পর্ব — ৬
— আমি প্রেগন্যান্ট!
হঠাৎ আগমন হওয়া লোকগুলোর সঙ্গে জোরাজোরিতে ব্যস্ততার মাঝেই নীরবকে উদেশ্য করে কথাটা বললো নীতি। শীতের সুনসান নীরবতা পূর্ণ রাতে নীতির চিকন গলায় চেঁচানো বড্ড কানে বাঁধলো নীরবের। বক্র চোখে চাইলো। ঠোঁটের কোনে বুঝি ব্যঙ্গাত্মক হাসির রেখাও ফুটলো। যেন এহেন কৌতুকপূর্ন বাক্য ইহজীবনে নীরব কোনোদিন শোনেনি।
লোকগুলোর ওকে নিয়ে টানা-হেঁচড়ায় চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ পড়লো নীতির। ফর্সা চেহারাটা কেমন ফ্যাকাসে লাগছে। সে যে ভীষণ আতংকিত বুঝতে বাকি রইলো না কারো। তাই ভীত-সন্ত্রস্ত নীতিপ্রিয়া এবারে লোক গুলোকে উদেশ্য যথাসম্ভব করুণ করে বললো,
— দেখুন ভাই? আমি অন্তঃসত্ত্বা। এইযে সামনে যেই লোক বসে আছেন ইনিই আমার বাচ্চার বাবা। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার ফায়দা লুটেছে। আর বাচ্চা পেটে আসতেই এখন পালিয়ে যাচ্ছে। আমাকে সাহায্য করুন ভাই। এই লোককে ধরে উচিত শিক্ষা দিন। যেন দ্বিতীয়বার আর কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাঁকানোর সাহস না পায়। বাবা ডাক শোনার মেশিন নষ্ট করে দিন।কবি বলেছেন পুরুষের সবচেয়ে বড় শত্রু তার নিজের মেশিন। আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে তার মেশিন নষ্ট করে দিই? আপনাদের দেখে আমি ভেতর থেকে ফিল পাচ্ছি ভাই। আপনারা আমার সঙ্গে এত বড় অনর্থ হবার থেকে বাঁচিয়ে নিবেন। এক অসহায় বোনের আর্তনাদ শুনুন। জীবনে তো কম পাপ করেননি ভাই। আজ, এই অবলা বোনের জন্য লড়াই করে দেখিয়ে দিন মানবতা বেঁচে আছে। আপনাদের সমাজ যতটা খারাপ চোখে দেখে, আপনারা ঠিক তা নন। আজ থেকে আপনারা আমার বড় ভাই৷ বোনের রক্ষা করুন৷
নীতির চিতকার-চেঁচামেচিতে লোকগুলো ছেড়ে দেয় ওকে। সন্দিহান হয়ে বললো,
— এই লোক আপনার সঙ্গে খারাপ কিছু কোরছে? সত্য কইতাছেন?
এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না থেকে চটাস করে উত্তর দেয় নীতি,
— জ্বি ভাই। আমাকে বাঁচান। এই লোকের সন্তান আমার গর্ভে। এখন ফেলে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।আমার সঙ্গে ন্যায় করুন ভাই। আমি হাত জোড় করছি।
সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে থাকা নীরব এবার ভাঙলো নিজের নীরবতা। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটের সঙ্গে চেপে ধরে বললো,
— লাইটার আছে?
— এখানে আমি বিপদের সঙ্গে কাবাডি খেলছি আর আপনার লাইটার চায়? হ্যাঁ? লাইটার চায় আপনার? একটু সাহায্য করুন নীরব সাহেব। পায়ে ধরছি আপনার।
চট করে নীরবের পা টা এগিয়ে দিয়ে বললো,
— ধরুন।
— ধরুন মানে? আমি পা ধরতে চাইলেই আপনি পা এগিয়ে দেবেন? মনুষ্যত্ব নেই? শেষমেশ একজন অন্তঃস্বত্তা নারীকে দিয়ে পা ধরাবেন?
— আপনিই তো ধরতে চাইছেন!
— আমি তো আপনার কাছে সাহায্যও চাইছি। সেটা করছেন না কেন? নেহাৎ বিপদে পড়ে সাহায্য চাওয়া একজন সুন্দরী মেয়েকে সাহায্য করবেন! সেসবের বালাই নেই। পা এগিয়ে দিচ্ছেন। আপনি মানুষ?
নীতিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে নীরব ফের ওদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করলো,
— লাইটার নেই? একটু আগেই তো সিগারেট খেলি ওদিকটায় বসে সবকটা মিলে।
চমকে উঠে লোকগুলো। কারণ ওরা অনেক ক্ষণ যাবতই অনুসরণ করছিল ওদের। কথোপকথন শোনার চেষ্টা করছিল। এমনকি নীরবকে পেছন থেকে মাথায় আঘাত করার কথাও ভেবে নিয়েছিল৷ সেকথা এই লোক জানলো কিভাবে? গায়ে আবার আর্মির পোশাক? লোকটা যদি সত্যিই আর্মি হয়! তবে ওরা ফেসে যাবে নির্ঘাত। আর যাই হোক এমন হাট্টাগোট্টা আর্মির সঙ্গে ওদের মতো হাড় জিরজিরে শরীরে লড়াই করা সক্ষমতা নেই। মুখ শুকিয়ে গেলো লোকগুলোর। তড়িঘড়ি করে চাদরের নীচ থেকে লাইটার বের করে দিয়ে দেয়।
লাইটারটা একপ্রকার কেড়ে নিয়ে সিগারেট ধরালো নীরব। ফিল্টারটা ঠোঁটে চেপে কয়েকটা টান দিয়ে নীতিতে উদেশ্য করে বললো,
— প্রমাণ দিন।
নীরবের ভাবলেশহীনতা দেখে গায়ে জ্বালা ধরে গেলো নীতি। এর মধ্যে আবার বলে প্রমাণ দিন। কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
— প্রমাণ? কিসের প্রমাণ?
— আপনি প্রেগন্যান্ট তার প্রমাণ দিন।
— এইযে হিরো? নিজেকে কি মনে করছেন আপনি? ক্রিস হেমসওয়ার্থ? এমন একটা ভাব নিয়ে প্রমান দিন বলছেন যেন এখানে হলিউড মুভির শুটিং চলছে। আপনার সিরিয়াস ডায়লগের উপর সিনেমার ক্লাইম্যাক্স নির্ভর করেছে। কান খুলে শুনে রাখুন প্রেগ্ন্যাসির কোনো প্রমাণ হয়না, বুঝেছেন? আমাকে হেল্প করুন। তাহলে নয় মাস পর মিষ্টি খাইয়ে প্রমাণ দেবো।
হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে বিশদ পড়াশোনা করা নীরব খুব সহজেই বুঝে ফেলেছে এই লাউডস্পিকারটা লোকগুলোকে কনভিন্স করে ফেলেছে। এরা ওকে আক্রমণ করে বসবে যেকোনো সময়। তাই সে-ও এবারে লোকগুলোকে উদেশ্যে করে বললো,
— এই মেয়ে কিন্তু ডেঞ্জারাস। প্রতারক চক্র। আমাকে ফাঁসিয়ে সব হাতিয়ে নিয়েছে। এর কথায় ফাঁসলে সব কিছু হারাতে হবে।
— এই লোক বাটপার। আমি নই। আমার বাচ্চা এই লোকের পেটে... না মানে এই লোকের বাচ্চা আমার পেটে। কিছু করুন ভাই। বোনের সংসার বাঁচান। আমি অবলা, অসহায়! দুনিয়ায় কেউ নেই।
কাঁদো কাঁদো গলায় বললো নীতি। লোকগুলো এবারে তেড়ে গেলো নীরবের দিকে। চেপে ধরতে গেলো জ্যাকেটের কলার.. তবে যা হবার তাই-ই হলো!
— শালা আমার বইনের দিকে হাত বাড়াস!
নীতি ভেবেছিল এক্ষুনি নীরবকে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখবে কিন্তু ঘটনা হলো ভিন্ন৷ বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে স্পেশাল ট্রেনিংপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান চারজনকে ধরাশায়ী করেছে একা হাতে, মাত্র কয়েক মিনিটে। তার ক্ষিপ্রতা সাংঘাতিক। লেফটেন্যান্ট ব্যতীত নীরবের আরও একটা পরিচয় আছে। সুতরাং এমন দু-চারটা ছিচকে চোর সামলানো ওর কাছে কঠিন কোনো ব্যপার নয়। একটা আঁচড় অব্দি গায়ে লাগেনি ওর। অথচ ব্যথায় লোকগুলো নিচে শুয়ে কোঁকাতে থাকে আহত জায়গাগুলো চেপে ধরে। পুনরায় বেঞ্চিতে বসে সিগারেট ধরালো। কয়েকটা টান দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে লোকগুলোকে বললো,
— এক সেকেন্ডে এখান থেকে বিদায় হ। নয়তো.. বাকিটুকু অবশ্য শেষ করার প্রয়োজন হয়নি। তার আগেই গায়েব হয়েছে লোকগুলো।
লোকগুলোকে দৌড়াতে দেখে তারস্বরে চেঁচালো নীতি,
— এবার যদি সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ফিরে আসিস তবে পা কেটে হাতে ধরিয়ে দেবো কিন্তু।আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ জিততে পারেনি। তোরাও পারবি না। এবার ফিরে এলো কিন্তু আর জীবনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবি না। যাহ পালা জলদি এখান থেকে।
— ওরা তল্লাট ছেড়ে পালিয়েছে। আপনি বৃথা চেঁচামেচি করছেন মিস নীতি।
— জী আমার আই সাইট অত্যন্ত সুক্ষ্ম। আমি দেখতে পাই। আপনাকে বলে দেয়া লাগবে না।ঠেস দেয়া গলায় বললো নীতি।
— বাই দ্যা ওয়ে কংগ্রাচুলেশনস।
— ফর হোয়াট?
— আপনি প্রেগন্যান্ট।
কথাটা শোনা মাত্র লাজুক হাসলো নীতি। গলায় ঝোলানো স্কার্ফের কোনা আঙুলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বললো,
— ধন্যবাদ নীরব সাহেব। আসলে এতক্ষণ আপনাকে এটাই বলতে চেয়েছিলাম। বোঝেনই তো সংকোচবোধ হচ্ছিল৷ আমি আবার ভীষণ লাজুক। অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলতে পারিনা। ইন্ট্রোভার্ট টাইপ। আপনি নিশ্চয় এখন ভাবছেন আমার মতো ইন্ট্রোভার্ট টাইপের মেয়ে জার্নালিস্ট হলে দেশটা রসাতলে যাবে?আমারও তাইই মনে হয়। তাই আপনার কাছে আমার সিক্রেট শেয়ার করে ফেললাম।
নীতির কথায় রহস্যময় হাসলো নীরব৷ সামনের দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
— আপনি প্রেগন্যান্ট সেইজন্য পাল্লাচ্ছেন মিস নীতি?
আনন্দে দুইচারটা লাফ-ঝাপ দিয়ে ফেললো নীতি।প্রফুল্লচিত্তে বললো,
— অফকোর্স। আপনার আই-কিউ সন্ধ্যে থেকে আমার সঙ্গে থেকে দেখেছেন কতটা বেড়ে গিয়েছে? আমার বয়ফ্রেন্ড আছে বুঝলেন? ফ্রান্সে থাকে এক বছর যাবত। ছয় মাস আগে একবার এসেছিল। আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কিছু-মিছু হলো। তারপর বোঝেনই তো। এসব নিয়ে তো আর খোলামেলা কথা বলা যাইনা। চলুন? ওদিকটাই একজন চাচা আছেন? পিঠে বিক্রি করছেন সম্ভবত। রাত-বিরেতে আমার আবার ক্রেভিংস হয়। এখন পিঠের ক্রভিংস হচ্ছে। টাকা নিয়ে টেনশন করবেন না। আমার পার্স ব্যাগ আছে। আচ্ছা আপনি ট্রেন থেকে যখন ঝাঁপালেন তখন আমার ব্যাগটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন৷ আপনি পঞ্চগড় কেন যাচ্ছেন? ওদিক দিয়ে হিমালয় চলে যাবেন নাকি? ধ্যানে বসবেন? কত বছরের তপস্যা করবেন? আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আজকাল কত মানুষ তপস্যা করছে আগেকার মুনিষীদের মতো। আচ্ছা উনারা না খেয়ে থাকতো কিভাবে? আর কথা বলতোও না। উনারাদের মনে হয় আপনার মতো মেন্টাল প্রব্লেম ছিলো৷
মেন্টাল প্রব্লেমের কথা শুনে খুক খুক করে কাশলো নীরব।
— কাশছেন কেন? এখন চা কোথায় পাই আপনার জন্য নীরব সাহেব?
— আমাদের ট্রেন ধরতে হবে মিস নীতি। আমরা পিকনিকে যাচ্ছিনা।
— কিন্তু আমার তো পিকনিকের ফিল হচ্ছে। জানেন? ফাইনালি আমি থলথলে ভুড়িওয়ালা সরকারি চাকরিজীবীর হাত থেকে রক্ষা পেলাম। বান্দা সুন্দরী দেখে বিয়ে করতে এসে দেখবে বউ গায়েব। সুন্দরী বউ তপস্যা ছাড়া পাওয়া যাবেনা। আর তুই ব্যাটা অমন ভুড়ি নিয়ে সুন্দরী বউয়ের স্বপ্ন দেখিস। আচ্ছা নীরব সাহেব? আপনার ফেভারিট হিরো কে? আরেহ বলেই ফেলুন। এত কথা জমিয়ে রেখে কি লাভ? আমি তো আর পাড়ার আন্টি নই যে আপনাকে জাজ করবো। এখনও জব ও করছি না যে পত্রিকায় আপনার খবর ছাপিয়ে দেবো। বরং আপনার সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হবেনা। নিজের যত সিক্রেট আছে শেয়ার করে ফেলুন। আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে? লজ্জা পাবেন না। দেখুন আমি আপনাকে বিয়ের আগে প্রেগন্যান্ট হয়ে গিয়েছি সেটাও শেয়ার করলাম আর আপনি আপনার গার্লফ্রেন্ডের নাম শেয়ার করতে ভয় পাচ্ছেন? আজ বলেই ফেলুন। নাকি গার্লফ্রেন্ড নেই? অবশ্য যদি শুনি নেই তবে আমি আশ্চর্য হবো না। কেন বলুন তো? আপনার যেই কোসঠ্যকাঠিন্যে মার্কা চেহারা, টাফ লুকের এটিটিউড এসবে মেয়েরা আজকাল দাম দেয়না। আমি মেয়ে তো। আমার চেয়ে ভালো আর কে জানবে? আমার একটা কাজিন আছে? ওর নাম সমুদ্র। ও পুরো আমার জন্য পাগল। আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেনা। একা পেলেই চুমু দিতে থাকে।কখনো ঠোঁটে, কখনো গলায়.. আমিও কন্ট্রোললেস হয়ে যাই। ওকেও চুমু দিয়ে ফেলি।
একাধারে বাজতে থাকা লাউডস্পিকারের শব্দে তপ্ত শ্বাস ফেললো নীরব। বলল,
— মিস নীতি? আপনার চিকিৎসা প্রয়োজন। প্লিজ কনসালট্যান্টের চিকিৎসাসেবা নিন। ইউ আর নট নরমাল। আর একটা কথা যদি আপনার মুখ থেকে বেরোয় তবে আমি নিজ দায়িত্বে আপনাকে বাসায় পৌছে দিয়ে আসবো। তখন ভেবে দেখুন আপনার বিয়ে হয়ে যাবে।
কপালের কাছে আঙুল ঘষে কথাগুলো বলে জোরে হাঁটা করে নীরব। ওদিকে নীতি! সে তো পড়লো ফ্যাসাদে। ধারালো গলায় বললো,
— ওহ এখন আমি বেশি কথা বলি? কোনো প্রয়োজন নেই তোর মতো বদমায়েশের হেল্প নেয়ার আমার। আমি নিজেই চলে যেতে পারবো। আমার চিকিৎসা প্রয়োজন? আমি পাগল। আর তুই কি? কোষ্ঠকাঠিন্যর রোগী। শত বছরের মল জমে আছে তোর পেটে। যার কারণে সবসময় চাপে থাকিস। আমার ভোকাল কর্ড দিয়ে আমি আপনার পারমিশন নিয়ে কথা বলবো? জীবনেও না৷ একটু সাহায্য করে এখন ভাব নিচ্ছে।শালা ফেইক জ্যাকেট পরা আর্মি। এই আমি গেলাম। সি ইউ নেভার নীরব সাফওয়ান। তুই পঞ্চগড় যা নয়তো মিশর। আমার দেখার বিষয় না। কিন্তু তোর চেহারা যদি আমি আর একবার দেখিনা? তখন বোঝাবো নীতির সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে কেউ জিততে পারেনা।... কথা শেষ করে নীরবকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে গেলো নীতি।
চলবে....
(নীরব-নীতির অনাকাঙ্ক্ষিত ট্রেন জার্নি এখানেই শেষ)
পর্ব — ৭
নীতির ঘুম ভাঙলো বাড়িতে তুমুল হৈচৈ শুনে। নড়েচড়ে বালিশটা মাথার উপর চেপে ধরেও লাভ হলোনা। বরং গোটা বাড়িটা যেন কেউ ইচ্ছে করে ওর মাথার উপর এনে ফেলতে চাইছে। মেজাজটা বিগড়ালো এক লহমায়। কেন? এবাড়ির সবাই হুট করে ওর শত্রু বনে গেলো কেন? একটু শান্তিমত ঘুমানোও দায় কেন? কিন্তু দুটো বালিশে নিজের মস্তকখানা বার্গারের পেটির ন্যায় চিপকে রাখলে উত্তর মিলবেনা অবশ্যই। অগত্য তীব্র অনিচ্ছায় উঠে বসলো নীতি। ঢুলতে ঢুলতে এলো নীচতালায়। পরণে বহু দিনের পুরানো টিশার্ট। বেশ কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। টিশার্টের উপর একটা প্রিন্টেড বড়সড় হাঙর সবগুলো দাঁত বের করে হাসছে। ট্রাউজারটাও বেশ কয়েক জায়গায় ছেঁড়া, চুলে বোধহয় এক সপ্তাহ যাবত তেল-চিরুনীর ছোঁয়া হতে বঞ্চিত। সবচেয়ে করুণ অবস্থায় আছে টিশার্ট। নীতি যখন দশম শ্রেনীতে ছিল এটা তখন ছোট মামার বাসায় বেড়াতে গিয়ে ঢাকার নিউমার্কেট থেকে একশটাকা দিয়ে কিনেছিল নীতি। এরপর থেকে এই টিশার্ট না পরা অব্দি ওর রাতে ঘুম আসেনা। যেখানে যাবে টিশার্ট সবার আগে প্যাকিং করে নীতি। দীর্ঘদিন ব্যবহারে কালো টিশার্ট ধারণ করেছে ছাই কালার। তাতে অবশ্য নীতির অসুবিধা নেই। বিখ্যাত ক্রিকেটার বাবর আজম সিরিজ খেলতে কিংবা ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে যেই দেশে যান সবসময় নিজের বালিশ নিয়ে যান। প্রায়শই বিভিন্ন বিমানবন্দরে তাকে বালিশ হাতে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। অন্য কোনো বালিশে তিনি ঘুমোতে পারেননা। অতবড় ক্রিকেটার যদি বালিশ নিয়ে ওয়ার্ল্ডকাপ ট্যুরে যেতে পারেন সেখানে নীতির সামান্য ছেঁড়া টি-শার্টে কিছু যায় আসেনা। ওই একই দোকান থেকে আরো বহু টিশার্ট কিনেছে নীতি অথচ ঘুম কেবল ছেঁড়া টিশার্টেই ভালো হয় ওর। উস্কোখুস্কো বেশে, তপ্ত মেজাজে নীতিকে আসতে দেখেই চেঁচালো ওর ছোটবোন প্রীতি,
— নীতিপ্রিয়ার আগমন,
শুভেচ্ছায় স্বাগতম।
নীতিপ্রিয়ার আগমনে,
ফুল ফুটিলো বাগানে...
— থাপড়ে চাপার দাঁত খুলে ফেলবো বেয়াদব। সাত সকালে তোদের নৃত্য করা লাগে কেন? আমি ঘুমোলেই যত কাহিনী শুরু হয় তোদের? কি করব আমি এবার? মরে যাবো? আমার ফিলিংস নেই?
ওদিকে কোথা থেকে এসে মেয়ের কান টেনে ধরলেন নীতির আম্মাজান। ঘড়ির দিকে কান টেনে মেয়েকে দেখিয়ে বললেন,
— বেলা বাজে চৌদ্দটা। এখন তোমার কাছে সকাল মনে হচ্ছে? বলেছিলাম না বাড়িতে মেহমান আসবেন। উনারা এলো বলে। যা-ও তৈরী হও। সং সেজে ঘুরে বেড়াবে না ঘরের মধ্যে। মেয়ে নিয়ে আমার হয়েছে যত জ্বালা!
— আগে কানটা ছাড়ো মা। মেয়ে বড় হয়েছে সেদিকে হুশ আছে? শুধু শুধু মারো কেন আমাকে? আজ বাদে কাল যাবে পরের বাড়ি, একটু আদর করতে পারো না? মেয়ের কপালে যদি সেখানেও মার লেখা থাকে? আমার প্রতি একটুও সদয় না তোমরা।
মাঝখানে ঠেস দেয়া গলায় প্রীতি বললো,
— কিন্তু আমার মনে হয় আপু তুই যেবাড়ি যাবি,কাঁদবে সে বাড়ির লোকজন।
— চুপ বেয়াদব। আম্মা? দেখছো তোমার ছোট মেয়ে কেমন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে? এটার বিয়ে দাও। বলেই মায়ের হাত থেকে কান ছাড়িয়ে নিয়ে সোফায় চিৎপটাং হয়ে ফের শুয়ে পড়লো নীতি। এদিক-ওদিক চেয়ে বললো,
— আজ আবার কোন মেহমান আসবে মা?
মেয়েকে ফের শুয়ে পড়তে দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললেন লতা বেগম। বললেন,
— আবার শুলে কেন নীতি? যাও ফ্রেশ হয়ে তৈরী হও। লাল জামদানী শাড়িটা পরবে। আমি সবকিছু রেডি করে দিয়ে এসেছি। এসব ছেঁড়া জামাকাপড় ছাড়ো।
— তোমার দজ্জাল শ্বশুর কোথায় আম্মাজান? বুড়ার এক পা কবরে অথচ কেস খাইয়ে দিচ্ছিল আমাকে। জানো কত প্ল্যানিং করে ওসব থেকে রক্ষা পেয়েছি? আবার কোন মেহমান ডেকে আমায় বলির পাঠা বানাতে চাইছে? উফ তোমাদের অত্যাচারে বাড়ি থেকে ভেগে যেতে হবে আমাকে। বলি একটু মেয়ের দিকেও খেয়াল রাখো মা? আমি তোমার পেটের মেয়ে নই? যার-তার সঙ্গে বেঁধে বিয়ে দিয়ে দিওনা মা। এতবছর সংসার কোরে বোঝোনি? তোমার শ্বশুর লোক সুবিধার না।
— যা-ও তৈরী হও। আর তোমার ছোট সাগ্রেদকেও নিয়ে যাও। দুটো বিচ্ছু পেটে ধরেছিলাম আমি!
বলে মেয়েকে চোখ রাঙিয়ে চলে গেলেন লতা বেগম। এই বিচ্ছুকে তিনি কি খেয়ে যে পেটে ধরেছিলেন! হাড়-মাংস জ্বালিয়ে খেলো একেবারে! মা চলে যেতেই প্রীতিকে উদেশ্য করে বললো,
— দাদুর কোন মেহমান আসবে রে প্রীতি? ওই সরকারি চাকরিজীবীর ফ্যামিলি?
বোনের পাশে এসে শুয়ে পড়লো প্রীতি। বললো,
— অন্যকেউ মনে হয় আপু। তোমার কি মনে হয় নীরব সাফওয়ান তোমাকে বিয়ে করতে রাজী হবেন? তুমি প্রেগন্যান্ট জানার পরও?
— তুই কি আমার অভিনয় স্কিলের উপর সন্দেহ করছিস প্রীতি? এখন যদি আমি মুভিতে অডিশন দেইনা? কাল দেখবি বেস্ট নায়িকার পুরস্কারের বৃষ্টি হচ্ছে এবাড়িতে। তাছাড়া ওই বলদকে এমন চুনা লাগিয়ে এসেছি না? ব্যাটা আমার ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে 'লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লাবিল্লাহ' পড়বে। বিয়ে নিয়ে নাকে খত দেবে। বলবে আমি সন্যাসী হবো, ধ্যানে বসবো তাও ওই মেয়েকে বিয়ে কোরবো না। ট্রেনের পুরোটা সময় আমাকে এমন ভাবে কটমট করে দেখছিলো যেন চিবিয়ে খাবে। ব্যাটা নিশ্চিত মনে মনে বলেছে এই মেয়েকে বিয়ে করার চেয়ে বিষধর সাপকে বিয়ে করা ভালো। তা-ও নাগমনি পাবার সম্ভাবনা আছে।
— কিন্তু আমার কেন জানি লোকটার ছবি দেখে অতটাও বলদ মনে হয়নিরে আপু ৷ ভীষণ চৌকস লেগেছে। অত বড় আর্মির অফিসার তো আর এমনিতেই হয়নি। আজ যদি সত্যিই চলে আসে? বিয়ে করে ফেলবি?
বোনের কথায় মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করলো নীতি। সে ভীষণ আত্নবিশ্বাসী ট্রেনে নিজের অভিনয়ের প্রতি৷ বললো,
— একদম ভয় দেখাবিনা আমাকে। ছেলেদের জাত এখনো চিনিস নি তুই প্রীতি। এদের মনে একবার সন্দেহের বীজ বুনতে পারলে সেখান থেকে প্রথমে চারা গাছ হয়। তারপর বিশাল বৃক্ষ হয়ে যায়। আমিও লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ানের মস্তিষ্কে সন্দেহের বীজ বুনে এসেছি। তিনি জীবনেও বিয়েতে রাজী হবেননা। আমার বুদ্ধির তারিফ করতেই হয় বল?
প্রীতি কিছু বলার আগে কলিং বেল বাজলো ওদের বাড়ির। তড়িঘড়ি করে সোফা থেকে উঠলো প্রীতি। দোতালার দিকে দৌড়ে পালানোর আগে বললো,
— মেহমান বোধহয় চলে এসেছে আপু। জলদি চল এখান থেকে। আমাদের মাতারানী এই বেশে মেহমাহদের সামনে গিয়েছি দেখলে কাঁচা চিবিয়ে লবণ-মরিচ ছাড়াই খেয়ে ফেলবে।
প্রীতি পালালেও নীতি গেলো না। বরং ঘড়ির দিকে দেখে ওর মনে হলো বাবা এসেছে মসজিদ থেকে। আজ শুক্রবার। ড্রয়িংরুমের এক পাশে কোনো কারণ বশত হয়তো রাখা বালতি আর মগ উঠিয়ে নিয়ে সে চললো দরজা খুলতে। স্কুটিটাকে আজ গোসল করিয়ে দেবে না-হয়। মেহমান আসবে না এই বিষয়ে ও একশভাগ নিশ্চিত। তা-ও ভালো। মেহমানদের উছিলায় একটু ভালো খাবার-দাবার খাওয়া যাবে। আর যাই হোক আর্মির পদধারী লেফটেন্যান্ট একজন প্রেগন্যান্ট মেয়েকে বিয়ে করতে পারেনা। লম্বা একটা হায় তুলে সদর দরজা খুললো নীতি। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
— হ্যালো পাপা? জিলাপি এনেছো আমার জন্য? ভিক্ষুকের মতো দুটো জিলাপিতে আমার পোষাবে না। বেশি করে না আনলে এক্ষুনি বাজারে গিয়ে আবার আনো।
বলতেই চমকালো নীতি। কারণ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা এক যুবক। লম্বাচওড়াও বেশ ভালো। পরণে ফর্মাল শার্ট, কালো ব্লেজার। হাতে বড়সড় ডায়ালের ঘড়ি। ওর সামনে দাঁড়ানো যুবকের চেহারা কিছুটা পরিচিত মনে হলো নীতির। তবে এই বান্দা বুক চিতিয়ে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন ভি আই পি গেস্ট। তড়িৎ বুঝলো নীতি। এটা ওর দাদার সিলেক্ট করা নতুন বখরা। ঢ্যাং ঢ্যাং করে একাই বিয়ে করতে চলে এসেছে নাকি? কাঁধের উপর দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। তবে কেউ নেই এই ছেলের সঙ্গে! উফফ! এক আর্মির পিছু ছাড়িয়ে দুদন্ড বিশ্রাম নেবার সুযোগ পেলো না নীতি। তার আগে কোথা থেকে আরেকজন বলদের সন্ধান করে ফেলেছে ওর বাড়ির লোক।কোনো অসুবিধা নেই। ওই ব্যাটা আর্মিকে যেভাবে হেনেস্তা করেছে,এই চান্দুকে আরও বেশি হেনেস্তা করবে নীতি। বিয়ের সাধ একেবারে মিটিয়ে দেবে আজ । পা থেকে মাথা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
— হু আর ইউ?
ওই প্রান্তের মানুষটাও যেন তৈরী ছিলো। সে-ও একইরকমভাবে বললো,
— হু আর ইউ?
— এখন ভিক্ষে হবেনা। মাফ করেন। এমনভাবে বাসা বাড়িতে ভিক্ষে না করে থালা নিয়ে মসজিদের সামনে বসুন।
— আমি ভিক্ষুক নই। আর আপনি যান। পোশাক আশাক দেখে মনে হচ্ছে কাজের লোক। বাড়ির মালিকিনকে ডাকুন। বলবেন হবু জামাই এসেছেন।
— কে হবু জামাই?
— আমি।
বিজ্ঞের মত দুপাশে মাথা নাড়ল নীতি। দৃঢ়স্বরে বলল,
— হবু জামাই? কিন্তু দেখে লাগে চোর ছ্যাচড়া। দারোয়ানটাকে আজকেই বিদায় করতে হবে। চোর-চোট্টা সদর দরজা পর্যন্ত চলে আসছে আর সে কি কোরছ?
নীতির ভিক্ষুক বলাতে ওপাশে দাঁড়ানো যুবকের কিছু এলো-গেলো না। বরং সে বুকের সঙ্গে দুহাত বেঁধে সটান দাঁড়ালো। যেন নীতি যেন তামাশা এখন করবে তা মোকাবিলায় সে প্রস্তুত।
নীতিও বুঝলো। ঘরের মধ্যে একবার নজর বুলিয়ে খানিকটা এগিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফের বললো,
— ভালোয় ভালোয় এখান থেকে কেটে পড়। নয়তো চোরের তকমা গায়ে লাগিয়ে গণধোলাই খাওয়াবো কিন্তু। আমার স্বামী আর্মিতে আছে। একবার যদি জানতে পারেনা আমার স্বামী? আমাকে কাজের লোক বলেছিস? প্যারেড গ্রাউন্ডে নিয়ে আটকে রেখে আপনার গায়ের উপর দিয়ে কুচকাওয়াজ করবে। তাছাড়া যাকে বিয়ে করতে এসেছিস সেই মেয়ের মাথা খারাপ। রাতে ছাদে উঠে ঘুরে বেড়াই। অচেনা লোক দেখলেই গায়ে থুথু দেয়।
নীতির কথার মাঝে ফোড়ন কাটলো যুবক। গম্ভীরমুখে বললো,
— আপনার স্বামী আর্মিতে আছেন?
— অবশ্যই।
— নাম কি?
— তোকে কেন বলবো?
— কারণ আমিও আর্মিতে আছি৷
আমতা-আমতা করতে থাকে নীতি। আবার আর্মি! বাড়ির লোক আর্মি ছাড়া কিছু খুঁজে পাচ্ছেনা নাকি ওর জন্য? আবারও আশেপাশে তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে বললো,
— লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান। বুঝেছিস তো? লেফটেন্যান্ট তো আর এমনি এমনি হয়নি। এবার কেটে পড় এখান থেকে।
— আপনি আমায় স্মরণ করছেন মিস নীতি?
আচমকা দরজার আড়াল হতে ভারী পুরুষালি কন্ঠস্বরে চমকে উঠলো নীতি। লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান হাজির হয়েছেন নীতির বাড়ির সদর দরজায়।পরণে ফর্মাল সাজপোশাক। চেহারাটা একেবারে চকচক কোরছে যেন। মানে ব্যাটা সত্যিই নীতিকে বিয়ে কোরতে হাজির? অত প্ল্যানিং, শীতের রাতে নাকানিচুবানি সবকিছু ফ্লপ! নীতির কপালে নীরব নামক শনি কাটবে কবে? তোতলানো কন্ঠে বললো,
— আপনি?
— ইয়েস। আপনার একমাত্র স্বামী যাকে আপনি চাতালগাও স্টেশনে ফেলে এসেছিলেন৷ আর সে? আপনার একমাত্র দেবর নীলয় সারহান।
নীরবকে দরজার সামনে দাঁড়ানো দেখে নীতির হার্টবিট বেড়েছে। ওইদিনের প্ল্যান যে পুরোটাই ফেইল করেছে বুঝতে বিন্দুমাত্র বাকি নেই। ধারালো গলায় বললো,
— আপনি? আপনার সাহস তো কম না। নিজের তোতা পাখির মতো নাক উঠিয়ে ফের আমার বাড়িতে চলে এসেছেন? আপনাকে ট্রেনে জানিয়েছিলাম মনে নেই? আমি প্রেগন্যান্ট? আমার বয়ফ্রেন্ড আছে। আপনাকে বিয়ে কোরবোনা আমি। এখন বিদায় হোন। গো আওয়ে।
নীতির বাচালগিরিতে বাঁকা হাসলো নীরব। নীলয়ের কাধে ভর দিয়ে একটু ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
— আপনি আপনার বাচ্চার দায়িত্ব নিতে চাই মিস নীতি। আপনার মতো সুন্দরী, অবলা মেয়েকে এমন অবস্থায় একলা ছেড়ে দিই কিভাবে? একজন দেশ সেবক হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছেনা? তাছাড়া বিউটি উইথ শার্প ব্রেইনের মেয়েদের আজকাল দেখা পাওয়া দুস্কর। একবার যখন আপনার সন্ধান পেয়েছি, আপনাকে হারাতে চাইনা আমি।
— আপনি...
দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে চাইলো নীতি তবে সেকথা শেষ করতে পারলোনা। কেননা রান্নাঘর থেকে ফিরে এসেছে লতা বেগম। এবং সদর দরজা এসে উপস্থিত হয়েছেন ওর বাবা আখতার শাহ। কটমট করে তোকে কাঁচা চিবিয়ে খাবো এমন একটা ভঙ্গিতে নীরবকে দেখে নিয়ে দোতালার দিকে ছুট লাগায় নীতি। বিড়বিড় করে বললো,
— আমাকে বিয়ের শখ তোকে জন্মের মতো মিটিয়ে দেবো লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান। নয়তো আমার নামও নীতিপ্রিয়া শাহ নয়।
চলবে....
পর্ব — ৮
— ভাই! আর ইউ শিউর? তুই আসলেই এই মেয়েকে বিয়ে করতে চাস? মানছি আমরা যেই প্রফেশনে আছি সেখানে জান বিলিয়ে দেয়ার জন্য আমরা সদা প্রস্তুত। স্নাইপারের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস আছে আমাদের। কিন্তু ভাই? এই মেয়ে তো ডেঞ্জারাস। স্নাইপার শট মিস হতে পারে কিন্তু এই মেয়ের চাপার জোরের কোনো মিস নেই। এটা মেয়ে নয় ভাই.. শি ইজ আ মিসাইল। দেখ? তুই আমার একমাত্র বড় ভাই। আমাদের বংশের উজ্জল নক্ষত্র। বাংলাদেশের একজন চৌকস সোর্ড অফ অনার পাওয়া লেফটেন্যান্ট। কেন জেনে শুনে আগ্নেয়গিরির লাভায় ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন নাশ করতে চাইছিস ভাই? সময় থাকতে শুধরে যা। এখান থেকে এক্ষুনি পালা। তোর দুটো পায়ে পড়ি, ভাই! ভাইই..শুনছিস?
কথাগুলো একনাগাড়ে নীরবের কানের কাছে বলছিল নীলয়। সদর দরজায় সেসময় উপস্থিত হয়েছিলেন নীতিপ্রিয়ার শ্রদ্ধ্যেয় বাবা-মা। উনারায় উষ্ণ অভ্যর্থনায় ওদের এনে বসিয়েছেন ড্রয়িংরুমে। নয়তো তার হবু ভাবীজান ওকে সদর দরজা থেকেই ঝেটিয়ে বিদেয় করার চক্রান্ত সেরে ফেলেছিলেন! লোকজন ডেকে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করলেও নীলয় মোটেও অবাক হতো না। প্রাথমিক আলাপ-চারিতা শেষ নীতির বাবা আশরাফুল সাহেব গেলেন গলির মোড়ে দাঁড়ানোর জন্য। ওদের গাড়িটা আগে এসে পৌছালেও ওদিকে ওদের বাবা-মায়ের গাড়ি পথ হারিয়ে অন্য দিকে যাবার কারণে বেশ দেরিই হবে উনাদের পৌছাতে। শরবতের ট্রে রেখে যাওয়া হয়েছে ওদের সামনে। রান্নাঘর থেকে খাবারের সুঘ্রাণে ম ম করছে গোটা বসার ঘর। ওরা দু'ভাই রাস্তাতে গাড়ি থামিয়ে জুম্মা আদায় করে এসেছে অবশ্য৷ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও পাত্রী অমন পারমানবিক বোমা না হলে সময়টা উপভোগ করতো নীলয়। তাই তো আশেপাশে কেউ থাকায় বড় ভাইকে আরও একদফা সাবধান করলো সে। শরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বাঁকা হাসলো নীরব৷ বললো,
— শরবতে মিষ্টি বেশি দিয়ে ফেলেছে!
— তুই এখনো মিষ্টি নিয়ে পড়ে আছিস ভাই? ওদিকে আমি তোর চিন্তায় ব্যকুল।
— চিন্তা করতে বসে দেখি চিন্তাই আবার আমাকে নিয়ে চিন্তা করছে.. ভয়ংকর অবস্থা! তাইনা বল?
নীরবের অমন গা ছাড়া ভাব দেখে করুণ স্বরে নীলয় বললো,
— আই উইল মিস ইউ ব্রাদার!
পরপরই গা কাঁপিয়ে হেসে ফেললো নীলয়। ওর হাসির মাঝে দোতালা থেকে নেমে এলো প্রীতি। কানটা যথাসাধ্য খাড়া করে শোনার চেষ্টা করছে ড্রয়িংরুম থেকে আগত শব্দদের। কেননা হাসিটা বড়ই পরিচিত ঠেকলো ওর নিকট। কিন্তু নীরব সাফওয়ানের সঙ্গে সেই লোক থাকবে কেন? ওদিকে ওদের মাতারাণী বকাবকি জারি রেখেছেন। নীচে মেহমান এসে বসে আছে আর উনার দুই বিচ্ছু মেয়ে সং সেজে দোতালায় বসে আছে। চট করে জামাটা পরিবর্তন করে কালো চুড়িদার জড়িয়ে একপ্রকার অতিষ্ঠ হয়ে নীচতলার আসার সময়ই শুনলো প্রীতির রাতের ঘুম কেড়ে নেয়া গগণবিহারী ঝংকার তোলা হাসি। হৃদস্পন্দন ভারী হলো ওর। মনের কোনে ফের সেই মানুষটার দেখা পাওয়ার তীব্র আকাংক্ষারা পেখম তুললো। দুরু বুকে পেছন থেকে দেখলো দু'জন যুবক বসা তাদের ড্রয়িংরুমের সোফায়। প্রায় একইরকম লম্বা দু-জনে। চুলের কাটও প্রায় একই। খটকা লাগলেও সে এগোলো। সমস্ত সংশয় একপাশে রেখে যথাসাধ্য হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বললো,
— আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই? আপনার একমাত্র শালিকা হাজির। জানেন তো শালি আধা ঘরওয়ালি। আজ আপনার নিস্তার নেই দুলাভাই। জলদি টাকা-পয়সা যা আছে বের করুন। একমাত্র শালি আমি। প্রথম দেখায় আমার সালামি পাওনা মান্ডাটরি।
প্রীতির কণ্ঠস্বর শুনে পিছু ফেরার আগে কনুই দিয়ে নীরবকে গুঁতো দেয় নীলয়। ঠোঁট টিপে হেসে বললো,
— লও ঠ্যালা সামলাও!
প্রীতি ওদের মুখোমুখি হতেই চমকালো। কেননা ড্রয়িংরুমে বসে আছেন লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান। শেষমেষ তার বোনের সমস্ত প্ল্যানে এক বালতি জল ঢেলে উপস্থিত হয়েছেন এই বান্দা! আর তার পাশে বসা যুবক? সে এখানে কেন? বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়েই থাকলো প্রীতি। অবিশ্বাস্য স্বরে বললো,
— নীলয়!
— ধানি লংকা!
— তুই আমার বাসায়?
— বিয়ে করতে এসেছি।
— মানে?
— মানে আমার ভাই নীরব বিয়ে করতে এসেছে। আমি বরযাত্রী। আর তুই আমার বেয়াইন। যা ধালি লংকা আমার জন্য হাত-পা ধোঁয়ানো পানি নিয়ে আয়।
— তোর জন্য ড্রেনের পানি আনবো। ওয়েট কর...
বলেই প্রীতি ছুটলো সদর দরজার দিকে। কেননা সেখানে উপস্থিত হয়েছেন নীরবের বাবা-মা এবং দাদাভাই । মনের কোনে জন্ম নেয়া আনন্দানুভূতি গোপন করে সেদিকে ছুটলো প্রীতি৷
ওদিকে প্রীতির দেখা হুট করে পেয়ে ঠোঁটের কোন থেকে হাসিটা কোনোভাবে সরছেই না নীলয়ের। সোফায় বসলেও ওর নজর তখনও রয়েছে সদর দরজার দিকে। যেখানে ওর মা প্রীতিকে জড়িয়ে রেখেছে আদুরে ভঙ্গিতে। পুরো ব্যপারটা এতক্ষণ বক্র চোখে দেখেই চলছিল নীরব। সদর দরজা থেকে চোখ না সরিয়েই নীলয় সম্মোহিত কন্ঠে বললো,
— ভাই? তুই বিয়েতে দ্বিমত করিস না প্লিজ। এখানেই আমাদের ডেস্টিনি।
— আচ্ছা? একটু আগেও যেন কি বলছিলি? মিসাইল এন্ড অল? রিমেম্বার?
— সব ভুলে যা ভাই। তুই বরং আজই বিয়েটা সেরে ফেল। আর কাজী সাহেব যদি আসেন তাহলে বাবা-মাকে আমার কথাও মনে করিয়ে দিস। খালি খালি দুবার টাকা খরচ করে কাজী ডাকার কি দরকার?
নীলয়ের কথার আগামাথা না বুঝলেও এতটুকু বুঝলো ওর ছোট ভাই কিছুক্ষণ আগের সেই মেয়েটির পূর্বপরিচিত। নিজের এবং সহদোর উভয়ের জন্যই তপ্ত শ্বাস ফেললো নীরব! তারা এবাড়ির মেয়েদের ভালোবাসার জালে ফাঁসলো অথচ ঘুনাক্ষরেও টের পেলো না!
--------------
নীতিকে ওর মা জোর করে রানী গোলাপি রঙের একটা সুতি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। যার পাড়টা রুপোলি রঙা চওড়া কাতানের বর্ডার।কানে স্বর্ণের ছোট্ট ঝুমকো আর গলায় পাতলা স্বর্ণের চেইন। হাতে পরিয়ে দিয়েছে কয়েক গাছি চিকন স্বর্ণের চুড়ি। মেয়ের ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থেকে হালকা সাজগোজ করতে বললেও উনার বিচ্ছু মেয়ে চেহারাটা বানিয়ে রাখলো বাংলার পাঁচ! যার কারণে তেমন সাজগোজ করাতে পারলেন না। চুলে হাত খোঁপা করিয়ে আরেকবার শাসালেন মেয়েকে। বললেন,
— উনারা তোমার দাদুর বন্ধুর পরিবার। আশা করি আমাদের মান-সম্মান ডোবাবে না। মেয়ে হয়ে জন্মালে বিয়ে হওয়ায় ভবিতব্য। আজ না-হয় কাল বিয়ের পিড়িতে বসতে হবেই। ভদ্র মেয়ের মতো নীচে এসো। বাড়িতে মেহমান এলে নিশ্চয় তোমাকে কেমন ব্যবহার করতে হয় সেটা শিখিয়েছি৷
বেশ কড়া গলায় কথাগুলো বলে চলে এলেন লতা বেগম। নীচে মেহমানদের খাবার-দাবারে তদারকি করাটা জরুরি। এই মেয়ের পাল্লায় পড়ে কতক্ষণ যাবত তিনি উপরে এসে বসে আছেন।
খাবার টেবিলে পাশাপাশি বসেছেন বাল্যবন্ধু ইনসান শাহ এবং আজিজ শরীফ। নাতি-নাতনিদের বিয়ে দিতে চেয়েছেন কয়েক যুগ আছে। খুলে বসেছেন পুরোনা দিনের সহস্র স্মৃতির পাতা। ওদিকে দেশ নিয়ে আলাপ জুড়েছেন উনাদের পুত্রদ্বয়। আর গৃহিনীরা ব্যস্ত সাংসারিক আলাপে। মাঝখানে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে নীরব আর নীলয়। নীলয় যে ভীষণ ডিসেন্ট সেটা বোঝাতে সে একটু বেশিই চুপচাপ। ভাতের লোকমা মুখে তুলছে এমনভাবে যেন তার মতো ভদ্রলোক গোটা বাংলাদেশে আর দুটো নেই। এক মেয়ের বিয়ের কথা পাকাপোক্ত করার সময় যেন আরেক মেয়ের কথাও পাকা হয়ে যায়। প্রীতি অবশ্য থেমে নেই। ইচ্ছে করে বেশ কয়েকবার মাংসের ঝোল ঢেলে দিয়েছে নীলয়ের পাতে। তাতেও কোনো রা করলো না নীলয়। সে তো জানে তার ধানি লংকা কেমন।
নীরব স্বভাবতই গম্ভীর। তার চলনে-বলনে মিলিটারি মেজাজ চিলিক দিয়ে উঠে। সবেই ভাতের লোকমা মেখে মুখে তোলার মাঝে সিড়ির দিকে চোখ পড়লো নীরবের। শাড়ি পরিহিত এক অপ্সরা যেন নীরবের জন্যই পৃথিবীতে নেমে আসছে আকাশ হতে! হাতের লোকমা মুখে নিতেও ভুলে গেলো নীরব। বরং সেগুলো হাতের ফাঁক দিয়ে প্লেটে গিয়ে পড়লো। প্রসাধনীবিহীন একটু বাচাল কিন্তু ভীষণ আদুরে সেই নারীর বঁধু বেশে বিমোহিত হলো । শক্তপোক্ত বক্ষপটে অনুভুত হয় অন্যরকম অনুভূতি। ভাইয়ের বেহাল অবস্থা অনুধাবন করেই ফের কনুই দিয়ে গুতো দিয়ে নীলয় বললো,
— ভাই.. মাটনকারিটা না-ও।
নীলয়ের কথা শুনে সেদিকে কটমট করে তাঁকালো নীতি। মনে মনে বললো,
— গিলতে এসেছিস? মাটন গিলে বিদেয় হবি। পাত পেড়ে যদি আমার শান্তির দফারফা করতে এখানে বসতে দেখি তবে দিনের আকাশেও তারা দেখবি, শালা ছ্যাচড়ার দল।
ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে মিষ্টিগলায় সালাম দেয় নীতি। সবেই পানির গ্লাসে চুমুক দিয়েছিল নীরব। ব্যস নীতির মিষ্টি কন্ঠস্বর শুনে বিষম খেলো। বিড়বিড়িয়ে নীলয় বললো,
— সবে শুরু ভাই..
ছেলের মুগ্ধতা মেশানো চাহনি নজরবন্দি হলো নীরবের মা শান্তির। স্বামীর দিকে চাইলেন ইঙ্গিত পূর্ন নজরে।সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
— এসো নীতি মা? মা শা আল্লাহ তুমি কি মিষ্টি! ছবির থেকেও বাস্তবে তুমি বেশি মিষ্টি।ওমা আবার দেখো মেয়ে আবার শাড়িও পরেছে।
শান্তি বেগমের মুখে ছবির কথা শুনে একটা ঝটকা খেলো নীতি। তারমানে? শুকনো একটা ঢোক গিলে চাইলো নীরবের দিকে যে কি না মাথা নিচু করে খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত। এই লোক ওকে ট্রেনে চিনে ফেলেছিল?
নীতি ওর দিকে তাঁকিয়ে আছে বুঝে ঠোঁট টিপে বাঁকা হাসলো নীরব। যেন বোঝাতে চাইলো ট্রেনে ওকে চিনে ফেলেছিল নীরব! যাহ! ওর অত প্ল্যানিং সব জলে গেল? আর এই হুলোটা সব জেনে-বুঝে সারাটা রাস্তা মজা নিয়েছে তাইনা? কপাল চাপড়ালো নীতি। ওর কপালটা এত সোনা দিয়ে বাঁধানো কেন?
নীতিকে কাছে টেনে নিয়ে শান্তি বেগম ফের বললেন,
— একটা মেয়ের শখ আমার অনেক দিনের বুঝলে। কত করে মেয়ে চাইলাম। কিন্তু আল্লাহ পাক আমাকে দিয়েছেন দুটো পাঠা!
মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটলো প্রীতি। কোনোরকমে হাসি চেপে বললো,
— ঠিকই বলেছেন আন্টি। আমাদের ক্লাসরুমে আগে পাঠার গন্ধে টেকা যেতো না।
মেয়েকে চোখ রাঙালেন লতা বেগম। সেদিকে যদিও খেয়াল নেই প্রীতির৷ যেন সে একটা ছক্কা মে রে দেয়া মশকরা করে ফেলেছে।
খুক খুক করে কাশলো ওর দু-ভাই। নীলয়কে একটু বেশিই আহত মনে হলো। এটা ওর নিজের মা তো? ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে এসে যদি এভাবে ছেলের বদনাম কোরছে কেন? বিড়বিড় করে মাকে নীলয় বললো,
— মা তুমি কি চাও না আমাদের বিয়ে হোক? তোমার মাঝেও দজ্জাল শাশুড়ী হবার পটেনশিয়ালটি আছে এটা জানার জন্য হলেও ছেলেদের বিয়ে দিয়ে দাও মা। বদনাম কোরো না মা। প্লিজ। বোঝো না এখানে আমাদের প্রেস্টিজ জড়িত?
কপাল কুঁচকে ছেলের কাছে জানতে চাইলেন,
— তুই নাকি বিয়েই করবি না। বিয়ে মানে জ্বালা। জীবনের শান্তি নষ্ট। তাহলে প্রেস্টিজের কথা আসছে কেন?
লাজুক হেসে প্রীতির দিকে এক নজর চাইলো নীলয়। ঘাড়টা সামান্য চুলকে গলাটা যথাসম্ভব খাদে নামিয়ে বললো,
— ভাইয়ার বিয়ে হয়ে গেলে আমি একা হয়ে যাবো না? তাছাড়া ভাবীরও একজন সাথীর প্রয়োজন আছেনা আমাদের বাসায়? ভেবে দেখো মা? একটু আশেপাশে নজর বুলাও। মেয়ে আশেপাশেই আছে।
— বেহায়া!
--------
খাবারের পর্ব শেষ হবার কিছুক্ষণ পর নীতিকে রান্নাঘরে টেনে আনলেন লতা বেগম। ট্রে-তে সাজিয়ে রেখেছেন ডেজার্ট। কড়া গলায় সেগুলো টেনে সার্ভ করতে বললেন।মায়ের ব্যবহারে বিরক্ত হয় নীতি। বললো,
— তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে অযাথা খারাপ ব্যবহার কোরছো আম্মু?
— তোমার মতো বিচ্ছু মেয়ের ভালো কথা শোনার ধাত আছে?
বলেই চলে গেলেন তিনি। ওদিকে সব সমস্যার জড় নীরব সাফওয়ানের উপর গিয়ে বর্তালো নীতির সমস্ত রাগ। এই লোক ওকে ট্রেনেই চিনে ফেলেছিল! অথচ ওর সঙ্গে সমান তালে নাটক চালিয়ে গিয়েছে। শালা! আমাকে বিয়ে করার তোর এত শখ? আমার জীবনের শান্তি গিলে খেয়ে আবার এসেছিস পোলাও-রোস্ট গান্ডেপিন্ডে গিলতে। এখন আবার ডেজার্ট খাওয়া? হ্যাঁ? এত সহজ নীতিকে বিয়ে করা? ডেজার্ট এর একটা বাটি আলাদা করে রাখলো নীতি। এই লেফটেন্যান্টকে তো ও নিজের মতো শায়েস্তা করবে। শেষপাতে বাল্যবন্ধুকে আপ্যায়নের জন্য নলেন গুড়ের পায়েসের বন্দোবস্ত করতে বলেছিলেন ইনসান শাহ। লতা বেগম শ্বশুরের আজ্ঞাকারী বউমা। ঘন জ্বাল করা দুধে নলেন গুড় মিশিয়ে রেঁধেছেন পায়েস। সুঘ্রাণ বেরিয়েছে পায়েস থেকে ভীষণই। হালকা লাল বর্ণের পায়েসটা দেখে একটা দ্যুতি খেলে গেল নীতির আনন জুড়ে। ঠোঁট টিপে হাসলো ড্রয়িংরুমের বারান্দায় সটান দাঁড়ানো লম্বা-চওড়া মানুষটাকে দেখে। বিয়ে করার এত শখ? তাইনা? তবে লেফটেন্যান্ট সাহেবকে একটু জামাই আদর করা যাক। এদিক-ওদিক চেয়ে রান্নাঘরের তাক থেকে নামিয়ে নিল মরিচ গুঁড়োর কৌটা। নলেন গুড়ের পায়েস হবার কারণে নীরবের জন্য নির্ধারিত বাটিতে খানিকটা মরিচের গুড়া মিশিয়ে দিলেও তেমন পরিবর্তন এলোনা। তবে শুধু মরিচের গুড়ো মিশিয়েই ক্ষান্ত দিলো না। এক মুঠো লবণ মিশিয়ে দেয় পায়েসের মধ্যে। ভালো ভাবে মিক্স করে আরও খানিকটা পায়েস দিয়ে ঢেকে দেয় সবকিছু। যেন মরিচের গুড়োর স্মেল না আসে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রান্নাঘর থেকে বাইরে এলো নীতি। সবাইকে ডেজার্ট সার্ভ করে এলো নীরবের কাছে। সে একটু সাইডে এসেছিল মোবাইলে কথা বলার জন্য।
নীতির ট্রে হাতে নিয়ে ঠোঁটের কোনের মিষ্টি হাসি এবং লাজুক ভঙ্গিতে হেঁটে আসা সবটা যেন সিনেমার মতো সুন্দর। তথাকথিত এরেঞ্জ ম্যারেজে বহু বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। আড়চোখে দেখা, লাজুক হাসি এসবই তো অচেনা দুজনের কাছে আসার, মন মিলে যাবার প্রথম শর্ত। কিন্তু নীতির বেলায় আদৌও দৃশ্যপট এমন হওয়া উচিত? কখনো না..
মোবাইলে কথা শেষ করে পিছু ফিরতেই নীরবের চোখাচোখি হলো মেজেন্টা শাড়ির অপ্সরার। কিন্তু এই লাউডস্পিকার এমন লাজুক হেসে দাঁড়িয়ে আছে কেন? আর্মি ট্রেনিং এর দরুন হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেছে নীরব। এই লাউডস্পিকারের ঠোঁট টিপে হাসা, চোখ জুড়ে খেলা করতে থাকা কৌতুকের ছাপ অন্যকিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু কি? আবার কোন প্ল্যান করে এসেছে মেয়েটা?কপাল কুঁচকে সন্দিহান হয়ে বললো,
— কিছু বলবেন মিস নীতি?
— বলবো তোর মাথা শা লা হারামজাদা! বিয়ের শখ তোকে ঘুচিয়ে দেবো আমি। কথাটা বললো মনে মনে। আর মুখে বললো,
— আপনার জন্য ডেজার্ট এনেছি নীরব সাহেব। নিজ হাতে বানিয়েছি। খেয়ে ধন্য করুন আমাদের।
ফের সন্দিহান হয়ে বলল,— আমার জন্য?
— অবশ্যই। আপনি আমাদের বাড়ির মেহমান। মেহমানের সেবা করাটা জরুরি। নিন? একটু খেয়ে দেখুন? আমরা মেহমানদারিতে এক্সপার্ট।
মোবাইলটা পকেটে রেখে ডেজার্টের বাটি হাতে নিলেও মুখে দেয়ার সাহস হলোনা নীরবের। দোনোমোনো করতে থাকে। এই মেয়েকে বিশ্বাস নেই। যদি পেট খারাপের মেডিসিন মিশিয়ে দেয়! নয়তো এত সুন্দর ব্যবহার করে ওকে পায়েস খাওয়ানোর মতো সু-সম্পর্ক তাদের মধ্যে নেই। মিষ্টি গলায় ফের নীতি বললো,
— নীরব সাহেব ডেজার্টটা খেয়ে নিন। আমি বাটি নিয়ে যাবো। কথাটা মুখে বললেও ঝালে এই ব্যাটার পরিবর্তিত চেহারাটা দেখতে চায় নীতি। অত কষ্ট করে তাক থেকে কৌটা নামিয়ে স্পেশাল রেসিপির পায়েস নিয়ে এলো! কিন্তু পায়েসের রিভিউ না নিয়ে যদি চলে যায় তাহলে তো ব্যপারটা জমবেনা। ঠোঁট টিপে হাসিটা কোনোরকমে দমিয়ে রাখলো নীতি। চোখের ইশারায় নীরবকে খাওয়ার জন্য বললোও।
একটা সুপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে একচামচ পায়েস মুখে দিতেই বুঝলো নীরব, ওর সামনে দাঁড়ানো নীতিপ্রিয়া শাহ নামক নারীর ওর জীবনে আগমন হয়েছেই ওকে জ্বালাতে এবং তার শুরুটা হলো মরিচ গুঁড়ো আর লবণ মিশ্রিত পায়েস খাবার মাধ্যমে। মুহুর্তে চোখ-মুখ লাল হয়ে গেলো নীরবের। ফর্সা চেহারাটা টুকটুক করছে একেবারে। কপালে ফুঁটে উঠলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। কিন্তু নীরব! সে সটান দাঁড়ানো। একটু নড়লো অব্দি না। কোনোরকমে পায়েস টুকু গিলে নীতির কাছাকাছি একটু এগিয়ে বললো,
— ঝাল যখন আপনি খাইয়েছেন মিষ্টিমুখ আজ রাতে আপনিই করাবেন নীতিপ্রিয়া শাহ৷ কথা দিলাম।
ঝাল খেয়েও নীরবের বাহ্যিক পরিবর্তন হলেও বিয়ের ভূত মাথা থেকে নামেনি বুঝতে বাকি রইলো না নীতির৷ রাগে তিরতির করে কেঁপে উঠলো সে৷ কয়েক লা এগিয়ে গেলো নীরবের সম্মুখে। বলল, — নিজের চেহারা আয়নার দেখেছেন? তোতা পাখির নাক নিয়ে চুমু পর্যন্ত খেতে পারবেন না। অথচ ঢ্যাং ঢ্যাং করে বিয়ে করতে চলে এসেছেন!
আবারও এক চামচ পায়েস খেয়ে নীরব বললো,
—আপনি তো নাক নিয়ে বিষদ গবেষণা করে ফেলেছেন মিস নীতি। কিন্তু ফিল্ড টেস্ট ছাড়া রেজাল্ট মানবেন কী করে? আপনি বরং একবার কাছে এসে চুমু খেয়ে দেখুন তারপর অভিযোগ থাকলে আমি নাক কেটে তবেই আপনার সঙ্গে বিয়ের পিড়িতে বসবো৷ নাক ঠিক করলে বিয়েতে আপত্তি নেই তো?
চলবে...