Notifications
Clear all
Page 2 / 2
Prev
September 13, 2026 11:00 pm
পর্ব:০৫
ধরনীতে দিনের আলো ফুটেছে খানিক। সামান্য কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের কিরণ প্রবেশ করেছে। ঘাসের উপর শিশির বিন্দু জমেছে খানিক। বসন্তের শুরুতে গ্রামের পরিবেশ টা এমনই থাকে। আঁকা বাঁকা সরু পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে এক দম্পতি। সদ্য বিবাহিত দম্পতি। শেখর সামনে হাঁটছে। তার থেকে একটু পিছনে হাঁটছে তনু। পড়নের লাল শাড়িটার নিচের অংশ একটু ভেজে উঠেছে। কাঁচা সকালে একটু ভেজা থাকে তার দরুন শাড়ির এই অবস্থা। তবে তনু কিছু বলছে না। দুজনের মধ্যে নৈঃশব্দ্য বিরাজমান। চলার পথে গ্ৰামের দু তিনজন মহিলাকে দেখেছে। সকলের নজরে ছিল একরাশ তিরষ্কার। যেন তাদের দুজনকে ধিক্কার জানাচ্ছে। তবে তনু সেসব দৃষ্টি গায়ে মাখলো না। শেখরের পিছু পিছু মির্জা বাড়িতে এসে পৌঁছালো। বেড়ার ভেতরে প্রবেশ করেই চারি পাশে নজর বুলালো। বাড়িতে মোটা ছয়টা ঘর রয়েছে। সবগুলোই ইটের দালান। তার পাশেই অবহেলায় পড়ে আছে শেখরের মাটির ঘরটি। ঘরে একপাশে টিউবওয়েল আছে। তার পাশ ঘেঁষেই একটা মাটির চুলা। আর কিছু ভেজা লাকড়ি। তার উপর পড়ে আছে একটা মোটা প্লাস্টিক। শেখর সেদিকে এগিয়ে গেলো। নিচু হয়ে প্লাস্টিক টা তুলে নিলো। রাতের ভারি বৃষ্টিপাত আর তুফানের প্রবলে পড়ে ছিঁড়ে গেছে। এটাকে ঠিক করতে হবে। তার আগে ঘর যাওয়া প্রয়োজন মনে করল। পিছন ফিরে তনুর উদ্দেশ্যে বাক্য ছুড়লো
— আহেন আমার লগে।
এগিয়ে দিয়ে দরজার খিল খুলে প্রবেশ করলো। পিছু পিছু তনুর এলো। টেবিলের উপর পড়ে আছে ভাত আর মাংস। শেখর সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এগিয়ে গিয়ে পুরাতন আলমারি টা খুললো। মায়ের কিছু জামা কাপড় আছে। যেগুলো সে এতো বছর নিজের কাছে যত্ন করে রেখেছিলো। সেখান থেকে কালো পাড়ের খয়েরী সুতি শাড়িটা বের করে তনুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
— এইডা পইড়া নেন। আমি এহন কামে যামু। আসার সময় আপনের লাইগা কামিজের কাপড় আনমু দেহি।
শেখরের কথায় তনু হেঁসে উঠল। তার হাসির ঝংকার তুললো ছোট মাটির ঘরটায়। শেখর যেন থমকে গেছে। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তনুর ফর্সা মুখশ্রীর দিকে। তনু হাসতে হাসতে বলল
— কামিজের কাপড় লাগবে না। আসার সময় দুটো সুতি শাড়ি আনলেই চলবে
— কিন্তু আপনে তো
— এই কিসের আপনে আপনে লাগিয়ে রেখেছো। আমি তোমার বিবাহিত স্ত্রী। তুমি করে বলবে কেমন
শেখরের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই বললো তনু। শেখর একটু ইতস্তত বোধ করলেও আস্তে আস্তে বলল
— আইচ্ছা তুমি কি খাইবা কও। তোমার তো সকালে ভাত খাইয়া অভ্যাস নাই
শেখরের কথায় তনু তাকালো তার পানে। মানুষ টা তার কথা ভাবছে। বুকের মাঝে উথাল পাতাল অনুভব করলো। সত্যি তার ভাত খাওয়ার অভ্যাস নেই। তবে এখন থেকে করতে হবে। মৃদু হেঁসে শেখরকে বলল
— সমস্যা নেই আমি শাড়ি পাল্টে আসি তাহলে। তারপর দুজন মিলে মাংস দিয়ে খাবো।
— আইচ্ছা যাও
তনু টয়লেটে চলে গেলো। শেখর পাঞ্জাবি খুলে একটা সাদা গেঞ্জি পরে নিলো। একটু পর তনু বেরিয়ে এলো। শেখর হেঁসে সেদিকে তাকাল। তাকাতেই তার মূহুর্ত যেন থেমে গেল। কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। হাত ভীষণ কাঁপছে। পায়ের শক্তি লোপ পেয়েছে। বুক ধুকপুক করছে।
টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তনু। পড়নে শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোট। শাড়িটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা মলিন হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো শেখরের কাছে। নিচু স্বরে বলল
— আমি তো শাড়ি পড়তে জানি না একটু শিখিয়ে দেও। এরপর থেকে আমি নিজেই পড়বো প্রমিস
তনুর কথায় শেখর শুকনো ঢোক গিললো। তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিতে বলছে। মুরগি নিজে থেকেই শিয়ালের কাছে ধরা দিচ্ছে। শেখর কাঁপা হাতে শাড়ির ভাঁজ খুললো। আস্তে আস্তে কোমড়ে গুঁজে দিলো। তনুর নরম কোমড়ে তার রুক্ষ হাতের স্পর্শ পেতেই তনু কেঁপে উঠলো। তিরতির করে কাঁপছে তার চিকন ওষ্ঠ দ্বয়। যা চোখ এড়ালো না শেখরের। দ্রুত শাড়ি পড়িয়ে দিলো। পড়ানো শেষ করেই দূরে সরে গেলো। তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গেলো। ঘরের মাঝে রেখে গেলো তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী কে। রক্তিম গাল দুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তনু। শরীর জুড়ে শীতল হাওয়া বইছে। অনুভূতি রা ঘিরে ধরেছে যেন। তনু মৃদু হেসে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। চুলার উপরের প্লাস্টিক টা উল্টে দেখছে শেখর। তনু সেদিকে এগিয়ে গেলো। অদূরে একটা বড় বাঁশ বাগান দেখতে পেলো। হঠাৎ মাথায় কিছু একটা আসতেই শেখরকে বলল
— এই বাঁশ বাগান টা কার?
তনুর কথায় শেখর চমকে তাকালো। তনুকে দেখেই আবার ঘরের ভিতরের কথা মনে পড়ে গেলো। চোখ সরিয়ে সামনে তাকিয়ে বলল
— আমার আব্বার ওইডা। এহন আমার আরকি। ক্যান কি হইছে?
— আজকে একটু দেরি করে কাজে যাবেন। আমার সহায়তা করবেন।
তনুর কথায় শেখর প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো। তার মাথায় কিছুই ঢুকে নি। তনু মুচকি হেসে বলল
— কিছু বাঁশ কেটে মাঝ থেকে ফালি করে দিবে। আর শক্ত দড়ি আনবে। রান্নাঘর বানাবো এগুলো দিয়ে। তার উপর প্লাস্টিক দিবো।
তনুর কথায় শেখর অবাক না হয়ে পারলো না। মেয়েটা যেন সুন্দরী তেমনি বুদ্ধি মতি ও। প্রথমদিনেই তার মাথায় বুদ্ধি চলে এল। কই শেখরের মাথায় তো এলো না। শেখর বোকা হেঁসে বলল
— আগে খাইয়া লই তার পরে কামে নামমু।
— আচ্ছা।
ঘরে গিয়ে শেখর একটা পেঁয়াজ কেটে নিল। মাংস টা গরম করে আনলো। তনু প্লেটে থাকা ঠান্ডা ভাতে সামান্য পানি ঢেলে নিলো। এগিয়ে দিলো শেখরের দিকে।
— কি ব্যাপার তুমি খাইবা না? তোমার থালা কই?
— তুমি খাইয়ে দেও।
আবদার টা ছোট হলেও শেখরের কাছে তা অপ্রত্যাশিত ছিল। সবে কিছু ঘন্টা আগে বিয়ে হলো এখনই এতোটা মিশে গেছে তনু। ওকে দেখে বুঝার উপায় নেই বিয়েটা তাদের ইচ্ছেমত হয়নি। বরং মনে হচ্ছে তারা পূর্ব পরিচিত। শেখর ভাতের লোকমা তনুর সামনে ধরতেই তনু মুখে নিয়ে নিলো। অত্যন্ত তৃপ্তি করে খাচ্ছে। যেন এর স্বাদ অমৃত। শেখরের চোখ ভিজে এলো। তাড়াতাড়ি চোখের পানি আড়াল করে নিলো। দূর্বলতা প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। মৃদু হাসি আনন্দের মধ্যেই খাওয়া শেষ করল।
তনু উঠে শাড়ির মাথার ঘোমটা আরো টেনে নিলো যাতে কেউ দেখতে না পায়। শেখর গামছা টা কোমড়ে বেঁধে নিলো। বঁটি নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। আসতেই সামনে পড়লো রোজিনা। তনুর হাতে বঁটি দেখেই তার আত্না কেঁপে উঠলো। রোজিনাকে ভয় পেতে দেখেই তনুর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো। বাঁকা হেঁসে তেড়ে গেলো সেদিকে।
তনুকে নিজের দিকে তেড়ে আসতে দেখেই রোজিনা চিৎকার করে উঠল
— ও খোদা বাঁচাও। আমারে বাঁচান আল্লাহ।আর জীবনেও কুটনামি করুম না। আল্লাহ গো বাঁচান
বলেই এলোমেলো দৌড় দিল নিজের ঘরের দিকে। শরীরে মেদ জমেছে।তাই ঠিক মতো দৌড়াতে পারছে না।তবু প্রাণপণে চেষ্টা করছে বাঁচাতে। তনু তাকে দৌড়ে নিয়ে ঘরে দিয়ে এলো। আসার সময় জোরে জোরে গান ধরলো
“ কুটনী ননদীনি
করিস খালি কুটনামি
কুটনামির ভূত ছাড়াবো
বাংলার বউ আমি ”
তনুর মুখে এমন গান শুনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো শেখর। এই গানটা আগে বাজারের টেলিভিশনে শুনতো মাঝে মধ্যে। তখন ভীষণ হাঁসি পেতো শেখরের। আজ হঠাৎ তনুর মুখে শুনে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। শেখরের হাঁসি দেখে তনু নিজেও হেঁসে দিলো। শেখরের কাছ আসতেই শেখর বলল
— এমন করলা ক্যান। আফা ডরাইছে অনেক
— আরে সেটা নিয়ে ভেবো না। আমাদের ননদ ভাবীর ব্যাপার ওটা
September 13, 2026 11:00 pm
পর্ব:০৬
নিরিবিলি দ্বিপ্রহর। গ্ৰাম গঞ্জের মানুষ তখন ক্লান্ত শরীর টেনে বাড়ি ফিরে দু মুঠো ভাতের জন্য। অনেকে ভাতের হোটেলেও খায়। মির্জা বাড়ির পরিবেশ একদম শান্ত। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছে। বাড়ির এক কোণে বসে বাঁশ দিয়ে ভেড়া বানাচ্ছে শেখর। তার পাশে চুলার কাছে বসে আছে তনু। ভাত রান্না হচ্ছে অন্য পাশে আলু সিদ্ধ দিয়েছে। যদিও এগুলো শেখর দেখিয়ে দিয়েছে। তবে এখন বাকি টুকু সে নিজেই দেখছে। রান্নাঘরের তিনপাশে ভেড়া লাগানো হয়েছে। সমানের দিক টা পুরা দরজা রাখবে তাই এখনো লাগানো হয়নি। উপরের বাঁশ এবং প্লাস্টিক বাঁধার কাজ করছে শেখর। তনু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজ স্বামীর পানে। লোক টা ঘেমে একাকার হয়ে আছেন। তবুও এক মিনিটের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছেন না।
তনুর মনে পড়লো তার বুঝ শক্তি হওয়ার পর থেকে বাবাকে কখনো এমন ভাবে দেখেনি। সবসময় এসি গাড়ি, এসি অফিস, বাসায় প্রতিটি রুমে এসি ছিল। এমনকি তার মাকেও কখনো রান্না করতে দেখেনি। আলাদা কাজের লোক রাখা হতো। জীবনের বিশটি বছর বিলাসীতায় কাটিয়েছে। তবে কখনো মন খুলে হাসতে পারেনি। কখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিজে থেকে নিতে পারে নি। এমনকি কি পোশাক পড়বে, কার সঙ্গে মিশবে, কি খাবার খাবে তার সবই ছিল বাবা এবং ভাইদের কন্ট্রোলে। আজ তনু বুঝতে পারছে সুখের আসল সংজ্ঞা। এই ছোট্ট মাটির ঘরে নিজের সুখ টুকু খুঁজে পেলো। এই মানুষটির মাঝে নিজের সুখ খুঁজে পেলো। তনু র চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। শেখর দেখার আগেই তা আড়াল করে নিলো।
আলু সিদ্ধ হতেই তা নামিয়ে ঘরে নিয়ে গেলো। বিছানার একপাশে তার ব্যাগটা পড়ে আছে। তনু আলুর থালাটা টেবিলে রেখে ব্যাগটা হাতে নিলো। বৃষ্টির পানি ভিতরে ঢুকে নি। তনু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ব্যাগটা আলমারি তে তুলে রাখলো। ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
ভাতের মাড় ফেলছে শেখর। তনু এগিয়ে এলো। শেখর মিষ্টি হাসলো শুধু। পাতিল টা রেখে বঁটি নিয়ে বসে পড়লো পেঁয়াজ মরিচ কুচি করতে। তনুর দিকে তাকিয়ে বলল
— ঘর তে বাডি আনো একডা
তনু মাথা নেড়ে চলে গেলো। বাড়ির ভেড়া ঠেলে প্রবেশ করতে দেখা গেলো রুমুকে। হন্তদন্ত হয়ে এক প্রকার ছুটে এলো যেন। শেখরকে দেখে দৌড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রুমুকে দেখে শেখরের মুখে মৃদু হাসির রেখার দেখা মিললো। খানিক হেঁসে বলল
— কিরে রুমু। এই সময়ে তুই এইহানে?
— আপনে নাকি কাইল বিয়া করছেন? এডা কি সত্য শেখর ভাই???
অস্থির কন্ঠ রুমুর। শরীর মৃদু কাঁপছে। চোখের পাতা বার বার বুজে আসতে চাইছে। শেখর সবই লক্ষ করলো। মুচকি হেসে কিছু বলার আগেই তনু বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
শেখরের সামনে ভীষণ মায়াবী এক শ্যাম কন্যা দেখে কপাশ গুটিয়ে নিলো। এগিয়ে এসে বলল
— আপনি কে আপু?
তনুর কথায় রুমু মাথা ঘুরিয়ে তার পানে চাইলো। লম্বায় রুমুর চেয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা হবে তনু। ফর্সা গায়ের বরন, পাতলা ফিনফিনে ঠোঁট। তার সৌন্দর্যের সামনে রুমুকে একদম ফিকে লাগলো। রুমু কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল
— শেখর ভাই এই মাইয়া আপনের বউ?
শেখর উঠে দাঁড়ালো। হেঁসে বলল
— হ রে রুমু। এইডা তোর ভাবী। পছন্দ হইছে নি?
ভাবী" এই একটা শব্দ যেন রুমুকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম ছিল। হাত পা প্রচন্ড কাঁপছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। শেখর আরো কিছু বলবে তার আগেই বিকট শব্দে মাটিতে হেলে পড়লো রুমু। শেখর তনু দু'জনে ভীষণ ভয় পেলো। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলো।
— ওর কি হলো শেখর? মেয়েটা এভাবে অজ্ঞান হলো কেন?
— বুঝতেছি না তো। খারাও সাবেনা চাচিরে ডাইকা আনি।
শেখর ছুটলো পাশের বাড়িতে। তনু পানি ছিটানো। তবে রুমুর জ্ঞান ফেরার নাম নেই। পাশের বাড়ি থেকে সব ছুটে এলো। একজন কে দিয়ে তালুকদার বাড়িতে খবর পাঠানো হলো। দরাদরি করে ঘরে নিয়ে চৌকির উপর শুইয়ে দিলো। শেখর ভ্যান নিয়ে ছুটলো ডাক্তারের দোকানে।
————
রহমান ম্যানশন~
সোফায় বসে আছেন তানিয়া। তার পাশে ইমরা বসে আছে। গতকাল থেকে তানিয়া কিছু মুখে নিচ্ছেন না। মেয়ের বিরহে কাতর হয়ে আছেন। সবাই চেষ্টা করেছে তবে তিনি নাছোড়বান্দা। সৈয়দা বেগম চলে গেছেন আজ সকালে। মেয়ের মুখোমুখি হতে বারণ করেছে জাহিদ। তিনি ও দ্বিমত করেন নি। সকাল হতেই নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। ইমরা তাকে দুপুরের খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করছে
— মম খেয়ে নিন। আপনার শরীর খারাপ করবে তো
— না ইমরা আমার মেয়ের খবর না পাওয়া পর্যন্ত আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না। মেয়েটা কোথায় আছে? কেমন আছে আমি জানি না। ও তো ক্ষুধা পেটে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না ইমরা। কি খেয়েছে মেয়েটা আমার
বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। ইমরা শাশুড়ি কে জড়িয়ে নিলো নিজ বাহুডোরে। তানিয়া একদম বাচ্চাদের মতো কেঁদে চলেছেন। এমন সময় বাড়িতে প্রবেশ করলো জাহিদ রহমান ও জারিশ। রান্নাঘর থেকে সায়না বেরিয়ে এলো। তানিয়া উঠে গিয়ে স্বামীকে জাপটে ধরলেন। বাহু ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করলেন
— আমার মেয়ে কোথায় জাহিদ? আমার তনু কে নিয়ে আসো নি কেন??? চুপ করে আছো কেন তুমি?? এই জারিশ বাবা আমার তুই বল না আমার তনু কোথায়? এখনো আসছে না কেন আমার মেয়েটা???
তানিয়া অস্থির হয়ে উঠছেন বারবার। ইমরা সায়না শাশুড়িকে ধরে সোফায় বসালো। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছেন তিনি। জাহিদ সাহেব মুর্তির ন্যায় তানিয়ার পাশে বসলেন। নিচু স্বরে বললেন
— তনু এসেছে তানিয়া।
তানিয়া তড়িৎ চাইলেন স্বামীর পানে। চোখে মুখে উচ্ছ্বাসের দেখা মিললো। তিনি আবেগি হয়ে জিজ্ঞেস করলেন
— কো কোথায় আমার তনু?
— বাড়ির সামনে লা'শবাহী গাড়িতে শুয়ে আছে
নির্লিপ্ত কন্ঠে বললেন জাহিদ। এক মূহুর্তের জন্য নিরবতা নেমে এলো। তানিয়া অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে আছেন স্বামীর পানে। মাথায় শুধু লা'শবাহী শব্দটা বারি খাচ্ছে। তার দুনিয়া যেন অন্ধকার হয়ে এলো। তিনি চিৎকার করলেন
— আমার তনুউউউ
অতঃপর জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়লেন মেঝেতে। ইমরা সায়না দৌড়ে গেলো শাশুড়ির কাছে। চিৎকার শুনে জিসান ও বেরিয়ে এলো। মাকে দেখে দৌড়ে এলো। কোলে তুলে এগিয়ে গেলো মায়ের ঘরে। সঙ্গে গেলো ইমরা ও সায়না। ড্রয়িংরুমে শুধু জাহিদ রহমান ও জারিশ উপস্থিত। দুজনের মুখেই রহস্যময় বাঁকা হাঁসি।
———
রাত প্রায় নয়টা বাজে। ঘরে বসে আছে তনু। বসে আছে বললে ভুল হবে। সে নিজের কাগজপত্র গুলো দেখছে। চোখের সামনে ভাসছে দুপুরের সেই দৃশ্য। রুমুর জ্ঞান ফিরতেই মেয়েটা নিঃশব্দে উঠে বেরিয়ে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে শুধু শেখরের দিকে তাকিয়ে একটা কথাই বলেছিলো! “ সুখে থাকবেন শেখর ভাই ” । কথাটা সাধারণ হলেও তনু সেটা সাধারণ ভাবে নিতে পারছে না। বারবার মনে কোণে উঁকি দিচ্ছে এই শব্দের মাঝে কোনো কিন্তু লুকিয়ে আছে। তনুর সকল ভাবনার মাঝে হর্ণের শব্দ ভেসে এলো। শেখর এসেছে। তনু সবকিছু গুছিয়ে রেখে দরজা খুলে দিল। একটু পর শেখর হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এলো। তনুর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। হাতে থাকা কাগজের প্যাকেট টা এগিয়ে দিলো। তনু মৃদু হেসে প্যাকেট টা খুলে দেখলো। তিনটে সুতি শাড়ি। একটা একদম সাধারণ নীল রঙের,অন্যটি কলাপাতা রঙের। শেষের টি কিছুটা দামি লাল রঙের শাড়ি। সঙ্গে বেলি ফুল ও এনেছে। তনুর আঁখি যুগল চিকচিক করছে। বেলি ফুলের সুবাস নিলো মন ভরে। বড় হেঁসে শেখরকে বলল
— এগুলো আমার জন্য এনেছো?
— হ। আমার তো একডাই বউ তার লাইগা আনছি।
তনু খুশিতে গদগদ হয়ে বলল
— চুলে পড়িয়ে দেও না।
শেখর হাসলো। বউকে তবে খুশি করতে পেরেছে সে। এগিয়ে গিয়ে তনুর পাশে বসলো। আলতো করে খোঁপায় বেলি ফুল টা পড়িয়ে দিলো। তনু হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল
— আমাকে কেমন লাগছে?
— অনেক সুন্দর। একদম শেখরের বউ লাগছে
September 13, 2026 11:01 pm
পর্ব:০৭
গভীর রাত, নিস্তব্ধ গ্ৰাম। অদূর হতে ভেসে আসছে শিয়ালের ডাক। বাঁশ ঝাড়ের ফাঁকে যেন আড্ডার আসর বসেছে নাম না জানা পোকাদের। ঘড়ির কাঁটায় মাত্র এগারোটা বেজে উনিশ মিনিট। শেখর ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে তনুকে। তনুও নিঃশব্দে ভাতের সঙ্গে শেখরের অকৃত্রিম যত্ন টুকু গিলে নিচ্ছে। মনটা এই মুহূর্তে বেশ ফুরফুরে। বারবার মাথার পিছনে হাত দিয়ে বেলি ফুল গুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে। ভীষণ ভালো লাগা কাজ করছে। আনমনেই হেঁসে চলেছে সে। তনুর প্রতিটি কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে শেখর। মনের মাঝে প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে। হঠাৎ মস্তিষ্কে কিছু জানান দিতেই শান্ত কন্ঠে শুধালো
— আইচ্ছা তোমার পুরো নাম কি?
আকস্মিক প্রশ্নে তনু খানিক অপ্রস্তুত হলো। এই কেমন কথা তার নাম জানে না শেখর!! অবশ্য না জানারই কথা। অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে! এরপর তো শেখর তাকে নাম জিজ্ঞেস করেনি। তনু লম্বা শ্বাস টেনে বলল
— রুপসেনা রহমান তনু। সবাই তনু বলেই ডাকতো।
শেখর মনে মনে রুপসেনা নাম টা বেশ কয়েকবার আওড়ালো। নামটা ভীষণ সুন্দর। পছন্দ হয়েছে তার। তবে এতো বড় নাম মনে রাখা কঠিন শেখরের মতো মানুষের। সবে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। যুগ পেরিয়ে গেছে বই ধরে না। এসব আধুনিক নাম মনে রাখা অসম্ভব। তনুর দিকে অপরাধীর ন্যায় চেয়ে নিচু স্বরে বলল
— আমি যদি তোমারে রুপ বইলা ডাকি তুমি কি রাগ করবা বউ?
কি আদুরে আবদার। তনু নিষ্পলক চেয়ে দেখলো স্বামী নামক পুরুষটির দিকে। মানুষটা তার সঙ্গে কথা বলতে ইতস্তত বোধ করছে তা বুঝতে পারে। এতোটা অবুঝ নয় তনু। নিজের শুভ্র কোমল হাত জোড়া দিয়ে আঁকড়ে ধরল শেখরের রোদে পোড়া শক্ত হাত খানা। শেখর চকিত চাইলো স্ত্রীর পানে। তনু মৃদু হেসে শুধাল
— অবশ্যই ডাকতে পারো। আমি তোমার স্ত্রী।আমার উপর সম্পূর্ণ অধিকার আছে তোমার। সময় মতো আদায় করে নিবে
শেখর মৃদু হাসলো। বিয়ে হয়েছে তাদের মনের মাঝে সংকোচ রাখা ঠিক নয়। শেখরের মুখ পানে চেয়ে তনু স্তম্ভিত হলো। কি সুন্দর হাঁসি। শেখরের জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার ইচ্ছে হলো হঠাৎ। তনু ধীর কন্ঠে শুধালো
— তোমার পুরো নাম কি? আমার শশুর শাশুড়ি আদর করে কি কি নাম রেখেছে তোমার?
শেখর খানিক লজ্জাবোধ করলো। তার নিজের নাম বলতে কেন জানি লজ্জা লাগছে ভীষণ। তনু যদি আবার হাসে। নিচু গলায় বলল
— আব্বায় রাখছে নীলয় মির্জা। এইডাই জন্মনিবন্ধনে দেওয়া। আম্মায় রাখছিল শেখর। সবায় শেখর বইলাই ডাকে।
— তোমার বয়স কত?
তনুর প্রশ্নে শেখর থামলো কিছুটা সময়। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো কিছু ভাবছে। বয়স গুনছে নাকি।
— ৩১ বছর চলে এহন
— আমার ২১ বছর। আমার থেকে ১০ বছরের বড় তুমি। তবে একদম বোকা ছেলে
শেষের কথাটা আস্তে বলল তনু। শেখরের কান অব্দি পৌঁছায় নি। শেখর অবাক নেত্রে তাকিয়ে আছে তনুর পানে। অবাকতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না যেন। মৃদু বিষ্ময় নিয়েই বলল
— কি কও বিবি আমাগো গেরামে তো মাইয়া গো বারো হইতেই বিয়া দিয়া দেয়। শুধু রুমুরে ওর বাপে এহনো দেয় নাই। আঠারো চলে মাইয়ার বয়স। কালা হওনে কেউ বিয়া করতে চায় না।
শেখরের কথায় তনু বেশ অবাক হয় সাথে তাচ্ছিল্য হাসে।
— মেয়েদের হতে হবে রুপবতী। তবেই না পুরুষ জাতি আকৃষ্ট হবে। এই সমাজে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েদের বেঁচে থাকা যে বড় দায়
— কিন্তু আমার তো মনে হই শ্যামলা মাইয়া রা বেশি সুন্দর হয়। যারে কয় মায়াবতী। আমার বইন ডা ও মায়াবতী। আমার রুমুর বিয়া হইবো আমি বিয়া দিমু ওরে
শেখর আরো কিছু বললো তবে তনু তো থমকে গেছে শেখরের বলা “ শ্যামলা মাইয়া রা বেশি সুন্দর হয় যারে কয় মায়াবতী ” কথাটায়। সে তো ফর্সা বর্ণের । তাহলে কি শেখর তাকে পছন্দ করেনি। তনুর মনটা যেন কু ডেকে উঠলো। শেখরকে হারানোর ভয় ঝেকে ধরলো সম্পূর্ণ গতরে। মনে মনে নানা চিন্তায় বিভোর হয়ে গেলো। শেখরের ডাকে বাস্তবে ফিরে এলো।
— চলো ঘুমাই পড়ি। কাইল আমি একটু সকাল সকাল বাইর হমু। রুমুর ভাই সোহাগ আইবো শহর থেইকা। ওরে একটু আগায় আনতে হইবো।
তনু নড়েচড়ে বসল। শেখরের ঘামে ভেজা মুখ পানে চাইলো। কিছু বলতে চাইছে তবে কন্ঠ নালী ভারি হয়ে উঠেছে। শেখর হারিকেন টা নিভিয়ে দিলো। বিছানায় শুয়ে তনুকে টেনে নিলো নিজ বক্ষ স্থলে। আলতো হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। অন্য হাতে পুরাতন নকশিকাঁথা টা টেনে ঢেকে ফেললো দুজনকে। তনু শেখরের বুকে বিড়াল ছানার ন্যায় পড়ে রইলো।
————
রাতের আঁধারে যেন হারিয়ে গেছে রহমান ম্যানশনের সকল সুখ, হাসি, খুনসুটি। এক নিস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজমান। একটু আগেই তনুর কব'র দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন সকলে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। তানিয়া বেগমকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজ কক্ষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ইমরা আর জিসান নিজেদের ঘরে গিয়েছে মাত্রই। সায়না স্বামীর পাশে বসে আছে। নিরবতা ভেঙ্গে জাহিদ রহমান হেঁসে বললেন
— অবশেষে আমার পরিকল্পনা কাজে দিলো তাহলে। দেখেছিস জারিশ আমি বলেছিলাম তানিয়া বিশ্বাস করে নিবে।
জাহিদ রহমানের কথায় জারিশ ও হাসলো উচ্চস্বরে। দুজনের মুখেই রহস্যময় বাঁকা হাসি এখনো দৃশ্যমান। সায়না অবাক নেত্রে তাকিয়ে দেখছে স্বামী ও শশুর নামক দুজন মানুষকে। তাদের কথা ঠিক বুঝতে না পারলেও কতোটুকু বুঝতে সময় লাগে নি তারা কিছু মিথ্যে বলেছে। তবে তা কি জানতেই সায়না বলল
— কি পরিকল্পনার কথা বলছেন বাবা??
সায়নার কথায় জারিশ তাকে এক হাতে আগলে নিয়ে বলল
— আব্বু একটা মাস্টার প্লান করেছিল। তনুর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই লা'শ টা মর্গ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
সায়না অবাকের চূড়ায় যেন পৌছে গেছে। তবে পরক্ষনেই মনে পড়লো। তনু মৃ'ত প্রমাণিত হলে সম্পত্তির ভাগ অর্ধেক তাদের। সায়না আড়ালে বাঁকা হাসলো। সে নিজেও তাদের সঙ্গে যোগ দিলো। তিনজনে আরো কিছুক্ষণ কথা বললো। অনেক রাতে হয়ে যাওয়ার জাহিদ রহমান উঠে গেলেন। এখন ঘুমানো প্রয়োজন। তিনি যেতেই সায়না জারিশকে জিজ্ঞেস করল
— বাবা তনুকে ভীষণ ভালোবাসতেন তাহলে এসব কেন করলেন?
— আব্বু কখনোই তনুকে ভালোবাসেন নি। যা ছিল সবই লোক দেখানো। তুমি হয়তো জানো না। তানিয়া হাসান আব্বুর দ্বিতীয় স্ত্রী। আমার মা আনিমার একমাত্র সন্তান আমি। আমার বয়স যখন তিন তখনই আব্বু দ্বিতীয় বিয়ে করেন। জিসান তখন পাঁচ বছরে ছিল আর তনু কেবল ছয় মাসের বাচ্চা। তানিয়া হাসান আর আব্বুর কোনো সন্তান নেই।
এটুকু বলেই থামলো জারিশ। সায়নার মুখের বাঁকা হাসি আরো গাঢ় হলো। জারিশকে জড়িয়ে ধরে বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো
— তাহলে বাবার এই সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী তুমি!!
— ইয়েস ডার্লিং। তনুকে সরিয়ে দেওয়া শেষ এখন জিসানকে সরানোর পালা। তাহলেই আমাদের সবকিছু। আব্বু আর কতদিনই বাঁচবেন বলো।
বলেই জারিশ উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল। তার সঙ্গ দিলো সায়না ও। দুজনকে মুখে এক বিশ্রী হাসি। চোখে মুখে সম্পত্তির লোভ। আড়াল থেকে এক জোড়া চোখ যে তাদের সকল কিছু দেখে নিলো সে বিষয়ে ধারনা নেই তাদের
———
কাকডাকা ভোরে গ্ৰামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলছে একটা ভ্যান গাড়ি। আশেপাশে তেমন কোনো মানবের দেখা নেই। শেখর আপন মনে চলছে নিজ গন্তব্যে। পথিমধ্যে কিছু মনে পড়তেই ব্রেক কষলো। আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে দুপুরের রান্না করা হয়নি। তার ফিরতে সন্ধ্যে হতে পারে। তনু ও তো রান্না জানে না। শেখর চিন্তায় পড়ে গেলো। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে এগোছে। হঠাৎ বড় পুকুরের ধারে রুমুর দেখা মিলল। হাতে কয়েকটা এঁটো থালাবাটি। শেখরকে দেখেই নিচু কন্ঠে সালাম জানালো
— আসসালামুয়ালাইকুম শেখর ভাই। কেমন আছেন?
— ওয়ালাইকুমুস সালাম। এই তো আছি কোনো রকম। তুই কই যাস
— এগুলা ধুইতে যাই। ক্যান কিছু দরকার আছিলো নাকি
রুমুর কথায় শেখর খানিক ইতস্তত বোধ করলেও শেষে লজ্জা ভেঙ্গে বলল
— আসলেই তোর ভাবী তো শহুরে মাইয়া রান্ধা পারে না। আইজ সোহাগ আইবো দেইখা তাড়াতাড়ি চইলা আইছি। তুই যদি একটু কষ্ট কইরা যাইতি। রান্ধা ডা দেহাই দিয়া আইলেও হইবো
শেখরের কথায় মানে বুঝে রুমু মনে মনে হাসলো। তার শেখর ভাই বউয়ের চিন্তা বিভোর। অথচ চিন্তা করার কথা ছিল তাকে নিয়ে।সবই নিয়তি। রুমু মৃদু হেসে বলল
— আইচ্ছা যাইতাছি আমি। তুমি কামে যাও। চিন্তা কইরো না
— আইচ্ছা বইন আমার।
শেখর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। রুমু যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। শেখরের ভ্যান কুয়াশায় মিলিয়ে যাওয়া পর সে তাড়াহুড়ো করে থালা বাটি গুলো ধুতে শুরু করল।
সকাল দশটায় ঘুম ভাঙল তনুর। আড়মোড়া হয়ে উঠে বসলো। বিছানায় শেখর নেই। বুঝলো বেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। টেবিলের উপর থালায় দুটো পাউরুটি আর চা রাখা। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবুও তনু হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। শেখরের এই যত্ন টুকু পাওয়ার জন্য গত একুশ টা বছর তার একাকিত্বে কেটেছে। পরিবার থেকেও কখনো ভালোবাসা যত্ন পায়নি। মা সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে থাকতো। কখনো তনুকে বুকে জড়িয়ে শান্তনা ও দিতো না।
তনু উঠে নাস্তা টা করে নিলো। রান্না করতে হবে। তবে সে তো রান্না পারে না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। বেড়ার ধারে রুমু দাঁড়িয়ে। এদিকেই আসছে। তাকে দেখে তনু হেসে বলল
— আরে রোমানা তুমি!! এসো ঘরে বসবে!
তনুর কন্ঠ অত্যন্ত বিনয়ী। রুমু তাকিয়ে দেখলো শ্বেতাঙ্গ সুদর্শনা নারীটি কে। মুখে লেপ্টে স্নিগ্ধ হাসি দেখে তার রূপের প্রশংসা না করে পারলো না রুমু। নিঃসন্দেহে এই গ্ৰামের সবচেয়ে সুন্দরী বধুয়া। তাই তো শেখর ভাই তাকে বিয়ে করেছে। রুমুর মতো শ্যাম কন্যাদের বেশি আশা করতে নেই। ভাবতেই বুকের বা পাশটা ভারি হয়ে এলো। আঁখি ভরে আসছে চাইলো। তবে রুমু নিজেকে সামলে নিলো। শান্ত সুকোমল স্বরে বলল
— শেখর ভাই কইলো আপনে নাকি রাঁধতে পারেন না। তাই খানা নিয়া আইছি। কাইল থেইকা আমি আপনারে রান্না শিখাই দিমু। খানা ডা রাইখা থালা ডা দেন।
রুমুর কথায় তনু বেশ খুশি হলো। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল
— সত্যি তুমি আমাকে রান্না শিখিয়ে দেবে। তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো আমি জানি না। কখনো কোনো কিছুর প্রয়োজন হলেই ভাবীকে জানাবে কিন্তু!!
ভাবী শব্দ টা কম্পন তৈরি করল রুমুর সমস্ত শরীরে। বন্ধ নেত্রে জোরে নিঃশ্বাস নিলো। মুচকি হেসে বলল
— আইচ্ছা ভা ভাবী।
— রাতের রান্নাটা করে ফেলবো এখনি। ঘরে তোমার ভাই কচুর লতি এনে রেখেছিলো। লতি দিয়ে কি রান্না করা যায় বলো তো!!
তনুর কথায় রুমুও খানিক ভাবুক হলো। সে জানে মাছ কিনার সাধ্য শেখরের নেই। গ্ৰামে মাছের দাম একদম গলা কেটে নেয়। কিন্তু মাছ ছাড়া কিভাবে রান্না করবে। আজকে যা এনেছে তাতেই হয়ে যাবে। রুমু বলল
— ভাবী আইজ হই যাইবো এই খানায়। বেশি কইরা আনছি। কাইল আমি আসার সময় বড় পুকুর থেইকা জাল ফালাই ইচামাছ ধইরা আনমু।
রুমুর কথায় তনু মৃদু হাসলো। মেয়েটা আসলেই ভীষণ কোমল।
— আচ্ছা ঠিক আছে রুমু
রোমানা বাটি নিয়ে চলে গেলো। তনু যাওয়ার পানে তাকিয়ে ভাবলো। শেখর শ্যাম কন্যাদের মায়াবতী নাম দিয়েছে। তাকে তো বলে নি। রুমুর মতো শ্যামলা হলে বোধহয় তাকেও বলতো। তনু কিছু ভেবেই এগিয়ে গেলো চুলার কাছে। গত কালের কিছু ছাই আছে। সেখান থেকে কিছুটা ছাই তুলে নিলো। আলতো হাতে নিজের পুরো মুখে সামান্য মেখে নিলো। দৌড়ে ঘরে গেলো। চৌকির পাশে থাকা ছোট আয়না টা হাতে নিলো। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। এবার তাকে একদম রুমুর মতো রাগছে। ঠিক যেমন টার বর্ণনা শেখর দিয়েছিলো। এখন নিশ্চয়ই শেখর তাকে ও মায়াবতী বলবে। ভাবতেই মনটা উষ্ণতায় ভরে উঠলো। গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে ইতি মধ্যে। আলমারি থেকে নীল শাড়িটা নিয়ে চলে গেলো গোসল করতে
September 13, 2026 11:02 pm
পর্ব:০৮
রাতের আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোয় সামান্য আলোকিত গোটা গ্ৰাম। বাচ্চারা চাঁদের আলোয় উঠানে খেলা করছে। মহিলারা ঘরের সামনে বসার জায়গাটায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। সকলের হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যেন। এই সুন্দর আড্ডা থেকে বাদ যায়নি তনু ও। সন্ধ্যা হতেই রুমুর চাচাতো শৈলি এসেছিল। তার সঙ্গে পাশের বাড়িতে এসেছে তনু। এখানে সবাই কমবয়সী মেয়ে বউ। আড্ডার এক পর্যায়ে একজন বলে উঠল
— শেখর ভাইয়ে বউ আপনের বয়স কত??
— একুশ চলছে ভাবী
স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর করল তনু। তবে তার কথা শুনে অস্বাভাবিক হয়ে গেলো সকলের চক্ষু। একেকজন যেন জ্যান্ত মাছি খেয়ে নিয়েছে। মুখের করুন দূর দশা। রুমু চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। এসব আড্ডায় তার মন নেই। পাশের বাড়ির জসিমের বউ সীমা বলল
— কি কন ভাবী আপনের বয়স একুশ!!! আমার বয়স সবে উনিশ। এহনি দুই বাইচ্চার মা। আল্লাহ রহমত করলে পেটের টা আইবো তিন মাস পরে
বলেই লাজে মুখ ঢেকে নিলো সীমা ভাবি।সকলে হেঁসে উঠল। ঘরের মধ্যে থেকে জসিম ও মাথা চুলকে হাসলো খানিক। তবে তনু হা করে তাকিয়ে আছে তার পানে। তিন তিনটে বাচ্চা এই বয়সে। ভাবতেই তনুর মাথা চক্কর মারছে। একটু জোরেই বলল
— ভাবি আপনার বিয়ে হয়েছে কত বছরে?
— বিয়ার সময় আমার বয়স আছিলো বারো বছর। তেরো তে আমার কোলে আইছিল জহির। ষোলে বছরে রিবু হইলো।
তনু হতভম্ব বাকরুদ্ধ। এসব কিছু তার কাছে নতুন। তনুর ভাবনার মাঝে আরেক ভাবি বলল
— তনু ভাবি আপনে কবে বাচ্চাকাচ্চা লইবেন?? তাড়াতাড়ি লইয়া লন তাইলে শেখর ভাই আপনেরে মেলা ভালোবাসবো
কথা গুলো তনুর মনে গেঁথে গেলো। শেখরের ভালোবাসা পেতে সে সবকিছু করতে রাজি। তবে কিভাবে চাইবে এসব। ভাবতেই অন্যমনষ্ক হয়ে গেলো। এদিকে প্রসঙ্গ পাল্টে নানা গল্পে মশগুল বাকিরা। তনুর মাথায় হঠাৎ কিছু আসতেই চট করে তাকালো রুমুর দিকে। খানিক হেঁসে বলল
— তা রুমুর বিয়ে কবে খাবো হুম।
— হ আমাগো রুমুর বিয়া খামু তো। হের লাইগা কত কিছু কিনা রাখছি।
তনুর কথার প্রসঙ্গে বলল সীমা ভাবি। বাকিরাও বেশ উৎসক। তবে রুমুর মুখ খানা মলিন। বুকের মাঝে যেন পাথর চেপে আছে মেয়েটা। ছোট থেকে যার বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে আজ সে অন্য নারীতে মত্ত। রুমু বিষাদের হাসি হাসলো
— আমার মতো কালা মাইয়ারে কেডায় বিয়া করবো ভাবি? শৈলি বা তনু ভাবির মতো সুন্দর হইলে মানুষ পাগল হইতো।
— এমনে কইও না বইন। খোদায় হুকুম করলে বেডার ঘরে যাইবা।
মহিলার কথায় তনু বলল
— আচ্ছা রুমু তুমি পড়াশোনা করো তো!
— জি ভাবি করি। দ্বাদশ পাশ করলাম কয়দিন আগেই। এহন আর পড়াইবো না আব্বায়।
— কেন? গ্ৰামে তো কলেজ আছেই ভর্তি পরিক্ষার প্রস্তুতি নেও।
তনুর কথায় সীমা হায় হায় করে উঠল
— কি কন ভাবি!! আমাগো গেরামে মাইয়া গো মেট্রিক পাস করলে আর পড়ায় না। রুমুর বাপ গেরাম প্রধান দেইখা ওয় আরো দুই কেলাস পড়তে পারছে।
সীমার কথায় তনু বেশ বিরক্ত হলো। বুঝলো এই গ্ৰামে মেয়েদের হেলাফেলা করা হয়। তনু এবার রুমুর দিকে তাকিয়ে উপদেশের সুরে খানিক দাম্ভিকতা টেনে বলল
— শুনো রুমু তুমি যদি পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারো তাহলে যারা তোমাকে এখন বোঝা ভাবছে তারাও তোমাকে সালাম করে চলবে। অতএব পড়াশোনা টা চালিয়ে যাও প্রয়োজনে আমি তোমাকে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সাহায্য করবো।
তনুর কথাটা বেশ পছন্দ হলো রুমুর। নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানানো। অন্য আলাপে মশগুল হলো সকলে।
—
রাত সাড়ে আটটার দিকে শেখর বাড়ি ফিরলো। সোহাগের সঙ্গে ছিল আজ সারাদিন। সোহাগ বাড়ি ফিরে শেখরকে নিয়ে গিয়েছিল পাশের গ্ৰামে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে নিজ নীড়ে ফিরলো। দ্রুত কলপাড়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকলো।ঢুকতেই সামনে তাকিয়ে শেখরের পুরো শরীর হিম হয়ে এলো। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। হৃদপিন্ড টা যেন লাফিয়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। ঘাম জমতে শুরু করেছে কপালে।
শেখরকে দেখে হাসি মুখে উঠে দাড়ালো তনু। পড়নে আকাশি সুতি শাড়ি টা। মাথায় ঘোমটা নেই। মুখে সেই ছাই লেপ্টে দেওয়া। লাজুক হেঁসে এগিয়ে গেলো শেখরের নিকট। নিজের কাছে আসতে দেখেই শেখর চিৎকার করে বলল
— ভূ ভূত ভূত!! আল্লাহ গো বাঁচান!! লা হাওলা ওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। দূর যা শয়তান!! আল্লাহ গো!!!
চিৎকার করতে করতে বলল। দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার পিছন পিছন তনুও বেরিয়ে এলো। তা দেখে শেখর আরো জোড়ে চিৎকার দিলো
— দূরে যা শয়তান। আমার রুপ কই??
— আরে আমিই তো তোমার রুপ। এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছো কেন??
— তুই আমার বউ না। আমার রুপ এমন না। আল্লাহ গো বাঁচান এই পেত্নির হাত থেইকা।
হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারালো শেখর। তনু তাজ্জব বনে গেলো। কি হয়েছে বুঝতে বেশ খানিকটা সময় নিল। হঠাৎ নিজের মুখের কথা মনে আসতেই কপাল চাপড়ে বসে পড়লো শেখরের পাশে। শেখরের মুখে পানির ছিটা দিতে দিতে বিরবির করে বলল
— শা/লা যার জন্য এগুলো মুখে মাখলাম সেই আমাকে চিনলো না। বলে কিনা আমি ভূত পেত্নি।
শেখরের গালে হালকা চাপড় মেরে ডাকলো
— এই উঠো। আরে উঠো না। দেখো আমি তোমার রুপ কোনো ভূত পেত্নি না। উঠো না।
আস্তে আস্তে শেখর চোখ পিটপিট করে তাকালো। তাকাতেই বিকট চিৎকার দিল
— আল্লাহ গো পেত্নি
দ্বিতীয় বারের মতো জ্ঞান হারালো শেখর। তনুর মাথায় এলো সে এখনো মুখ পরিষ্কার করে নি। হতাশ হয়ে কপাল চাপড়ে বসে রইলো তনু। আস্তে করে শেখরের হাত টেনে ঘরের ভিতরে নিয়ে এলো। একটানে কোলে তুলে চৌকিতে শুইয়ে দিয়ে উঠে গেলো কলপাড়ে। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ফিরলো। শেখরের জ্ঞান ফিরানো দরকার। আস্তে আস্তে ডাকলো। মুখে সামান্য পানিতে ছিটা ও দিলো। খানিক বাদে শেখরের জ্ঞান আসলো। উঠেই আগে আড়চোখে তনুর দিকে তাকালো। মুখে স্পস্ট আতংক বিরাজ করছে। তবে তাকাতেই তনুর শুভ্র মুখ খানা দেখে লাফিয়ে উঠে বসলো। তনুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জাপটে জড়িয়ে ধরল তাকে। একদম বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। বিরবিরিয়ে শুধাল
— তুমি ঠিক আছো রুপ চুনা!! আমি কত ভয় পাইছিলাম। ওই পেত্নি তোমার কিছু করে নাই তো??
বলেই অসংখ্য চুমু এঁকে দিলো তনুর ললাটে। শেখরের এই যত্ন দেখে তনু চুপটি করে পড়ে রইলো স্বামীর বক্ষে মাঝে। উদ্দেশ্য আরেকটু আদর নেওয়া।
Page 2 / 2
Prev