গল্প: তিনটে জারবেরা
 
Notifications
Clear all

গল্প: তিনটে জারবেরা


Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

অণুগল্প 

 

লেখনিতে :সুমাইয়া তুলি 

গল্প: তিনটে জারবেরা 

 

—“আমি আপনাকে ভালোবাসি, হিয়ান ভাই।”

 

অনেক সাহস সঞ্চয় করে নিজের মনের কথা বলেই ফেলল অথৈ। হিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,“কেন?”

 

প্রশ্নটা শুনে থমকে গেল অথৈ। ভালোবাসতে আবার কারণ লাগে নাকি? সে তো অকারণেই তার মনটা এই মানুষটাকে দিয়ে দিয়েছে। অথৈর নীরবতা দেখে হিয়ান মৃদু স্বরে বলল,“যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর তোমার কাছে থাকবে, সেদিন এসে জানাবে। আমি অপেক্ষায় থাকব।”

 

সাল ১৯৯৭~

 

দীর্ঘ তিন বছর পর আবার সেই মানুষটাকে দেখে পুরনো দিনের কথা স্মরণ হলো অথৈর। হাতের বইগুলো পরিষ্কার করা বাদ দিয়ে বুক শপের দরজার পানে এগিয়ে গেল অথৈ। আগের সেই ভার্সিটি পড়ুয়া হিয়ানের সাথে এই হিয়ানের আকাশ-পাতাল পার্থক্য খুঁজে পেল সে। কাস্টমার দেখে তার খালামনি আশালতা এগিয়ে এসে বললেন,“কি চাই?”

 

হিয়ান একটা বুকলিস্ট বের করে বলল,“এই বইগুলো হবে?”

 

লিস্ট দেখে আশালতা বললেন,“শেষের দুটো ছাড়া বাকিগুলো আছে।”

 

“ঠিক আছে ওগুলোই দিন।”

 

আশালতা বই বের করতে করতে অন্যমনস্ক অথৈকে বললেন,“ফুলগুলো ফুলদানিতে রেখে দে অথৈ, শুকিয়ে যাবে তো।”

 

তার কথা শুনে হিয়ান তাকাল টেবিলের উপর রাখা তিনটে তিন রঙের জারবেরা ফুলের পানে। অথৈ ফুলগুলো নিয়ে রেখে দিল ফুলদানিতে। তিন বছর যাবত কেউ প্রতিদিন এই ফুল তাদের শপের সামনে রেখে যায়। শত চেষ্টা করেও সেই আগন্তুককে ধরতে পারেনি অথৈ। শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আশালতা বইগুলো প্যাকেট করে দিতেই, সেগুলোর দাম মিটিয়ে চলে গেল হিয়ান। অথৈ দৌড়ে দরজার কাছে এসে তার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। আশালতা ভাগ্নীর এরূপ আচরণ দেখে বললেন,“কি ব্যাপার অথৈজল? চেনাজানা না কি?”

 

অথৈ ধরা পড়ে তুতলিয়ে বলল, “ওই আমাদের কলেজের পাশের ভার্সিটিতে পড়ত।”

 

“শুধুই কি তাই!” সন্ধিহান কণ্ঠে বললেন আশালতা। অথৈ দরজা থেকে সরে এসে পুনরায় নিজের কাজ করতে করতে বলল,“তা ছাড়া আর কি? তুমি একটু বেশিই ভাবছো মনি।”

 

অথৈয়ের এই পৃথিবীতে নিজের বলতে খালা আশালতা ছাড়া আর কেউ নেই। ছোটবেলায় একটা দুর্ঘটনায় নিজের বাবা-মাকে হারানোর পর খালা আশালতাই হয়ে ওঠে তার শেষ আশ্রয়স্থল। আশালতাও আর বিয়ে-থা করেননি। বোনের মেয়েকে নিয়ে দিব্যি জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছেন। এই বইয়ের দোকানটা তাদের আয়-উৎসের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

 

আর হিয়ান... তাকে অথৈ সত্যিই প্রথম দেখেছিল তাদের কলেজের পাশের সেই বিশ্ববিদ্যালয়টাতে। উঁচা-চওড়া শ্যামবর্ণের হিয়ান প্রথম দেখাতেই যে কারো মন কাড়তে সক্ষম। হয়েছিলও তাই ! তার প্রেমে পাগল হয়েছিল অথৈ নামক বালিকা। পাগলামির একপর্যায়ে লাজলজ্জা ভুলে প্রেমনিবেদনও করেছিল। তবে হিয়ান তাকে না-ও করেনি আবার হ্যাঁও বলেনি। তারপর কিছুদিনের মাঝে অথৈয়ের কলেজ জীবন শেষ হলে আশালতা তাকে নিয়ে অন্য শহরে চলে আসেন। তারপর আজই প্রথম হিয়ানকে দেখল অথৈ।

 

বইগুলো নিয়ে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছে হিয়ান। চিরচেনা একটা ফুলের দোকানের পাশে এসে থেমে গেল সে। দোকান থেকে একজন মাঝবয়সী মহিলা বের হয়ে এসে বললেন,“আজকে কি এখনই ফুল নেবে? তবে তুমি তো সাধারণত রাতে ফুল নিয়ে যাও।”

 

তার কথায় মৃদু হাসল হিয়ান। দোকানের লাল প্লাস্টিকের বালতিতে রাখা জারবেরা গুলোর পানে তাকিয়ে বলল,“উহু রাতেই নেব।” তার কথায় মহিলাটা হেসে মাথা নাড়ালেন। হিয়ান আবার হাঁটা ধরল। তার চোখের সামনে শুধু ভাসছে অথৈর অবাক হওয়া মুখটা। মেয়েটা তাকে অনেক দিন পরে দেখে বেশ অবাক হয়েছে। কিন্তু সে কি জানে হিয়ান তাকে প্রতিটা দিন দেখে? সে কি জানে হিয়ান তাকে কতটা ভালোবাসে? না জানে না। জানবে কি করে হিয়ান তো তাকে বলেনি আর না বুঝতে দিয়েছে। এসব ভেবে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো হিয়ানের। 

 

মেয়েটা তাকে প্রেমনিবেদন করার অনেক আগে থেকেই হিয়ান তাকে ভালোবাসে। ইচ্ছে ছিল পড়াশোনাটা শেষ করে একটা চাকরি নিয়ে মেয়েটাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে। সাজাবে একটা সুন্দর সংসার। তাই তো সেদিন প্রশ্ন করে তাকে একটু ভড়কে দিয়েছিল। তারপর যথারীতি পড়াশোনা শেষ হলো মোটামুটি একটা চাকরিও পেল। তবে বিয়ে করা হলো না বাবার করে যাওয়া ধারদেনা পরিশোধ করার চক্করে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলেদের জীবনটা যে এমনই। তবে সে আশা ছাড়েনি। অথৈরানীকে সে সত্যি সত্যিই রানী করে রাখবে। তার জন্যই তো দিনরাত এতো পরিশ্রম। হাঁটতে হাঁটতেই কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের সামনে এসে পৌঁছাল হিয়ান। সামনে কিছু লোক ঢালাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেখে এগিয়ে গেল সে। “কি হচ্ছে এখানে?”

 

তার কথা শুনে ম্যানেজার আশরাফুল এগিয়ে এসে বললেন,“আহা হিয়ান। উত্তেজিত হইও না। আজকে ঢালাইটা দিয়া দেই।”

 

“ঢালাই দেবেন মানে কি? এখনই ঢালাইয়ের জন্য বিল্ডিং প্রস্তুত নয়। আর আমি এখনো লিগ্যাল পেপারে সিগনেচার করিনি। তাই এই কাজ হবে না।”

 

এক প্রকার বাধ্য হয়েই কাজ বন্ধ করতে হলো। হাজার হোক এই বিল্ডিং নির্মাণের একজন প্রকৌশলী হিয়ান। তার অনুমতি ছাড়া ঢালাই দেওয়া সম্ভব না। তবে ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসে উঠলেন ম্যানেজার আশরাফুল।

ভোররাতের কিছুক্ষণ আগে নিজের কাজ শেষ করে হিয়ান ছুটল ফুলের দোকানে। তার আসতে দেরি হলে দোকানি মহিলাটি দোকান বন্ধ করার আগে বাহিরের ঝুড়িতে তিনটে জারবেরা দিয়ে একটা সুন্দর তোড়া বানিয়ে রেখে যান। আজও তাই হয়েছে। হিয়ান ফুলগুলো নিয়ে পাশের বাক্সে টাকা রেখে দিল। প্রথম প্রথম অন্য পাশের শহর থেকে ভোরবেলা আসতে তার বেগ পেতে হতো। তবুও তার অথৈ রানীর জন্য সে আসত। হাঁটতে হাঁটতে অথৈদের বইয়ের দোকানের সামনে আসতে চারিদিকে ভোরের আলো ফুটে গেছে। হাতের ফুলগুলো দোকানের সামনে রাখতেই পেছন থেকে অথৈ বলে উঠল,“আপনি এতো সকালে এখানে কি করছেন?”

 

কেঁপে উঠল হিয়ান। ব্যাগে সকালের কেনা বইগুলো এখনো তার কাছে আছে। তাই বলল,“ওই.. আমি একটা বই বদলাতে এসেছি।” অথৈ পালটা প্রশ্ন করল,“এতো সকালে?”

 

“হ্যাঁ, তুমিও তো এতো সকালেই এসেছ।” একটু কাজ থাকায় আজ তারাতাড়ি এসেছে অথৈ তাই আর কিছু বলল না। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই চোখ পড়ল হিয়ানের হাতের ফুলগুলোর দিকে। একবুক আশা নিয়ে বলল,“এগুলো আপনি এনেছেন, হিয়ান ভাই?” হিয়ান চেয়েও বলতে পারল না সত্যিটা “না আমি কেন আনতে যাব? এগুলো তো দরজার সামনে পড়া ছিল।” অথৈ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল হিয়ানের পানে অতপর হাত বাড়িয়ে বলল,“দিন ওগুলো আমার।” এই প্রথম হিয়ান আলতো হাতে ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিল তার গোপন প্রেয়সীর পানে। মুখে বলল,“কে দিয়েছে?” অথৈ অভিমানী কণ্ঠে বলল,“দিয়েছে কোন এক আগন্তুক। তাতে আপনার কি? আপনি তো আর দেননি!” অভিমানী কন্যার কথা শুনে একটু হাসল হিয়ান বুঝতে পারল অথৈ এখনো তাকে ভোলেনি। সে তো এটাই চেয়েছিল।

 

অথৈ বইটা বদলে দিল। হিয়ান পকেট থেকে অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে কেনা নোকিয়া ফোনটা বের করল। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে অথৈকে বলল,“তোমাদের দোকানের ল্যান্ডলাইনের নাম্বারটা পাওয়া যাবে। মানে নতুন কোন বই আসলে খোঁজ নিতাম আর কি!” অথৈ কোন ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই দিয়ে দিল নাম্বারটা।

 

তারপর থেকে শুরু হলো তাদের ফোনালাপ। সময় পেলেই হিয়ান বইয়ের বাহানায় ফোন করত অথৈকে। একপর্যায়ে সেটা ফোনালাপ থেকে বেরিয়ে টুকটাক ঘুরাঘুরিতেও রূপ নিল। মুখে ভালোবাসি না বলেও তারা প্রতিটা মুহূর্তেই প্রকাশ করল তাদের ভালোবাসা। বিষয়টা চোখ এড়ালো না আশালতার। তবে কথায় আছে না 'অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়'। হিয়ানের ক্ষেত্রেও ঘটল তাই। দীর্ঘ তিনটে বছর পর সে অথৈয়ের একটু কাছাকাছি আসতে পেরেও পারল না। ম্যানেজার আশরাফুল ফ্রড কেসে তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। জেল জরিমানা না হলেও উপর মহল থেকে তাকে ৩ লক্ষ টাকা পরিশোধ করে চাকরি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে।

 

এই মুহূর্তে এতোগুলা টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে হিয়ান? এই সংকটের মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন হিয়ানের কলিগ সেলিম সাহেব “তুমি চাইলে আমি একটা সাহায্য করতে পারি। তবে দু'বছরের আগে সেখান থেকে আসতে পারবে না।” দু'বছর কথাটা শুনেই অথৈয়ের কথা মনে পড়ল হিয়ানের। মেয়েটাকে কি কখনোই তার পাওয়া হবে না! কিন্তু কোন উপায় না পেয়ে রাজি হতে হলো হিয়ানকে।

 

যাওয়ার আগে একবার সেই বুকশপে গেল হিয়ান। অথৈ না থাকলেও দেখা হয়ে গেল আশালতার সাথে। তিনি হিয়ানকে দেখে বললেন,“বসো তোমার সাথে অনেক দিন থেকেই কিছু কথা বলার ছিল।” বিধ্বস্ত হিয়ান না বসেই বলল,“আমি অথৈকে ভালোবাসি। আমায় কিছু দিন সময় দেবেন আন্টি। আমি ওকে বিয়ে করে রানী করে রাখব।”

 

আশালতা সন্ধিহান কণ্ঠে বললেন,“সত্যিই রাখতে পারবে?” তার কথায় চুপ হয়ে গেল হিয়ান। সত্যিই কি তার এই অভাব-অনটনের জীবনে এটা সে পারবে? আশালতা আবার বললেন,“দেখো হিয়ান অথৈ ছোট থেকে অনেক কষ্ট করেছে। তাই আমি চাই না বিয়ের পড়েও ও কষ্ট করুক। আশা করি আমার কথা তুমি বুঝতে পারছো।”

 

আর কিছু বলা হলো না হিয়ানের। বেরিয়ে গেল সে। চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে একটা প্রজেক্টের কাজ পেয়েছে। একবুক কষ্ট নিয়ে সেখানেই চলে গেল। যাওয়ার আগে একবার পুনরায় বেজে উঠল অথৈয়ের দোকানের সেই ল্যান্ডলাইন। অথৈ সেটা তুলতেই ওপাশ থেকে হিয়ান বলল,“আমি চলে যাচ্ছি অথৈ। ভালো থেকো।” ব্যাস এতোটুকুই। দ্বিতীয়বারের মতো মন ভেঙে গেল অথৈয়ের। দোকানের সামনে জারবেরা আসাও বন্ধ হয়ে গেল। এভাবেই কেটে গেল দুটো বছর।

 

একদিন হিয়ান একজনের মাধ্যমে জানতে পারল বিয়ে ঠিক হয়েছে অথৈয়ের। দু বছর নিজেকে অনেক কষ্টে আটকে রাখলেও আর পারল না। ফোন বেজে উঠল পুনরায়। এপাশ থেকে অনেক দিন পর হিয়ানের কণ্ঠ শুনে কান্না করে অথৈ বলল,“আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে হিয়ান ভাই।” প্রতিউত্তরে হিয়ান অস্থির হয়ে বলল,“আমি আর পারছি না অথৈ। বিয়ে করবে আমায়? রানীর মতো না রাখতে পারলেও আমার সর্বস্ব দিয়ে আগলে রাখব তোমায়।”

 

এর জবাবে কি আর না বলতে পারে অথৈ। এটার জন্য যে সে বহু বছর অপেক্ষায় ছিল। আবহাওয়া খারাপ থাকা সত্ত্বেও দুই বছরের কন্ট্রাক্ট শেষ করে সেদিনই রওনা দিল হিয়ান। কলিগরা আজ যেতে মানা করলেও শুনল না। যাওয়ার আগে কনস্ট্রাকশন সাইটের বাগান থেকে তুলে নিল তিনটি জারবেরা। মেয়েটাকে এবার সে তার মনের কথা বলেই ছাড়বে। এদিকে বিয়েটা ভেঙে আশালতার সাথে ঝামেলা করে হিয়ানের অপেক্ষায় বাসস্ট্যান্ডে বসে রইল অথৈ। কিন্তু দিন পেরিয়ে রাত গড়িয়ে আরও একটা দিন এলো। এলো না শুধু হিয়ান। নিস্প্রাণ অথৈ চুপচাপ বসে রইল সেখানেই। তার কষ্টে আজ আকাশটাও কেঁদে দিল।

 

অপরদিকে প্রবল বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধ্বসে গেছে। সেখানেই নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে হিয়ান। অথৈকে বিয়ে করার একবুক আশা নিয়ে বের হলেও তা আর পূরণ হলো না। স্বেচ্ছাসেবক দল যখন তার দেহটা উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছিল। তখনও তার প্রাণহীন দেহের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরা ছিল সেই তিনটে জারবেরা। যা কাউকে দেওয়ার অর্থ 'আমি তোমাকে ভালোবাসি'...

 

সমাপ্ত

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner