতে পারতো না। অথচ আজ ২১ বছরের নীলা(অনেকেই বছর নিয়ে কনফিউজ কারণ আমি একবার চেন্জ করে ২৩ দিয়েছিলাম। কিন্তু ২১ই ঠিক আছে।) নিজের হাতে তার ইরফান ভাইয়ার বাসর ঘর সাজাতে ব্যস্ত।এই দৃশ্য নীলয় মির্জা আর বেশিক্ষণ দেখতে পারলেন না।তার মেয়ে যতোই শক্ত দেখাক না কেন নিজেকে কিন্তু ভেতর ভেতর যে শেষ হয়ে গেছে তা তিনি বাবা হয়ে বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পারছেন। চোখের পানি মুছে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।বরণ হবার পর যে তিনি সেই নিজের রুমে ঢুকে ছিলেন এরপর মাত্র বের হলেন মেয়ের খুঁজে।এখন মেয়েকে শক্ত হয়ে থাকতে দেখে তিনি আরো বেশি ভেঙে পরলেন।আর মেয়ের সামনে নিজের ভেঙে যাওয়ার রূপ প্রকাশ করতে চান না বলে আপনার নিজের রুমে চলে গেলেন। 
________________
 
পুরো রুম জবা ফুল দিয়ে সাজালো নীলা। টুকটুকে লাল রঙের জবা ফুল নীলার খুব পছন্দ। কিন্তু ইরফান জবা ফুল পছন্দ করতো না বলে সে নিজের পছন্দ কে বিসর্জন দিয়েছিল কোনো এক কালে।আজ সে নিজের হাতেই ইরফানের বাসর ঘর জবা ফুল দিয়ে সাজালো। সাথে নীল রঙের জালি কাপড় যাতে ইরফানের মনে হয় এইটা তার বাসর ঘর না বরং সাজা পাওয়ার ঘর।আবির আর ইবাদ নীলার সাথে দাঁড়িয়ে পুরো রুমে ভালো করে চোখ বুলায়। আবিরের বুক মোচড় দিয়ে উঠলো আজ এই খানে তার বোনের থাকার কথা ছিল অথচ নিয়তির পরিহাসের ফলে তার বোন এই রুম সাজালো।মুখ দিয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর নীলার উদ্দেশ্যে বলল___
সাব্বাস নীলু সাব্বাস। এই না হলে আমার বোন।
ইবাদ বলে উঠলো ____
"আয়না ঘরের দিন শেষ, বাসর ঘরকে সাজা ঘরে পরিণত করে হল বাংলাদেশ।"
 
আবির শব্দ করে হেসে উঠলো ইবাদের কথা শুনে।নীলা বাঁকা হাসলো তারপর বলল____
এখন সবাই যার যার রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে আসো। বাসর ঘরে ঢুকতে দেওয়ার আগে বরের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে তো। 
 
আবির আরেক দফা অবাক হলো নীলার কথা শুনে।আজ যেন অবাক দিবস। কিন্তু কিছু না বলে আবির আর ইবাদ নিজেদের ঘরে চলে গেল।নীলা একবার চোখ বুলিয়ে নিল ঘরটাতে। চোখের কোণে তার জল জমেছে খানিকটা।নীলা রুমে থাকা ফুল গুলোতে আলতো করে হাত বুলিয়ে আহত কন্ঠে বলল___
আমায় কেন ধোঁকা দিলে ইরফান ভাই? আমি কি দোষ করেছিলাম? আমার সত্যিকারের ভালবাসার এত বড় পুরস্কার না দিলেও পারতে। কোনো কু নজর নেই তোমার নতুন সংসারের প্রতি আর না আছে কোনো অভিশাপ। কিন্তু তোমরা আমাকে এমন ভাবে ভেঙে দিয়েছো যে এখন আমি নতুন নীলা হয়ে জন্মেছি। কিন্তু আমার মনের ভালোবাসা বিশ্বাস অনুভূতি এগুলো আর কখনো কারোর জন্য জন্মাতে পারবে না। আমাকে এমন ভাবে না ভাঙলেও পারতে।
 
কথা গুলো বলতে বলতে নীলার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরার আগেই নীলা উপরের দিকে তাকালো। চোখের পানি চোখে রয়ে গেল। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক 
করে বলল___
তোমরা যদি ভেবে থাকো আমি পাঁচ দশটা ন্যাকা মানুষের মতো বলবো "অথচ আজও লাশ তার খুনি কে ভালোবেসে" তাহলে তোমরা ভুল ভাবছো। খুনের বদলে খুন করবো না বরং তোমাদের করা খুনের প্রতিশোধ নেব।
কথাটি বলে বাঁকা হেসে রুম ত্যাগ করল নীলা।
 
পুরো মির্জা বাড়ি আজ থমথমে। ইরফান আর আরশি ইমরান মির্জার রুম দাঁড়িয়ে আছে। ইরফানের মা তো ছেলের দিকে তাকিয়েও দেখছে না। ইমরান খান নিজের ছেলের উদ্দেশে আবার বলে উঠলেন ____
লজ্জা করল না এমন নিচু কাজ করতে? বিয়েতে মত ছিল না তাহলে কেন মেয়েটির মন নিয়ে খেললে? গায়ে হলুদের দিন কেন হাসতে হাসতে আনন্দ করলে? আর বিয়ের দিনই কেন এমন কাজ করলে? একটা মেয়ের জন্য তার বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া কতটা অপমানজনক তাকে তুমি জানো? অবশ্য তুমি কি করে জানবে তোমার তো নিজেরই কোন মান নেই। 
 
"বাবা"
ইরফান ডাকটি বলতেই ইমরান খান ছেলেকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল___
আমাকে বারবার বাবা ডেকে মনে করিয়ে দিও না যে আমি তোমার মত কুলাঙ্গার কে জন্ম দিয়েছি।যখন বেকার ছিলে তখন নীলা তোমার পাশে ছিল। আজ তুমি যতটুকু তার পেছনে কেবল রয়েছে নীলা আর তুমি সেই নীলা কেই এখন প্রত্যাখ্যান করলে? নীলাকে প্রত্যাখ্যান করার যোগ্যতা কি আদৌ আছে তোমার মাঝে? 
 
ইরফান প্রতি উত্তরে বলার কিছু খুঁজে পেল না। ইমরান মির্জার এইবার নিজের পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন ____
যেখানে নিজের ছেলে দোষী সেখানে তুমি পরের মেয়ে তোমাকে আমি দোষারোপ করব না। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখবে যেই যায়গায় নীলা আমার ছেলেকে সাফল্যতা পেতে সাহায্য করেছে, সেই জায়গায় আমার ছেলে নীলাকে ছেড়ে দিয়েছে। তুমি তো তুচ্ছ্য নীলার সামনে।
 
ইমরান মির্জার কথা বেশ বিধলো আরশির গায়ে।সে যেই না মুখ খুলে কিছু বলতে নিবে তার আগেই ইরফান তার হাত চেপে ধরলো।
 
ইমরান মির্জা তাদের উভয়ের উদ্দেশ্যে বলল___
যাও এখন নিজেদের ঘরে যাও।
 
ইরফান আর আরশি নির্লজ্জের মত ইমরান মির্জার রুম থেকে বের হয়ে গেল। আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগলো ইরফানের ঘরের দিকে। ইরফান নিজের ঘরের সামনে যেতেই গান শুনতে পেল কোনো এক মেয়েলি কন্ঠের।
 
নীলা ইরফানের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে‌।তার এক পাশে আবির এবং অন্য পাশে ইবাদ দাঁড়িয়ে আছে। নীলার পরনে তার নীল শাড়ি এবং সাথে মেচিং করা চুড়ি এবং জুয়েলারি।নীলার হাতে রক্ত জবা ফুল। সে রক্ত জবা ফুলে হাত বুলাতে বুলাতে গান গাইলো ____
হাতে চুড়ি ছাম ছাম বাজে
বসে না মন কোনো কাজে,
প্রেম আসে যায় মনে
তোকে না পাওয়ার কারণে।
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 পর্ব:০৩-০২
 
 
 
 
দরজার সামনে থেকে সর তোরা।
ইরফান কড়া কন্ঠে বলল।
 
নীলা ইরফানের চোখে চোখ রেখে বলল ___
কেন ভাইয়া? আমাদের পরিবারের নিয়ম ভুলে গেছো নাকি?কারোর বিয়ে হলে ছোটরাই তো বাসর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা টাকা নেওয়ার জন্য। কতক কষ্ট করে আমরা তোমাদের বাসর ঘর সাজালাম এইটা তো আমাদের প্রাপ্তি।
 
নীলার কথা শুনে ইরফান এবং আরশি এক সাথে অবাক হয়। তাদের বাসর ঘর নীলা সাজিয়েছে।আরশি আর নিজেকে দমিয়ে না রেখে বলে উঠে___
তুই নিজ হাতে আমাদের বাসর ঘর সাজিয়েছিস? 
 
নীলা স্মিত হেসে জবাব দিল ___
কেন নয় ভাবি? এতটুকু তো করাই যায়।
 
নীলার এমন সম্পর্ক রক্ষা জনক ডাক শুনে আরশি অবাক হয় যেমন ঠিক তেমনি নীলাকে কষ্ট পেতে না দেখে ভেতর ভেতর রাগে জ্বলে উঠলো।
 
ইরফান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নীলার দিকে। পরনে তার নীল রঙের শাড়ি।এই রঙ নীলার খুব পছন্দের কিন্তু ইরফানের অপছন্দ বলে নীলা এই রঙের জিনিস পত্রের ধারের কাছেও যেত না। অথচ আজ সেই নীলা তার পছন্দকে উপেক্ষা করে নিজের পছন্দের কাজ করল‌। ইরফানের কাছে যেন এই নীলা অচেনা। ইরফান রাগী কন্ঠে বলল____
নীলা তোকে না বলেছিলাম আমার নীল রং পছন্দ না তাহলে এই রঙের শাড়ি কেন পরেছিস।
 
নীলার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।সে ইরফানের চোখে চোখ রেখে বলল___
আমি কেন তোমার পছন্দ অপছন্দের খেয়াল রাখবো? তোমার বউ আছে তাকে বরং বলো নীল রঙের জিনিস থেকে দূরে থাকতে।
 
নীলার কথা শুনে ইরফান স্তব্ধ হয়ে গেল।নীলা কখনো তার মুখের উপর এইভাবে কথা বলে নি।নীলার কথা শুনে আরশি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো ___
না বাবা আমার নীল রঙ অনেক পছন্দ। আমি কারোর জন্য নিজের পছন্দ বিসর্জন দিতে পারবো না।আর আমি ভীষণ ক্লান্ত তোমাদের যা নেওয়ার আছে তা নিজেদের ভাইয়ের কাছ থেকে নাও।আমি রুমে গেলাম।
 
কথা গুলো বলেই আরশি নীলা আর ইবাদের মাঝ দিয়ে রুমে চলে গেল। ইরফান এখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কোই নীলা তো কখনো এভাবে বলেনি যে সে নিজের পছন্দকে বিসর্জন দিতে পারবে না। অথচ আরশি কত সহজেই কথা গুলো বলে ফেলল।এই মুহূর্তে যদি আরশি যায়গায় নীলা থাকতো তাহলে কখনোই ইরফান কে এইভাবে ছেড়ে চলে যেত না বরং বলতো আমিও যেমন ক্লান্ত আমার ইরফান ভাই ও তেমন ক্লান্ত।ওকে কেউ বিরক্ত করো না।
ইরফান নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল তখনই আবির
 বলে উঠলো ___
ভাইয়া রুমে গিয়ে চিন্তা ভাবনা করো। আপাতত আমাদের কে টাকা দাও।
 
ইরফান নড়ে চড়ে উঠলো আবিরের কথায়।সে ভীষণ ক্লান্ত এবং বুকের মাঝে এক অজানা শূন্যতা অনুভব করছে তাই আর কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল__
কত টাকা।
 
আবির আর ইবাদ দাঁত বের করে হাসি দিয়ে বলল___
বেশি না মাত্র ১০ হাজার।
 
ইরফান পকেটে থাকে টাকা বান্ডিল বের করে চেক করে দেখল তার কাছে আছে কেবল ৭ হাজার টাকা।
 
নীলা বাঁকা হাসে বললো ___
ভাইয়া এর থেকে বেশি তো আমার কাছেই আছে। যাইহোক এগুলোই দাও আমরা ম্যানেজ করে নিব।
 
ইরফান কিছুটা লজ্জা পেল নীলার কথায়। আগে অনেক টাকা নিয়েছে নীলার কাছ থেকে কিন্তু কখনো লজ্জা পায়নি কিন্তু আজ পাচ্ছে।
 
ইরফান নীলার দিকে টাকা গুলো এগিয়ে দিতেই নীলা আবির কে উদ্দেশ্য করে বলল ___
ভাইয়া টাকা গুলো নিয়ে ছাদে আসো আমরা আড্ডা দেই। কথাটি বলেই নীলা জবা ফুল কানের পেছনে গুজে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। ইরফান আহত দৃষ্টিতে কেবল চেয়ে রইল নীলার পানে। ভাবলো হয়তো নীলা অন্তত একবার পেছন ফিরবে। কিন্তু নীলা সোজা ছাদের দিকে চলে গেল।
 
_________
 
মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে মিহাল। ইসরাতুল ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন ___
কি হয়েছে বাবা? 
 
মিহাল আহত কন্ঠে বলল___
মিনু আন্টির কথা মনে পড়ছে।
 
ইসরাতুল ঠিকই বুঝতে পারলেন ছেলে তার মিনু আন্টির জন্য না বরং মিনু আন্টির ছেলে মুনভির জন্য কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু মিনুর কথা শুনে তার মনে পুরোনো স্মৃতি জাগ্রত হলো। অবশ্য এগুলো সে কখনোই ভুলেনি।
 
মিহাল মায়ের নিরবতা কারণ উপলব্ধি করতে পেরে বলল____
তোমার ছেলের উপর ভরসা রাখ মা।আমি সব ঠিক করে দেবো।
 
ইসরাতুল কিছু বলল না কেবল ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নীরবে চোখের জল ফেলল.।
 
_____________
 
বাসর ঘরে ঢুকতেই ইরফানের যেন জান যায় যায় অবস্থা। পুরো রুম জবা ফুল দিয়ে সাজানো। সাথে নীল রঙের জালি কাপড়‌।
 
আরশি এতক্ষণে পরনে লাল রঙের শাড়ি খুলে ইরফানের শার্ট এবং টাওজার পরে বসে আছে।তার খেয়ালই নেই যে এই রুমে তার স্বামী ঠিকমত দম দিতে পারবেনা। 
 
ইরফান আরশি কে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরশি বলে উঠলো ___
ওহ্ কামন ইরফান, আজ কিছু হবে না। আমি অনেক ক্লান্ত। আর এমনিতেও তোমাদের বাড়ি আসার পর থেকে আমার পরিবার কম কথা শোনায়নি আমাকে। আজকে রাতে কিছু হবার আশা করোনা। আর এমন তো নয় যে আমাদের মাঝে কখনো কিছু হয়নি। এসব তো অনেক আগেও অনেকবার হয়েছে। তাই আমাকে এখন ঘুমাতে দাও।
 
কথাগুলো বলে আরশি বিছানায় শুয়ে পরল গায়ে কমফোর্ট জড়িয়ে।
 
ইরফান রাগে দুঃখে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে চলে গেল।তার রাগ মূলত আরশির উপর কিন্তু নীলার উপর আজ সে তার সকল রাগ ঝাড়বে। 
নীলা, আবির আর ইবাদ মিলে ছাদে চেহারা নিয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিল এবং আইসক্রিম খাচ্ছিলো। এমন সময় ইরফান রাগে গজগজ করতে করতে ছাদে এলো এবং নীলার হাত থেকে আইসক্রিম কেড়ে নিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল।
 তারপর দাঁতের দাঁত চেপে বলল ____
তুই চাস না আমি বাসর করি।
তাই ইচ্ছে করে এমন করেছিস তাই না? 
 
ইরফানের কাজ দেখে আবির রেগে গেল।ইবাদ কেবল নিরব দর্শকের মত সবকিছু দেখতে লাগলো। 
 
নীলা শব্দ করে হেসে উঠলো। তার হাসি শুনে সবাই অবাক। নীলা হাসতে হাসতে বলল____
তোমার বাসর করা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই ইরফান ভাইয়া। এখন তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে বাসর করবে নাকি রাস্তার কুকুরের সাথে সেটা নিতান্তই তোমার ব্যাপার।
 
নীলার কথা শুনে ইবাদ আর আবির শব্দ করে হেসে উঠলো।আর ইরফান আবারো স্তব্ধ হয়ে গেল। সে যেন এই নীলার রূপ হতে অজ্ঞাত 
 
 
 
Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner