writer- Nadia ferdousi
এখন থেকে এই গল্পের বাকি পর্ব গুলো পোস্ট করা হবে।
আর বাকি পর্ব গুলো পড়তে বাকি যাদের আছে তাদের জন্য নিচে লিংক দেওয়া হয়েছে।
গল্পের: link
writer- Nadia ferdousi
এখন থেকে এই গল্পের বাকি পর্ব গুলো পোস্ট করা হবে।
আর বাকি পর্ব গুলো পড়তে বাকি যাদের আছে তাদের জন্য নিচে লিংক দেওয়া হয়েছে।
গল্পের: link
রিকশায় বসে বসে পাশের বাইকগুলো কে শু শু করে যেতে দেখে জুথি আফসোস সূচক শব্দ করলো। আহা! এই সময়ে একটা বাইক রাইডাকে বুকিং করলেই তো একটু জলদি চলে যেতে পারতো। আবার স্বামীর চোখ রাঙানো চেহারাটা অক্ষিপটে ভাসতেই আফসোস বাদ দিলো। বাচ্চাগুলোকে মায়ের কাছে রেখে আসতে গিয়ে দেড়ি হয়ে গেল। আবার গাড়িটারি না পেয়ে রিকশার উঠে বসেছে।এখন জ্যামে আঁটকে গেছে। ফাবিহাটা কল করে মাথা খাচ্ছে। এই মেয়েটার সবকিছুতে অস্থির হওয়াটা আর গেলো না। বিশ মিনিটের মতো রোদে পুড়ে ছাই হয়ে শপিং মলের সামনে এসে দাড়াল জুথি। শপিং মলের বাইরে চিরপরিচিত কয়েকটা মুখ দেখে জুথি আবেগে আপ্লূত হয়ে গেলো। যেই বন্ধুগুলোর সাথে প্রতিদিন দেখা হতো, কথা হতো। কতশত আড্ডা। পড়াশোনা শেষ হয়ে গেলে সেই বন্ধুগুলোর সঙ্গে মাসেই একবার দেখা হয় না। ফাবিহা মাইশার বিয়ে হয়নি বলে দেখা করতে পারে ইচ্ছে হলেই। সে পারে না সংসারে বেড়াজাল থেকে বের হয়ে দেখা করতে।
ফাবিহা জুথিকে দেখে চেচামেচি শুরু করলো। রাফি বাদাম খেতে খেতে পিচ্চি দেখতে ফাবিহার পানে তাকিয়ে অর্ককে বললো -" দেখ, পুটিমাছের অবস্থা দেখ। মনে হচ্ছে ওকে কেউ পানি থেকে তুলে ডাঙ্গায় রেখে দিয়েছে। "তারপর ফাবিহাকে ব্যাঙ্গিয়ে হাত নাচিয়ে গা ঝাঁকিয়ে বললো-" হেই জুথি, হেই জুথি। জুথি রানী এসে গেছে। "
ফাবিহা গাল ফুলিয়ে আদনান,অর্ককে বললো -" তোরা কিছু বলবি ওরে?"
অর্ক আদনান রাফিকে কি বলবে! ওরাও রাফির মতো ওকে ব্যাঙ্গালো। জুথি দূর থেকে বন্ধুদের বাচ্চামো দেখে হেসে ফেললো।সবকয়টার বয়স হয়েছে কিন্তু স্বভাব পাল্টেনি একটুও। ফাবিহাটা এখন একটা এনজিও প্রতিনিধিত্ব দিচ্ছে অথচ বন্ধুদের সামনে সেই অবুঝ মেয়েটা। যার কাজকারবার উল্টো। বন্ধুরা খ্যাপালেই মেঘের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা।অথচ মেঘ বেশিরভাগ সময়ই আদনানদের সঙ্গ দিতো।বন্ধুরা তাই তো মেঘের ময়না বলে খেপিয়ে অতিষ্ঠ করে দিতো। জুথি ফাবিহার কাছে যেতেই ফাবিহা ওর ছোটখাটো শরীরটা নিয়ে জুথির পিছনে লুকিয়ে বললো -" আসোক মেঘ। তোদের দেখে নিবো আমি। "
অর্করা হইহই করে বললো -" ওরেএএ আমার মেঘের ময়নাটাকে ওর কোলে দিয়ে আয় কেউ। "
জুথি নিষেধ করে বললো-" ভাই ছেড়ে দেয় না বাচ্চা মেয়েটাকে। কতদিন পর দেখা হলো! তোরা তারপরও এসব করবি? "
আদনান গম্ভীর স্বরে বলল -"জুথি বিয়াইত্তা মহিলা, আপনি বেশি কথা বলবেন না। এগুলো আমাদের জোয়ান ছেলে মেয়ের বিষয়। "
জুথি বিস্মিত হয়ে বলল -" ওহহ তাই। তাহলে রাফি আমার দলের। এই বিয়াত্তা পুরুষ এই দিকে আয়। আমি কেন একা একা থাকবো? "
রাফি ক্ষীণ হেসে জুথির পিছনে এস দাঁড়িয়ে সারেন্ডার করার ভঙ্গিতে দুহাত তুলে বললো -" এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। জুথি চিন্তা করিস না। সবকটা একদিন এক এক করে আমাদের দলেই আসবে। মাইশাটা তো যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। "
জুথি বললো-" হ্যা।ভালো কথা। মেঘ এখনও আসেনি? "
অর্ক আদনানের হাতের ঠুংকা থেকে বাদাম নিতে নিতে বললো-" মাইশাদের সঙ্গে আসবে বললো। ওর তো আবার। বুঝিস না। ওর ব্যস্ত সময় যায়। "
জুথি হাহুতাশ করে বললো -" বিয়ের আগেই ছেলেটা বউ পাগল। বিয়ে পরে যে কি করবে? "
অর্কা পিন্জ মে*রে বললো -" তানিশা রাজকুমারীটা ওকে বিয়ে করলেই হয়। যা অবস্থা দেখলাম। "
ফাবিহা চিন্তিত স্বরে শুধালো -" কেন? কি হয়েছে? "
-" কেন? গ্রুপ কলে তো ছিলিই। মনে নেই বিদেশি উল্লুকটার কথা। ভারা ভাতে ছাই দিতে এলো যে। "
অর্ক রাস্তায় চোখ রেখে সবাইকে সর্তক করে বললো -" গাইজ, মেঘ আসছে। বিদেশি উল্লুকটার কথা ভুলেও তুলবি না। নাহলে ওর আক্রোশ আমাদের উপর মেটাবে। "
জোহানের কথা ওঠায় ফাহিবা কিছু প্রশ্ন করতে চেয়েছিলো। কিন্তু সর্তকবার্তা পেয়ে মুখে কুলুপ এঁটে নিলো। মেঘ তার গাড়িটা পার্ক করে একা একাই চলে এলো। বন্ধুদের দেখে তার চিরচেনা সেই নির্মল হাসিটা দিলো। জুথিকে জিজ্ঞেস করল -" কি রে জুথি রানী? কেমন আছিস? তোর আণ্ডাবাচ্চাগুলো কোথায়? "
-"আল্লাহ তুমি আমার বন্ধুটার নসিবে একটা ভালো বউ দান করো। সে যে আমাকে এই প্রশ্নগুলো করলো। "
মেঘ হাসলো।জিজ্ঞেস করল -" কেনো? ওরা করেনি? "
জুথি নাক মুখ কুঁচকে বললো -"ওই হাঁসের বাচ্চাগুলো প্যাক প্যাক করেই সময় পায় না। আর আমার ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করবে! তা মাইশারা আসেনি? "
-" আমি ওদের সাথে আসিনি। অফিসে যেতে হলো। সেখান থেকেই এলাম। আর অর্ক যদি একটা কাজকারবার ঠিক মতো কাজ করতো! আমি বেঁচে যেতাম। কি আর করা?"শেষের কথা গুলো অর্কে খোঁচা দিয়ে বললো মেঘে। অর্ক গমগমে কন্ঠে বললো-" দেখুন ইহতেশাম চৌধুরী মেঘালয়, আমি এখন ছুটিতে আছি।তাই আজাইরা প্যাচাল আমার কানের কাছে করবেন না।"
-" মাইশারাও এসে গেছে বোধহয়। " রাফির কথা শুনে সবাই পিছন ফিরে তাকালো।তিনটা গাড়ি এসে থেমেছে। প্রথম গাড়ি থেকে এক এক করে বয়োজ্যেষ্ঠগণ নেমে আসলেন। পরের গাড়ি থেকে আইরা, ফাইয়াজ, ফাহিম রাইসারা নেমে এলো। কিন্তু পাঁচ জন মানুষ যাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা একদম শেষে গাড়ি থেকে বের হলেন। মাইশা বের হয়েই মেঘদের দেখে চেঁচিয়ে উঠলো। শপিংমলের সিড়ি গুলো লাফিয়ে লাফিয়ে বেয়ে চলে গেল। একহাত দিয়ে জুথি অন্য হাত দিয়ে ফাবিহাকে জড়িয়ে ধরল।
তানিশা বের হওয়ার আগে জোহান বের হয়ে আসলো গাড়ি থেকে। তানিশার শাড়ীর আঁচল গাড়ি দরজায় আটকে নিতে দেখে জোহনা ধরল। মেঘের চোয়াল কিড়মিড় করলো।ফাবিহা সেই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে গোল গোল চোখে ওদের দেখলো।জোহানের রূপের প্রশংসা করে বললো-" এতো প্রিন্সেসের সঙ্গে প্রিন্স চার্মিং।"
মাইশা আঁতকে গিয়ে লাগামহীন ফাবিহার মুখ চেপে ধরল।রাফি আদনান অর্ক মাথা ঝাঁকাল। এটা আজ গেছে। ফাবিহা মুখ থেকে মাইশার হাত সরিয়ে খ্যাক করে বলল-" মুখে হাত দিলি ক্যান? যা সত্যি তাই তো বললাম। কি সুন্দর! "
মাইশা একহাত দিয়ে নিজের মুখ ডেকে নিলো। ফাবিহা বন্ধুদের সবার মুখের দিকে তাকালো এক এক করে। মেঘের মুখের দিকে তাকিয়ে শুষ্ক ঢোক গিললো। মেঘের রক্তিম চোখের পানে চেয়ে ভ্যাবলার মতো হেসে বলল -" জাস্ট ফাননন! আমি তো ফান করছিলাম। তবে এটা কিন্তু একদম খাঁটি কথা। তোর সাথে তুলনা হয় না। তুইই বেস্ট। "
মেঘ দাঁত কিড়মিড় করে বলল -" তোর পুটিমাছের মতো মাথাটা আমি চিবিয়ে খাবো ফাবু।"
ফাবিহা একহাত দিয়ে কান ধরল -" মাফ, প্লিজ মাফ।"
মেঘ ঢংগি মেয়েটার পানে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তানিশার দিকে তাক করলো ফাহিমের সঙ্গে বেশ সিরিয়াস হয়ে কথা বলছে। মেঘ যেন ভাবনায় পরে গেল। মেয়েটাকে সিরিয়াস হলে বেশি ভালো লাগে না নরমাল!
************
মেঘ ঝুলানো শার্টগুলো নেড়েচেড়ে রাখলেও দৃষ্টি তার অন্য দিকে।বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি। মহিলা পার্টি নিজেদের শপিং করতে ব্যস্ত লেডিস শপে। কিন্তু একজন লেডিস ওদের সাথে জেন্টস শপে এসেছেন। আর উনার নাম হলো তানিশা মর্তুজা। বিদেশি উল্লুকটার পাশ ছাড়ছেই না। তানিশা জোহানের জন্য অন্য সাইডে পাঞ্জাবি দেখছে। জোহান তাকে এসব নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করে যাচ্ছে। তানিশা মিষ্টিস্বরে সেই সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে।মেঘ জিব্হাটা গালে ঠেস দিলো। মেয়েটা আসার পর থেকে ওর দিকে একবারও দৃষ্টি দিচ্ছে না। আহা! নিষ্ঠুর মানবী।আদনান তানিশার পানে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো -" মেয়েটা একদম বদলে গেলো কিভাবে? এই বিদেশিটা সাথে কেমন সব সময় চিপকে থাকে। নিশ্চয়ই কোনো ঘাপলা আছে। "
মেঘ ওর পানে তাকিয়ে কঠিন স্বরে শুধালো -" তোকে ও বলেছে যে এখানে ঘাপলা আছে? আমরা যে রকম তিনটা গাঁধিদের পালি। তেমন তানিশা একটা গাধা পালতেই পারে। "
রাফি আদনানের মতো সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -" কিন্তু এই পালা কি সেই পালা? নাকি অন্য ধরনের পালা হচ্ছে। "
অর্ক পিছন থেকে গলা খেঁকারি দিলো। আদনান রাফি ইঙ্গিত বুঝতে পারলো না। আদনান রাফিকে বললো-" আমারও তাই মনে হয়। "
মেঘ মাঝখানে থেকে একবার আদনানের একবার রাফির পানে তাকাল। তার পর ওর বলিষ্ঠ হাতে ওই দুটোর ঘাড় চেপে ধরল। ঠিক সেই সময়ই দুটোর খেয়াল হলো বেজায়গা বেফাঁস কথাগুলো উগলে দিয়েছেন উভয়। মেঘ ওদের একটার সাথে আরেকটার মাথা ঠেস লাগিয়ে চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে বললো-" তোদের গবেষণা আমি তোদের পু*টকি দিয়ে ভরবো। শা*লা!"
আদনান ঝুকে থাকা অবস্থায় অসহায় কন্ঠে অর্ককে ডাকলো -" অর্ক, অর্ক ষাঁড় খেপেছে রে। আমাদের বাঁচা। "
অর্ক বন্ধুদের কাজে অতিষ্ঠ হয়ে এসে মেঘকে পিছন থেকে ঝাপটে ধরল। মেঘ মেকি দস্তাদস্তি করলো খানিকক্ষণ। রাফি আদনান ওর হাত থেকে ছুটে যেতেই পাশের হাংকার থেকে মেঘ একটা শার্ট নিয়ে ছুড়ে মার*রো ওদের পিছনে। আদনানের পিঠে লেগেও লাগল না। মেঘ অর্কের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বিদেশ ফেরত দুই উল্লুকের দিকে হাঁটা ধড়লো। তানিশার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তানিশা মুখ তুলে চাইতেই মেঘ ওর হাত থেকে পাঞ্জাবিটা জোহানের হাতে গছিয়ে দিয়ে বললো -" উল্লুক সাহেব নিজের কাজ নিজে করেন। তানিশা এখন আমার বুকিং। এই তানিশা চলো। "
মেঘ তানিশার বাহু ধরে ওকে টেনে ওই শপ থেকে বের করে আনলো। তানিশা আশ্চর্যান্বিত স্বরে শুধালো -" আরে! আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। "
মেঘ বেশ হতাশ স্বরে শুধালো -"আর বলো না তানু। অকর্মাগুলো আমার মাথার ভেতরের গিলু ঘুলিয়ে দিয়েছে। এখন আমি কিছুই চুজ করতে পারছি না। তোমার চুজ ভালো। তাই নিয়ে এলাম। চলো এই শপে ভালো কিছু না। অন্য শপে যাই। "
-"আচ্ছা। "বলে তানিশা মেনে নিলো। মেঘ পাশের আরেকটা জেন্টস নিয়ে এলো। তানিশাকে বললো শার্ট চুজ করে দিতে। তানিশা ঘুরে ঘুরে চৌদ্দটা শার্ট মেঘকে গছিয়ে দিলো। -" এখানের সবগুলো আপনাকে বেশ মানাবে বলে আমি মনে করি। এখন আপানি চুজ করেন কোনটা কিনবেন। "
মেঘ তানিশার উপর হাতে কয়েকটা শার্ট দেখে জিজ্ঞেস করল -" আর ওগুলো কি?"
-" এইগুলো জোহানের জন্য। "
এইকথাটা যদি অন্যের মুখ থেকে শুনতো যে তানিশা এইগুলো ওই উল্লুকটার জন্য কিনেছে।তাহলে মেঘ তার নাকে ঘুষি মে*রে নাক ফাটিয়ে দিতো। তানিশা বলেছে বলে নিজেকে কন্ট্রোল করে ছোট করে বললো -" ওহহ।"
ক্রোধে তানিশাকে ওখান রেখে শার্টগুলোর বিল পে করতে গেল মেঘ। স্টাফকে শার্টগুলো দিয়ে পিছন ফিরে দেখে। থমকে গেল। তানিশা নেই। তানিশার কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না এই শপে। মেঘের দৃষ্টি তানিশাকে খুঁজে খুঁজে শপের সচ্ছ কাচের গ্লাসে বেদ করে বাইরে গেল। তানিশাকে চলে যেতে দেখে স্টাফকে বললো-" এই সবগুলো শার্ট পেক করে দিন। একটাও যেনো এই দিক সেদিক না হয়। আমি এসে বিল পে করছি। "
মেঘ দৌড়ে শপ থেকে বের হয়ে চেচিয়ে ডাকলো তানিশাকে। তানিশা দাঁড়িয়ে গেল। মেঘ এগিয়ে বললো -" কোথায় যাচ্ছো? "
-" জোহান কি করছে দেখে আসি? "
তেঁতো একটা স্বাদ এসে ঠেকলো মেঘের গলায়।হতাশ হয়ে তানিশাকে রেখে আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে ফাইয়াজকে লক্ষ্য করলো। ফাইয়াজ একা একা ছেলেকে নিয়ে হাঁটছে শপের বাইরে । মেঘের মনে হলো এর থেকে ভালো কোনো অপশন নেই। তার কাজ শেষ হবার আগ পর্যন্ত তানিশাকে আটকে রাখার। তাই তানিশাকে টেনে নিয়ে ফাইয়াজের কাছে গেল। তানিশা টেনে নিয়ে ফাইয়াজের পাশে গিয়ে ওর একটা হাত তানিশার হাতে রেখে বললো -" তোমার বোনকে দেখে রাখতে পারো না?ছোট্ট মানুষ হারিয়ে গিয়েছিল। "
তানিশা হতবাক হয়ে বলল -" আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম?কবে?কখন?"
