part:02
এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর রাতের অবসানে পর গাড়িটা এসে থামল এক ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে। প্রথম আলোর স্পর্শে যেন নতুন করে জেগে উঠল চারপাশটা। বাড়ির বাগানজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। সুচারুভাবে ছাঁটা গাছপালা, বাহারি ফুলে মোড়া সরু পথ, আর সবকিছু মিলিয়ে যেন এক শান্ত, নির্মল রাজপ্রাসাদের আবহ। গাড়ির শব্দ পেতেই গেটের পাশে দাঁড়ানো দারোয়ানটি তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল। ভেতরটা তখন নিস্তব্ধ কেবল দূর থেকে কোথাও পাখির ডাক ভেসে আসছে মাঝেমধ্যে।
গাড়ির পেছনের সিটে ঘুমিয়ে আছে লিলি। সারাদিনের ধকল, রাতভর অভুক্ত থাকা আর অজানা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ঘুমটাই যেন তার কাছে একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। ক্লান্ত শরীরটা ভেঙে পড়েছিল অবসাদে, আর মনের ভেতর জমে ছিল অসংখ্য প্রশ্ন। তবুও সে কিছু বলেনি।
কিন্তু আয়েশা বেগম? তিনি সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেননি। গাড়িতে বসেই জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন দীর্ঘ সময়। গভীর রাতে লিলির প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলেও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হয়নি। শাশুড়ির কঠিন মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে আর কথা বাড়ায়নি। কেন জানি না এই মহিলাকে তার ভীষণ ভয় করছে।
গাড়ি থামতেই লিলির ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলেই দেখল তারা এসে দাঁড়িয়েছে এক অপূর্ব সুন্দর বাড়ির সামনে। তবে বাড়ির চেয়ে তার দৃষ্টি বেশি আটকে গেল চারপাশের বাগানে। ছোটবেলা থেকেই গাছপালার প্রতি তার এক অদ্ভুত টান। এই নিখুঁত, যত্নে সাজানো বাগান যেন তার ক্লান্ত হৃদয়ে একফোঁটা প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দিল। ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এলো এক কঠিন কণ্ঠের ডাক,
— “কি হলো, গাড়ি থেকে নামছো না কেন?”
চমকে উঠল লিলি। আয়েশা বেগম ইতোমধ্যেই দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। চারপাশে তাকানো বন্ধ করে লিলি চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। শাশুড়ির পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। বাড়ির কলিং বেল টিপতেই এক মধ্যবয়সী লোক দরজা খুলে দিল। আয়েশা বেগম গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— “সাদিদ কোথায়, বাহারি?”
লোকটি কিছুটা সংকুচিত গলায় উত্তর দিল,
— “সাদিদ বাবা তো এখানটাতে আসে লাই, বড়ম্যাডাম।”
এক মুহূর্তের জন্য আয়েশা বেগমের মুখে উদ্বেগের ছায়া নেমে এল। তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তিনি দ্রুত নিজের ভাবনা গুছিয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। পেছন ফিরে আবার বললেন,
— “ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে, আমার সাথে চলো।”
লিলি দ্রুত পা চালিয়ে তার পিছু নিল। চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখছিল সে। বাড়িটা ভীষণ পরিপাটি ও গোছানো। তবুও কোথাও যেন এক অদ্ভুত গুমোট ভাব ছড়িয়ে আছে। ঠিক যেমনটা তার শাশুড়ির ভেতরেও অনুভব হয়।
———
ঢাকার এক সরকারি হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন মানুষের ভিড় আর অস্থিরতা। কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, কোথাও বা কান্নার শব্দ। কেউ ট্রলিতে করে আহত কাউকে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার চিকিৎসকের সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসার জন্য অনুরোধ করছে। পুরো ওয়ার্ডজুড়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজমান।
একটা বেডের পাশে বসে আছে সাদিদ। মুখে তার কঠোর এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। তার গায়ে এখনো সাদা শেরওয়ানি, হাতার কাপড় গুটানো কনুই পর্যন্ত। বুকের কাছে ঘাম জমে কাপড়টা শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে, যাতে তার সুগঠিত বুকের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামনের বেডে কপাল ও হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছে হাসিব।
অবশেষে সাদিদ মুখ খুলল,
—“কখন শুরু হয়েছিল এসব?”
আরিফ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। গলা যেন শুকিয়ে এলো। পুরো সেমিনারের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তার ওপরই। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো—সেমিনার লণ্ডভণ্ড, ছেলেরা আহত, কেউ কেউ হাসপাতালে। তাই গলা পরিষ্কার করে সে বলল,
— “সাদি… ওরা মোরশেদ দেওয়ানের লোক ছিল। আমরা অনেক সতর্ক ছিলাম। সেমিনারের চারপাশে আমাদের ছেলেরা ছড়িয়ে ছিল চেকপোস্টে, প্রবেশপথে, এমনকি চেয়ার সারির মাঝেও। যাতে একটা পিঁপড়েও ঢুকতে না পারে।”
একটু থেমে সে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর আবার বলল,
—“কিন্তু ওরা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গেছিল ভাই। প্ল্যাকার্ড হাতে, সেমিনারের টি-শার্ট পরে, কেউ কেউ ক্যামেরাম্যান সেজে ছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি ওরা মোরশেদের পেইড গুন্ডা। সেমিনার শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ বিশৃঙ্খলা শুরু করে চেয়ার ছোঁড়াছুঁড়ি, স্লোগান, মারামারি। আমাদের ছেলেদের স্পিরিটটাই ভেঙে দিয়েছে।”
সাদিদ ধীরে ধীরে চোখ তুলে আরিফের দিকে তাকাল। তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে। রাগে হিসহিস করে বলল,
—“তাদের কেউ ছাড় পাবে না। মোরশেদ ভুল করেছে। আমার এলাকায় দাঁড়িয়ে আমার ছেলেদের ছুঁয়ে।”
একটু থেমে সে আরও বলল,
—“আর স্পিরিট কি এত সস্তা জিনিস নাকি, যে এতটুকুতেই ভেঙে যাবে? রাজনীতির মঞ্চে এরকম অহরহই হয়। কিন্তু তাতে হার মানলে চলবে!”
তার কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল আরিফ আর হাসান।
———
বেলা তখন মধ্যাহ্ন। হাসপাতাল থেকে সাদিদ ফিরল নিজের বাড়িতে। মাথায় ঘুরছে হাজারো চিন্তা। এক্সট্রা চাবি সবসময় তার কাছে থাকে, তাই কলিং বেল না টিপেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ছোটবেলায় পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকতে হতো বলে এই বাড়িটা তার দাদু তাকে উপহার দিয়েছিলেন। বরাবরের মতোই এটা তার শান্তির নীড়। কিন্তু আজ সেই শান্ত নীড়ে ফিরতেই পেছন থেকে ভেসে এলো এক কঠিন কন্ঠস্বর,
—“কাল বিয়ের আসর থেকে চলে কেন গেলে, সাদিদ?”
সাদিদ থমকে দাঁড়াল। এই সময়ে মায়ের এখানে থাকা তার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তবুও স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
—“গতকালের সেমিনারে সমস্যা হয়েছিল।”
আয়েশা বেগম কড়া স্বরে বললেন,
—“এই ফালতু কারণের জন্য তুমি নিজের বিয়ের আসর থেকে উঠে চলে এসেছ?”
সাদিদ শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “রাজনীতি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
এবার আয়েশা বেগম সত্যিই রাগে ফেটে পড়লেন।
— “তুমি কি ঠিক করেছো রাজনীতি ছাড়বে না? আমি কখনোই তোমার এই রাজনীতি করাকে সাপোর্ট করিনি। আর এখন তো একদমই না! তুমি আমাদের ফ্যামিলি বিজনেসে জয়েন করছো—এটাই ফাইনাল।”
সাদিদ বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “অসম্ভব। রাজনীতি আমার রক্তে মিশে গেছে। আর এবারের নির্বাচনে আমি দাঁড়াচ্ছি।”
এই বলে সে নিজের রুমের দিকে এগোতেই পেছন থেকে আবার শোনা গেল তার মায়ের তেজী কণ্ঠ,
— “রাজনীতি… রাজনীতি… রাজনীতি! এই পথে ধ্বংস ছাড়া কিছুই পাবে না তুমি সাদিদ। একদিন এই রাজনীতি তোমাকে নিঃস্ব করে দেবে।”
মায়ের কথায় থামল না সে। নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে পেছন ঘুরতেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো এক রমনী। যাকে দেখে সাদিদ চরম বিরক্তি নিয়ে বলল,
— “এই মেয়ে আমার রুমে কি করছো তুমি?”
লিলি ভয়ে কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে গেল। শাশুড়ি মা তো তাকে এই রুমেই থাকতে বলেছিলেন। তাহলে সে এখানেই থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। এদিকে লিলি চুপ করে থাকায় সাদিদ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— “বাড়িতে আরও অনেক রুম আছে। যেটাতে ইচ্ছে গিয়ে থাকো। তবে আমার রুমের আশেপাশেও আর আসবে না।”
লিলি পিটপিট করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
লোকটা দেখতে মাশাআল্লাহ… কিন্তু ব্যবহার আস্তাগফিরুল্লাহ! মেয়েটাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাদিদ বিরক্ত হয়ে ‘চ্’ শব্দ করল। তারপর হাত ধরে টেনে লিলিকে ঘরের বাইরে বের করে দিল।
শাড়িতে পা জড়িয়ে পড়ে যেতে যেতে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল লিলি।
পরক্ষণেই তার মুখের সামনে দরজাটা ধপ করে বন্ধ করে দিল সাদিদ। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। এই লোক তার সাথে এমন আচরণ করছে কেন? একটু পরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
— “খারুস! অসভ্য লোক! অভিশাপ দিলাম জীবনে তোর বিয়ে হবে না। আর যদি হয়ও, তাহলে হবে একটা পেত্নীর সাথে। বাসর রাতেই সে তোর ঘাড় মটকে দেবে!”
পরক্ষণেই হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই চমকে উঠল,
— “তওবা তওবা! ওই খারুসটার বউ তো আমিই!”
ঠিক তখনই আচমকা খুলে গেল সাদিদের ঘরের দরজা। সেখানে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাদিদ। লিলিও আহাম্মক হয়ে তাকিয়ে রইল তার পানে। সাদিদ দাঁত চেপে বলল,
— “বলা শেষ? এখন আমার রুমের সামনে থেকে দূর হও ইডিয়েট।”
শেষের কথাটা চেচিয়ে বলায় লিলি ভয় পেয়ে এক হাতে শাড়ি সামলে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু চুলের ভেজা পানি মেঝেতে পড়ে জায়গাটা পিচ্ছিল হয়ে ছিল। পা ফেলতেই
ধপ করে পড়ে গেল সে।
— “ও মাগো! আমার কোমড়টা শেষ!”
সাদিদ সবই দেখল। কিন্তু সাহায্য করার বদলে আবারও লিলির মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল। শব্দে কেঁপে উঠল লিলি। সে ভেবেছিল লোকটা হয়তো সাহায্য করবে। কিন্তু না! এই লোকটা সত্যিই একটা বদজাত।
এদিকে তার চিৎকার শুনে ছুটে এলো বাহারি।
— “কি হইছে বউমনি? আপনি ফড়ে গেলেন কেমনে?”
লোকটা বাঙালি নয়। তবে দীর্ঘদিন বাঙালিদের সঙ্গে থাকতে থাকতে বেশ ভালোই বাংলা রপ্ত করেছে। তার কথা শুনে লিলি কিছুটা লজ্জা পেল। মুখে বলল,
—“ভাড়ী কাকা, আমাকে একটু তুলবেন?”
বাহারি হকচকিয়ে বলল,
— “আগ্গে বউমনি, হামার নাম তো বাহারি!”
লিলি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
— “সেটাই তো বললাম ভাড়ী কাকা।”
বাহারি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তবুও লিলিকে ধরে তুলল। উঠে দাঁড়িয়ে লিলি কোমরে হাত দিয়ে আহাজারি শুরু করল,
— “আহা! আমার এত সুন্দর কোমড়টাই বুঝি ভেঙে গেল রেএএ!”
বাহারি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
— “হামি গিয়ে বড়ম্যাডামকে ডেকে লিয়ে আসি। আপনি দাঁড়ান বউমনি।”
বাহারি চলে যেতেই লিলি একবার তাকাল সাদিদের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে। মনে মনে ভাবল - লোকটা যদি তাকে মেনেই না নেয়… তাহলে বিয়ে করল কেন?