আঁখি কে বিয়ের সাজে সাজানো হয়েছে। লাল টুকটুকে বেনারসি তে ছোট্ট মেয়ে টাকে একদম রানীর মতো লাগছে। কিন্তু বিয়ের আনন্দ বোধহয় মেয়েটার মন কে স্পর্শ করতে পারে নি। পারবেই বা কেমন করে ,দশম শ্রেণির গন্ডি পেরোনোর আগেই তো মেয়েটাকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ও রাজি ছিল না কিন্তু বাবা মায়ের জোড়াজোড়ির কারণে রাজি হতে হয়েছে। কিছু দিন আগে যে মেয়ে টি মাথায় দুই বিনুনি করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেত সেই মেয়েটি আজ বিয়ের পিরিতে! বাবা মায়ের এক কথার কাছে দমে যেতে হয়েছে তাকে। তাদের ভাষ্য মতে এত ভালো ছেলে পেয়েছে মিস করা যাবে না। আর আরাব যথেষ্ট সুন্দর,নম্র,ভদ্র। এমন ছেলে লাখে একটা , মিস হয়ে গেলে পরে আপসোস করতে হবে। এত বড়ো বোকামি কেই বা করতে চায়?
আঁখির বয়স সবে ষোলো আরাবের পঁচিশ। আঁখির কানে শুধু মাত্র একটি শব্দ ই আসল, কাজী সাহেবের বলা সেই মূল্যবান কথাটি এই বিয়ে তে রাজি থাকলে বলো কবুল। আঁখি কিছুক্ষণ পর বলল কবুল। সবার মুখে আলহামদুল্লিহ শোনা গেল। আঁখি যেন স্থির হয়ে আছে। তার আরাব কে পছন্দ না বা অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে এমন না। তার মনে জমে আছে এক সমুদ্র অভিমান। তার এখন বিয়ের বয়স নয় যে। তবে বিয়ে হয়ে ই গেলো। আরাবের মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। সে যে তার স্বপ্নের রানীকে পেয়ে গেছে। সম্পূর্ণ রূপে, পুরোপুরি হালাল ভাবে। যার মাঝে আছে শুধু পবিত্রতা আর পবিত্রতা।
বিয়ের পর আঁখি তার শ্বশুর বাড়ি যায় নি। শ্বশুর বাড়ির কাউকে ঠিকঠাক চিনে ও না। বিয়ের দিনই সবাই কে কোনো রকমে চোখের দেখা দেখেছে। কিন্তু বিয়ের পিরিতে বসে কি কাউকে ওভাবে চেনা যায়? চেনা যায় না। আর তার ওপর ওর এই বিয়ে তে রয়েছে এক আকাশসম অভিমান।
আঁখিকে যেহেতু জোড় করেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই আঁখির একবার বলাতেই সবাই রাজি হয়ে গেছে। সবার একই রকম কথা, যে থাক না মেয়ে টা, বিয়ে টার সাথে মানিয়ে নিয়ে তারপর না হয় শ্বশুর বাড়ি যাবে।
বিয়ের বেশ কদিন পার হয়ে গেছে। আরাবের সাথে শুধু সে একটি রাত ই থেকেছে। আঁখির মা আঁখি কে বার বার বলার পর ও আঁখি আরাব কে কল করে নি। বড্ড অভিমান যে ,আরাব এর মাঝে কয়েকবার কল করেছে কিন্তু আঁখি শুধু উত্রর ই দিয়ে গেছে। পাল্টা কোনো পশ্ন করে নি। বিয়ের দেড় মাস পর আজ আরাব এসেছে। আঁখির মাঝে নতুন বউয়ের মতো লাজুকময় খুশি দেখা যাচ্ছে না। সে স্বাভাবিক ই আছে। আরাব জানালো যে সে আঁখি কে নিয়ে হানিমুনে যাবে।
.
আরাব আর আঁখি হানিমুনে এসেছে মালদ্বীপ। আরাব তার রানীকে নিয়ে মালদ্বীপের উজ্জ্বল সূর্যলোক , শীতল সমুদ্রের বাতাস এবং সাদা বালি উপভোগ করতে এসেছে । তারা আলিমাথা দ্বীপের একটি হোটেল এ অবস্থান করেছে। আলিমাথা দ্বীপের সমুদ্রের পরাবাস্তব উপভোগ করতে এবং মালদ্বীপে সূর্যোদয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য একটি বিস্ময়কর জায়গা। তাই তো সে তার স্বপ্নের রানীকে নিয়ে হানিমুনে এখানে এসেছে। আরাব আর আঁখি এখানে দশ দিন অবস্থান করে বাংলাদেশে ফিরে এল। বাংলাদেশে আরাব আঁখি কে নিয়ে তার স্বপ্নের রানীর জন্য করা বাড়িতে আর ও দশ দিন অবস্থান করল। আরাবের প্রতি আঁখির অভিমান এখনো যায় নি। ছোট্ট মেয়ে টা যে এত বেশি অভিমানি তা আরাবের জানা ছিল না। তাতে অবশ্য তার কোনো আপসোস নেই। সে সময় নিয়ে তার রানীকে গুছিয়ে নিবে।
⛔ এই চিহ্ন দেওয়া অংশ টুকু অবশ্যই পড়বেন।
আরাব আঁখি কে হানিমুনের পর তার বাবার বাসায় দিয়ে গেছে দু মাস হতে চলল। এর মাঝে আরাব একটি বারের জন্য ও ফোন করে নি আর না আঁখি করেছে। আঁখি কে তার মা বহু বার বলে গেছে কিন্তু আঁখি তার অভিমানে অটল। হঠাৎ একদিন আঁখি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেল।
ডাক্তার এসে দেখে গেলেন সাথে দিয়ে গেলেন বেশ কয়েকটি টেস্ট। ডাক্তারের কথা মতো আঁখি কে টেস্ট করিয়ে আনা হয়েছে। কয়েকদিন পর রিপোর্ট ও আনা হবে।
কিছুদিন পর রিপোর্ট আনা হলো। রিপোর্ট এ দেখা গেল আখি বেবি কনসিভ করেছে। আঁখির বাবা মা তো বেশ খুশি হলো। তারা যে নানা নানু হবে। তাদের তো একটি মাত্রই মেয়ে। কিন্তু আঁখি যেন খুশি হতে পারল না। সে প্রথমে কোনো ভাবেই মানতে রাজি হলো না। সে তার মা কে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,"মা, আরাব ইচ্ছে করে এমনটা করেছে। ও কেন এমনটা করল? কেন করল এমন।"
আঁখি প্রচন্ড উন্মাদ হয়ে পড়ল। পাগলের মতো করছে। বিষয়টি সম্পর্কে একেবারেই ধারণা ছিল না তার। আরাব ইচ্ছে করে সবটা করেছে! পুরোটাই প্রি প্ল্যান। বেশ কিছুক্ষণ পর শান্ত হলো ও। তবু ওর মনে অভিমান রয়েই গেল। সে তার পেটে হাত রেখে বলল,"তুই শুনতে পাচ্ছিস? তোর পাপা বড্ড বেশি খারাপ। আমি ফোন করি নি বলে সে ও ফোন করবে না। তুই তাড়াতাড়ি আয় ,তোর পাপাকে অনেক অনেক বকা দিবি। যাতে তোর মাম্মা কে আর কষ্ট না দেয়। অনেক বেশি খারাপ সে।"
আঁখির মা বার বার করে বলে গেলেন আরাব কে ফোন করে তার বাবা হওয়ার কথা জানাতে। আঁখি প্রথমে না করলে ও পরে ভাবল এই বেবি টা যেমন ওর ঠিক তেমনই ভাবে আরাবের ও। তাই ফোন নিয়ে বেশ দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল যে সে কল করবে।
আঁখি তার পেটে হাত রেখে বলল," দেখবি তোর পাপা অনেক বেশি খুশি হয়েছে। এখনি কল করে ওনাকে চমকে দিব।"
আঁখি খুশি মনে আরাব কে কল দিল। বেশ অনেকদিন পর এত খুশি হয়েছে সে। ফোন রিং হচ্ছে কিন্তু আরাব ধরছে না। আক্ষখির ফোন রিসিভ করছে না দেখে আঁখি সামান্য ভ্রু কুঞ্চিত করে রইল। আবার কল দিল, এবার ফোন টা রিসিভ হলো।
"হ্যালো আরাব?"
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর পেল না আঁখি। তাই সে আবার বলল,"আরাব শুনতে পাচ্ছেন?"
এবার উত্তর আসল,"হ্যালো।"
আঁখি চমকে উঠল। কারণ একটি মেয়ের গলা। আঁখি বলল
,"জি কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে মেয়েটি কাঁপা স্বরে বলল,"আমি আরাব ভাইয়ার বোন।"
"ও আপু আরাব আছেন? ওনাকে একটু দেওয়া যাবে?"
এবার আরাবের বোন বলল,"ভাইয়া নেই।"
"কোথায় গেছেন ওনি। আর ফোন নিয়ে কেন যান নি?"
আরাবের বোন এবার নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদে দিল। ওর কান্নার শব্দে থম ধরে গেল আঁখি।
"আরাব ভাইয়ার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে ,ভাইয়া আর নেই। ভাইয়া আর নেই।"
আঁখি যেন কিছু বুঝে উঠল না। চিৎকার করে বলল,"মানে? কী বলছেন এসব? আরাবের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে আমাকে বলা হয় নি কেন? কথা বলছেন না কেন? কথা বলুন। বলুন প্লিজ।"
আরাবের বোন কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,"আমরা ও একটু আগেই জেনেছি ভাবি।"
আঁখির হৃদয় ভেঙে কান্না আসছে। ও চিৎকার করে ওঠল। যেন দুনিয়া থমকে গেছে। এ কী শুনল সে? সব মিথ্যে। সব দুঃস্বপ্ন। আঁখির ঘুম ভা ঙ লেই সব মিথ্যে হয়ে যাবে। কিন্তু আঁখির ঘুম কেন ভাঙছে না? কেন ভাঙছে না এই দুঃস্বপ্ন। ও নিজেকে জাগানোর চেষ্টা করছে। তবে হচ্ছে না। ভেতর থেকে সব অনুভূতি যেন প্রাণ হারিয়ে ফেলেছে। ও তবু নিজেকে বোঝাল, সব কিছু মিথ্যে। কিছু সত্যি নয়। আরাব আছে। আছে আরাব। ওর এমন চিৎকার শুনে আঁখির মা দৌড়ে আসলেন। ও চিৎকার করে বলল,"আম্মু তুমি দেখলে, দেখলে তুমি? এই জা নো য়া র আমার সাথে বেইমানি করেছে। আম্মু আরাব আমাকে ধোঁকা দিল। এই সব ভালোবাসা মিথ্যে আম্মু সব ঐ জা নো য়া রের নাটক ছিল। সব নাটক।"
মেয়েটি যেন পাগল প্রায়। আচরণের ঠিক নেই। ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে। চোখ থেকে নোনা জলের ধারা নামছে। পেটে হাত রেখে ও বলতে লাগল।
"আমাকে কেন এত বড়ো দায়িত্ব দিয়ে চলে গেল আরাব?
কেন আম্মু, কেন? আম্মু আমি ভালো বউ হতে পারি নি?
আম্মু আমি ভালো বউ হতে পারি নি তাই আরাব আমাকে একা ছেড়ে চলে গেল। তাই চলে গেল ও। একবার সুযোগ দিল না। কেন দিল না? কেন দিল না সুযোগ। আরাব..."
আরাব বলে চিৎকার করল আঁখি। আঁখির পৃথিবী থমকে গেছে। ওর চিৎকারে পুরো পৃথিবী যেন নিস্তব্ধ। জীবনের ঝড় যেন থামছেই না। ও অনুভব করল, পুরো পৃথিবীতে সে একা। কেউ নেই হ্যাঁ কেউ নেই তার।
মেয়েটার চিৎকারে যেন থমকে আছে আকাশ , বাতাস, নদী নালা। ও সারাক্ষণ একই কথা বলছে। আরাব আমি ভালো বউ হতে চাই। কোথায় আপনি , কোথায় , আমি কথা দিচ্ছি আমি পৃথিবীর সবথেকে ভালো বউ হব। আরাব চলে আসুন না আমি যে একা , সম্পূর্ণ একা। আরাব আমাদের বেবি আসছে, আমাদের বেবি। আপনি পাপা হবেন। হ্যাঁ আপনি পাপা হবেন। আমাদের বেবি কাকে পাপা বলবে? কাকে বলবে? শুনতে পান না আপনি? আরাব কেন শুনতে পান না আপনি?"
আঁখিকে কোনো ভাবেই থামানো যাচ্ছে না। আঁখির মা নিজেই কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। তার এক মাত্র মেয়ের এ কেমন সর্বনাশ হলো। আঁখির জীবনের কালো দিন টা যেন কাটছিলই না। সময় যেন থমকে গেছে।
.
সাদা কা ফ নে শুয়ে আছে আরাব । মুখে যেন সেই বিশ্ব জয়ের স্নিগ্ধ হাসি। যেটা আঁখিকে কবুল বলে নিজের করে নেওয়ার সময় ছিল।
আরাব শুয়ে আছে আঁখি কে আনা হয়েছে আরাবের সামনে। আঁখি মৃদু হাসলহ নিজের দিকে বা আশে পাশে কারোর দিকে কোনো খেয়াল ই নেই। সে তাকিয়ে আছে তার প্রিয়তমর দিকে। আরাবের কাছে গিয়ে আরাবের মাথায় হাত রাখল ও। আঁখি আরাব কে নিখুঁতভাবে দেখছে। পরম আবেশে মাথায় হাত বুলাতে রাখল। তারপরই বলল,"আপনি অপরূপ, আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর পুরুষ আপনি। যার প্রতি টা স্পর্শে ছিল জান্নাতের সুঘ্রাণ। আপনার ভালোবাসার প্রতিটা ছোঁয়া আমায় সব থেকে মধুর সময় দিয়েছে। কি অমায়িক আপনি। আল্লাহ আপনাকে কত যত্নেই না বানিয়েছেন। আরাব আপনি আমাকে আবার পিচ্চি পাখি বলে ডাকবেন তো? কী হলো বলুন আমায়।
রাগ করেছেন আপনি? আমি আর কখনো আপনাকে কষ্ট দিব না। আমি আপনার ভালো বউ হব। আরাব কথা বলুন না। কথা বলছেন না কেন?
আরাবের হাত আঁখি নিজের পেটের কাছে ধরল। টলমলে চোখে বলল,"আপনি শুনতে পাচ্ছেন? আমাদের বেবি এখানে। আমাদের ভালোবাসার পবিত্র ফুল। ও কাকে পাপা বলবে? কাকে পাপা বলবে? কথা বলেন প্লিজ।"
এবার আঁখি চিৎকার করে বলল,"আরাব আপনি কথা বলছেন না কেন? আপনাকে আসতেই হবে। আমাদের বেবির জন্য হলেওও আসতে হবে। আমার সাথে বেইমানি করলেন আপনি? কেন করলেন? আমার পৃথিবীতে নিজের মায়া ছড়িয়ে কেন আমার থেকে বিলীন হয়ে গেলেন? কেন আরাব, কেন?"
আঁখির কান্না থামার নাম ই নেই। আঁখির জীবনের আলোই যে নেই , অন্ধকার তার পৃথিবী। আরাবের এক হাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল। আরাবের হাত নাকি কেউ খুলতে পারে নি।
আখি আরাবের হাত স্পর্শ করল। আঁখি দেখতে পেল হাতে কিছু একটা আছে। আখি আরাবের হাতে চুমু খেল। কী আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে আরাবের হাত নরম হয়ে গেল। আঁখি আরাবের হাত অতি যত্নে খুলল। সে দেখতে পেল একটা চিরকুট যার মাঝে লেগে আছে কিছুটা র ক্ত। আঁখি চিরকুটটা খুলে পড়ল,আরাবের লেখা চিরকুট। লেখা গুলো তে বার বার চুমু খেল ও। তারপর আরাবের দিকে তাকিয়ে সে নিজের চোখের পানি মুছে নিল। ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে নিল স্নিগ্ধ হাসি। সে নিজেকে সামলে নিচ্ছে যেন। আশে পাশের সবাই অবাক হয়ে গেল। যে মেয়েটাকে এতক্ষণ কেউ সামলাতে পারল না। সে একটা চিরকুট পড়ে নিজেকে সামলে নিল? আঁখি সবাই কে চমকে দিয়ে আরাবের কপালে চুমু খেল। তারপর চোখের পাতাতে আর ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,"আমি ও চুমু খেলাম আরাব। আমি পূর্ণ আরাব আমি পূর্ণ। আমি একা নই আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন, আমাদের বেবি আছে তো। হ্যাঁ আরাব আপনি আছেন আমার সাথে। আপনার প্রতিটা স্পর্শ, ভালোবাসার পরশ আমার শরীরে মিশে আছে।
তারপর কি যেন ভেবে আরাবের হাত আখি নিজের গলায় ছোঁয়াল। তারপর বলল,"আপনি বলেছিলেন না আমাকে শুধু আপনি স্পর্শ করবেন এই পেনডেন্ট টা যেন আমাকে চুমু না খায়? রেখে দিলাম আপনার স্পর্শ,আপনার পিচ্চি পাখির সর্বাঙ্গে শুধু আপনার স্পর্শ , শুধু আপনার স্পর্শ আরাব।"
তারপর আঁখি আরাবের বুকে মাথা রাখল। আরাব আঁখিকে বুকে নিয়ে ঘুমাতো। তখন আরাব কে ফাঁকি দিয়ে আরাবের হৃদস্পন্দন গুনতো আঁখি। আজ গুনতে পারছে না আখি, অভ্যাস টা বড্ড তাড়া করছে। আরাবের বুকে মাথা রেখেই বলল,"আপনার আঁখি শুধু আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবে , শুধু আপনার।"
আঁখি আরাব কে বেশ অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরল। অবশেষে আরাব কে নেওয়ার জন্য সবাই আসল। আঁখি আরাবের মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। আরাবের হাত আঁখির পেটের রেখে বলল,"পাপা কে বিদায় জানাবে না বেবি? পাপাকে বিদায় জানিয়ে দেও। আমরা আবার এক সাথে হব। পরপারে আমরা পাপা কে নিয়ে খুব ভালো থাকব। আবার আমাদের দেখা হবে।"
আরাবের হাত আঁখির থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হলো। আঁখি উঠে দাঁড়িয়ে আরাব কে আবার চুমু খেল। আঁখি আরাবের দিকে এক দৃষ্টি তে চেয়ে আছে । আরাব কে দেখার তৃষ্ণা যেন মিটছে ই না। আরাব যেন হাসছে। আঁখি চেয়েই রইল আরাবের সেই বিশ্ব জয় করা ভুবনভোলানো ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা স্নিগ্ধ হাসি তে।
.
এভাবেই কেটে যায় দশ দশটি বছর। আঁখি সবে মাত্র ফজরের নামাজ শেষ করল। সে আরাবের সেই চিরকুট টা বের করল। চিরকুট টা বের করেই কয়েকটা চুমু খেল। তারপর চিরকুট টা পড়া শুরু করল,"আমার পিচ্চি পাখি। আমার স্বপ্নের রানী। আমার সময় শেষ , আল্লাহ আমাকে আর সময় দিচ্ছেন না। আমি যে পৃথিবী জয় করে নিয়েছি। তুমি ই যে ছিলে আমার পৃথিবী। তোমাকে পেয়ে আমি যে পূর্ণ। আমি জানি আমার পিচ্চি পাখি আমাকে কতোটা ভালোবাসে। কিন্তু অভিমানে একবার বলে ও না। তবু ও অনেক ইচ্ছে ছিল,আমার পিচ্চি পাখির মুখ থেকে ভালোবাসি কথা টা শোনার। আপসোস আল্লাহ আমাকে সেই সুযোগ দিবেন না। আমার যত দূর মনে হয় আমাদের বেবি আসছে। আমি জানি তুমি আমার ওপর রেগে যাবে ।
কারণ আমি তোমাকে না জানিয়েই আমাদের বেবিকে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বড্ড অভিমানি তুমি, যদি জানতাম আমাদের পথ চলা এখানেই সমাপ্তি ঘটবে। তাহলে কখনোই তোমার থেকে এক সেকেন্ড সময় দূরে থাকতাম না। জড়িয়ে রাখতাম বুকে। খুব ভালোবাসি যে। আপসোস আমাদের বেবি কে আমি দেখতে পারব না। ওর পাপা যে বড্ড অভাগা। কিন্তু আল্লাহ চাইলে নিশ্চয়ই আমি ওকে দেখতে পাব। হ্যাঁ ওর ছোট ছোট হাতের আলতো স্পর্শ পাব না।কিন্তু পরপারে আমাদের ঘর আবার হবে। আমাদের বেবিকে বলো ওর পাপা ওর জন্য অনেক ভালোবাসা দিয়ে গেছেন। আচ্ছা পিচ্চি পাখি শোনো আমাদের মেয়ে হলে আরাবি নাম রেখো আর ছেলে হলে আরিব রেখো। আর মনে রাখবে, হযরত মুহাম্মদ (স) বলেছেন যে যাকে ভালোবাসে পরপারে সে তার সাথে থাকবে। আমার আর কোনো চিন্তা নেই পিচ্চি পাখি। আমরা এক সাথে থাকব। আর হ্যাঁ একদম ভে ঙে পরবে না। আমি জানি আমার পিচ্চি পাখির অনেক বেশি সাহসীঈ। এই পৃথিবীর কোনো শক্তির ক্ষমতা নেই আমার পিচ্চি পাখিকে হারানোর। আমাদের এক সাথে থাকা হলো না। আরেকু দীঘল হলো না আমাদের পথ চলা। আল্লাহ চায় নি আমাদের পথটা আরেকটু দীর্ঘ হোক।। আমাদের পথ চলা এখানেই শেষ। ভালোবাসি পিচ্চি পাখি বড্ড বেশি ভালোবাসি।
আঁখির চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। সে চিরকুট টাকে বেশ কয়েকবার চুমু খেল। আঁখি এই চিরকুট টা বার বার পড়ে যত বার ই পড়ে তত বার ই চুমু খায় আর চোখের পানি ঝরে। শুকনো র ক্ত টুকু যে বড্ড বেশি আপন তার। আরাবের র ক্ত, পৃথিবীর সব থেকে দামি এটা। অতি যত্নে রেখে দিয়েছে দশ দশটি বছর। আরাবের সাথে কাটানো ২২ টি দিনের হাজারো মধুর স্মৃতি নিয়ে চোখের পলকে কাটিয়ে দিয়েছে সে দশ দশটি বছর। সে আরাবের ভালোবাসা তে পূর্ণ। মানুষের জীবন কয়দিন আর? পরপারের জীবন যে অনন্ত কাল। সে অনন্ত কাল তার ভালোবাসার মানুষের সাথে কাটাবে। এই পৃথিবীর জীবন নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই।
কারো স্পর্শে আঁখির ধ্যান ভাঙল। আখি দেখল মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে আরাবি আর আরিব। হুম আরাব আর আঁখির জমোজ সন্তান হয়েছে। তাই আরাবের দেওয়া দুটো নাম ই আঁখি তার সন্তান দের দিয়েছে।
আরাবের মৃত্যুর পর থেকে তার একমাত্র শক্তি হলো আরাবের লেখা চিরকুট। আরাব মা রা যাওয়ার পূর্বে অতি যত্নে তার পিচ্চি পাখির জন্য চিরকুট টা লিখে গেছে । আরাবের অপূর্ব লেখা এখনো কতোটা স্বচ্ছ, মনে হয় আরাব এখনই লিখেছে। আঁখি তার শ্বশুর বাড়িতে যায় নি। আঁখির বাবা - মা অনেক বার বলেছেন জীবনটাকে রাঙিয়ে নিতে। কিন্তু আঁখি মানতে নারাজ। আঁখির স্পষ্ট কথা আরাব ই আমার জীবনের রঙ। আমি রঙহীন নই। আর আমার সন্তান আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন। আমার জীবনে কোনো আক্ষেপ নেই। আমি পূর্ণ আরাব কে পেয়ে। মেয়ের এমন কথায় দুজন ই চোখের পানি ফেলেন। মনে হচ্ছে তার মেয়ে আরাবের সাথে হাজার বছর সংসার করেছে। অথচ মাত্র ২২ দিন ওরা কাছাকাছি থেকেছে। একেই বোধহয় বলে ভালোবাসা।
তারপর থেকে আঁখির বাবা মা আর আঁখিকে এই বিষয় নিয়ে বলেন না। তারা ও খুশি তাদের মেয়ে আর নাতি নাতনি নিয়ে। আশে পাশের অনেক মানুষ বলে আঁখি ভালোবাসাতে অন্ধ হয়ে গেছে। ও এখনো বাচ্চা , নিজের জীবনটাকে নষ্ট কেন করছে। এখনো হাজারো মানুষ আঁখিকে বিনা শর্তে বিয়ে করতে প্রস্তুত। তখন আঁখি হেসে উত্তর দেয় আরাব তাকে জয় করে নিয়েছে। আরাবের জয় করা জিনিস শুধুই আরাবের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। আর আরাব বেঁচে আছে, প্রতি সেকেন্ড আরাব আছে আঁখির সাথে। আঁখি তার বাবা মা কে নিয়ে আরাবের দেওয়া বাড়িতেই থাকে। যে বাড়িতে আরাব আর আখির ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছিল। আরাব আর আঁখি হানিমুনে যাওয়ার পূর্বে এই বাড়ি তে একদিন অবস্থান নিয়েছিল। আর এই বাড়িতেই আরাব আঁখি কে সম্পূর্ণ নিজের করে নিয়েছিল। হাজারো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়ির দেওয়ালের প্রতি টা ইটে। আরাবের ভালোবাসার প্রতি টা স্পর্শ এ বাড়িতে। আঁখি কী করে অন্য কোথাও থাকবে? আঁখি পূর্ণ হ আঁখির নেই কোনো আপসোস। আরাবের ভালোবাসা পেয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবতী মনে করে ও।
আঁখি আরাবি আর আরিবের দিকে তাকিয়ে বলল,"আমার মাম্মা পাপার কী হয়েছে?"
আরাবি আর আরিব একসাথে বলে উঠল, "মাম্মা তুমি কেঁদো না। পাপা তো আমাদের সাথেই আছে সবসময় তাই না?"
আরাবি আর আরিব কে জড়িয়ে ধরে ও বলে," হুম আছে তো। তোমাদের পাপা সব সময় আমাদের পাশে আছে।"
আরাবি আর আরিব বলল," মাম্মা,পাপা কে দেখতে যাবে না?"
"হুম অবশ্যই যাব।"
আঁখি আরাবি আর আরিব কে নিয়ে গেল আরাবের ক ব রে। আঁখি আরাবি আর আরিব প্রথমে আরাবের জন্য দোয়া করল। দীর্ঘ দশ বছরের একটি দিন ও মিস যায় নি আরাব কে দেখতে আসার। আঁখি আরাবি আর আরিব কে বলল,"মাম্মা, পাপা তোমরা তোমাদের পাপার জন্য আরো বেশি বেশি করে দোয়া করো যাও।"
আরাবি আর আরিব চলে গেল তাদের পাপা র জন্য দোয়া করতে। আঁখি আরাবের কবরের পাশে এসে বসল। হাতে সেই চিরকুট, আঁখি মৃদু হাসল। তারপর আরাবের কবর জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ আঁখি আরাবের কবর জড়িয়ে শুয়ে রইল। রোজ আঁখি এমন করে। তারপর আঁখি মৃদু স্বরে বলল,"এই যে শুনছেন? আমি আপনার পিচ্চি পাখি । আমরা খুব তাড়াতাড়ি আবার এক হব। এক জনমের জন্য নয় অনন্তকালের জন্য।"
আরাবের কবরের চারপাশ সুঘ্রাণ এ ভরে উঠে। আঁখির মনে হয়, আরাব হাসছে আর বলছে পিচ্চি পাখি তুমি না বড্ড বেশি অভিমানি। আঁখি আবার বলে,"শুনছেন আপনি? আমি আপনাকে ভালোবাসি, খুব বেশি ভালোবাসি। শুনে রাখুন,অভিমানে ও ভালোবাসি।"
~ সমাপ্ত ~
অবশ্যই পড়বেন 👇
⛔ এই গল্প টা আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম , যখন স্বপ্নের প্রেয়সী গল্প চলমান ছিল। স্বপ্নটা দেখার পর সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে প্রচুর কেঁদেছিলাম। তারপর ই এই গল্প টা লিখে রেখেছিলাম। কিছুতেই এদের দুজন কে আলাদা করতে পারছিলাম না আমি। তাই অভিমানে ও ভালোবাসি তে আমি পূর্ণতা দিয়েছি। কিন্তু এতে আমার স্বপ্নটা অসম্পূর্ণ রয়ে যেত। গল্পের রূপ দেওয়া হতো না। তাই স্বপ্নের অংশ টুকু গল্প আকারে রূপ দিয়েছিলাম। এই গল্প টা লিখার সময় ও আমি অনেক কেঁদেছি। জানি না গল্প টাকে কত টা হৃদয়স্পর্শী করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন যদি আপনি এই গল্পের অনুভূতি স্বপ্নে অনুভব করতেন। তাহলে কাঁদতেন প্রচুর কাঁদতেন আপনি।