গল্প: প্রেম সমাচার ...
 
Notifications
Clear all

গল্প: প্রেম সমাচার (Writer:Humaira Murtaza)

Page 2 / 2

Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
(বিয়ে স্পেশাল)  
 
 
 
পর্ব — ১০ 
 
 
 
রাতের প্রায় দশটা। নীতিদের বসারঘর আজ সরগরম। হইহট্টগোলে মেতে আছে সকলে।আখতার শাহ-এর ব্যবসায়িক পরিচিত বেশ কয়েকজন সহ এসেছেন নিকটস্থ আত্নীয়স্বজন। ওদিকে মহিলারা ব্যস্ত রান্নাঘরে। যতই স্বল্পপরিসরে বিয়ে হোক, আখতার শাহের কলিজার টুকরো, বড়মেয়ের বিয়ে বলে কথা। ঝটপট সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নানাপদ খাবারের আয়োজন করেছেন। টেবিলে সেসব সাজানো রাজকীয় আয়োজনে। বসার ঘরের এককোনে ডেকোরেশনও সেরে ফেলেছেন। এই-ওই ঘরে আসছে-যাচ্ছে। এতেই পুরো হলঘরের অবস্থা একেবারে গমগমে।তবে যাদেরকে কেন্দ্র করে আজকের সাজসাজ রব তাদের মধ্যে একজন অবনত মস্তকে ড্রয়িংরুমের এক কোনায় নির্বিকারচিত্তে বসা। পরণে সাদা পাঞ্জাবি, মেরুন রঙের কোটি এবং সাদা পাজামা। দোতালা থেকে উঁকি দিয়ে নীরবকে দেখে একটা ভেংচি কাটলো নীতি। হুলো বেড়ালটা কেমন লেজ পেতে বসে আছে বিয়ে করার জন্য। সন্ধ্যার দিকে যখন বিয়ের কথা একেবারে পাকাপোক্ত করা হলো, তক্ষুনি বেঁকে বসলো নীতি৷ সে কিছুতেই বিয়েতে মত দেবে না। একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত নীতিকে কোনোভাবেই মতবিরুদ্ধে গিয়ে ওর বাবা-মা বিয়ে দিতে পারেন না। ব্যস এরপর থেকে শুরু হলো নীতির মায়ের ফ্যাসফ্যাসে গলার কান্নাকাটি! দুচোখ ছাপানো জল দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় নীতি! ওদিকে ওর বাবা বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কেঁদে কেঁদে নীতির বললেন, 
 
— ছেলে তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়৷ 
 
দ্বিধায় পড়ে যায় নীতি। নীরব এর আগেও অনেকবারই ওর সঙ্গে কথা বলেছে। তাহলে? এখন আবার কিসের কথা? আর কথা বলবে এটা জানাতে ওর মা এমন কেঁদে ভাসাচ্ছে কেন? মুখে বললোও সেকথা। 
 
— নীরব সাহেব আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন এটা নিয়ে তুমি গঙ্গা-যমুনায় বান ডেকে আনছো কেন মা? উনাকে ছাদে পাঠিয়ে দাও। আমি যাচ্ছি। 
 
ফের কান্নার রোল তুললেন লতা বেগম। মেয়ের হাতটা মাথায় চেপে ধরে বললেন, 
 
— তুই আমাকে কথা দে নীতি? নীরবকে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলে বিয়ে ভেঙে দিবি না। 
 
— আমি শুধু কথা বলবো মা! 
 
— তোর কথাই তো আমার বিশ্বাস নেই। 
 
ঝট করে মায়ের মাথা থেকে হাত ছাড়িয়ে হনহন করে হেঁটে ছাদের দিকে এগোলো নীতি। তার আগে আরেকবার চাইলো মায়ের দিকে। তিনি তখনও কান্নাকাটিতে ব্যস্ত! এই মহিলার চোখে পানির ট্যাংক সেট করা হলো কেন নীতি বুঝেই পেলোনা৷ 
 
ছাদে এসে রেলিং ঘেষে দাঁড়ায় নীতি। ভালো ঠান্ডা পড়েছে।ওর গায়ে অবস্য শাল চাদর ছিলো। সেটা খুলে রেলিঙের একপাশে রেখে দেয় নীতি। দু'হাতের তালু ঘষে হাত দুটোকে একটু উষ্ণতা অনুভব করানোর চেষ্টার মাঝে তাঁকিয়ে থাকলো ছাদের দরজার দিকে। লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ানের মার্চ টু ছাদ কর্মসূচি পালন করে কখন নীতিকে অতিক্রম করতে আসবেন? ঘাড় ঘুরিয়ে আবার তাঁকালো কুয়াশা জমে থাকা রেলিঙের উপর৷ কিছুক্ষণ পর আবার পেছনে ফিরতেই চমকালো নীতি। কেননা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে নীরব৷ দুরত্ব বড়জোর দুই গজ। ছাদের অন্যপাশে জ্বলতে থাকা লাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখলো নীতি। তার বাবা-মায়ের সিলেক্ট করা আদর্শ ছেলের ঠোঁটের ভাজে জ্বলজ্বল করছে সিগারেট। হাতে লাইটার৷ নীতি পিছু ফিরতেই নীরব একটা সুপ্ত শ্বাস ফেললো। শিথিল হলো ওর কপালের ভাঁজ৷ বললো, 
 
— মিস নীতি আমাকে ছাদে আনার জন্য আপনার একটা ধন্যবাদ জামিয়ে রাখা হলো। সিগারেটের ক্রেভিংস হচ্ছিল। অথচ নীচ থেকে আসতে পারছিলাম না। শুনুন আমার সিগারেট শেষ না হওয়া অব্দি আপনার ছাদ থেকে পালানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। 
 
নীরবের সহজ-স্বাভাবিক ব্যবহারে চোখের পলক পর্যন্ত ফেলতে ভুলে গেলো নীতি৷ চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
 
— আপনি নিঃশব্দে ছাদে এলেন কিভাবে? তাও আমার এত কাছাকাছি? জাদু জানেন আপনি? 
 
— জী না মিস নীতি। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সুপার কমান্ডো লেফটেন্যান্ট, প্যারা মিলিটারি স্পেশাল ফোর্স। অলওয়েজ আর্মড এন্ড আন্ডার কাভার এজেন্ট। ট্রেনিং-এর সাইড এফেক্ট হিসেবে বলতে পারেন। আমাদেরকে নিঃশব্দে চলাফেরা করার ট্রেনিংও দেয়া হয়। 
 
— আপনি একজন সুপার কোমান্ডো?
 
— এজ পার আই নো, মিস নীতিপ্রিয়া। 
 
— আপনি সিগারেট খান। বাসায় জানে? 
 
— না। 
 
— আমি যদি বলে দিই? 
 
— গো এহেড। 
 
— আমি কিন্তু সত্যিই বলে দেবো। 
 
— আই থিংক ইউ শ্যুড ট্রাই। 
 
— আপনার বাবাকে যদি বলে দিই? আপনি... 
 
কথা বলার মাঝে থেমে গেলো নীতি। নীরবের এই বিশেষ ট্রেনিং-এর ব্যপারটা অজানায় ছিলো নীতির। এইজন্যই ওর বাবা-মায়ের নীরবকে এত পছন্দ! আর এই ব্যাটাও বিয়ের জন্য পাগল। নীতি বোধহয় বিয়ের গ্যাড়াকল থেকে আজ বাঁচতে পারবে না। হঠাৎ নীতির মনে হলো আপাতত বিয়েটাই ওর সব সমস্যার সমাধান। বিয়ে না করলে ওর বাবা-মায়ের সম্মান শেষ হয়ে যাবে। মা কাঁদবেন ফ্যাচফ্যাচ করে। দেখা যাবে আবার কোন বলদ জুটিয়ে আনবে।সেদিক থেকে নীরব সাফওয়ান সেইভ অপশান। এই বান্দা আর যাইহোক বলদ নয়। বরং নীতি বিয়ে করে নীরবকে এত জ্বালাবে যেন দুই দিন পর ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ব্যস তারপর নীতি উড়ালপংখী৷ সে আকাশে-বাতাসে উড়ে বেড়াবে৷ তখন বাবা-মাকে বেশ কড়াকড়ি করে বলতে পারবে নীরব সাফওয়ান একটা রেড ফ্ল্যাগ ছিলো। যার সঙ্গে কোনো খোঁজ-খবর না নিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল ওকে শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবী দেখে। এবার নীতি নিজের মতো করে বাঁচবে। ওসব বিয়ে-শাদির কোনো দাম নেই নীতির কাছে। ভাবনাটা মাথায় খেলতেই খুশিতে গদগদ হলো নীতি। দুকদম এগিয়ে নীরনের দিকে ঝুকে বললো,
 
— আপনাকে বিয়ে কোরতে আমি রাজী নীরব সাফওয়ান সাহেব। তবে আমার কিছু শর্ত আছে। মানতে রাজী আছেন?
 
কয়েকটা ধোঁয়ার কুন্ডুলি ছেড়ে সরল গলায় নীরব পালটা প্রশ্ন ছুড়লো,
 
— শর্ত? 
 
— জী শর্ত। টার্মস এন্ড পলিসি। 
 
— আপনার শর্ত মানতে আমি বাধ্য নই, মিস নীতি। 
 
— দেখুন? নীরব সাহেব? আপনি আমাকে সেধেসেধে বিয়ে করার জন্য উড়ে পড়ে কেন লেগেছেন আমি জানিনা কিন্তু বিয়ের শর্ত মানতেই হবে। দিন, আপনার পা দুটো দিন ওগুলোকে ধরে রিকোয়েস্ট করি আজ৷ তবে শুনবেন আমার কথা। নাকি?
 
— ওকে। আপনার শর্ত পেশ করুন,মিস নীতি। ভেবে দেখি। মানার যোগ্য হলে মানবো। নয়তো ইউ নো আ'ম নট দ্যাট মাচ ডেস্পারেট টু ম্যারি ইউ। 
 
— দেখলাম তোর ডেস্পারেটনেসের নমুনা! শালা! বিয়ে করার জন্য লেজপেতে বসে আছে আবার বলে ডেস্পারেট নই। মনে মনে বকাবকি করতে থাকে নীতি। ওদিকে নীরবের গা ছাড়া ভাবে দাঁতে দাঁত পিষলো একদফা। ইচ্ছে তো কোরছে আচ্ছামতো দুটো কথা শুনিয়ে দিতে কিন্তু এখন নীতি বিপদে আছে। হাতি কাঁদায় পড়েছে তাই নীরবের মতো চামচিকা ওকে লাথি দেবার সুযোগ পেয়েছে। ওকে.. কোনো ইস্যু নেই। নীতির দিনও আসবে। তখন নীরবকে নাকে খত দেয়াবে নীতি। ওর আকাশকুসুম কল্পনার মাঝে ওর সামনে তুড়ি বাজালো নীরব৷ বললো,
 
— ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি? 
 
— না। ঘুমোয় নি। আপনি কান খুলে শুনে রাখুন। 
 
— কানের জন্য আলাদা কোনো ঢাকনা নেই মিস নীতি। ওটা চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে। অবশ্য এখন মনে হচ্ছে কান বন্ধ করা গেলে ভালো হতো। আমার শ্রবণেন্দ্রিয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা পেতো। 
 
ফের আগুন চোখে তাঁকালো নীতি। বললো,
 
— শর্ত নং এক ~ অলওয়েস লিসেন টু নীতিপ্রিয়া। অর্থাৎ আমি যা বলবো তাই হবে। কোনো ফিরতি প্রশ্ন করা যাবেনা। আম রাইট অল দ্যা টাইম। 
 
শর্ত নং দুই ~ অলওয়েজ ফলো দ্যা ফার্স্ট রুল। এবার বলুন আপনি রাজী? 
 
সিগারেটের ফিল্টার পায়ে চেপে নিভিয়ে দেয় নীরব। পকেট থেকে একটা মিন্ট ফ্লেভারের চকলেট বের করে মুখে নিয়ে বললো, 
 
— আমি রাজী নীতিপ্রিয়া শাহ। আপনার সমস্ত শর্ত নীরব সাফওয়ান মাথা মেতে নেবে। অলওয়েজ। 
 
ব্যস তারপরই নিচে নেমে এসেছে নীতি। এসে বাবা-মাকে জানিয়েছে বিয়েতে রাজী। ওর হঠাৎ রাজী হয়ে যাওয়াতে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল প্রীতি। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললো,
 
— আপুরে? তুই আসলেই আমার বোন? নাকি ছাদ থেকে অন্য কেউ নেমে এসেছে তোর রুপ ধরে? আম্মাজান? এই মেয়ের পা চেক করে দেখো। সোজা আছে নাকি? আমার ভয় লাগছে আম্মা। 
 
প্রীতিকে শাসালো নীতি। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, 
 
— চুপ বেয়াদব। এখান থেকে যা। নয়তো তোর সব গোপন কথা ফাঁস করে দেবো।
 
বোনের হুমকিতে কাজ হলো তরতর করে। মুখে কুলুপ আঁটলো প্রীতি। আর যাই হোক ওর গোপন খবর কোনোকিছু মায়ের কাছে ফাঁস হলে মার খেতে খেতে আধমরা হয়ে যাবে প্রীতি।তারচেয়ে তার বড়বোনের বিয়ের নাটক উপভোগ করা যাক। কারণ বোনকে হাড়েমজ্জায় চেনে প্রীতি। তার বোনের বিবাহ ভীতি এতটাই প্রকট যে কারো সঙ্গেই সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে না। 
 
ওদিকে মেয়ের সম্মতিতে আরেকচোট কাঁদলেন লতা বেগম।কালবিলম্ব না করে তড়িঘড়ি করে ছুটলেন নীচতালায়।তার বিচ্ছু মেয়ে আবার বেঁকে বসার আগেই বিয়ের আয়োজন করতে হবে। 
 
------- 
 
বাসর ঘরে বসা নীতি। এটা অবশ্য তথাকথিত বাসর ঘর নয়। ওদের বাসার গেস্টরুম। আজকের জন্য ওর বাসরঘরে টান্সফর্ম করা হয়েছে।এই টুকু সময়ের মধ্যে রুম ডেকোরেশনও করে ফেলেছে! ঘরের কয়েক জায়গায় শোভা পাচ্ছে ফুলদানি ভর্তি রজনীগন্ধার স্টিক। দেয়ালে গোলাপ আর বেলীফুল চিপকে দিয়েছে। আর মোটামোটা মোট নয়টা সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা! বাবারে! বাসরের আয়োজন দেখে তো মনে হচ্ছে নীরব আজ পাগলা ষাড় হয়ে যাবে। যতই ষাড় হয়ে যাও নীরব সাহেব? নীতিকে বাগে আনা এত সহজ নয়।
 
বিয়ের জন্য নীতি নিজেও সাজগোজ করেনি। তবে লাল বেনারসি গায়ে জড়িয়েছে। মাথায় দিয়েছে লাল ওড়না। হালকা-পাতলা গহনা আর প্রীতি এই রুমে আসার আগে মেকাপ করিয়ে দিয়েছিল। তবে মেকাপ টিস্যু দিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই মুছে ফেলেছে নীতি। ঘড়ির কাটায় প্রায় রাত দুটো। আজ আর ওর ঘুম হবে না। একজন অচেনা পুরুষের সঙ্গে একঘরে থাকলে কোনো মেয়েরই ঘুম আসবেনা। এরমাঝে শুনলো দরজা খোলার শব্দ। তবে সে এসেছেন। ওর মা বারবার করে বলে দিয়েছেন যেন পা ছুঁয়ে সালাম করে৷ তবে নীতি কোনোদিনও করবে না৷ গাট হয়ে বসেই থাকলো সে। টু শব্দটিও করলো না৷ 
 
— তোমার কিছু প্রয়োজন নীতি? 
 
দরজার কাছ থেকে ভেসে আসা ভারী পুরুষালি কণ্ঠে প্রথমবারের মতো তুমি সম্বোধনে হচকালো নীতি। কবুল বলার ঘন্টা খানেকের মধ্যে এই লোকের এটিটিউড একশো আশি ডিগ্রি বদলে গেলো কিভাবে? এমনভাবে ওর সঙ্গে কথা বলছে যেন তাদের কত বছরের সংসার! । তপ্ত শ্বাস ফেলে ধারালো গলায় বললো,  
 
— জী। এক বোতল বি*ষ প্রয়োজন। আপনি এনে দিতে পারবেন নীরব সাহেব? 
 
এতক্ষণ দরজার কাছে থাকলেও এবারে কিছুটা এগিয়ে বুকে হাত বেঁধে সটান নীতির মুখোমুখি দাঁড়ালো নীরব। ঠেস দেয়া গলায় বললো,
 
— বলো কি? বিষের স্টক শেষ? তবে কালনাগিনীও যে বিষ সংকটে পড়ে তোমাকে বিয়ে না করলে জানতেই পারতাম না নীতিপ্রিয়া..
 
— কেন? আপনি নাকি একজন সুপার কমান্ডো? তবে এতটুকু জানেন না?কালনাগিনী মৃদু বিষধর। মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং ইকো সিস্টেম তাদের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ। 
 
— স্বজাতি নিয়ে অনেক রিসার্চ কোরেছো মনে হচ্ছে নীতিপ্রিয়া। আগে যদি জানতাম রেপটাইল প্রজাতির কেউ আমার বউ হবে তবে অবশ্যই রিসার্চ করে রাখতাম। এনিওয়ে বললে না তোমার কিছু প্রয়োজন? রাতের খাবারটাও তো খেলে না। চলো কিছু খেয়ে নেবে৷ 
 
— এইই? এইই? আমার সঙ্গে একদম চালবাজি করবেন না। একটু আগে কি বললেন আমি কালনাগিনীর স্বজাতি? মানে আমাকে সাপ বলছেন?আমি সাপ? তবে একটা ছোবল দিয়ে দিই? আমাকে বেহুলা ভেবে বসলেন নাকি? এই ঘরে আসার পর থেকে দেখছি আপনি আমাকে তুমি সম্বোধন করছেন? আমি অনুমতি দিয়েছি আপনাকে? আমার সঙ্গে বেশি ফ্র‍্যাংক হবার চেষ্টা করবেন না। আচ্ছা আপনাদের কি যেন অনুমতি লাগেনা বিয়ে করতে? সেটা নিয়েছেন? বেশি হাংকিপাংকি করলে হেড কোয়ার্টারে নালিশ করে দেবো। বুঝেছেন? খবরদার আমাকে তুমি সম্বোধন করেছেন তো! এইযে এখানে বালিশ রাখা। উঠিয়ে নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ুন। যান। 
 
— বিয়ের পর জামাই-বউ জড়াজড়ি করে ঘুমাই। তবে আমি সোফায় ঘুমোবো কোন দুঃখে নীতিপ্রিয়া? 
 
চলবে...
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
 
পর্ব — ১১
 
নিশুতি রাতের প্রথম প্রহরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বাঁধা পড়ে যাওয়া মানুষটির মুখনিঃসৃত বাক্যটা শোনামাত্র থ বনে গেলো নীতি। বিয়ের পরপরই তার পালটে যাওয়া সম্বোধন, কথার টোনে রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো সে। কয়েক সেকেন্ডে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্তস্বরে বললো,
 
— আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আপনি বলতে চাইছেন?আপনি আমার সঙ্গে জড়াজড়ি করে শোবেন? আমার সঙ্গে? এটাই বলতে চাইছেন? 
 
— অফকোর্স নীতিপ্রিয়া...  
 
আগের মতো সটান বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে ভাবলেসহীনভাবে বললো নীরব৷ তবে ওপাশের মানুষটার এতটা দায়সারা ভাব হজম হলোনা নীতির। এই লোককে শাসানোর বন্দোবস্ত আগেই করে ফেলেছিল নীতি এবং প্ল্যানমাফিক কাজ করলো বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে।
 
 শাড়ির ভাঁজে রাখা চাকুটা বের করে নীরবের দিকে তাক করলো নীতি। চোখ-মুখ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ৷ রাগে গজগজ করতে করতে সে এগিয়ে এসেছে নীরবের অনেকটা কাছাকাছি।ছোট্ট চাকুটা একটু বিঁধিয়ে দেয়ার মিথ্যে চেষ্টা করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, 
 
— আমি নীতিপ্রিয়া শাহ। আজ পর্যন্ত হাংকিপাংকি করে আমার সঙ্গে কেউ জিততে পারেনি। আমার সঙ্গে ঘুমিয়ে দেখুন না? সকালে উঠে দেখবেন আপনি আছেন কিন্তু আপনার ছোটপাখি একেবারে ঘ্যাচাং করে দেবো। পাখির কোনো অস্তিত্বই থাকবেনা। বুঝেছেন?
 
চাকুটা আগে পিছু নিয়ে ইশায়ায় বোঝালো ঠিক কিভাবে চাকু দিয়ে ঘ্যাচাং করে পাখি কাটবে নীরবের। চাকু দেখে মেকী ভয় পেয়ে শুকনো ঢোক গিললো নীরব। বললো,
 
— আম এফ্রেড! 
 
— ইউ শুড লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান ! 
 
নীতির কাছাকাছি এগিয়ে আসার সুযোগ উপর্যুপরি সদব্যবহার করলো নীরব। নিজের ঠান্ডা হাতটা নীতির কোমরের বাঁকে চেপে ধরলো হঠাৎই। বাসর রাতে নববধুর কাছ থেকে অমন হুমকি পাবার পরও কান্ডটা ঘটাতে এক মুহুর্তের জন্যও ভাবলো না। কানের কাছে মুখটা নামিয়ে গাঢ়স্বরে বললো, 
 
— বাসর রাতে নিজের পায়ে নিজে কেউ কুড়াল মারে নীতিপ্রিয়া? আমার পাখি কেটে নিলে তোমার কি হবে একবার চিন্তা করবে না? আমার চাইতে ওটা তোমার বেশি প্রয়োজন। নয়তো মাম্মা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হবে তুমি।  
 
 সদ্য বিয়ে করা অপরিচিত কিংবা স্বল্প পরিচিত স্বামী নামক লোকের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো নীতির শরীর জুড়ে। কেমন যেন ঝিমঝিমিয়ে উঠলো সর্বাঙ্গ। সেই সঙ্গে শ্রবণগ্রন্থির খুব কাছাকাছি তার ঠোঁটকাঁটা জবাবে আরও নেতিয়ে পড়লো নীতি। তবে প্রতিরোধ গড়ে তুললো অবশ্যই। তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নেয়ার প্রচেষ্টা চলমান রেখে তোতলানো কন্ঠে বললো,
 
—আমাকে অশ্লীল কথাবার্তা বললে আপনার মুখ সেলাই করে দেব আমি।  
 
বলেই নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে নীতি। তবে শক্ত-সামর্থ্য বাংলাদেশ প্যারা মিলিটারির স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত নীরব সাফওয়ানকে সামান্য এক নারীর ধাক্কায় সরানো এতটা সহজ হবার নয়। বলা চলে বৃথায় গেলো নীতির ওকে টলানোর প্রচেষ্টা। বরং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নীরব নিজের অন্য হাতখানা চেপে শাড়ি ভেদ করে চেপে ধরলো কোমল উদরে। সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে ভস্ম করে দেয়ার চাহনি নিয়ে বললো,
 
— আপনি আজ মার্ডার হবেন আমার হাতে। সত্যিই। আপনাকে আমি মে রে ফেলবো আজ। সবার আগে কাটবো হাত। মিলিয়ে নেবেন। 
 
— তাই? 
 
 আরেকহাতে অজানা কোনো কায়দায় নীতির হাত দুটো আটকালো পেছনে নীরব। নড়াচড়ার সমস্ত পথরোধ করলো ওর। চাকুটা মেঝেতে পড়ে শব্দ হলো ঝনঝনিয়ে। আবারও মাথাটা নুইয়ে আনলো নীতির কানের কাছে। ফিসফিস করে বললো,
 
— তুমি বোধহয় আমার কথাটার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারোনি নীতিপ্রিয়া। আ'ম অলওয়েজ আর্মড সুপার কমান্ডো। ইউ গেট ইট? অলওয়েজ ফুললি লোডেড আর্মড।একজন অন ডিউটি অফিসারকে ছিচকে চোরের মতো চাকু দিয়ে ভয় দেখিয়ে নিজেকে হাসির পাত্রী বানিয়ে ফেলছো। তার চেয়ে একটু আপোষ করে না-ও। বিয়ে যখন হয়েছেই, আপোষ করে নেয়ায় ভালো। 
 
কটমট করে তাঁকালো নীতি। বললো,
 
—আপোষ? তা-ও আপনাকে? কখনো না। 
 
— দেখা যাবে.. 
 
নীতিকে হাতের বাঁধন মুক্ত করে বিছানার দিকে এগোলো নীরব। কম্বল গায়ে টেনে বিছানায় শুতে শুতে বললো, 
 
 — ঘুমোও নীতি। ঘুমিয়ে শক্তি সঞ্চয় করো। কাল আমাদের বেরোনোর আছে। আর বাসরটা আজ তোলা রইলো। যেদিন আমার জন্য তোমার চোখে সত্যিকারের ভালোবাসার অশ্রুবিন্দু ঝরবে, সেদিন তোমার জন্য ভালোবাসার বৃষ্টি নামবে আমার তরফ থেকে। আমার সিক্স সেন্স বলছে সেই দিন বোধহয় বেশি দূরে নেই নীতিপ্রিয়া।  
 
নীরবের কথায় মনে মনে ওকে একটা ভয়ংকর গালি দিল নীতি। একহাত কবজি ম্যাসাজ করতে থাকে। হাতের কব্জিতে ব্যথা কোরছে প্রচন্ড। হুলো বেড়ালটা এত জোরে ধরছে! হাত তো নয়। যেন লোহা! ইশ হাতের হাড্ডিগুলা কেমন মড়মড় করছে ওর। শালা আবার বলে কি! ভালোবাসার বৃষ্টি ঝরাবে? তার আগে তোর উপর পঁচা কাদার প্রলেপ ছড়ানো হবে রে হুলো। তোর বাসর তোলায় থেকে যাবেরে হারামজাদা। আয় না? বাসর করতে এলেই তোর পাখি উড়িয়ে যদি না দিই তবে আমার নামও নীতি নয়৷ 
 
চুপচাপ দাঁড়িয়েই ছিলো নীতি। অবশ্য নীরবকে বকাবকি তখনও বিদ্যমান। এরমধ্যে কম্বলের মধ্যে থেকেই শুনলো নীরবের ঘুম জড়ানো ভারীস্বর।
 
— আমাকে গালাগালি করা শেষ হলে সং সেজে আছো সেসব ধুয়েমুছে শুতে এসো।
 
 তার তাতের ফের ছ্যাত করে উঠলো নীতি। মাথার পাশে আরেকটা আরেকটা বালিশ তুলে নিল হাতে। এটাকে আজ বালিশ চাপা দেবে নীতি। অবশ্যই দেবে। নীতি শাড়ি পরে সং সেজে আছে? মুখে বললো,
 
— আমি সং সেজে আছি? আমি? আপনি জানেন? গোটা সিলেট শহরে আমার কত-শত এডমাইরার আছে? ছেলেরা বাসার বাইরে লাইন ধরে থাকে। ফেসবুকের ইনবক্স সবসময় ফুল হয়ে থাকে তাদের ম্যাসেজে। একটা নাম্বার বেশিদিন ব্যবহার করতে পারিনা ছেলেদের অত্যাচারে। একবার শাড়ি পরে পহেলা বৈশাখে বেরিয়েছিলাম। পরদিন পনেরোটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। আর আপনি বলছেন আমি শাড়ি পরে সং সেজে আছি? ফ্যাশন সেন্স একেবারেই জিরো আপনার।আমি-ই পাগল। আপনার ফ্যাশন সেন্স থাকবে এমন আশা করায় বৃথা। পরে থাকেন সেই জংলি, ময়লা কাপড়চোপড় আর মানধাত্তা আমলের বুট। চুলের কোনো ফ্যাশন আসবেই বা কিভাবে? মাথা তো টাকবেল। তালগাছের মতো লম্বা, একটা খাম্বা মার্কা লোক এসেছেন আমার শাড়ি পরাকে সং বলতে। আপনি সং। 
 
কম্বল মুড়িয়ে রেখেই নীরব বললো,
 
— ইউ আর রাইট নীতিপ্রিয়া। 
 
ভ্রু কুঁচকে গেলো নীতির ফের। এই ব্যাটা আবার কোন কথার সুরে এসব বলছে। কেননা নীতিকে সঠিক বলার মতো এমন কিছু এতক্ষণে আসলে ও কোনটা বলেছে? বললো,
 
— কি বলতে চাইছেন? 
 
— দ্যাট ইউ আর ম্যাড। এন্ড আই এগ্রি উইথ ইউ টোটালি। 
 
এবারে আর নিজের রাগ সংবরণ করতে পারলো না নীতি। সত্যিই বালিশ নিয়ে এগোলো কম্বলের উপর দিয়ে নীরবকে চাপা দেয়ার জন্য। এই লোকের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। পিপীলিকার যেমন মরিবার তরে পাখা গজায়, এই লোকেরও তেমন মরিবার তরেই নীতির সঙ্গে বিয়ে বসেছে তো বসেছেই। আবার গায়ে আগুন লেগে যাওয়া কথা ছুঁড়ছে একটার পর একটা। 
 
বালিশ নিয়ে নীরবের মুখে চাপা দেয়ার আগে চোখের উপর থেকে কম্বল না সরিয়েই নীরব বললো,
 
— ইউ থিংক ইউ ক্যান কিল মি উইথ দ্যাট পিলো? 
 
কথাটা শেষ করেই ঝট করে উঠে বসলো নীরব। বাজ পাখির ন্যায় অসামান্য খিপ্রতায় নীতিকে হ্যাচকা টান দিয়ে ফেললো বিছানায়। অবিশ্বাস্যভাবে কয়েক পলকে নীতির দু-হাত চেপে ধরলো মাথার দুপাশে। নিজের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো নীতির উপর! নিশ্বাসে বাড়ি খায় দুজনের। ঘরে লাইট জ্বলছে। একে অপরের চোখের পাপড়ি অবদি গুণতে পারছে ওরা। এবং প্রথম বারের মতো আবিস্কার করলো নীতি ওর কাছাকাছি থাকা পুরুষের চোখের মনি কালো নয়। বরং বাদামী বর্ণের। দূর থেকে বোঝা না গেলেও মাত্র কয়েক ইঞ্চি দুরুত্বে থাকার কারণে বেশ ভালোভাবেই বুঝলো নীতি। শুধু চোখের মনি নয়। মানুষটার ক্লিন সেভড গালে অবহেলায় জন্মে থাকা খসখসে দাড়ি, সিগারেটে পোড়া পুরু ওষ্ঠপুট, জোড়া শৈলপান্ত সবটা পরিস্কার দেখতে পেলো নীতি। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ভুলে বসলো। মস্তিষ্ক বুঝি এখনো প্রসেস করতে পারেনি ঘটনাটি। এসব কি হচ্ছে ওর সঙ্গে। ওদিকে নীতির ঠোঁটের খুব কাছাকাছি ঠোঁট এনে বললো,
 
— বিরক্ত কোরছে কেন নীতিপ্রিয়া? কি চায়? বাসর করতে চাও আমার সঙ্গে? 
 
— ছাড়ুন। এগুলো কোন ধরণের অসভ্যতা? 
 
— প্রথমে আমার কথার উত্তর দাও। ঘুমোতে দিচ্ছো না কেন? আদর নিতে চাইছো? চাইলে বলো? শরীরের ভালোবাসা-বাসিতে মনের ভালোবাসার প্রয়োজন হয়না। আমারও ফার্স্ট টাইম। করবে? 
 
মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে নীতি। এভাবে! এই লোকের এত কাছাকাছি! শাড়ির আঁচল সরে গিয়েছে অনেকটা। বুকের নরম অংশ গিয়ে ঠেকে আছে নীরবের বুকে। আবার সে নাকি করতে চাওয়ার অনুমতি চাইছে! ছিঃ..কেমন বিদঘুটে ঠেকলো কথাটা! বিয়ের প্রথম রাতে এমন বেলেহাজ কথায় মুখটা তেতো হলো নীতির। তাছাড়া যতই মুখে পটর পটর করুক নীতি কিন্তু একজন নারীর জন্য তার খুব কাছে পুরুষের উপস্থিতিতে লজ্জারা হানা দেয়। দুচোখ খিচে বন্ধ করে নেয় নীতি।চোখ বন্ধ রেখেই তোতলানো কন্ঠে বললো, 
 
— আমি ব্যথা পাই নীরব। 
 
— কোথায়? 
 
ঝট করে চোখে খুলে ফের নীরবের চোখের দিকে তাঁকালো নীতি। হতবাকচিত্তে বললো,
 
— কোথায় মানে? অমন চেপেচুপে ধরে রেখে আবার নির্লজ্জের মতো জানতে চাইছেন কোথায় ব্যথা পাচ্ছি আমি? আপনার সাহসের তারিফ না করে পারা যাইনা! বিয়ে হয়েছে বলে কি আপনি আমাকে কিনে নিয়েছেন? ইচ্ছে করে ব্যথা দিচ্ছেন তাইনা? ছাড়ুন বলছি। নয়তো আমি আপনার বাবাকে বিচার দেবো। আংকেল আমাকে বলেছেন আপনি যদি আমার সঙ্গে ঠিকঠাক ব্যবহার না করেন আমি যেন তার কাছে বিচার দিই। উনি আপনার ইউনিটে জানিয়ে আপনাকে প্যাদানি খাওয়াবেন৷ এখনো পাথরের মতো চেপে আছেন কেন? সরুন। বললাম না? আপনাকে বলা যাবেনা কোথায় ব্যথা পাচ্ছি।
 
— তোমার আংকেলকে আদৌও বলতে পারবে আমি এক্সক্টলি কি করেছি? 
নীরবের কথায় আবারও হচকালো নীতি। আসলেই তো! শ্বশুরবাবাকে তার ছেলের নির্লজ্জ কর্মকান্ডের কথা কিভাবে বলবে? তাই কাচুমাচু করে গলাটা যথেষ্ট মোলায়েম করার চেষ্টা করে বললো,
 
— আমি সত্যি ব্যথা পাচ্ছি নীরব। 
 
— সেটাই জানতে চাইচি নীতিপ্রিয়া ঠিক কোথায় ব্যথা পাচ্ছো? 
 
এতক্ষণ লজ্জায় মেজাজের পারদ নিচে থাকলেও এবার সত্যিই রেগে গেলো নীতি। নাকের পাটা ফুলিয়ে চেঁচালো,
 
— তুই আমারই বাড়িতে, আমাকে শিম্পাঞ্জির মতো চেপে ধরে আছিস আর বলছিস কোথায় ব্যথা পাচ্ছি? ইয়ার্কি মারছিস আমার সঙ্গে? চোখে দেখতে পাস না? না দেখলে ভালোভাবে দেখ হাত আর বুকে ব্যথা পাচ্ছি আমি। ছাড় এবার? খুশি? 
 
কথাটা শেষ করতেই নীতির মনে হলো নীরব ওকে আরও বেশি জোরে চেপে ধরেছে। ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারছেনা নীতি। পরপরই কানের কাছে শুনলো ফিসফিস আওয়াজ ফের, 
 
— আমি এখন ঘুমোবো। আর একবার যদি আমার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাও তবে আমি বাধ্য হবো। এখন ছেড়ে দিচ্ছি। আরেকবার থাবার নিচে ধরলে কিন্তু ছাড়বো না। হালাল করে ফেলবো একদম। বুঝেছেন নীতিপ্রিয়া শাহ? 
 
চলবে...
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ১২
 
নীতি ঘড়ি দেখলো। রাতের প্রায় তিনটে বাজে। দেখে একটা তপ্ত শ্বাস ফেললো। ঘরে মৃদু পাওয়ারের টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। গোটা ঘর তলিয়ে আছে মোলায়েম আলোয়। ঠান্ডাটাও পড়ছে বেশ। সিলেটে অন্যান্য জেলার চেয়ে সাধারণত ঠান্ডা একটু বেশিই পড়ে। অন্য সময় হলে নীতি আরাম করে ঘুমিয়ে যেতো। কিন্তু আজ দু-চোখ থেকে ঘুম মহাশয় উধাও। নিজেকে পেঁচা শ্রেনীর প্রানী মনে হলো ওর। এই রুম বরাবর একটা বড় কদম গাছ আছে। সেখানে একজোড়া পেঁচা দম্পতির বসবাস বহুদিন ধরে৷ দু'দিন পর পর বাচ্চা ফুটিয়ে বংশবৃদ্ধি করে তারা। রাতদুপুরে ওরাই শোরগোল কোরছে। নীতির মনে হলো পেঁচার স্বামীটা মনে হয় নীরবের মতো মিচকা শয়তান। আগেও অনেকবার দেখেছে একজোড়া পেঁচা পাশাপাশি বসে থাকে। একজন হাউকাউ করে আর আরেকজন মটকা মেরে চোখ বুঁজে বসে থাকে। নিশ্চিত মেয়ে পেঁচাটা চিল্লাফাল্লা কোরছে স্বামীর সঙ্গে। কেন জানি পেঁচাটার উপর হিংসে হলো নীতির৷ মহিলা তাও চেঁচিয়ে নিজের রাগ মেটাতে পারছে! আর ও? চুপচাপ মটকা মেরে একটা শয়তানের পাশে শুয়ে আছে! কথাটা মনে আসতেই অগ্নিদৃষ্টিতে চাইলো নীরবের দিকে। সব দোষ এই লোকের। ট্রেনে অত কথা বলে এলো! তারপরও বিয়ে করে বাসর ঘরে এসে পড়েছে? এই লোকের একটু ভয়ডর নেই কেন? বুকের পাটা আছে! না পাটা না। কলিজা আছে বলতেই হয়। শরীরের পুরোটাই কলিজা। মনে মনে বললো তোর কলিজা আমি ভুনা করে খাব শালা! একটু ঝুঁকে নিগূঢ় চোখে পরিস্থিতি বোঝার জন্য চেয়ে রইলো নীতি৷ ভালোভাবে খেয়াল করে এতটুকু বুঝলো দেখতে শুনতে লোকটা ভালো। লম্বাও বিশাল। ছয় ফিট খাটের এমাথা-ওমাথা জুড়ে শুয়েছে একেবারে। কিছুক্ষণ আগে কম্বল মুড়িয়ে রাখলেও এখন তার চাঁদবদন বেরিয়ে আছে। একটু পর পর ভারী শ্বাস ফেলছে। নীতিকে বিয়ে করে মনে হচ্ছে ঠোঁটের কোনে বিশ্বজয় করা হাসি। বিড়বিড় করে বললো,
 
— হ্যাঁ রে পাঠা লেফটেন্যান্ট, তোরই তো ঘুমোনোর দিন। পাশে সুন্দরী মেয়ে নিয়ে ঘুমিয়েছিস। ঘুম তো ভালো হবেই। 
 
বলেই মুখ বাঁকালো নীতি। হাত বাড়ালো এই পাঠার গলাটা চেপে ধরার জন্য। চকিতে ফিরিয়েও আনলো। এই লোকের কারণে ওকে বুঝি এবার মার্ডার কেসে ফাসতে হবে? এই বদ লেফটেন্যান্ট আসলে লেফটেন্যান্ট পরিচয় নিয়ে ঘোরে। আদতে সে একজন সুপার কোমান্ডো। সবটা না জানলেও এতটুকু জানে নীতি স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত আর্মি হয় এরা। ঘুমের ঘোরেও এরা মুভমেন্ট টের পায়৷ তাছাড়া এই মিচকা শয়তান হুলো বেড়াল যে সত্যিকারভাবে ঘুমিয়ে আছে এমনটা না-ও হতে পারে। দেখা গেলো অভিনয় কোরছে। নীতি ঘুমোলেই উল্টাপাল্টা কিছু কোরবে। তখন এমনভাবে বুকে চাপ দিয়েছিল! নীতির এখনো ব্যথা হয়ে আছে। অতএব নীতি এখন ঘুমাবে না মোটেও। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে নীতি একা ঘুমিয়ে অভ্যস্ত। এমনকি প্রীতিকেও কখনো সাথে নিত না। এখন আজ? হুট করে এমন ধেড়ে সাইজের ব্যাটালোক নিয়ে ওর জীবনেও ঘুম আসবেনা।
 
— আমার দিকে এমন অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাখলে আমি ঘুমোবো কিভাবে নীতিপ্রিয়া? এই নিয়ে তিনবার 'এটেম্প টু মার্ডার' করলে। অন ডিউটি অফিসারকে মারার চেষ্টায় তোমাকে হাজত খাটাতে পারি আমি। জামিন পাবে না সহজে জানো?
 
আচমকা নীররের কথা শুনে চমকে উঠলো নীতি। ভ্রু কুঁচকে তড়াক করে উঠে বসে হড়বড়িয়ে বললো,
 
— আপনি ঘুমোননি? 
 
— আমার দিকে কেউ চেয়ে থাকলে আমি ঘুমোতে পারিনা। আর এখানে তো মা র্ডার করার পায়তারা চলছে। ঘুমোবো কিভাবে? 
 
আর এতেই চললো নীতির কথার রেলগাড়ি। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, 
 
— চোখ বন্ধ রেখে আমি দেখলেন কিভাবে? মিথ্যে বলার জায়গা পাননা? আপনার কি মনে হয়? রাতদুপুরে আপনার রুপ গলে গলে পড়ছে আর আমি? আমি না ঘুমিয়ে আপনার রুপ দেখছি? হাসালেন! আমার মনে হয় আপনি সুযোগের সন্ধ্যানে মটকা মেরে পড়ে আছেন। কিছুটা সুন্দরবনের লোনা পানির কুমিরের মতো। এটাকে কি বলে জানেন? ক্যামোফ্লাজ। আপনিও ক্যামোফ্লাজ করেই শুয়ে আছেন। আপনাদের পেশায় ক্যামোফ্লাজ জিনিসটা ভালো ভাবেই শেখায়। আমার ঘুমের অপেক্ষায় আছেন যেন আপনি সুযোগ নিতে পারেন। তবে কান খুলে শুনে রাখুন আপনি আমার কাছে আসার যদি আর একবার আমি কিছু চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকবো। সবাই এলে বলবো আপনার পুরুষত্ব নেই। সেইজন্য আমি কাঁদছি। আমার কপাল পুড়েছে। তারপর আমি যা চাইছি তাই-ই হবে৷ 
 
 তখনও সটান শোয়া নীরব৷ দুচোখ মুদে আছে। বললো,
 
— আমার পুরুষত্ব নেই তুমি জানলে কিভাবে?
 
— আমার জানার দরকার নেই। বাকি সবাই জানলেই হলো। 
 
— আমি আইনের লোক। আইন মুখের কথায় বিশ্বাসী নয়। প্রমান দাও। 
 
— এইতো শুরু হয়ে গেলো। আপনার প্রমাণ দাও ডায়লগ। নিজেকে ক্রিস হেমসওয়ার্থ ভাবা একটু বন্ধ করতে পারেননা? আয়নায় চেহারা দেখেছেন কখনো? আমার মুখের কথায় যথেষ্ট। ওই এলেন আইনের লোক। আইনের চোখ অন্ধ। দেখেন না কালো কাপড় বেঁধে রাখে। সেইজন্যই আপনাকে সিলেক্ট কোরেছে। আমি হলে আপনি লেফটেন্যান্ট, সুপার কোমান্ডো দূরে থাক, সুবেদারও হতে পারতেন না। হাহ!
 
— আচ্ছা তুমি কি চাইছো নীতিপ্রিয়া? মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছো কেন? 
 
— আমি কি চাইছি আপনাকে বলবো কেন? আপনি কে হোন আমার? পরিবারের চাপে পড়ে বিয়ে কোরেছি শুধুমাত্র। এবাদে আপনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শারিরীক এবং মানসিক কোনো সম্পর্ক নেই। আর কোনোদিন হবেনা। আপনি আমার জীবনে নেহায়েতই একজন অনাকাঙ্ক্ষিত উটকো ঝামেলা। আমার আপন ভুবনে অনাধিকার প্রবেশকারী পথের কাঁটা মাত্র। যাকে সময়মতো উপড়ে ফেলতে দুবার ভাববো না। জানেন তো কাঁটা ছোট হোক বা বড়। কোনোটাই সমঝোতা করা যায়না। 
 
ততক্ষণে দু-চোখ মুদে রাখলেও এবারে চোখ মেলে সরাসরি নীতির চোখের দিকে তাঁকালো নীরব। লাল হয়ে আছে চোখ জোড়া। হতে পারে সদ্য ঘুম ভাঙার কারণে এমনটা হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে নির্ঘুম থাকার কারণে। অতশত ভাবতে পারলো না নীতি। কারণ অমন লাল চোখ দেখে ভয় পেয়েছে সে। 
 
নীতি চুপ করে গেলেও এবারে উঠে বসলো নীরব। বিছানার পাশে রাখা জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে বের হতে হতে বললো,
 
— আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি বেয়াদবি। আর তুমি অত্যন্ত বেয়াদব মেয়ে এটা জানো? আমাকে উটকো ঝামেলা বলার আগে তোমার হিসেব করা উচিত ছিলো তোমার মতো বেয়াদবকে আমি যখন সেধেপড়ে বিয়ে কোরতে এসেছি তার পেছনে কোনো কারণ আছে? এনিওয়ে আমি ক্যাম্পে ফিরছি। সময়মতো ডিভোর্স লেটার পৌছে যাবে তোমার কাছে। আমি কারো জীবনে উটকো ঝামেলা হতে চাইনা। 
 
 গম্ভীর কণ্ঠে কথাগুলো বলে নীরব পূর্নদৃষ্টিতে তাঁকালো নীতির দিকে। আর তাঁকালো বলেই থমকালো নীরব। প্রথমবারের মতো তার আটাশ বছরের জীবনে কিছু একটা হয়ে গেলো। বোধহয় ওর অজান্তেই। মুক্তোঝরানো ঝকঝকে হাসির এক অন্য রমনীকে দেখলো নীরব। কারো হাসি এত সুন্দর হয়! এটা হাসি নাকি কোনো মাদক! নয়তো ঝিমঝিম করে উঠলো কেন ছয় ফুটিয়ে তাগড়া যুবক দেহসত্তা? ফ্যালফ্যাল করে নীতির হাসিটা গিলছিল নীরব। কানে বাজলো রবীঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা। কেন বাজলো নীরব জানেনা। শুধু ডঙ্গার মতো বেজেই চললো,
 
প্রহরশেষের আলোয় রাঙা 
সেদিন চৈত্রমাস—
তোমার চোখে দেখেছিলাম 
আমার সর্বনাশ। 
 
কিন্তু এখন তো শেষ প্রহর নয়। বরং বদ্ধ কামরা। কিন্তু ওর সম্মুখে দাঁড়ানো রমনীর চোখেমুখে লেপ্টে থাকা নৈর্সগিক হাসিতে নিজের সর্বনাশ দেখলো নীরব। তা-ও তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী যাকে ডিভোর্স লেটার পাঠানোর কথায় তার মুখশ্রী হতে আচমকা সরেছে কালো মেঘের আনাগোনা। আর মেঘের আড়াল হতে উঁকি দিয়েছে একটুকরো হৃদয়গ্রাহী হাস্যোজ্বল চেহারা। টলিয়ে দিয়েছে নীরবের শক্তপোক্ত খোলসে আবৃত হৃদকুঠুরীর জানালা।
 
বিছানা থেকে লাফিয়ে নীরবের সামনে এসে পড়লো নীতি। ফের হাসলো অধর প্রসারিত করে। আর তাতেই একটা ভালোবাসার তীর ছুঁড়ে গিয়ে গেঁথে গেলো নীরবের বক্ষপটে। ওর ভালোবাসার কিউপিড তবে আধাপাগল মেয়েটার হাসিতে ভর করে এসেছে! বলতেই হচ্ছে কিউপিডের নিশারা নির্ভেদ্য বক্ষপিঞ্জরে ঝড় তুলে ছেড়েছে একেবারে। 
 
নীরবের চেহারার রঙ উড়ে যাওয়া কিংবা নজরের পরিবর্তন কোনোটাই চোখে বাঁধলো না নীতির। বরং চোখ ভর্তি উপচে পড়া খুশি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
 
— আপনি আমাকে সত্যিই ডিভোর্স দেবেন নীরব সাহেব?  
 
আটাশ বছরের জীবনে বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে নীরবের। খু নি, সাইকো, মাফিয়া থেকে শুরু করে নিন্মশ্রেনীর চোর-ছ্যাঁচড়ের সঙ্গেও মিশেছে সে চাকরির খাতিরে। কিন্তু ডিভোর্সের কথা শুনে তাও আবার বাসর রাতে এমন মুক্তোঝরানো হাসিমুখ নিয়ে আনন্দিত হতে এই প্রথম বার দেখলো নীরব। বিস্ফোরিত নেত্রে নীতির হাসির দিয়ে চেয়ে মাথাটা একটু কাত করলো। যদিও বোঝা গেলোনা সে কি বোঝাতে চাইছে। তবে নীতি বোধহয় ওই ঘাড়নাড়ানোকে হ্যাঁ হিসেবেই ধরে নিল। নীরবের সামনেই দুচারটা লম্ফঝম্প দিয়ে বললো,
 
— থ্যাংকিউ সো মাচ নীরব সাহেব। আপনি আমার পথ সুগম করে দিলেন। আমি আপনার আচরনে ভেবেছিলাম কাঠালের আঠার মতো আমার গায়ে লেগে যাবেন। আপনি দেখি আগেই সব ঠিক করে রেখেছেন। কবে নাগাদ ডিভোর্স দেবেন?  
নীতির হাসিখুশি আননের দিকে তাঁকিয়ে সম্মোহিত কন্ঠে বলে বসলো নীরব,
 
— দেবো না।
 
পরক্ষনেই বুঝলো গড়মিল করে ফেলেছে। মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেললেও নিজেকে সামলে নিল নীরব। তারপর বললো,
 
— বিয়ের দিনই ডিভোর্স দেয়া যায়না নীতি । ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। আর এই ছয়মাস আমার সঙ্গে থাকতে হবে তোমাকে। তারপর আমি নিজে মুক্ত করে দেবো তোমাকে। এটাই নিয়ম। 
 
— এসব নিয়ম-কানুন কোন বলদে বানায় বলুন তো? হুট করে বিয়ে হলে, হুট করে ডিভোর্স হবারও নিয়ম হওয়া চায়। তাইনা? আরেহবাবা ছয় মাস কি কম সময়? ছয় মাসে পৃথিবীর অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশে কতখানি পরিবর্তন হয় জানেন? পৃথিবী সূর্যকে অর্ধেকটা প্রদক্ষিণ করে ফেলে। যারা ডিভোর্স চায় তারা একসঙ্গে থাকবে না বলেই তো ডিভোর্স চাইছে। আর এরা কি কোরছে? আরও ধরে বেধে একসাথে থাকার জন্য জোরাজোরি কোরছে! উফ! ব্লাডি আইন! 
 
নীতির কথার মাঝে বিড়বিড়িয়ে বললো নীরব, — থ্যাংকস টু হিম। 
 
— কিছু বললেন? 
 
— না। 
 
—ওকে। জুতো পায়ে দিয়ে আপনি কোথায় চললেন মাঝরাতে? আমি আপনাকে বিশ্বাস করলাম। ছয়মাস অর্থাৎ একশো আশিদিন পর আপনি আমায় ডিভোর্স দেবেন। আজ থেকে ছয়মাস আমরা বন্ধু। আপনাকে আমি একটুও বিরক্ত কোরবো না। বরং আপনার জন্য আপনিটাইপ কাউকে খুঁজে এনে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবো। তারপর আপনি আপনার মতো। আমি আমার মতো। ওকে? 
 
— ওকে। 
 
— ডিল? 
 
— ডিল।  
 
প্রফুল্লচিত্তে ফের বিছানার দিকে ছুটলো নীতি। খুশি যেন ধরেনা। গলার কাঁটা এত সহযে উপড়ে ফেলবে কে জানতো? নীতির হাসির দিকে চেয়ে ফের শুধায় নীরব,
 
— আর যদি আমি তোমাকে ছয়মাস পর ডিভোর্স না দিই? 
 
কথাটা শ্রবণগ্রন্থিতে আঘাত হানা মাত্র নীতির ফুরফুরে মেজাজ বিগড়ালো। এই লোক আসলেই মিচকা শয়তান। অগ্নিদৃষ্টিতে নীরবকে দেখে নিয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে উঠিয়ে নিল তখনকার চাকুটা। নীরবের দিকে তাক করে বললো,
 
— তাহলে আমি আপনাকে মে রে ফেলব নীরব। না থাকবে বাঁশ, আর না বাজবে বাঁশি। বুঝেছেন? 
 
 চলবে....
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ১৪
 
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে ছুটে চলা গাড়ির গতি স্বাভাবিকের তুলনায় একটুও বেশিই রাখলো নীরব। সন্ধ্যের আগে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে পৌছানোই একমাত্র লক্ষ্য। শশুরবাড়ি থেকে একেবারে ফিটবাবু সেজে বেরিয়েছে নাস্তার পরপরই । নীতি জানালার গ্লাস নামিয়ে বাইরেটা দেখছিল। আকাশটা মেঘলা। শীতকালে বৃষ্টির সম্ভাবনা ক্ষীণ আমাদের দেশে। তবুও একটু বৃষ্টির জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করলো নীতির।
 
তখনকার কথাটা বলার পর থেকে নীরবকে কেমন যেন গম্ভীর লাগলো নীতির কাছে। মনে মনে নীরবকে ভেঙালো নীতি,
 
— নীরব সাফওয়ান অলরেডি মার্ডারড!
 
তারপর থেকে দুজনই চুপ। মনে মনে ফের ধমকালো নীরবকে, খেতা পুড়ি তোর অলরেডি মার্ডার। বিয়ে হতে না হতেই এই লোকটা সুযোগ খোঁজা শুরু কোরেছে। নীতিকে এখনো চিনে উঠতে পারেনি এই লোক। হাহ! ওইসব সস্তা কথায় নীতি পটবেনা। ডিভোর্স আমি আপনাকে দেবোই নীরব সাফওয়ান সাহেব ।
 
গাড়ি চালানোর ফাঁকে নীতির সঙ্গে অল্প কথা বলছে নীরব।নীতির প্রশ্নের উত্তর গুলো দিচ্ছে একেবারে দায়সারাভাবে। যদিও ভেতরে ভেতরে নীতির কথা শুনতে নীরব যথেষ্ট উদগ্রীব। গাড়ির লুকিং গ্লাসের দিকে নজর পড়লো ওর। আর পড়লো বলেই বেঈমান হৃদযন্ত্রটা আরেকবার কাঁপলো। নীতির পরণে সিদুঁরে লাল রঙা একটা শাড়ি। এটাকে সম্ভবত জামদানী শাড়ি বলে। সকালে নীল শাড়িতেও নীতিকে সদ্য পরিস্ফুটিত অপরাজিতা ফুলের মতো লাগছিল। আর এখনকার লাল শাড়িতে মেয়েটাকে লাগছে রক্তজবার ন্যায়। ঠোঁটেও লাল লিপস্টিক দিয়েছে। নিঁখুত ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দেয়ার ইচ্ছে হলো নীরবের।একটা ঢোক গিললো নীরব। নিজেকে ভীষণ সংযত ব্যক্তি হিসেবেই জানে। সন্ন্যাসী পর্যায়ের না হলেও সে কাছাকাছি ছিল। কিন্তু বদ্ধ গাড়ির মধ্যে এমন বিচ্যুতি হবার কারণ কি? এই উদ্ভট বাচাল মেয়েটাকে বিয়ের পর থেকে নীরবও বদলে যাচ্ছে বোধহয়। হবেই তো। কথায় আছেনা? সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। বছরের পর বছর কড়া ট্রেনিং-এর ফলে নীরব লোহা হয়ে গিয়েছে। তাই এখন নীরবও ভাসছে। লুকিং গ্লাসে নীতিকে দেখার সময় চোখাচোখিও হয়েছে কয়েকবার৷ তড়িৎ নজর সরিয়েছে নীরব। মেয়েটা ওকে হয়তো ছ্যাচড়া ভাবছে! 
 
নীরবের ভাবনার মাঝে রাস্তার পাশে কয়েকটা টংয়ের দোকান চোখে পড়তেই লাফিয়ে উঠলো নীতি। উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,
 
— চা খাবেন? এসব টং এর দোকানের কথা আমি অনেক শুনেছি।উনাদের চায়ের হাত নাকি অসাম। টেস্ট করাবেন? দেখুন? আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না। আসার সময় আংকেল আমাকে বলে দিয়েছেন আপনি যদি আমার কোনো কথা না শোনেন তবে উনাকে জানাতে। উনি আপনাকে মিলিটারি স্পেশাল শাস্তি দিবেন। শাস্তি পেতে না চাইলে গাড়ি থামান নীরব। 
 
একটা সুপ্ত শ্বাস ফেললো নীরব। এই মেয়েটা এত বাচাল কেন? দুটো শব্দে প্রশ্ন ছুড়লেই কাজ শেষ। কিন্তু না! তাহলে তার নাম নীতিপ্রিয়া শাহ হবে কেন? সে করলো বিশাল রচনা! ছোট্ট করে বললো,
 
— আমাদের পৌছাতে দেরি হয়ে যাবে নীতি৷ 
 
— তো? এই সাহস নিয়ে আপনি আর্মি অফিসার হয়েছেন? সামান্য ড্রাইভিংও পারেন না? আপনাদের চোখের টেস্টিং করা হয়না? আপনার চেয়ে দেখি মুরগির কলিজা বড়। খুব বড় বড় বয়ান দিলেন সেদিন আপনি সবসময় আর্মড থাকেন।বেশি ঝামেলা মনে হলে ঠাস ঠাস দুটো বুলেট ঝেড়ে দেবেন। মানে গুল্লি মেরে উড়িয়ে দেবেন। তাও আমি আজ হাইওয়ের চা না খেয়ে যাবো না। আজ চট্টগ্রাম পৌছালে কাল সিলেট ব্যাক কোরবো। বুঝেছেন? নতুন বিয়ে করা বউ আমি আপনার। সামান্য এক কাপ চা খেতে চেয়েছে। আর আপনি কিপটামো করছেন? বিল না হয় আমি পে করে দেব। তা-ও আপনার পালকি থামান। আপনার মতো অত বড় চাকরি না করলেও আমার মন অনেক বড়।আপনাকেও খাওয়াবো। চলুন? চলুন না নীরব? 
 
কথায় কথা বাড়ে। নীরব জানে। কিন্তু মানতে হয়তো পারলো না। আর পারবে কিভাবে? সঙ্গদোষ হয়েছে না ওর। সঙ্গদোষের প্রভাবে নীরব বলে বসলো,
 
— নতুন বিয়ে করলে চা খাওয়াতে হবে কেন? 
 
— আপনি যাবেন না? গাড়ি থামান। আমি বাড়ি ফিরে যাবো। আপনার মতো কাঠখোট্টা লোকের সঙ্গে কোথাও যাবো না। সামান্য চা খাওয়া নিয়ে কিপটামি? সরকারি ফ্রি রেশনের চাল-ডাল খেতে খেতে আপনাদের ভুড়ি হয় থলথলে। পকেটের টাকা খরচ করে কিছু কিনে খেতে গেলেই পেটে মোচড় দেয় নাকি? 
 
ছোট্ট করে একটা শ্বাস ফেললো নীরব। যেচেপড়ে আধাপাগল বিয়ে কোরলে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়াটা আমূলক কিছু নয়। বরং চা না খেলে দেখা যাবে ওর কান দুটো চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। কান হারিয়ে কালা হয়ে যাবার চেয়ে চা খেয়ে আসা যাক। কিন্তু আসন্ন দিনগুলোতে আরো কত উদ্ভট কাজকাম সঙ্গী হতে হবে ভেবে শংকিত হলো নীরব। ওসব শংকা আপাতত গাড়ির ডিকিতে ছুড়ে ফেলে নীতির হুকুম তামিলের স্বরে বললো,
 
— চলুন নতুন বিয়ে করা বউ.. আপনাকে হাইওয়ের চা খাইয়ে নিয়ে আসি।
 
চায়ের আনন্দে ঝকঝকে হাসলো নীতি। ভীষণ মিষ্টি হাসি। নীরবের কাছে মনে হলো হাসি থেকে বুঝি কয়েক মণ চিনি গড়িয়ে পড়লো! সেই ঠোঁট ভর্তি হাসি নিয়েই বললো,
 
— চলুন নীরব সাহেব। 
 
মাটির ভাড়ে দুকাপ চা আনলো নীরব৷দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেয়া মালাই চা। উপরে স্বরের আস্তরণ। চা-পাতার জ্বালে লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। চায়ের সুঘ্রাণে ম ম কোরছে গোটা এলাকা। বিকেলটাও পড়ে এসেছে। নরম আলোয় চারপাশ ছড়িয়ে আছে। সারিসারি গাছ, কোথাও আবার কুয়াশাও পড়তে শুরু কোরেছে। এমনই বিকেলে হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে চা খাওয়াটা নীরবের কাছে অকল্পনীয় মনে হলো। তার রুটিনবাঁধা জীবন। টি-ব্রেক বলে কোনো কথা নেই সেখানে। আর আজ কি না হাইওয়েতে চা খাচ্ছে!
 
একটুও দেরি না করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আমেজে চোখ বন্ধ করে ফেললো নীতি। মাথা নাড়িয়ে বললো,
 
— অমৃত! এত মজার চা আপনার জন্য মিস হয়ে যাচ্ছিলো নীরব সাহেব। কিন্তু আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? টেস্ট করুন। টেস্ট করে আমায় ধন্যবাদ দিন।
 
 চায়ের কাপে নীরবও চুমুক দিলো ছোট্ট করে। আসল কথা হচ্ছে নীরব চা খায়না। ওকে কেউ কোনোদিন জোর করেও চা খাওয়াতে পারেনি। আজকে কি না সেধে সেধে চা খাচ্ছে! খেয়ে অবশ্য খারাপ লাগলো না। আবার একটা চুমুক দিয়ে বললো,
 
— ধন্যবাদ নীতিপ্রিয়া শাহ।
 
— আমার নামটা আপনার কি বেশি পছন্দ হয়েছে নীরব সাহেব? 
 
— কেন বলুন তো? 
 
— বেশিরভাগ সময়ই নীতিপ্রিয়া ডাকছেন। তাই। আমাকে পুরো নামে কেউ ডাকেনা। 
 
নীরবের বলতে ইচ্ছে হলো আপনাকেই আমার একটু বেশি পছন্দ হয়েছে নীতিপ্রিয়া। তবে গিলে নিল কথাটুকু। ধমকালোও নিজেকে। ওর মধ্যে একজন ছ্যাচড়া নীরব ঘাঁটি গেড়েছে কবে? টেরই পেলো না। কিন্তু বিরস মুখে বললো,
 
— এমনিই। এত সুন্দর নাম আগে শুনিনি তা-ই। 
 
— ফ্লার্ট করছেন? 
 
— ট্রায়িং.. 
 
— খুব লেইম ফ্লার্টিং স্কিল আপনার। ইমপ্রুভমেন্ট প্রয়োজন। 
 
— এস ইউ কমান্ড, নতুন বিয়ে করা বউ। 
 
— কি ব্যপার নীরব সাহেব? মুখের বুলি ফুটছে এত! 
 
— সঙ্গদোষ। 
 
মেকি রাগ নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট টিপে নীরবের দিকে তাঁকালো নীতি। বললো, 
 
— আপনার নাক কেটে দেবো আমি নীরব সাহেব। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমাকে বাচাল বললেন তাইনা? আমি মোটেও অতিরিক্ত কথা বলিনা বুঝেছেন?
 
— আমার নাকটা কি আপনার একেবারেই পছন্দ নয় নীতি? সেই দেখা হবার দিন থেকে নাকের পেছনে পড়ে আছেন? ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে নাকি প্লাস্টিক সার্জারি জন্য? অবলা নাক আর কত আপনার রোশানলে পড়ে অত্যাচার সহ্য করবে? 
 
নীরবের কথায় হেসে ফেললো নীতি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নীরব ফের বললো,
 
— আমি স্মোক কোরতে পারি নীতিপ্রিয়া? 
 
ভ্রু কুঁচকে গেলো নীতির। এই লোক সিগারেট ধরাবে তাতে ওর কি? কই? চাতালগাও স্টেশনে তো পারমিশন চায়নি? তবে? এখন চাইছে কেন? সবই ঢং। হাজার হোক পুরুষ মানুষ। একটু ভাব নিতে চাইছে নীতির কাছে! এসব ভাব গোনার সময় নেই নীতির। মনে মনে বললো,
 
— তোর ভাব ধুয়ে তুই পানি খা হুলো মিলিটারি। 
আর মুখে বললো,
 
— সিগারেট ধরাবেন? 
 
— জী। যদি আপনার পারমিশন থাকে? 
 
ঠোঁট টিপে হাসলো নীতি। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় বারবার চুল উড়ছে বিধায় সেগুলো টেনে একপাশে আনলো। এনে বললো,
 
— আপনারা আর্মিরা এমন রোবট কেন? চেইন অফ কমান্ড ছাড়া কিছুই কোরতে পারেন না? সবকিছু অনুমতি নিয়ে করা লাগবে কেন? এই জন্যই আমার আর্মিদের পছন্দ না। এলোমেলো হওয়াটা আপনারা বোঝেনই না। মানুষের জীবন রোবটিক ওয়েতে চলতে পারেনা। মানুষ ভুল করবে।ভালোবাসবে। তবেই না জীবন পূর্নতা পাবে।
 
— সো? অনুমতি দিচ্ছেন, ইয়োর হাইনেস? 
 
— আপনার সঙ্গে কি আমাকেও স্মোকিং কোরতে হবে? 
 
ভ্যাবলার মতো মাথা নাড়ায় নীরব। বললো,
 
— না। তবে আপনি চাইলে করতেই পারেন। মেয়েরা আজকাল কোনো বিষয়ে পিছিয়ে নেই। 
 
— তবে আমার কাছে অনুমতি চাইছেন কেন? আপনি আপনার লাইফে যা ইচ্ছা কোরতে পারেন নীরব সাহেব। মাত্র ছমাসের ব্যপার। এরপর আমাদের রাস্তা ভিন্ন। সুতরাং আমার জন্য আপনার কোনো অভ্যস চেঞ্জ করার প্রয়োজন নেই।
 
বিপরীতে আর কোনো কথা বললো না নীরব। কিন্তু আরেকবার চায়ে চুমুক দিতেই ভীষণ তেতো ঠেকলো ওটা। নেহায়েতই অখাদ্য ব্যতীত আর কিছু নয় যেন। সুন্দর সময়ের তাল কেটে গেল্প ওদের। 
 
ধীর পায়ে নীতির কাছে সরে এলো। দোকানীর বিল মিটিয়ে দিলো। এরপর পিছু ফিরতেই নজর পড়লো নীতির উপর৷ শীতের হিমেল বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে ওর। সেই সঙ্গে খোলা চুলে যেন পটে আঁকা কোনো ছবি মনে হলো। ঝটপট মোবাইল বের করে একটা ছবি তুলে নেয় নীরব। ঠোঁটের কোনে ফুটলো মৃদু হাসি। 
 
----------
 
নীরবের কোয়ার্টারের সামনে এসে গাড়ি থামলো। তখন প্রায় রাত আটটা। গাড়ি থেকে ঝটপট বেরিয়ে এসে নীতির পাশের দরজা খুলে দেয় নীরব।
 
গাড়ি থেকে নামতে নামতে নীতি বললো,
 
— নিজেকে ভি আইপি মনে হচ্ছে নীরব সাহেব। 
 
— ওয়েলকাম নীতিপ্রিয়া। তুমি একটু এখানে অপেক্ষা করো। 
 
বলেই লক খুলে ভেতরে চলে গেলো নীরব৷ দরজা আটকে দিলো ভেতর থেকে। তার পর থেকে নীরবের আর সাড়াশব্দ নেই। 
 
প্রথমে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও এবারে উদ্বিগ্ন হলো নীতি। এই লোকের ভরসা নেই। নীতিকে সারারাত বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি? দরজায় টোকা দিলো কয়েকটা। ডাকলো মিহিস্বরে,
 
— নীরব? আমি কি চলে যাবো? ভেতরে আসতে দেবেন না তাহলে সিলেট থেকে আমাকে টেনে আনলেন কেন? আমি আপনার অতিথি। শুনছেন? আমি অল্প কিছুদিন থেকে চলে যাবো তো! নী... 
 
তখনই খুলে গেলো দরজা। নীরব দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁট জুড়ে লেপ্টে আছে বিশ্বজয় করার মতো হাসি। সন্দিহান হয়ে যায় নীতি। কি এমন করছিল ঘর আটকে? মেয়ে এনে ফুর্তি করে নাকি? মদটদও খেতে পারে। মিলিটারিদের দিয়ে বিশ্বাস নেই। সেসব এভিডেন্স গায়েব করলো? নাকি অন্যকিছু?
 
— কি করছিলেন? বলেই ঘরের ভেতরে চোখ পড়লো নীতির। ফ্লোরে ফুল ছিটিয়ে রাখা। একটা ওয়েলকাম কার্ড টাঙিয়ে রাখা পেছনের দেয়ালে। কয়েক রকমের ফেইরি লাইট জ্বলছে। নীরবের হাতে একটা টকটকে লাল গোলাপ ফুলের তোড়া। সেটা নীতির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
 
— ওয়েলকাম ইন ইয়োর হোম নীতিপ্রিয়া। 
 নীতি হতবাক হয়ে যায়। বললো,
 
— এসব কখন করলেন? 
 
— আসুন। কেক কাটুন৷ দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললো নীরব। হাসি মুখে ভেতরে এলো নীতি। বেশ পরিপাটি একটা ফ্ল্যাট। ব্যাচেলরস ডেন সচারাচর যেমন হয়। বাসাটা ঠিক তার উল্টো। চারিদিকে সবকিছু গোছানো। কোথাও ধুলোর আস্তরণ নেই। টুকুর টুকুর করে চারিদিকে দেখতে থাকে নীতি। বাসাটা যে একটা ছেলে মানুষের বোঝারই উপায় নেই। অন্যদিকে নীতি নিজের ঘর সাত দিনেও গোছায় না। জামা কাপড় লতা বেগম খুঁজে না ধুয়ে দিলে ওভাবেই পড়ে থাকে! যাক ডিভোর্সটা দেয়ার সিদ্ধান্তটাই উত্তম। এমন রোবটিক লোকের সঙ্গে সারাজীবন কাটানো ইম্পসিবল। 
 
টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে কেক কাটলো। ফ্লেভারটা দেখে চক্ষুচড়কগাছ হলো। ওর প্রিয় রেড ভেলভেট কেক! 
 
— আপনি আমার প্রিয় কেক নিয়ে জানলেন কিভাবে? 
 
— গেস করলাম। 
 
— কিভাবে? 
 
— ব্যাক ম্যাজিক করে। 
 
— ধুর। সত্যি কথা বলেন। 
 
— প্রীতি বলেছিল নীলয়কে। 
 
— আর আপনার ভাই আপনাকে পাচার করেছে। 
 
— জী। 
 
কেক কেটে নীতি আশেপাশে নজর বুলিয়ে বললো,
 
— হুম। বাসাটা ভালো সাজিয়েছেন। গুড। ঘুরে দেখি? 
 
— আগে ফ্রেশ হয়ে নিন।রাস্তার ধুলো-ময়লা লেগে আছে। 
 
— হ্যাঁ যাচ্ছি। 
 
— ওই রুমটা... হাত উঁচিয়ে দেখোলো নীরব। 
মুহুর্তে থমকে গেলো নীতি। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
 
— আপনার রুম কোনটা? 
 
ঠোঁট টিপে হাসলো নীরব। বুকের সসঙ্গে হাত বেঁধে নীতির সামনা-সামনি সটান দাঁড়ালো। বললো,
 
— ভয় পাবার কোনো কারণ নেই নীতিপ্রিয়া। আমার রুম আপনার উল্টোপাশেরটা। 
 
— গুড। চিন্তাও করবেন না। নয়তো..
 
— নয়তো কি? রাতে বালিশ চাপা দেবেন? 
 
মিটিমিটি করে হাসলো নীতি। যেতে যেতে বললো,
 
— দিতেও পারি। 
 
--------
 
ফ্রেশ হয়ে বাইরে এলো নীতি। শাড়ি ছেড়ে পরেছে ঘরোয়া পোশাক। নীতির প্রিয় টিশার্ট এবং প্লাজু। কালো টিশার্টের উপর সাদা বাংলা অক্ষরে বড়বড় করে লেখা 'তুমি একটা বোকা' সঙ্গে একটা চোখ টেপা ইমোজি। রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসছে থেকে সেদিকেই গেলো নীতি। একটুও শব্দ না করে এগোলেও নীরব পিছু না ফিরেই বললো,
 
— বিশ্রাম নেয়া শেষ? 
 
— আপনি জানলেন কিভাবে আমি এসেছি? পেছনে দুটো চোখ আছে নাকি? 
 
নীরবের বলতে ইচ্ছে হলো আপনার শ্যাম্পুর কড়া ঘ্রাণই মেইন কালপ্রিট নীতি। ওটা নীরবকে টাল-মাটাল করে দিচ্ছে। কিন্তু কিছুই বললো না নীরব। সে গোসল সেরে খাবারের বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। একঘন্টা আগে থেকেই খাবারের অর্ডার করেছিল। সেটা একটু আগে পৌছেছে। প্লেটিংয়ের কাজ কোরছে দ্রুত হাতে। তবে নীতি কি চুপ করে থাকতে পারে? ফের বললো,
 
— আপনার আবার স্পেশাল ট্রেনিং আছে তাইনা? শব্দ না শুনেও অনেক কিছু বুঝতে পারে। আচ্ছা আপনাদের এত কড়া ট্রেনিং দিয়ে লাভ কি? 
 
— আমরা দেশের স্বার্থে কাজ করি নীতি। জরুরি নয় সব খবর মিডিয়ায় প্রচারিত হবে। ঢোল পিটিয়ে তো আর আসামি ধরা যায়না। 
 
— হুম...  
 
নীরবের অমন ঝটপট খাবার গোছানো, ঘরের ডেকোরেশন, সাফ-সুতরো পরিবেশ এবং সাজানো-গোছানো আসবাবপত্র, পর্দা থেকে বিছানার চাদর অব্দি ঝকঝকে! সবকিছু ভালোভাবে দেখে নিয়ে বিস্ময় নিয়ে নীতি বললো,
 
 — আপনি ঘর মুছতে পারেন? 
 
— জী।
 
— রান্নাবান্না?  
 
— জী পারি। 
 
— কাপড় ধুতে পারেন? 
 
— জী। 
 
ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসলো নীতি। কিচেন ক্যাবিনেটের উপর বসতে বসতে বললো,
 
— আপনি তো পুরাই গ্রিন ফ্ল্যাগ নীরব। ইউ ডিজার্ভ বেটার। 
 
ঝটঝট চলতে থাকা হাত দুটো থেমে গেলো নীরবের। স্মিত হেসে সেও তাল মেলালো,
 
— তাহলে ডিভোর্সটা ক্যান্সেল করিয়ে দেবো নীতিপ্রিয়া? 
 
নীরবের কথা শোনামাত্র পাশের সেল্ফে রাখা বড় চাকুটা উঠিয়ে নেয় নীতি। সেটাকে নীরবের দিকে তাক করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
 
— আপনার কি জীবনের মায়া নেই নীরব সাহেব? 
 
চলবে...
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ১৫ 
 
  মোবাইল ফোনের রিংটোন বাজতেই চাকুটা নামিয়ে রাখলো নীতি। মোবাইলটা উঠিয়ে দেখলো স্ক্রিনে ভেসে আছে ওর মায়ের নাম্বার। না চাইতেও ফোনটা এখন রিসিভ করতে হবে। একগাদা নীতিবাক্য এখন নীতির দিকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছুঁড়ে দেবেন লতা বেগম। নীতি একটু ভয়ই পেলো।তার পতিব্রতা আম্মাজান আবার রাতে নীরবের পা টিপে দেয়ার জন্যও বলতে পারেন৷ অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওর মায়ের ধারণা কপাল গুণে এত ভালো জামাই পেয়েছে নীতি। ফোন নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে নীরবকে উদেশ্যে করে বললো,
 
— 'এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন নীরব সাহেব। নয়তো সরকারি চাকরি করে যেই থলথলে ভুড়ি বানিয়েছেন না? আজ ওটা ফাসায়ে সব তেল-চর্বি বের করে ফেলতাম।'
 
  প্লেটে খাবার সাজানোর ব্যস্ত হাতটা থেমে গেলো নীরবের। ঠোঁট টিপে খানিকটা হেসে দুহাত উঁচু করে আর্ত্নসমার্পন করলো। কন্ঠে মেকী ভয় ঢেলে আওড়ালো, 
 
— ’এজ ইউ কমান্ড, মাই লেডি।’
 
— 'আবার?' 
 
কিচেন ক্যাবিনেট থেকে নেমে দাঁড়ালো নীতি। দ্রুত পায়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে যাবার আগে ফের বললো,
 
— আপনার তৈলাক্ত ভুড়ি আমি অবশ্যই ফাসাবো নীরব সাফওয়ান সাহেব। ওয়েট করুন। 
 
কিচেন থেকে বাইরে এসে মোবাইল কানে ধরতেই ওপাশ থেকে চাপাস্বরে ধমকালেন লতা বেগম। বললেন,
 
— নীরবের সঙ্গে কোনো বেয়াদবি করোনি তো? আর শোনো একদম বাচালগিরি করবে না, বুঝেছো? পৌছে ফোন দিতে বলেছিলাম না? সেটা করোনি কেন? নীরবই আমাদের জানালো। এত ভালো ছেলে! 
 
মায়ের অমন আকস্মিক বাক্যবাণে হচকায় নীতি। বিস্ফোরিত নেত্রে মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে নাম্বারটা আরেকবার রিচেক করে নিল। নতুবা কোন মা বিয়ের পরপরই মেয়ের সাইড পালটে ফেলেন। বিস্ময় নিয়ে মাকে বললো,
 
— আমি তোমার পেটের মেয়ে নই? নাকি হাসপাতাল থেকে কুড়িয়ে এনেছিলে? হুট করে অচেনা এক পুরুষের সঙ্গে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছো। তোমার মেয়েকে যদি এই লোক অন্যদেশে পাচার করে দেয়? সেসব হুশ আছে তোমাদের? চারিদিকে পাহাড়। ধরো এও লোক কোনো আর্মি-টার্মি না। নারী পাচারকারী। আমার মতো সুন্দরী মেয়েদের বিয়ের ফাঁদে ফেলে, আর তোমার মতো ঘষেটি টাইপ মায়েদের ভোলাভালা হবার সুযোগ নিয়ে পাচার করে দেয় তখন কি করবে? হু? বলো? আমাকে দেখি মেয়ে বলেই মানো না তুমি আম্মা! আমি আর সিলেট ফিরবোই না। 
 
মেয়ের কথায় এবারে হতবম্ভ হলেন লতা বেগম। এই বিচ্ছু মেয়ে কিসব বলছে? নাহ এমনিই জোর করে বিয়ে করে দিয়েছেন। আবার যদি ধমকান তবে মেয়ে তো বেকে বসবে। থামলেন লতা বেগম। কণ্ঠে মমতা ঢেলে বোঝান মেয়েকে, 
 
— আমরা অনেক খোঁজ-খবর নিয়েই তোমার বিয়ে দিয়েছি নীতি। নীরবের মতো ছেলেই হয়না। ওর সঙ্গে বেয়াদবি করবে না। আর মুখ বন্ধ রাখবে।
 
— আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলিনা মা। 
 
— তোমার প্রয়োজন জানা আছে আমার বাচাল মেয়ে। 
 
এবারে লতার কাছ থেকে ফোন ছিনিয়ে নিলেন নীতির নানি। সত্তরের পৌড়া হলেও তিনি নিজের ঠাট-বাট ঠিক রেখেছেন। নিয়মিত চুলে কলপ লাগান। সপ্তাহে তিনদিন মুলতানি মাটি আর গোলাপজলের ফেসপ্যাক লাগান। মেপে মেপে খাবার খান। যার কারণে তার বয়স বোঝা যায়না৷ আগের যুগের হলেও তিনি নতুন মডেলের আইফোন ব্যবহার করেন। টিকটকে কোমর দুলিয়ে ফিল্টার দিয়ে নাচেন। বলা যায় তিনি একজন টিকটক সেলিব্রেটি। ফোনের ওপাশ থেকে নীতিকে বললেন,
 
— শোনো নানুমনি? রাতে শোবার আগে শাড়ি পরবা। আচ্ছা? এখনই বয়স তোমার জামাইয়ের সোহাগ নেয়ার। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করবা, বুঝছো? প্রথম রাতে পদ্ধতি করতে বলবা জামাইকে। নাহয় দেখা যাবে দুই দিন ট্যা ট্যা হয়ে যাবে। মজা করতে পারবা না। তোমাদের ছবি আমি আইডিতে ছেড়ে দিয়েছি। সবাই বাহবা দিচ্ছে আমার নাত জামাইকে। রাতে মটকা মেরে বিছানায় পড়ে থাকবা না। 
 
নানীর অমন কথায় ভ্যাবাচেকা খেলো নীতি। খুক খুক করে কাশলো। দিশেহারা অবস্থা হলো ওর। ফোন কাটলো তড়িৎ। বলে কি এই টিকটকার বুড়ি? ডেঞ্জারাস! যেমন মেয়ে, তেমন তার মা। কেউ নীতিকে আসলে ভালোবাসেনা। হাহ! ওই সরকারি চাকরিজীবীকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা দূরে থাক, কাছে আসার চেষ্টা করলে বালিশ চাপা দেবে নীতি। অথচ নীতির একবারও মনে হলোনা একজন স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত সুপার কমান্ডোকে আদৌও বালিশ চাপা দেয়া সম্ভব? তাও নীতির মতো পাটকাঠির মতো শরীর নিয়ে?
 
------------- 
 
নীতির ঘুম ভাঙলো পরিচিত কিন্তু অপ্রীতিকর ব্যথা নিয়ে৷ নীরব ওর জন্য যেই ঘর বরান্দ করেছে তাতে দেয়ালের সঙ্গে বেশ বড় একটা ডিজিটাল ক্লক সেট করা। সেই ঘড়িতে জানান দিচ্ছে সবে ভোর ছটা। ঠোঁট কামড়ে ব্যথা সংবরণ করলো নীতি। ছুটে গেলো লাগেজের কাছে। লাগেজের মধ্যে হন্য হয়ে খুঁজলো কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা। কিন্তু নেই। কে জানতো এমন গোলমেলে সিচুয়েশনে সে এসে হাজির হবে! তলপেটের অসহনীয় ব্যথাটা প্রতিমাসে এসে হানা দেয় নীতির। তিনটা দিনের জন্য নীতিকে কুপোকাত করে ফেলে একেবারে৷ চুপচাপ বসে রইলো বিমুঢ় চিত্তে কতক্ষন। কিন্তু বসে থেকে উপায় নেই। অতীব প্রয়োজনীয় জিনিসটা ব্যবস্থা করতে হবে। ধীরে-সুস্থে হেঁটে বাইরে এলো নীতি। নীরব সম্ভবত ঘুমিয়ে আছে এখনো। এরমধ্যে চুপ করে বেরিয়ে যাবে বাসা থেকে। ঝটপট টিশার্টর উপর একটা ট্রেঞ্চকোর্ট পরলো নীতি। ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। সদর দরজার কাছে এসে অবশ্য একটা ঝটকা খেলো। দরজাটা হাট করে খোলা। সামনে ছোট্ট উঠোন মতো একফালি জায়গা।সেখানে ক্রমাগত পুশ আপ দিয়ে চলেছে নীরব। শরীরের পেশী ফুলে আছে সব। ওর গায়ে শুধুমাত্র চিকন স্লিভের টিশার্ট আর জংলি ছাপা ট্রাউজার। টানা পুশ আপ দিয়ে যাচ্ছে নীরব। নাকের ডগা থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। তবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গুনলো নীতি। টানা পঞ্চাশটা পুশ আপ দিয়ে তবেই থেমেছে নীরব। বিস্ময় নিয়ে দেখতে থাকে এইলোককে আর থলথলে ভুড়িওয়ালা বলা যাবেনা! পুশ আপ শেষ করে ড্যাম্বেল উঠিয়ে নিল নীরব। ড্যাম্বেলের উঠানামা করার মাঝে দরজার দিকে নজর পড়তেই থমকালো। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
 
— আপনি? এত সকালে? কোনো প্রব্লেম? 
 
ইতস্ততভাবে একটু সামনে এগিয়ে এলো নীতি। তলপেটের অসহনীয় ব্যথায় চেহারাটা শুকনো লাগছে ওর। একটা অসুস্থতার ছাপ গোটা চেহারায়। নীরবও খেয়াল করলো। ড্যাম্বেল ফেলে এগিয়ে এলো তড়িৎ। ব্যস্ত হয়ে ফের শুধালো,
 
— আপনি অসুস্থ? রাতেও তো সুস্থ ছিলেন। ঘুম হয়নি? মাথা ব্যথা করছে নাকি? 
 
নীরবের একগাদা প্রশ্নে খেই হারালো নীতি। আমতা-আমতা করে বললো,
 
— আমার কিছু মেডিসিন প্রয়োজন। 
 
এগিয়ে এসে বিনাদ্বিধায় নীতির কপালে হাত রাখলো সে। কপালটা গরম লাগছে। উদ্ব্যেগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে নীরব বললো,
 
— কোন মেডিসিন? আমায় নাম বলুন। আমি এনে দিচ্ছি। ফার্মেসী এখান থেকে বেশ দূরে। আপনার জ্বরও এসেছে। কাল রাতেও তো সুস্থ ছিলেন। 
 
আবারও ইতস্তত করলো নীতি। অন্যসময় কথার ফোয়ারা ছুটলেও এখন কোনো কথা খুঁযে পাচ্ছেনা নীতি৷ মিনমিন করে বললো,
 
— আপনি পারবেন না। আমি যাচ্ছি। আমাকে লোকেশানটা বলুন। 
 
পেটের ব্যথায় দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিল নীতির। দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে ফের বললো,
 
— আমি আমায় ঠিকানা বলুন। আমি একাই যেতে পারবো। 
 
তীক্ষ্ণ নজরে নীতিকে পর্যবেক্ষণ করলো নীরব। অন্যসময় কথার ফুলঝুরি ছোটানো মেয়েটা হঠাৎ মিয়িয়ে গেলো কেন? কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো নীরবের। সে তো আর এসবে অভ্যস্ত নয়। তবুও আন্দাজ করতে পারলো।আর পারলো বলেই সহজ গলায় বললো, 
 
— আপনি রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিন নীতি। আই উইল বি ব্যাক ইন টেন মিনিটস।
 
 বলেই নীতিকে পালটা কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উঠোনে রাখা চেয়ারের উপর থেকে জ্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে গেলো দ্রুত পায়ে। 
নীরব বেরিয়ে যেতে লজ্জা পেলো নীতি। ইশ! কি ভাবলো এই লোক! এমন অপ্রীতিকর মুহুর্তে পড়ার চেয়ে মাটি দুভাগ হয়ে ওকে গিলে ফেললে ভালো হতো! ধুর..ধুর।
 
--------- 
 
ফার্মাসিতে এসে নীরব যেন কুল-কিনারাহীণ মহাসমুদ্রে পড়লো। স্যানিটারি ন্যাপকিনের এত ভ্যারাইটিস হয়! সে তো বীরপুরুষ সেজে ছুটে বেরিয়ে এলো। নীতিকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন ছিল। তবে এখন কোনটা নেবে? আর সবথেকে বড় কথা কয়টা নেবে? মাথা ঘুরতে লাগলো ওর! কিশোর বয়সে বায়োলজি বইয়ে যতটুকু পড়েছিল মেয়েদের ঋতুস্রাব প্রায় সাতদিন থাকে। তবে? সে কি করবে এখন। অত চিন্তা করার সময় নেই নীরবের। সাতদিনের জন্য কয় প্যাকেট প্রয়োজন? ফার্মাসিতে উদ্ভ্রান্তের মতো এমাথা-ওমাথা পায়চারি করলো। শেষমেষ কালক্ষেপণ না করে একে একে ওখানে থাকা প্রায় সব ব্র‍্যান্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিনের পাঁচটা করে প্যাকেট উঠিয়ে নিল। সঙ্গে আরও কিছু মেডিসিন নিয়ে নিল। সবকিছু বিল দেয়ার সময় নজর পড়লো চকলেটের উপর। বেশ কয়েকটা চকলেটও নিয়ে নেয় নীরব। 
 
বিল দেয়ার সময় দোকানির ঠোঁট টিপে হাসিটা ঠিকই নজরে এলো নীরবের। কিন্তু কারণ ধরতে পারলো না। তাছাড়া আর্মিদের সঙ্গে একটু বুঝে-শুনে কথা বলতে হয় দোকানদারও জানেন। তাই হয়তো কিছু বলতে পারছেনা। সে সদা গম্ভীর মানুষ। আর্মিতে জয়েন করার পর আরও গম্ভীর হয়েছে। যারকারণে ওকে সবাইই সমীহ করে চলে। তারপরও একটু হাস্যরসিক হয়ে দোকানদার বললো,
 
— স্যার আর কিছু? 
 
— নাথিং। 
 
ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে দ্রুত গতিতে হেঁটে বাসায় ফিরলো নীরব। নীতি নিজের কামরায় ছিল। দরজায় আলতো টোকা পড়তেই খুলে দিল। নীরব দাঁড়িয়ে আছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। বললো,
 
— ফ্রেশ হয়ে আসুন। নাস্তা করে মেডিসিন নেবেন। 
 
বলেই ব্যাগটা ওর হাতে দিয়ে চট করে ওখান থেকে সরে গেলো নীরব৷ নীতিকে কোনো অকওয়ার্ড মুহুর্তে ফেলতে চায়না সে। ওদিকে নীরবের দিয়ে যাওয়া ব্যাগ দেখে নীতি হতবাক! ব্যাগের মধ্যে থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে কয়েকটা ব্র‍্যান্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিন। থ বলে গেলো নীতি। এই লোক কি পাগল? এতগুলো এনেছে কেন? ঠোঁটের কোনে একটা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেলো নীতির৷ বিড়বিড়িয়ে বললো,
 
— মাথামোটা লেফটেন্যান্ট! 
 
 
ফ্রেশ হয়ে বাইরে এলো নীতি। মাথাটা নিচু করে রেখেছে ও। ওকে দেখেই নাস্তার প্লেট এগিয়ে দেয় নীরব। দুটো ডিম সিদ্ধ, দুটো খেজুর, কিছু রোস্টেড বাদাম, ব্রেড টোস্ট আর এক গ্লাস চকলেট মিল্ক। এগিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারটাও টেনে দেয় নীতির জন্য। বললো,
 
— বসুন। পিরিয়ড খুবই ন্যাচারাল একটা বিষয়। এটা নিয়ে এত ইতস্তত হবার কোনো কারণ নেই। আপনারা মেয়েরা তো লজ্জা পেয়ে পেয়ে সাধারণ বিষয়টাকে ট্যাবু বানিয়ে ফেলেছেন। নাস্তাটা শেষে মেডিসিন গুলো খেয়ে নিবেন। আমার অফিস আছে আজ থেকে। আমি আসছি।  
 
টেবিলে বসলো নীতি। যদিও নীরব ওকে স্বাভাবিক হতে বলেছে কিন্তু সে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। লজ্জা লাগছে ভীষণ। মিনমিন করে বললো,
 
— ফিরবেন কখন? 
 
— সন্ধ্যের মধ্যেই। কেন? আপনার কিছু প্রয়োজন? বলেই হাসলো নীরব। ঠেস দেওয়া গলায় ফের বললো,
 
— আবার বিষ চেয়ে বসবেন না যেন। আপনি তো কালনাগিনী। এক ছোবলে কয়েকজনকে ছবি করার মত বিষের স্টক করে রাখেন। স্টক আউট হবার আগে ফিলাপ করে ফেলবেন ওকে?
 
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে গরম চোখে তাঁকালো নীতি। নাস্তার প্লেট টেনে খেতে খেতে বললো,
 
— প্রথম ছোবলটা আপনাকে দিয়েই শুরু করবো নীরব। ওঝার কাছে যাবারও সময় পাবেন না। বউকে কালনাগিনী বলা তাইনা? 
 
নীতিকে আবারও অবাক করে দিয়ে দু'লাইন আওড়ালো নীরব, 
 
—তুমি হাকিম হইয়া হুকুম কর
পুলিশ হইয়া ধর
সর্প হইয়া দংশন কর
ওঝা হইয়া ঝাড়...
 
চলবে...
Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner