অনুগল্প
Notifications
Clear all
August 7, 2026 7:01 pm
রোদে পোড়া তপ্ত বিকেলের আলোয় ভার্সিটির খোলা মাঠের মধ্য দিয়ে এক যুবক ছুটে চলেছে দিশেহারা হয়ে। তার চোখে চরম উদ্দীপনা, কিছুটা লুকানো পাগলপ্রায় ঝলক। সামনে থাকা মেয়েটা দ্বিগুণ বেগে তেজের সহিত দৌড়াচ্ছিল। প্রায় বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে। কারণ পেছনে ফিরলেই হাজারো পাগলামি সহ্য করতে হবে তাকে। সে চায় না। কিন্তু কতক্ষণই বা পালাবে ঈশানের থেকে! পালাতে পারবে না তো! আর সত্যিই পারলো না।
হঠাৎ পেছন থেকে ঈশান খপ ধরল ছুটন্ত মেয়েটির কোমল হাত। মেয়েটি হঠাৎ থমকে ঘুরল, চোখে রাগ আর এক অদ্ভুত ত্রস্ত অনুভূতি। কড়া গলায় তীব্র রাগের মিশেলে বলল,
“হাত ছাড়, ঈশান! এখানে সিনক্রিয়েট করবি না একদম!”
ঈশান হালকা হাসল, যেন মজা পেল তার কথায়। সহসা ধরে রাখা হাতটি নিজের কাছে টেনে, মেয়েটিকে সামনের দেয়ালের সঙ্গে আটকে দিল। তারপর বলিষ্ঠ বাহু দ্বারা দুই পাশ আবদ্ধ করে ধরে রাখল। যাতে আর কোথাও পালাতে না পারে।
মেয়েটি চমকে উঠল না, সে জানে এমনটাই হবে। তবে চেষ্টার চূড়ান্ত রূপে মুক্তি পেতে ছটফট করতে লাগল। তার চোখে ভয় আর হাহাকার মিশে আছে। একটা ভুল করে ফেলেছে সে জানে। সুদীর্ঘ আঁখি পল্লব অনবরত ঝাপটাতে থাকে। নিজেকে লুকানোর ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। কিন্তু পারে না। সে যে ঈশানের শক্তপোক্ত বাহুডরে বন্দি।
কিন্তু ঈশানের দৃষ্টি শান্ত, গভীর। সে অপলক ভাবে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, তার ইরাবতী কেন পালাচ্ছিল তার থেকে? কেন? কেন?
কি মনে করে ইরার মুখের সামনে আসা চুল সরিয়ে কানে গুজে দিতে দিতে বলল,
“কেন পালাচ্ছিস, ইরাবতী? আমার থেকে পালিয়ে কোথায় যাবি বল? পারবি না তো? তোর গন্তব্য যে আমাতেই সমাপ্ত।”
ইরার ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“কেন পাগলামি করছিস? ছাড় আমাকে!”
ঈশান নরম হেসে বলে,
“আমাকে পাগল বানিয়ে বলছিস কেন পাগলামি করছি?”
ইরা বুঝে গেল এভাবে সে জোরজবরদস্তিতে পারবে না। দোষ তো তারই ছিলো। নিজেকে শান্ত করে ঠোঁট গোল করে বড় একটা শ্বাস ফেলে। এরপর জিভ দিয়ে নিচের অধর ভিজিয়ে ভেবে নেয় কিছু। তারপর সে মাথা খাটিয়ে, হালকা স্বরে বলল,
“ওকে ওকে, আমরা বসে কথা বলি। এভাবে তো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। চল, ওদিকটায় বসি।”
ঈশান ইরার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়ল। ইরা ইশারা করে সামনের বেঞ্চের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে দেখল একটা খালি বেঞ্চ সামনে। ঈশান ধীরে ইরার হাত নিজের মুঠোয় বন্দি করে মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। যাওয়া যাক।”
তাদের পায়ের শব্দ মাঠের ধ্বনিতে মিলিত হলো। রোদ তখনও তপ্ত, বাতাস তখনও বয়ে চলেছে। তাদের মধ্যে একটা অদ্নিস্তব্ধতা কাজ করছে। আর কিছুসময়ের নীরবতা।
বেঞ্চে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে ইরা। পাশে বসে ঈশানও। দমকা হাওয়ার ঝাপটায় ইরার মাথাভর্তি চুলগুলো। খানিকটা বিরক্ত হয়েই ব্যাগ থেকে রাবার ব্যান্ড বের করল এবং চুল বেঁধে নিল। এইসময়টুকুও ঈশানের চোখ ইরাতেই নিবদ্ধ। ইরা তা লক্ষ করে চোখ কুচকে ইতস্তত করে বলে,
“এই কি দেখিস এভাবে! ওদিকে তাকা! সারাক্ষণ শুধু আমাকে দেখতেই থাকিস! সমস্যা কি, ভাই?”
ঈশান হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তুই…!”
ইরা হা করে নিজের দিকে তর্জনী আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল,
“কিহ! আমি?”
ঈশান হালকা হাসল। কি ভেবে যেন ইরা একটা ঢোক গিলে নরম কণ্ঠে বলল,
“দেখ, আমাদের মধ্যে এসব হওয়া সম্ভব না। বাবা মানবে না এসব। আর আমি….."
ইরার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ঈশান তীক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
"আঙ্কেলের টপিকে পরে আসছি। আগে বল তুই আমায় চাস কি না! "
ইরা খানিকটা মিনমিনিয়ে কণ্ঠে বলল,
“হুম…।"
ঈশান ইরার সেই ছোট্ট ‘হুম’ শুনেই বুকের ভেতর থেকে বিশাল বোঝা সরে গেল। ইরা এবার ভিতু গলায় বলল,
“তোকে চাই কিন্তু পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে না।”
ঈশান বেঞ্চে পা তুলে ইরার সামনা-সামনি বসে। এরপর ইরার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে মৃদু স্পর্শে অধর ছুঁয়ে দেয়। একদম সন্তর্পণে, অতি যত্নে। ইরা আবেশিত হলো। না চাইতেও ঠোঁটে অজান্তে মিষ্টি হাসি ফোটে। মনে মনে ভাবল, এই ঈশানটাও না, সত্যিই পাগল। ঈশান ইরার গালে এক হাত রাখল, চোখে দৃঢ়তা নিয়ে অঙ্গিকারের সাথে বলল,
“সবাইকে মানাবো। সব করব। শুধু তুই আমার সঙ্গে থাক। আর কিছু চাই না।”
ইরাও তার গালে রাখা হাতে হাত রাখল, মাথা হালকা নাড়াল, নিঃশব্দে সম্মতি জানিয়ে।
ঈশান এবার তার চেনা, নির্দিষ্ট রূপে ফিরে আসে। ইরার গালে ধরে রাখা হাতটা নিমেষে শক্ত,কঠিন রুপ ধারণ করে। আচমকা ব্যাথা টের পেতেই মৃদু আর্তনাদ করে বসে ইরা। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ঈশান হির হির করে বলে,
“আচ্ছা, এবার বল। আমি যা শুনেছি, তা কি সত্যি?”
ইরা ভয় পেয়ে চোখ বড় করে তাকাল, ভিতু চেহারা স্পষ্ট। ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়াতে লাগল। ঈশান ধীরে ধীরে তার আঙ্গুল দুইটি ইরার গালে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। এমন তীব্র ব্যথায় ইরা কেঁপে উঠল। কোনোমতে বলল,
“বিশ্বাস কর, আমি ইচ্ছে করে বসিনি পাত্রপক্ষের সামনে! হঠাৎ করেই এসেছে। তাছাড়া মা জোর করে বসিয়েছে।”
ঈশান হালকা হাসি রেখে আঙ্গুল ছাড়ল। ইরা হাফ ছাড়ল অবশেষে। একটা স্বস্তির নিশ্বাস নিল। ঈশান হতাশ গলায় আক্ষেপ মিশিয়ে বলল,
“এই শ্বাশুড়িও কেন ভিলেন হচ্ছে, ভাই! হোয়াইইই!”
ইরা রেগে খামচি দিল ঈশানের বুক বরাবর। বলল,
“মা কে নিয়ে কিছু বলবি না, খবরদার!”
ঈশান পাত্তা না দিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করতে করতে বলল,
"নেক্সট টাইম ভুলেও দৌড়াবি না। বাঘকে জাগিয়ে ক্ষেপিয়ে দিয়ে দৌড়ালে তোরই ক্ষতি। জানিস ধরে ফেলব, তাও যে কেন এমন করিস!"
ইরার চোখ বড় হয়ে গেল। আসছে বাঘ! ঈশানের এই কথায় মুখ বাকায় ইরা। ভেঙ্চিয়ে বলে,
“এসেছে! বাঘ না ছাই!”
ঈশান আলতো হাসে। তারপরে সে টিফিন বক্সটি ইরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“চিতই পিঠা আর পায়েস। মা পাঠিয়ে দিয়েছেন তোর জন্য। বলেছে, বৌমাকে খাইয়ে দিয়ে আসবি। দেখতো, কত সুইট আমার মা!”
ইরা খপ করে টিফিন বক্সটা লুফে নিল। লোভ সামলাতে পারলো না আর। শ্বাশুড়ি যখন দিয়েছে এর মানে টেস্টি কিছুই! এই পিঠা-পায়েস তার খুব প্রিয়। চটপট করে মুখে পিঠা-পায়েস পুরে নিল এবং ছোট্ট হাসি ফুটল অধরে। মুখভর্তি খাবার নিয়েই বলল,
“ওহ, সত্যিই! তোর মা আসলেই সুইট রে! তার মতো শ্বাশুড়ি পেলে আমি গর্বিত। দেখ, পেট ফুলে গেছে গর্বে!”
এই বলে আরেক দফা খিলখিল করে হেসে উঠে।
ঈশান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখল। মেয়েটির চোখে অনাবিল আনন্দ, মুখে হাসি, আর সব কিছুতে এক মিষ্টি আবেশ। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, শুধু এই হাসিই যথেষ্ট, এই হাসিই যথেষ্ট করে দেয় তার সমস্ত পৃথিবীকে পূর্ণ করে দিতে। আর কি চাই এই ছোট্ট জীবনে।
এইসব ভাবনার মাঝে ইরার খাওয়া শেষ হলে এক বোতল পানি এগিয়ে দেয় ঈশান। তারপর বলল,
“ক্লাস করবি না আজ?”
ইরা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“মুড নেই আজ।”
ঈশান চোখে মৃদু রাগের ঝলক নিয়ে বলল,
“এভাবে চলতে থাকলে সেমিস্টারে ডাব্বা খাবি কিন্তু। একটাও ক্লাস ঠিকঠাক করিস না। আর বাসায় পড়ার মতো মেয়েই না তুই, এভাবে চলবে কি করে!”
ইরা হতাশ হলো ঈশানের বক্তব্যে। এতো রোজকার ডাইলগ! এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয় ইরা। তাই সেসব পাত্তা না দিয়ে দু'হাতে ইশানের গাল টিপে হেসে বলল,
“ওরে, আমার ফার্স্ট বয়! তুমি কি ভুলে গেছো,তোমার গার্লফ্রেন্ড লাস্ট ব্রেঞ্চার?হু হু! ”
ঈশানও পাত্তা না দিয়ে ইরার হাত গাল থেকে সরিয়ে শক্ত হাতে হাত ধরে ক্লাসের দিকে এগোতে লাগল। পথে চলতে চলতে বলল,
“ভুলি নি, মনে আছে। এই লাস্ট ব্রেঞ্চার মেয়েটাই ফাঁসিয়েছে আমাকে! এখন ভোগো! ”
ইরা হেসে তাকালো প্রেমিক পুরুষের শক্ত করে ধরে রাখা হাতের দিকে। সবসময় দখলদারিত্ব! ইরারও ভালো লাগে। হঠাৎই এমন ভাবনায় পুলকিত হলো হৃদয়। ইরা জানে এই ছেলে এখন ক্লাস করাবে তাকে জোর করে। আর কি করা? ঈশান শুধু হাত টানতে টানতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর পেছনে পেছনে আসছে ইরা।
******
দীর্ঘসময়ের ক্লাস শেষে তারা দুজন বাড়ির পথে হাঁটছিল। ব্যস্ত রাস্তার গহীনে, শব্দ আর গাড়ির ভিড় থাকলেও দুজন দুজনাতেই মগ্ন। ইরা ছড়িয়েছে তার জমিয়ে রাখা কথার বাহার, আর তার মনোযোগী শ্রোতা ঈশান। একটা কথাও কর্নগোচরের বাইরে যেতে দেয়নি ঈশান। বাকি কোনো কিছুর খেয়াল নেই তাদের। তবে ঈশান খেয়াল রেখেছে তার ইরাবতীর। এই যে রাস্তায় কথায় মগ্ন থাকা ইরা কতবার যে হোঁচট খেতো, সাইকেলের সাথে ধাক্কা খেতো তার ইয়াত্তা নেই। ঈশান সামলেছে তাকে যত্নের সহিত। অবুঝ ইরা বুঝতেও পারেনি কতবার সামলেছে তাকে ঈশান।
হাঁটার মাঝে পথের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল টকটকে ফুলে ভরা। থোকা থোকা ফুলের কি বাহার! মুহুর্তেই ইরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফুলগুলো। ইরা কথা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, ঠোঁট উল্টো করে ঈশানের দিকে তাকায়। মুখ বলতে হয় না কিছু, কারন জানে ঈশান বুঝে যাবে। আর সত্যি ঈশান বুঝেই যায়।
ইরার ইচ্ছে পূরণ করতে সামনে এগিয়ে গিয়ে লাফ দিয়ে গাছের থেকে এক থোকা কৃষ্ণচূড়া ফুল নিল। কিছু ফুল ছিঁড়ে ইরার কানে গুঁজে দিল। তারপর ঈশান মৃদু হাসল। মুগ্ধ চোখে এবং কোমল মায়াময় কন্ঠে আওড়ালো একটা বাক্য,
“কৃষ্ণচূড়ায় আমার ইরাবতী। ”
ইরা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার চুলে গোজা লাল ফুলের ছোঁয়ায় যতটা না ভালো লাগছিলো তার থেকে বেশি আবেশিত হয় প্রেমিক পুরুষের মুখনিঃসৃত বানীতে, প্রেমময় সম্মোধনে। সেই ক্ষণে পথের সব কোলাহলকে থামিয়ে দিয়েছে, শুধু তারা দুজন আর কৃষ্ণচূড়া গাছ সাক্ষী এই প্রেমযুগলের।
(সমাপ্ত)
লেখিকা:প্রিয়াংশি চৌধুরী
(নোটে অনেক আগেই লিখে রেখেছিলাম। অনেকদিন তেমন লেখাই হচ্ছে না। তাই দিয়ে দিলাম ছোট্ট অনুগল্পটা। মন্তব্য করে জানাবেন কেমন হয়েছে।)