পর্বঃ২৭
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]
যেই নারী আবৃতির সাজানো গোছানো সংসারটা তছনছ করেছে তাসের ঘরের মতো। যার জন্য নিজের সবটুকু চেষ্টা ব্যয়ের পরেও ছয়বছরের সংসার জীবনে ধ্রুবর কাছ থেকে স্রেফ অবহেলা কুঁড়িয়েছে। যার জন্য তার সন্তানকে আজীবনের জন্য পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। তাকে কি এত সহজে ক্ষমা করা যায়? না আবৃতি এত মহান হয়তো হতে পারবেনা কখনো। ওর এখনো মনে পড়ে অতীতের বিভীষিকা। যখন দিনের পর দিন ও খেটে গিয়েছে শুধুমাত্র ধ্রুবর মনে একটুখানি জায়গা পাওয়ার আশায়। মা বলে পুরুষের মন নাকি মোমের মতো। নারীর ভালবাসায় সেই মোম গলতে বাধ্য। কিন্তু ওর ভালবাসা পাটেনি নিজের স্বামীর বুকে একটুখানি জায়গা করে নিতে। হয়তো তাকে পেতেই দেয়া হয়নি।
— আবৃতি আমি জানি আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। না না অন্যায় না এটা পাপ পাপ! কিন্তু বিশ্বাস করো আমি এটা করতে চাইনি। আমি তো ধ্রুব বিয়ে করে ফেলেছে শুনেই অনেক দূরে, এই শহর ছেড়ে দিয়েছিলাম।অনেক কষ্টে সময়ের সাথে নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। কিন্তু দেড় বছর পরে যখন ধ্রুবকে আবার সামনাসামনি দেখলাম আমার সকল সংযম গুঁড়িয়ে গেল৷ মনের মধ্যে আবার লোভ জাগলো ধ্রুবকে পাওয়ার৷
ইরা হাঁপাতে হাঁপাতে এটুকু বলে শ্বাস নিতেও পারলোনা। আবৃতি ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,
— আমরা নারীরা না একজন পুরুষের থেকেও অধিকতর নিকৃষ্ট জানেন? একজন নারী নিজ মনে আরেকজন নারীর প্রতি এত পরিমাণ হিংসা পুষে রাখে যে সেই হিংসা চরিতার্থ করতে আরেক নারীর সুখের সংসার ছিনিয়ে নিতেও দ্বিধাবোধ করেনা। তার হিংসার অনলে বিনষ্ট হয়ে যায় আরেক নারীর সকল সুখ।
– কি…বল..তে চাইছো তুমি?
ইরা তুতলে জিজ্ঞেস করলো। আবৃতি অত্যন্ত শান্ত গলায় বলে উঠলো,
— আপনার আসলে ধ্রুবকে দেখার পর তাকে আবার পাওয়ার লোভের চেয়েও ধ্রুবকে আমার সাথে দেখে মেনে নিতে পারেননি।
ইরা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের চমকে উঠে। আজ যেন আবৃতি নয় বরঞ্চ একটা আরশি দাঁড়িয়ে আছে। যেথায় ওর পাপগুলো স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায় দৃশ্যমান।
ইরা প্রকম্পিত গলায় বললো,
— মিথ্যে। আমি ধ্রুবকে ভালবাসি। আর ভালবাসার মানুষকে কি এত সহজেই ভোলা যায়? তুমি তো কখনো ভালবাসনি। নাহলে বুঝতে আমার সিচুয়েশন।
আবৃতি মলিন হেসে বলে,
— ঠিকই বলেছেন আমি কখনো ভালোবাসিনি। কি করে বাসতাম বলুন? সেই সুযোগটা যে ধ্রুব কখনো আমাকে দেয়ইনি৷ অথবা হতে পারে অনুভূতিটুকু তৃতীয় ব্যাক্তির প্রভাবে ভালবাসায় রুপান্তর হতে পারেনি।
— এখানে তৃতীয় ব্যাক্তি বলতে কাকে বুঝিয়েছো আবৃতি? আমি তৃতীয় ব্যাক্তি? অথচ আমি ধ্রুব দু’জন দু’জনকে ভালবাসতাম৷ আমাদের ভালবাসায় তোমাকে জোর করে ঢোকানো হয়েছে৷ নিজের ভালবাসা দাবী করা কি অন্যায়?
আবৃতি কাটকাট গলায় বললো,
— অবশ্যই অন্যায়। আপনার ভালবাসা আমার ধর্মীয় এবং আইনগত স্বামী ছিল। ছিল আমার একছত্র অধিকার। তাহলে বলুন হালাল একটা সম্পর্কে আপনার হারাম ভালোবাসার জোর কতটুকু?
ইরা সোফার কভার খামচে ধরে। আবৃতির কথাগুলো যেন ফাল হয়ে ওর বুকের মাঝ বরাবর ঢুকছে।
— একটা কথা কি জানেন? নারীর ছলনা ভয়ংকর! খুব ভয়ংকর!
ইরা চোখ তুলে তাকায়। আবৃতি ইরার দিকে চেয়েই বলে,
— ধ্রুবকে আমি কখনো নিষ্পাপ বলিনি। আর না এখন বলব। ধ্রুব অবশ্যই পাপ করেছে। বাট বাট বাট সেই পাপটা আপনার তুলনায় কিছুটা কম বৈকি। মিথ্যে বলবোনা আরশান জন্মের পর থেকেই আমি ধ্রুবর মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পেলাম। ও মনপ্রাণ দিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল অতীত ভুলে আমাদের সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার৷ কিন্তু ওর সব চেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আপনি নিজের বিছানো জালে ওকে বাজেভাবে আটকে দিলেন।
— কি বলতে চাইছো তুমি? আমি কখন…
— হঠাৎ দু’বছর পর আপনার অকষ্মাৎ ঢাকায় ব্যাক করা তাও আবার শানু ফুফিদের বাড়িয়ে আমাদের দেখার পরপরই। নিজের বাড়ি ছেড়ে একদম ধ্রুবর এলাকার ভেতরে নিজের বাসা নেওয়া। এসব কি শুধুই কাকতালীয় ইরা? বলুন? আপনি জানতেন ধ্রুব আপনাকে দেখলেই অপরাধবোধে গুমরে মরবে। আর আপনি ধ্রুবর সেই দূর্বলতাটাকেই নিজের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ইউজ করলেন। ধ্রুবকে নিজের পরম বন্ধু বানিয়ে সময় অসময়ে ওর সাথে যোগাযোগ করতেন। ধীরে ধীরে ধ্রুবর আপনার প্রতি আবার উইক হয়ে পড়ে। আর সুযোগ বুঝে আপনি আপনার নোংরা খেলাটা খেলে নিলেন।
আবৃতি কথা কেড়ে নিয়ে রয়েসয়ে বললো।
ইরার হৃদপিণ্ড ছলকে উঠে। বুদ্ধিহতের ন্যায় ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে আবৃতির চির অবিচল সুশ্রী আননে।
★
সন্ধ্যা সাতটা৷ ধীরে ধীরে লোকসমাগমে ভরে উঠছে রাজধানীর অত্যাধুনিক রয়াল কনভেনশন হলটি৷ নামীদামী ঐক্যর বিজনেস পার্টনার থেকে শুরু করে ওয়াফার ক্লাস ফ্রেন্ডরাও নিজেদের বাবা মায়ের হাত ধরে পার্টিতে ঢুকছে। ঐক্যর মামা ও জোবায়দা চৌধুরী মিলে আগত অতিথিদের উষ্ণ অভিবাদন জানাচ্ছেন। বিশালাকৃতির হলরুমের গিফট টেবিলটা নিমিষেই পূর্ণ হয়ে উঠছে রেপিং পেপারে মোড়ানো নানা রকম উপহারের বক্সে। সবাই নিজেদের মতো সফট ড্রিংকস হাতে খোশগল্পে মেতে আছে নিজেদের মতো। হঠাৎ হলরুমের কেন্দ্রস্থলে কয়েকটি কালারফুল স্পটলাইট জ্বলে উঠে। মুহুর্তে সবার মনোযোগ সেদিকে স্থির হয়। ডার্ক রেড কালারের ডিজনি প্রিন্সেস গাউনটা পড়ে বাবা আর পিপ্পির হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে ওয়াফা। যেন সত্যিকার অর্থে রুপকথার রাজকন্যা বাস্তবে আবির্ভূত হয়েছে। নিমিষে সবাই মুগ্ধ হয়ে যায় ঐক্যর আদুরে পরিটিকে দেখে। জোবায়দা চৌধুরী মনে মনে দু’বার মাশাল্লাহ পড়ে নেন। ওয়াফা গুটিগুটি পায়ে ঐক্যর হাত ধরে মিডলে আসতেই সব লাইটগুলো জ্বলে উঠে। সবাই সমস্বরে ‘ওয়েলকাম আওয়ার বার্থডে গার্ল ‘ বলে করতালি দেয়। সবার করতালিতে ওয়াফার ডাগর নয়নজোড়া উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। আজকের সবকিছু ওর জন্য এটা ওর ছোট্ট মনে উপলব্ধি হতেই খুশির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় দ্বিগুণ হারে। ঐশী শাড়ি সামলে পিছু পিছু মন্থর গতিতে নেমে দাঁড়ায়। ও আজ পড়েছে সবার সাথে ড্রেসকোড মিলিয়ে ব্ল্যাক সিল্কের কারচুপি সিকোয়েন্সের শাড়ি। এই নিয়ে জীবনে ওর হাতে গোণা দুএকবার শাড়ি পড়া হয়েছে। পড়বে কিভাবে? মেডিকেলের মোটা মোটা বইগুলো পড়তেই তো যৌবন পার হয়ে যাচ্ছে। অনভ্যস্ত হওয়ায় তাই শাড়িটা সামলাতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে।
ঐশী খেয়াল করলোনা দূর থেকে একজোড়া চোখ ওর পা- মাথা মেপে নিচ্ছে মুগ্ধ দৃষ্টিতে। সেই ব্যাক্তিটি বিরবির করে বলে,
— না মমের পছন্দ খারাপ না। সি রিয়েলি লুকস প্রিটি!
ওয়াফার ফ্রেন্ডরা সবাই দৌড়ে এসে ওকে ঘিরে ধরে। ঐক্য হেসে সরে দাঁড়ায়। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই ও চারিদিকে তাকায়। কিন্তু কাঙ্খিত ব্যক্তিদের খুঁজে পায়না। ভ্রু কুঁচকে আপনমনে বিড়বিড় করে বলে,
— কি ব্যাপার? মিস আবৃতিরা এখনো আসলেন না?
— ঐক্য?
ঐক্য পিছনে তাকিয়ে দেখে ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু সোহান। ঐক্য হেসে সোহানকে জড়িয়ে ধরে। অবাক গলায় বলে,
— হোয়্যাট আ সারপ্রাইজ সোহান। আসলি কখন? তুই না বললি ফিরতে ফিরতে মিড নাইট হবে?
সোহান ঐক্যকে ছাড়িয়ে হেসে বলে,
— আই ওয়ান্ট টু সারপ্রাইজড ইউ ডুড। তাই বলেছি ফিরতে লেইট হবে।
— আঙ্কেল আন্টি এসেছেন?
— হ্যাঁ ওইতো জোবায়দা খালামনির সাথে কথা বলছেন।
এই বলে পকেট থেকে একটা বক্স বের করে বলে,
— এটা ওয়াফা মামনির জন্য। যাই ওয়াফা বেবির গিফটটা দিয়ে আসি৷
ঐশী ওয়াফার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। ও বারবার ফোন চেইক করছে। প্রায় আধঘন্টা পূর্বে আহান মেসেজ পাঠিয়েছিল ওরা বের হচ্ছে। কিন্তু এখনো কেন পৌঁছায়নি কে জানে? এতক্ষণ তো পৌঁছে যাওয়ার কথা৷ সোহান এগিয়ে একদম ঐশীর সামনাসামনি দাঁড়ায়৷ সামনে ফর্সা লম্বা মতন একজন যুবকের উপস্থিতি লক্ষ্য করে ঐশী মাথা তুলে তাকায়৷ অবাক গলায় বলে,
— সোহান ভাইয়া আপনি? হোয়্যাট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! আপনি না আসতে পারবেন না?
সোহানের হাসিমুখ দপ করে নিভে যায় ঐশীর মুখে ভাইয়া ডাক শুনে৷ বেশ অবাক হয়ে মনে মনে ভাবে,
— কি ব্যাপার ঐশী কি কিছুই জানেনা? মুখ দেখে তো মনে হচ্ছেনা৷ ও তো ভেবেছিল ঐশী ওকে দেখে লজ্জা পাবে ভীষণ৷ কিন্তু এই মেয়ে তো একদম স্বাভাবিক। বাহ বেশ এডভান্সড তো৷ নট ব্যাড।
— কি হলো ভাইয়া কোথায় হারালেন?
সোহান মুচকি হেসে ঘাড় চুলকে বললো,
— তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম৷।
ঐশী হেসে বলে,
— সত্যি অনেক সারপ্রাইজড হয়েছি৷ তা কেমন কাটছে অস্ট্রেলিতে দিনকাল৷
— হুম ভালোই। তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে। ফাইনাল ইয়ার না?
— হ্যাঁ। ভালোই চলছে।
— গুড৷ তাহলে আমি একজন উ্যড বি ডক্টরের সাথে কথা বলছি?
ঐশী লজ্জা পেয়ে বললো,
— দোয়া করবেন ভাইয়া৷
আবার “ভাইয়া”! সোহান মনে মনে চ সূচক শব্দ করে।সোহান গিফট বক্সটা ঐশীর হাতে ধরিয়ে বলে,
— এটাতে একটা ডায়মন্ডের পেনডেন্ট আছে। আমার পক্ষ থেকে ওয়াফার জন্য ছোট্ট গিফট। ওকে এখনই পড়িয়ে দাও প্লিজ৷
— আচ্ছা।
— ওয়াফা মামনি দেখ তোমার একটা আঙ্কেল এটা তোমাকে উপহার দিয়েছে। এসো পড়িয়ে দিই৷
ওয়াফা চোখ তুলে সোহানকে দেখে বলে,
— থাংকস আঙ্কেল৷
সোহান ওর ফুলকো গালদুটো টিপে বলেলো,
— ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম প্রিন্সেস ।
ঐশী হেসে ওয়াফাকে লকেটটা পড়িয়ে দেয়৷ কিন্তু ওয়াফার তেমন ভাবাবেগ নেই সেদিকে। উদাস হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে বারবার। ঐশী তা লক্ষ্য করে। কপাল সামান্য কুঁচকে ওর মুখটা তুলে শুধায়,
— কি হয়েছে মামনি? তুমি আপসেট কেন?
— পিপ্পি সুইটি আন্টি আর পঁচা ছেলে কি আসবেনা?
— ওমা আসবেনা কেন? তারা বোধহয় রাস্তায় আছে।
যদিও ঐশী নিজেও চিন্তিত। আজ বিশেষ একজনের জন্য বড় শখ করে শাড়ি জড়িয়েছে শরীরে। শুধুমাত্র তার জন্য। কিন্তু মহাশয় কোথায়?
.
ঘূর্ণায়মান ঘড়ির কাঁটা তার নিজ গতিতে ছুটতে ছুটতে রাত সাড়ে আটটার ঘরে পৌঁছে গেলেও ওয়াফার সুইটি আন্টির দেখা মেলেনা৷ এদিকে ঐক্যর অনেক দূরবর্তী গেস্ট তাড়া দিচ্ছিল দ্রুত কেক কাটার জন্য। তাদের আবার ফিরতে হবে আপন নিরালায়। ঐক্য ঐশীকে ডেকে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
— ঐশী? মিস আবৃতিরা এখনো আসছেননা কেন? তারা কি আসবেন না?
— বুঝতে পারছিনা ভাইয়া৷ তখন বলেছে রওনা দিয়েছেন। কিন্তু এতটা সময় লাগার তো কথা না৷
— তুই একটা কল করে দেখ তো। আহানের নাম্বার আছে?
— হুম দাঁড়াও দিচ্ছি৷
ঐশী কল লগে আহানের নাম্বারটা তুলে কল করে। কিন্তু ওকে আশ্চর্য করে দিয়ে কলটা কেটে দেয়। কান থেকে ফোন নামিয়ে ঐশী হতবাক গলায় বললো,
— কল কেটে দিয়েছে।
— স্ট্রেন্জ। ওনারা ঠিক আছেন তো? নাকি পার্টিতে আসতেই চাচ্ছেন না৷
ঐশীর উজ্জ্বল শ্যামলা মুখটায় অমাবস্যার অন্ধকার নেমে আসে। সত্যি আহান স্যার আসবেন না? তাহলে তাকে সেদিন প্রমিস কেন করেছেন? হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ঐক্যর ব্লেজার মুঠো করে টেনে ধরে।ঐক্য ভ্রু কুঁচকে পেছনে ফিরতেই অবাক হয়ে যায়। ওয়াফা টলমলে চোখে তাকিয়ে আছে। ঐক্য হাঁটু ভেঙে বসে মেয়ের ফোলা গালটা আজলায় নিয়ে নরম সুরে সস্নেহে শুধায়,
— কি হয়েছে আম্মাজান?
ওয়াফার রক্তিম ঠোঁট জোড়া কেঁপে কেঁপে ফুলে উঠে। ঠোঁট ভেঙে বলে,
— সুইটি আন্টি আসবেনা। তুমি সুইটি আন্টিকে নিয়ে আসোনি? আমি আজ কোন কেক কাটবোনা। সবাইকে বলো চলে যেতে।
বলতে বলতে ডাগর ডাগর নেত্রে এতক্ষণের জমিয়ে রাখা অশ্রুকণা ঝরঝর করে নামে গাল বেয়ে। ঐক্যর বুকটা খামচে উঠে। মনে মনে ভীষণ রাগ জন্মে আবৃতি নামক নারীটির প্রতি। তার মেয়েটা কতটা আশা নিয়ে আছে কাল থেকে আর ইনি কিনা শেষ মুহুর্তে আসলেনইনা।
— আমি এটা আপনার থেকে একদমই আশা করিনি মিস আবৃতি।
ঐক্য বিড়বিড়িয়েে বলে। নরম হাতে ওয়াফার চোখের পানি মুছে ঠোঁটে মেকি হাসিহাসি ভাব ধরে বললো,
— কে বলেছে তোমার সুইটি আন্টি আসবেনা। তোমার সুইটি আন্টি ওন দ্য ওয়ে সোনা। জ্যামে আটকেছে তো তাই লেইট হচ্ছে।
ওয়াফা নাক টেনে বললো,
— সত্যি আসবে?
— হ্যাঁ আম্মাজান সত্যিই আসবে। তুমি যাও তোমার ফ্রেন্ডসদের ওয়াফেল টেস্ট করাও। যাও।
ওয়াফা মাথা নাড়িয়ে প্রস্থান নিতেই ঐক্য দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
— না এসে কোথায় যান আপনি আমিও দেখি। আজকের দিনে আমার মেয়ের তিল পরিমাণ কষ্টও আমি মেনে নেবনা। ঐশী তুই এদিকটা ম্যানেজ কর আমি একটু আসছি।
— সেকি যাচ্ছ কোথায় তুমি?
ঐক্য যেতে যেতে শুধু এটুকু বলে,
— আমার মেয়ের উপহার আনতে।
*
— বিশ্বাস করো আবৃতি আমি যাই করেছি শুধুমাত্র ধ্রুবকে ভালোবেসে করেছি৷ তখন আমার মনে হয়েছিল ধ্রুবকে পেতে হলে আ….
— আপনাকে অনেক নিচে নামতে হবে তাইতো?
ইরা মাথা নামিয়ে নিল। আবৃতি বিরস হেসে বলে,
–আপনারা ভালবাসা বলতে কেবল ছিনিয়ে নেওয়া কেন বোঝেন?
ইরা আর শুনতে পারলোনা। টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
— আমি জানি আমি মরে গেলেও তোমার ক্ষমা পাবোনা। কিন্তু প্লিজ ধ্রুবকে তুমি মাফ করে দাও। আমি পারছিনা ভালোবাসার মানুষটাকে এভাবে তিলে তিলে অপরাধবোধে শেষ হয়ে যেতে দেখতে।
আবৃতি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
— আমার কারোর প্রতি কোন অভিযোগ নেই। আমি সবসময় এটা বিশ্বাস করি আমি যা কিছু হারিয়েছি উপরওয়ালা তা শতগুণে আমায় ফিরিয়ে দেবেন।
ইরা কন্ঠ হঠাৎ কেঁপে উঠে,
— আবৃতি?
— বলুন।
ইরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠে,
— আমি সেদিন তোমাকে নিজের প্রেগন্যান্সি নিয়ে মিথ্যে বলেছিলাম।
আবৃতি চমকে উঠে ভীষণভাবে। রুদ্ধকর শ্বাসে শুধায়,
— মানে?
— সেদিন আমি প্রেগন্যান্ট ছিলাম না। আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম যাতে তুমি ধ্রুবকে ঘৃণায় ছেড়ে দাও৷ আমি জানতাম এটা জানার পর তুমি কিছুতেই আর ধ্রুবর ঘর করবেনা।
আবৃতি আজ আরো একবার অবাক হয় নারীটির কুটিলতায়। ভেবে কূল পায়না একজন নারী ঠিক কতটা কুচক্রী হলে নিজের মাতৃত্ব নিয়ে মিথ্যাচার করতে পারে।