অমৃত প্রণয় গাঁথা —পর্ব-১(সূচনা) [কপি করা নিষিদ্ধ ]

লেখক: তাজিম আহমেদ

 


নির্জন দুপুরে রোয়াইল বাড়ি দুর্গের পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এক মাদ্রাসার ছাত্রী। ধুলোমাখা পথ, চারপাশে সুনসান নীরবতা—মানুষজন  খুব একটা নেই। তবে মেয়েটার খুব কাছেই ঘুরঘুর করছে কয়েকটা বখাটে ছেলে।


লেখকের ফেসবুক পেইজের লিঙ্ক


অন্যদিকে, দুর্গের কংক্রিটের ছাতার নিচে বসে একটা ছেলে একের পর এক সিগারেট ধরাচ্ছে। একটা শেষ হতেই আরেকটা। অগোছালো শার্টের কলার, ধুলোমাখা জুতা—সবকিছুই বলে দিচ্ছে, সে ভীষণ স্ট্রেসের মধ্যে আছে।

এদিকে মেয়েটা যখন ভয়ে ভয়ে পথ চলছে , তখন ছেলেগুলো ধীরে ধীরে তার আরও কাছে এসে পড়ল। নির্জনতা যেন পরিস্থিতিটাকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলল। একসময় ওরা একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়ে রোজকার মতোই বলতে শুরু করল—

“এই মাইয়া, এত ভাব লও ক্যান রে? কতদিন ধইরা তোরে কইতাছি—ভাই তোরে পছন্দ করছে। একটাবার চল, সমস্যা নাই। ভাই তোর বিষয়টা ভাইবা দেখবো কইছে। তোর লাভই হইবো, লস হইতো না।”

মেয়েটা কিছু বলার সাহস পেল না। কারণ ওরা যে আরফান দেওয়ানের লোক। দুর্গের পাশেই আরফান দেওয়ানের বিশাল বাড়ি। প্রতিদিনই একইভাবে ওরা তাকে বিরক্ত করে। আজও সে চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল।

ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল আরফান দেওয়ান নিজে। পান খাওয়া মুখ, বড় বড় গোঁফ,লুঙ্গির সাথে ঢিলে ফতোয়া, সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত বিরক্তি।

তাকে দেখে মেয়েটার মনে হলো, যেন তার আত্মাটা খাঁচা ছেড়ে পালাতে চাইছে।

আরফান কোনো কথা না বলে সরাসরি মেয়েটার হাত চেপে ধরে টানতে শুরু করল।

 আতঙ্কে মেয়েটা গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল—

“বাঁচাও! কেউ আমাকে এই নরপশুটার কাছ থেকে বাঁচাও!”

চিৎকারটা গিয়ে ধাক্কা খেল ছাতার নিচে বসে থাকা ছেলেটার কানে। সে শব্দের দিকে তাকাতেই তার মেজাজ মুহূর্তেই চরমে উঠে গেল। একদিকে নিজের ভেতরের চাপ, তার ওপর এই দৃশ্য—মাথায় রক্ত উঠে গেল তার। সে সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।

ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে সে এগিয়ে গেল সেই জায়গার দিকে, যেখানে ধস্তাধস্তি চলছে।

ওদের কাছে পৌঁছানোর আগেই আরফানের এক লোক বলে উঠল,

 “ভাই, দেখেন কে আইতাছে!”

আরফান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

সূর্যের বিপরীতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ইশতিয়াক মির্জা।

কুচকুচে কালো লিনেন শার্ট—উপরের বোতাম খোলা, হাতা কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করা। কবজিতে ডার্ক মেটাল ঘড়ি, চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস। পায়ে কালো চামড়ার শ্যু।

সে এসে ঠিক আরফানের সামনে দাঁড়াল।

সানগ্লাসটা একটু নামিয়ে চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,

“দেওয়ান সাব, কী করতাছেন এসব? নিজের বয়সটার দিকে একটু চাইয়া দেহেন। আপনি যদি সময়মতো বিয়া করতেন, আপনার এই মাইয়াটা থেইকা বড় মাইয়া থাকতো। আর আপনি কিনা এখন এইরকম একটা মাইয়াটার লগে নোংরামি করতাছেন?”

আরফান থতমত খেয়ে বলল—

“তু-তুমি? তুমি এখানে কী করতাছো?… আর আমি নোংরামি কই করলাম? আমি তো মাইয়াটার ভালো-মন্দ জিগাইতেছিলাম। তোমার কোথাও ভুল হইতাছে, মির্জা।”

এর মধ্যেই মেয়েটা সরে গিয়ে চলে গেল।

ইশতিয়াক ঠান্ডা গলায় বলল,

 “আমারে ভুল-সঠিক শিখাইতে আইসেন না, দেওয়ান সাব। আপনার চরিত্র আমি খুব ভালো কইরাই জানি।”

আরফান এবার রেগে গিয়ে বলল,

 “এবার একটু বেশি হইয়া যাইতাছে না, মির্জা? শান্তিতে আছো, শান্তিতে থাকো। কেন শুধু শুধু ঝামেলায় জড়াইতে চাও? সুখে থাকতে ভুতে কিলায় নাকি?”

ইশতিয়াক হেসে উঠল,

 “হা হা হা… আমারে থ্রেট করার চেষ্টা করতাছেন? কিসের ভয় দেখান? আপনার গলির পলিটিক্স এর? হাহ! আপনার মতো দুই টাকার পলিটিশিয়ান এই মির্জার একটা চুলও ছিঁড়তে পারবে না।”

আরফান গম্ভীর হয়ে বলল,

“বেশি উপর দিয়া উইড়ো না, মির্জা। মাটিতে পড়তে সময় লাগবে না।”

ইশতিয়াক এবার একেবারে কাছে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আপনার এই ডায়লগ কোনো দুধের শিশুরে গিয়া দিয়েন, দেওয়ান সাব। আর একটা কথা—এই রোয়াইল বাড়ি তে যেন আর কখনো মাইয়া নিয়া নোংরামি করতে না দেখি। না হলে আপনাকে এলাকাছাড়া করতে এই মির্জার এক মিনিটও লাগবে না। মনে থাকে যেন।”

এরপর সে হাঁটা ধরল।

ঠিক তখনই তার পকেটে রাখা নোকিয়া এন-৯৫ ফোনটা বেজে উঠল। স্লাইডারটা এক ঝটকায় ওপরে তুলে কানে ধরল ইশতিয়াক।

“ভাই, আইজকা রাইতে মেয়র সাব আপনার লগে বসতে চাইছে।”

ওপাশ থেকে রফিকের গলা।

ইশতিয়াক হাঁটতে হাটতেই বলল,

 “কেন? মেয়রের কি আরও মাল লাগবো নাকি? তিন মাস আগে না মাল নিল?”

রফিক বলল,

“জানি না ভাই… শুধু কইছে আজকেই বসতে হইবো।”

ইশতিয়াক একটু থেমে ধুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল,

 “ঠিক আছে।মেয়র রে সুরঙ্গ রুমে নিয়া আসিস।”

রফিক আবার বললো,

“ভাই, যদি না আসে?এই এলাকায়। উনি তো বলছিল কোন হোটেলে বসার জন্য। “

ইশতিয়াক বলল,

“না আসলে নাই। ফুলের বাগানরে কখনো মৌমাছির কাছে যাইতে দেখছিস? আমি যেটা বলছি, ওইটাই ফাইনাল।”

এটা বলে কল কেটে দিয়ে সে আবার হাঁটা শুরু করল। তার মাথায় তখনো ঘুরছে মেয়েটার আর্তচিৎকার আর আরফানের বিকৃত হাসি।

ঐদিকে ‘মির্জালয়’-এর বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে থামল একটা ঝকঝকে সাদা গাড়ি। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ইমরান মির্জা চিৎকার করে লোকজনকে ডাকলেন,

“কিরে, কে কোথায় আছিস? জলদি আয়! আজ দীর্ঘ কুড়ি বছর পর আমার কলিজার বন্ধু আসছে!”

বাড়ির কাজের লোকেরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। গাড়ি থেকে নামলেন তাহের খান। কুড়ি বছরের ব্যবধান দুই বন্ধুর চুলে পাক ধরালেও মনের টান একটুও কমেনি। নামতেই তারা একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

এরপর একে একে গাড়ি থেকে নামলেন তাহের খানের ছেলে, পুত্রবধূ এবং তাদের একমাত্র নাতনি—আয়রা খান।

লোকজন লাগেজপত্র নিয়ে গেস্ট রুমের দিকে চলে গেল।

কুশল বিনিময়ের পর ইমরান মির্জা নিজেই তাহের খানকে নিয়ে বাড়ির ভেতরটা দেখাতে শুরু করলেন।

সদর দরজা পেরোতেই বিশাল হলঘর। মেঝের শ্বেতপাথর এমনভাবে পালিশ করা যে আয়নার মতো মুখ দেখা যায়। দেওয়ালজুড়ে দামী কাঠের কারুকাজ। একটা থাম দেখিয়ে ইমরান বললেন,

“এইটা বার্মা টিক কাঠ, বন্ধু। সরাসরি ওপার থেইকা আনাইছিলাম।”

বামদিকে বিশাল ড্রয়িংরুম—মখমলের ভারী সোফা, এন্টিক ল্যাম্পশেড—সব মিলিয়ে রাজকীয় আবহ। তাহের খান মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছেন।

দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা পুরো সেগুন কাঠের। উঠতে উঠতে সেই মৃদু মড়মড় শব্দ হচ্ছে। ওপরে উঠে লম্বা বারান্দা—যেখান থেকে পুরো গ্রাম দেখা যায়।

প্রথম রুমটা দেখিয়ে ইমরান বললেন— “এইটা আমার নাতির রুম।”

পাশের তালাবদ্ধ দুইটা দরজার দিকে তাকিয়ে তার গলা হঠাৎ ভারী হয়ে এল,

 “ওখানে আমার ছেলে, ছেলের বউ আর নাতনি থাকতো…”

তাহের খান চুপ করে শুনলেন। তারপর ধীরে বললেন,

 “থাক বন্ধু, কষ্ট পাস না। এটাই নিয়ম। এই দুনিয়ায় আসার সিরিয়াল থাকলেও যাওয়ার কোনো সিরিয়াল নাই।”

ইমরান গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন,

“হুম… সেটাই।”

এরপর একে একে গেস্ট রুমগুলো দেখানো হলো। প্রতিটা রুমে আধুনিকতার সাথে ভিন্টেজের মিশেল। সবশেষে তারা পৌঁছালেন ডাইনিং হলের পাশের বিশাল বারান্দায়।

তাহের খান বিস্ময়ে বললেন,

 “বন্ধু, এটা তুই বাড়ি বানাইছিস, না রাজপ্রাসাদ?”

ইমরান মির্জা তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

গেস্টরা ফ্রেশ হয়ে আসার পর উঠোনে নাস্তার আয়োজন করা হলো। ধোঁয়া ওঠা চা, হরেক পদের খাবার—গল্পে মশগুল সবাই।

ঠিক তখনই গেট দিয়ে ঢুকল এক যুবক।

কালো জুতো, ঘামে ভেজা কালো শার্ট, চোখে কালো সানগ্লাস।

তাহের খান তাকিয়ে রইলেন— “বন্ধু, ওটা কে?”

ইমরান মির্জার বুক গর্বে ভরে উঠল,

 “এইটা আমার বংশের একমাত্র বাতি… আমার উত্তরাধিকার—আমার নাতি, ইশতিয়াক মির্জা।”

বিদেশে বড় হওয়া আয়রা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। কিন্তু ইশতিয়াককে দেখে তার চোখ থেমে গেল। এমন ভাবে তাকিয়ে রইলো যেন সে এমন কিছু দেখেছে যা এখানে দেখার কথা না।

ইমরান বিষয়টা লক্ষ্য করে হেসে উঠলেন,

 “দোস্ত তাহের, তোর নাতনি তো দেখছি আমার নাতিরে দেইখা পুরো শকড!”

তাহের খানও মুগ্ধ,

“শকড তো হবেই। যেমন তুই, তেমন তোর নাতি… বরং তার চেয়েও কয়েক কাঠি ওপরে।”

এদিকে ইশতিয়াক কারও দিকে তাকাল না। মেহমানদেরও না। সোজা দোতলায় নিজের রুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে সরাসরি ঢুকে গেল ওয়াশরুমে।

ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে থেকেও তার মাথা থেকে সরে গেল না সেই চিৎকার— “বাঁচাও… কেউ আমাকে বাঁচাও…”

পানি শরীরের ক্লান্তি মুছে দিলেও মনের আগুন নেভাতে পারল না।

কিছুক্ষণ পর সে বেরিয়ে এল।

কালো পাঞ্জাবি, কালো গ্যাবার্ডিন প্যান্ট, পায়ে কালো চামড়ার জুতো। বুকের কাছে একটা বোতাম খোলা। সানগ্লাসটা ঝুলছে বুকে। চুল অগোছালো, কিছু গোছা কপালে নেমে এসেছে।

সে দ্রুত গেটের দিকে হাঁটা ধরল।

ঠিক তখনই ইমরান মির্জা ডাকলেন— “মতিউর! ওরে ডাক দে । তারপর ইশতিয়াক কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

কিরে, মেহমানদের দেখলি না?”

মতিউর—বাড়ির পুরনো বিশ্বস্ত মানুষ। ছোটবেলা থেকে ইশতিয়াক তার কাছেই মানুষ হয়েছে। সে দ্রুত এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখল—

“বাবা ইশতিয়াক… একটু শোনো। তোমার দাদার বন্ধু বিশ বছর পর আইলো। একটাবার দেখা কইরা আসো।”

ইশতিয়াক তাকাল। তার সেই শান্ত অথচ ভয়ংকর চোখ দেখে মতিউরের বুক কেঁপে উঠল।

নিচু গলায় ইশতিয়াক বলল,

 “চাচা, আপনি তো সব জানেন… তারপরও এই কথা কইতেছেন?”

মতিউর তার হাতটা শক্ত করে ধরল,

 “আমি সব জানি বাবা। কিন্তু মেহমানরা তো জানে না। এইটা শুধু তোমার দাদার সম্মান না—এইটা তোমার বংশের আদব।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে,তারপর ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সানগ্লাসটা চোখে না পরে হাতে নিল।

সে রাজি হলো।

ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই পরিবেশ বদলে গেল। মুখে তার কৃত্রিম হাসি—এই অভিনয়টা সে ভালোই পারে।

তাহের খানের সামনে গিয়ে বলল,

 “সালামু আলাইকুম, দাদা। ২০ বছর পর আপনি আসলেন—খুব ভালো লাগলো। আমি ইশতিয়াক, ইমরান মির্জার নাতি।”

তাহের খান উঠে দাঁড়ালেন— “ওয়ালাইকুম সালাম! বন্ধু ইমরান, তোর নাতি তো একদম…. ! অনেক ওয়ার্ক আউট করে নিশ্চয়ই। “

ইমরান মির্জা শুধু হাসলেন।

তাহির খান আবার বললেন—

“এই যে, আমার নাতনি আয়রা—তোমার সমবয়সী ।”

আয়রা আড়চোখে তাকিয়ে ছিল। এখন সে সরাসরি তাকাল।

ইশতিয়াক হালকা হাসল,

 “ওয়েলকাম টু কেন্দুয়া,মিস.আয়রা।”

আয়রা ভেতরে ভেতরে অবাক— একটু আগের আর এখনকার ছেলেটার মধ্যে সে যথেষ্ট পার্থক্য করতে পারছে।

এক কোণে বসে ইমরান মির্জা তৃপ্তির হাসি হাসছেন।

কুশল বিনিময় শেষ হতেই ইশতিয়াক মতিউরের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল… তারপর আবার বেরিয়ে গেল

এদিকে,

বিকেলের রোদেলা আভা তখনো রাস্তার কালভার্টটার ওপর আলতো করে লেগে আছে। আশিক আর ইবনান ব্রিজের সিমেন্টের রেলিংয়ে বসে পা দোলাতে দোলাতে সিগারেট টানছিল, আর রাজ্যের গল্প করছিল।

ঠিক তখনই সামনে দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে গেলো।

পুরো শরীর ঢাকা কুচকুচে কালো বোরকায়, চোখেমুখে কালো নেকাব। কাঁধে একটা ব্যাগ ঝোলানো। হাঁটার ভঙ্গিতে একধরনের মার্জিত ভাব ফুটে উঠছে।

মেয়েটা ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলে আশিক কনুই দিয়ে ইবনানকে গুঁতো দিল…….

চলবে….(ইনশাআল্লাহ)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x