নিজের স্বামীকে অন্য একটা মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে থমকে গেল সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নীলাশা। নিজের চোখ কে আজ বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। ঘনিষ্ঠ অবস্থায় থাকা মেয়েটা আর অন্য কেউ নয়, তার স্বামীরই খালাতো বোন।
অনিকের সাথে তার বিয়ে হয়েছে প্রায় চার বছর। তার আগে এক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাদের। এতগুলো দিন পর তাদের ঘর আলো করে একটা নতুন প্রাণের আগমন ঘটতে চলেছে। এই সুখের সময় অনিক যে অন্য এক নারীতে মত্ত হতে পারে, তা নীলাশা স্বপ্নেও ভাবেনি। নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে দরজার সাথে বাড়ি খেল। এতে আধভেজানো দরজাটা খুলে গেল। আর সেই শব্দে মুহূর্তেই ছিটকে দূরে সরে গেল ভেতরে থাকা দুই নর-নারী।
নীলাশাকে দেখে চমকাল তারা। কারণ সে চেকআপ করাতে হাসপাতালে গিয়েছিল। অনিক সকালে অফিসে গিয়েছিল, তবে নীলাশারা বেরিয়ে যেতেই বর্ষা তাকে ফোন করে ডেকেছে। কিছুদিন ধরে সে এই বাড়িতেই থাকছে। সকলের অগোচরে ভালোই চলছে তাদের সম্পর্ক। অনিক নিজের পরনের শার্ট ঠিক করে নীলাশার কাছে এগিয়ে এসে বলল,
—“নীল, তুমি যেমনটা ভাবছো, এমন কিছুই হয়নি এখানে।”
—“তো কেমন হয়েছে, অনিক?”
—“আসলে…”
নীলাশা ভারী পেটটা ধরে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল,
—“আসলে তুমি আমার অবর্তমানে আমাদের ঘরে তোমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে একান্ত কিছু সময় কাটাচ্ছিলে, তাই তো?”
অনিক কিছু বলতে চাইল, তবে তার আগেই তাকে সপাটে চড় মারলেন তার বাবা আতিফ উদ্দিন। তিনি নীলাশার পেছনেই ছিলেন। অনিককে ডাকতে এসেছিলেন।
—“ছি ছি, আজ আমার লজ্জা লাগছে তোকে মতো কুলাঙ্গারকে নিজের ছেলে বলতে।”
তার চিৎকার শুনে ঘরে ছুটে এলো অনিকের বোন অনিতা আর তার মা ফিরোজা খাতুন। অনিতা আর নীলাশা অনেক পুরোনো বন্ধু। অনিতার সূত্র ধরেই অনিকের সাথে নীলাশার পরিচয়, প্রেম, অতঃপর বিয়ে।
—“কি হয়েছে, বাবা?”
কথাটা বলেই অনিতার চোখ গেল দূরে কোনো রকমে গায়ে শাড়ি জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বর্ষার পানে। আর্তনাদ করে উঠল সে,
—“হায় আল্লাহ!”
ফিরোজা খাতুন পাশেই দাঁড়িয়ে সবটা দেখছেন। তবে কিছু বললেন না তিনি। অনিতা নীলাশাকে আকড়ে ধরে অনিককে উদ্দেশ্য করে বলল,
—“এমনটা কেন করলি, ভাই? তোকে তো ভাই বলতেও লজ্জা লাগছে।”
গর্জে উঠল অনিক,
—“কে বলেছে ভাই বলতে? বলিস না। আমি পুরুষ মানুষ। আমারও কিছু চাহিদা আছে। নিজেকে আয়নায় দেখেছে ও? এখন তো ওর দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করে না।”
এবার আরেকটা চড় পড়ল তার গালে। এটা দিয়েছে নীলাশা।
—“আমি তোমার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য জীবন-মরণ লড়ছি, আর তুমি পড়ে আছো চাহিদা নিয়ে! আর আমার নিজের এই অবস্থা তোমার বাচ্চাকে এই পৃথিবীতে আনার যুদ্ধের জন্যই হচ্ছে। তবে তোমার মতো মূর্খ ব্যক্তি তা কি করে বুঝতে পারবে?”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে হাইপার হয়ে গেল নীলাশা। বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলাতে চাইল। এমনিতে যথেষ্ট সুন্দরী সে। দুধে-আলতা গায়ের রঙ তার। বাচ্চা পেটে আসায় একটু স্বাস্থ্যটা বেড়েছে। তবে এতে তার সৌন্দর্য কমার বদলে বেড়েছে শতগুণ। তবে হারামে মজা মানুষ কি আর হালালে খুশি থাকে? অনিতা দৌড়ে গিয়ে পানি নিয়ে এলো তার জন্য। বর্ষা প্রত্যেকটা বিষয় দেখছে আর মনে মনে খুশি হচ্ছে। নীলাশার প্রত্যেকটা জিনিসের প্রতি তার যে প্রবল লোভ।
ছেলের কথা আর নীলাশার অবস্থা দেখে ছেলের গালে আর একটা চড় মারলেন আতিফ উদ্দিন। তা দেখে ফিরোজা খাতুন এগিয়ে এসে বললেন,
—“কি করছো? এত বড় ছেলের গায়ে হাত তুলছো কেন?”
—“আজ একটা কথাও বলবে না তুমি। তোমার আস্কারা পেয়েই আজ ওর এই অবস্থা।”
তারপর ছেলেকে উদ্দেশ্য করে শক্ত কণ্ঠে বললেন,
—“বেরিয়ে যা। এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।”
—“বাবা…”
—“ওই মুখ দিয়ে খবরদার আমায় বাবা ডাকবি না। আর এই অজাতটাকেও নিয়ে বেরিয়ে যা। ওকে এই বাড়িতে থাকতে দেওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল।”
—“ওগো, কি বলছো তুমি এসব? ছেলেটা কোথায় যাবে?”
এসব দেখে বর্ষা অসহায় মুখ করে তাকাল অনিকের পানে। অনিক তাকে অভয় দিল। তাদের এই নাটক আর সহ্য করতে পারল না অনিতা। নীলাশাকে ছেড়ে বর্ষার কাছে এগিয়ে গিয়ে সশব্দে চড় মারল তার গালে। তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল বর্ষা।
চেচিয়ে উঠলো অনিক,
—“অনিতা, তোর সাহস কি করে হয় ওর গায়ে হাত তোলার?”
অনিকের কথা শুনে তার পানে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে একপলক তাকাল নীলাশা। এই মানুষটার জন্য এক সময় সে তার বাবা-মায়ের সাথে ঝামেলা করেছিল। উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় তার বাবা কখনোই তার আর অনিকের সম্পর্কটা মেনে নেননি। নীলাশা একপ্রকার বাবা-মায়ের অমতে গিয়েই বিয়ে করেছিল তাকে। এই জন্য তার বাবা তার সাথে কথা বলে না বহুদিন। আর আজ এই পুরুষটা কি করল? তার এতো ত্যাগের কি প্রতিদান দিল? তাই তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
—“কেন? খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি নিজের রক্ষিতার জন্য?”
—“নীলাশা…”
—“আওয়াজ নিচে। এত কিছুর পরেও আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস কোথায় পাও তুমি?”
অনিক চুপ করে গেল। তাদের সাথে আর কথা না বলে ফুসতে ফুসতে বর্ষাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। পেছন থেকে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেন ফিরোজা খাতুন।
—“যাস না বাপ। যাস না।”
মায়ের কথা না শুনে বেরিয়ে এলো অনিক। বাইরে এসে বর্ষা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
—“আমরা এখন কোথায় যাব, অনিক? সবটা আমার জন্য হয়েছে।”
অনিক নরম কণ্ঠে বলল,
—“তোমার কোনো দোষ নেই। আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগে গেছে। এখন আমরা আমার ফ্ল্যাটে যাব। বাচ্চাটা হওয়ার পরে না হয় নীলকে ডিভোর্স দিয়ে বাচ্চাটাকে নিজের কাছে নিয়ে আসব।”
ডিভোর্সের কথায় খুশি হলেও বাচ্চা নিজের কাছে রাখার ব্যাপারটা ভালো লাগল না বর্ষার। সেই ছোট থেকে সে অনিককে ভালোবাসে। কিন্তু সেটা বলার আগেই তার বাবা তার বিয়ে দিয়ে দিল। সেখানে সে ভালোই ছিল। তবে একদিন যখন দেখল অনিক নীলাশার সাথে সুখী আছে, তখন আবার সেই পুরনো ভালোবাসা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সহ্য হলো না তাদের এই সুখ। তাই তো নিজেই স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে অসহায় সেজে এসে উঠল অনিকদের বাড়িতে। আর তারপর অনিককে নিজের জালে ফাঁসাতে তার খুব একটা সময় লাগেনি।
অনিক বেরিয়ে যেতেই ভেঙে পড়ল নীলাশা। তাদের এত বছরের ভালোবাসা, বিশ্বাসকে অনিক একপলকেই ভেঙে দিতে পারল? প্রতারণা করার আগে একবারও কি তাদের অনাগত সন্তানের কথা তার মনে পড়ল না?
অনিতা এসে জড়িয়ে ধরল নীলাশাকে। সে কল্পনাও করতে পারেনি তার ভাই এমন কিছু করবে। নীলাশা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে গেল। এত এত ভালোবাসা, ত্যাগ, বিশ্বাস, ন্যায়নিষ্ঠার শেষে সে কি পেল সে? শুধুই প্রতারণা ছাড়া।
বাইরে থেকে ফিরোজা খাতুনের কণ্ঠ ভেসে আসছে। ছেলের জন্য তিনি হা-হুতাশ করছেন। অথচ একজন নারী হয়ে একবারও তার ছেলের করা কুকর্মের কথা তার স্মরণ হলো না। আতিফ উদ্দিনের আজ নিজেকে ব্যর্থ মনে হলো। নিজের আদর্শে তিনি ছেলেটাকে মানুষ করতে পারেননি। নীলাশার মাথায় হাত রেখে অসহায় কন্ঠে বললেন,
—“পারলে এই বাবাটা কে ক্ষমা করে দিস, মা।”
নীলাশা তার অশ্রুভরা ডাগর ডাগর চোখ তুলে তাকাল শ্বশুর নামক বাবার পানে। নিজের বাড়ি ছেড়ে আসার পর এই লোকটা যে তাকে কখনোই বাবার অভাব বুঝতে দেননি। মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে গেছেন সবসময়।
গল্প:সখি তোরা প্রেম করিও না
লেখনিতে:সুমাইয়া তুলি