Golpo: Augustina(01)

বাসর রাতে রেইন জানতে পারে তার স্বামী একজন বিদেশী।ফ্রান্সের একজন পাইলট সে। আর পাঁচটা বাসর ঘরের মতো তাদের বাসর ঘর ফুল দিয়ে সাজানো না। বরং এটা একটা সাধারণ পাহাড়ি কুঁড়েঘর। যেখানে নেই কোন আধুনিকতার ছোঁয়া। একটা কাঠের চৌকির উপর শুয়ে আছে তার নামমাত্র বিদেশী স্বামী। মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে যার নামে কবুল পড়েছে সে। রেইন ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলো লোকটার শরীর অত্যাধিক ফর্সা। ধারালো চোয়াল আর চওড়া চিবুক যেন এর সৈন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে। থুতনিতে ঢেউ খেলানো টোল-টাই পুরো আকর্ষণ কেড়ে নিচ্ছে নিমিষেই। মাথায় চুলগুলো গাড় লাল আর কালোর রঙের মিশলে । রেইন ভাবে রং করেছে বোধহয়। গলার অ্যাডামস আ্যপেলটা দেখা যাচ্ছে। চওড়া পেটানো বলিষ্ঠ শরীর তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর।

রেইন নজর সরিয়ে দেয়াল ঘেঁষে নিচে বসে। বাংলাদেশের একজন নামকরা অভিনেত্রী ও মডেল সে। মুভির কিছু সিন সুট করার জন্য তারা চট্টগ্রামের এই পাহাড়ি এলাকায় এসেছিল। সুট করা শেষে সবাই হোটেলে ফিরে গেলেও হঠাৎ করে রেইন তার টিম থেকে আলাদা হয়ে হারিয়ে যায়। শুটিংয়ের জন্য তার পোষাক ছিল কিছুটা ছেঁড়াফাটা, আর মুখে ছিল কৃত্রিমভাবে তৈরি করা কিছু আচরের দাগ। আর তার মুখটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে কেউ তাকে চিনতে পারবে না। রেইনের সাজসজ্জা দেখলেই মানুষের মনে বিরুপ মন্তব্য তৈরি হবে এতে সন্দেহ নেই।
রেইন পুরোটা বিকেল জঙ্গল থেকে বেরুনোর রাস্তা খুঁজেছে। এভাবেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। গভীর অরণ্যে রেইন একা ভয়ে ভয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ কারো গোঙানির আওয়াজ পেতেই কৌতূহল বশত একটু এগিয়ে যায়। ঝোপের আড়াল থেকে আর্তনাদ ভেসে আসছে। রেইন কৌতুহল আর ভয় নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায় লম্বা চওড়া গড়নের একটা ছেলে। শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে র*ক্ত’পাত হচ্ছে। ছেলেটার পুরো শরীর র*ক্তে ভেসে যাচ্ছে। তার নজর হঠাৎ ছেলেটার বুকে যেতেই থমকে যায়। গুলি করা হয়েছে ছেলেটার বুকে। দু দুটো গুলির ছিদ্র দিয়ে সমানে র*ক্তপাত হচ্ছে। চোখমুখের বিভিন্ন জায়গা, হাতে, পায়ে আঘাতের চিহ্ন। র*ক্তে’র জন্য ফেস বোঝা যাচ্ছে না।

— হে.ল্প মি প্লিই-জ

ছেলেটা অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে বলে। রেইন হকচকিয়ে গিয়ে আশেপাশে তাকায়। ভয়ে ভয়ে বলে,
— আপনি কি আমাকে শুনতে পারছেন। কি হয়েছে আপনার? কথা বলুন।

ছেলেটার নড়াচড়া ততক্ষণে অনেকাংশে কমে এসেছে। বেগুনি চোখের মণির চোখজোড়া তখন আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ বন্ধ করে যাচ্ছে । ডার্ক রেড আর কালোর সংমিশ্রণের চুলগুলো একটু অদ্ভুত দেখাচ্ছে।

— আপনি কি আমাকে শুনতে পারছেন মিস্টার।

— হেল্প..
নিম্ন স্বরে বিরবির করে বলে।

রেইন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত আর সংকোচ নিয়েই নিজের ওড়না ছেড়ে ক্ষ’তস্থান বেধে দেয়। চারদিকে তখন নিষক কালো অন্ধকার। সাহায্যের জন্য আশেপাশে দৌড়াদৌড়ি করেও লাভ হলো না। রেইন জঙ্গল থেকে দুর্বা ঘাস তুলে এনে ক্ষত স্থান থেকে র*ক্তপাত বন্ধ করানোর চেষ্টা করে। রেইন যখন মনুষ্যত্বের পরিচয় দিচ্ছিল লোকটাকে সাহায্য করে ঠিকে তখনই কিছু পাহাড়ি লোক এদিক দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের এই অবস্থায় দেখে ভুল বুঝে তাদের ধরে নিয়ে যায়। আর তারপর তাদের দুজনের বিয়ে দিয়ে দেয় জোর করে। রেইন বিয়ে না করতে চাইলে তাদের দুজনকে মে’রে ফেলার জন্য কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালাতেই রেইন বিয়ের জন্য রাজি হয়।

রেইন ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসে। মুখে তার ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ। এইতো কিছুক্ষণ আগেই লোকটা পুরোপুরি জ্ঞান হারানোর আগে সে জেনেছিল লোকটা ফ্রান্সের একজন পাইলট। নামটা মনের করার চেষ্টা করে মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে।
— লি.. লিব্র আর্থার
হ্যাঁ হ্যাঁ লিব্র আর্থারই নামটা। চট করে মস্তিষ্কে প্রশ্ন খেলে — লোকটা কি আদৌ মুসলিম? আচ্ছা যদি সে বিবাহিত হয় তখন?

রেইন চট করে লোকটার দিকে ফিরে তাকায়। পরক্ষণেই ভাবে যা হওয়ার হোক। সে এই বিয়ে মানে না। তাছাড়া এটা জানাজানি হলে তার ক্যারিয়ার শেষ। এমনিতেই কতো শত্রু তার পিছনে পরে আছে। চিন্তায় মাথাটা চেপে ধরে। এদিকে কারো সাথে যোগাযোগও করতে পারছে না। অস্থির হয়ে নড়াচড়া করতে থাকে।

***
২.
কারো চিৎকারে চেঁচামেচিতে রেইন মেঝে থেকে ধরফড়িয়ে উঠে। সামনে তাকাতেই বিস্ময়ে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। লিব্র পুরো ঘর এলোমেলো করে ফেলেছে। নিচে বসে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে চিৎকার করছে সে। রেইন ভয়ে এগুতে নিলেই লিব্র চিৎকার করে উঠে।
কালকে রাতে পাহাড়িরাই লিব্রর চিকিৎসা করেছিল। সম্পূর্ণ কাজ না হলেও অনেকটাই হয়েছে।
— শান্ত হোন। আমি কিছু করবো না।

রেইনের শান্ত কন্ঠে লিব্র ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
— আ-আমি কে?তুমি কে??

লিব্রর মুখে হঠাৎ এই কথা শুনে রেইন চমকে উঠে। সিউর হতে আবার জিজ্ঞেস করে,
— আপনার কি কিছু মনে নেই?

— মন কি? এটা দিয়ে কি করে? তুমি কে?

লিব্রর বাচ্চাসুলভ কথায় রেইন চমকে উঠে। লিব্রর কথাগুলো এমন, মনে হচ্ছে সে কোন চার বছরের বাচ্চা। রেইন চোখ বড়বড় করে লিব্রর ফুলিয়ে রাখা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে। বাম হাতের নখ কামড়াচ্ছে মনযোগ দিয়ে লিব্র। রেইনের মনে এই মুহূর্তে যা আসছে, সে চাইছে এটা না হোক।
— এই বিপদ আবার স্মৃতি টৃতি হারায় নি তো।
চমকে উঠে ডান হাতে কপাল চাপড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে। “সর্বনাশ করছে”

— আমি কে? এটা কোথায়?

— তু-তুমি তু-মি….
লিব্রর প্রশ্নে রেইন ঘামতে থাকে। কি বলবে এই মুহূর্তে। সেও তো তার সম্পর্কে জানে না। শুধু একেবারে অজ্ঞান হওয়ার আগে শুধু বলেছিল সে ফ্রান্সের। নামটাও বলেছিল অনেক পরে। আর পুরোপুরি অজ্ঞান হওয়ার আগে শুধু বিরবির করে বলেছিল সে ‘পাইল..’ কথাটাও সম্পূর্ণ করতে পারে নি তার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিল। তবে কথাটা রেইন বুঝেছিল।

— বলো না তুমি কে? আমি কে?

— তোমার নাম লিব্র।

— লিব্র! এটা কেমন নাম?
লিব্র ঠোঁট ফুলিয়ে রাখে। বেগুনি চোখজোড়াতে অসন্তুষ্টির ছাপ। বারগেন্ডি রঙের চুলগুলো কপালের উপর উপচে পরেছে সদ্য ঘুম থেকে উঠার ফলে। ক্লিন সেইভের ধারালো চোয়ালে গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁটজোড়া গোল করে ফুলিয়ে রেখেছে। রেইনের মনে আকস্মিক মায়া কাজ করছে ছেলেটার জন্য। কিন্তু সেও নিরুপায়।

লিব্র চৌকির উপর গোল হয়ে বসে বাম হাতের নখ খুঁটছে। মুখে তার গভীর চিন্তার ছাপ। কপালে ভ্রু দ্বয়ের মাঝে তিনটে ভাঁজ সৃষ্টি করে প্রশ্ন করে –
— তোমার নাম কি? তুমি কে গো?

এমন মিষ্টি স্বরের প্রশ্ন শুনে রেইনের ভিতরটা নাড়া দিয়ে ওঠে।
— আ-মি রেইন। ঝিনুক জাহান রেইন।

— রেইনবোর মতো বুঝি?

— তুমি জানো রেইনবো কি??

লিব্র মাথা দু’পাশে ঘন ঘন নাড়িয়ে না বোধক সম্মতি দেয়।
— রেইনবো কি?

রেইন উত্তর দেয় না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বের হতে নিলেই ওড়নায় টান খেয়ে পিছনে ফিরে। লিব্র ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
— তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমাকে ছেড়ে যেও না, আমাকে ছেড়ে যেও না। রেইনবো আমাকে ছেড়ে যেও না। ও-ওরা আমাকে মারবে।
ভয়ে লিব্র কুকিয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকাতে থাকে চোখে পানি নিয়ে।

— আমি কোথাও যাচ্ছি না। এখন ছাড়ো আমাকে।
রেইন জোর করে ছাড়াতে গেলেই লিব্র ভয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। রেইনের চলন্ত হাতজোড়া থেমে যায়। শরীরটা ঝাকুনি দিয়ে উঠে। নড়াচড়া থেমে গেছে তার। লিব্র হাতের বন্ধন দৃঢ় হতেই রেইনের হুশ ফিরে।
— কি হচ্ছে কি ! ছাড়ো আমাকে। ”
রেইন ধমকের সুরে বলে। লিব্র টলমলে চোখে তাকে ছেড়ে দিয়ে দেওয়ালের সাথে ঘেঁষে নিচে বসে পরে। শরীরটা তীব্রভাবে কাঁপছে ভয়ে।
রেইনের মধ্যে অপরাধবোধে উঁকি দিলেও তা প্রকাশ করে না নিজের অবস্থার কথা ভেবে। এই লোকের কারণেই তার সবকিছু ধ্বংসের পথে। তার ২১ বছরের সাজানো স্বপ্ন শেষ এই লোকটার কারণে। তিরিক্ষি মেজাজে বাইরের পথে পা বাড়ালো ‌রেইন ।

— রেইনবো , রেইনবো , আমার না অনেক খিদে পেয়েছে। ” দুহাত দুদিকে প্রসারিত করে দেখায় কতটুকু খিদে পেয়েছে।

রেইনের নিয়ন্ত্রণ করা মেজাজের বাঁধ ভেঙে যায় মুহূর্তেই। রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠে,
— তো আমি কি করবো? আমার লাইফটা শেষ করে খিদে মেটেনি। এখন আবার খিদে পেয়েছে। খা খা এখন আমাকে গিলে খা তাহলে যদি খিদে মেটে। “

রেইনের এমন চিৎকার করে ক্ষেপে বলা কথায় লিব্র আরো গুটিয়ে যায়। চোখমুখ খিচে বন্ধ করে দুহাতে কান চেপে ধরে। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট ভাষায় বিরবির করে মাথা ঝাকাতে থাকে। বেগুনি চোখের মণিতে ভয়ের আভাস। হাত দিয়ে শরীরে আঘাত করতে থাকে।
রেইন একপ্রকার না দেখার ভান করেই চলে যায় বাইরে। রাতের পাহাড়ি লোকগুলো তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও চিৎকার চেঁচামেচি করে একপ্রকার পালিয়ে এসেছে সেখানে থেকে।

৩.

ভোরের স্নিগ্ধ সকাল। পাহাড়িরা চায়ের পাতা তুলছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ছে। রাখালরা গরু – ছাগল দূরে মাঠে নিয়ে যাচ্ছে। পুব আকাশের সূর্যটা কমলা রঙের দীপ্তি ছড়াচ্ছে। সূর্যটাকে ডিমের কুসুমের মতো লাগছে। তার সামনে দিয়ে ভোরের পাখি উড়ছে। ঠিক যেন জলরং দিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা কোন চিত্রকর্ম। কোন কোন চায়ের দোকানের সাটার উঠাচ্ছে দোকানী। আবার কিছু কিছু দোকানে চায়ের আড্ডাও বসেছে। কিছু কিছু মানুষ এতো সকালেই সূর্যোদয় দেখতে পাহাড়ে হাঁটছে।

রেইন একটা টংয়ের দোকান থেকে মোবাইল নিয়ে তাতে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট এর নাম্বার তুলে ডায়াল করে। সে একাই হম্বিতম্বি করে ওখানে থেকে মুখ ঢেকে চলে এসেছে লিব্রকে না নিয়েই। প্রায় অনেকটুকু হাঁটার পরেই একটা চায়ের দোকান পেতেই অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুজিয়ে মোবাইল নিতে পেরেছে। অনুরুপ সাথে সাথেই কল লাগায় নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টকে । একবার দুইবার তিনবার কল করার পর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট কল ধরে।

রেইন হাই হ্যালো কিছু না বলেই বলে,
— আমি ঝিনুক, সাহিল।

সাহিল ছেলেটা ম্যামের কন্ঠস্বর পেতেই হড়বড়িয়ে বলে,
— ম্যাম আপনি কোথায়? ওদিকে কত বড় কান্ড হয়েছে জানেন? আপনাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি যেখানেই থাকেন না কেন তাড়াতাড়ি ক্যাম্পে আসুন। সবাই আপনার জন্য চিন্তা করছে। আপনি আসলেই ফিরে যাবে।”

— দুইদিন পর না যাওয়ার কথা ছিল?

— ম্যাম একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে। আপনার যে ব্রেন টিউমার হয়েছে সেটা কে জানি পাবলিশ করে দিছে। এটা নিয়েই এখন ঝামেলা চলছে। ডিরেক্টর আপনার উপর মারাত্মক রেগে আছে। আপনি জলদি আসুন।”

[ এটা উপন্যাস সম্পর্কিত। ভালো রেসপন্স হলে কন্টিনিউড হবে নয়তো এখানেই স্টপ ]

চলবে……….

 

লেখিকা: নুসরাত জাহান তীব্রতা

সূচনা পর্ব

Happy Reading…. 🩷🤍

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x