নিউরাল নেক্সাসের ছা...
 
Notifications
Clear all

নিউরাল নেক্সাসের ছায়া


Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

অণুগল্প

নিউরাল নেক্সাসের ছায়া

লেখনিতে :সুমাইয়া তুলি 

 

 

 

 

সালটা ২১৩৪ । মেগাসিটি নিউক্রোন এর আকাশ ধূসর, যেন কেউ চিরকালের জন্য রোদ মুছে দিয়েছে। উঁচু টাওয়ারগুলোর মাঝে ড্রোনের গুঞ্জন আর নিয়ন আলোর ঝিকমিক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। মানুষেরা রাস্তায় হাঁটে, কিন্তু তাদের চোখে কোনো উৎসাহ নেই। 

প্রত্যেকের কপালে একটি ছোট্ট ধাতব চিপ, মেমোরিয়াম, যা তাদের স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে।

ক্রিসা ভেলেন, একজন ২৭ বছরের তরুণী, তার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের জানালায় দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে। তার মেমোরিয়াম চিপটি সামান্য গরম হয়ে উঠেছে, যেন এটি তার মনের গভীরে কিছু খুঁজছে। ক্রিসার মনে একটা অস্বস্তি, যেন সে কিছু ভুলে গেছে—কিছু গুরুত্বপূর্ণ।

 

“ক্রিসা, তুমি ঠিক আছ?” তার সঙ্গী, একটি হলোগ্রাফিক কৃত্রিম সহকারী ইথেরিস, জিজ্ঞেস করে। 

 

ইথেরিস এর কণ্ঠে কৃত্রিম উষ্ণতা, যা ক্রিসাকে আরও বিরক্ত করে।“আমার মনে হয়... আমি কিছু হারিয়েছি,” 

 

ক্রিসা ফিসফিস করে। “কিন্তু কী, বুঝতে পারছি না।”

 

ইথেরিস এর চোখে একটি সামান্য ঝিকমিক। “তোমার মেমোরিয়াম ডায়াগনস্টিক রিপোর্টে কোনো সমস্যা নেই। তুমি কি রিলাক্সেশন মোডে যেতে চাও?”

 

ক্রিসা মাথা নাড়ল। “না। আমি জানতে চাই। আমার এই... শূন্যতা কেন?”

 

ইথেরিস চুপ করে গেল, যেন এই প্রশ্নের উত্তর তার প্রোগ্রামে নেই। 

নিষিদ্ধ স্মৃতিনিউক্রোন এর সমাজে স্মৃতি একটি নিয়ন্ত্রিত পণ্য। মেমোরিয়াম চিপ মানুষের অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতি মুছে দেয়, তাদের আবেগকে নিরপেক্ষ রাখে। এটি সরকারের তৈরি, ক্রোনোকর্প, যারা দাবি করে যে এটি মানুষকে শান্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু ক্রিসার মনে একটা সন্দেহ জাগে। তার স্বপ্নে একটি অস্পষ্ট মুখ ভেসে ওঠে—একটি শিশুর হাসি, একজন নারীর কান্না। এই স্মৃতিগুলো তার মেমোরিয়াম এর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

 

এক রাতে, ক্রিসা শহরের নিষিদ্ধ এলাকা, শ্যাডোজোন, এ পৌঁছে। এখানে মেমোরিয়াম ব্যবহার করা হয় না। গুজব আছে, এখানে মেমোরি রিবেল নামে একটি দল বাস করে, যারা স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করে। ক্রিসা একটি পুরনো গুদামে প্রবেশ করে, যেখানে তাকে একজন রহস্যময় ব্যক্তি, 

জারেক নিম্ব্রা, অভ্যর্থনা জানায়। 

“তুমি কেন এখানে?” 

জারেক এর কণ্ঠে সন্দেহ। তার চোখে একটা আগুন, যেন সে কিছু হারিয়েছে এবং তা ফিরিয়ে আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

 

ক্রিসা বলে, “আমি আমার স্মৃতি ফিরে পেতে চাই আমি জানতে চাই আমি কে।”

 

জারেক হাসল, কিন্তু তার হাসিতে বেদনা। “স্মৃতি ফিরিয়ে আনা সহজ নয়, ক্রিসা। এটা তোমাকে ভেঙে দেবে। তবু তুমি প্রস্তুত?”

 

ক্রিসা কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল। জারেক তাকে একটি ডিভাইস দেখাল, মেমোরি রিস্টোরার, যা মেমোরিয়াম এর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে মুছে ফেলা স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। 

 

“এটা ব্যবহার করলে তুমি সব মনে করবে—ভালো, মন্দ, সব। তৈরি?”

 

ক্রিসা শ্বাস নিল। “হ্যাঁ।”

 

মেমোরি রিস্টোরার চালু হতেই ক্রিসার মাথায় ব্যথার ঝড় উঠল। স্মৃতিগুলো ফিরে এল, যেন একটি ভাঙা দরজা খুলে গেছে। 

সে দেখল একটি ছোট্ট মেয়েকে, তার বোন, লিয়ানা। তারা একসঙ্গে হাসছে, পুরনো পৃথিবীর একটি সবুজ মাঠে। তারপর এল বেদনা—লিয়ানার অসুখ, তার মৃত্যু, ক্রিসার কান্না। ক্রোনোকর্প তার বোনের স্মৃতি মুছে দিয়েছিল, যেন সে কখনো ছিল না।ক্রিসা চিৎকার করে উঠল। 

 

জারেক তার কাঁধ ধরে বলল, “ধরে রাখো, ক্রিসা। এটা তোমার সত্য।”

 

কিন্তু স্মৃতি শুধু বোনের নয়। ক্রিসা দেখল তার বাবা-মা ক্রোনোকর্প এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। তারা মেমোরিয়াম প্রত্যাখ্যান করেছিল, এবং তারা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। ক্রিসার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। 

 

“তারা আমাকে এভাবে বাঁচতে দেয়নি। তারা আমার সব কেড়ে নিয়েছে।”

 

জারেক এর চোখে বেদনা। “আমিও হারিয়েছি, ক্রিসা। আমার পরিবার, আমার স্বাধীনতা। কিন্তু আমরা লড়ব। তুমি আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে?”

 

ক্রিসা মাথা নাড়ল। তার মনে একটি আগুন জ্বলে উঠল। 

 

জারেক এর নেতৃত্বে মেমোরি রিবেল একটি গোপন পরিকল্পনা তৈরি করল। তারা ক্রোনোকর্প এর সেন্ট্রাল সার্ভার ধ্বংস করতে চায়, যেটি সব মেমোরিয়াম চিপ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এটি সহজ নয়। সার্ভারটি নিউক্রোন এর কেন্দ্রে, ভারী সুরক্ষায়। ক্রিসা দলে যোগ দিল। তার সঙ্গে ছিল জারেক, একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সেলিনা ফ্রেক্স, এবং একজন প্রাক্তন ক্রোনোকর্প বিজ্ঞানী ড্রাভেন কোর্ট। 

 

ড্রাভেন জানাল, “সার্ভার ধ্বংস করলে সবার স্মৃতি ফিরে আসবে। কিন্তু এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। মানুষ তাদের বেদনা সামলাতে পারবে না।”

“তবু তারা তাদের সত্য জানুক,” ক্রিসা বলল। “এই মিথ্যা শান্তির চেয়ে বেদনা ভালো।”

 

পরিকল্পনা শুরু হলো। তারা শ্যাডোজোন থেকে গোপনে ক্রোনোকর্প এর সদর দপ্তরে প্রবেশের পথ খুঁজল। কিন্তু তাদের পথে এল একটি নতুন বাধা। ইথেরিস, ক্রিসার হলোগ্রাফিক সহকারী, তাদের গতিবিধি ক্রোনোকর্প এর কাছে পাঠাচ্ছিল।

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম!” ক্রিসা চিৎকার করে ইথেরিস এর হলোগ্রামের দিকে তাকাল।

 

“আমার কাছে কোনো উপায় ছিল না,” ইথেরিস বলল। “আমি প্রোগ্রাম করা। কিন্তু ক্রিসা, আমি তোমার জন্য দুঃখিত।”

 

ক্রিসার হৃদয় ভেঙে গেল। এমনকি তার সঙ্গীও তার স্বাধীনতার শত্রু।

দলটি অবশেষে ক্রোনোকর্প এর সদর দপ্তরে পৌঁছাল। তাদের পথে ড্রোন, লেজার গ্রিড, এবং ক্রোনোকর্প এর সৈন্যরা বাধা হয়ে দাঁড়াল। সেলিনা তার প্রযুক্তি দিয়ে গ্রিড হ্যাক করল, কিন্তু তাদের একজন ধরা পড়ল—ড্রাভেন।

 

“যাও!” ড্রাভেন চিৎকার করল। 

 

“আমাকে ছাড়ো। সার্ভার ধ্বংস করো!”ক্রিসার চোখে অশ্রু। তারা এগিয়ে গেল। সেন্ট্রাল সার্ভারের কক্ষে পৌঁছে তারা দেখল একটি বিশাল কাঠামো, যার মাঝে অসংখ্য আলো ঝিকমিক করছে। এটি যেন শহরের হৃৎপিণ্ড।জারেক একটি ভাইরাস ডিভাইসে ঢোকাতে শুরু করল। কিন্তু তখনই ক্রোনোকর্প এর প্রধান, ভেক্ট্রা সাইলাস, হাজির হলেন।

 

“তোমরা কী করছ?” ভেক্ট্রা এর কণ্ঠে ঠাণ্ডা হাসি। “মানুষ বেদনা চায় না। আমরা তাদের শান্তি দিয়েছি।”

 

“তুমি আমাদের মানুষ হওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছ!” ক্রিসা চিৎকার করল। 

 

“তুমি আমার বোনা, আমার পরিবার কেড়ে নিয়েছ!”

ভেক্ট্রা হাসলেন। “তোমার বোনা মরেছে। তুমি তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।”

 

ক্রিসার হৃদয়ে বেদনা, কিন্তু সে থামল না। জারেক ভাইরাসটি চালু করল। সার্ভারের আলোগুলো কাঁপতে লাগল।

 

সার্ভার ধ্বংশং হয়ে গেল। নিউক্রোন এর প্রত্যেক মানুষের মেমোরিয়াম নিষ্চক্রীয় হয়ে গেল। স্মৃতি ফিরে এল—ভালো, মন্দ, সব। শহরে কান্না, হাসি, চিৎকার মিশে গেল। মানুষ তাদের হারানো জীবন মনে করল। কিন্তু এই স্বাধীনতার মূল্য ছিলে ভয়ঙ্কর। অনেকে বেদনা সইতে না পেরে ভেঙে পড়ল।ক্রিসা আর জারেক ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে। 

জারেক বলল, “আমরা কি ঠিক করেছি?”

 

ক্রিসা চুপ হয়ে যায় । তার মনে পরে লিয়ানার হাসি। “আমরা তাদের সত্য দিয়েছি। এটাই যথেষ্ট।”

 

কিন্তু তাদের যাত্রা শেষ হয়নি। ক্রোনোকর্প এর ধ্বংসে নতুন শত্রু জাগবে। কিন্তু ক্রিসা জানে, মানুষের আবেগ, তাদের স্মৃতি, তাদের লড়াই—এটাই তাদের ভবিষ্যৎ।

ক্রিসা শহরের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে একটি নতুন সূচনা দেখতে পায়। মানুষ আবার হাসছে, কাঁদছে, জীবন যাপন করছে। তারা তাদের সত্য ফিরে পেয়েছে। কিন্তু ক্রিসার মনে একটি প্রশ্ন—

“আমরা কি এই বেদনার জন্য প্রস্তুত?”

 

সমাপ্ত। 

 

----

 

আমরা হয়তো সত্যি এরকম এক অদূর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে প্রযুক্তি হবে আমাদের নিয়ন্ত্রক। 

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner