গল্প: আপনি আমার ভীষ...
 
Notifications
Clear all

গল্প: আপনি আমার ভীষণ কাছের কেউ (লেখনিতে:সুমাইয়া তুলি)

Page 1 / 2

Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

গল্প: আপনি আমার ভীষণ কাছের কেউ 

লেখনিতে:সুমাইয়া তুলি 

 

 

 

অতীতে প্রেমিকার দেওয়া ধোকার কারণে বিয়ে করতে চায় না সাদিদ। তবে মায়ের জোড়াজড়িতে বিয়ে করতে বাধ্য হয় লিলি নামক এক রমণীকে। যার পেছনে আবার পড়ে আছে তার পাগল প্রেমিক ইহরান শেখ। বউ না মানলেও লিলি কে আবার ইহরানের সাথে সহ্য করতে পারে না সাদিদ। 

 

অস্বীকৃতি, অহংকার, অতীতের ক্ষত আর বর্তমানের জটিলতায় ভরা এই সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থামবে? হাজার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কি লিলি পারবে সাদিদের হৃদয়ে নিজের জায়গা করে নিতে? আর সাদিদ সে কি পারবে তার অতীতের অন্ধকার ভুলে নতুন করে ভালোবাসতে?

 

জনরা — রাজনৈতিক, রোমান্টিক, রম্য 

 

 

Loading spinner

Reply
6 Replies
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

Part:01

 

কবুল বলেই বিয়ের আসর ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সাদিদ। যেন এই বিয়েতে তার ভূমিকা শুধু ওই তিনটে শব্দ বলা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পেছন থেকে তার মা আয়েশা বেগম বলে উঠলেন, 

—“কোথায় যাচ্ছো সাদিদ?” 

 

সাদিদ নামক ব্যাক্তি একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, 

—“প্লিজ আম্মু! বিয়ে করতে বলেছ, করেছি। আর বাধা দিও না। এখন আমায় যেতে হবে।”

 

তার এই কথায় চারদিকে শুরু হলো তীব্র সমালোচনা। এদিকে একের পর এক কান্ডে হতভম্ব নববধূ লিলি। শুধুমাত্র ঢাবিতে চান্স না পাওয়ায় অচেনা-অজানা একজনের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে তার৷ বিষয় টা ঠিক হজম হচ্ছে না লিলির। চারপাশের এতো কোলাহলের মাঝেও তার কানে কিছুই ঢুকছে না।

 

এই তো একটু আগে সামনের হুজুর টাইপ লোকটার গম্ভীর কণ্ঠে যখন বলল,

— “বলো মা, কবুল?”

 

বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে লিলি তীব্র অভিমানে চোখ নামিয়ে নিল। মনে মনে ঠিক করল সে আর থাকবে না এদের সাথে। চলে যাবে। তাই ফটাফট বলে ফেলল,

— “কবুল, কবুল, কবুল।”

 

রায়ন সাহেব মেয়ের এই কাজে অবাক হলেন না। তবে তার যে এখানে কিছুই করার নেই। লিলি কবুল বলার পরপরই, বর কবুল বলেই আসর ছেড়ে উঠে চলে গেল। এটা দেখে লিলির বাবা মায়ের প্রতি অভিমান আরও তীব্র হলো। 

 

বাবা তাকে এত তাড়াতাড়ি জোর করে বিয়ে দিল তো দিল, এমন একজনের সঙ্গে দিল, যে কিনা তাকে বিয়ের আসরেই ফেলে চলে গেল! সে তো লোকটাকে চেনেও না, পাশে বসে থাকলেও লোকটাকে একবার চোখ তুলে দেখা হয় নি তার। শুধু নামটা শুনেছে — কাইরান শাহরিয়ার সাদিদ। আর চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে দেখেছে।

 

বিয়ের আসর থেকে সাদিদকে এভাবে চলে যেতে দেখে লিলির বাবা রায়ন সাহেব এগিয়ে গেলেন আয়েশা বেগমের দিকে,

—“এটা কী হলো, ভাবি? সাদিদ এভাবে চলে গেল কেন? ও কি এই বিয়েতে রাজি ছিল না?”

 

আয়েশা বেগম চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বরাবরই গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। তাঁর ছেলেটাও হয়েছে তারই মতো চুপচাপ, নিজের মতো চলা, মাথা গরম, আর ভীষণ রকমের জেদি। অনেক কষ্টে তিনি ছেলেকে বিয়ের জন্য রাজি করিয়ে ছিলেন। তবে কে জানত সে এমন একটা কাজ করবে!

 

তবুও নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে বললেন,

—“এসব নিয়ে ভাববেন না। লিলি এখন আমাদের বাড়ির বউ। ওকে আমি নিজের মেয়ের মতোই দেখব। সাদিদ হয়তো একটু জেদি, তবে খারাপ ছেলে নয়। নিজের দায়িত্বে সে অবহেলা করবে না।”

 

সবকিছু হঠাৎই গতি পেল। বিদায়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেল। লিলি বুঝে ওঠার আগেই সবার ভিড়, আলতো কান্না, ঝাপসা আলো সব মিলিয়ে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল সে। গাড়িতে ওঠার সময় একবার ফিরে তাকাল বাবা-মায়ের মুখের পানে। পরপরই চোখ সরিয়ে নিল অভিমানে। 

 

আজ সকালেও তো সব ছিল স্বাভাবিক। প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে মা-বাবার সঙ্গে খাওয়া, হাসিঠাট্টা সব ঠিকই ছিল। তবে বিকেলের দিকেই আচমকা সব পাল্টে গেল। হুট করেই তার মা মিসেস পারভীন তাকে সাজাতে শুরু করলেন। মাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। তখনই পাশ থেকে তার ছোট চাচাতো বোন বলে ওঠে,

 

—“কেন ফাইজা আপু, তুমি কি জানো না আজকে তো তোমার বিয়ে?”

 

প্রথমে তার কথা বিশ্বাস না করলেও পরিবারের সবার অস্বাভাবিক আচরণ আর মায়ের নীরবতা তাকে নিশ্চিত করে দিল মেয়েটা সত্যিই বলছে। তখনই লিলির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। নিজের আকস্মিক বিয়ের কথা শোনার পর যখন বাবা-মাকে বোঝাতে চাইল, সে এই বিয়ে করতে চায় না। তখন তার বাবা একটা কথাই বলেছিলেন,

 

— “ঢাবিতে তো চান্স পাওনি, তাই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। তোমার আর পড়াশোনা করতে হবে না।”

 

ব্যস, এতটুকুই লিলির ছোট্ট মনে তীব্র অভিমান জমার জন্য যথেষ্ট ছিল। 

 

লিলির পুরো নাম ফাইজা মুনতাহা লিলি। ‘লিলি’ নামটা তার দাদির দেওয়া। যদিও সরাসরি তিনি এই নাম রাখেননি। দাদির মতে, সে পদ্মফুলের মতো কোমল ও সুন্দর। তাই তিনি প্রথমে তার নাম পদ্ম রেখে ছিলেন। কিন্তু কালেভদ্রে কিভাবে জানি সবাই তাকে পদ্মর থেকে লিলি বলে ডাকা শুরু করল। তারপর জন্মনিবন্ধনেও সেই নামই দেওয়া হলো। 

 

লিলি তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবার স্বপ্ন ছিল সে যাতে ঢাবি তে পড়ে৷ সেই কথামতোই এইচএসসি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য দিনরাত প্রস্তুতি নিয়েছিল লিলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে চান্স হয় নি তার। এতে তার বাবা তার উপর বেজায় অভিমান করেছিল। কিন্তু সেই জন্য যে বিয়েই দিয়ে দেবে তা লিলি ভাবতেও পারেনি। অতপর লিলি আর কোনো প্রশ্ন করেনি। বাবা-মায়ের প্রতি তীব্র অভিমান নিয়ে চুপচাপ পুতুলের মতো বিয়েটা করে নিয়েছে সাদিদ নামক ওই অজ্ঞাত পুরুষকে। 

 

———

 

লিলির ভাবনার ছেদ ঘটে যখন গাড়িটা এসে থামে এক বড় দোতলা বাড়ির সামনে। বাড়িটা পুরোনো আমলের আদলে গড়া। বেশ বড়, ছিমছাম। ঝাড়বাতির আলোয় চিকমিক করছে চারিপাশ। বাড়ির লোকেরা ব্যস্ত হয়ে উঠলো নতুন বউকে ঘরে তুলতে। আর অপরিচিত অনেক মানুষ তো আছেই। লিলি চুপচাপ মাথা নিচু করে সবার কথা শুনছে। গাঁ ভর্তি গহনা, ভারী শাড়ি পড়ে পা ফেলে হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। তবে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না।

 

সবাই যখন লিলিকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই আয়েশা বেগম এক কাজের লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করেন,

—“সাদিদ এসেছে?”

 

ছেলেটি একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ে,

—“আজ্ঞে না ভাইজান তো এখানে আসেনি।”

 

উত্তরটা আয়েশা বেগমের পছন্দ হলো না। সামান্য বিরক্তি নিয়ে ধীরে বললেন,

—“ঠিক আছে।”

 

তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি কি ভাবছেন। হঠাৎ করে লিলির কাছে গিয়ে তার হাত ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন।

তা দেখে আয়েশা বেগমের বড় জা মিসেস সানজিদা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলেন,

—“ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?”

 

—“ওর যেখানে থাকা দরকার সেখানে।”

 

গম্ভীর কণ্ঠে এতটুকু বলেই লিলিকে নিয়ে রওনা দিলেন কোনো এক অজানা বা চিরচেনা গন্তব্যের দিকে। তবে লিলি এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না। তার শাশুড়ি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? তাকে কি বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে? তাহলে বিয়েটা কেন করানো হলো? তারউপর খিদেয় তার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। বাবা মায়ের উপর রাগ করে তো বিকেলের পর কিছুই খাওয়া হয়নি তার। আর কিছু ভাবতে পারছে না লিলি। কোন মোড়ে যাচ্ছে তার জীবন সবকিছুই যে ধোঁয়াশা।

 

———

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে টিএসসি চত্বরে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের মাঝে তুমুল সংঘর্ষ বেধেছে। চারদিকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার সেল নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু তাতেও যেন উত্তেজনা একটুও কমছে না। উত্তাল জনতার মাঝে ক্রমেই বাড়ছে বিশৃঙ্খলা।

 

ঠিক এমন সময় ঝড়ের বেগে সেখানে এসে থামল একটি জিপ। গাড়ির দরজা খুলে ধীর পায়ে নেমে এলো এক যুবক। পরনের গাঢ় রঙের শেরওয়ানি। জিপ থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই সে হাতা গুটিয়ে নিল। সামনে তাকাতেই তার চোখে পড়ল কয়েকজন ছেলে মিলে রাস্তায় ফেলে একজনকে নির্মমভাবে মারছে।

মুহূর্তেই রাগে তার পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠল তার। জ্বলে উঠল তার হলুদ সবুজ মিশেলের হ্যাজেল আইস।

 

আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। জিপের ব্যাকসিট থেকে একটা হকি স্টিক তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সামনে। তারপর শুরু হলো তার তাণ্ডব। সামনে থাকা ছেলেগুলোকে একের পর এক আঘাত করতে লাগল। হকি স্টিকের আঘাতে একসময় ছেলেগুলো রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এতক্ষণ মার খাওয়া ছেলেটা কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—“ভাই, আমরা তো শান্তিপূর্ণভাবেই সমাবেশ করছিলাম। ওরাই এসে ঝামেলা বাধিয়েছে।”

 

পুরুষটি কিছু বলল না। শুধু বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল, যেন নিজের ভেতরের আগুনটাকে কোনোমতে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই দূর থেকে লাঠি হাতে দৌড়ে এলো আরেকটা ছেলে। কাছে এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—“আজকের দিনে তুই কেন আসতে গেলি, সাদিদ? আমি সবটা সামলে নিতাম।”

 

গম্ভীর কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল সাদিদ,

—“Shut up, idiot! কখন এই ঝামেলা শুরু হয়েছে? তোরা থাকতে কেন বাহিরের মানুষের কাছ থেকে আমায় এই খবর জানতে হবে?”

 

আরিফ চুপ করে সাদিদের কথাগুলো নিঃশব্দে গিলে নিল। আজ সাদিদের বিয়ে ছিল। এমন দিনে কি আর তাকে ডাকা যায়! তাই ম্লান কণ্ঠে সে বলল,

—“আজ তো তোর বিয়ে ছিল, তাই…”

 

কথা শেষ করতে না দিতেই সাদিদ আবার কঠিন গলায় বলে উঠল,

—“Don’t say that. আম্মুর ছেলের বউয়ের দরকার ছিল, দিয়ে দিয়েছি। ব্যাস। এছাড়া ওই মেয়ের আমার জীবনে কোনো জায়গা নেই। They’re all the same.”

 

কথা শেষ করেই সে আবার ভিড়ের ভেতর ঢুকে গেল। তাকে সামনে আসতে দেখে অনেকেই পালিয়ে গেছে। তবুও যারা রয়ে গেছে, তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সাদিদ। একের পর এক তাদের বেধড়ক পেটাতে লাগল। কে জানে কোথাকার কোন রাগ, কোন যন্ত্রণা সে আজ এভাবে ঝাড়ছে।

 

আরিফ দূর থেকে তাকিয়ে রইল তার দিকে। পাশেই আহত অবস্থায় বসে থাকা হাসান ধীরে ধীরে বলল,

—“ভাই… কি এখনো তাকে ভুলতে পারেনি?”

 

আরিফ নিঃশব্দে হাসানের কাঁধে হাত রাখল। তারপর গভীর, হতাশ কণ্ঠে বলল,

—“তাকে নয়… তার করা কাজটাকে ভুলতে পারেনি।”

 

 

 

Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

part:02

 

 

 

এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর রাতের অবসানে পর গাড়িটা এসে থামল এক ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে। প্রথম আলোর স্পর্শে যেন নতুন করে জেগে উঠল চারপাশটা। বাড়ির বাগানজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। সুচারুভাবে ছাঁটা গাছপালা, বাহারি ফুলে মোড়া সরু পথ, আর সবকিছু মিলিয়ে যেন এক শান্ত, নির্মল রাজপ্রাসাদের আবহ। গাড়ির শব্দ পেতেই গেটের পাশে দাঁড়ানো দারোয়ানটি তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল। ভেতরটা তখন নিস্তব্ধ কেবল দূর থেকে কোথাও পাখির ডাক ভেসে আসছে মাঝেমধ্যে।

 

গাড়ির পেছনের সিটে ঘুমিয়ে আছে লিলি। সারাদিনের ধকল, রাতভর অভুক্ত থাকা আর অজানা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ঘুমটাই যেন তার কাছে একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। ক্লান্ত শরীরটা ভেঙে পড়েছিল অবসাদে, আর মনের ভেতর জমে ছিল অসংখ্য প্রশ্ন। তবুও সে কিছু বলেনি।

 

কিন্তু আয়েশা বেগম? তিনি সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেননি। গাড়িতে বসেই জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন দীর্ঘ সময়। গভীর রাতে লিলির প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলেও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হয়নি। শাশুড়ির কঠিন মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে আর কথা বাড়ায়নি। কেন জানি না এই মহিলাকে তার ভীষণ ভয় করছে।

 

গাড়ি থামতেই লিলির ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলেই দেখল তারা এসে দাঁড়িয়েছে এক অপূর্ব সুন্দর বাড়ির সামনে। তবে বাড়ির চেয়ে তার দৃষ্টি বেশি আটকে গেল চারপাশের বাগানে। ছোটবেলা থেকেই গাছপালার প্রতি তার এক অদ্ভুত টান। এই নিখুঁত, যত্নে সাজানো বাগান যেন তার ক্লান্ত হৃদয়ে একফোঁটা প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দিল। ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এলো এক কঠিন কণ্ঠের ডাক,

— “কি হলো, গাড়ি থেকে নামছো না কেন?”

 

চমকে উঠল লিলি। আয়েশা বেগম ইতোমধ্যেই দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। চারপাশে তাকানো বন্ধ করে লিলি চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। শাশুড়ির পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। বাড়ির কলিং বেল টিপতেই এক মধ্যবয়সী লোক দরজা খুলে দিল। আয়েশা বেগম গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

— “সাদিদ কোথায়, বাহারি?”

 

লোকটি কিছুটা সংকুচিত গলায় উত্তর দিল,

— “সাদিদ বাবা তো এখানটাতে আসে লাই, বড়ম্যাডাম।”

 

এক মুহূর্তের জন্য আয়েশা বেগমের মুখে উদ্বেগের ছায়া নেমে এল। তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তিনি দ্রুত নিজের ভাবনা গুছিয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। পেছন ফিরে আবার বললেন,

— “ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে, আমার সাথে চলো।”

 

লিলি দ্রুত পা চালিয়ে তার পিছু নিল। চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখছিল সে। বাড়িটা ভীষণ পরিপাটি ও গোছানো। তবুও কোথাও যেন এক অদ্ভুত গুমোট ভাব ছড়িয়ে আছে। ঠিক যেমনটা তার শাশুড়ির ভেতরেও অনুভব হয়।

 

———

 

ঢাকার এক সরকারি হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন মানুষের ভিড় আর অস্থিরতা। কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, কোথাও বা কান্নার শব্দ। কেউ ট্রলিতে করে আহত কাউকে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার চিকিৎসকের সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসার জন্য অনুরোধ করছে। পুরো ওয়ার্ডজুড়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজমান।

 

একটা বেডের পাশে বসে আছে সাদিদ। মুখে তার কঠোর এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। তার গায়ে এখনো সাদা শেরওয়ানি, হাতার কাপড় গুটানো কনুই পর্যন্ত। বুকের কাছে ঘাম জমে কাপড়টা শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে, যাতে তার সুগঠিত বুকের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামনের বেডে কপাল ও হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছে হাসিব।

অবশেষে সাদিদ মুখ খুলল,

—“কখন শুরু হয়েছিল এসব?”

 

আরিফ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। গলা যেন শুকিয়ে এলো। পুরো সেমিনারের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তার ওপরই। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো—সেমিনার লণ্ডভণ্ড, ছেলেরা আহত, কেউ কেউ হাসপাতালে। তাই গলা পরিষ্কার করে সে বলল,

— “সাদি… ওরা মোরশেদ দেওয়ানের লোক ছিল। আমরা অনেক সতর্ক ছিলাম। সেমিনারের চারপাশে আমাদের ছেলেরা ছড়িয়ে ছিল চেকপোস্টে, প্রবেশপথে, এমনকি চেয়ার সারির মাঝেও। যাতে একটা পিঁপড়েও ঢুকতে না পারে।”

 

একটু থেমে সে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর আবার বলল,

—“কিন্তু ওরা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গেছিল ভাই। প্ল্যাকার্ড হাতে, সেমিনারের টি-শার্ট পরে, কেউ কেউ ক্যামেরাম্যান সেজে ছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি ওরা মোরশেদের পেইড গুন্ডা। সেমিনার শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ বিশৃঙ্খলা শুরু করে চেয়ার ছোঁড়াছুঁড়ি, স্লোগান, মারামারি। আমাদের ছেলেদের স্পিরিটটাই ভেঙে দিয়েছে।”

 

সাদিদ ধীরে ধীরে চোখ তুলে আরিফের দিকে তাকাল। তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে। রাগে হিসহিস করে বলল,

—“তাদের কেউ ছাড় পাবে না। মোরশেদ ভুল করেছে। আমার এলাকায় দাঁড়িয়ে আমার ছেলেদের ছুঁয়ে।”

 

একটু থেমে সে আরও বলল,

—“আর স্পিরিট কি এত সস্তা জিনিস নাকি, যে এতটুকুতেই ভেঙে যাবে? রাজনীতির মঞ্চে এরকম অহরহই হয়। কিন্তু তাতে হার মানলে চলবে!”

 

তার কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল আরিফ আর হাসান। 

 

———

 

বেলা তখন মধ্যাহ্ন। হাসপাতাল থেকে সাদিদ ফিরল নিজের বাড়িতে। মাথায় ঘুরছে হাজারো চিন্তা। এক্সট্রা চাবি সবসময় তার কাছে থাকে, তাই কলিং বেল না টিপেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ছোটবেলায় পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকতে হতো বলে এই বাড়িটা তার দাদু তাকে উপহার দিয়েছিলেন। বরাবরের মতোই এটা তার শান্তির নীড়। কিন্তু আজ সেই শান্ত নীড়ে ফিরতেই পেছন থেকে ভেসে এলো এক কঠিন কন্ঠস্বর,

—“কাল বিয়ের আসর থেকে চলে কেন গেলে, সাদিদ?”

 

সাদিদ থমকে দাঁড়াল। এই সময়ে মায়ের এখানে থাকা তার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তবুও স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

—“গতকালের সেমিনারে সমস্যা হয়েছিল।”

 

আয়েশা বেগম কড়া স্বরে বললেন,

—“এই ফালতু কারণের জন্য তুমি নিজের বিয়ের আসর থেকে উঠে চলে এসেছ?”

 

সাদিদ শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— “রাজনীতি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

 

এবার আয়েশা বেগম সত্যিই রাগে ফেটে পড়লেন।

— “তুমি কি ঠিক করেছো রাজনীতি ছাড়বে না? আমি কখনোই তোমার এই রাজনীতি করাকে সাপোর্ট করিনি। আর এখন তো একদমই না! তুমি আমাদের ফ্যামিলি বিজনেসে জয়েন করছো—এটাই ফাইনাল।”

 

সাদিদ বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে শান্ত গলায় বলল,

— “অসম্ভব। রাজনীতি আমার রক্তে মিশে গেছে। আর এবারের নির্বাচনে আমি দাঁড়াচ্ছি।”

 

এই বলে সে নিজের রুমের দিকে এগোতেই পেছন থেকে আবার শোনা গেল তার মায়ের তেজী কণ্ঠ,

— “রাজনীতি… রাজনীতি… রাজনীতি! এই পথে ধ্বংস ছাড়া কিছুই পাবে না তুমি সাদিদ। একদিন এই রাজনীতি তোমাকে নিঃস্ব করে দেবে।”

 

মায়ের কথায় থামল না সে। নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে পেছন ঘুরতেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো এক রমনী। যাকে দেখে সাদিদ চরম বিরক্তি নিয়ে বলল,

— “এই মেয়ে আমার রুমে কি করছো তুমি?”

 

লিলি ভয়ে কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে গেল। শাশুড়ি মা তো তাকে এই রুমেই থাকতে বলেছিলেন। তাহলে সে এখানেই থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। এদিকে লিলি চুপ করে থাকায় সাদিদ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— “বাড়িতে আরও অনেক রুম আছে। যেটাতে ইচ্ছে গিয়ে থাকো। তবে আমার রুমের আশেপাশেও আর আসবে না।”

 

লিলি পিটপিট করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

লোকটা দেখতে মাশাআল্লাহ… কিন্তু ব্যবহার আস্তাগফিরুল্লাহ! মেয়েটাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাদিদ বিরক্ত হয়ে ‘চ্’ শব্দ করল। তারপর হাত ধরে টেনে লিলিকে ঘরের বাইরে বের করে দিল।

 

শাড়িতে পা জড়িয়ে পড়ে যেতে যেতে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল লিলি।

পরক্ষণেই তার মুখের সামনে দরজাটা ধপ করে বন্ধ করে দিল সাদিদ। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। এই লোক তার সাথে এমন আচরণ করছে কেন? একটু পরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

— “খারুস! অসভ্য লোক! অভিশাপ দিলাম জীবনে তোর বিয়ে হবে না। আর যদি হয়ও, তাহলে হবে একটা পেত্নীর সাথে। বাসর রাতেই সে তোর ঘাড় মটকে দেবে!”

 

পরক্ষণেই হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই চমকে উঠল,

— “তওবা তওবা! ওই খারুসটার বউ তো আমিই!”

 

ঠিক তখনই আচমকা খুলে গেল সাদিদের ঘরের দরজা। সেখানে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাদিদ। লিলিও আহাম্মক হয়ে তাকিয়ে রইল তার পানে। সাদিদ দাঁত চেপে বলল,

— “বলা শেষ? এখন আমার রুমের সামনে থেকে দূর হও ইডিয়েট।”

 

শেষের কথাটা চেচিয়ে বলায় লিলি ভয় পেয়ে এক হাতে শাড়ি সামলে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু চুলের ভেজা পানি মেঝেতে পড়ে জায়গাটা পিচ্ছিল হয়ে ছিল। পা ফেলতেই

ধপ করে পড়ে গেল সে।

 

— “ও মাগো! আমার কোমড়টা শেষ!”

 

সাদিদ সবই দেখল। কিন্তু সাহায্য করার বদলে আবারও লিলির মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল। শব্দে কেঁপে উঠল লিলি। সে ভেবেছিল লোকটা হয়তো সাহায্য করবে। কিন্তু না! এই লোকটা সত্যিই একটা বদজাত।

 

এদিকে তার চিৎকার শুনে ছুটে এলো বাহারি।

— “কি হইছে বউমনি? আপনি ফড়ে গেলেন কেমনে?”

 

লোকটা বাঙালি নয়। তবে দীর্ঘদিন বাঙালিদের সঙ্গে থাকতে থাকতে বেশ ভালোই বাংলা রপ্ত করেছে। তার কথা শুনে লিলি কিছুটা লজ্জা পেল। মুখে বলল,

—“ভাড়ী কাকা, আমাকে একটু তুলবেন?”

 

বাহারি হকচকিয়ে বলল,

— “আগ্গে বউমনি, হামার নাম তো বাহারি!”

 

লিলি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

— “সেটাই তো বললাম ভাড়ী কাকা।”

 

বাহারি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তবুও লিলিকে ধরে তুলল। উঠে দাঁড়িয়ে লিলি কোমরে হাত দিয়ে আহাজারি শুরু করল,

— “আহা! আমার এত সুন্দর কোমড়টাই বুঝি ভেঙে গেল রেএএ!”

 

বাহারি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

— “হামি গিয়ে বড়ম্যাডামকে ডেকে লিয়ে আসি। আপনি দাঁড়ান বউমনি।”

 

বাহারি চলে যেতেই লিলি একবার তাকাল সাদিদের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে। মনে মনে ভাবল - লোকটা যদি তাকে মেনেই না নেয়… তাহলে বিয়ে করল কেন?

 

 

Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

part:03

 

 

 

 

উন্মাদের মতো বসার কক্ষের জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ি করছে এক শ্বেতাঙ্গ যুবক। তার উন্মত্ত আচরণ দেখে উপস্থিত কেউই তাকে থামাতে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। একের পর এক জিনিস ছুড়ে মারছে সে, আর বিকট স্বরে চিৎকার করছে।

 

—“মানি না এই বিয়ে! কিছুতেই মানি না! ব্লুবেরি শুধু আমার… শুধুই আমার! আয়ায়ায়ায়া!”

 

বলেই হঠাৎ সোফার সামনে রাখা সেন্টার টেবিলটি দু’হাতে তুলে সজোরে উল্টে দিল সে। ঠিক তার সামনের সোফাতেই নির্বিকার চিত্তে বসে আছেন রায়ান সাহেব। এই ছেলেটির উন্মত্ততা থেকে মেয়েকে বাঁচাতেই তো তিনি এত তাড়াহুড়ো করে লিলির বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটি লিলির খালাতো ভাই। মিসেস পারভীনের বড় বোনের ছেলে। তারা স্বপরিবারে লন্ডনে বসবাস করেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে। সেবার মিসেস পারভীনের বড় বোন পারুল, তার স্বামী ইহসান শেখ এবং তাদের একমাত্র ছেলে ইহরান শেখ স্বপরিবারে বেড়াতে এসেছিলেন বোনের বাড়িতে।

 

তখন লিলি সবে চৌদ্দ বছরে পা দেওয়া এক কিশোরী। আর ইহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক তাগড়া যুবক। সেই সফরেই কিভাবে যেন লিলিকে ভীষণভাবে পছন্দ হয়ে যায় ইহরানের। পছন্দ ধীরে ধীরে এক ধরনের পাগলামো তে পরিণত হয়। একপর্যায়ে ছেলের এই একগুঁয়ে আবদারে অতিষ্ঠ হয়ে মিসেস পারুল বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু রায়ান সাহেব কিছুতেই এত অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হলেন না। তার উপর সেই সুদূর বিদেশে একমাত্র সন্তানকে পাঠানোর ব্যাপারেও তিনি সম্পূর্ণ অনাগ্রহী ছিলেন।

 

কিন্তু তার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি ইহরান। ছোটবেলা থেকেই সে ভীষণ একরোখা স্বভাবের। যা তার পছন্দ, তা সে যে কোনো মূল্যে পেতে চায়। সেদিনও আজকের মতোই উন্মত্ত আচরণ শুরু করেছিল সে। আদরের ছেলের এমন অবস্থা দেখে ইহসান শেখ বহু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রায়ান সাহেবকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। শেষমেশ রায়ান সাহেব বলেন, বিয়ে দেবেন তবে এখন নয়। লিলি বড় হলে। আর সেই সময়ের মধ্যে ইহরান একবারও লিলির সামনে আসতে পারবে না।

 

ইহরান এতে প্রথমে মোটেই রাজি হয়নি। কিন্তু বাবার অনুরোধ ও বোঝানোর কাছে শেষ পর্যন্ত নত স্বীকার করেছিল। যদিও আড়ালে-আবডালে লিলির খোঁজ ঠিকই রাখত সে। এ বিষয়টি অবশ্য রায়ান সাহেবের দৃষ্টিগোচর হয়নি। তবে তিনিও চুপ ছিলেন কারণ তার মনে তখন অন্য এক পরিকল্পনা চলছিল।

 

এদিকে নিজের এলোমেলো চুলগুলো মাথার পেছনে ঠেলে দিয়ে ইহরান হিসহিসিয়ে বলল,

—“আপনি কি ভেবেছেন বিয়ে দিয়ে দিলেই ব্লুবেরির কাছ থেকে আমাকে দূরে রাখতে পারবেন? তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। দশ বাচ্চার মা হয়ে গেলেও ব্লুবেরিকে আমি আমার কাছে নিয়ে আসবই।”

 

রায়ান সাহেব শান্ত কণ্ঠে বললেন,

—“তোমার কি মনে হয় তুমি পদ্মাকে নিয়ে আসতে চাইবে আর তার স্বামী স্বেচ্ছায় তাকে তোমার হাতে তুলে দেবে?”

 

‘তার স্বামী’ এই দুটি শব্দ তীরের মতো গিয়ে বিঁধল ইহরানের বুকে। সে ছাড়া অন্য কেউ তার ব্লুবেরির স্বামী এই চিন্তাটুকুই তার নিঃশ্বাস আটকে দিচ্ছে। হঠাৎই সে নিজের গায়ের কালো শার্টের ওপরের কয়েকটি বোতাম টেনে ছিঁড়ে ফেলল। এক হাতে নিজের চুল শক্ত করে ধরে ঘরের ভেতর পায়চারি করে, অস্ফুট স্বরে কিছু বিড়বিড় করতে লাগল।

 

তার এই ভয়ংকর রূপ দেখে মিসেস পারভীনের গলা শুকিয়ে আসছে। তিনি আগেই আন্দাজ করেছিলেন লিলির বিয়ের খবর শুনলে ইহরান নিশ্চয়ই ছুটে আসবে। হলোও তাই। তার ভাবনার মাঝেই ইহরান হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,

—“পৃথিবীর কেউ ব্লুবেরিকে আমার কাছে নিয়ে আসা থেকে আটকাতে পারবে না! আর যদি কেউ আমাদের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাকে… তাকে আমি নিজের হাতে খু/ন করব!”

 

নিজের কথা শেষ করেই বড় বড় পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। তার প্রস্থানে যেন ঘরে উপস্থিত সবাই একসাথে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাজের লোকেরা দ্রুত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র গুছিয়ে ঘর পরিষ্কার করতে লেগে পড়ল। শুধু মিসেস পারভীন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন ইহরানের চলে যাওয়ার পথে। বোনের ছেলেটিকে তিনি ভীষণ স্নেহ করেন। তার গভীর ইচ্ছে ছিল লিলির সাথেই ইহরানের বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু রায়ান সাহেব যে হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ অন্য কিছু করে বসলেন। বলাবাহুল্য, লিলির এই আকস্মিক বিয়ের খবরটিও মিসেস পারভীন শেষ মুহূর্তে এসে জানতে পেরেছিলেন।

 

স্ত্রীর মুখের অস্বস্তি ও দ্বিধা লক্ষ্য করে রায়ান সাহেব শান্ত স্বরে বললেন,

—“সারা জীবন তুমি আমার সিদ্ধান্তের উপর কখনো আঙুল তোলোনি, পারভীন। সেই ভরসাটা এবারও রেখো। অচিরেই প্রমাণ হবে আমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিইনি।”

 

মিসেস পারভীন নীরব রইলেন। তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না লিলি কীভাবে সাদিদের সাথে সুখী হবে, যেখানে সাদিদ বিয়ের দিনই তাকে ফেলে চলে গেছে?

 

———

 

বাহারি গিয়ে আয়েশা বেগমকে ডেকে আনার পর তিনি লিলিকে সাদিদের ঘরের পাশের রুমটিতে নিয়ে গেলেন। কোমরে ব্যথানাশক স্প্রে করে দিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে, নীরবে সেখান থেকে চলে গেলেন।

 

সন্ধ্যা ছয়টা হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল লিলির। চোখ মেলে দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,

—“ইস! এতটা সময় ঘুমিয়েছি? নামাজটাই তো কাজা হয়ে গেল…”

 

তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসার পর কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। মনে এক অদ্ভুত দ্বিধা কাজ করছে তার। সে বুঝতে পারছে না এখন কি নিচে যাওয়া উচিত? আবার ঘরে বসেই বা করবে কী?

 

একটু ভেবে শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধা আর সংকোচ সরিয়ে রেখে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল সে। দরজা খুলতেই মুখোমুখি হয়ে গেল আয়েশা বেগমের সাথে। তাকে দেখে লিলির কাছে মনে হলো, হালকা রঙের শাড়িতে আত্মবিশ্বাসী এক নারীর দৃঢ় উপস্থিতি যেন পুরো করিডোরটা ভরিয়ে রেখেছে। আয়েশা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন লিলির দিকে। ছেলের রূঢ় ব্যবহার সম্পর্কে তিনি ইতোমধ্যেই অবগত। আর তিনি এটাও বুঝতে পারছেন এখনই কিছু একটা না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই স্বাভাবিক গলায় বললেন,

—“আমার সাথে এসো।”

 

লিলি কিছুই বুঝতে না পেরে চুপচাপ তার পেছনে হাঁটতে লাগল। এই মুহূর্তে লিলি বসে আছে আয়েশা বেগমের রুমে। আয়েশা বেগম তাকে নিজের সামনে বসিয়ে স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—“শোনো মেয়ে, সময় থাকতে থাকতে নিজের স্বামীকে নিজের আঁচলে বাঁধতে শেখো। ও তোমাকে রুম থেকে বের করে দিল, আর তুমি সুরসুর করে বের হয়ে এলে? কেন প্রতিবাদ করতে পারোনি?”

 

শাশুড়ির এমন কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল লিলি। সে কি বলত? একজন লোক যদি তাকে নিজের ঘরে থাকতে না দেয়, তাহলে সেই বা কী করতে পারে? আয়েশা বেগম আবার বললেন,

—“কি হলো? কথা বলো না কেন? শোন, এরকম চুপচাপ স্বভাবে থাকা যাবে না। তোমাকে তোমার নিজের অধিকার বুঝে নিতে হবে। আর এসব কি পরেছো? কাল থেকে শাড়ি পরে সেজেগুজে থাকবে সব সময়।”

 

শাশুড়ির কথায় লিলি নিজের দিকে তাকাল। সে একটি হালকা গোলাপি রঙের থ্রি-পিস পরে আছে। তবে সমস্যা হলো সে শাড়ি পরতেই জানে না। তাই একটু সাহস সঞ্চয় করে আস্তে বলল,

—“কিন্তু… আমি তো শাড়ি পরতে পারি না।”

 

লিলির কথায় মিসেস আয়েশা বেগম ভীষণ বিরক্ত হলেন। আজকালকার মেয়েরা কেন শাড়ি পরতে পারে না আল্লাহই জানেন। আবার লিলির দিকে ভালো করে তাকালেন তিনি। মেয়েটা নিতান্তই এখনও বাচ্চা। তার মুখ দেখে কেউ বলবে না যে তার বয়স উনিশ। মুখটায় এক ধরনের সরল মায়া লেগে আছে। আয়েশা বেগমের ভীষণ ইচ্ছে ছিল একটা মেয়ে সন্তানের। কিন্তু সেই ইচ্ছে কখনোই পূরণ হয়নি। এই মেয়েটার ছোট্ট, মায়াময় মুখটা তার অদ্ভুত রকম ভালো লাগে। তবে তিনি এটাও বুঝতে পারছেন লিলি তাকে বেশ ভয় পায়। তাই কণ্ঠটা একটু নরম করে বললেন,

—“ঠিক আছে, আমি শিখিয়ে দেব। আর কাল সকালে তৈরি থেকো। তোমাকে ভার্সিটিতে ভর্তি করতে নিয়ে যাব। তোমার সব ডকুমেন্ট সাথে এনেছো তো?”

 

আয়েশা বেগমের কথা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে গেল লিলি। সে তো ভেবেছিল বিয়ের মাধ্যমে তার পড়াশোনার ইতি ঘটেছে। বিয়ের পরেও যে তাকে পড়তে দেওয়া হবে। এটা সে কখনো কল্পনাও করেনি। তাই একটু ইতস্তত করে মিনমিন করে বলল,

—“কিন্তু… আমি তো আর কোনো পরীক্ষার ফর্ম তুলিনি।”

 

তা শুনে আয়েশা বেগম বললেন,

—“আর পরিক্ষা দিতে হবে না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করে দেব তোমাকে।”

 

এই কথা শুনে নিজের বাবার প্রতি আরও বেশি অভিমান জন্মালো লিলির মনে। এই কথাটুকুই তো সে তার বাবার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিল। কই তিনি তো তা বলেননি! এমন তো নয় যে তারা অসচ্ছল পরিবার। তাহলে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়ার মতো তুচ্ছ একটি কারণে তার বিয়ে কেন দিয়ে দেওয়া হলো?

 

———

 

সন্ধ্যার পর থেকে লিলি শাশুড়ির পিছে পিছে ঘুরছে। আয়েশা বেগম ছেলের জন্য রান্না করছেন। লিলি বারবার সাহায্য করতে চাইলে তিনি ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন। তবুও মুখ গোমড়া করে মেয়েটা তার পিছু পিছু ঘুরছে। বিষয়টা আয়েশা বেগমের কাছে বেশ লাগছে। এই সময় একদম রেডি হয়ে নিচে নামল সাদিদ। রান্নাঘর থেকে লক্ষ্য করে আয়েশা বেগম বললেন,

—“কোথায় যাচ্ছো এই অসময়ে?”

 

সাদিদ পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে তাকাল মায়ের দিকে। ঠিক তখনই চোখ পড়ল আয়েশা বেগমের পেছনে লুকিয়ে থাকা লিলির উপর। মেয়েটার উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফিট এক, আর আয়েশা বেগম নিজে পাঁচ ফিট পাঁচ। তাই তো অনায়াসে তার পেছনে লুকে থাকতে পারছে।

লিলি উকি দিয়ে সাদিদকে দেখার চেষ্টা করল। দেখতে পেল সে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আবারও আয়েশা বেগমের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। লিলি মূলত ভয় পাচ্ছে সাদিদ যদি তখনকার ঘটনা শাশুড়ি আম্মু কে বলে দেয়। তবে এমন কিছুই হলো না। সাদিদ বলল,

—“একটু কাজ আছে তাই যেতে হবে।”

 

আয়েশা বেগম তো চেনেন নিজের ছেলে কে তাই আর মানা করলেন না উল্টো গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—“ডিনার করে যাও।”

 

—“বাহির থেকে করে নেব।”

 

তারপর চলে গেল সাদিদ। আয়েশা বেগম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, তারপর নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন। লিলি এখনও সাদিদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা কে তার বেশ লেগেছে। তবে তার ব্যাবহার ভালো না। খারুস একটা। হঠাৎ মনে পড়ল তার লাগেজের কথা। সেটা তো সাদিদের রুমেই আছে। এই তো সুযোগ ওটা নিয়ে আসার। তাই আয়েশা বেগম কে বলল,

—“শাশুড়ি আম্মু, আমার লাগেজ তো ওনার রুমে। ওটা নিয়ে আসি।”

 

আয়েশা বেগম কিছু ভেবে বললেন,

—“যাও।”

 

অনুমতি পেয়ে লিলি ছুটে লাগল, যেন এখন না গেলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে। আয়েশা বেগম লিলির পেছনে তাকিয়ে আনমনে বললেন,

—“লাগেজের সঙ্গে তোমাকেও সাদিদের মনে আর ঘরে জায়গা করে নিতে হবে। তবেই ছেলেটার ছন্নছাড়া জীবনটা হয়তো একটু গতি পাবে।”

 

 

বানানের ভুল ত্রুটি হলে জানাবেন।  

Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

Part:04

 

 

 

দূর থেকে পাখিদের কলরব ভেসে আসছে। ধরনীর বুকে আবারও এক নতুন দিনের সূচনা হয়েছে। সকালের মৃদু আলো ধীরে ধীরে চারপাশকে আলোকিত করে তুলছে।আজ লিলি ঘুম থেকে বেশ তাড়াতাড়িই উঠে পড়েছে। ঘুম জড়ানো চোখে একটু সময় বসে থেকে আড়মোড়া ভেঙে নিল। তারপর আলমারি খুলে একটা সালোয়ার-কামিজ বের করল। শাশুড়ি আম্মু অবশ্য তাকে শাড়ি পরতে বলেছিলেন, কিন্তু শাড়ি পরে কি আর ভার্সিটিতে যাওয়া যায়! হাঁটতে গিয়েই যদি হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়! তখন কি একটা অবস্থা হবে ভাবতেই নিজের মুখ কুঁচকে ফেলল লিলি। শেষ পর্যন্ত সালোয়ার-কামিজই পরে নিল। তৈরি হয়ে আয়েশা বেগমের কক্ষের সামনে এসে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে দরজায় নক করল।

 

—“শাশুড়ি আম্মু?”

 

ভেতর থেকে গম্ভীর স্বর ভেসে এলো।

—“ভেতরে এসো।”

 

লিলি ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।আয়েশা বেগম ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে বিছানার পাশে বসে আছেন। তাঁর পরিপাটি সাজ আর গম্ভীর মুখাবয়ব সব সময়ের মতোই কঠোর ও স্থির। তিনি একবার লিলির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—“রেডি হয়ে গেছ?”

 

লিলি মাথা নিচু করে উত্তর দিল,

—“জি।”

 

কিছুক্ষণ নীরবতা রইল ঘরের ভেতর। তারপর আয়েশা বেগম দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

—“ঠিক আছে। আজকের জন্য এই পোশাকই চলবে। তবে কাল থেকে আমি তোমাকে শাড়ি পরা শিখিয়ে দেব। বাড়িতে থাকলে শাড়িই পরবে।”

 

লিলি নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। আয়েশা বেগম আবার বললেন,

—“তোমার সব ডকুমেন্ট নিয়েছ?”

 

লিলি নিজের ছোট্ট ব্যাগটা একটু তুলে ধরে বলল,

—“জি, সব গুছিয়ে নিয়েছি।”

 

—“হুম। চলো তাহলে।”

 

আয়েশা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। লিলি তাঁর পিছু পিছু বেরিয়ে এলো। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অজান্তেই তার চোখ চলে গেল সাদিদের ঘরের দরজার দিকে। দরজাটা বন্ধ। খারুসটা কি এখনও ঘুমাচ্ছে? নাকি অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে? অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো—যদি আরেকবার তার সাথে দেখা হয়ে যেত! কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল সাদিদের গতকালের সেই কঠিন কথাগুলো। মুহূর্তেই নিজের ভাবনাটাকে ঝেড়ে ফেলল সে। গাড়িতে উঠে বসার পর আয়েশা বেগম বললেন,

—“শোনো, সংসার করার পাশাপাশি পড়াশোনাটাও ঠিকঠাক করতে হবে। সাদিদ কিন্তু পড়াশোনায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ছিল। বুঝতে পেরেছ?”

 

লিলি বিস্মিত চোখে তাকাল।

—“উনি এত ট্যালেন্টেড! সেই জন্যই তো সবসময় এমন গোমড়া মুখ করে থাকেন।”

 

আয়েশা বেগমের ঠোঁটে তখন খুব সূক্ষ্ম একটুখানি হাসি ফুটে উঠল যা লিলি এর আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু এখানে হাসার কী আছে? কিছুক্ষণ পর জানালার বাইরে তাকাল লিলি। ঢাকার সকালের ব্যস্ত রাস্তাগুলো অবিরাম ছুটে চলেছে ঠিক তার নিজের জীবনের মতোই।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পৌঁছাতেই উত্তেজনায় লিলির বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। আয়েশা বেগম তাকে নিয়ে গেলেন অফিস রুমে। সেখানে একজন মধ্যবয়সী অধ্যাপক তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাদের দেখে তিনি হাসিমুখে বললেন,

—“মিসেস আয়েশা! আসুন, আসুন। আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। এই তাহলে আপনার বউমা?”

 

আয়েশা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,

—“হ্যাঁ, এ হলো লিলি। ফাইজা মুনতাহা লিলি।”

 

এরপর কিছুক্ষণ কথাবার্তা আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষে লিলির ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। সবশেষে দুজন ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। গাড়ি যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পেরিয়ে কিছুটা দূরে এগিয়ে গেছে, তখন হঠাৎ লিলির চোখ পড়ল রাস্তার অপর পাশে একটি বড় বিল্ডিংয়ের সামনে টাঙানো সাইনবোর্ডে।

‘ইয়ুথ ফর চেঞ্জ : ন্যায় ও উন্নয়নের পথে।’

 

লিলির দৃষ্টি অজান্তেই স্থির হয়ে গেল লেখাটার ওপর। ঠিক তখনই বিল্ডিংয়ের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামল। সেখান থেকে নেমে এল একজন মানুষ—লম্বা দেহ, চোখে কালো সানগ্লাস, মুখে মাস্ক। কেন যেন লিলির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। লোকটাকে অনেকটা মিস্টার খারুসের মতো লাগছে… কিন্তু দূর থেকে ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না।

 

সে ধীরে আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“শাশুড়ি আম্মু, ওটা কীসের অফিস?”

 

আয়েশা বেগম একবার ব্যানারের দিকে তাকালেন। তারপর দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন,

—“ওটা রাজনীতির অফিস। এসব নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই।”

 

লিলি আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল জন্ম নিল। সে আবার জানালার বাইরে তাকাল। লম্বা মানুষটা ততক্ষণে অফিসের ভেতরে ঢুকে গেছে।

 

———

 

 

পার্টি অফিসে~~

 

আজ কিছুটা দেরিতেই পার্টি অফিসে ঢুকল সাদিদ। সাধারণত সময়ের ব্যাপারে সে খুবই পাংচুয়াল। কিন্তু আজ অজান্তেই কিছু সময় নষ্ট হয়ে গেছে। অফিসে ঢুকতেই দেখল রাশেদ কিছু কাগজপত্র গোছাচ্ছে। হাসানের অনুপস্থিতিতে এই দায়িত্ব এখন তার ওপরই এসে পড়েছে। তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ক্লান্ত আরিফ। তাকে দেখে সাদিদ জিজ্ঞেস করল,

—“হাসান কেমন আছে?”

 

আরিফ ঢুলতে ঢুলতে এসে সোফার ওপর সটান শুয়ে পড়ল। তার শরীর যেন আর চলছেই না। সারারাত হাসপাতালেই কাটিয়েছে সে। যদিও সাদিদও তার সঙ্গেই ছিল।

 

—“ভালোই আছে। কয়েকদিনের মধ্যে ডিসচার্জ হয়ে যাবে। এসব বাদ দে… বল, ভাবির সাথে দেখা করাবি কবে? সেমিনারের জন্য তো তোর বিয়েতেই খেতে পারলাম না।”

 

এক মুহূর্তেই সাদিদের মুখভঙ্গি গম্ভীর হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—“এইসব ফালতু আবদার আমার সামনে আর করবি না।”

 

আরিফ নাটকীয়ভাবে উঠে বসে বুকের ওপর হাত রেখে বলল,

—“আমার ভাবী! আমার বন্ধুর বউ! তার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়া ফালতু আবদার? তুই কি লজ্জা পাচ্ছিস, নাকি ভাবীকে লুকিয়ে রাখতে চাস?”

 

একটু থেমে হেসে আবার বলল,

—“লুকিয়ে রেখে লাভ নেই। আমি সেই মহীয়সী নারীকে দেখতে চাই, যে তোর মতো পাষাণ পুরুষকে বিয়ে করে নিজের জীবন ধ্বংস করেছে।”

 

সাদিদ বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আরিফ, আমার অনেক কাজ আছে। কাজের কথা থাকলে বল, না হলে ফোট।”

 

—“আরে, সব সময় কাজ কাজ করলে তোর বউ ভাববে তুই নিরামিষ তখন—”

 

কথা শেষ হওয়ার আগেই সাদিদ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। দৃশ্যটা দেখেই আরিফ এক লাফে দরজার কাছে গিয়ে বলল,

—“কুল কুল সাদি মামা কুল! এত হাইপার হোস না। যাচ্ছি তো আমি! আর আসব না! একেবারে ভাবির চাঁদমুখ দর্শন করতেই তোর বাড়িতে পদার্পণ করিব! ইয়ে মেরা বাচন হ্যায় ওর মেরা বাচন হি হে শাসসসসসস…

 

এরপর আর বাকিটা বলা হলো না। কারণ সাদিদকে এগিয়ে আসতে দেখেই সে দৌড় লাগিয়েছে। সাদিদ চোখ বন্ধ করে কপালে হাত রেখে ধীরে ধীরে নিজের মাথা ম্যাসাজ করে রাগটা সংযত করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ তার বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল এক দৃশ্য,

আয়েশা বেগমের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে তাকে দেখছে লিলি। ফট করে চোখ খুলল সাদিদ। কি এক মুসিবত এই মেয়ে কেন তার মাথায় ঘুরছে?

 

প্রথমে মেয়েটাকে সে একেবারেই সাধাসিধে ভেবেছিল। কিন্তু গতকালের অভিশাপের ঘটনার পর বুঝেছে এই মেয়ে আরিফের চেয়েও বড় বিচ্ছু।

 

এদিকে আরিফ বাহিরে গিয়ে হেসে উঠল। অবশেষে সাদিদ কে মুভ অন করানোর একটা উপায় পাওয়া গেছে। না খুব তাড়াতাড়ি মেয়েটার সাথে দেখা করতে হবে আরিফ কে। তাকে কিছু টিপস দিতে হবে যাতে সেই গোমড়ামুখোকে বাগে আনতে পারে।

 

———

 

বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই স্বামীর তিলে তিলে গড়া সুন্দর ফুলের বাগানের যত্ন নিচ্ছে তার প্রাণপ্রিয়া স্ত্রী। মনে মনে এই হেডলাইনটা ভেবেই একগাল হাসল লিলি। তার পাশেই ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাহারি। সাদিদ নিজের বাগানে অন্য কারও উপস্থিতি একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এমনকি বাহারিকেও ঢুকতে দেয় না। নিজেই সব গাছের যত্ন নেয়।

 

—“হ্যালো ভারি কাকা… হ্যালো… শুনতে পাচ্ছেন?”

 

অন্যমনস্ক বাহারির মুখের সামনে হাত নারিয়ে কথাগুলো বলছে লিলি। সে বুঝতে পারছে না ভারি কাকা নস্ট ফোনের মতো হ্যাং হয়ে আছে কেন? লিলির এহেন আচরণে নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো বাহারি। তড়িঘড়ি করে বলল,

—“কি হইছে বউমনি?”

 

লিলি হাঁফ ছেড়ে বলল,

—“যাক, অবশেষে আপনি ফিরে এসেছেন। আমি তো কতক্ষণ ধরে বলছি পানির লাইনটা দিন!”

 

বাহারি দ্বিধাভরে বলল,

—“বলছি কি বউমনি… বাগানে ফানি লা দিলেই কি লয়?”

 

লিলি আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,

—“কেন হবে না? আমি শাশুড়ি আম্মুকে বলেই এসেছি। তাই ওই খারুসকে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সে আমাদের একটা চুলও বাকা করতে পারবে না।”

 

পেছন থেকে হঠাৎ একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,

—“ওহ আই সি।”

 

—“ইয়াপ… এইটা তো খারুসটার কণ্ঠ… কিন্তু সেএএ—”

 

কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছনে তাকিয়ে দেখল সাদিদ দাঁড়িয়ে আছে। বাহারি ততক্ষণে লিলিকে একা রেখে চুপিসারে পালিয়েছে।অগত্যা লিলি মুখে জোরপূর্বক হাসি ঝুলিয়ে বলল,

—“হে হে… আসলে ইয়ে মানে হয়েছে কি…”

 

রাগে সাদিদের চোখ লাল হয়ে গেছে। নিজের ব্যাক্তিগত জিনিসে কারও হস্তক্ষেপ সে পছন্দ করে না। আর এই বাগানে তো একেবারেই না।

—“তুমি এখানে কি করছো, স্টুপিড?”

 

তার গম্ভীর কণ্ঠে কেঁপে উঠল লিলি। আমতা আমতা করে বলল,

—“অই… আপনার বাগানে ইয়া বড় বড় পোকা এসেছিল। তাই শাশুড়ি আম্মু সেগুলো তাড়ানোর গুরুদায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন।”

 

—“What?”

 

লিলি ঢোক গিলে বলল,

—“হোয়াট ফোয়াট নয়। সত্যি কথা।”

 

সাদিদ অনেক কষ্টে নিজের রাগ সংযত করে বলল,

—“জাস্ট গেট লস্ট। আর যেন তোমাকে আমার জিনিসের আশেপাশে না দেখি।”

 

কথাটা ভীষণ গায়ে লাগল লিলির। তাই সাদিদের সামনেই সে এক সাংঘাতিক কাজ করে বসল। হলুদ গোলাপের গাছ থেকে ফটাফট তিন-চারটা গোলাপ ছিঁড়ে নিয়ে বলল,

—“একশো একবার আসব!”

 

সাদিদ লিলির কথা শোনেনি। তার দৃষ্টি আটকে আছে লিলির হাতে ধরা ছেঁড়া গোলাপগুলোর দিকে। হঠাৎ ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে লিলির গাল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,

—“বিয়ে করেছি মানে এই নয় যে তোমাকে বউয়ের মর্যাদা দিয়েছি। তাই বেশি অধিকার দেখাতে এসো না জানে মেরে ফেলব।”

 

গালের ব্যথায় লিলি সাদিদের বুকে কিল ঘুষি মারতে লাগল। অবশেষে সাদিদ তাকে ছেড়ে দিল। ছলছল চোখে লিলি বলল,

—“আমি শাশুড়ি আম্মুকে বলে দেব আপনি আমাকে মেরেছেন! অসভ্য লোক!”

 

কথা শেষ করেই দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। তার গালটা এখনও ব্যাথায় টনটন করছে। হাত থেকে গোলাপগুলো অনেক আগেই পড়ে গেছে। সাদিদ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে সেই গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্তিতে নিজের স্পাইক করা চুলে হাত চালিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। আজ কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছিল বলেই বাড়ি এসেছিল। কিন্তু এখন আর ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। সবকিছুই কেমন অসহ্য লাগছে। কেন সবসময় এমনটা তার সাথেই হয়? সে তো এসব কিছুই চায়নি…

 

  

 

 

Loading spinner

Reply
Page 1 / 2
Share:

Loading spinner