নিস্তব্ধ রজনী। ঘড়ির কাঁটায় সময় ঠিক সাড়ে বারোটা। গ্ৰামে এই সময় কে গভীর রাত বলে বিবেচনা করা হয়। পাড়া মহল্লায় মানুষজন নয়টার মধ্যেই খাবার খেয়ে ঘুমাতে চলে যায়। নিজের ছোট্ট দোচালা টিনের ঘরের দরজায় পিঁড়িতে বসে আছে নিরু। টেবিলের উপরে রাখা হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় সামান্য আলোকিত ঘর। বড় চৌকির উপর ঘুমিয়ে আছে তার এক বছরের মেয়ে নুহা। নিরুর নজর বাড়ির রাস্তায় নিবদ্ধ। হয়তো কারো অপেক্ষায় আছে। অনুভূতি শূন্য চোখ দুটোর নিচে কালি পড়ে গেছে অনেক খানি! ফর্সা মুখশ্রী কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। অনেকক্ষণ পর দূরে হতে সামান্য আলোর দেখা মিললো। এদিকেই আসছে। আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হলো রিক্সা চালিয়ে আসা নিরুর স্বামী মিলন। নিরু শক্ত মুখে উঠে দাঁড়ালো। মিলন রিক্সা রেখে ঘরে এসেই ঝাঁঝালো গলায় শুনাল,
-“ কিরে ফকিন্নির ঝি ভাত কই? ভাত দে তাড়াতাড়ি ”
মিলনের এমন সম্বোধনে একটুও অবাক হলো না নিরু। গত আড়াই বছর ধরে তো এটাই শুনে আসছে। নিঃশব্দে হারিকেন নিয়ে চলে গেলো খাবার আনতে। নিরু ভিতরে যেতেই মিলন দরজায় খিল এঁটে দিলো। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে চৌকির উপর বসলো। একটা বারের জন্যও তাকিয়ে দেখলো না মেয়েকে। নিজের মতো আপন মনে বাতাস করছে। হঠাৎ নজর গেলো টেবিলের উপর রাখা রিচার্জেবল ফ্যানের দিকে। চোখ ছোট ছোট হয়ে গেলো তার। পরখ করে দেখলো ফ্যান টা। দেখে মনে হচ্ছে বেশ পুরনো হবে। চলন্ত ফ্যানের বাতাসে আরামে ঘুমাচ্ছে নুহা। সেই ঘুম যেন সহ্য হলো না মিলনের। এক টান দিয়ে মেয়েকে তুলে ছুড়ে ফেললো পাকা মেঝেতে। উচ্চ শব্দে কেঁদে উঠলো ছোট নাজুক প্রাণটি। কান্নার শব্দে ছুটে এলো নিরু। মেয়েকে বুকে আগলে নিয়ে মিলনের দিকে তাকিয়ে বলল
-“ আপনে কি জানো'য়ার? এমনে মাইডারে আছাড় মার'লেন ক্যান?”
কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। নুহা কান্না বন্ধ করে জননীর বুকের সঙ্গে লেপ্টে রইলো। মিলন এসে নিরুর চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে বলল
-“ শালী কার লগে তেজ দেখাস তুই হ্যাঁ। ঘরের মইধ্যে এইডা আইলো কেমনে! তোর কোন নাগর দিয়া গেছে এডা ”
-“ আল্লাহর দোহাই লাগে চুপ করেন আপনে। এডা আইজ মুন্নি আপা দিলো নুহা লাইগা ”
মিলন বিশ্বাস করলো না। উল্টো ইচ্ছে মতো মা'রধর করে বিছানায় চলে গেলো। নিরু ব্যথায় জর্জরিত শরীর টেনে কোনো রকম উঠে অন্য চৌকিতে নুহাকে শুইয়ে দিলো। মাথার পাশে বসে হাতপাখা করতে লাগলো। একটু পর মিলনের কন্ঠ ভেসে এলো
-“ ওই এদিকে আয় তাতাড়ি ”
নিরু ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো মিলনের কাছে। তার জানা আছে এখন মিলন কি করবে। রাতে আঁধার নিজের শরীর বিলিয়ে দিলো স্বামীর নিকট।
শেষ রাতের দিকে মিলন তাকে ছেড়ে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। নিরু নিরবে চোখের জল ছেড়ে দিলো। বিয়ের আড়াই বছর হতে চললো। অথচ আজ অবধি একটা ভালো ব্যবহার করে নি মিলন। সবসময় কুকুর বিড়ালের মতো ব্যবহার করেছে। তার অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে বটে। নিরুর বাবার চাকর ছিল মিলন। তিনি ভীষণ রুক্ষ ব্যবহার করতেন চাকরদের সঙ্গে। গ্ৰামের কেউ তাকে পছন্দ করতো না কিন্তু কিছু বলার সাহস ও ছিল না। তিনি ছিলেন গ্ৰামের মহাজন। তার মৃ'ত্যুর পর নিরু বিয়ে হয় মিলনের সঙ্গে।
সকাল সকাল উঠে নিরু চুলার দুয়ারে বসে একটা পেঁয়াজ কেটে নিলো। রাতের পান্তা ভাতের সঙ্গে পেঁয়াজ , মরিচ আর সামান্য লবণ ছিটিয়ে নিলো। একটা প্লেটে এগিয়ে দিলো মিলনের দিকে। অন্যটা থেকে নিজে খেলো আর নুহাকে সামান্য খাইয়ে দিলো। খাওয়া শেষে নিরু ঘরে এলো রান্না কিছু আছে কিনা দেখতে। মিলন এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে চুমু দিয়ে বলল
-“ বউ তোর মুন্নি আপা আর কি দিছে রে কাইল”
-“ কিছু বাটি চামচ পেলেট দিছে। ওই ফ্যান ডা দিছে আর চুড়ি দিছে কয় মুঠ ”
নিরুর কথায় মিলনের চোখ চকচক করে উঠলো। আস্তে আস্তে বলল
-“ চুড়ি গুলি দে তো একটু ”
-“ ক্যান!”
অবাক কন্ঠে শুধাল নিরু। মিলন মনে মনে বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলো না।
-“ আরে দে না এত্তু দেহি ”
নিরু ট্যাংকের ভেতর থেকে বের করে দিলো। ছয় মুঠ কাঁচের চুড়ি। সঙ্গে চুলের ফিতা আছে কিছু। মিলন খপ করে দু মুঠো ছুড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে! তাড়াতাড়ি রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে গেলো। পিছন থেকে নিরু চিৎকার করেও লাভ হলো না। রান্না শেষ করে নিরু মুন্নি আপার বাড়ি কাজ করতে চলে গেলো। এভাবে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। প্রায় সময় মিলন ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু সে টাকা আর ঘরে আসে না। ঠিক মতো রিক্সাও চালায় না এখন। নিরুর সন্দেহ হয়। জিজ্ঞেস করলে মিলন জানায় এলাকার রিপন রা নাকি কি খেলে সে শুধু দেখে। নিরু কথা বিশ্বাস করল না।
এর শুরু হলো আরো অত্যাচার। মিলন সবসময় নিরুর উপর অত্যাচার করে টাকা নিয়ে যেতো। ও বাড়ি কাজ করে সেই সুবাদে তারা যা কিছু দিতো সব নিয়ে বেচে দিতো। শেষে নিজের রিক্সাটাও বিক্রি করে দিলো
-“ সত্য কইরা কন আপনে জুয়া খেলেন?”
-“ হ খেলা কি করবি এহন ”
বেশ তেজ নিয়ে বলল মিলন। নিরু বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
-“ এই আমার দিকে তাকান। আমার লাইগা আপনের মাইয়ার লাইগা চিন্তা হয় না আপনের! মাইয়াডার ভবিষ্যৎ কি?”
-“ না হয় না। ওর সব চাইতে বড় অপরাধ ও মাইয়া। আমার কিছু কইরা ও তো খাওয়াই তে পারবো না। বাইচ্চা থাইকা শুধু আমার খরচ করে যতসব ”
রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো মিলন। নিরু কাঁদতে কাঁদতে কাজে চলে গেলো। বাড়িতে একা রয়ে গেলো ছোট্ট নুহা। বাড়ির অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে গেলো। সবাই বাড়ির সামনে বড় রাস্তায় খেলছে। একটু পর পর বড় বড় গাড়ি ছুটে আসছে। ওরা দৌড়াদৌড়ি করছে এমন সময় অপর পাশ দিয়ে বড় মালবাহী ট্রাক দ্রুত বেগে ছুটে এলো। মূহুর্তের মধ্যে হাসির আসর কে কান্নার আসরে পরিনত করে দিলো। পাকা রাস্তার উপর পড়ে আছে নুহার নিহর দেহ। বাড়ির লোকজন ছুটে এলো।
নিরুর কাজ শেষ। আজকে বেতন পেয়েছে সেই সঙ্গে ভালো খাবার ও। খুশি মনে বেরিয়ে পড়লো। বাড়ির কাছাকাছি আসতে নজর পড়লো লোকজন জড়ো হয়ে থাকা রাস্তায়। এগিয়ে গিয়ে দেখতে চাইলো সে। নিরুকে দেখেই সবাই সরে গিয়ে জায়গা করে দিলো। তাতেই যেন শরীর রক্ত পানি হয়ে গেলো। পায়ের তলা টা কেমন শূন্য অনুভব করল। বুকটা যেন কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। মেয়েকে জাপটে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।
-“ আম্মা আম্মারে উঠ মা। দেখ আম্মা কি আনছি তোর লাইগা। উঠ না মা। আম্মার নিঃশ্বাস টা বন্ধ হইয়া আসতেছে। উঠ মা। ও ভাবী কও ওরে উঠতে ”
জোড়ে জোড়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদছে নিরু। সকলে অসহায় চোখে চেয়ে দেখলো। একজন এগিয়ে এসে তার ভ্যান তুলে নিলো নুহাকে। ভ্যান ছুটলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। মেয়ের খবর শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো মিলন। সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিরু। মিলন আসতেই তার দিকে তাকিয়ে হাসলো। এই অবস্থায় নিরুর হাসি একদম আশা করেনি মিলন।
-“ ওই নিরু আমার মাইয়া কই! ওর কি অবস্থা ক "
-“ আপনার কি মাইয়া আছে মিলন সাব! ওইডা আমার মাইয়া আপনের কিছু না। জানেন এহানে আনার পর ও বাইচা ছিল। সাহেব রা কইছে অপারেশন করতে মেলা টাহা লাগবো। আমি দিতে পারি নাই। আমার মাইয়া ডা আমার চোখের সামনে দিয়া মই'রা গেলো। আমি কিছু করতে পারি নাই ”
নিরুর কথায় মিলন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মেয়ে আর নেই।
-“ টাহা লাগবো না আপনের এই যে নেন। সব নিয়া যান কিন্তু আমার মাইয়া ডারে আমার বুকে আইনা দেন ”
জোরে চিৎকার করে কাঁদছে নিরু। অসহায় চেয়ে আছে মিলন। তার কাঁদা উচিত নয়। তার অবহেলায় আজ তার মেয়ে চলে গেছে বহু দূরে। একজন মানুষ খারাপ কাজ করলে তার প্রভাব আশেপাশের মানুষ গুলোর উপর ও সমান ভাবে পড়ে।
— সমাপ্ত —