মেঘ বিরক্ত হয়ে বলল -" এতো কথা বলো না তো তানিশা। ফাইয়াজ ভাই একে দেখে রাখিয়েন। "
মেঘ চলে যেতে তানিশা হতবাক দৃষ্টিতেই ফাইয়াজের পানে তাকাল। ফাইয়াজ একহাতে আইয়াজকে বুকের সাথে চেপে ধরে অন্য হাতে আঙুলের ভাঁজে তানিশার হাত নিলো।তানিশা হেসে হাত দুলিয়ে দুলিয়ে একবার পিছনে একবার সামনে এনে বাচ্চাদের মতো করলো।ফাইয়াজ তানিশার বাচ্চামো দেখে হাসে।কিছুক্ষণ হেঁটে সামনে একটা বেবি কর্ণার দেখে তানিশা আইয়াজকে বললো-" আইয়াজ কাদঁ। কাদঁ বাবা কাঁদ। তোর আব্বু তোকে কেন বার্বি ডল কিনে দেয় না। "
আইয়াজ বেবি কর্ণারে একবার বাঁকা চোখে চেয়ে বিতৃষ্ণা নিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। তানিশা অবাক হলো। ফাইয়াজ বললো-" আমার ছেলেকে বার্বিডল না। ফুটবল বল দেখা রাজকুমারী। পটে যাবে। "
তানিশা বিষয়টা বুঝতে করে ভিতরে একটা পুরনো ব্যাথা অনুভব করলো। সঙ্গে একটা মধুর স্মৃতি।
তখন তানিশা ক্লাস টু তে পড়ে। সুলতানা হায়দার উনার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গেলেন শপিংমলে । সঙ্গে নিলেন ছোট্ট তানিশাকে। পুরো মার্কেট ঘুরে ঘুরে সুলতানা হায়দার শপিং করলেন। একসময় মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেবি কর্ণার পাড় হয়ে যাচ্ছিলেন। তানিশার পা সেই দোকানের সামনে আটকে গেলো। সুলতানা হায়দার মেয়ের মনোভাব বুঝে পেরে জিজ্ঞেস করলেন কি কিনবে। তানিশার ইশারায় দেখালো দোকানের একপাশে একটা পিংক কালারে বার্বি ডল স্কুল ব্যাগ।দেখে মনে হচ্ছে এটা স্কুল ব্যাগ না এটা বার্বিডলই। সুলাতানা হায়দার বললেন -" এটা তো স্কুল ব্যাগ। তোমার নতুন স্কুল ব্যাগ তো তোমার মেজআব্বু কিনে দিয়েছে। আসো আম্মু তোমায় একটা বার্বিডল কিনে দেই। "
তানিশা নাকচ করে বললো-" নাহ। আমার এই স্কুল ব্যাগটাই লাগবে। এটা ছাড়া আমি স্কুলে যাবো না। "
সুলতানা পরলেন মহা যন্ত্রণায়। মাত্র একদিন গেছে নতুন স্কুল ব্যাগটা নিয়ে স্কুলে । এখনই স্কুল ব্যাগটা কিনে দেওয়া মানেই হয় না। উনি তানিশার কথা উপেক্ষা করে এই রকম একটা বার্বিডল কিনে দিলেন তানিশাকে। মাকে ব্যাগ না নিয়ে ডল নিতে দেখে তানিশা সেখানেই কেঁদে কে*টে নাজেহাল অবস্থা সৃষ্টি করলো। নাছোড়বান্দার মতো দোকানের মেজেতেই বসে পরলো। দোকানে স্টাফ মেয়েটা বললো -" মেম, বাচ্চাটা যখন এভাবে কাঁদছে? তাহলে ব্যাগটা নিয়ে যান। "
এডভোকেট সুলতানা হায়দার ধমক দিয়ে বললেন -" চুপ, বেশি বুঝো তুমি? আমার মেয়ে আমি দেখবো। তোমাকে যেটা দিতে বলেছি সেটা দাও। বাচ্চাদের সব কথায় তাল দিতে হয় না। কাঁদছে একটু পরে শান্ত হয়ে যাবে। "
স্টাফটা কাচুমাচু করে নিজের কাজ করতে লাগলো। আড়চোখে তাকালো তানিশার দিকে। মিষ্টি দেখতে আদুরে বাচ্চাটা মেজেতে বসে পা ছড়িয়ে কাঁদছে। কাঁদার ফলে মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে আর খাটাস মা শুধু বাচ্চাটাকে ধমকে যাচ্ছে। মেয়েটার প্রতি তার মায়া কাজ করছে। ডলটা প্যাক করে সুলতানা হায়দারের হাতে দিলেন। সুলতানা হায়দার বিল পে করে তানিশাকে উঠতে বললেন। কিন্তু তানিশা জেদ ধরে শুয়েই পরলো মেজেতে। সুলতানা হায়দার না পারতে হাতের শপিং ব্যাগগুলো হাত থেকে রেখে তানিশাকে জুড় করে কোলে নিলেন। স্টফ মেয়েটাকে বললেন ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে যেন দেয়। মেয়েটা তাই করলো। সুলতানা হায়দার তানিশাকে কোলে তুলে বাইরে নিয়ে এলেন। তানিশা তখন চিৎকার করে যাচ্ছে। শপিংমলে সবাই একবার হলেও এই জেদি মা মেয়েকে দেখছে ঘাড় ঘুরিয়ে। সবকিছু পেয়ে পেয়ে এই মেয়েটার স্বাভব নষ্ট হয়ে গেছে।তাই সুলতানা হায়দার আজ মেয়ের জেদের সঙ্গে তাল দিবেন না বলে জেদ ধরলেন।
নুরুল মর্তুজা আর নাজমুল মর্তুজা দুইভাই বাড়িতে প্রবেশ করতেই তানিশার চিৎকার দিয়ে কান্নার শব্দ শুনে পারলেন। পুরো রাস্তায় তো কেঁদে একটু ক্লান্ত হয়ে থেমেছিলো। বাড়িতে এসে চাচিদের আহ্লাদে পরে আবার সেই কষ্টের কথা মনে হয়ে গেছে উনার। এমন কান্না শুরু করেছে দুই চাচি মিলেও শান্ত করতে পারলেন না। ফাইয়াজ বাইরে গিয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে। ফাদিন ফাহিমকে ততটা মানে না। মাইশা রাইশাকে তো আরও আগে না। তাই আপাতত তানিশাকে সামলানোর জন্য কেউ নেই বাসায়।সুলতানা হায়দারে মাথায় ব্যাথা হয়ে গেছে।তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন ড্রইংরুমের একপাশে। নুরুল মর্তুজা দ্রুত এগিয়ে গেলেন। মানজুম আরার কোল থেকে ছিনিয়ে নিলেন একপ্রকার তানিশাকে। তানিশার নীল হয়ে যাওয়া মুখটায় হাতবুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন -" কি হয়েছে আমার আম্মার? "
তানিশা হিচকি তুলতে তুলতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাই কথা বলতে পারলো না। ক্লান্ত মাথাটা নুরুল মর্তুজার কাঁধে নেতিয়ে দিলো। আসফিয়া বললেন -" একটা স্কুল ব্যাগ পছন্দ হয়েছিল ওর।সুলতানা কিনে দেয়নি। তাই কেঁদে কে*টে এই অবস্থা করেছে।"
নুরুল মর্তুজা সুলতানা হায়দারের সামনে গিয়ে গম্ভীর স্বরে ডাকলেন-" সুলতানা! "
সুলতানা হায়দার নড়েচড়ে বসলেন। জবাব দিলেন -" জ্বী ভাইজান। "
নুরুল মর্তুজা শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন -" ওকে ব্যাগটা কেনে দেওয়া হলো না কেন শুনি?তোমার কাছে কি টাকার স্বল্পতা ছিলো?টাকা লাগলে আমাকে কল করতে? আমি তো সেই রাস্তা দিয়ে আসতাম। "
সুলতানা হায়দার কাচুমাচু করে বললেন-" তেমন কিছু না ভাইজান। "
-" তাহলে কেমন কিছু? "
সুলতানা হায়দার চোখ খিচকে ধরলেন। -"মেজভাই কিনে দিয়েছেন বলে আর কিনে দেয়নি।সবসময় জেদ ধরে। প্রচন্ড জেদি হয়ে উঠছে। "
-" হলে হবে। আমাদের মেয়ে আমাদের কাছে জেদ ধরবে না তো কার কাছে ধরবে? এমনটা করা তোমার উচিত হয়নি সুলতানা। মেয়েটার মুখটা দেখো কেমন কালো হয়ে গেছে। আর এমন করো না আমার কলিজার টুকরোর সাথে। "
সুলতানা হায়দার নত মাথাটা ঝাঁকালেন। -" দুঃখিত ভাইজান। "
-"কি হচ্ছে এখানে?"ফাইয়াজ বাড়িতে প্রবেশ করে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো দেখে জিজ্ঞেস করল। ফাইয়াজকে দেখে তানিশা হাত বাড়িয়ে দিলো বড়ভাইয়ের দিকে। ফাইয়াজ এগিয়ে এসে নিয়ে নিলো তাকে। তানিশার মুখ দেখে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে আমার পাখিটার? কে মেরেছে? "
মানজুম আরা উৎসাহ নিয়ে ঘটনাটা খুলে বললেন। সবকিছু জেনে ফাইয়াজ কোনো বাক্য ব্যায় করলো না। তানিশাকে নিয়ে চলে যেতে যেতে বললো -" আজ কেউ যেনো প্রিন্সেসকে আমার কাছ থেকে নিতে না আসেন। "
সুলতানা দৃষ্টি তুলে তাকালেন। ফাইয়াজ যে তাকেই কথাটা বলে গেছে ঠিক অনুভব করতে পারলেন। নিজের মেয়েটার উপর বেশ হতাশ হলেন। মেয়েটা হয়েছে বাড়ির সবার জান। কিছু বলেও টেকা যায় না।
পরেদিন নুরুল মর্তুজা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে শপিংমলের সামনে গাড়িটা থামাতে বললেন ড্রাইভারকে।নাজমুল মর্তুজা ভাইয়ের মতলব বুঝতে পেরে বললেন -" আহা ভাইজান! বাদ দেন। মেয়েটাও ভুলে গেছে। সুলতানা কিন্তু ঠিক কাজ করেছে। "
-" তুই চুপ থাক। বেশি বকবক করিস। "
নাজমুল মর্তুজা চোখ রাঙিয়ে বললেন -" গাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেই কিন্তু আমি গাড়ি নিয়ে যাবো ভাইজান। "
নুরুল মর্তুজা থুড়াই কেয়ার করলেন। তিনি নেমে গেলেন গাড়ি থেকে । নাজমুল মর্তুজা নিজের কথা মতো গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। নুরুল মর্তুজা তানিশার সেই বর্ণনা অনুযায়ী খুঁজে খুঁজে একটা ব্যাগ ক্রয় করলেন। বাড়িতে একটা সিএনজি নিয়ে ফিরলেন।বাসায় ঢুকতেই মানজুম আরা উনাকে দেখে হেঁসে ফেললেন হু হু করে। নুরুল মর্তুজা ভ্রু উঁচিয়ে ড্রইংরুমের সবাইকে দেখতেই উনার দৃষ্টি সোফায় বসে থাকা তানিশার পানে গেল। তানিশা দুইপাশে এইরকম দুইটা ব্যাগ নিয়ে বসে আছে। নুরুল মর্তুজার হাতে আরেকটা ব্যাগ দেখেই মানজুম আরার হাসি পেয়েছে। নুরুল মর্তুজা এগিয়ে গিয়ে ব্যাগগুলো দেখে মুখ বাকিয়ে বললেন -" এগুলো আবার কে এনেছে? "
আসফিয়া খাতুন বললেন -" একটা সুলতানা এনেছে একটা ফাইয়াজ এনেছে। "
নুরুল মর্তুজা সুলতানা হায়দারকে কিছু বলতে পারলেন না তাই ফাইয়াজেকে বাঁকা স্বরে শুধালেন -" তুই টাকা পেলি কোথায়? "
-"আমার জমানো টাকা থাকে। "
নুরুল মর্তুজার মুখ কালো হয়ে গেল। ছেলেকে হাত খরচ সবসময় উনি বাড়িয়ে দেন। জানেন ফাইয়াজ অযথা খরচ কখন করে না। নিজের জন্য তো নাই। তবে ভাইবোনদের জন্য করতে পছন্দ করে। তাই দেন।এখন সেটা নিয়ে আফসোস করলেন। -" তোমরা আনতে গেলে কেন? আমি তো আনতামই। "
ফাইয়াজ গুমড়া মুখে বলল -" আমরা তো আর জানতাম না।"
নুরুল মর্তুজা নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন -" এসে গেছে তো কি হয়েছে ? একটা মাইশা রাইশা নিয়ে যাবে। "
মাইশা যেন এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিলো। ছু মে*রে একটা নিজের হাতে অন্য আরেকটা রাইশার কোলে ছু*ড়ে মা*রলো। ব্যাগগুলো তার অত্যধিক পছন্দ হয়েছে।
ফাইয়াজের মেজাজ খারাপ হচ্ছে। সে যে পুতুলের ব্যাগটা এনে দিলো তানিশা তা একবার ছুয়েও দেখছে না। সে ফাহিমের এনে দেওয়া ছোট পুতুল ব্যাগটা থেকে রঙিন কলম পেন্সিল বের করে একমনে খাতায় আকুপাকু করে যাচ্ছে। দেখেই অনুধাবন করা যাচ্ছে এইসব ব্যাগ থেকে তার আগ্রহ উঠে গিয়ে ফাহিমের রং পেন্সিলের ব্যাগে গিয়ে জমা হয়েছে। আর ছবি একেঁও পাশে বসা ফাহিমের সাথে ডিসকাশন করছে ছবি আকাঁ হচ্ছে কি না। ফাইয়াজ ভেতরে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেল নিজের অবস্থান ত্যাগ করে। ফাইয়াজ যে তখন অভিমান করে চলে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করেছিল। পরে আর ডিনার টাইমে বের হয়ে এলো। তানিশা সবসময় ওর ডান পাশে বসে আর ফাহিম বাম পাশে। কিন্তু আজ সে ফাইয়াজের চেয়ারে বসেছে। ফাইয়াজকে দিয়েছে নিজের চেয়ারে। ফাইয়াজ চুপচাপ এসে বসে খাওয়া শুরু করল। তানিশা নিজের হাত ভাতগুলো খেয়ে নিয়ে প্রতিদিনের মতো ফাইয়াজকে বললো মাছটুকু বেছে দিতে। ফাইয়াজ খ্যাক করে বলল -" আমাকে বলছিস কেন? তোর আদরের ভাই আছে না? ওকে বল।আমাকে খাওয়ার মধ্যে একদম বিরক্ত করবি না। "
ফাইয়াজের মুখে এহেন কথা শোনে তানিশার মনটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। নাজমুল মর্তুজা গম্ভীর স্বরে বললেন -" ফাইয়াজ, বোনের সঙ্গে উচ্চ স্বরে কথা বলবে না। "
ফাইয়াজ গুমোট হয়ে খাবারে মনোযোগ দিবেই তখন দৃষ্টিতে পরলো ফাহিম তানিশার প্লেট টেনে নিচ্ছে।তা দেখে তড়িৎ গতিতে প্লেট আটকালো। তানিশার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী স্বরে বলল -" দাও। বলভাইয়া দিচ্ছি। "
তানিশা খুশি হয়ে ফাহিমের কাছ থেকে প্লেটটা ছিনিয়ে এনে ফইয়াজকে দিলো। ফাইয়াজ একটা এক্সট্রা ভাব নিয়ে ফাহিমের দিকে তাকাল। যেন চোখে চোখে বলছে। সামান্যতম সময়ে ও তোমার কাছে গেলেও। ঘুরে ফিরে আমার কাছেই আসবে।
চলবে........
-" কেন?"
নাহিদ মর্তুজা হাসলেন। জিজ্ঞেস করলেন -" আচ্ছা বলো তো তুমি আমার কে? "
-" তোমার মেয়ে। "
-" হুম। এটাই। তুমি আমার মেয়ে। আর আমার সব আমার মেয়ের জন্যই। সে খাবে কি ফেলে দিবে সেটা সে ভালো জানবে।তুমি যদি আমার সবকিছু চাইতে তাহলে তোমার আব্বু সবকিছু দিতেও প্রস্তুত।যদি জীবনটাও..."
তানিশা কথা থামিয়ে দিলো। -" আব্বু টাকাটা আমার এখনই দরকার। এই মূহুর্তে। তুমি একটু তাড়াতাড়ি দিও। আমি এখন রাখছি। "
নাহিদ মর্তুজা নিষ্প্রাণ নয়নে চেয়ে থাকলেন হাতের মুঠোয় আগলে রাখা ফোনটায়।খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর তানিশা শপে ফিরে গেল। জোহান ওকে দেখে হাস্যরস স্বরে বলল -" আমি তো ভাবলাম আমাকে বুঝি ভুলেই গেছো। "
তানিশা মুখ ঝামটি দিয়ে বলল -" তুমি বেশি কথা বলো। চুপ থাকো।"
জোহানের মুখ বিস্ময়ে থ হয়ে গেল। ঠোঁট গোল করে 'ওওও' করে শব্দ করে। তানিশা একবার তীর্যক দৃষ্টিতে ওর পানে চেয়ে বিলটা পে করে দিয়ে আসলো।জোহান তানিশার পিছু পিছু এসে বললো -" তুমি টাকাগুলো চুরি করে নিয়ে এসেছো? না হলে তোমার ভাবভঙ্গি এমন কেন? "
তানিশা পা থামিয়ে দিলো। জোহানের মুখ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেল। তানিশা ওর পানে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে। কথাটা কি ওর খারাপ লাগলো। কিন্তু তানিশা ওকে দ্বিধা ফেলে দিয়ে বলে উঠলো -" তোমার হাতের শপিং ব্যাগটা মেলে ধরো। "
-" কেন? "
-" যেটা বলেছি ওটা করো না বাবা। "
-" আচ্ছা "বলে জোহান ব্যাগ মেলে ধরল। তানিশা স্বর্ণের ব্যাগটা ঠেলেঠুলে ওটায় ঢুকালো -" বিষয়টা সিক্রেট। তুমি যদি কাউকে বলেছো। "
কথাটা শেষ না করেই তানিশা শাসিয়ে চাইল জোহানের চোখে। জোহান মেকি ভয় পাবার ভান করে বললো -" না না আমি বলবো না। "
জোহানের ফর্সা মুখটা আস্তে আস্তে লাল বর্ণ ধারণ করছে। এই এসির মধ্যেও ছেলেটা কুল কুল করে ঘামছে।ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। তানিশা বিরক্ত হয়ে পার্স ব্যাগটা থেকে টিস্যু বের করে ওর কপাল ছুঁতে চাইল। জোহান সেটা নিজের হাগে নিয়ে নিলো। জোহান মৃদু হেসে বলল -" এসব করতে হবে না প্রিন্সেস। আমি তো আর বাচ্চা নই।"
তানিশা চোখ পাকিয়ে বলল-" তাহলে তুমি যখন করো তখন কি আমি বাচ্চা থাকি?"
জোহান মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-" বিকজ ইউ’আর আ প্রিন্সেস।"
ততক্ষণে মেঘ এসে তাদের পাশে দাঁড়াল। জোহানকে টিটকারি মে*রে বললো -" ওহহহ তাই? আমরা জানতাম না। তুমি বললে বলে জানলাম। "
জোহান মেঘকে দেখে হাসোজ্জল মুখে বলল -" আরে ক্লাউড! কোথায় ছিলে? তোমাকে মিস করছিলাম। "
মেঘের মুখ কুঁচকে গেলো। উল্লুকটা এমন ভাবে ওর সঙ্গে কথা বলে যে শোনে জোহানকে তার অন্য কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে। -" নো নিড ইউ মিস'স।তানিশা চলো শপিং করবে না? "
তানিশা নিজের একহাত তুলে পাঁচ আঙুল দেখালো।মেঘ না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস -" কি?"
-"পাঁচটা ড্রেস হয়ে যাবে আমার। ফাইয়াজ ভাই একটা, আম্মু একটা, মেজো আম্মু একটা, ইয়াসির ভাই একটা এবং বড়বাবা একটা। তারউপর আমার নিজের ও এমন কয়েকটা শাড়ি আছে যা না পরেই নিয়ে যেতে হবে। "
-"তাই বলে যাবে না? সবাই তোমাকে কত খুঁজেছে। "
-"হুম।এখনই যেতাম। জোহান চলো। সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। "
-" ও থাকলে থাক তুমি চলো। "
-" ও কেন থাকতে যাবে? আমার সঙ্গেই যাবে? "
-" ওকে কেন সবসময় তোমার সাথে যেতে হবে? "
তানিশা বেশ কঠোর দৃষ্টিতে মেঘের পানে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো -" মেঘ ভাইয়া আপনার কি মনে হয় না আেনি বেশি করছেন?"
মেঘ তানিশার এমন কথা আর এমন দৃষ্টি দেখে ব্যাথিত হলো। মেয়েটা তার সাথে এমন ভাবে কথা বলবে সে কল্পনা করেনি । মেঘ স্মিথ স্বরে শুধালো -" কোন বিষয়ে? "
-"তা নিশ্চয়ই আমাকে খুলে বলতে হবে না।আমি কোন বিষয়ে কথা বলছি। আপনি আমার পার্সোনাল লাইফ থেকে দূরে থাকেন। "
মেঘের মস্তিষ্ক শব্দ শূন্য হয়ে গেল। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো। তানিশার পানে। যাকে ঘিরেই তার ব্যক্তিগত জীবন সেই বলছে তার ব্যক্তিগত জীবন থেকে দূর থাকতে!
তানিশার ভেতরে ভেতরে খারাপ লাগলো। হুটহাট সে এমন কাজ করে বসে যে অন্যকে কষ্ট দিয়ে ফেলে।তবে কিছু করার নেই। সে প্রাপ্ত বয়স্ক একজন যুবতী। একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষ তার জন্য কেমন অনুভূতি পোষণ করছে তা অনুভব করতে পারে। মেঘে এমন কর্মকান্ড তার কাটা গায়ে লবন ছিটানোর মতো।বারণ করতে গিয়েও থেমে যায় বারবার। কাউকে কষ্ট দিতে তার বুক কাপে। তানিশা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জোহানকে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলো। মেঘ স্তব্ধ, ব্যাথিত মন নিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো।
**********
শপিং শেষ করতে করতে সন্ধ্যা পাড় হয়ে গেছে।সবাই এখন একটা রেস্টুরেন্টে এসে বসেছেন। রেস্টুরেন্টটা রুমটফ। রুমটফ হওয়ায় মনোরম পরিবেশ উপভোগ করা যাচ্ছে।আকাশে আজ মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। শহর জুড়ে রূপালী আলোর বিস্তার। ষোল তলা বিল্ডিংয়ের উপর রেস্টুরেন্টটা। মনে হয় টুপ করে বুঝি চাঁদটা ছোয়া যাবে। শীতল বাতাস মনকে করছে আরোও আবেশিত। রেস্টুরেন্টের পুরো একপাশ ফাইয়াজরাই জুড়ে বসেছে। বড় একটা টেবিল জুড়ে মুরব্বি মুনসিরা বসেছেন। সেই কাথারে আইরা, রাইশাও পরে গেছে। শশুড় শাশুড়ীদের মধ্যে খানিতে নিজেদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বসেছে। ইয়াং জেনারেশন আরেকটা বড় টেবিন জুড়ে বসেছে। জুথির স্বামী লায়েক এসেও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ওই টেবিলে একটু হলেও কম হইহট্টগোল। এই টেবিলে আর টেবিলের জায়গায় থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে এই কোলাহলে মেঘের কোনোরকমে খেয়াল নেই। তার সব প্রকার ধ্যান পাশের টেবিলে স্নিগ্ধ মুখটার পানে। সুলতানা হায়দারের পাশে বসে কি সব নিয়ে কথা বলছে। মেঘ শুনতে পেলো না। তার বড্ড ইচ্ছে হলো তানিশা হাত নেড়ে নেড়ে কি এমন গল্প করছে তা শোনতে।মেয়েটা তাকে ওই কথাটা তখন বললেও মেঘের তা এখন আর গায়ে লাগছে না । সে লাগাবেও না। বয়ে গেছে তার মেয়েটার ব্যক্তিগত জীবন থেকে দূরে থাকতে।সে থাকবে না দূরে। দেখবে মেয়েটা কি করে?
ফাদিন অনেক্ক্ষণ চেঁচিয়ে কথা বলে একটু থামলো। হঠাৎ আকাশের মধ্যেখানিতে থাকা তালার মতো চাঁদটা দেখে চেয়ারের পিছনে চেয়ে মানজুম আরাকে ডাকলো। -" আম্মু ও আম্মু। "
মানজুম আরা ওপর টেবিল থেকে খ্যাক করে উঠলেন -" কি হয়েছে? "
ফাদিন হাতটা উপরে দিকে তুলে মানজুম আরার দিকে দৃষ্টি রেখেই চেঁচিয়ে বললো -" আম্মু দেখো তোমার ভাই, তোমারই ভাই।মামা, মামা। "
মানজুম আরা ফাদিনের দুষ্টুমি ধরতে পারলেন না। তিনি হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাড়ালেন চেয়ার থেকে।হাপুস নয়নে ছাঁদের আশপাশ দেখে অস্থির ভঙ্গিতে বললেন -" কই? ভাইজান কই? "
ফাদিন মায়ের উতলা হওয়া দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পরলো। ফাদিনের হাসি দেখে মানজুম আরার বোধগম্য হলো উনার ছেলে ওনার সাথে খুব বাজে একটা মশকরা করেছে। রাইশা হেসে বললো -" মেজোমা মামা আসেননি। তোমার ছেলে চাঁদমামাকে দেখে বলেছে।"
মানজুম রাগে লাল হয়ে নাজমুল মর্তুজাকে বললেন-" তুমি কিছু বলবে এই বেয়াদবটাকে? "
নাজমুল মর্তুজা কেয়ার করলেন না। উনার ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে মানজুম আরা বিরবির বললেন -" বাপ বেটার জ্বালায় বাঁচি না। এতো পাতলা স্বভাবের ছেলে আমার কি করে হলো আল্লাহ জানেন। "
তানিশা মৃদু হেসে ওপর পাশের টেবিলে তাকাতেই মেঘর সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তানিশা বেশ বিরক্ত হলো মেঘের পলকহীন চাহনিতে। মেঘ তার দৃষ্টি সংযত করছে না বলে নিজেই দৃষ্টি সড়িয়ে নিল।
*******
তানিশা কাঁথাটুকু একটু ফাঁক করে ফুস করে একটা শ্বাস ফেললো।শপিং থেকে আসার পর থেকেই শরীরটা খারাপ করেছে তার। কোনো রকম ফ্রেশ হয়ে এসে ঝাপ দিয়ে শুয়েছে।জ্বরে আগমন ঘটছে ঝুপ দিয়ে। একটু আগে একটু ঠান্ডা লাগায় কাঁথা দিয়ে ঝাপ দিয়ে শুয়েছিল।এখন আবার হাসফাস লাগছে।মাইশা হুট করে এসে ঢুকলো রুমে তার হাতে শপিং ব্যাগ কয়েকটা। মাইশা তানিশাকে বললো-" এগুলো তোর। "
তানিশা ফিরেও তাকাল না। ক্ষীণ স্বরে শুধু বলল-" রেখে যাও পরে দেখবো। "
মাইশা দাঁড়িয়ে ইতিউতি করে শুধালো -" তোকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি? "
তানিশা বিরক্তি প্রকাশ করে বলল -" আপু, এসব কথা বলতে এখন আমার একটুও ইচ্ছে নেই।তুমি যাও। "
মাইশার মন ব্যাথিত হলো খুব। তবুও কিছু না বলে চলে গেল। তানিশা একা একি রয়ে গেল।
চলবে..........
-" সময় করে চলে যাস। তোকে কে মানা করেছে? "
-" না থাক। তুমি এতোগুলা শপিং করলে। এখান থেকে একটা চুজ করে নিয়ে নেই। "
মেঘ আঁতকে উঠল। ঝাড়ন দিয়ে হিমালয়ের বাড়িয়ে দেওয়া হাত সরিয়ে নিলো ব্যাগগুলোর থেকে। -" একদম নজর দিবি না বললাম। "
-" আরে একটাই তো নিবো। তোমার চয়েজ ভালো।একটা নেই?"
-" হাত কে*টে রেখে দিবো। যদি এইগুলোর দিকে হাত বাড়াস। দরকার হলে তোকে কাল ছুটি দিবো। শপিং যাস। পুরো শপিংমল কিনে আনিস।তবুও এইগুলোর দিকে হাত বাড়াবি না।"
হিমালয় ধপ করে বিছানায় মেঘের পাশে বসলো। -" এতো হাড় কিপ্টে হলে কবে থেকে শুনি? "
-" হাড় কিপ্টে হলে, হ্যা আমি হাড় কিপ্টেই।তবুও দিচ্ছি না। "
-" কেন? ভাবি কিনে দিয়েছেন?"
মেঘ হিমালয় কথা দুরুক্তি করলো না। কিন্তু কাজ করতে করতে তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি রেখা ফুটলো। মেঘকে লাগেজ গুছাতে দেখে হিমালয় জিজ্ঞেস করল -" তা যাচ্ছো কোথায়? বিজনেস ট্যুর তো নেই ইদানীং। "
-" মাইশার বিয়েতে যাবো তাই।"
-" তা তো চার দিনের মতো বাকি। এতো তাড়াহুড়োর কি?তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে এখনিই রওনা হবে। "
-" সকালে রওয়না হবো। "
হিমালয় যেন বিষম খেলো। আশ্চর্যান্বিত স্বরে শুধালো -" কি বললছো এসব? আমি কি সত্যি শোনছি? "
মেঘ বিরক্তি মুখে হিমালয়ের মুখোমুখি হলো। টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে বললো-" হ্যা, আপনি সত্যি শুনছেন। এটা নিয়ে বেশি ঢং করলে আছাড় মারবো তোকে হিমু। "
হিমালয় একটু ঢং করে নিজের বুক চেপে ধরল।অবিশ্বাস্য সুরে শুধালো -"এইদিন আমি কিভাবে দেখলাম?যেই ছেলে কারো বাসায় গিয়ে একরাত থাকতেও অশান্তি অস্থিরতায় পাগল হয়ে যায়। সে এখন বন্ধু বিয়েতে একসপ্তাহ আগে চলে যাচ্ছে। "
মেঘ চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চাপলো। কিড়মিড় করে বলল -" হিমু! বেশি হয়ে যাচ্ছে। যা এখান থেকে। "
ভাইয়ের রাগি মুখশ্রী দেখে দুষ্টু হাসলো হিমালয় । -" মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে উঠে দাড়াল। যেতে যেতে বললো -" সমস্যা না যাও।তবে অফিসে এসো। আর একটা কথা।"
মেঘ পিছন ফিরে তাকাল হিমালয়ের পানে। হিমালয় চোখ মেরে বললো -" আমি কিন্তু সব জানি। সবই বুঝি।"
-"তাতে আমার কি? "খুব শান্ত কন্ঠে জবাব দিয়ে মেঘ নিরুৎসাহিত ভাবে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো পূনরায়। হিমালয় ভাইয়ের নিরুত্তাপ ভাবভঙ্গি দেখে চলে গেল। মেঘ লাগেজে কাপড় গুছিয়ে রাখছিল। হঠাৎ একটা শার্ট হাতের মুঠোয় কুঁচকে ধরল।কারো চেহারা অক্ষিপটে ভাসতেই মুখ বাকালো। বিরবিরয়ে বললো-" তোমার ব্যক্তিগত জীবনের নিকুচি করি আমি। দূরে কিভাবে রাখো আমিও দেখবো। হুহ! ন্যাকা।আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে দূরে থাকুন। "
**********
আইরা ব্রেডে জ্যাম লাগিয়ে আরিয়ার সামনে রাখলো। আরিয়া টুক টুক করে ফোন দেখেই যাচ্ছে কখন থেকে। আইরার মেজাজ তিরিক্ষি হলো। এই মেয়েটা দিন দিন বেয়াদব হচ্ছে। আইরা গম্ভীর স্বরে ডাকলো -" আরিয়া!"
আরিয়ার হাত কেঁপে উঠলো। তড়িঘড়ি করে ফোনটা টেবিলের উপর রেখে বড়বোনের পানে তাকাল।আইরা যেন থাকে ভস্ম করে দিবে এমন ভাবে তাকাচ্ছে। আরিয়া শুষ্ক ঢোক গিললো। কালই মাইশা আপুর বিয়ের উপলক্ষে সে বড়আপু বাসায় এসেছে। এখন ফোনটা হাতে নিয়ে ভুলেই বসেছিল যে পাশে বড়আপু আছে। আরিয়া স্মিথ স্বরে -"সরি " বললো।
আইরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। মেয়েটা বিগড়ে যাচ্ছে। ওকে বিয়ে দিয়ে মা বাবা এই মেয়েটাকে মাথায় তুলে রাখছেন। ওর বোন হয়েও মামাতো বোন বন্যার মতো ন্যাকা কেমন করে হলো? আল্লাহ জানেন। আইরা কিছু বলতেও পারেনা। নিজেই পেলেপুষে যে বড় করেছে।আদর করে তাই একটু বেশি। হটাৎ কলিং বেল বাজতে আইরা আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো আশেপাশে কেউ তেমন নেই। তাই নিজেই উঠে দাড়াল। দরজাটা খুলে টিপটাপ মেঘকে দেখে বিমোহিত হাসলো। -" কি রে?এতো ফিটবাবু হয়ে সক্কাল সক্কাল? ভেতরে আয়। "
-"না ভেতরে আসবো না। অফিসে যাবো। শুধু এটা রাখতে আসলাম। "বলে মেঘ তার আড়াল থেকে লাগেজটা টেনে এনে আইরার সামনে। আইরা লাগেজ দেখে বললো -" এটা কার?"
-"আমারই।অফিস থেকে এখানে এসে উঠবো। এখন এটাকে নিয়ে রাখো তো। আমি যাই। "
আইরা মৃদু হেসে বলল -" বেড়াতে এলে মানুষ এভাবে আসে বুঝি?সারাটি দিন তো অফিসেই কাটিয়ে দিবি। "
মেঘ নির্বিকার চিত্তে জবাব দিলো -" তা হউক যেভাবেই।এখানে এসে যদি মাথাটা রাখতে পারি তাহলেই হলো।তা মাইশা কোথায়?"
-"মাইশা ছাঁদে। "
মেঘ ফির প্রশ্ন করলো -" আর ছোটটা?"
-" এখনও ঘুমে।"
মেঘ মুখ বাকিয়ে বলল -" নবাব!"
আইরা শুধরে দিলো -" হু হুম।রাজকুমারী।"
-" আচ্ছা তাহলে এখন যাই।তুমি এটাকে নিয়ে যাও।"
আইরা অবিশ্বাস্য স্বরে শুধালো -" যাই মানে কি? ভেতরে আয়। সকালের নাস্তা করে যা। "
-" বাড়িতে করে এসেছি। " কথাটা বলে মেঘ পা বাড়ালো। কিন্তু আকষ্মিক মেঘের কানে চিরপরিচিত একটা স্বর এসে ধাক্কা খেলো। মেঘ দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘরের ভিতরে দেখলো একটা একুশ বাইশ বছরের বয়সী মেয়ে " ভাইয়াআআ "বলে চেঁচিয়ে তার দিকে অগ্রসর হয়েছে। মেঘ আইরার পানে তাকিয়ে বললো -" এই প্রডাক্ট এখানে আমার আগেই এসে গেল? "
আইরা আরিয়ার পানে তাকিয়ে হেসে বললো-" কাল সন্ধ্যায় এসেছে। "
আরিয়া দৌড়ে এসে মেঘকে ঝাপটে ধরতে চাইল। তার আগেই মেঘ ওর পুরো মুখশ্রী নিজের হাতের পাতায় আবদ্ধ করে। এক হাত দূরেই আটকে রাখলো।-" দূরে থাক ব্যাকটেরিয়া। আমি স্নান করে এসেছি।এখন ময়লা আবর্জনা ছুঁতে চাই না। "
আরিয়া দুহাত দিয়ে মেঘের হাত নিজের চেহারা থেকে সরাল।আরিয়া ন্যাকা স্বরে বলল -" তুমি আমাকে এভাবে বলতে পারলে? কতদিন পর দেখা হলো তাও? "
মেঘ চোখ উল্টে আরিয়াকে ব্যাঙ্গিয়ে বলল-" হ্যা, আমি আপনার সাথে এটা করতে পারলাম। ভালো হয়েছে মানুষের বোনের বিয়ে মানুষ আমাদের বাড়ির পাশে দিয়েছে। নাহলে তো প্রতিবার মুখ উঠিয়ে আমাদের বাড়ি এসে যেতেন। "
আইরা মৃদু হেসে বলল -" রাগ করিস কেন? বিয়ের অনুষ্ঠান পরে তোদের বাসায় পাঠাবো পিঠিয়ে। "
-" হ্যা। এখান থেকে তোমাদের বাসায়ই তো যাবো। "
মেঘ মুখ বাঁকিয়ে বললো -" হয়েছে। আর বকবক করতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি আপনাদের মেম। এখন যাই। সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে। "
আইরা মাথা ঝাঁকাল। আরিয়া না বুঝে পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো -" আরে!চলে যাচ্ছো কেন? আরেকটু থাকো। আমিও তো আছি৷ "মেঘ পিছন ফিরে হাত দিয়ে না করলো। সে এখন আসবে না। আরিয়ার মন খারাপ হলো। আইরা ওর মাথায় চাটি দিয়ে বললো -" শুনিস নি কি বললো? সন্ধ্যায় আসবে। লাগেজ রেখে গেছে এই দেখ। "
আরিয়া লাগেজের পানে চেয়ে মাথা চুলকে বলল -" ওহহ। তা তো আগে বলবে। আমি বেকার চেঁচালাম। এখন যাই, এই লাগেজটা রেখে আসি। ভাই তো আমারই।"
********
দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বাড়িতে বাড়িঘর সাজানোর লোক এসে কাজে লেগেছে। বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আরও তিন বাকি। এখন শুধু বাড়ি সাজিয়ে দিয়ে যাবে। দুদিন পর এসে গায় হলুদের প্যান্ডেল সাজাবে। মানজুম আরা রুষ্ট হয়ে মনে মনে কাজের লোকগুলোকে গালি দিলেন। কড়াইয়ে পিঁয়াজ দিয়ে তা নাড়লেন বিরক্ত মুখে। আজ পুরো সকাল থেকে সুযোগ খুঁজছেন। কিন্তু কোনো ভাবেই রান্নাঘর থেকে বের হতে পারছেন না। আর ওইদিক নবাব জাদী নিচে এসে নিজে পায়ের ধুলো ফেলছেন না। পিঁয়াজ একটু লাল লাল হতে শুরু করতেই সবজিগুলো ঢেলে দিলেন। খুন্তি দিয়ে নেড়েচেড়ে দিচ্ছেন।উনার চেহারার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝাই যাচ্ছে তিনি বেশ রুষ্ট, অতিষ্ঠ। আসফিয়া খাতুন রান্নাঘরে এসে এমন পরিবেশ দেখে ইশারায় সুলতানা হায়দারকে জিজ্ঞেস করলেন। কি হয়েছে বলতে। সুলতানা হায়দার ইশারায় বুঝালেন তিনিও জানেন না। রান্নাঘরে টুকটাক আওয়াজ হচ্ছে কাজের। নাহলে পুরো থমথমে অবস্থা। আইরা আড়চোখে তাকাল হাফসা আপার পানে। চেহারা উনার মেঘে ঢাকা।বিয়ে উপলক্ষে নতুন কাজের মেয়ে রেখেছেন আসফিয়া। আর সেই মেয়েটা বলার আগে আগেই কাজ করছে। উনার তা অসহ্য লাগছে। আরেকটা বিষয় হলো ভয়। উনার ভয় করছে ওই মেয়ের কাজ দেখে যদি আম্মারা উনাকে বিদায় করে দিয়ে মেয়েটাকে রেখে দেয়। এসব ভাবতেই উনার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসে। একজীবন তিনি এখানে কাজ করছেন। কি মায়া সবার জন্য! এখন এসব ছেড়ে যাবেন কিভাবে? এসব ভাবতেই হাতের বাসনটা ঠাস করে রাখলেন। ঠিক সেই সময় মানজুম আরাও নিজের হাত থেকে খুন্তিটা রাখলেন শব্দ করে। একসঙ্গে এমন দুটি কাজ হওয়ার ফলে শব্দের বিস্ফোরণ হলো যেন। বাকি চার রমনী রাগান্বিত দুই রমনী পানে তাকালেন। মানজুম আরা ফুস করে একটা শ্বাস ফেলে আইরাকে ডাকলেন -" আইরা! "
আইরা আমতা আমতা করে জবাব দিলো -"জ্বি মেজোআম্মু?"
-"সবজিটা একটু দেখো তো। আমার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। "
আইরা আসার আগে নতুন কাজের মেয়ে জরিনা এগিয়ে এলো। -" দেন আম্মা, আমি করছি । "
মানজুম আরা অতিষ্ঠ হয়ে বললেন -" তোমাকে ডেকেছি আমি? যাও হাতের কাজ করো গিয়ে।অতিরিক্ত! এই আইরা তুমি দেখো। "
জরিনার মুখটা কাচুমাচু হয়ে গেল। আইরা নিজে এগিয়ে এলো। মানজুম আরা হাতটা ধোঁয়ে রান্নাঘরের থাক থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিলেন। রওয়ানা হলেন তানিশার রুমের দিকে।
তানিশা মাত্রই গোসল সেরে এসেছে। কাঁধ সমান চুল ভেজার ফলে আরেকটু নিচে নেমেছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হাতে পায়ে লোশন দিলো ধীরস্থিরে। মুখে ক্রিম মেখে একটু রূপচর্চা করে উঠলো।উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিলো বাইরে। মরিচবাতি লাগানো হচ্ছে পুরো বাড়িতে। ছাঁদের উপর থেকে লোকগুলো মরিচবাতির লাইনগুলো নিচে ফেলছে।জোহানকেও দেখা গেলো গার্ডেনে।।কত করে বললো তোফায়েলের সঙ্গে ঘুরে আসতে। ছেলেটা গেলো না। তানিশা জানালার পাশের মরিচবাতির লাইনটা ধরল।ছোট ছোট লাইটগুলো ঝিলমিল করে জ্বলে কি যে ভালো লাগে দেখতে। শেষবার যখন বাড়িটা এমন সাজে সজ্জিত হয়েছিল তখন সে কত বাচ্চা স্বভাবেরই না ছিলো। ফাইয়াজের বউভাত ছিলো। খুশিতে পুরো বাড়ি টই টই করে ঘুরেছিলো।তানিশা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জানালায় পর্দা টেনে দিলো। শুকনো একটা টাওয়াল বালিশের উপর বিছিয়ে দিলো।বালিশে মাথাটা ঠেকাতেই যাবে তখন মানজুম আরা ওর রুমে এলেন। দেখে মনে হচ্ছে তিনি বেশ তাড়ায় আছেন। এসেই তানিশার গা ঘেঁষে বসলেন। তানিশা জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে মেজোমা? "
-" কি হবে? কিছুই না।তবে তোর জন্য নিচে অপেক্ষা করতে করতে আমার ধৈর্য আর কুলায়নি।তাই চলে এলাম। "
-" হুমম।একটু মাথা ব্যাথা করছে তো তাই যেতে পারিনি।তুমি এসে গেছো, তাহলে বলেই দাও।কি বলবে?"
মানজুম আরা চিন্তিত স্বরে শুধালেন -" পরে বলবো। আগে তুই বল মাথা ব্যাথা যে সেটা তো কাউকে দিয়ে খবর পাঠালি না ! আর এখন কি শুতে যাচ্ছিলি? " বালিশের পানে ইঙ্গিত করে বললেন।
-" হ্যা। "
-" পাগল নাকি তুই? ভেজা চুল নিয়ে ঘুমালে আরও মাথা ব্যাথা করবে। চুল থেকে এখনও পানি পরছে। দে টাওয়ালটা আমার হাতে। আমি মুছে দিচ্ছি।এইটুকু চুল শুকাতে আর কত সময় লাগে। চুল শুকিয়ে শুবি না? "
তানিশা টাওয়ালটা মানজুম আরাকে দিয়ে উনার দিকে পিঠ দিয়ে বসলো। -" তোর শরীর গরম কেন?"
তানিশা কথা কাটিয়ে জবাব দিলো -" তুমি কি যে বলতে আসলে? বলো। "
মানজুম আরার সংবিৎ ফিরলো। ফোনটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষন ঘাটাঘাটি করে তানিশার সামনে ধরলেন। -" এদের দেখতো কেমন? সবার আগে তোকে জিজ্ঞেস করবো বলে আমি হাপুস নয়নে চেয়েছিলাম।"
তানিশা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো কয়েকটা মেয়ের ছবি। তানিশা বোকার মতো প্রশ্ন করলো -" এরা কারা? "
মানজুম আরা ফিসফিসয়ে বললেন -" ফাদিনের জন্য মেয়ে খুঁজতে বলেছিলাম আমার এক বোনকে। বুঝলি? আজ ঘটকের কাছ থেকে নিয়ে কয়েকটা মেয়ের ছবি পাঠিয়েছে। "
তানিশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -" ফাদিন ভাইয়ের জন্য? "
-" হ্যা।বয়স তো আর কম হলো না। বিয়ে দিতে হবে না। বিয়ে দিলে একটু যদি সিরিয়াস হয়। তোকে বললাম ফাইয়াজের মতো এর কিছু-মিছু আছে কিনা দেখতে। তোর তো খবরই নেই। "
তানিশা ফোনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে জবাব দিলো -" নেই। "
মানজুম আরা কৌতূহলী হয়ে বললেন -" কিভাবে জানলি? "
তানিশা নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বললো- " যে ছেলেগুলো এসবে সায় দেয়, সেই ছেলেগুলো আবার এসব করে না। তোমার এই ছেলে এসব করবে না। "
-" হ্যা তোরে কইছে। ফালতু কথা। এবাড়ির মেয়েগুলোর কত সুন্দর বিয়ে হচ্ছে আর ছেলেগুলোর অবস্থা যাচ্ছে তাই। ফাইয়াজের বিয়েটা তো সেই করিয়ে দিয়ে ছাড়লো। এখন নিজেরটা না করে বসে। আমার আর শাশুড়ী সেজে রঙঢঙ করে যাওয়া হবে না পরে। "
তানিশা হেসে ফেললো তার মেজোমার বাচ্চামো কথা শুনে। -" তুমি এই জন্য এতো অস্থির? "
মানজুম আরা গাল ফুলিয়ে বললেন -" তা নয়তো কি? তারউপর আইরাটাকে কিভাবে যে তোদের মতো পেয়ে গেলো।ফাইয়াজ চালাক আছে। আমারটা তো বোকার বোকা। তোদের মতো একটা মেয়ে আনবে। তা না দেখা যাবে কোন রাক্ষসী নিয়ে আসছে। হয়েছো তো বাপের মতো। "
তানিশা ফিঁচকে হেসে শুধালো -"তাহলে স্বীকার করছো তুমি একটা রাক্ষসী। "
মানজুম আরা মেকি রাগ দেখিয়ে বললেন দিবো একটা ফাজিল কোথা কার। তানিশা হেসে গড়িয়ে পরল বিছানায়।নাজমুল মর্তুজা আর মানজুম আরার বিয়েটা ছিল পালিয়ে বিয়ে। তানিশার দাদি কোনো ভাবেই এটা মানতে পারছিলেন না। উনার এতো জ্ঞানী ছেলেটা এমন কাজ করেছে। ফাইয়াজের বেলায়ও তেমন। ফাইয়াজের আর আইরার বিয়ে হয়েছিল পালিয়ে। তবে একটু ভিন্ন। ভীষণ চমকপ্রদ!
তখন তানিশার এইচএসসি পরীক্ষা মাত্র শেষ হয়েছে। ছুটি কাটাচ্ছিলো জ্বরেকে সাথে নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। পরীক্ষার চিন্তা ওকে বেশ চিন্তিত করে রাখতো। পরীক্ষার দেওয়া সময়টাও প্রায়ই জ্বর ছিলো তানিশার। তো একদিন বিকেলে মাইশা এসে ভোতা মুখে ওর পাশে এসে বসলো।তানিশা তখন জ্বরে ঘোরে বিছানায় লেপ্টে। তবুও বোনের এমন ভাবভঙ্গি দেখে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে আপু?"
মাইশা কিছু না বলে খানিক্ষণ চুপটি করে বসে থাকলো। তানিশা দৃষ্টি মাইশাতেই আবদ্ধ ।হঠাৎ মাইশার চোখ বেয়ে উষ্ণ অশ্রু পরতে দেখে। তানিশা বিচলিত হয়ে উঠে দাড়াল।এই জল্লাদ মেয়েটা কাঁদতে দেখেনি কখনও।সে আজ কাঁদছে। এ যে অষ্টম আশ্চর্য । -" কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন? "
মাইশা মাথা ঝাঁকাল। -" আমার কিছু হয়নি। তবে।"
তানিশা অস্থির ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল -" তবে কি?"
মাইশা তানিশার পানে ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে বললো -" বড় ভাইয়া অনেক কষ্টে হচ্ছে রে। উনার কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না। মন চাইছে দুনিয়া ফুরে এনে ভাইয়া যায় চায় তাই এনে দেই। "
তানিশা এবার দ্বিগুন উত্তলা হয়ে বললো -" কি হয়েছে বড়ভাইয়ার? "
মাইশা আহাজারি করে বললো -" তানিশারে আইরা মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কাল।ভাইয়া কিছুই করতে পারছে না। ভাইয়ার জন্য আমার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে। "
মাইশার কথাগুলো তানিশার কর্ণকুহরে পৌছাতেই তানিশা স্তব্ধ হতবাক হয়ে থম মেরে গেলো।বুকটা তার মুচড়ে ধরলো বরভাইয়ার এহেন বিপর্যয় শুনে।
চলবে.........
ফাইয়াজ মাথা তুলে বললো -" তোমরা যা ভালো মনে করো, করো। "
ফাইয়াজের স্বীকারোক্তি পেয়ে মাইশা তানিশা চেচিয়ে উঠলো। ফারহান দিলো এক ধমক -" চুপ। একদম চুপ। এখন সবাইকে জানিয়ে ঘেটে ঘ করে দিবি। "
মাইশা তানিশা চুপ হয়ে গেলো। ফাদিন ফাইয়াজকে নিয়ে বের হয়ে এলো। ফাহিমকে বললো -" তোরা যা আমি ওই ঘর কোণোটাকে নিয়ে আসি। "
মাইশা 'আচ্ছা ' বলে রওনা হয়ে যাচ্ছিল।ফাদিন ওকে পিছন থেকে আটকে ফেললো -" এই চুন্নি তুই কোথায় যাচ্ছিস? "
-" কেন? আমি যাবো না? "
-" না। আমরা ছেলেরা যাবো শুধু। "
মাইশা অবিশ্বাস্য স্বরে বলল -" অসম্ভব! আমি তো যাবোই যাবো। আমাকে না নিলে খবর হয়ে যাবে বললাম। "
ফাদিন বললো -" আচ্ছা তাহলে তুই চল। তানিশা বাড়িতে থাকুক।ওর তো জ্বর। "
তানিশা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেললো। তার বড় ভাইয়ের বিয়ে আর সে যাবে না!তানিশা পিছনে ফিরে দিলো দৌড় নিজের রুমের দিকে। ফাদিন ফাহিমকে টেনে চিলেকোঠার ঘর থেকে নিয়ে আসতে আসতে তানিশা মোটা একটা কম্বল নিয়ে এলো গায়ে জড়িয়ে। ফাহিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -" তুই এই অবস্থায় যাবি?"
ফাইয়াজ বলল-" থাক। ওকে কিছু বলিস না। "
বাড়ির সবগুলো ছেলেপেলেদের একসঙ্গে বাইরে যেতে দেখে আসফিয়া জিজ্ঞেস করলেন -" এই তোমরা সবকটা কোথায় যাচ্ছো।"
সবাই একসাথে বললে উঠলো -" ঘুরতে। "
তানিশাকে দেখে মানজুম আরা বললেন -" এভাবে যাবি? ভালো একটা চাদর নিয়ে যা।এই কম্বলটা রাখ।"
মাইশা তড়িঘড়ি করে তানিশার কম্বলটা সামলে নিজের হাতে নিলো। -" এটাতেই হবে।এই সবাই চলো দেড়ি হয়ে যাচ্ছে। "
সবাই সায় দিয়ে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসলো। সবাই উত্তেজিত হলেও ফাইয়াজ নির্বিকার। যা হবার শুধু হতে দিচ্ছে। এতে যদি কিছু হয় তাহলে তো হলো। নাহলে কিছু করার নেই।
******
তানিশা একবার বাইরে থাকালো। তারা সবাই আইরার বাড়ির সামনে এসে দাড়িয়েছে। সবাই গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে। শুধু ফাদিন বের হয়ে গেছে। আইরা কল ধরছে না। এই চিন্তায় কারো কিছু ভালো লাগছে না। আর ফাহিম বেশ বিরক্ত এসব আজাইরা কাজ কারবারে। সব থেকে বিরক্ত সে মাইশার উপর। মাইশা কনেকে অজ্ঞান করে নিয়ে যাবে বলে প্লানিং করেছে। কিডন্যাপ করবে তো সব পদ্ধতি মেনে করবে। তাই তাকে দিয়ে ক্লোরোফর্ম কিনিয়েছে। একটা রুমালেও মাখিয়েছে।সবাই মানা করলেও সে এসব করবেই করবে। তানিশা মুখ ঘুরিয়ে মাইশার পানে তাকাল।সে একমনে তার বন্ধুদের সাথে চ্যাটে নিজেদের এডভেঞ্চার শেয়ার করছে। রাইশাকে শেয়ার করা যাবে না সাফ সাফ মানা করে দিয়েছে ফাদিন।রাইশাও বয়োজ্যেষ্ঠদের পাল্লায় পরে গেছে। তানিশা আবার জানালার বাইরে তাকিয়ে মাইশাকে ডাকলো -" এই আপু দেখ ফাদিন ভাই আর একটা বোরকা পরা মেয়ে আসছে। "
মাইশা তড়িঘড়ি করে নিজের হাত থেকে ফোনটা রেখে দিলো। রুমালটা হাতে নিয়ে রেডি হবার আগেই বোরকা পরা মেয়েটা দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠে বসলো। ফাইয়াজকে তাড়া দিয়ে বললো -" জলদি গাড়ি স্টার্ট করো ফাইয়াজ। জলদি। "
মাইশার মুখ হা হয়ে গেল কনের এতো তাড়া দেখে।মাইশার মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে দেখে ফাহিম হু হা করে হেসে উঠলো। আইরা মাইশার পানে তাকিয়ে মিষ্টি স্বরে শুধালো -" কি হয়েছে? "
মাইশা হাতের রুমলটা ছুড়ে মা*রলো জানালার বাইরে। হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে অভিমানী কন্ঠে বললো-" কিছু না। "
ওরা প্লানিং অনুযায়ী শপিং মলের দিকে চললো।শপিংমল আসার পর থেকে শপিংমলে সবাই ঘুরে একবার হলেও তানিশার পানে তাকাচ্ছে। এমন আজিব চিরিয়া ওরা আগে কখন দেখেনি।ওরা এখন শপিংমলে এসেছে।জুরুরি কিছু জিনিস পত্র কিনতে।তানিশাকে সবাই বলেছিলো গাড়িতেই অপেক্ষা করতে । কিন্তু তানিশা উত্তেজনায় আর বসে থাকতে পারিনি। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তাতে তার ধ্যান নেই।মাইশা আইরা শপিং করছে আইরার জন্য। ছেলেরা গেছে ফাইয়াজকে নিয়ে। হঠাৎ মাইশার কল এলো। মেঘের কল এসেছে। মাইশা খুশি হয়ে কলটা তুললো।হ্যালো বলতেই মেঘের রাগান্বিত স্বর ভেসে এলো -" কু*ত্তার বাচ্চা তোরা কাকে তুলে নিয়ে গেছিস? তোদের আমি আমার হাতের কাছে পাই।শয়*তানের বাচ্চাআআ। "
মাইশা থতমত খেয়ে থুতলিয়ে থুতলিয়ে বললো -" কি হয়েছে তোর?এভাবে মাথা গরম কেন? আমি কি করেছি?"
মেঘ চেঁচিয়ে বলল- "তোরা যাকে তুলে নিয়ে গেছিস সে আমার খালাতো বোন হয় বে*কুবের বাচ্চাআআ!"
মেঘের কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই মাইশা এতো পরিমাণ হতবাক, বাকরূদ্ধ হলো যে সে সেখানেই মূর্তির মতো জমে গেল।
চলবে............