গল্প: বিষাদও বসন্ত ...
 
Notifications
Clear all

গল্প: বিষাদও বসন্ত (writer:Alakananda Aindri)

Page 3 / 3

Alakananda Aindri
Posts: 14
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 6 months ago

 
পর্ব:১৭
 

 

 

 

মিথির একটা হসপিটালে পার্টটাইম জব হলো হিয়ার বন্ধু দীপ্রর মাধ্যমেই। মোটামুটি অল্প পরিশ্রম এবং সহজ কাজ। এই যেমন রোগীর সিরিয়াল দেওয়া, ডেস্ক ঠিক রাখা, রোগীর তথ্য লেখা, রোগী দেখার সময় ডক্টরকে সাহায্য করা ইত্যাদি। মিথির অবশ্য এটা প্রত্যাখান করার সুযোগ ও নেই। আপাতত নিজের চলার জন্য এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হলেও জবটা ওর দরকার। করতে হবে এটা। মিথি হিয়া দুইজনই খুশি হলো এতে। এবং আজই ও প্রথম দিনের মতো জয়েন করল।দিয়ে গেল হিয়াই।  সব কাজ বুঝে নিয়ে মোটামুটি করার চেষ্টা করল। অতঃপর এক পর্যায়ে ডক্টর ফাজরিনকে দেখা গেল। বোধহয় এই হসপিটালেও বসেন উনি।  মিথি প্রথমেই দেখেই শুকনো ঢোক গিলে। সেদিনকার রাতের সে ভয়ানক ঘটনাগুলো আবারও চোখের সামনে ভাসে। মিথি মুখ লুকিয়ে ডক্টর ফাজরিনের সম্মুখীন না হওয়ার জন্য অন্য পাশে ফিরতে নিল। অথচ লাভ হলো না খুব একটা। ডক্টর ফাজরিন নিজ থেকেই পেছন থেকে বলে উঠল,

“ তুমি আদ্রর ওয়াইফ না? কি যেন নাম  ছিল?  মিথি, মিথি রাইট তুমি? ”

মিথি আবারও শুকনো ঢোক গিলে। আদ্রর পরিচয়ে পরিচিত হতে ওর লজ্জা লাগছে। ইচ্ছেও হচ্ছে না ওর নামটা মুখে আনতে। ছোট করে বলল, 

“ হ্যাঁ, মিথি। ”

ডক্টর ফাজরিন হেসে বলল,

“ কেমন আছো এখন? সুস্থ আছো রাইট? আদ্র পরে আর ঝামেলা করেছে হুহ? ”

মিথি ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,

” আগের থেকে ভালো আছি। ”

ডক্টর ফাজরিন ঘড়ির দিকে চাইল। অতঃপর হেসে কিছুটা তাড়া দেখিয়ে বলল,

“ আচ্ছা,ভালো থেকো হুহ? আমাকে ও.টি রুমে যেতে হবে একটু। খেয়াল রেখেো নিজের হু? এই সময়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে। আদ্রকেও বলে দিও আরো সচেতন হতে। ”

সচেতন? আদ্র সচেতন হবে? হাস্যকর!মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। ততক্ষনে ডক্টর ফাজরিন চলে গিয়েছে নিজ ব্যস্ততায়। অতঃপর মিথি নিজের মতো নিজের কর্মব্যস্ততা শেষ করল সেদিনকার মতো। কাজ শেষে রাত আটটা কি নয়টার দিকে হিয়া এল। নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। সাথে অবশ্য দীপ্রও আছে।দীপ্রকে হিয়া এনেছে এই কারণেই কারণ মিথি দীপ্রকে সরাসরি ধন্যবাদ দিতে চেয়েছিল।   দীপ্র সম্পর্কে হিয়ার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই এবং বন্ধু। কোচিং এই বন্ধুত্বের  সম্পর্কটা আরো ভালো হয়েছে।  মিথির সাথে পরিচয়টা আজ হলেও বেশ মিশুক ও।আর এই অল্প সময়েই দীপ্রর সাথে মিথির ভালো সখ্যতাও গড়ে উঠল।  এই যে জবটার জন্যও মিথি নিজেই ওকে ধন্যবাদ জানাল সম্মুখে দাঁড়িয়ে। অতঃপর তিনজনই একসাথে হেঁটে বাসায় ফিরতে নিল। হিয়া দীপ্রর দিকে চেয়ে দ্রুত শুধাল,

“ তোকে আমাদের সাথে যেতে হবে না দীপ্র। চলে যা। শুধু শুধু হেঁটে কষ্ট করবি কেন? ”

দীপ্র তাকাল। পকেটে দুই হাত গুঁজে উত্তর দিল,

“ হাঁটলে ওজন কমবে আমার। সমস্যা নেই। চল তোরা আগে আগে। ”

দীপ্র অল্প স্বাস্থ্যবান। ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের এক মাত্র ছেলে হওয়াতে  ও গোলুমুলু ছিল আদরে যত্নে। অথচ এই স্বাস্থ্যবান খ্যাতিটা দীপ্রর ভালো লাগে না। হাই স্কুলে উঠার পর থেকেই ভালো লাগে না। ছোটবেলায় হয়তো রাগ করত, জেদ করত কিন্তু এখন এটা চাপা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে।অতঃপর এখন লম্বায়ও দীপ্র বেশ লম্বা হওয়াতে খুব একটা স্বাস্থবান মনে হয় না দীপ্রকে।প্রায় ছয় ফুট লম্বা ছেলেটার ভারিক্কি দেহ নিয়ে এখনো মজা চলে। এখনো কোচিং এর অনেকেই দীপ্রকে মাঝেমাঝে মোটা সম্বোধন করেই কথা বলে। দীপ্র হেসে উড়ালেও হিয়ার মানতে বিরক্ত লাগে। এইজন্য সে বেশ কয়েকবার বেশ কয়েকজনের সাথে কথা কাঁটাকাঁটিও করেছে। দুয়েকজনের সাথে ঝগড়াটা একটু গভীররকমেই হয়েছে। আর মূলত তারপরই দীপ্র ওকে বুঝাতে এসেছিল যে এসব নিয়ে ঝগড়া না করতে। মানুষের চিন্তাভাবনাকে তো ও বদলাতে পারবে না। দীপ্র সত্যিই বুদ্ধিমান, চমৎকার একটা ছেলে। যাকে মাঝেমাঝে হিয়ার মনে হয় বেশ বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় বাচ্চা একটা। হিয়া তাকাল দীপ্রর দিকে। দীপ্রর ফর্সা আলুথালু গালে দাঁড়ির ছায়া জম্মাচ্ছে। একদম বাচ্চাদের মতো লাগে এই ছেলের মুখটা। হিয়া হেসেই বলল,

“ তুই ওজন কমালে তোর গালটা এমন দেখাবে পরে? হাঁটতে হবে না বাপ, তুই রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে যা। আমরাও রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে যাচ্ছি। মিথির এমনিতেও কষ্ট হবে হেঁটে যেতে। এমনিতেও এইটুকু হেঁটে তোর খুব বেশি ওজন কমবে না। ”

দীপ্র ভ্রু কুঁচকায়। বলল,

“ তোর কি মনে হচ্ছে যে আমি ওজন কমাতে পারব না হিয়া? আমি অলরেডি এই মাসে আট কেজি  ওজন কমিয়েছি। ”

“ পারবি। কিন্তু আমি চাইছি না তুই এখন পড়ালেখা বাদ দিয়ে এসবে মনোযোগ দে। ওজন কমানো কোন কঠিন বিষয় না। পরেও পারবি। ”

দীপ্র হিয়ার থেকে লম্বা। বেশ লম্বা। ঘাড় নামিয়ে শুধাল,

“ আর যদি আমি এভাবে থেকে যাই? ”

হিয়া চমৎকার ভাবে শুধাল,

“ তবুও তুই আমাদের দীপ্রই থাকবি দীপ্র। আমি তোকে ওজন কমানো বাধ্যতামূলক একবারও বলিনি।তুই যেমন তেমনই সুন্দর আছিস। তুই-ই পাগলের মতো পড়ালেখা বাদ দিয়ে সকাল -সন্ধ্যা- রাত জিমে গিয়ে পড়ে আছিস। ”

“ আমি তো আর দেশে থাকব না,  পড়ালেখা করে আর কি করব? আইলস করে বাইরে ট্রাই করার ইচ্ছা আছে।কিন্তু তার আগে ওজন কমিয়ে সুন্দর হয়ে যেতে হবে বুঝলি? ”

হিয়া কপাল কুঁচকায়। শুধাল,

“ এমনিতে কি বান্দর দেখায় তোকে? সত্যি করে বল, কোন মেয়ের জন্য ওজন কমাতে উঠে পড়ে লেগেছিস ভাই? রিজেক্ট করেছে নাকি? ”

দীপ্র বলল,

“ রিজেক্টেড যাতে না হতে হয় তার জন্য নিজেকর পরিবর্তন করছি। কারণ আমি সত্যিই তাকে চাই। ”

হিয়া হাসল। যেন দীপ্র মজার কোন কথা বলল। শুধাল,

“ একেই বলে বুদ্ধিহীন পুরুষ!  আরেহ গরু, যে মেয়ের জন্য তুই এত ভাবছিস টাইম  নষ্ট করছিস, পরিবর্তন করছিস নিজেন সে মেয়ে তোকে নিয়ে এতোটা ভাববে কি গ্যারান্টি আছে? আজকালকার রিলেশনের ভ্যালু আছে? বেশিরভাগই টাইম পাস আর স্বার্থের জন্য হয়। তুই বাচ্চা বাচ্চা মানুষ, তোকে তো সহজ সরল পেয়ে আরো ঠকাবে। কোন গ্যারান্টি নেই এসবের। ”

“ নেই? ”

“ একদমই না। এর চাইতে খালা দেখেশুনে তোকে হাজার গুণ সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করাবে দেখে নিস ভাই। অপেক্ষা কর কেবল। ”

দীপ্র শুধাল,

“ করছি তো। তোর কি মনে হচ্ছে আমি ডেস্পারেট এসবে? ”

হিয়া সুন্দরভাবে উত্তর করল,

“ না, তোকে আমার ভদ্র মনে হয়েছে বলেই বন্ধুত্ব করেছি। এসব প্রেম ভালোবাসায় ডেস্পারেট  জানলে বন্ধুত্ব করতাম না আমি। ”

মিথি চুপচাপ ওদের কথা শুনছে। বলার মতো ওর কিছু নেইও৷ তাছাড়া এতোটা সময় এখানে থাকার পর ক্লান্তিতে ওর চোখ নিভু নিভু যেন। শরীর ভেঙ্গে আসছে কেমন। পেটে ক্ষিধেও লেগেছে । আজকাল কিছুক্ষন পরপরই ক্ষিধে পায় ওর। বোধহয় প্রেগন্যান্সির কারণে। মিথি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেই একটা রিক্সা দেখা গেল। দীপ্রই ডাকল। অতঃপর শুধাল,

“ হিয়া, মিথি ? ”

হিয়া বলল,

“ কি? ”

“ উঠে যা তোরা। রিক্সা নাও পেতে পারিস। মিথি?  উঠে যা সাবধানে।  ”

এই যে এই অল্প সময়েও মিথিকে তুই সম্বোধন এবং নাম ধরে এভাবে বলা সত্যিই আপন আপন লাগল। মিথি আর হিয়া মাথা নাড়িয়ে উঠে গেল। 

.

শীতকালের সকালে হুট করেই ঝরঝরে বৃষ্টির ছোঁয়া। আজ সকাল থেকেই বেশ ঠান্ডা পড়েছে। এতোটা ঠান্ডা যে হাত পা জমে আসছে। অথচ মিথির আজ চাকরির তৃতীয় দিন। প্রথম,দ্বিতীয় দিন হিয়াই দিয়ে এসেছে, হিয়াই এনেছে। আজ অবশ্য হিয়া নেই। মিথি একা যাবে বলেই বের হয়েছিল। অথচ নেমে বাইরে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি দেখে কপাল কুঁচকাল ও। কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি ইতোমধ্যে গায়েও পড়েছে। অথচ মিথি ছাতা আনে নি। বলতে গেলে এই মুহুর্তে ওর নিজের ছাতা নেইও। কিনতে হবে। তাই আর উপরেও গেল না। ওভাবেই রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে থাকল৷ অতঃপর কিয়ৎক্ষন পর পাশের বিল্ডিং থেকে হিমেল এবং ওর ভাই এর মেয়ে সিমরানকে বের হতে দেখা গেল। হিমেল সিমরানকে ছাতা মেলে  দিচ্ছে। অপর হাতে নিজের ছাতাটাও মেলে নিয়ে দোকানে গেল। কিছু একটা কিনে  সিমরান যখন আবার ফিরে আসতে নিল তখনই মিথির সাথে চোখাচোখি হলো। সিমরান ওকে দেখেই খুশি হয়ে  এগিয়ে এল। মিথিও হেসে শুধাল,

“ সিমরান,  তুমি?  ভালো আছো? ”

সিমরানও সঙ্গে সঙ্গেই শুধাল,

“ তুমি এখানে? ভালো আছো? ”

“ হ্যাঁ। তুমি? ”

“ আমিও। শীত করছে না তোমার? বৃষ্টি পড়ছে তো। ”

মিথি হেসে জবাব দিল,

“ হু। থেমে যাবে হয়তো। তুমি একা যেতে পারবে বাসায়? ”

মিথি ভেবেছিল হিমেল সিমরানকে একাই পাঠিয়ে দিয়েছে। অথচ সিমরান জবাব দিল,

“ চাচ্চু আছে সাথে। ”

এইটুকু বলেই আঙ্গুল উঁচিয়ে একচু পেছনে হিমেলকে দেখাল। মিথি তাকাল। ঠিক তখনই আবার চোখাচোখি হলো হিমেলের সাথেও৷ হিমেল ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ কি? ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? ”

মিথি অপ্রস্তুত হলো যেন। ও তাকিয়ে থাকে নি। শুধু তাকিয়েছে মাত্র।তবুও বলল,

“ না, এমনিই।”

হিমেলের ভ্রুজোড়া কুঁচকানো। কয়েক সেকেন্ড মিথির দিকে খেয়াল করে আরো কুঁচকে এল ভ্রু জোড়া। অতঃপর মেলে রাখা ছাতাটা সিমরানের দিকে বাড়িয়ে বলল,

“ সিমরু, এটা তাকে দাও। ”

সিমরান কথামতো নিল। মিথির দিকে এগিয়ে বলল,

“ তোমার জন্য। নাও। ”

মিথির চোখ ছোট হয়ে এল।  উত্তর কি দেওয়া উচিত? উশখুশ করে বলে,

“ কিন্তু আমার তো দরকার হবে না সিমরান। এক্ষুনিই চলে যাব। তুমি রেখে দাও। ”

হিমেলের মুখ গম্ভীর দেখাল এবারে বেশ। মিথির দিকে চেয়ে কাটকাট গলায় বলে উঠল ও, 

“ মিথি, টেইক ইট।”

“ হু?”

আবারও গম্ভীর গলায় উত্তর এল,

“ ওটা নিতে বললাম।” 

মিথি নাকোচ করে জানাল,

“ লাগবে না হিমেল ভাই। ”

“ লাগবে কি লাগবে না তা আমি তোকে জিজ্ঞেস করিনি মিথি। ”

মিথি নমনীয় গলায় জানাল,

“ আমার সত্যিই লাগবে না হিমেল ভাই। আমাকে যেতে হবে এক জায়গায়। বৃষ্টি অতো বেশিও না। সমস্যা হবে না আমার। ”  

“ তো? ” 

“ এইটুকু বৃষ্টিতে ছাতা না নিলেও হবে হিমেল ভাই। ”

“ যদি বৃষ্টি নামে তখন এই ঠান্ডার মধ্যে ভিজতে নিশ্চয় ভালো লাগবে তোর? ”

মিথি এবারে চোখ ছোট ছোট করে নিল।  কিছুটা সময় চুপ থেকে হাত বাড়িয়ে নিল ছাতাটা ও। হিমেল তাকাল। বলল,

“ আমার তো সন্দেহ হচ্ছে তুই চোখে দেখতে পাস কিনা মিথি। ”

“ পাই হিমেল ভাই। ”

“ ঝড়বৃষ্টির অনুভূতি বুঝিস? ”

“ বুঝি। ”

হিমেল এবারে চুপ থাকল। সিমরানের হাত ধরে যেতে যেতে শুধাল,

“ আই থিংক সিমরান তোর থেকে ভালো বুঝে কখন কি করা উচিত হবে মিথি। ”

.

রিধির মাথা ব্যাথা করছে। চোখ খিচে অনেকটা সময় ও মুহিবের বুঝানো ম্যাথটক বুঝার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইচ্ছে হচ্ছে না। তাই কিছুটা সময় পর পাশের মেয়েটার সাথে সবে মুখ খুলেছে ঐ মুহুর্তেই মুহিব তাকাল ওর দিকে।মার্কার দিয়ে ইশারা দিয়ে বলল,

“ লাস্ট টেবিল!  রিধি। কথা বলছো কেন এভাবে? বুঝাতে কষ্ট হচ্ছে না আমার? ”

রিধি দাঁড়াল। বোকা বোকা স্বরে বলল,

“ আমি তো মাত্রই বললাম মুহিব ভাই। ”

“ মাত্র নাকি অনেকক্ষন তা তে ম্যাটার না। এতক্ষন যা বুঝিয়েছি বুঝেছো কিছু? পরীক্ষায় গোল্লা পাও তো এই কারণেই। ”

রিধির নাক ফুলে উঠল। রাগে ও কথাই বলল না আর। মুহিব আবারও বলল,

“ এখানে এসে এটা আবার রিপিট করে বুঝাবে। বুঝাতে পারলে শাস্তি নেই। বুঝাতে না পারলে বাইরে গিয়ে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। ”

“ হু?” 

“ কানে শোন নি? ”

রিধির রাগে দুঃখে চোখ টলমল করে। ও আর দাঁড়ালই না। ব্যাগ গুঁছিয়ে কাঁধে নিয়ে বাইরে যেতে নিল। যাওয়ার সময়ও মুহিব আবারও বলল,

“ কানে ধরে দাঁড়াবে বাইরে। চলে যেতে বলিনি আমি। ”

রিধি ফোঁস করে তাকাল। রাগে হাঁসফাঁস করে ও তাকিয়ে বাইরে গেল। কান ধরে দাঁড়িয়ে ও সবার প্রথমে মুহিবের গোষ্ঠি উদ্ধার করল। 

.

ফিজা সে রাত আটটা থেকেই মায়ের সাথে কথা বলছে। জরুরী আলাপ।কথার এতোটা সময়ে এসেও ওর মা ওকে কেবল এটাই বুঝাল যে, 

“ ফিজা? মেয়ে হয়েছো যখন তোমায় বিয়ে দিতে হবে না? নাকি সারাজীবন তোমায় আমরা রেখে দিতে পারব? ”

ফিজা উত্তর করল,

“ আমি পড়ালেখাটা শেষ করেই বিয়ে করব আম্মু। এখন না। ”

“ ভালো সম্বন্ধ হলে বিয়ে দিব না? তোমার আব্বুর ও শরীর খারাপ দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিয়ের পরও তো মানুষ পড়ালেখা করে ফিজা। তুমি জানো না তোমার আব্বুর অলরেডি ওপেন হার্ট সার্জারী করানো। মানুষটার অসুস্থতা সম্পর্কে জানো না নাকি?”

“জানি৷ কিন্তু আমি পড়ালেখা শেষ করি প্লিজ আম্মু। তারপর ভাবি?”

“তোমার কথা যদি আমরা সব রাখতে পারি তুমি কেন রাখবে না? তোমার আব্বুর দিকও ভাবা উচিত তোমার। ”

“ আব্বুর শরীর খারাপ, জানি তো আমি আম্মু। কিন্তু বিয়েটাই সমাধান? ”

ওপাশ থেকে জানানো হলো, 

“ তোমার আব্বুর বন্ধুর ছেলে। নিজ থেকে প্রস্তাব দিয়েছে। না করি কিভাবে? তোমার আব্বুর ও তো একটা মুখ আছে তাই না? ”

ফিজা অনেকটা সময়ে এভাবে কথা বলেই কল রাখল। মেজাজ খারাপ লাগছে ওর। মায়ের সাথে কথা কাঁটাকাটি হয়েছে কিছুটা। না চাইতেও হয়েছে। এদিকে ওপাশ থেকে আয়মানও বেশ কয়েকবার কল দিল। ফিজা মেজাজ খারাপ নিয়েই কল তুলল। ওপাশ থেকে আয়মান বলল,

“ এত সময় ব্যস্ত? কার সাথে কথা বলছিলে ফিজা যে ফোন তোলার সময় নেই?”

ফিজা শুধাল,

“ তুমিও এতবার কল দিচ্ছিলে কেন? কথা বলছি তো আমি কারোর সাথে। ”

ফিজার গলা শুনে আয়মান থেমে গেল। ছোটশ্বাস ফেলে শুধাল,

“ কেউ কিছু বলেছে ? ”

“ না। ”

আয়মান শান্তস্বরে জানাল,

“ তাহলে? কথার টোন এমন কেন?” 

ফিজা ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,

“ কিছু বলবে আয়মান? না বললে ফোন রাখো। আম্মু কল দিচ্ছে। ”

“ কিছু হয়েছে? তুমি টেনশন করছো কিছু নিয়ে? ”

ফিজা বলল,

“ তেমন নয়। তোমার তো পরীক্ষা দুয়েকদিন পর? পড়ো আয়মান। আমি পরে কথা বলব তোমার সাথে। ”

 

Loading spinner

Reply
Alakananda Aindri
Posts: 14
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 6 months ago

পর্ব:১৮
 

 

মিথি ফিরল রাত আটটায়। আজ তুলনামূলক কাজের চাপ বেশিই ছিল বোধহয়। মিথি দুপুরেও খাওয়া হলো না। ক্ষিধেতে ওর পেট ছোঁ ছো করছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্র্যাগনেন্সিতে ক্ষিধের পরিমাণ বেশি থাকে, তার উপর এতোটা সময় ও খায় নি৷  শারিরীক ক্লান্তি আর দুর্বলতা নিয়ে ও সর্বপ্রথম হাত মুখ ধুঁয়ে খাওয়ার উদ্দেশ্যে রান্নাঘরেই গেল। অথচ হতাশ হলে যখন দেখা গেল হাড়ি পাতিল গুলো মোটামুটি খালিই পড়ে আছে। মিথি ছোট শ্বাস ফেলল। হিয়া সম্ভবত আজ বাড়ি গিয়েছে। রিধি আর ফিজা রান্নায় মোটামুটি কাঁচা। এই কারণেই বোধহয় যা ছিল তা দুইজনে ভাগাভাগি করে খাওয়ার পর আর রান্না করে রাখা হয় নি। মিথি বাইরে একবার তাকাল। ফিজা আপু ফিরেনি, রিধিও পড়ছে। অতঃপর ক্ষিধে নিয়েই মিথি হাড়িটা ধুঁয়ে নিল। চাল ধুঁয়ে চুলোয় বসাতে নিতেই দেখা গেল গ্যাসের তামাশা।খুবই অল্প তাপ৷ সকালের দিকেও কিংবা দুপুরে ও লাইন গ্যাস হওয়াতে এই সমস্যাটা ফেইস করতে হচ্ছে। মিথি ছোট শ্বাস ফেলে ওভাবেই চুলোয় ভাতের হাড়ি বসিয়ে বের হয়ে এল। একপাশে বসতে নিতেই রিধি বলল,

“ তোমার মুখচোখ খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে মিথি আপু। ঘুমাও কিছুক্ষন। ”

মিথি উত্তর করল,

“ হ্যাঁ, ঘুমাব। ”

রিধি ফের বলল,

“হিয়া আপু কল করেছিল। তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছে। যায় হোক, কেমন চলছে প্রথম কাজ করা? সব ভালো ওখানে? ”

“ ভালো চলছে। কিছুক্ষেত্রে মানিয়ে নিচ্ছি । কিছুক্ষেত্রে অত্যাধিক ভালো এমন৷ ”

এটুকু বলে মিথি চোখ বুঝল কিঞ্চিৎ। মাথাটাও ব্যাথা করছে ওর। সাথে ঘুম ঘুম ও লাগছে।পায়ের দিকটায় কিঞ্চিৎ টান পড়ে আছে। বোধহয় হাঁটাচলার কারণে। মিথি এসব নিয়েই কিছুটা সময় ওভাবে বসে থাকতেই রিধির ফোনে কল এল। হিয়া কল করেছে। শুধাল,

“ মিথি? ”

মিথি ফোন কানে নিল রিধির থেকে। ওপাশ থেকে আবার বলল,

“ কতক্ষন হলো ফিরেছিস? আমি রিধিকে আরো দুবার কল  করেছিলাম। ”

“ রিধি বলেছিল। ভালোভাবে পৌঁছেছিস?কল করে খোঁজ নিতে পারিনি আমি। ”

“ দূর পাগল।আমি তোর খোঁজ নিব নাকি তুই?  খাওয়া হয়েছে তোর? ”

মিথি উত্তর করল,

“ হয়নি। রান্না বসিয়েছি। তাও গ্যাসের অবস্থা খু্ব খারাপ। গ্যাস আসলে রান্না হয়ে যাবে আশা করি। ”

“ দুপুরেও তো খাস নি আজ। ক্ষিধে লাগছে না? ”

মিথির ক্ষিধে লেগেছে। একটু বেশিই লেগেছে। তবুও বলল,

“ তেমন লাগে নি। ”

“ মিথ্যে বলছিস। রুমে কিছু এমনি আছে কিনা দেখ। ফল- টল কিছু আছে কিনা দেখ। আপাতত থাকলে খেয়ে নে৷ ক্ষতি হবে এভাবে। ”

“ হু। ”

হিয়া আবারও বলল,

“ তোর ভাইকে দেখেছিলাম আজ মিথি৷ ”

“ ওহ। আমার কথা জিজ্ঞেস করেছে?”

“ না, তবে বলল তুই যাতে বাড়িতে যাস। তোর বর তোকে নিতে এসেছিল, খোঁজ করেছিল। ”

মিথি ভ্রু উঁচাল। বলল,

“ আদ্র? ”

“ হ্যাঁ,তোর বর। ”

“ কেন? ”

“ বলল সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তুই যাতে সবটা ভুলে ফিরে যাস। শুধু শুধু রাগ অভিমান করে একটা সংসার ভেঙ্গে লাভ আছে নাকি?  এসব বলল।”

“ ওহ। ”

হিয়া আবারও বলল,

“ তোর ভাই তোর সাথে দেখা ও করতে চাইল মিথি। ”

মিথি ক্লান্ত গলায় জানাল,

“ হয়তো এসবই বলবে৷ বুঝতে পেরেছি। ”

হিয়া কৌতুহল নিয়ে শুধাল,

“ তুই ফিরবি? ফিরে যাবি মিথি? ”

মিথি চুপ থাকল। অনেকটা সময় পর শুধাল,

“ আদ্র যদি ভুল বুঝতে পারে তাহলে ফেরা উচিত আমার? ”

হিয়া জবাব দিল,

“ না!  কুকুর সবসময় কুকুরই থাকে মিথি। ফিরবি না তুই। একদমই ফিরবি না। ”

.

আদ্রর মা বিরিয়ানি রান্না করেছে। আদ্রর পছন্দের খাবার। আগে হলে আদ্র মা নিজেই ছেলেকে ডেকে আদর যত্ন করে খাওয়াতো। অথচ আজ ডাকল না অব্দি। টেবিলে যেভাবে বেড়ে রাখা ওভাবেই আছে। আদ্র মায়ের দিকে চাইল একবার। বলল,

“ অনেকদিন পর তুমি বিরিয়ানি রান্না করেছো নিজ হাতে আম্মু। ”

আদ্রর মা হাসল। ছেলের পাশের চেয়ারে বসে হঠাৎ শুধাল,

“ আদ্র, মিথি গিয়েছে আজ অনেকগুলো দিন। তুমি ভালো আছো এখন তাই না? আশা করি সুখে আছো। ”

মিথির কথা হঠাৎ তোলার কারণ হলো আদ্রর মা হিয়ার খবর জানতে পেরেছে মিথির ভাই এর মাধ্যমে। ওখানে গিয়ে হিয়ার সাথে দেখা করবে। সুযোগ মিললে মিথির সাথেও দেখা করবে। অনেকদিন মেয়েটার খোঁজ নিতে পারেনি সে। কোন মাধ্যমই পায়নি। আদ্র মায়ের কথা শুনে বলল,

“ আমি ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলাম ওকে আম্মু। ও না ফিরলে আমার কি করার? জোর করে আনব ওকে আমি? ”

“ নিশ্চয় ও ফিরে আসার মতো ভালো কোন কাজ তুমি করোনি আদ্র। নিজের সন্তানকে কি করে মানুষ চায় না? ছিঃ!আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোমাকে বিষ খাইয়ে মে'রে ফেলি আদ্র। এতোটা অমানুষকে আমি কি করে বড় করেছি। ”

আদ্রু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ মিথি তোমার কাছে আমার চাইতেও আপন? ”

“ কারণ ও তোমার মতো অমানুষ নয় আদ্র। ওর চারিত্রিক গুণাবলী যথেষ্ট সুন্দর। ও আমার বংশধরকে বহন করছে শত বাঁধা পেরিয়েও। আর এদিকে তুমি এমন একটা অমানুষ তৈরি হয়েছো যে তোমার জন্য আমি ওকে হারিয়ে ফেলেছি। যোগাযোগের সর্বনিম্ন মাধ্যমও খুঁজে পাচ্ছি না। ”

আদ্রর রাগ লাগল। সবসময় মিথি ভালো এটা শুনতে তার ইচ্ছে হয় না। অসহ্য লাগে। মিথিকে পেলে ও বুঝাত সব হারে হারে। সবটা দেখাত৷ আদ্র রাগে মুখ টান টান করেই বলে,

“ মিথির জায়গায় তুমি মুহুকে এক্সেপ্ট করলে তো এসব হতো না আম্মু। আমিও তোমার চোখে অমানুষ হতাম না। ”

আদ্র মাও রেগে জানাল,

“ মিথির জায়গায় তুমি মুহুকে বসাও কিভাবে? কোথায় মুহু আর কোথায় মিথি? আমি শিওর মুহুর মতো মেয়েরা কখনো সংসার করতে পারবে না। তুমি দেখে নিও আদ্র, মুহু তোমায় কখনোই বিয়ে করতে রাজি হবে না। মুহুরা সংসার করতে জানেই না আদ্র। ওরা বাঁচে আলাতা অহং নিয়ে। ”

আদ্র তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলল,

“ মোটেই না। মুহু আমায় নিয়ে সংসার  করার স্বপ্ন দেখে। ”

“ তাই নাকি? হাসালে। তাহলে করছো না কেন বিয়ে? সমাজের চোখে তো তোমার আর মুহুর সম্পর্কটা খুব একটা পবিত্র দেখাচ্ছে না। এমনকি আমার চোখেও না। ”

আদ্রর রাগে হাঁসফাঁস লাগে। ওটুকু বলেই ও না খেয়ে উঠে গেল। হনহন করে নিজের ঘরে গেল। অতঃপর আবারও বের হয়ে এল। সদর দরজার দিকে যেতে যেতে আদ্রর মা বলল,

“ অপাত্রে ভালোবাসা দান করলে পরে আপসোস করতে হয় আদ্র। আমি শিওর তুমিও একদিন খুব পস্তাবে। খুব!  ”

আদ্রর সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে শুধাল,

“ ঐ গেঁয়ো মিথির জন্য? জীবনেও না!”

.

মিস্টার এহসান। মুহুর বর্তমান বিজন্যাস পার্টনারই বলা চলে এই ছেলেটাকে। চোখে মুখে আলাদা তেজ ফুটে উঠে যেন তাকালেই। একটা আলাদা দম্ভ, অহংকার। মুহু প্রায় মিনিট দশ হলো গ্লাসের এ পাশ থেকে এই ছেলের চোখ মুখের তেজ, জেদ, দম্ভ পরখ করছে। ও ইন্টারেস্টেড হয়ে পড়ছে এই ছেলের প্রতি? কোন ভাবে আগ্রহ জম্মাচ্ছে এই ছেলের প্রতি? না নাহ! ও তো আদ্রকে ভালোবাসে। আদ্রকেই চেয়ে এসেছে এতকাল। ওর দুনিয়াতে সবচাইতে আপন মানুষটাই হলো আদ্র। তাহলে? ও কেন এই ছেলেটার পেছনে এত সময় নষ্ট করছে হু? মুহু ছোট শ্বাস টানে। অতঃপর পা বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে ছেলেটার কাছে গেল। হেসে বলল,

“ মিস্টার এহসান?  সময় নষ্ট হলো আপনার? ”

এহসানের চোখে মুখে বিরক্তি এবং  সুস্পষ্ট দম্ভ নিয়ে জানাল,

“ এহসান লাইফে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে না মিস মুহু। টেন মিনিটস ইনভেস্ট করে টেন ক্রোর আর্ন করে নিতে জানে এহসান৷ ”

“ ভেরি গুড। আপনি চাইলে কালও কিছুটা সময় নষ্ট করতে পারেন আমার জন্য। করবেন? ”

“ কোন দরকারে? ”

মুহু সুন্দরভাবেই হেসে বলল,

“ আমার জম্মদিন। নর্মালি মানুষ মা বাবা পরিবার নিয়ে জম্মদিন সেলিব্রেট করে। কিন্তু আমি অফিসের সবার সাথেই সেলিব্রেট করি। আপনাকেও ইনভাইটেশন কার্ড দেওয়ার ছিল। ”

সাধারণত মুহুর মতো মেয়ে এমন হেসে হেসে কথা বলে নিজের জম্মদিনে যেতে বললে যে কোন পুরুষই বোধহয় উতলা হবে। গদগদ হয়ে রাজি হয়ে যাবে। অথচ এহসানকে রাজি হতে দেখা গেল না। বরং বলল,

“ আপনার কেন মনে হলো আপনি ইনভাইটেশন কার্ড দিলেই আমি সত্যি সত্যিই আপনার বার্থডে সেলিব্রেট করতে চলে আসব? ”

“ আসতে হয় মিস্টার এহসান। কোম্পানির সুবিধার্থে সম্পর্ক ভালো বজায় রাখতে হলেও আসতে হয়। বিজন্যাস সম্পর্কে মোটামুটি আমার ভালো ধারণা আছে। ”

এহসান ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,

“ এমনও তো হতে পারে আমি সম্পর্ক ভালো রাখার সুবিধার্থে কিছুই করলাম না। তবুও আপনি সম্পর্কটা সুন্দরই রাখলেন অদৃশ্য কোন টানে। হতে পারে না? ”

মুহু হেসে চাইল। এই এহসানের কথায় আসলেই কোন টান আছে।নয়তো মুহু এই ছেলের কথা শুনে এতোটা উৎফুল্ল বোধ করত ? বলল,

“ আপনার কথায় আলাদা এক চতুরতা স্পষ্ট মিঃ এহসান। ”

“ এমন তো না যে আপনি কোন বোকা মহিলা৷ হয়তো আমার চতুরতায় সামলে উঠতে পারছেন না এই আরকি।”

“ আই থিংক আপনি সুন্দর ফ্লার্টও করতে পারেন মিস্টার এহসান। ”

“ আমি ফ্লার্ট করলে আপনি এতক্ষনে এতটুকুতে আটকে থাকতেন না মিস মুহু। বহু আগেই বহু কিছু অফার করে বসতেন। ”

“ যেমন? ”

এহসান উঠল। বলল,

“ আপনি জানেন আমি কি মিন করছি।”

মুহু তাকাল। এহসান নিজের আলাদা ভাব নিয়েই হেঁটে গেল। আজ মুহুই ডিনার অফার করেছিল এহসানকে। তাই কথাটা চেপে গেল। এহসানের পিছু পিছু গেল। অতঃপর গাড়িতে উঠল এহসানের সাথে সংকোচ ছাড়াই। 

.

আদ্র মুহুর অফিসেই এসেছিল। জানতে পারল কোথাও গিয়েছে। অতঃপর মুহুর বিশ্বস্ত একজন থেকে কোথায় গিয়েছে তা ঠিকানা নিয়ে গিয়ে দেখা গেল রেস্টুরেন্টে মুহু এবং আরেকজন অপরিচিত ছেলে। আদ্র ভ্রু কুঁচকাল। কিয়ৎক্ষন চেয়ে থেকে আবার বের হয়ে এল ও। কল দিল মুহুকে। কল তুলতেই শুধাল,

“ মুহু?  ”

“ হু আদ্র, বলো। ”

আদ্র জিজ্ঞেস করে,

“ কোথায় তুমি? ”

উত্তর এল,

“ একটা মিটিং ছিল। আধঘন্টার মধ্যে বাসায় পৌঁছাব আদ্র। ”

“ আমি অপেক্ষা করছি। আসো। ”

মুহু সত্যিই আধঘন্টার মধ্যে এল। আদ্রর রাগ লাগছে অযথাই। চোখমুখ লাল হয়ে আছে। রাগে হাঁসফাঁস লাগছে।চেহারাও অস্বাভািবিক লাগছে। মুহু আসতেই আদ্র চোখ তুলে চাইল। শুধাল,

“ মুহু? ”

মুহু তাকাল। কিয়ৎক্ষন পরখ করে বলল,

“ কি হয়েছে আদ্র? এমন কেন চোখমুখের অবস্থা? ঠিক আছো তুমি?”

আদ্র আচমকাই মুহুকেই জড়িয়ে ধরল। কেন ধরল তা বোধহয় ও নিজেও জানে না। রোধ হয়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“ মুহু? ”

মুহু হাত বুলাল ওর মাথায়। শুধাল,

“ হ্যাঁ, বলো আদ্র। রেগে আছো তুমি? কষ্ট হচ্ছে?  এমন করছো কেন? ”

“ আমি তোমাকে ভালোবাসি মুহু। জানো তুমি তাই না? আমার সাথে চিট করার সাহসও করো না মুহু। কখনো করো না। ”

“ হঠাৎ? হঠাৎ এই কথা?”

আদ্র ওভাবেই ওকে জড়িয়ে আছে ঘাড়ে মুখ গুঁজে। বলল,

“ তুমিও আমায় ভালোবাসো রাইট? ”

“ বাসি। বাসি তো। ”

“ তো আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইছি। এই মুহুর্তেই। আমার আর এই রকমের সম্পর্কটা ভালো লাগছে না। আঁই নিড ইয়্যু মুহু।চলো বিয়ে করে কোথাও চলে যাই।   ”

মুহু অবাক হলো যেন। শুধাল,

“ কিসব বলছো আদ্র? 

আদ্র মুখ তুলে। বলে,

“ ভালোবাসো রাইট? তো বিয়ে করতে কি সমস্যা মুহু? আমরা অনেক আগেই বিয়ে করে ফেললে মিথি কোনভাবেই আমার লাইফে আসতে পারত না। আম্মু মিথিকে বিয়ে করতে বলার পরও আমি তোমাকে বিয়ে করার অফার দিয়েছিলাম। কি এত সমস্যা বিয়েতে তোমার? ”

মুহু  মুহুর্তেই বলল,

“ আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না। সামনে পুরো ক্যারিয়ার পড়ে আছে আমার। ”

“ তো এটা তোমার ভালোবাসা? আশ্চর্য! এতসব করতে তোমার সমস্যা হচ্ছে না, শুধু বিয়েতেই সমস্যা!  ”

মুহু রেগে গেল যেন আচমকা। চিৎকার করে শুধাল,

“ টিপিক্যাল পুরুষদের মতো চিন্তা করছো আদ্র। বিয়ে ছাড়া মানুষ টাইম স্পেন্ড করে না বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের সাথে? বিয়ে বাধ্যতামূলক হু? বিয়ে করে কয়জন সুখী আছে আদ্র? তোমার বউ সুখী হয়েছে বিয়ে করে? ”

আদ্র রাগে কপাল কুঁচকাল। মুহুর থুতনি চেপে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ আমার বউ সুখী হয়নি বলে কি বুঝাতে চাইছো তুমি? আন্সার মি মুহু।”

“ তুমি একজন ভালো হাজব্যান্ড নও বাট একজন ভালো লাভার আদ্র এটাই বললাম। যদি বিয়ের পর তুমি বদলে যাও? ”

আদ্র রাগে চোয়াল শক্ত করে। দাঁতে দাঁত চাপে। অতঃপর মুহুর গাল চেপে ধরে বলল,

“ আমি ভালো হাজব্যান্ড হইনি কার জন্য? তোর জন্য মুহু। তুই কি চেয়েছিলি? আমি একাধারে দুইজনকে ভালোবাসব? তোকেও আবার মিথিকে ও? ভালো তো তোকেই বেসেছিলাম এইজন্য মন থেকে সরাতে পারছি না। নয়তো সরিয়ে ফেলে দিয়ে সংসার করতাম মন দিয়ে। ”

এইটুকু বলেই ও আবারও বের হয়ে গেল। মুহু হতবিহ্বল! ওর সাথে আদ্র এমন ব্যবহার কখনো করেনি। কখনো না।ও যেভাবে বলতো আদ্র ওভাবে করতো। ওকে পুতুলের মতো ট্রিট করত। আজ কি হলো? এমন করল কেন আদ্র? 

 

Loading spinner

Reply
Alakananda Aindri
Posts: 14
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 6 months ago
পর্ব:১৯
 
 
 
মিথির এভাবে করে দু দুটো মাস গেল ভালোভাবেই। এতদিন মিথি সন্তানসম্ভাবা এটা চোখের দেখাতেই না বুঝা গেলেও এখন দৈহিক গঠনের কারণে বুঝা যায় একটু একটু৷ তবুও এখনও পর্যন্ত যে কারোর কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি এতেই মিথি বোধহয় সুখী অনুভব করে। আজকাল মানুষের কথাকে ও ভয় পায়। মানুষজনকেও ভয় পায়। মানুষজনের প্রশ্নকে তো আরো। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। এখন রাত আটটা। তার কাজ শেষ। বাসায় যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যেতে নিতেই দেখা হলো ডক্টর ফাজরিনের সাথে। মিথিকে দেখে সর্বপ্রথম সে হাসল। বলল,

“ মিথি, ভালো আছো? ”

মিথি তাকাল। বিনিময়ে সেও হাসল৷ তবে মনে প্রশ্ন আসে আদ্রর সাথে কি ডক্টর ফাজরিনের যোগাযোগ হয়? কোনভাবে বলে দিলে? আদ্র জেনে গেলে? শুকনো হেসে বলল,

” ভালো আছি। আপনি? ”

“ একদম ভালো। তুমি এখানে জব করছো? এই অবস্থায় এতোটা পরিশ্রম শরীরে সইতে পারবে? ”

মিথি হেসে জানাল,

“ পারছি। ”

ডক্টর ফাজরিন মিষ্টি করে হাসল। বলল,

“ যত্ন নিও নিজের  এবং বাচ্চার। ভালো থেকো। মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া অবশ্যই ভালো ”

এটুকু বলেই ডক্টর ফাজরিন পা বাড়াল। মিথি তাকিয়ে দেখল। অতঃপর সেও পা বাড়াল নিজের মতো। রাতের শহরে তখন ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট। চারপাশে মৃদুমন্দ হাওয়া৷ অথচ রাস্তায় এত গাড়ির সরগমেও রিক্সা মিলছে না। মিথি কিছুটা বিরক্তই হলো৷ প্রায় মিনিট বিশ দাঁড়িয়েও যখন রিক্সা পেল না তখন হতাশ হলো ও। ঠিক তখনই আচমকা নিজের সামনে একটা রিক্সা থামতে দেখা গেল। মিথি ভ্রু কুঁচকাল। রিক্সায় বসা মানুষটা হিমেল ভাই। মিথির দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকাল সে। জিজ্ঞেস করল,

“ রিক্সা নেই? ”

মিথি তাকাল। উত্তরে বলল,

“ আজ পাচ্ছি না। ”

হিমেল কিছুটা সময় চুপ থাকল। অতঃপর এদিক ওদিক চেয়ে দেখল খালি রিক্সার দেখা মিলছে না। তাই আবারও জিজ্ঞেস করল,

“ একই রিক্সায় যেতে অসুবিধা হবে তোর? ”

মিথি শুনল বোধহয়। তবুও জিজ্ঞেস করল,

“ জ্বী? ”

“ এই রিক্সায় যেতে অসুবিধা হবে তোর? ”

মিথি এবার ইতস্থত বোধ করল। হিমেল ভাই এর সাথে তার ইদানিং কয়েকদিন পরপরই দেখা হচ্ছে । কথা হচ্ছে। এবং না চাইতেও সাহায্য নিতে হচ্ছে। এই যেমন সেদিন ছাতা নিতে হলো, কয়েকদিন রিক্সা পাচ্ছে না বলে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল ও। তখনও হিমেল তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল যতোটা সময় রিক্সা পায়নি। মিথি ইতস্থত বোধ করে উত্তর করল,

“ আমি একটু পর রিক্সা পেলে চলে যাব হিমেল ভাই। পেয়ে যাব আশা করি। আপনি চলে যান।  ”

হিমেলের উত্তরটা মোটেও পছন্দ হলো না। জানাল,

“ পেয়ে যাবি তা আমিও জানি। কিন্তু কখন পাবি তা তুই জানিস? এতোটা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগবে নিশ্চয় তোর?  ”

“ এতক্ষন অপেক্ষা করেছি যখন আর কিছুটা সময় অপেক্ষা করলে পাব। ”

হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। মিথি যে ওর সাথে এক রিক্সায় কখনোই যাবে না তা  হিমেল ভালোভাবেই জানে৷ তাই নেমে গেল দ্রুত। জানাল,

“ আমি নেমে গেছি। তুই এবার যেতে পারিস। ”

“ প্রয়োজন নেই তো হিমেল ভাই। আমি একটু পর চলে যাব রিক্সা পেলেই। ”

“ আমার সাথে যেতেই তো অসুবিধা ছিল তাই না? নেমে গেলাম তো। একা যেতেও অসুবিধা হবে নাকি তোর? ”

মিথি উত্তর করল,

“ না, কিন্তু ওটা আপনি নিয়েছেন। আপনার নিশ্চয় দেরি হবে। আমি ঠিক চলে যেতে পারব প্রতিদিনের মতো। ”

হিমেলের এবার কপাল কুঁচকে এল। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

” আমি তোকে খারাপ কিছু বলিনি নিশ্চয়? কিংবা খারাপ কোন উদ্দেশ্য নিশ্চয় আমার নেই এতে?  ”

মিথি বিনয়ী স্বরে জানাল,

“ আপনি ভুল বুঝছেন। আমি সত্যিই আপনার থেকে এই সাহায্যটা নিতে চাইছি না বলেই উঠছি না। আর অন্যকিছু না। ”

“ কেন? আমি অপরিচিত?  ”

“ আপনি আমার গ্রামের বড়ভাই। এইছাড়া খুব একটা পরিচিতি আমাদের নেই হিমেল ভাই। ছোট থেকে আপনাকে হিমেল ভাই হিসেবে জেনে এসেছি এটাই বলতে গেলে পরিচয়। কিন্তু এতবার সাহায্য নেওয়ার মতো আমার আপন কেউ নন আপনি।মোটকথা,  আমি বারবার আপনার থেকে সাহায্য নিতে চাইছি না৷ ”

“ তুই আমাকে অপরিচিত বলছিস তাই তো? ওকে ফাইন। আমিও তোকে চিনি না আজ থেকে। ”

মিথি নিরাশ হলো। পরপরই খালি রিক্সা দেখা গেল। হাত উঁচিয়ে রিক্সাটা ইশারা করে মিথি শুধাল,

“ রিক্সা পেয়ে গেছি হিমেল ভাই। আপনিও চলে যান। ”

.

রিধি তখন সন্ধ্যায় দোকানে এসেছিল কিসের জন্য। দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনে আবারও সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিতেই দেখা হলো সেই অতি পরিচিত রিধির সেই অপছন্দে আন্টির সাথে। ভদ্র মহিলাও বোধহয় দোকানের জন্যই নামছিল। রিধিকে দেখে মুহুর্তেই ভ্রু কুঁচকে ডাকল,

“ এই রিধি, এই? ”

রিধির পছন্দ হয় না এই মহিলাকে। তবুও হেসে বলল, 

“ কি আন্টি? কিছু বলবেন? ”

ভদ্রমহিলা সন্দেহি নজরে বলল,

“ তোমাদের সাথে যে মেয়েটা থাকে? ঐ যে মিথি নাকি টিথি নাম।  ও প্র্যাগনেন্ট নাকি? দেখতে তো লাগে প্রেগন্যান্ট! কিছু হবে নাকি ঐ মেয়ের?”

রিধি বিরক্ত হয় মনে মনে। বলল,

“ প্রেগন্যান্ট মনে হলে তো কিছু হবে অবশ্যই আন্টি। ”

“ আরেহ মজা করছি না। সত্যি বলো। কিছু হবে? পেটটা কেমন ফুলো ফুলো৷”

রিধি হতাশ স্বরে জানাল,

“ হ্যাঁ, আপু প্র্যাগনেন্ট।” 

ভদ্রমহিলা চমকে উঠলেন যেন। শুধালেন,

“ সে কি!” 

রিধি ভ্রু কুঁচকে জানাল,

“ কি? আপনার ধারণা সঠিক হলো। আপনার তো খুশি হওয়া উচিত। তা না করে এমন চ্যাৎ করে উঠলেন। ”

ভদ্রমহিলা সন্দেহি দৃষ্টিতে আবারও ফিসফিস স্বরে বলল,

“ বিয়েশাদী হয়েছে মেয়ের? ”

“ কেন হবে না? নাকে নাকফুল, হাতে চুড়ি দেখেন নি নাকি আপনি আন্টি? ”

“ তো বিয়ে হলে এভাবে পোয়াতি মেয়ে একা থাকে কেন পরিবার ছাড়া? তোমাদের সাথে এভাবে থাকে কেন? এই সময়ে কত কি সমস্যা হয়। ”

রিধি চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বলে,

“ হয়তো কোন কারণ আছে তাই থাকছে আন্টি। ”

” স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো তো? কই এতদিনেও তো কোনদিন স্বামীকে এসে দেখে যেতে দেখলাম। নিশ্চয় সংসারে কোন সমস্যা চলছে তাই না?”

রিধির বিরক্ত লাগে। তবুও জানাল,

“ আপনার কৌতুহল দেখে আমার হাসি পাচ্ছে আন্টি। আপুর এডমিশন টেস্ট না সামনে? ঐ কারণেই আপুর বান্ধবী মানে হিয়া আপু সহ একসাথে এখানে থাকছে। আর কিছুই না। আপনি একটু বেশিই বুঝেন। ”

ভদ্রমহিলা এবার বোধহয় কিঞ্চিৎ রাগ করলেন। জানালেন,

“ মোটেই বেশি বুঝছি না। আমার মন বলছে তোমরা কিছু লুকিয়ে যাচ্ছো।আধো মেয়ে বিবাহিত কিনা তাও সন্দেহ! ”

রিধি এবার সরাসরিই বিরক্তি দেখাল। উত্তর না করে ধপাধপ পা পেলে উঠে গেল। হতাশ হয়ে মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে এক কিনারায় বসতেই হিয়া তাকাল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“ কি হয়েছে? ”

রিধি বলল,

“ ঐ যে আন্টিটা । বিরক্তিকর!  মিথি আপুর সম্পর্কে তদন্ত করা শুরু করে দিয়েছে। ”

“ কেন?” 

“ মিথি আপু প্রগন্যান্ট তাই।” 

“ তো? ”

“ ওটা তো এতদিন বুঝে নি। এখন বুঝা যাচ্ছে। তাই মহিলার আজগুবি কথাবার্তা আরকি। বাদ দাও। ”

হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,

“ ওহ। মিথিকে বলিস না এসব। ও আবার ভাবতে শুরু করে দিবে। ”

“ আচ্ছা। ”

হিয়া কথা শেষ করে আবার নিজের জায়গায় গেল। ফোন হাতে নিতেই দেখা গেল দীপ্রর মিসড কল। এগারোটা কল। তাও প্রায় দশ মিনিট আগের। মোবাইল সাইলেন্ট থাকাতেই বোধহয় শুনে নি ও। হিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে ফোনে তুল নিয়ে কল ব্যাক করল। দীপ্র কল তুলতেই উত্তর করল,

“ দীপ্র? কল দিয়েছিলি? ”

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

“ কেন তোর ফোনে মিসড কলের নোটিফিকেশন দেখায় না হিয়া? ”

হিয়া ছোটশ্বাস ফেলল ত্যাড়া কথা শুনে। প্রশ্ন করল,

“ কেন কল দিয়েছিস? ”

“ এমনিই। ”

“ কোচিং এ তো নিয়মিত আসিসই না দীপ্র। পড়ালেখা কেমন চলছে তোর? ”

দীপ্র হতাশ স্বরে জানাল,

“ পড়ালেখায় মন দিল কিছুই বসছে না।তবে আমার খুব ইচ্ছে তোর সাথে একই ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার হিয়া। যদিও পরীক্ষার ডেইট কাছে এসেছে বলে পড়ার ইচ্ছে আরো মরে গিয়েছে। চল এডমিশন টেস্ট ফেস্ট না দিয়ে তুই আর আমি প্রাইভেট কোন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাই হিয়া। গুড আইডিয়া না?”

“ গুড। ভেরি গুড। কিন্তু তোর বাপের অনেক টাকা থাকলেও আমার বাপের নেই। সো ঐ প্ল্যান বাদ। আচ্ছা, তোর সেই পছন্দের মেয়ের মন জয় করতে পারলি? ওজন তো খুব কমালি। ঐদিন দেখলাম আগের থেকে বহু ওজন কমিয়েছিস। মুখচোখ শুকিয়ে গেল। ”

 দীপ্র শুধাল,

” হু কমিয়েছি তো। কত কষ্ট করেছি৷  সুন্দর দেখাচ্ছিল নাকি আমায়? ”

“ ওভাবে দিন রাত পড়ে থেকে না খেয়ে  ডায়েট মেইনটেন করলে আর দিনরাত এভাবে দৌড়াদৌড়ি আর জিমে গেলে আমারও  ওজন কমবে। আমাকেও সুন্দর দেখাবে। ”

দীপ্র সঙ্গে সঙ্গেই জানাল,

“  তুই ওজন কমালে ব্যাঙ এর মতো লাগবে। ”

“ আমি তোর মতো পাগল ও নই যে ছেলে পটানোর জন্য ওজন কমাবো দীপ্র। আই থিংক মেয়েরা এমনই ভালো। ”

“ হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক। তোকে এভাবে দেখেই অনেক ছেলে পটে যাচ্ছে হিয়া চিকন হলে তো আরো ছেলে পটে যাবে। তাই তোর ওজন কমানোর চিন্তাও নেই। ”

হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে। কথা বলতে বলতে আজগুবি টপিক উঠে এসেছে। তাই শুধাল,

“ এসব আজব টপিক বাদ দে। কল দিয়েছিস কেন? ”

“ তোর বাসার ওখান দিয়েই যাচ্ছিলাম। প্রায় পাঁচদিন হলো তোর সাথে দেখা হয়নাই। তাই ভাবলাম দেখা করি। কিন্তু তুই তো কলই তুললি না।”

“ সাইলেন্ট ছিল ফোন। ”

“ ওহ। দিপা আপু আসছে আজ দেশে। আম্মু বলেছিল তোকেও বলতে। আসবি? ”

হিয়া ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“ ইনভাইট করতে কেউ যদি এভাবে আসবি কিনা জিজ্ঞেস করে তো উত্তর কি দেওয়া যায়? ”

”না মানে তোকে তো এর আগেও বলেছিলাম। আসিস নি। ”

হিয়া উত্তর করল না এবারে। কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর বলল,

” আমার বাসা থেকে কতটুকু দূরে গেলি এই দশ মিনিটে? ”

“ বেশি না। তোদের রাস্তার মোড়ের রেস্টুরেন্টে।”

হিয়া মুহুর্তে প্রশ্ন ছুড়ল, 

” রেস্টুরেন্টে? তোর ওজন সতর্কতা?” 

“ তোর কল পেয়ে ওখানে বাইক থামিয়েছি। রেস্টুরেন্টে ডুকিনি। ”

হিয়া হেসে ফেলল। এই ছেলেটাকে সে পরিচয়ের শুরু থেকেই দেখছে ওজন নিয়ে লড়াই করতে। কিন্তু ইদানিং বেশিই করছে। দীপ্রকে তো ওর স্বাস্থ্য বেশি থাকায় অবস্থায়ও খারাপ লাগে নি। গালটা একদম সাদা ধবধবে হাসের ছানার ন্যায় ছিল। দীপ্রর গায়ের রং সাদা আর লম্বা হওয়াতে ওকে সাদা ভূতও বলে বেড়াত হিয়া। হিয়া শুধাল,

“ ভেরি গুড। আমার বাসার নিচে আয়। তারপর রেস্টুরেন্টে গিয়ে পেট ভরে খাব। টাকা কিন্তু তুই পে করবি দীপ্র। ”

দীপ্র মুহুর্তেই শুধাল,

“ ঠেকা পড়ছে আমার? তুই খাবি তুই পে করবি। আমি নাই। ”

“ ছিঃ! বোনের খাওয়ার বিলও পে করত পারবি না?”

“ কোন বোন? ”

হিয়া উত্তর করল সঙ্গে সঙ্গে, 

“ তোর দূর সম্পর্কের খালাতো বোন হই দীপ্র। বোনের মতোই তো। ”

দীপ্র প্রথমে চোখ ছোট ছোট করে চাইল। অতঃপর বলল,

“ শুনে খুবই খুশি হলাম। কিন্তু আমার পকেটে এই মুহুর্তে টাকার ট ও নেই যে আমি তোকে খাওয়াব রেস্টুরেন্টে নিয়ে।” 

“ কষ্ট পেলাম।” 

“ না করেছি কষ্ট পেতে?”

হিয়া মুখচোখ নিরাশ করে বলল,

“ ফোন রাখ বেয়াদব। ঘুম দিব আমি। ”

বিপরীতে দীপ্র শুধাল,

“ আমি আসলে তোর মুখে থাপ্পড় পড়বে হিয়া। বাসা থেকে নিচে আয়৷ আমি তোর বাসার নিচে আসছি। ”

.

মুহিবের হাতে একটা স্বস্তা সিগারেট। খুব যত্ন নিয়ে ও ঠোঁটে ছোঁয়ায়। অতঃপর নিকোটিনের ধোঁয়া আকাশে উড়িয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে,

“ ফুল, কেমন আছিস? জানি ভালো নেই৷ তবুও আমার সাহস নেই ফুল তোকে ভালো রাখার দায়িত্ব নেওয়ার। তোকে একবার দেখতে যাওয়ার ও সাহস নেই। যদি ভুলবাল অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হই? সেদিন তোর ভাবী যেমন প্রশ্ন করল। এই ভয়েই আমি গ্রামে যাচ্ছি না ফুল। আমি আসলে তোর অনুভূতির সত্যিই মূল্য দিইনি ফুল। সত্যিই তোকে ভালোবাসিনি। ভালোবাসলে মানুষ সর্বপ্রথম নিজের সম্মান নিয়ে ভাবতে পারে বল? যেদিন তোর ভাবী আমায় কল দিল, আমি সেদিনই টের পেলাম আমি তোকে ভালোবাসিনি ফুল। আমার যা কিছু আছে তা এক আকাশ পরিমাণ আপসোস। তোকে কেন তখন গুরুত্ব দিলাম না ফুল? এই আপসোস নিয়ে আমি আজীবন কাঁটাব কি করে? ”

রিধি পাশে এসে দাঁড়াল দুয়েক সেকেন্ড হলো। মুহিবের এমন আকাশে দিকে চেয়ে বিড়বিড় করা দেখে ও ভ্রু কুঁচকে নিল। এসেছিল রাগ ঝাড়তে মুহিবের উপর। অথচ এখন কৌতুহল জম্মাচ্ছে এই লোকের প্রতি। কি বিড়বিড় করছে এ? রিধি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

”প্রেমিকার শোকে পাগল টাগল হয়ে গিয়েছেন নাকি মুহিব ভাই? কি বিড়বিড় করছেন এমন? ”

মুহিব থেমে গেল। পাশ ফিরে চাইল রিধির দিকে। ভ্রু বাঁকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে মুখের সিগারেট ধোঁয়াটা আচমকা ছেড়ে দিল রিধির মুখের উপর। রিধি সঙ্গে সঙ্গেই নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে কেশে উঠল। অবশেষে কাশি থামিয়ে রিধি উত্তর করল, 

“ মুহিব ভাই? সমস্যা কি? আপনি সবসময় আমার উপর এমন তোড়জোড় করেন কেন? ধোঁয়া কেন ছাড়লেন হ্যাঁ? কেন? ”

মুহিব উত্তর করল,

“ সবসময় আমি সিগারেট মুখে তুললেই তোমাকে আমার পাশে পাই কেন? নিশ্চয় তোমারও সিগারেটের ধোঁয়া ভালো লাগে? ”

“ মোটেই না। ”

” তো দাঁড়িয়ে আছো কেন? নাকি আমাকে ভালো লাগে? ”

রিধি মুহুর্তেই নাক মুখ কুঁচকে উত্তর করল,

” ছিঃ! আমি এসেছি রাগ ঝাড়তে।”

“ তো রাগ ঝেড়ে বিদায় হও। ”

রিধি এসেছিল কত কথা শুনাবে। অথচ গুলিয়ে ফেলেছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ও দম ফেলে শুধাল রাগী কন্ঠে, 

” আমি পড়ালেখা না করলে আপনার সমস্যা কি? আমার আব্বুকে বলেছেন কেন আমি পরীক্ষায় গোল্লা পাই, পড়ালেখা করি না। আপনার সমস্যা কি হু?”

মুহিব ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়েই সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ল। বলল,

“ যেটা সত্যি ওটাই তো বললাম। সমস্যা কি? ”

“ এটা সত্যি না। ”

“ মিথ্যে?তুমি পড়ালেখা করো?”

“ আমি পড়ালেখা করি। শুধু একটা পরীক্ষাতেই গোল্লা পেয়েছি। বুঝেছেন?” 

মুহিব হেসে ফেলল। শুধাল,

“ গোল্লা ইজ গোল্লাই। একটা পরীক্ষা হোক আর দশটা পরীক্ষা। ”

“আমার আপনাকে অসহ্য লাগে। ”

মুহিব এবারেও হাসল। আশ্চর্যভাবে খেয়াল করল ও, এই মেয়েটার সাথে কথা বললে তার হাসি আসে। মন ভালো হয়। প্রফুল্ল লাগে এই মেয়ের বোকা বোকা কথা শুনলে। মন খারাপ হলর এবার থেকে এই মেয়ের সাথে কথা বলা যেতেই পারে! মুহিব শুধাল,

” তোমাকে আমার খুব সহ্যকর লাগে এমনও নয়। ”

” এই যে আপনি সারাদিন সিগারেট ফুকেন। জানে আপনার পরিবার? ”

“কেন? ”

রিধি নাক মুখ কুঁচকে বলল,

” আপনি আমার আব্বুকে আজেবাজে কথা বলেছেন। এখন আমিও আপনার আব্বু আম্মুকে আজেবাজে কথা বলব। ”

মুহিব ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“ কি বলবে? ”

“ এই যে আপনি কোন মেয়ের থেকে ছ্যাঁকা খেয়ে সিগারেট ফুকেন রোজ, এটাই। ”

মুহিব হাসল। বলল,

“ তুমি বোকা রিধি। এটা ছ্যাঁকা নয়। ”

“ তো কি? ”

মুহিব চুপ থাকল। অতঃপর কিছুটা সময় চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বলল,

“ আপসোস।”

“ না পাওয়ার আপসোস? ”

“ না, কাউকে সঠিক সময়ে মূল্য দিতে না পারার আপসোস। ”

“ তো এখন দেন মূল্য। ”

“ এটাও সম্ভব নয়। ”

রিধি ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ বিয়ে করে নিয়েছে নাকি আপনাকে ফেলে রেখে? ”

“ হ্যাঁ। ”

রিধি যেন পৈশাচিক আনন্দ পেল এবার। একদম ভালো হয়েছে। এই লোক কষ্ট পেয়ে সমুদ্রে ভেসে যাক।  পৈশাচিক আনন্দ নিয়েই বলল ও,

“একদম উচিত কাজ করেছে। ঐ মেয়েটাকে সামনে ফেলে আমি একশোটা ধন্যবাদ দিতাম গুণে গুণে। ”

. 

মুহুর সাথে  সেদিনের পর থেকে আদ্রর আচরণ বোধহয় বদলাতে শুরু করল। যাকে এতোটা ভালোবেসেছে, আদুরে পুতুলের ন্যায় যত্ন করেছে তার প্রতি আদ্রর আচরণ বদলে যাচ্ছে। আদ্র নিজের প্রতিই বিরক্ত হলো বোধহয়৷ মুহু সাতদিনের ট্যুরে গিয়েছে। কোম্পানি থেকে যাওয়া। অথচ সে একই ট্যুরে মিস্টার এহসানও গিয়েছে৷ সাত সাতটা দিন ট্যুর শেষে ফেরার পর মুহু এবার আদ্রর সাথে দেখা করে নি। আদ্র কল দিয়ে ডাকেও নি৷ তবুও আদ্র এসেছে মুহুকে দেখার জন্য। এতগুলো দিন দেখেনি বলে কথা।অতঃপর ঘন্টা দুয়েক মুহু আর আদ্রর সময়টা ভালোই কাঁটল। ফুরফুরে প্রেমিক প্রেমিকার ন্যায়। কিন্তু এর পরমুহুর্তেই মিস্টার এহসানের কল এল মুহুর ফোনে। আদ্র ভ্র কুঁচকে ফেলে৷ এত রাতে সে কেন কল করবে মুহুকে? আদ্র নিজেই শুধাল, 

“ মুহু? আবার সে মিস্টার এহসান? সোজাসুজি বলো, তুমি তার প্রতি ইন্টারেস্টেড? ”

মুহুকে বিরক্ত দেখাল এই প্রশ্নে। ফোনটা কেড়ে নিল ও। আদ্র আবারও বলল,

“ আর কতবার এই নিয়ে ঝামেলা করব আমরা? পছন্দ হচ্ছে না আমাকে আর? নাকি নতুন পুরুষ দেখে চোখে লেগেছে? কোনটা? ”

মুহু তখনই জানাল,

“ আদ্র ভুল বুঝছো তুমি আমায়। ”

“ আমি যা বুঝার বুঝতে পারছি মুহু। ছোট বাচ্চা নই আমি। তুমি বলো? পুষছে না আর আমাকে দিয়ে তাই তো? কি চাইছো শিউরলি বলো। ”

মুহুকে আদ্রকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েলি গলায় শুধাল,

“ আমি তোমাকে ভালোবাসি আদ্র৷” 

আদ্র তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল যেন। মুহুর চোখে চেয়ে বলল,

“ অথচ আমি স্পষ্ট দেখছি তুমি অন্য এক পুরুষকে চাইছো। ছিঃ!”

মুহুও শুধাল এবারে,

“ তুমি অন্য এক নারীকে বিয়ে করেছো। আমি মেনে নিয়েছিলাম তা তাই না? তাহলে আমার বিজন্যাস পার্টনার নিয়ে তোমার অসুবিধা হবে কেন? ”

আদ্রু ভ্রু কুুচকে বলল,

“ শর্ত কি রেখেছিলে? আমার বিয়ে করা বউকে আমি ছুঁতেও পারব না। যদি ছুঁই তুমি সম্পর্ক ভেঙ্গে দিবে। বলেছিলে কিনা?” 

মুহু তাচ্ছিল্য নিয়ে শুধাল,

” তোমার মতো পুরুষ বউকে ছুঁয়ে দেখেনি আদ্র? এটুকু বিশ্বাসযোগ্য? যে বিয়ের আগেই প্রেমিকাকে ছুঁতে পারে সে বিয়ের পর বউকে ছুঁয়ে দেখেনি? অধিকার থাকা স্বত্ত্বেও? ”

আদ্রর এদিকটায় নড়বড়ে হলেও ও দেখাল না৷ মুহুর গাল চেপে চোয়াল শক্ত করে শুধাল,

“ তোকর ছুঁয়েছি কারণ তুই-ই প্রথমে আমার কাছে আসতি বুঝলি? আমি প্রথমে তোর কাছে যাইনি। তুই অধিকার দিয়েছিস বলেই কাছে গিয়েছি। আর কারোর কাছে গিয়েছি? তুই আমার মতো পুরুষ বলতে কি বুঝালি?  কি বুঝালি বল? ” 

Loading spinner

Reply
Alakananda Aindri
Posts: 14
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 6 months ago
পর্ব:২০
 
 
 

তখন রাত বারোটা। মিথির পেটের চামড়ায় কিছুটা ব্যাথা। আজকাল খাবার হজম হতে সমস্যা হয়। রাতের বেলায় আরো বেশিই বোধহয় সমস্যাটা অনুভব হয়। কাজ থেকে ফেরার পথে ও সিঁড়ি বেয়ে উঠতেও কষ্ট লাগছিল। পায়ের মাংসপেশিও কেমন টান পড়ে আছে। গোড়ালিটা ব্যাথা করছে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। সামনেই পরীক্ষার ডেইট। হিয়াটা এত কষ্ট করছে ওর জন্য, এডমিশন টেস্টের আবেদন গুলো অব্দি ওকে নিয়ে গিয়ে জোর করে করে করিয়েছে। কোন টপিক না বুঝলে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। কোচিং এ কোয়েইশ্চেন গুলো হুবুহু মিথিকে এক্সাম দেওয়ার জন্য বাসায় এসে বানিয়ে দেয়। তারপর ও যদি মিথি ঝিমিয়ে থাকে কিভাবে হবে? মিথি এই দেড়- দুই মাস যথেষ্ট সময় দিয়েছে পড়ালেখার পেছনে। এখনো হিয়ার পাশে বসে প্রশ্ন সলভ করছে। মূলত এই দুয়েক মাস ও বই নিয়ে বসেছেও হিয়ার জন্য। হিয়া জোর করেছে বলেই নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস রেখে পড়ছে এখনো। মিথির আজকাল নিজেকে নিয়ে হতাশ লাগে না। মনে হয় না পৃৃথিবীতে সে খুব একটা বিপদে ফেঁসে গেছে। বরং মনে হয় যে কোন সমস্যায় অতিক্রম করা যায়। যে কোন কঠিন রাস্তায় পার হওয়া যায়। অতো অসাধ্য কিছুই না।তেমনই এই পরীক্ষার অধ্যায়টাও ও পার করে নিবে কোন মতে। কোন না কোন ভাবে ঠিকই কিছু একটা হয়ে যাবে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। হাতের কলম রেখে হিয়ার দিকে চাইতেই হিয়া উৎফুল্ল স্বরে শুধাল,

“ চা আনি মিথি?মাথা ঝিমঝিম করছে।তোর ও বোধহয় ঘুম পাচ্ছে।”

এটা ঠিক, মিথির চোখ ছোট ছোট হয়ে এসেছে। ঘুম আসার দরুন কিছুটা লালচেও হয়ে এল। তবে ম্যাথ সলভ করার কারণে তেমন ভাবে ঘুমকে পাত্তা দিচ্ছে না চোখ। মিথি উঠল। হিয়ার দিকে চেয়ে বলল,

“ আমি করে আনি? ”

হিয়া সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর করল,

“ একদমই না। তুই বেলকনি থেকে হেঁটে আয় বরং। আমিই করছি। ”

মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। টেবিল ল্যাম্পের মতো ল্যাম্পটা অফ করে বেলকনির দিকে গেল। রিধি বোধহয় বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। আর ফিজার উপস্থিতি টের পাওয়া গেল বেলকনিতে। ফিসফিস করা কথার স্বরে। মিথি পা ফেলতেই কানে এল ফিসফিস করা স্বর। মিথি তাকাল। বেলকনি দিয়ে রাস্তায় স্পষ্ট দেখা গেল আয়মানের প্রতিচ্ছবি ও। ও হাসল। ফিজা বোধহয় অপ্রস্তুত হয়ে কল রাখল। মিথিকে শুধাল,

“ তোদের দুইজনের পড়ালেখা শেষ নাকি? ”

মিথি হাসল। বলল,

“ হিয়া চা করতে গেল আপু। তোমার জন্যও বলি? ”

ফিজা ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“ এতরাতে চা? ”

“ ঘুম পাচ্ছিল। তোমার জন্য বলি? ”

“ আচ্ছা বল। ”

মিথি গেল। হিয়াকে চায়ের জল বসাতে দেখাতে বলল,

” ফিজা আপুও জেগে আছে। আপুর জন্যও দে হিয়া। ”

হিয়া তাকাল। আরো এক কাপ চায়ের জল বেশি দিল। অতঃপর বলল,

” রিধি বেয়াদবটা কি করছে? ঘুমোচ্ছে?”

” সাড়াশব্দ নেই। বোধহয় ঘুমোচ্ছেই। ”

“ রিধিটা আর ঘুমাবে কেন ? চড় মেরে তোল  ওরে। ”

মিথি হেসে ফেলল। পা বাড়িয়ে গেল রুমের আলো জ্বালাল। রিধিকে বাচ্চাদের মতো ঘুমোতে দেখে ও আবারও হেসে ফেলল। ঘুমোতে ঘুমোতে প্রায় বিছানা থেকে গড়িয়ে ফ্লোরে চলে এসেছে মেয়েটা। শুধাল,

“ বেচারি কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে। চড় মারবি কেন?”
 
হিয়ার চায়ের জল বসিয়ে দিয়ে নিজেও এল। রিধিকে নাদুস নুদুস বাচ্চার মতো আরামে ঘুমাতে দেখে বলল,

“ তো কি করব? আমরা সবাই জেগে আছি। ওর ঘুমানো অন্যায় না বল? ”

পেছন থেকে ফিজা বলল,

“ ডাকতে থাক,উঠে যাবে। ”

মিথি প্রথমে ডাকল। কাজ হলো না দেখে হিয়া সত্যিই সত্যিই আলতো হাতে চড় মারল গালে। অথচ এতেও উঠল না। মিথি সর্বশেষ উপায় হিসেবে রিধির লম্বার চুলের থেকে দু দুটো চুল টেনে ধরল। মুহুর্তেই রিধি কুঁকড়ে উঠার ন্যায় মাথায় হাত রাখল। মুখ কুঁচকে এল কেমন যেন। চোখজোড়া বহুকষ্টে মেলে ধরে সবাইকে এমন জাগ্রত আর রুমে আলো জ্বলতে দেখে ঘুমঘুম স্বরে শুধাল,

“ সকাল হয়ে গেছে মিথি আপু? ”

মিথি যেন সত্যি কথাই বলছে এমন একটা হাবভাব ধরে শুধাল,

“ অলরেডি দুপুর হয়ে গেছে রিধি। এতোটা সময় কি করে ঘুমালে? তোমার না এক্সাম? ”

বোকা রিধি মুহুর্তেই লাফ মেরে উঠে পড়ল। চোখ কচলে ঘুম সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,

“ কি বলছো? দুপুর হয়ে গেছে? আমি তো এলার্ম দিয়েছিলাম আপু।  ”

মিথি আবারও অবুঝ শিশুর মতো করে বলল,

“ কখন দিয়েছো? বাজে নি তো। সময় দেখো ফোনে। দুপুর বেরিয়ে বিকেল। ”

রিধি প্রায় কেঁদেই দিবে যেন। মোবাইল নিয়ে সময় দেখল ও। বারোটা সাতাশ এইটুকুই দেখল ও। অথচ পি.এম., এ.এম. খেয়ালই করল না। কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,

“ আমার পরীক্ষা আপু। কি করব এবার? ”

হিয়া পাশ থেকে এসে রিধির পাশে বসল। রিধির মাথায় সজোরে একটা চড় বসিয়ে বলল,

“ রিধি, তোরে কি এমনি এমনি বোকা বলি? সময় দেখ ভালো করে। ”

রিধি আবারও সময় দেখল। আবারও দেখল বারোটা আটাশ। হিয়া এবার কপাল কুঁচকেই বলল,

“ আরে গর্দভ, ভালোভাবে দেখ। ”

রিধি এতক্ষনে খেয়াল করল। অতঃপর মিথির দিকে চেয়ে কেমন ফুঁসে উঠল। শুধাল,

“ মিথি আপু! তুমি আমাকে বোকা বানালে। তোমারে আমি ভালো ভাবতাম। ”

মিথিও হেসে ফেলল। জবাব দিল,

“ সঙ্গদোষে লোহা ভাসে মিথি। তোমাদের সাথে মিশে মিশে হয়ে যাচ্ছি। আমার দোষ কি বলো? ”

.

মিথির আজকাল অনেক রকমই শারিরীক সমস্যার দেখা মিলছে। রাতে ঘুম হচ্ছে না খুব একটা।চোখের নিচে বিস্তর কালি জমেছে মেয়েটার। খাবার খেয়ে হজম হচ্ছে না, পেট জমে যাচ্ছে। অল্প খেলেও এই সমস্যাটা এখন নিয়মিত হচ্ছে৷  এমনকি পায়ের মাংসপেশিও টানটান হয়ে থাকে। এসব সমস্যার কারণেই হিয়া সহ ডক্টরের কাছে যাবে। কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে ও তাই। মিথি আর হিয়া নিচে নামার সময় ওদের সাথে ফিজাও নামল। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখা গেল ওপাশ আয়মানও এসেছে। ওদের সাথে হালকা কথোপকোতন সারতেই এবার হিমেলকেও দেখা গেল। একপাশে হাত পা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে। আয়মান কথা শেষ করে হিমেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হেসে বলল,

“ তুই আমার বেলায় অলওয়েজ লেইট করিস শা'লা।সময় দেখ। ”

হিমেল গম্ভীর কন্ঠে উত্তর করল,

“ ভালো করেছি। ”

আয়মান ফুঁসে উঠে। হিমেলের পিঠ বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে আবারও ফিজার দিকে গেল। কয়েকটা কথা বলল। হিয়া ওদের কথা বলাও দেখল আবারও হিমেলকেও ওভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। অতঃপর বিরস স্বরে শুধাল,

“ আয়মান ভাই? এই হিমেল নামের মানুষটা কেমন অদ্ভুত না? ”

উত্তর এল,

“ হান্ড্রেড পার্সেন্ট অদ্ভুত! ”

ঠিক তখনই হিমেল এসে আয়মানকে টেনে নিতে লাগল। রিক্সা পেয়ে গেছে। অন্যদিনের মতো ভদ্রতা দেখিয়ে আজ এদের কাউকেই রিক্সা অফার করেনি হিমেল। আয়মানকে টেনে ধরে বলল,

“ দেরি হয়ে যাচ্ছে। রিক্সা পেয়ে গেছি, চলে যাচ্ছি। তুই মেয়েদের মাঝখানে থাকতে চাইলে ছেড়ে যেতে পারি। ”

আয়মান খেঁকিয়ে উঠল। শুধাল,

“ ফিজাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে রিক্সা নিয়ে চলে যাব? এইজন্য মাত্রই হিয়া তোরে অদ্ভুত বলেছে। ”

হিমেল ভ্রু কুঁচকে নিল। ওকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল? তাও মেয়েদের মধ্যে। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আয়মান আবারও হিয়াকে ইঙ্গিত করে বলে উঠল,

“ এই হিয়া, অদ্ভুত না ও? বলেছো না তুমি? আমি কি মিথ্যে বলছি?আমিও সহমত। কোন প্রেমিককে দেখেছো প্রেমিকাকে রেখে চলে যেতে? ”

“ তাহলে তুই থাক। আমিই যাচ্ছি। ”

“ তোর বন্ধুর প্রিয়তমা। রিক্সাটা পেয়েছিস। এভাবে নিয়ে চলে যেতে বিবেকে বাঁধবে না তোর? ”

“ বাঁধছে না। সবাই তো আর তোর মতো না যে কোনকিছু অফার করলেই লুফে নিবে। যেচে কোনকিছু অফার করে অপমানিত বোধ করতে চাইছি না। ”

হিয়া মিনমিন চোখে দেখে যাচ্ছিল। ঠোঁট আওড়িয়ে বলল,

“ আসলেই অদ্ভুত। ”

মিথি সঙ্গে সঙ্গেই হিয়ার হাতে চড় বসাল। সতর্ক করল যে শুনে নিবে। আসলেই শুনলও হিমেল। হিয়ার দিকে চেয়ে শুধাল,

” ঠিক ধরেছেন মিস হিয়া। অদ্ভুতই। ”

মিথি হিমেলের দিকে তাকিয়ে ছিল। কথাটা শুনছিল। ঠিক তখনই হিমেল সরু চাহনিতে মিথিকে দেখল। অতঃপর চোখমুখের অবস্থা লক্ষ্য করে মিথির পাশে থাকা হিয়াকে জিজ্ঞেস করল,

“ মিস হিয়া, আপনার বান্ধবী খাওয়া দাওয়া করে না ঠিকমতো? উনার চোখমুখের এই ভয়াবহ পরিণতি কেন?”

মিথি হিমেলের দিকে চাইল। ওর নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে ও নিজেই উত্তর দিল,

“হিমেল ভাই, খাওয়া দাওয়া করি আমি ঠিকমতো। ”

হিমেল ভ্রু বাঁকাল। তিক্ত বিরক্ত স্বরে উত্তর করল,

“ তোকে জিজ্ঞেস করেছি? নাকি তোর সাথে কথা বলেছি? ”

মিথি নিরাশ হলো এমন কথায়। শুধু বলল,

“ আপনি অযথায় রাগ করছেন।অথচ আপনার সাথে আমার কোন ঝামেলা হয়নি হিমেল ভাই। ”

হিমেলের মুখ টানটান। গম্ভীর মুখে শুধাল,

“ তোর তো আমার নাম জানার কথা নয় মিথি। আমি তোর অপরিচিত। আমার জন্য ও তুই অপরিচিত। হিসেব কাটকাট। ”

মিথি এবার চুপসে যাওয়া মুখে তাকাল। বলল,

“ আপনিও তো আমার নাম বললেন মাত্র। ”

হিমেল ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,

“ নাম জানলে নাম বলব না? ”

“আপনার মুখে নাম শুনে মনে হচ্ছে না আমি আপনার অপরিচিত। ”

হিমেল সরাসরি নজর ফেলল।ছোটশ্বাস টেনে বলল,

“ ওকে, মিথিয়া মাহমুদ।আমি আপনাকে আজ থেকে জানি না।”

এটুকু বলেই ধপধাপ পা ফেলে হিমেল এগিয়ে গিয়ে রিক্সায় বসল।পিছু পিছু দৌড়ে গেল আয়মানও। ফিজার দিকে চেয়ে চোখেমুখে বুঝাল ও অসহায়। অন্যদিকে হিয়া চোখমুখ গোলগোল করে তাকিয়ে মিথিকে শুধাল,

“ কি হলো এটা? ”

মিথি ছোটশ্বাস টেনে উত্তর করে,

“ রিক্সা পাচ্ছিলাম না।  দাঁড়িয়ে ছিলাম। উনি রিক্সা অফার করেছিলেন কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাই নি তাই বোধহয়। ”

হিয়া কপাল কুঁচকে বলল,

“ তো কাজে লাগালে কি হতো? ছেলেটা ভালো। অন্তত অন্য নজরে তোকে নিশ্চয় রিক্সা অফার করেনি? পরিচিত বলেই করেছে।”

“ জানি। ”

“ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ছেলেটা তোকে অন্য নজরে দেখলে দেখতেও পারে।নয়তো এমন রাগ দেখাবে কেন? ”

“ পাগল। উনি সবসময়ই আমার সাথে এমন রাগ রাগ বিহেভিয়ারই দেখিয়ে এসেছেন। তবে উনি আমাকে ছোটবোনের মতোই দেখেছেন সবসময়।অন্য নজরে তাকায়নি। শুধু আমি কেন, গ্রামের কোন মেয়েকেই তেমন চাহনিতে দেখে নি উনি। ”

হিয়াও সহমত জানিয়ে শুধাল,

“ তোর মতো আমিও খেয়াল করেছি এই লোক কোন মেয়েকে তেমন বিরক্ত টিরক্ত করে না। তেমন নজরে তাকায় না। তাই বললাম ছেলেটা ভালোই। ”

মিথি এবার হেসে ফেলল। বলল,

“ বিয়ে করে আমার ভাবী হয়ে যা প্লিজ। ”

“ দূররর, বিষয়টা ততটুকুও নয়। আসলে উনার ব্যাক্তিত্ব সুন্দর তাই চোখে পড়েছে। ”

.

হিয়া আর মিথি হসপিটালে পৌঁছেছে একটু আগেই। তাদের সিরিয়াল ডাকতে দেরি আছে। বাইরেই বসে আছে দুইজন। ওদের থেকে দুই চেয়ার পরেই একজোড়ক দম্পতিকে দেখা গেল। মেয়েটা সম্ভবত সন্তানসম্ভাবা। আর মেয়েটার স্বামী এই কয়েক মিনিটেই মেয়েটাকে একবার জল এগিয়ে দিচ্ছে, একবার ফল এগিয়ে দিচ্ছে। কিছুটা সময় আগে কপালেও হাত রাখল। বোধহয় উত্তাপ পরখ করছে। হিয়া ওদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ যদি মিথির স্বামীটা এমন হতো তাহলে মিথিও এই যত্নটা পেত। মিথিও এই ভালোবাসাটা পেত। ওর জানামতে ওর বান্ধবী ছোট থেকেই সহজ সরল, ভালো মনের মেয়ে। তবে বিধাতা এমনটা কেন করল? মিথির ভাগ্যেই কেন এমনটা লিখল? হিয়া বারবার এই দম্পতিকে আড়াল করে মিথির দিক করে বসতে চাইল যাতে মিথি খেয়াল না করে। তা বুঝেই মিথি হেসে বলল,

“ আমি দেখেছি হিয়া। বিষয়টা আসলে সুন্দরই। ”

হিয়া অপ্রস্তুত হাসল। বলল,

“ নতুন মা বাবা হচ্ছে হয়তো দুইজনে।”

মিথিও হাসল। শুধাল,

“ আরেহ ভালোবাসা থাকলে নতুন বাবা মা হতে হয় না। বার কয়েক বাবা মা হলেও একই যত্নই থাকবে, একই ভালোবাসাই থাকবে। ”

.

মুহুর আজকাল আদ্রর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি কাজ করে কম, বরং বিরক্তিই বেশি কাজ করে। আদ্রর যে যত্নগুলো, ভালোবাসাগুলো ও আগে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকল সেগুলোকেই আজকাল ওর দমবন্ধ লাগে। অসহ্য লাগে আদ্রকে। তবুও আদ্রকে প্রকাশ করতে পারে না। মুহু ছোটশ্বাস ফেলে। ও নিজেই বিশ্বাস করত আদ্রর উপর থেকে ওর কখনো মন উঠবে না। আদ্রকে আস্ত একটা মুগ্ধতা মনে করত ও। আদ্রকে ফেলেই শান্তি শান্তি লাগল। আদুরে অনুভূতি মন ছুঁয়ে যেত। অথচ আজকাল অনুভূতির পরিবর্তন ঘটেছে। আদ্রর প্রতি ভালোবাসা বদলাচ্ছে। কোথাও একটা সমস্ত অনুভূতি ছিন্নভিন্ন হয়ে এসেছে আদ্রর প্রতি। বাকি যেটুকু মুহু দেখিয়ে যাচ্ছে, কিংবা দেখাচ্ছে তা কেবলই অভিনয়। আগের মতো সত্য নয়। মুহুর আজকাল মুগ্ধতা সব গিয়ে জমেছে মিস্টার এহসানের প্রতি। একটা চতুর, জ্ঞানী লোক এহসান। বয়সে তার চাইতে প্রায় ছয় বছরের বড়। অথচ কাজ কর্মে কতোটা পরিপক্ব, কতোটা চতুর এই লোক। আদ্রর মতো বদমেজাজী, শর্ট টেম্পার আর বোকা নয়। মুহু আজও মিস্টার এহসানের সাথে দেখা করেছে।আদ্রকে জানায়নি। মূলত কোন এক অদৃশ্য টানেই ও বারবার মিস্টার এহসানের সাথে দেখা করছে, মিস্টার এহসান যা বলছে তাই করছে। নিজের এহেন পরিণতি দেখে মুহুর নিজেরই মাঝেমাঝে কেমন লাগে। ও বোধহয় আসক্ত হয়ে যাচ্ছে ছেলেটার প্রতি। অসহ্য রকমের  ভালো  লাগা নিয়ে আজকাল মরেও যেতে ইচ্ছে করছে। যেমনটা আদ্রর বেলায় শুরুর দিকে মন চাইত। নতুন নতুন প্রেমে পড়ার অনুভূতি। মুহু যখন এহসানকে ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করছিল ঠিক তখনই আদ্র কল করল। মুহুর এত এত মুগ্ধতা, ভালো লাগা য় হঠাৎ আদ্রর কল পেয়ে ও কপাল কুঁচকাল। প্রথম দফায় কল না তুললেও দ্বিতীয় দফায় কল তুলল। হেসে শুধাল,

“ কি করছো আদ্র? ”

আদ্র শুনল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ দরজা খুলো। চাবি নেই সাথে। ”

“ এতরাতে কেন এসেছো? কাল সকালে আসলেই হতো। ”

আদ্র আবারও দাঁতে দাঁত চাপে। নিজেকে যথেষ্ট ঠান্ডা রাখার চেষ্টা চালিয়ে বলে,

“ কেন? আসাতে বিরক্ত লাগছে নাকি? আগে লাগত না যখন আমায় কল করে করে উম্মাদের মতো তোর বাসায় নিয়ে আসতি? চালাকি করবি না মুহু, বারবার বলছি আমার সাথে চালাকি করবি না। মে'রে ফেলব আমি। ”

মুহু ছোটশ্বাস ফেলল।আর একটা কথাও না বলে কল রেখে দিল। উঠে গিয়ে দরজা খুলল। অতঃপর আদ্রকে দেখে শুধাল,

“ বারবার এইসব তুইতোকারি আমি নিব না আদ্র। কি ভাবছো নিজেকে তুমি? কোথাকার কি হও তুমি? ”

আদ্র রুমে ডুকল। দরজা লাগিয়ে সোফায় দাঁতে দাঁত চেপে বসল ও৷ চোয়াল শক্ত করে কিছুটা সময় থম মেরে বসে থাকল।অতঃপর হুট করেই মুহুর ড্রয়িং রুমে রাখা কাঁচের টি টেবিলটা লাথি মেরে ভেঙ্গে ফেলল। রাগে চোখমুখ লাল করে শুধাল,

“ আবারও, আবারও ঐ মিস্টার  এহসান!  তুই গিয়েছিলি না ওই লোকের সাথে দেখা করতে? কেন গিয়েছিলি? বল কেন গিয়েছিলি? আমাকে ভালো লাগছে না আর তাই না? ঐ লোককে ভালো লাগছে তোর জা"নোয়ার? ”

আচমকা বিকট শব্দে মুহু যেমন ভয়ে কেঁপে উঠল ঠিক তেমনই আদ্রর ভয়ানক রূপ দেখেও কাঁপল। ও আদ্রকে শান্ত করার উপায় পায় না। চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে আছে। মুখ অবয়ব ভয়নক। মুহু পিঁছিয়ে যায়। কাঁপে স্বরে বলে,

“ আ্ আদ্র শান্ত হও। শান্ত হও আদ্র। আমি এক্সপ্লেইন করছি। ”

আদ্র হেসে উঠল। মুহু আরো দুয়েক পা পিছাতেই ও বলল,

“ ভয় পাচ্ছিস? এই ভয়টা আগে পাওয়া উচিত ছিল না? ছিল কিনা? আমাকে ভালোবেসেছিলি মুহু, আমাকে। সে আমি বিনা অন্য কেউ তোর মনে থাকলে সোজা মে'রে ফেলতেও হাত কাঁপবে না আমার। ”

মুহু কেঁদে ফেলবে যেন ভয়ে। ঘন ঘন শ্বাস টেনে ও আচমকা আদ্রকে শান্ত করার জন্য জড়িয়ে ধরল। ও জানে, আদ্র ওর জন্য পাগল। ও জানে, আদ্র ওকে ভালোবাসে। সুতারায় প্রিয়তমার জড়িয়ে ধরাতে নিশ্চয় আদ্র শান্ত হবে।  অথচ শান্ত হলো। মুহু এবারে ইমোশনাল হয়েই ঠোঁট ছোঁয়াল আদ্রর গলায়। শুধাল,

“ আদ্র, শান্ত হও। শান্ত হও আদ্র। ওটা বিজন্যাস এর খাতিরে। আর কিছুই না। তুমি অতিরিক্ত ভাবছো আদ্র। আমার সাথে মিস্টার এহসানের কিছু নেই। কিছুই না। আমি জানি, তুমি আমায় ভালোবাসো। আমিও তোমায় ভালোবাসি আদ্র। আমার মনে শুধু তুমিই আছো। ”

অথচ মুহু নিজেই জানে ওর মন থেকে আদ্র মুঁছে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর হয়তো আদ্রর লেশমাত্রও ওর মনে থাকবে না। ও এখন মিস্টার এহসানের প্রতি মুগ্ধ। মিস্টার এহসানের প্রতি দুর্বল। কিন্তু আদ্র? আদ্রর থেকে রেহাই পাবে কি করে ও? আদ্রকে ছেড়ে আসার জন্য ওকে নিশ্চয় পার্ফেক্ট প্ল্যান করতে হবে। ঠান্ডা মাথায়! 

Loading spinner

Reply
Page 3 / 3
Share:

Loading spinner