গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২৫)

পর্বঃ২৫

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

[গল্প চুরি করে,পেইজ, টিকটক বা ইউটিউবে নিজেদের নামে চালানো থেকে বিরত থাকুন।নতুবা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।⛔]

 

 

— এটা কার জন্য নিয়েছ?

ডায়মন্ডের পেন্ডেট টা হাতে নিয়ে নাড়িয়ে চাড়িয়ে প্রশ্ন করে রাজ।

— আমার মেয়ের জন্য?

— ওয়াফার জন্য?

রাজ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল। ওর এমন দৃষ্টি দেখে মাহিরা বললো,

— ওয়াফার জন্মদিন কাল।

–কিন্তু তুমি এটা কিভাবে দেবে?

— যেভাবেই হোক দেব। ওয়াফাকে তো আমি সেভাবে কোন কিছুই দিতে পারিনি।

রাজ মাহিরাকে পরখ করে সন্দেহী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

— মাহিরা তুমি বলেছিলে না ওয়াফার কাস্টিডি নেওয়ার জন্য এপ্লাই করবে?

— না।

রাজ অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

— কেন? তুমি না বললে ওইদিন।

— এখন আমি সেটা করতে চাইনা৷

রাজ হতবাক বনে যায়,

— বাট হোয়াই?

মাহিরা বক্সটা টেবিলে স্ব শব্দে রেখে শান্ত গলায় বললো,

— এখন ওয়াফাকে নিয়ে ঐক্যর সাথে লড়াই করা মানে নিজের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলা। মিডিয়ার কেউই জানেনা আমি ম্যারিড ছিলাম। তাছাড়া বর্তমানে আমার একটা মেয়েও আছে৷ এখন মিডিয়া যদি হঠাৎ করে এসব গুণাক্ষরেও টের পায় দ্যান আ’ম ফিনিশড রাজ। আমার এত বছরের একটু একটু করে গড়ে তোলা ক্যারিয়ারটা নিমিষে গুড়িয়ে যাবে।

রাজ ভারী আশ্চর্য হলো। এ কেমন মা যে কিনা সন্তানের থেকেও ক্যারিয়ারকে বড় করে দেখে। আর এর জন্য কিনা ও ত্রয়ীকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে যাচ্ছে? যে মেয়ে নিজের সন্তানকেই চায়না সে খেয়াল রাখবে রাজের সন্তানের? হয়তো ত্রয়ী মাহিরার মতো অত্যাধুনিক না, না মাহিরার মতো আগুন সুন্দরী। কিন্তু ত্রয়ী একজন সৎ স্ত্রী, আদর্শ মা। পুরুষরা বাহিরে যতই নোংরামো করে বেড়াক না কেন। দিনশেষে প্রতিটা পুরুষই ত্রপার মতো মেয়েকেই ঘরের বৌ রুপে চায়। মাহিরারা তো কেবল ক্ষণিকের মোহ। ত্রপা রাজের মানসিক শান্তি। ঘরের সৌন্দর্য৷ মাহিরার মতো মেয়েদের কেবল হোটেল বা ব্রোথেলেই মানায়। হঠাৎ রাজ মনে মনে নিজের সিদ্ধান্তটা বদলে ফেললো। যে সিদ্ধান্তটা ও মাহিরার প্রতিনিয়ত চাপে নিয়ে ফেলেছিল। ও মাহিরাকে কিছুতেই বিয়ে করবেনা। কিছুতেই না। ত্রয়ীকে ডিভোর্স দিয়ে এমন একটা স্বার্থপর মেয়েকে বিয়ে করা মানে নিজের জীবন ধ্বংস করা।

— কি হলো তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে আবার?

রাজ সপ্রতিভ হয়ে বললো,

–কই কিছুনা তো।

মাহিরা তীর্যক চোখে রাজকে পরখ করে জিজ্ঞেস করলো,

— তা কি ভাবলে?

রাজ অবুঝের মতো শুধায়,

— কি নিয়ে?

মাহিরা বড় আশাহত হয়। তবুও রাগ চেপে বললো,

— আমাদের বিয়ে নিয়ে।

রাজ এগিয়ে এসে মাহিরাকে নিজের বাহুতে নিয়ে আহ্লাদী সুরে বললো,

— আরে বেবি। এত তাড়াহুড়ো কিসের। বিয়ে সাদী এসব থার্ড ক্লাস সাবজেক্ট। আমরা এমনিতেই ফ্রিডমলি লাইফ ইনজয় করি।

মাহিরা রাজকে হালকা ধাক্কা দিয়ে রেগে বললো,

— এমন তো কথা ছিলনা রাজ। তুমি নিজের কথার খেলাপ করছো। আই ওয়ার্ন ইউ রাজ ডোন্ট ট্রাই টু ওভারক্রসড মি।

রাজ মেকি হেসে মাহিরাকে ফের বুকে টেনে নিয়ে বললো,

— সোনা বিয়েতো আমি তোমাকে করবোই। তার আগে ত্রপাকে ডিভোর্স দেওয়ার একটা যোগ্য কারণ তো খুঁজে বের করি আগে।

— ওকে।

মাহিরার ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলে,

— দ্যাটস মাই গার্ল। নাও স্মাইল।

মাহিরা হাসলে। ওর অগোচরে রাজের ঠোঁটে বক্র হাসি খেলে যায়।

রাত সাড়ে দশটা। খাবার টেবিলে খেতে বসেছে আবৃতিদের পরিবার। পরিবার বলার কারণ আজ আহান ও উপস্থিত। সপ্তাহে চারদিন ওর নাইট ডিউটি আর বাকি তিনটি ডে শিফট। আহান খেতে খেতে বোনকে শুধায়,

— কিরে আদনান স্যারের বিষয়ে কিছু তো বললিনা।

আবৃতি ভাত মাখানো হাতটা থেমে যায়। জাহানারাও খাওয়া থামিয়ে মেয়ের দিকে তাকান উত্তরের আশায়। আবৃতি হঠাৎ উদাস হয়ে যায়। আহানের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে ভেবে পেলনা। জেদের বসে তো বলে দিয়েছে ও আবার বিয়ে বসবে। কিন্তু সব কিছু কি এতই সোজা? বিশেষ করে একটা মেয়ের কাছে সবকিছু ভুলে দ্বিতীয় সূচনা করাটা যে অনেক কঠিন। নিজের ফেলে আসা স্বামী, সংসারের মায়া কি আবৃতি এখনো ভুলতে পেরেছে? মস্তিষ্কের তৎক্ষনাৎ উত্তর এলো ‘না’। ধ্রুবর প্রতি আবৃতির ভালবাসা নেই এই সত্যিটা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। কিন্তু ওই যে ‘মায়া’ ওটা যে আরো খারাপ। ভালবাসা একসময় নিঃশেষ হয়, সময়ের সাথে সাথে ফিকে পড়ে যায়। কিন্তু মায়া নামক অনুভূতিটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রয়ে যায়। ওর ফেলে আসা সংসারের প্রতিটা কোণা ওর মায়ার জায়গা। সেই সংসারের মানুষগুলো যাদের আবৃতি আপন করে নিয়েছিল। ওর প্রিয় সেই দক্ষিণের বারান্দা টা। যেখানে ও নিজের হাতে প্রিয় চারাগুলো লাগিয়েছিল। ওর সেই প্রিয় জায়গা রান্নাঘর। যেখানে ওর সকাল সন্ধ্যা কাটতো সবার আবদারের ডালা পূরণ করতে। যেগুলো আবৃতি হাসিমুখেই পূরণ করতো। ওর আদরের সংসারটা। আহ!

— কিরে মা কিছু তো বল। দেখ ছেলেটার বয়স একটু বেশি। কিন্তু মা ছেলেটা সম্পর্কে যতটা শুনেছি ছেলেটা খুব ভাল, দায়িত্ববান। অবিবাহিত অনেক ছেলের প্রস্তাব নিয়মিত আসে তোর চাচ্চুর কাছে। কিন্তু তুই তো সেগুলো নাকচ করে দিস।

আবৃতি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ গলায় বললো,

— দেখো মা আমাকে নিজের সাথে সাথে আমার ছেলেটার দিকটাও চিন্তা করতে হবে। যারা আমার আরশানকে মেনে নেবেনা তাদের মতো মানুষদের সাথে আমার জীবন জড়ানোরও কোন মানে নেই।

আহান বললো,
— আদনান স্যারের আহানকে নিয়ে কোন ইস্যু নেই।
এখন কি বলিস? তুই মত দিলে আমি আদনান স্যারের সাথে কথা বলব৷

আবৃতি নিচু গলায় বললো,

— আমাকে একটু সময় দে প্লিজ।

জাহানারা ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,

— না না মা। তোর যত সময় লাগে তুই নে। তোর উপর কোন জোর নেই৷ একবার তাড়াহুড়ো করে তোর বিয়ে দিয়ে মস্ত ভুল করেছি। আমার মেয়ে আমার বোঝা হয়ে যায়নি৷ তোকে সারাজীবন বসিয়ে খাওয়াব দরকার হলে।

আবৃতি মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। যাক অন্তত তার পরিবার তার সঙ্গে ঢাল হয়ে আছে। ডিভোর্সের পর পরিবারের সাপোর্ট কয়জন মেয়ে পায়? সেদিক থেকে আবৃতি ভীষণ লাকি। ওর মা, ভাই ওকে এত কম্পোর্ট না দিলে হয়তো ও এত শক্ত থাকতে পারতো না। আহান হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ টেনে বললো,

— কিরে তোকেও কার্ড দিয়েছে ওয়াফা মনির বার্থডের?

— হুম৷ আজকে ঐক্য সাহেব যাওয়ার সময় দিয়ে গেলেন।

— আমাকেও আজ ঐশী হসপিটালে দিল একটা কার্ড।

–কিন্তু বাচ্চাটাকে কি দেওয়া যায় বলতো? আমার তো মাথায় কিছুই আসছেনা।

— আচ্ছা কাল সকালে মলে চল। কিছুনা কিছু মনে তো ধরবেই। আর মনে আছে ড্রেস কোড ব্ল্যাক।

আবৃতি ঠোঁট চিপে বললো,

— কিন্তু আমার তো কালো রঙের কোন জামা বা শাড়ি নেই।

— সমস্যা কি। কাল গিফটের সাথে কিনে নেওয়া যাবে।

— আচ্ছা।

*

— মা।

— হুম বলো৷

ইরা রুগ্ন স্বরে অভিযোগ জানাল,

— আমি এত অসুস্থ। তবুও ড্যাড আসলোনা?

স্যুপের বাটিতে নড়াচড়া করা ইরার মার হাত থেমে গেলেন। মেয়ের অভিমানী অভিযোগের বিপরীতে উত্তর করলেন রয়েসয়ে,

— তুমি তোমার ড্যাডকে খুব ভাল করেই চেনো ইরা। তবুও অভিযোগ কেন?

ইরা ধরা গলায় বললো,

— তাহলে তুমি এসেছে কেন। তুমিও না আসতে।

ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

— আমি তো মা ইরা। দুনিয়ার সবাই তোমাকে ত্যাগ করলেও আমি তো পারবনা। একজন মা কখনো তার সন্তানকে ছাড়তে পারেনা।

ইরা কিছু বললোনা। নিশ্চুপে চোখের জল ফেলতে লাগলো। তার বাবাটা এত কঠিন কি করে হলো তার প্রতি? যে বাবা ওর সামান্য জ্বরেও পাগলপ্রায় হয়ে যেত সেই বাবা কি করে ইরা এত অসুস্থ জেনেও দূরে সরে আছেন? ইরা নাক টেনে বললো,

— আমার অন্যায়টা কি এতটা বড় মা যে এত অসুস্থতায়ও ড্যাড সামান্য সহানুভূতি জানাতেও এলোনা৷

ভদ্রমহিলা রাশভারি স্বরে বললেন,

— তোমার কাছে হয়তো তোমার অন্যায়টা অদৃশ্যমান ইরা। কেননা তোমার বিবেক বহু আগেই মরে গিয়েছে। কিন্তু সমাজ, এই সমাজের আট দশটা মানুষের কাছে তুমি যেটা করেছে সেটা বিরাট অন্যায়। পাপ ইরা একটা ঘৃণিত পাপ!

ইরা কাঁদতে কাঁদতে বললো,

— কি এমন করেছি মা। ভালোই তো বেসেছি। ভালবাসা যদি অন্যায়ই হয় তবে তুমি কেন বাবাকে ভালবেসে বিয়ে করেছ?

ভদ্রমহিলা হাসলেন নিজের মেয়ের বাচ্চামোতে। ওনার হাসি দেখে ইরার হৃদয়ের দহন তরতরিয়ে বাড়ল। চাপ পড়লো ফের বুকে। তিনি সাবলীল গলায় বললেন,

— কে বলেছে ভালবাসা অন্যায়? ভালবাসার মতো পবিত্র আর কোন কিছুর তুলনা হয়না এই ধরিত্রীতে। কিন্তু মা ভালবাসলে যে সবসময় সেটা পেতেই হবে সেটা তো কোথাও লেখা নেই। ভালবাসলে কখনো ত্যাগ করতে জানতে হয়,ভালবাসার মানুষের সুখে হাসতে হয়। কিন্তু তুমি কি করেছ মা? তুমি ভালোবাসাটাকে সর্বদা নিজের জেদ রূপে দেখলে। সেই জেদকে উষ্কে ধ্বংস করলে আরেক নারীর জীবন। কেড়ে নিলে এক সন্তারের মাথার উপর থেকে পিতার ভরসার হাত। এবার বলো তোমার করা নিকৃষ্ট কাজটাকে ভালোবাসা বলব নাকি পাপ?

ইরার কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে। ভদ্রমহিলার নিজের চোখ দুটোও টলমল করছে। স্নেহময় হাতে মেয়েকে বুকে আগলে নিলেন। ইরা এবার হাউমাউ করে কেঁদে বুক ভাসালো ভদ্রমহিলার।

— আমি কি করব মা? আমার কোন কিছুতেই আর শান্তি লাগছেনা। মরে যেতে ইচ্ছে করছে। ধ্রুব, এই সন্তান সব কিছু অসহ্য ঠেকছে। সবার এত ঘৃণা, অবহেলা নিয়ে আমি বাঁচতে পারছিনা। আই কান্ট… আই কান্ট টেক ব্রিথ মা।

ইরার মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফুটে বললেন,

— মা তোমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। যে নারীর সাথে তুমি এতটা অন্যায় করেছ তার কাছে ক্ষমা চাও। একমাত্র আবৃতির ক্ষমাই পারে তোমার মনে স্বস্তি এনে দিতে।

.

হসপিটাল থেকে বের হয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ গাড়িটায় উঠে বসলেন ইরার মা। উনার বসতে দেরী হয়নি একপ্রকার হামলে পড়লেন ইরতেজা সাহেব। সম্পর্কে তিনি ইরার পিতা। হড়বড়র করে বললেন ভীষণ উৎকন্ঠায়,

— কি অবস্থা ইরার? ডক্টর কি বললো? ওর চোখেমুখের এই অবস্থা কেন মায়া?

মায়া হাসলেন লোকটির উৎকন্ঠায়। বললেন,

— তোমাকে আমার অদ্ভুত লাগে ইরতেজা। মেয়ের জন্য এত দুশ্চিন্তা তবুও ওকে চোখের দেখা দেখতে যাচ্ছনা।

ইরতেজা সাহেব শক্ত গলায় বললেন,

— সব জেনেও এমন প্রশ্নের কি মানে কি মায়া?

মায়া হাসলেন। ওনার হাসি দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন ইরতেজা সাহেব,

— হাসছ কেন মায়া?

— আজ আমার মেয়ের দোষে যে কিছুটা তুমিও দোষী ইরতেজা।

— মা…নে? কি বলতে চাইছ তুমি?

— ছোট বেলা থেকে তুমি ইরা যেটা বলেছে সেটাই সাথে সাথে এনে দিয়েছ। ওকে জীবনে যেমন ইচ্ছে সেভাবে চলার অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছ। ওর প্রতিটা অন্যায় আবদার তুমি পূরণ করেছ। তোমার দেওয়া এই অবাধ স্বাধীনতা ইরাকে পুরোপুরি জেদী করে তুলেছে। সব পেতে পেতে ওর মনে হয়েছে যে ওকে সব পেতেই হবে। নাহয় ও হেরে যাবে।

মায়া কাটকাট গলায় কথাগুলো বলে দম নিলেন। ইরতেজা সাহেব স্তব্ধ বনে গেলেন ক্ষণিক সময়ের জন্য। বিপরীতে মুখ ফুটে কিছু বলার জন্য শব্দ খুঁজে পেলেন না। মায়া যে ভুল কিছু বলেনি। ইরার আজ এই অধঃপতনের দায় যে আংশিক হলেও ওনার উপর বর্তায়।

— একটা সন্তান লালন-পালন অনেক বড় একটা দায়িত্ব ইরতেজা। আমরা তো নিজেদের মতো করে সন্তান মানুষ করি। মনে করি সন্তানের সকল চাহিদা হাতের নাগালে এনে দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু না ইরতেজা। একজন সন্তানের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন হলো পিতামাতার কঠোর অনুশাসন। যেটা ইরা কখনো তোমার থেকে পায়নি।

ইরতেজা সাহেব কাঁপা গলায় বললেন,

— এখন আমি কি করব তবে?

— ইরার কাছে যাও। ওকে আগলে নাও। তোমার ওর থেকে মুখ ফিরে থাকায় এখন কিছুই আর আগের মতো হবে না। বদলে পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যাবে।

রাত এগারোটা। ঘুটঘুটে তিমিরে আচ্ছ্বাদিত পুরো চৌধুরী ভিলা। শুধুমাত্র ওয়াফার রুমে রেইনবো কালারের কয়েকটি ফেইরি লাইট জ্বলছে। সেই মৃদু আলোতে ঐক্য ওয়াফাকে বুকে নিয়ে একটা স্টোরি বুক পড়ে শোনাচ্ছে। ওয়াফা বাবার বুকে গাল দাবিয়ে ঘাপটি মেরে শুড়ে ফ্যালফ্যাল করে পাপার গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে। এই যে যেমন, ‘সিন্ড্রেলা কাঁচের জুতো কিভাবে পরে ডান্স করেছে? ভেঙ্গে যায়নি?’

ঐক্য দেয়াক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ে। প্রায় আধঘন্টা যাবৎ ও গল্প শুনিয়ে চলেছে তো চলেছেই কিন্তু মহারাণীর ঘুমের কোন খবর নেই। ওয়াফা চোখ পিটপিট করে বললো,

— কি হলো পাপা বলোনা এরপর কি স্লিপিং বিউটি আর কখনো ঘুম থেকে উঠেনি?

ঐক্য জবাব দিলোনা৷ মেয়ের লালাভ আদুরে মুখটা স্নেহময় দৃষ্টিতে দেখলো চোখভরে। হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে প্রশ্ন করে,

–আম্মাজান? জন্মদিনে কি চাই তোমার?

ওয়াফা চোখ বড় বড় করে উৎসুক গলায় শুধায়,

— জন্মদিনে বাচ্চারা যা চায় তাই পাওয়া যায় পাপা?

— হ্যাঁ বাবা। পাপা তোমার যেকোন ইচ্ছে পূরণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করব। এবার বলো কি চাই তোমার?

ওয়াফা টলটলে উদ্ভাসিত চোখে তাকিয়ে আদো গলায় নিজের ইচ্ছটি জানায়,

— তাহলে সুইটি আন্টিকে আমার মাম্মা বানিয়ে দাও না পাপা।

ঐক্য থমকে যায়। বিস্মায়াবিষ্ট ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি তার মেয়ের নিষ্পাপ আননে। ঢোক গিলে প্রশ্ন করলো ধীরে,

— তুমি সুইটি আন্টিকে কেন এত ভালোবাসো?

ওয়াফা নিষ্পাপ কন্ঠে বললো,

— জানিনা তো। কিন্তু অনেক ভাল লাগে।

— কেমন ভাল?

— মাম্মামের মতো ভাল।

ঐক্যর বুকের উচাটন বেড়ে যায়। স্বস্তি আর ভালোলাগায় ভরে উঠে হৃদয়ের প্রতিটি কোণা। যেই কোণাগুলো এতদিন হাহাকারে ডুবে থাকতো। পাপার কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে ওয়াফা চোখ তুলে তাকায়। দেখে বেখেয়ালে ডুবে আছে ঐক্য। ওয়াফা নিজের ছোট হাতটা তুলে ঐক্যর খসখসে পুরুষালি
গালে রাখে,

–পাপা।

— জি আম্মাজান৷

— কাল তুমি নিয়ে আসবে সুইটি আন্টিকে?

ঐক্য কোন উত্তর দেয়না৷ ওয়াফা ঐক্যর টিশার্ট মুঠো ধরে ঝাঁকিয়ে বলে,

— ও পাপা বলোনা।

ঐক্য একটা ঢোক গিলে হাসলো। মেয়ের টসটসে গালে চুুমু খেয়ে বললো,

— আনব আম্মাজান। ভেরি সুন তোমার সুইটি আন্টি তোমার কাছে চলে আসবে।

— আমার মাম্মা হয়ে যাবে সুইটি আন্টি?

— ইনশাআল্লাহ সুইটি আন্টি তোমার মাম্মা হয়েই আসবে।

ওয়াফা সজলনেত্রে তাকাল। নিজের বুড়ো আঙুল ঐক্যর সামনে বাড়িয়ে ধরে বললো,

— প্রমিজ?

ঐক্য হেসে সেই বুড়ো আঙুলটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,

— প্রমিজ।

চলমান…….

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x