গল্প:সখি তোরা প্রেম...
 
Notifications
Clear all

গল্প:সখি তোরা প্রেম করিও না


Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

নিজের স্বামীকে অন্য একটা মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে থমকে গেল সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নীলাশা। নিজের চোখ কে আজ বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। ঘনিষ্ঠ অবস্থায় থাকা মেয়েটা আর অন্য কেউ নয়, তার স্বামীরই খালাতো বোন।

 

অনিকের সাথে তার বিয়ে হয়েছে প্রায় চার বছর। তার আগে এক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাদের। এতগুলো দিন পর তাদের ঘর আলো করে একটা নতুন প্রাণের আগমন ঘটতে চলেছে। এই সুখের সময় অনিক যে অন্য এক নারীতে মত্ত হতে পারে, তা নীলাশা স্বপ্নেও ভাবেনি। নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে দরজার সাথে বাড়ি খেল। এতে আধভেজানো দরজাটা খুলে গেল। আর সেই শব্দে মুহূর্তেই ছিটকে দূরে সরে গেল ভেতরে থাকা দুই নর-নারী।

 

নীলাশাকে দেখে চমকাল তারা। কারণ সে চেকআপ করাতে হাসপাতালে গিয়েছিল। অনিক সকালে অফিসে গিয়েছিল, তবে নীলাশারা বেরিয়ে যেতেই বর্ষা তাকে ফোন করে ডেকেছে। কিছুদিন ধরে সে এই বাড়িতেই থাকছে। সকলের অগোচরে ভালোই চলছে তাদের সম্পর্ক। অনিক নিজের পরনের শার্ট ঠিক করে নীলাশার কাছে এগিয়ে এসে বলল,

—“নীল, তুমি যেমনটা ভাবছো, এমন কিছুই হয়নি এখানে।”

 

—“তো কেমন হয়েছে, অনিক?”

 

—“আসলে…”

 

নীলাশা ভারী পেটটা ধরে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল,

—“আসলে তুমি আমার অবর্তমানে আমাদের ঘরে তোমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে একান্ত কিছু সময় কাটাচ্ছিলে, তাই তো?”

 

অনিক কিছু বলতে চাইল, তবে তার আগেই তাকে সপাটে চড় মারলেন তার বাবা আতিফ উদ্দিন। তিনি নীলাশার পেছনেই ছিলেন। অনিককে ডাকতে এসেছিলেন।

 

—“ছি ছি, আজ আমার লজ্জা লাগছে তোকে মতো কুলাঙ্গারকে নিজের ছেলে বলতে।”

 

তার চিৎকার শুনে ঘরে ছুটে এলো অনিকের বোন অনিতা আর তার মা ফিরোজা খাতুন। অনিতা আর নীলাশা অনেক পুরোনো বন্ধু। অনিতার সূত্র ধরেই অনিকের সাথে নীলাশার পরিচয়, প্রেম, অতঃপর বিয়ে।

 

—“কি হয়েছে, বাবা?”

 

কথাটা বলেই অনিতার চোখ গেল দূরে কোনো রকমে গায়ে শাড়ি জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বর্ষার পানে। আর্তনাদ করে উঠল সে,

—“হায় আল্লাহ!”

 

ফিরোজা খাতুন পাশেই দাঁড়িয়ে সবটা দেখছেন। তবে কিছু বললেন না তিনি। অনিতা নীলাশাকে আকড়ে ধরে অনিককে উদ্দেশ্য করে বলল,

—“এমনটা কেন করলি, ভাই? তোকে তো ভাই বলতেও লজ্জা লাগছে।”

 

গর্জে উঠল অনিক,

—“কে বলেছে ভাই বলতে? বলিস না। আমি পুরুষ মানুষ। আমারও কিছু চাহিদা আছে। নিজেকে আয়নায় দেখেছে ও? এখন তো ওর দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করে না।”

 

এবার আরেকটা চড় পড়ল তার গালে। এটা দিয়েছে নীলাশা।

—“আমি তোমার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য জীবন-মরণ লড়ছি, আর তুমি পড়ে আছো চাহিদা নিয়ে! আর আমার নিজের এই অবস্থা তোমার বাচ্চাকে এই পৃথিবীতে আনার যুদ্ধের জন্যই হচ্ছে। তবে তোমার মতো মূর্খ ব্যক্তি তা কি করে বুঝতে পারবে?”

 

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে হাইপার হয়ে গেল নীলাশা। বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলাতে চাইল। এমনিতে যথেষ্ট সুন্দরী সে। দুধে-আলতা গায়ের রঙ তার। বাচ্চা পেটে আসায় একটু স্বাস্থ্যটা বেড়েছে। তবে এতে তার সৌন্দর্য কমার বদলে বেড়েছে শতগুণ। তবে হারামে মজা মানুষ কি আর হালালে খুশি থাকে? অনিতা দৌড়ে গিয়ে পানি নিয়ে এলো তার জন্য। বর্ষা প্রত্যেকটা বিষয় দেখছে আর মনে মনে খুশি হচ্ছে। নীলাশার প্রত্যেকটা জিনিসের প্রতি তার যে প্রবল লোভ।

 

ছেলের কথা আর নীলাশার অবস্থা দেখে ছেলের গালে আর একটা চড় মারলেন আতিফ উদ্দিন। তা দেখে ফিরোজা খাতুন এগিয়ে এসে বললেন,

—“কি করছো? এত বড় ছেলের গায়ে হাত তুলছো কেন?”

 

—“আজ একটা কথাও বলবে না তুমি। তোমার আস্কারা পেয়েই আজ ওর এই অবস্থা।”

 

তারপর ছেলেকে উদ্দেশ্য করে শক্ত কণ্ঠে বললেন,

—“বেরিয়ে যা। এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।”

 

—“বাবা…”

 

—“ওই মুখ দিয়ে খবরদার আমায় বাবা ডাকবি না। আর এই অজাতটাকেও নিয়ে বেরিয়ে যা। ওকে এই বাড়িতে থাকতে দেওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল।”

 

—“ওগো, কি বলছো তুমি এসব? ছেলেটা কোথায় যাবে?”

 

এসব দেখে বর্ষা অসহায় মুখ করে তাকাল অনিকের পানে। অনিক তাকে অভয় দিল। তাদের এই নাটক আর সহ্য করতে পারল না অনিতা। নীলাশাকে ছেড়ে বর্ষার কাছে এগিয়ে গিয়ে সশব্দে চড় মারল তার গালে। তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল বর্ষা।

 

চেচিয়ে উঠলো অনিক,

—“অনিতা, তোর সাহস কি করে হয় ওর গায়ে হাত তোলার?”

 

অনিকের কথা শুনে তার পানে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে একপলক তাকাল নীলাশা। এই মানুষটার জন্য এক সময় সে তার বাবা-মায়ের সাথে ঝামেলা করেছিল। উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় তার বাবা কখনোই তার আর অনিকের সম্পর্কটা মেনে নেননি। নীলাশা একপ্রকার বাবা-মায়ের অমতে গিয়েই বিয়ে করেছিল তাকে। এই জন্য তার বাবা তার সাথে কথা বলে না বহুদিন। আর আজ এই পুরুষটা কি করল? তার এতো ত্যাগের কি প্রতিদান দিল? তাই তাচ্ছিল্য হেসে বলল, 

 

—“কেন? খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি নিজের রক্ষিতার জন্য?”

 

—“নীলাশা…”

 

—“আওয়াজ নিচে। এত কিছুর পরেও আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস কোথায় পাও তুমি?”

 

অনিক চুপ করে গেল। তাদের সাথে আর কথা না বলে ফুসতে ফুসতে বর্ষাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। পেছন থেকে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেন ফিরোজা খাতুন।

 

—“যাস না বাপ। যাস না।”

 

মায়ের কথা না শুনে বেরিয়ে এলো অনিক। বাইরে এসে বর্ষা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

—“আমরা এখন কোথায় যাব, অনিক? সবটা আমার জন্য হয়েছে।”

 

অনিক নরম কণ্ঠে বলল,

—“তোমার কোনো দোষ নেই। আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগে গেছে। এখন আমরা আমার ফ্ল্যাটে যাব। বাচ্চাটা হওয়ার পরে না হয় নীলকে ডিভোর্স দিয়ে বাচ্চাটাকে নিজের কাছে নিয়ে আসব।”

 

ডিভোর্সের কথায় খুশি হলেও বাচ্চা নিজের কাছে রাখার ব্যাপারটা ভালো লাগল না বর্ষার। সেই ছোট থেকে সে অনিককে ভালোবাসে। কিন্তু সেটা বলার আগেই তার বাবা তার বিয়ে দিয়ে দিল। সেখানে সে ভালোই ছিল। তবে একদিন যখন দেখল অনিক নীলাশার সাথে সুখী আছে, তখন আবার সেই পুরনো ভালোবাসা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সহ্য হলো না তাদের এই সুখ। তাই তো নিজেই স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে অসহায় সেজে এসে উঠল অনিকদের বাড়িতে। আর তারপর অনিককে নিজের জালে ফাঁসাতে তার খুব একটা সময় লাগেনি।

 

অনিক বেরিয়ে যেতেই ভেঙে পড়ল নীলাশা। তাদের এত বছরের ভালোবাসা, বিশ্বাসকে অনিক একপলকেই ভেঙে দিতে পারল? প্রতারণা করার আগে একবারও কি তাদের অনাগত সন্তানের কথা তার মনে পড়ল না?

অনিতা এসে জড়িয়ে ধরল নীলাশাকে। সে কল্পনাও করতে পারেনি তার ভাই এমন কিছু করবে। নীলাশা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে গেল। এত এত ভালোবাসা, ত্যাগ, বিশ্বাস, ন্যায়নিষ্ঠার শেষে সে কি পেল সে? শুধুই প্রতারণা ছাড়া। 

 

বাইরে থেকে ফিরোজা খাতুনের কণ্ঠ ভেসে আসছে। ছেলের জন্য তিনি হা-হুতাশ করছেন। অথচ একজন নারী হয়ে একবারও তার ছেলের করা কুকর্মের কথা তার স্মরণ হলো না। আতিফ উদ্দিনের আজ নিজেকে ব্যর্থ মনে হলো। নিজের আদর্শে তিনি ছেলেটাকে মানুষ করতে পারেননি। নীলাশার মাথায় হাত রেখে অসহায় কন্ঠে বললেন,

—“পারলে এই বাবাটা কে ক্ষমা করে দিস, মা।”

 

নীলাশা তার অশ্রুভরা ডাগর ডাগর চোখ তুলে তাকাল শ্বশুর নামক বাবার পানে। নিজের বাড়ি ছেড়ে আসার পর এই লোকটা যে তাকে কখনোই বাবার অভাব বুঝতে দেননি। মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে গেছেন সবসময়।

 

 

 

 গল্প:সখি তোরা প্রেম করিও না

 

লেখনিতে:সুমাইয়া তুলি 

 

 

 

 

Loading spinner

Reply
2 Replies
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

  পর্ব:২ 

 

      

 

রাতটা বিষণ্নতায় কাটানোর পর সকালে নিজের লাগেজ নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো নীলাশা। কিন্তু এখন যাবে কোথায় সেটাই বুঝে উঠতে পারল না। মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও বাবার সঙ্গে বহুদিন কথা হয় না। বিয়ের সময় তিনি নারাজ ছিলেন সেই অভিমান আজও রয়ে গেছে। তার থেকেও বড় কথা, কোন মুখে যাবে সেই বাড়িতে?

 

এদিকে নিজের সব সঞ্চয় সে অনিককে ফ্ল্যাট কেনার সময়ই দিয়ে দিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই নিচে নেমে দেখতে পেল অনিতা আর নিজের শ্বশুর-শাশুড়িকে। ফিরোজা খাতুন কাল থেকে একবারও নীলাশার সঙ্গে কথা বলেননি। উল্টো দোষারোপ করেছেন। নীলাশার জন্যই নাকি তার ছেলে আজ তার কাছে নেই। এই নিয়ে রাতে আতিফ উদ্দিনের সঙ্গে তার এক দফা ঝগড়া হয়েছে। নীলাশা অনিতার ঘর থেকে সবটাই শুনেছে। কাল রাতে সে ওই ঘরেই ছিল; অনিকের ঘরে যাওয়ার রুচি হয়নি তার।

 

নীলাশাকে দেখে অনিতা ছুটে এসে ভেজা কণ্ঠে বলল,

—“আমিও আজ চলে যাব শ্বশুরবাড়ি। এ বাড়িতে আর আসব না। মা থাকুক তার কুলাঙ্গার ছেলেকে নিয়ে।”

 

ফিরোজা খাতুন সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলেন,

—“এসব কী কথা, অনি! ভাই হয় তোর। আর ছেলেদের অমন একটু-আকটু দোষ থাকেই। তাই বলে কি বউ হয়ে স্বামীর গায়ে হাত তুলতে হবে? ছি ছি, কী দিনকাল পড়ল!”

 

নীলাশা অনেক কিছুই বলতে পারত, কিন্তু তার ইচ্ছে করল না। অনিতা এগিয়ে এসে বলল,

—“তার মানে আমার স্বামীও যদি এমন কিছু করে, তাহলেও তুমি একই কথা বলবে, মা?”

 

হইহই করে উঠলেন ফিরোজা খাতুন,

—“বালাইশাট! আশিক এমন কেন করবে? এসব অলুক্ষণে কথা কে মুখে আনে!”

 

স্ত্রীর কথা শুনে আতিফ উদ্দিন বললেন,

—“যেই নিজের মেয়ের কথা উঠল, অমনি পাল্টি খেয়ে গেলে। আসলেই তুমি কখনো ওই মেয়েটার মা হতে পারনি—শাশুড়িই রয়ে গেছ।”

 

আর কথা বাড়ালেন না ফিরোজা খাতুন। মুখ ঝামটা দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। প্রথমে তিনি এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন নীলাশার বাবার অর্থ-সম্পদ দেখে। কিন্তু বিয়ের পর এই মেয়ে কী করল! বাবার সঙ্গে যোগাযোগই বন্ধ করে দিল!

 

ফিরোজা খাতুন চলে যেতেই বাড়িতে আগমন ঘটল এক পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষের। তার চাকচিক্যময় চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য। তাকে দেখে ছলছল করে উঠল নীলাশার চোখ। পুরুষটি নীলাশার জন্মদাতা পিতা নাজিম চৌধুরী। নীলাশার ইচ্ছে করল দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে। তবে তার হাত-পা যে অদৃশ্য কোনো শেকলে বাঁধা। কিন্তু যে মানুষ এত বছরে একবারও এ মুখো হয়নি, সে হঠাৎ এখানে কী করছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই নীলাশা তাকাল আতিফ উদ্দিনের দিকে। তিনি এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

 

—“বাবা বলে ডেকেছিলি, তবে সেই বাবার দায়িত্ব তো পালন করতে পারলাম না। তাই তোর আসল বাবাকে ডেকেছি।”

 

নাজিম চৌধুরী একমাত্র মেয়ের দিকে তাকালেন। তার ছোট্ট মেয়েটা আজ একটি ছোট্ট প্রাণকে নিজের মাঝে ধারণ করছে। মেয়ের সঙ্গে কথা না বললেও তার খোঁজখবর তিনি ঠিকই নিয়েছেন। বাচ্চা পেটে আসার পর তিনি নিজের স্ত্রীকে দিয়ে অনেকবার বলিয়েছেন, যাতে সে তাদের বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু জেদি মেয়েটা সেটাও শোনেনি। অনিক ছেলেটিকে তার কোনো কালেই পছন্দ ছিল না। তবু মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে বিয়েটা মেনে নিয়েছিলেন। এমনকি মেয়ের সুখের জন্য ছেলেটার চাকরি হওয়ার পেছনেও তিনিই কলকাঠি নেড়েছেন। কাল রাতে আতিফ উদ্দিন যখন ফোন করে তাকে সবটা জানালেন। তখন ওই অনিক কে তার খু/ন করতে ইচ্ছে করছিল। সবটা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। তারপর নিজ কন্যার দিকে এগিয়ে গিয়ে বহুদিনের জমে থাকা অভিমান ভেঙে বললেন,

—“বুঝলেন, আতিফ সাহেব? কেউ একজন আমাকে এতটাই পর করে দিয়েছে যে নিজের সমস্যাটাও এখন আর মুখ ফুটে বলে না।”

 

নিজেকে আর আটকাতে পারল না নীলাশা। বাবাকে জড়িয়ে ধরে আহাজারি করে কেঁদে উঠল সে। কাল থেকে জমে থাকা কষ্টটা চিৎকার করে বের করে দিল। সেই শব্দে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ফিরোজা খাতুন। এদিকে নাজিম চৌধুরী মেয়েকে আটকালেন না কাঁদতে দিলেন।

 

—“স-সবটা আ-আমার দোষ, বাবা। ত-তোমার কথা না শোনার ফল। সব দোষ আমার। অনিক… অ-নিক…”

 

মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন নাজিম চৌধুরী।

—“ওই ছেলের নাম নিজের মুখেও নিও না। খাঁটি সোনা ছেড়ে যে কয়লাকে বেছে নেয়, তার নাম তোমার মুখে শোভা পায় না।”

 

তারপর মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে ফিরোজা খাতুন বলে উঠলেন,

—“আরে বেয়াই সাহেব, এই ছোটখাটো ঝামেলা তো কথা বলেই মিটমাট করা যায়। এই সময় ওকে নিয়ে চলে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?”

 

শাশুড়ির কথায় হাসি পেল নীলাশার। কাল থেকে একবারও তিনি তাকে থাকার বিষয়ে একটি কথাও বলেননি, অথচ বাবাকে দেখে কী সুন্দর পাল্টিটাই না খেলেন! তার কথায় থেমে গেলেন নাজিম চৌধুরী। পেছন ফিরে বললেন,

—“ছোটখাটো ঝামেলা? তা বেশ, ডাকুন আপনাদের ছেলেকে মিটমাট করি। নাকি সে বাড়িতে নেই? তো কোথায় আছে সে? আমার মেয়ের টাকায় কেনা ফ্ল্যাটে? কার সঙ্গে আছে, জানেন নিশ্চয়ই—নাকি আমাকে বলতে হবে?”

 

তার কথায় চুপসে গেলেন ফিরোজা খাতুন। উল্টো ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে নাজিম চৌধুরী আবার বললেন,

—“আর হ্যাঁ, জেলে যাওয়ার জন্য তাকে প্রস্তুত থাকতে বলবেন।”

 

তারা চলে যেতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন ফিরোজা খাতুন। তার ভাষ্যমতে, এত সামান্য একটি ভুলের জন্য তার ছেলেকে কেন জেলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হবে? আতিফ উদ্দিন স্ত্রীর কথায় ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তিনিও তো এক কন্যার পিতা; তাই তিনি চান ওই কুলাঙ্গার ছেলের সঠিক বিচার হোক। অনিতাও ফিরে গেল শ্বশুরবাড়ি। যদিও সেখানে তাকে অনেক কথা শুনতে হবে ভাইয়ের এই কুকর্মের জন্য।

 

———

 

সকালবেলা উঠেই পটের বিবি সেজে বসে আছে বর্ষা। অনিকের দেওয়া গহনাগুলো পরেছে সে। ওবাড়িতে থাকতে তো আর সেগুলো পরতে পারত না। অনিক একটা কর্পোরেট অফিসে চাকরি করে। নীলাশার কথায় একসময় অতিরিক্ত সৎ ছিল সে। তাই সাদামাটা জীবনই কাটাত। কিন্তু এসব বর্ষার পোষাত না। তাই অনিককে ধীরে ধীরে ফুসলিয়ে ঘুষ নিতে শিখিয়েছে সে। আর সেই টাকাতেই বানানো হয়েছে এই গহনাগুলো। এমন সময় অনিক ওয়াশরুম থেকে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে বলল,

—“বর্ষা, অফিসে যেতে লেট হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি নাশতা রেডি করো।”

 

বর্ষা কথাটাকে গুরুত্ব না দিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে বলল,

—“আমায় কেমন লাগছে, অনিক?”

 

—“প্রতিদিন যেমন লাগে।”

 

—“মানে?”

 

—“আরে, সুন্দর লাগছে। এখন প্লিজ খাবার রেডি করো।”

 

খুশি হয়ে রান্নাঘরে চলে গেল বর্ষা। কিছুক্ষণ পর অনিক ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার মুখে দিতেই তার মুখ কালো হয়ে গেল। লবণ অতিরিক্ত বেশি। তাই আর এক লোকমাও না খেয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

 

—“উঠলে কেন?”

 

—“খাবারে লবণ বেশি।”

 

—“আরে, এই সামান্য বিষয়ে তুমি খাবার ফেলে উঠে যাচ্ছ? একদিন একটু ম্যানেজ করে নিলেই তো হয়।”

 

বর্ষার গা-ছাড়া কথায় ভেতরে ভেতরে রেগে গেল অনিক। ম্যানেজ করবে মানে কী? আগে তো কখনো তাকে কিছু ম্যানেজ করতে হয়নি। নীলাশা সেই সুযোগই দেয়নি। তার কাজেও কখনো ভুলও খুঁজে পায়নি অনিক। এরই মাঝে বর্ষা আবার বলল,

—“নীলাশাকে ডিভোর্স কবে দেবে, অনিক?”

 

—“তাড়াতাড়িই।”

 

—“ঠিক আছে। আর হ্যাঁ, আসার সময় আমার জন্য কিছু দামি শাড়ি কিনে এনো। ওবাড়ি থেকে তো কিছুই আনতে পারলাম না।”

 

অনেকটা আফসোসের সুরে বলল বর্ষা। তার কথার জবাবে অনিক শুধু বলল,

—“হুঁ।”

 

তারপর না খেয়েই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল সে। অনিক চলে যেতেই আবার সাজগোজে মত্ত হয়ে উঠল বর্ষা।

 

———

 

অনেকগুলো বছর পর নিজের বাড়ির প্রাঙ্গণে পা রাখল নীলাশা। কত হাসি, কত কান্নার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িকে ঘিরে। মেয়েকে দেখেই ছুটে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন বনলতা।

 

—“আমার বাচ্চাটা।”

 

মায়ের উষ্ণ আলিঙ্গনে অন্তত একটা প্রশান্তি নেমে এলো নীলাশার মনে। এই মানুষগুলোকে ছেড়ে সে অনিকের মতো একজনকে বেছে নিয়েছিল—ভাবতেই নিজেকে ধিক্কার দিল। মাকে ছেড়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই চোখ পড়ল তাদের পেছনে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকা আয়ানের দিকে।

 

আয়ান তার বেস্ট ফ্রেন্ড। বাবার বন্ধুর ছেলে। তাদের বাড়িও একই এলাকায়। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গেই বড় হয়েছে তারা। কিন্তু বিয়ের পর এই বন্ধুত্ব তাকে ভেঙে দিতে হয়েছে। কারণ অনিকের পছন্দ ছিল না, নীলাশার কোনো ছেলে বন্ধু থাকুক। আয়ান এগিয়ে এসে নীলাশাকে পাশ কাটিয়ে নাজিম চৌধুরীর কাছে গিয়ে বলল,

—“একে তো নিয়ে এসেছেন। তবে ওই জানোয়ারটার কী ব্যবস্থা করলেন?”

 

—“আজই উকিলের সঙ্গে কথা বলব। আগে ডিভোর্সটা হয়ে যাক, তারপর ওকে দেখছি।”

 

আয়ান প্রচণ্ড রাগ নিয়ে বলল,

—“আপনাকে দেখতে হবে না। আমি ওকে দেখে নেব। আর আমার এক পরিচিত উকিল আছে, তার সঙ্গে আমি আগেই কথা বলেছি।”

 

বনলতা বললেন,

—“ভালো করেছিস বাবা। যত তাড়াতাড়ি পারিস, ওই নরক থেকে আমার মেয়েটাকে মুক্ত কর।”

 

আয়ান আড়চোখে মাথা নিচু করে থাকা নীলাশার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তা তো করবই। তবে একটু সময় লাগবে। হাজার হোক, ওই নরকে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য তো আপনার মেয়ে সব বিসর্জন দিয়েছিল। আর কিছুদিন না হয় থাকত ওখানেই।আংকেল একটা ভুল করে ফেলেছেন। ওকে আরও কিছুদিন তার পেয়ারের স্বামীর সঙ্গেই রাখা উচিত ছিল।”

 

নীলাশা করুণ চোখে তাকাল আয়ানের দিকে। আয়ান যে এখনো তার ওপর রেগে আছে সেটা তার কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। আর রেগে থাকাই তো স্বাভাবিক। তাই সে খুব ধীর কণ্ঠে ডাকল,

—“আয়ান…”

 

আয়ান না শোনার ভান করে বাড়ির বাইরে চলে গেল। তা দেখে বনলতা আবার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

—“চিন্তা করিস না। ওকে তো চিনিস। বেশিক্ষণ তোর ওপর রাগ ধরে রাখতে পারবে না।”

 

কিন্তু নীলাশা জানে, এবার আয়ানের রাগ সহজে গলবে না। তার ভুলটা যে অনেক বড়।

 

—“আমি ভুল মানুষকে বেছে নিয়ে তোমাদের কষ্ট দিয়েছি, মা। আমায় ক্ষমা করে দাও।”

 

—“সন্তানের ওপর কি বাবা-মা রাগ করে থাকতে পারে? তবে শোন, বাবা-মা যা বলে, ছেলেমেয়ের ভালোর জন্যই বলে। অনেক সময় আমরা সেটা বুঝতে পারি না। উল্টো তাদের ওপরই অভিমান করি।”

 

নাজিম চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন,

—“যা হয়েছে, সব ভুলে যাও। নতুন করে নিজের জীবনটা সাজাও। একটা জানোয়ারের জন্য জীবনে থেমে থাকার কোনো মানে হয় না।”

 

নীলাশা দু’হাতে বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরল। সেও থেমে থাকতে চায় না। আর থাকবেও না। সে এগিয়ে যাবে, বহুদূর।

 

———

 

গভীর রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎই ভেসে এলো নীলাশার তীব্র চিৎকার। মেয়ের পাশে শোয়া বনলতা সবার আগে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। পাশের ঘর থেকে নাজিম চৌধুরীও ছুটে এলেন। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে নীলাশা।

 

—“মা… খুব ব্যথা করছে…”

 

বনলতার বুক কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন,অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ থেকে তার প্রিম্যাচিউর লেবার পেইন শুরু হয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাড়ির সবাই জেগে উঠল। আয়ানও ছুটে এলো। সে আজ এই বাড়িতেই ছিল। পরিস্থিতি দেখে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

 

নাজিম চৌধুরী দ্রুত গাড়ি বের করার জন্য ড্রাইভারকে ফোন করলেন। কিন্তু অপেক্ষা করার সময় নেই বুঝে নিজেই চাবি তুলে নিলেন। আয়ান সাবধানে নীলাশাকে কোলে তুলে নিল। এতদিনের অভিমান, রাগ সব যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। এখন শুধু একটাই চিন্তা, নীলাশা আর তার অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে হবে।

 

কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি ছুটল হাসপাতালের দিকে। বনলতা পেছনের সিটে মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে দোয়া পড়ছেন। আয়ান শক্ত হাতে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে। তার পাশেই নাজিম চৌধুরী বসে মেয়েকে অভয় দিয়ে যাচ্ছেন।

 

 

Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

  অন্তিম পর্ব

 

       

 

মাঝে কেটে গেছে তিন মাস। ঘুষ নেওয়ার অপরাধে প্রায় দুই মাস আগেই অনিকের চাকরিটা চলে গেছে। বর্তমানে সে জেলে আছে। তাকে ছাড়াতে আতিফ উদ্দিন একবারও আসেননি। এরই মধ্যে নীলাশার সন্তান হওয়ার খবরও পৌঁছে গেছে তার কানে। তাই ডিভোর্স পেপারে সই করার সময় বেশ ঝামেলা করেছিল সে। তবে শেষ পর্যন্ত তাতে কোনো লাভ হয়নি।

 

আজ তাদের মামলার শেষ শুনানি। সম্ভবত আজই সবকিছুর নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। জেলে আসার প্রথম কয়েকদিন বর্ষা তার সাথে দেখা করতে এলেও এখন আর আসে না। আদালতের নির্দেশে নীলাশার মালিকানাধীন ফ্ল্যাটটি ফেরত দিতে হওয়ায় সেখানেও থাকতে পারেনি সে। পরে ফিরোজা খাতুনের কাছ থেকে খবর পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে নাকি কোনো ধনী লোককে বিয়ে করে বিদেশে চলে গেছে বর্ষা। কথাটা শুনে ভীষণ চমকে উঠেছিল অনিক। নিজের কৃতকর্মের জন্য গভীর অনুশোচনায় ভরে উঠেছিল তার মন। তবে কথায় তো আছে— সময় চলে গেলে সাধন হয় না।

 

———

 

সকালে উঠে তৈরি হচ্ছে নীলাশা। অনিককে বিয়ে করার পর মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল সে। কতটাই না বোকা ছিল সে তখন! তাই আবার নতুন করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। বাচ্চাকে সামলানোর দায়িত্বও তাকে খুব একটা নিতে হয় না। সারাদিনই ছোট্ট শুভ্র লেপ্টে থাকে আয়ানের সাথে। আয়ানও নিজের সব কাজ ফেলে তাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আর বাচ্চাটার নামও সেই রেখেছে। সেদিন নীলাশার একটি ছেলে হয়েছিল। তবে সাত মাসে জন্ম নেওয়ায় দীর্ঘদিন তাকে নিওনেটাল আইসিইউ (NICU) তে রাখা হয়েছিল। সেই কয়েকটা দিন হাসপাতালেই কাটিয়েছে সবাই। আতিফ উদ্দিন আর অনিতাও এসে দেখে গেছেন তাকে। এখন পুরো বাড়ির সবাই মেতে থাকে ছোট্ট শুভ্রকে ঘিরে।

 

আজ কোর্টে যেতে হবে। তাই তৈরি হয়ে নিচে নেমে নীলাশা দেখল আয়ান একটা বেবি ক্যারিয়ার ব্যাগে শুভ্রকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে। নীলাশাকে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,

—“রেডি?”

 

—“হ্যাঁ। কিন্তু শুভ্রকে সাথে নিয়ে যাবি?”

 

আয়ান নাদুসনুদুস ছোট্ট শুভ্রের গালে চুমু খেয়ে বলল,

—“যেখানে যাব, বাডিকে সাথে নিয়েই যাব। কি বলো বাডি?”

 

ছোট্ট শুভ্র মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বের করতে লাগল। ঠিক তখনই নাজিম চৌধুরী একটা বড়সড় ব্যাগ নিয়ে এসে বললেন,

—“আয়, আমি রেডি। এখন যাওয়া যাক।”

 

ব্যাগটা দেখে নীলাশা ভুরু কুঁচকে বলল,

—“এটা কেন নিয়েছো বাবা?”

 

নাজিম চৌধুরী একগাল হেসে বললেন,

—“আরে এতে শুভ্র নানুভাইয়ের সব দরকারি জিনিস আছে।”

 

নীলাশা বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আমরা তো কয়েক ঘণ্টার জন্য যাচ্ছি, কয়েক দিনের জন্য না! মা, তুমি কিছু বলো।”

 

বনলতা এগিয়ে এসে অসহায় ভঙ্গিতে বললেন,

—“আমি আর কি বলব? আমার কথা তো কেউ শোনে না।”

 

ঠিক তখনই কথার মধ্যে ঢুকে পড়লেন আশা বেগম, আয়ানের মা।

—“ওদেরকে আর কি বোঝাবেন ভাবি? দেখুন তো, আরও একজন একটা ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়েছে।”

 

সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল নুরুল আমিনের দিকে। তার হাতেও একটা ব্যাগ। তিনি নাজিম চৌধুরীর হাতে ব্যাগ দেখে একটু অসন্তোষ নিয়ে বললেন,

—“আরে নাজিম, তোমাকে তো কালই বলেছিলাম সব দরকারি জিনিস আমি নিয়ে আসব। তারপরও তুমি আবার এসব কেন নিলে?”

 

নাজিম চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন,

—“যদি প্রয়োজন হয়! তাই আর কি…”

 

এদের হাবভাব দেখে নীলাশার মনে হলো এরা আদালতে না, পিকনিকে যাচ্ছে! সে এগিয়ে গিয়ে দুইজনের হাত থেকেই ব্যাগ নিয়ে বলল,

—“দুটো ব্যাগ নিয়ে আমরা কোথাও যাচ্ছি না। যা যা দরকার, সব আগেই নেওয়া হয়েছে।”

 

দুই বন্ধুর মুখ একসাথে মলিন হয়ে গেল। তাদের সেই অবস্থা দেখে হাসি চেপে রাখতে পারল না নীলাশা। এদিকে আশা বেগম ছেলের কাছে গিয়ে বললেন,

—“ওকে একটু আমার কাছে দে! সেই কখন থেকে তুই একাই নিয়ে আছিস।”

 

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

—“একদম না। বাডি কোথাও যাবে না। আমার কাছেই থাকবে। তাই না বাডি? বলো বলো!”

 

আশা বেগম মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। কতদিন পর আবার তার ছেলেটাকে আগের মতো হাসিখুশি লাগছে।

তার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে—নীলাশাই তার ছেলের জন্য একদম পারফেক্ট। বিয়ের প্রস্তাবও দিতে চেয়েছিলেন একসময়। কিন্তু তার আগেই নীলাশা অনিককে বিয়ে করে ফেলে। তারপর একসময় আয়ানের সাথে যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়। সেই সময়টা আয়ান ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। আশা বেগমেরও রাগ হয়েছিল নীলাশার ওপর।

তবে সেই রাগ বেশিদিন টেকেনি। হাজার হোক ছোটবেলা থেকে নিজের মেয়ের মতো করেই তো মানুষ করেছেন তাকে।

 

———

 

অন্যদিকে…

একটি নিষিদ্ধ পল্লীর জরাজীর্ণ ঘরে বসে আছে বর্ষা। যে লোকটাকে সে বিয়ে করেছিল, সেই লোকই তাকে এখানে বিক্রি করে দিয়েছে।

লোকটা অনিকের বিল্ডিংয়েই থাকত। অনিক জেলে যাওয়ার পরই তার সাথে পরিচয় হয় বর্ষার। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই দামি দামি উপহার দিতে শুরু করেছিল সে—যা অনিক কখনো দিতে পারেনি। লোভী বর্ষার তখন আর সময় লাগেনি লোকটার প্রতি ঝুকতে।অনিকের প্রতি তার সমস্ত ভালোবাসা মুহূর্তেই ফুরুত। লোকটার হাত ধরে বেরিয়ে এলো সে। বিয়ে করল তাকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারল। লোকটা একজন নারী পাচারকারী। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

দেশ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে বর্ষা। পাসপোর্ট নেই, ভিসা নেই। পালানোর কোনো পথও নেই। এখন প্রতিদিনের এই নরকযন্ত্রণা তার একমাত্র সঙ্গী।

 

তার বাবা তাকে একজন ভালো মানুষের সাথেই বিয়ে দিয়েছিলেন। তবে লোকটা ছিল মধ্যবিত্ত। বর্ষার বিলাসী চাহিদা পূরণ করার সামর্থ্য ছিল না তার। তাই তাকে ছেড়ে অনিকের কাছে চলে এসেছিল বর্ষা। কারণ তখন অনিক ছিল কর্পোরেট অফিসার।

আর নীলাশার সাথে তার সুখী সংসার দেখে হিংসায় জ্বলে উঠেছিল সে। আজ আফসোস হয়। নিজের লোভই তাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে একজন নারীর কর্কশ গলা শোনা গেল,

—“কি রে! দরজা বন্ধ করে বসে আছিস কেন? বাইরে কাস্টমার অপেক্ষা করছে। দরজা খোল!”

 

কথাটা শুনে বর্ষার চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হয়তো এটাই একটি নারীর সংসার ভাঙার শাস্তি।

 

———

 

বিনা ঝামেলাতেই ডিভোর্স হয়ে গেছে নীলাশা আর অনিকের। আদালত অনিককে মোহরানা ও ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তবে সেই টাকা নিতে অস্বীকার করেছে নীলাশা।

এমন কাপুরুষের টাকার কোনো প্রয়োজন নেই তার। সন্তানের দায়িত্বও আদালত মায়ের কাছেই দিয়েছে। আজ অনিক আর কিছু বলেনি। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিল নীলাশা আর তার সন্তানের দিকে। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাতেও আজ প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়েছে সে। অর্থাৎ আইনত তার তেমন কোনো শাস্তি হয়নি।

 

আদালত থেকে বের হতেই হঠাৎ করে নীলাশার পা জড়িয়ে ধরল অনিক।

—“আমায় ক্ষমা করে দাও নীল… প্লিজ ক্ষমা করে দাও।”

 

নীলাশা চিৎকার করে উঠল,

—“পা ছাড়ো! এক্ষুনি ছাড়ো!”

 

কিন্তু অনিক ছাড়ল না। এটা দেখে আয়ান শুভ্রকে আশা বেগমের কাছে দিয়ে এগিয়ে এলো। অনিককে টেনে তুলেই পরপর দুইটা ঘুষি বসিয়ে দিল।

—“বাস্টার্ড! তোর সাহস কি করে হয় ওকে ছোঁয়ার!”

 

অনিক রাগে চিৎকার করে উঠল,

—“আমার বউ ও! ওকে ছুঁতে তোর পারমিশন লাগবে নাকি—”

 

ঠাস! জনসম্মুখে সপাটে একটা চড় পড়ল তার গালে। অনিক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল নীলাশার দিকে। এতোদিনের জমে থাকা সব রাগ যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠে।

 

—“কে বউ হ্যাঁ? কে তোমার বউ? আমি? সাত মাসের প্রেগন্যান্ট স্ত্রীকে রেখে অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক করার সময় এই কথাটা মনে ছিল না? ওহ… মাথায় থাকবে কি করে! তখন তো তোমার মাথায় শুধু নিজের চাহিদার কথাই ঘুরছিল। শেষবারের মতো বলছি আমাদের থেকে দূরে থাকবে। তোমার মতো কাপুরুষের ছায়াও আমি আমার সন্তানের উপর পড়তে দেব না।”

 

কথা শেষ করেই হাঁটা দিল নীলাশা। তার এই প্রতিবাদে পরিবারের সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শুভ্রকে কোলে নিয়ে আয়ানও তার পিছু নিল। বাকিরাও চলে গেল।

অনিক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ দৌড়ে তাদের পিছু নিল।

—“নীল… অন্তত একবার… আমার বাচ্চাটাকে কোলে নিতে দাও… নীল…”

 

কিন্তু ততক্ষণে নীলাশারা গাড়িতে উঠে গেছে।

গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে লাগল।

অনিক পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল গাড়ির পেছনে। হঠাৎ করেই একটা ট্রাকের সাথে ভয়াবহ ধাক্কা লাগল তার। মুহূর্তেই ছিটকে পড়ে গেল রাস্তায়। মানুষ ভিড় করল তার রক্তাক্ত দেহ দেখতে। অনিক আধো আধো চোখে চেয়ে রইল নীলাশার যাওয়ার পানে।

 

নীলাশাদের গাড়ি তখন অনেক দূরে। আজ নীলাশার নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গ মনে হচ্ছে। গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। বাহিরের জন-কোলাহলও আজ তার কাছে ভালো লাগছে। তাকে দেখে মুচকি হাসল আয়ান। তারপর ছোট্ট শুভ্রের গালে চুমু খেয়ে মৃদুস্বরে গেয়ে উঠল,

 

🎶

সখি তোরা প্রেম করিও না

পিরিত ভালা না…

সখি তোরা প্রেম করিও না…

🎶

 

তার কথায় হেসে ফেলল নীলাশা। কে বলেছে প্রেম ভালো না? ভালোবাসার তো কোনো দোষ নেই। ভুল তো করি আমরা সঠিক মানুষ টাকে চিনতে।

 

সমাপ্ত 

 

বাংলাদেশ আইনে সাধারণত পুলিশ বা আদালত পরকীয়ার অভিযোগে জেলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় না। জেল তখনই হয় যখন স্ত্রী অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা হয় (মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ১ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে)। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বা প্রতারণা করে অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক করা হয় (ধারা ৪২০ অনুযায়ী ৭ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে)। তাই অনিকেরও জেল হয় নি।

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner