গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (০৬)

পর্ব:০৬

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ⛔]

ঐক্য ভ্রু কুঁচকে আবৃতির আপাদমস্তক দেখলো। যার কোলে কিনা তার আম্মাজান চড়ে বসে আছে। বোঝার চেষ্টা করলো পরিস্থিতি। আবৃতি অবাক চোখে বোঝার চেষ্টা করছে লোকটা কে? ঐক্য আবৃতিকে উদ্দেশ্য করে বললো,

— এক্সকিউজ মি? আপনি কে?

আবৃতি সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজেই প্রশ্ন করে,

— আপনি কে জানতে পারি?

প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করা পছন্দ হলোনা ঐক্যর৷ তবুও অপরিচিত নারীটির প্রশ্নের জবাব দেওয়া সমীচীন মনে করে বললো,

— আ’ম ঐক্য চৌধুরী। ওয়াফার ফাদার।

আবৃতি কপাল মসৃণ হলো। ইনি তাহলে তার কোলে থাকা অত্যন্ত আদুরে ধাচের এই বাচ্চাটার পিতা। আবৃতি ভদ্র সুলভ হেসে বললো,

— আসলে বাচ্চাটা এখানে মন খারাপ করে বসে ছিল। তাই আমি এগিয়ে এসে কোলে নিয়েছি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।

— নো ইট’স ওকে। ওয়াফা আম্মাজান আসো পাপার কোলে ।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওয়াফা ওদিকে ফিরে গেল। দুইহাতে শক্ত করে আবৃতির গলা জড়িয়ে ধরে চুপটি করে তার কাঁধে পড়ে রইলো। আবৃতি অবাক চোখে ঐক্যর দিকে তাকালো। ঐক্য বুঝলো তার আম্মাজান তার উপর ক্ষেপেছে। ঐক্য ব্যস্ত কন্ঠে বলে,

— কি হলো ওয়াফা? আসো পাপার কাছে?

ওয়াফার কোনরুপ নড়চড় নেই। আবৃতি অবাক নয়নে একবার বাচ্চাকে দেখছে আরেকবার বাচ্চার বাবাকে। বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে। এদের আসলে হয়েছেটা কি?
ঐক্য আবৃতির এমন দৃষ্টি দেখে বিব্রত হলো। এগিয়ে এসে ওয়াফাকে টেনে আবৃতির কোল থেকে টেনে নিতে চাইলো। ওয়াফা দুই পায়ে আবৃতির কোমর চেপে ধরলো। ঐক্য অসহায় চোখে আবৃতির দিকে চাইলো। আবৃতির ভীষণ হাসি পেল অচেনা এই লোকটির নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে। এদিকে আহানের হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট আরশান ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড ঈর্ষায় ফুঁসতে লাগলো তার মাম্মামের কোলে ওয়াফাকে দেখে। বেচারা অনেকক্ষণ সহ্য করেছে কিন্তু এই মেয়েটা তো তার মাম্মামের কোল থেকে নামছেই না।
হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে আরশান দুই ঠোঁট চেপে ধরে দৌড়ে গিয়ে ওয়াফার উঁচু করে বাধা ঝুঁটিটা ধরে টান মারলো। ওয়াফা ফাল মেরে উঠে পিছনে তাকায়।
আরশান চোখ পাকিয়ে শাসিয়ে বলে,

— এই মেয়ে আমার মাম্মার কোল থেকে নামো। নামো বলছি!

ওয়াফা কিছুক্ষন ফ্যালফ্যাল করে আরশানের রাগে লাল টমেটোর মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ হল কাপিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দেয়। এদিকে কি থেকে কি হয়ে গেল আবৃতি আর ঐক্য অবাক হওয়ার সুযোগটিও পেলোনা৷ কি কান্ড! আবৃতি ভড়কে গেল নিজের শান্তশিষ্ট বাচ্চাটার এরুপ অশান্ত রূপ দেখে। এদিকে কোনদিন শরীরে ফুলের টোকা না পাওয়া ঐক্য চৌধুরীর আলালের দুলালি ওয়াফা মৃদু ব্যথা পাওয়ায় গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। ঐক্য পাগলের মতো করা শুরু করলো মেয়ের কান্নায়। ওয়াফাকে আবৃতির কোল থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে গালে এলোপাতাড়ি কতগুলো চুমু খেল। বুঝ হওয়ার পর থেকে ওয়াফা এভাবে কোনদিন কাঁদেনি, বলতে গেলে ঐক্য কোনদিন সেই সুযোগটিই দেয়নি। ঐক্যর একমুহূর্তের জন্য মনে পড়ে গেল সেই সময়টা যখন তার দুধের বাচ্চাটা তারস্বরে চেঁচিয়ে কাঁদতো মায়ের বুকের একফোঁটা দুধের জন্য । আবৃতি অসহায় চোখে ঐক্যর দিকে তাকালো। লোকটা গ্রাউন্ডের এপাশ-ওপাশ হেঁটে হেঁটে ওয়াফার কান্না দমানোর প্রচেষ্টায়। কিন্তু ননস্টপ সেই কান্না থামার নামই নেই। আবৃতি রেগেমেগে আরশানকে কষে এক ধমক দিল। মাম্মামের এত জোরে ধমক খেয়ে আরশান কেঁপে ওঠে। আবৃতির দিকে ছলছল অভিমানী চোখে তাকিয়ে আরশান ও ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দিল। দুজন বাচ্চার এহেন কান্নার আওয়াজে গ্রাউন্ড রুমে একপ্রকার শোরগোল লেগে গেল। আহান ঘোর থেকে বের হয়ে তড়িঘড়ি করে ভাগ্নেকে কোলে তুলে নিল। আবৃতি এখনো রাগান্বিত চোখে আরশানের দিকে তাকিয়ে আছে। আহান ফিসফিসে আওয়াজে বললো,

— আবৃতি আমি ওকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। তুই প্লিজ ঐক্য স্যারকে স্যরি বলে আয়।

আবৃতি মাথা নাড়িয়ে ঐক্যর দিকে এগোলো। আমতাআমতা করে কিছু বলতে নিলে ঐক্য রাশভারী আওয়াজে বললো,

— বাচ্চাটাকে বকলেন কেন? ছোট বাচ্চারা এমন করতেই পারে। বাচ্চার সব কাজে শাসন করতে যাবেন না। হিতে বিপরীত হতে পারে।

আবৃতি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো উস্তাদ রুপি ঐক্যর দিকে। ওয়াফা আবৃতির দিকে ফিরলো। আবৃতি মায়ামায়া চোখে চাইলো। কেঁদেকুটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলা ওয়াফা। ইতস্তত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে কোলে থাকা ওয়াফার কপালে চুমু খেল।ঐক্যকে উদ্দেশ্য করে বললো,

— আরশানের তরফ থেকে আমি ক্ষমা চাইছি। ওয়াফা বাবু আন্টিকে ক্ষমা করে দাও।

ওয়াফা নাক টেনে বললো,

— আন্টি তুমি অনেক সুন্দর! তাইনা পাপা?

আবৃতি গোলগোল চোখে একবার ওয়াফা তো আরেকবার ঐক্যর দিকে চাইলো। ঐক্য বিব্রত হয়ে চোখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল। বোঝাই যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে ওয়াফার এমন কথা কারোরই হজম হয়নি। পাপার থেকে নিজের করা প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে ওয়াফা ঐক্যর গলায় বাধা টাই টেনে বললো,

— কি হলো পাপা? বলো আন্টি সুন্দর না?

ঐক্য জানে তার মেয়ের খবর। তাই ইতস্ততভাবে বললো,

— হ্যাঁ সুন্দর!

আবৃতি বোকা বোকা চোখে ঐক্যর দিকে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষণে হড়বড় করে বললো,

— ওয়াফা মামুনি আমি আসি কেমন। বাই।

এই বলে আবৃতি ছুটে পালালো। ঐক্য সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আজ কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছে কে জানে? এসব কি হচ্ছে আজ? ঐক্য ঠান্ডা চোখে মেয়ের দিকে তাকালো। ওয়াফা চোখ পিটপিট করে আবৃতির গমন পানে চেয়ে আছে। ইচ্ছেতো করছে আবৃতির মতো কষে একটা ধমক দিতে। কিন্তু এটা হয়তো ঐক্যর পক্ষে কোনদিন সম্ভব হবেনা।

★★

–ঐশী, এই ঐশী শোন।

কারো ডাকে ঐশি অবাক হয়ে পিছনে তাকাল। ব্যাচমেট বীথি দৌড়ে এসে দাঁড়ালো। ঐশি ভ্রু কুঁচকে বললো,

— কি হয়েছে? এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছিস কেন?

বীথি হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

— আহান স্যারের বাইকে না আজ একটা মেয়েকে দেখেছি।

ঐশীর কুঁচকানো ভ্রু যুগল শিথিল হয়ে যায়। চেহারার আদলে নেমে আসে অমাবস্যার ছাঁয়া। ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করে,

— মানে কাকে? আর কোথায় দেখেছিস?

–ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে৷ বাইকের পেছনে ইয়াং একটা মেয়ে ছিল৷ জানিস মেয়েটা কি সুন্দর! একদম আহান স্যারের মতো ধবধবে ফর্সা।

বুকটা কেমন যেন টনটন করে উঠে ঐশির। নয়নযুগল না চাইতেও ভরে উঠলো। প্রচন্ড শক্ত ধাঁচের এই মেয়েটি এই এক জায়গায় ভীষণ রকম দূর্বল। সেই জায়গাটার নাম আহান খন্দকার!

বীথি ঐশীর মুখটা দেখে মায়া লাগলো। মেয়েটা আহান স্যারের প্রতি কি পরিমাণ দূর্বল এটা ব্যাচের প্রায় সবাই জানে৷ ও ঐশীকে আশ্বস্ত করে বললো,

–আরে হতে পারে কাজিন বা রিলেটিভ কেউ। আর স্যারের গার্লফ্রেন্ড থাকলে আমরা শুনতাম না? এখন চলতো রাউন্ডে চল। দেরী হচ্ছে।

রাউন্ড শেষে ঐশী আজকের রোগীদের স্ক্রিপ্ট গুলো জমা দিতে আহানের কেবিনে নক করলো। ভেতর থেকে আহান ডাকলো,

— কামিং।

ঐশী চোখ নামিয়ে ভেতরে ঢুকে। আহান আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে হোয়াইট টিশার্ট আর ব্লু ডেনিম প্যান্ট পরিহিত বছর চব্বিশের শ্যামলা বরণের মায়াবী মেয়েটাকে! ঐশী ফাইলগুলো হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আহান চশমাটা ঠেলে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,

— সিট ঐশী।

ঐশী ফাইলগুলো টেবিলে রেখে বসলো। আহান ফাইলগুলো চেইক করে সাইন করে দিল। ঐশীকে এভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে আহান অবাক হলো। কেননা অন্যসব দিনে মেয়েটা এই টপিক ওই টপিক নিয়ে আহানকে নানারকম প্রশ্ন করতো। কিন্তু আজ হলো কি?

— ঐশী আর ইউ ওকে?

ঐশী হুট করে দাড়িয়ে গিয়ে বললো,

–জি স্যার। আমি একদম ঠিক আছি। আর কারো জন্য কেউ বেঠিক থাকেনা। ঠিকই মানিয়ে নেয়। আসি।

এই বলে গটগট পায়ে কেবিন থেকে চলে গেল। এদিকে আগামাথা না বোঝা আহান হতবুদ্ধি হয়ে আওড়ায়,

— এই রাগী রাণীর আজ হলোটা কি?



রাত দুটোর ঘর অনেক আগেই পেরিয়েছে। কিন্তু চোখে ঘুম নেই জোবায়দা বেগমের। তাহাজ্জুদ পড়ে তাসবী হাতে দেয়ালো টাঙানো মৃত স্বামীর ছবিটার দিকে অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জোবায়দা বেগম। ঐক্যর বাবা ওয়াসিফ চৌধুরী মারা যান। আপাত দৃষ্টিতে এটা অ্যাক্সিডেন্ট মনে হলেও এটা ছিল একটা পরিকল্পিত খুন। সফল ব্যবসায়ী ওয়াসিফ চৌধুরীর শত্রুর অভাব ছিলনা৷ ওয়াসিফ চৌধুরীর সাথে খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয় কিশোরী জোবায়দা বেগমের। বিয়ের আগে সপ্তদশী সুন্দরী জোবায়দা বেগম অনেক কেঁদেছিলেন বিয়ে করবেন না বলে। কিন্তু সেই স্বামীকেই জোবায়দা বেগম বিয়ের পর পাগলের মতো ভালোবেসে ফেললেন। আসলে ওয়াসিফ চৌধুরী এমন একজন মানুষ ছিলেন যাকে ভালো বেসে না থাকা জোবায়াদা বেগমের পক্ষে সম্ভব ছিলনা।
তার ছেলেটাও ঠিক যেন তার স্বামীর প্রতিচ্ছবি। কি পাগলের মতোই না ভালোবেসেছিল ওই ছলনাময়ীটাকে তার ছেলেটা। কিন্তু সেই বিনাশীনিটা কি করলো? তার ছেলেটাকে একদম শেষ করে দিয়ে গেল। হঠাৎ বাইরে
থেকে গাড়ির তীব্র হর্ণ ভেসে আসলো। জোবায়দা বেগম চোখ মুছে বিছানার দিকে তাকালেন। সেখানে এলোমেলো ভাবে একটা পিংক টেডিবিয়ার জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট ওয়াফা। জোবায়দা বেগম কম্পোটারটা নাতনীর গায়ে আরেকটু জড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

চলমান……

[আসসালামু আলাইকুম পাঠক। রেসপন্স করবেন সবাই পিওরা। ]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments