গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩১)

পর্বঃ৩১

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]

বাড়ির লনে ওয়াফা আরশানকে ছোটাছুটি করতে দেখে ঐশী যা বোঝার বুঝে গেল। বিস্তর উত্তেজনায় ছটফটিয়ে উঠলো হৃদয়। ওকে দেখে ওয়াফা খেলা ফেলে ছুটে আসলো,

— পিপ্পি!

ঐশী স্মিত হেসে নিজের হ্যান্ডব্যাগ থেকে চকোলেট বের করে হাতে দিল। চকোলেট দুটো পেয়ে ওয়াফা লাফিয়ে চলে গেল। ঐশী পিছু ডেকে কিছু বলবে এর আগেই ওয়াফা হাতের একটা চকোলেট আরশানের দিকে বাড়িয়ে দিল। ঐশীর মুখে হাসি ফুটে উঠে। যাক তার আর আগ বাড়িয়ে বলতে হলোনা। দুরুদুরু বুকে বাড়িয়ে প্রবেশ করে দেখে ড্রয়িংরুমের বসে আছে আহানের পরিবার৷ আবৃতির নজর পড়লো ঐশীর দিকে। ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বললো,

— ওই তো ঐশী এসে গিয়েছে?

সবাই একযোগে ফিরে তাকাল। সবার দৃষ্টি ওর দিকে নিবদ্ধ এটা উপলব্ধি হতেই ঐশী অপ্রস্তুত হলো বেশ। জাহানারা বেগম ত্রস্ত পায়ে উঠে এলেন। ঐশীর নিকটে এসে ওর আনত মুখটা তুলে নিলেন। হেসে বললেন,

— মাশাল্লাহ। আমার ছেলের পছন্দের তারিফ করতেই হয়। কত মিষ্টি দেখতে তুমি মা!

ঐশী লজ্জায় মাথা নুইয়ে সালাম দিল। জাহানারা সালামের জবাব দিয়ে বললেন,

— যাও মা হাত-মুখ ধুয়ে আসো। ঘেমে আছো।

— ফ্রেশ হয়ে একটা শাড়ি পরে এসো মা।

ঐশী মাথা নাড়িয়ে নিরবে প্রস্থান নিল। জোবায়দা চৌধুরী বললেন,

–আবৃতি মা?

— জি আন্টি।

— ও শাড়ি পরতে পারেনা তেমনটা। একটু হেল্প করে দিও।

— আচ্ছা আন্টি যাচ্ছি।

.

রুমে এসে হাতের এপ্রন আর ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ঐশী চাপা স্বরে চিৎকার করে উঠে। কতক্ষণ মেঝেতে লম্ফঝম্প করে হাঁপাতে হাঁপাতে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজের রক্তিম মুখটা একদৃষ্টিতে দেখে আপনমনে হাসে। নিচে মায়ের বলা কথাটা মনে হতেই ফের লজ্জায় দুহাতে মুখটা ঢেকে ফেলে। এই জন্যই বুঝি মা জরুরী তলব করে ডেকে এনেছেন? ইশ বলে দিলো তো আরো আগেই নাচতে নাচতে চলে আসত বাড়িতে। চাপা স্বরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে বিরবির করে বলে,

— ফাইনালি! ফাইনালি ডক্টর আহান খন্দকার আপনি আমার হতে চলেছেন। ইয়া আল্লাহ এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি!

অকস্মাৎ কারো হালকা কাশির আওয়াজে ঐশী আঁতকে উঠে। তড়িৎ পিছনে তাকিয়ে দেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবৃতি মিটিমিটি হাসছে।

— জি এটা সত্যি ভাবিজান।

ঐশী লজ্জায় মিইয়ে যায়। চারদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে নত শিরে মিনমিনে আওয়াজে বলে,

— আস..লে ওই আরকি?

আবৃতি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,

— এই আহান টা না একটা আস্ত খবিশ কিসিমের মানুষ। আমার এখনো বুঝে আসেনা এই রামছাগলটার প্রেমে তুমি পড়েছ কিভাবে? পড়েছ তো পড়েছ রীতিমতো দেখি হাবুডুবু খাচ্ছ।

ঐশীর গাল দুটো লাল হয়ে যায় লাজে।

— হয়েছে হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবেনা। আন্টি বলেছেন তোমাকে একটা শাড়ি পরিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে যেতে।

ঐশী নিজের হাত কচলাতে কচলাতে বললো,

— আহান আই মিন স্যার আসবেন না?

আবৃতি হো হো করে হেসে ফেলে বলে,

— আপনার প্রিয়তম রাস্তায় আছে। আসছে।

দুরুদুরু বুক নিয়ে ঐশী আলমিরা খুলে একটা নীল অরগাঞ্জা শাড়ি বের করলো। শাড়িরা দেখে আবৃতি সুর টেনে বললো,

— ও হো….নীল রঙ কার যেন প্রিয় রঙ? ঠিক মনে পড়ছেনা।

ঐশী পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে প্রসঙ্গ বদলে শুধায়,

— তোমার পছন্দের রঙ কি আপু?

— সাদা।

ঐশী তড়াক করে তাকিয়ে বললো,

— ওমা তাই নাকি? জানো ভাইয়ারও প্রিয় রঙ সাদা। ভাইয়ার রুম আর ড্রেসআপ দেখলেই বুঝবে। সবকিছুতে শুভ্রতার প্রলেপ। দেখেছ কোইনসিডেন্টলি তোমাদের অনেক কিছুই ম্যাচ করে যায়।

আবৃতি কুন্ঠায় মিইয়ে যায়। একটু আগে ছাদের দৃশ্যপট মানসপটে ভেসে উঠতেই হাসফাস করে উঠে।
শাড়িটা হাতে নিয়ে কথা ঘোরায়,

— তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি ওয়েট করছি।

— আচ্ছা আপু। পাঁচ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসছি।

শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে দিয়ে ভাল করে পিন দিয়ে সিকিউর করে নেয়। রিবন্ডিং করা চুলগুলোর খোপা ছেড়ে দিয়ে ঐশীকে আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড় করায়। আবৃতি পেছন থেকে ওর কাঁধে থুঁতনি ঠেকিয়ে আওড়াল,

— মাশাল্লাহ। কি সুন্দর মানিয়েছে রঙটা। আমার ভাই আজ মাথা ঘুরে না পড়ে যায়।

ঐশী হাসফাস করে বললো,

— উফ আপুওওও। আর লজ্জা দিও নাতো।

আবৃতি হাসতে হাসতে বললো,

— আচ্ছা আর লজ্জা দেবনা৷ একটু হালকা সেজে নাও তো। আমি আবার সাজগোজে একেবারেই অপটু।

ঐশী হালকা পাতলা মেকআপ করে নিল। শাড়িটার সাথে মিলিয়ে হাত ভরে স্টোনের সাদা চুড়ি পড়লো। হালকা বললেও সাজার কমতি সে রাখলোনা। এই দিনটা বহু অপেক্ষা আর সাধনার পরে তার জীবনে অবশেষে এসেছে।

— মাম্মাম, মাম্মাম। মামু এসেছে। কত্ত কিছু নিয়ে এসেছে জানো? এই দেখ আমার আর ওয়াফা মনির জন্যও প্রিঙ্গেলস নিয়ে এসেছে।

আবৃতি টেনে টেনে বললো,

— ওই যে আপনার প্রেমিক ওহ স্যরি আপনার স্যার এসেছেন। মনে হয় দৌঁড়ে দৌঁড়ে এসেছে। নাহয় এত অল্প সময়ে কিভাবে পৌঁছেছে। বাহ বাহ দু’জনেরই কি তাড়া।

ঐশী বিস্তর লজ্জায় আইঢাই করে। এতক্ষণ মনে যেটুকু উল্লাসে মেতেছিল সেটুকু মিলিয়ে গেল লজ্জায়। মাথা নুইয়ে লাজুক হেসে বললো,

— আপু আমার না ভীষণ লজ্জা লাগছে।

আবৃতি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিল। ও দোয়া করে প্রতিটি মেয়ের জীবনে যেন আহানদের মতো একজন সুপুরুষ আসে। কাউকে অসঙ্গী নিয়ে ঘুমরে মরতে না হয়। আবৃতি মেয়েটার আরক্তিম গালে হাত রেখে স্নেহশীল কন্ঠে বললো,

–দোয়া করি তোমার এই ঠোঁটের হাসি আর অন্তরের খুশি সারাজীবন অটুট থাকে যেন। এখন আসুন আমার ভাইকে আপনার এই অপরূপ সাজ সৌন্দর্য্যের দর্শন দিয়ে ধন্য করুন।

.

কিছুক্ষণের মধ্যেই চৌধুরী বাড়ির বসার ঘরটা সরগরম হয়ে উঠলো। সোফায় পাত্র বেশে মাথা নিচু করে বসে আসে আহান। জোবায়দা চৌধুরী আর ঐক্য এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে আর আহান ইতস্ততভাবে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছে। খানিক পূর্বে হসপিটাল থেকে তাকেও জরুরী তলব করে ডেকে পাঠানো হয়েছে। অগত্যা ইমারজেন্সি ছুটি নিয়ে ছুটে আসতে হয়েছে। ওর অনেক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আজ সকালেও কি ভেবেছিল ঐশী নামক এক আধ পাগলিকে নিজের করে পাবে? কতগুলো বছর এই মেয়েটার পাগলামো সহ্য করেছে। সেই মেডিকেলের ফার্স্ট ইয়ার থেকে মেয়েটা তার পিছু নিয়েছে। সিনিয়র থেকে শিক্ষক হলো তবুও নাছোড়বান্দা মেয়েটা পিছু হটেনি। সবশেষে আহান ও খুব বাজে ভাবে গোঁ হারা হারলো মেয়েটার ভালবাসার কাছে। আহান জানেনা ও ঐশীর মতো করে ভালবাসতে পারবে কিনা? কিন্তু আজকের পর থেকে ওর সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে ঐশীকে ভাল রাখার৷ কেননা সম্পর্কে ভালবাসার থেকে ভাল রাখাটা অধিক জরুরী। পকেটে থাকা আংটির বক্সটা আরেকবার ছুঁয়ে দেখে। এই আংটিটা আহান নিজের যৎসামান্য সেভিংস থেকে টাকা তুলে কিনেছে। আজ ঐশীকে আংটি পরিয়ে যাবে ওরা। যদিও জোবায়দা চৌধুরী ঠিক করেছিলেন সামনের শনিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে বাগদান সারবেন। কিন্তু লজ্জা শরমের তোয়াক্কা না করে আহান বললো আজই বাগদান সেরে ফেলতে। পরে আত্মীয়-স্বজনদের জানানো হবে।

— রেণু দেখ তো। ওদের হয়েছে কিনা।

রেণু উপরে উঠার আগেই দেখল। আবৃতি ঐশীকে নিয়ে নামছে।

— ওই তো আপামনি নামতাছে। খালাম্মা দেখেন কি সুন্দর দেখতে লাগতাছে আপামনিরে!

রেণুর উল্লাস ভরা গলা শুনে সবার চোখ মুহুর্তেই সিঁড়িতে নিবদ্ধ হলো। আহানের মুগ্ধ লোচন জোড়া সোজা গিয়ে স্থির হলো সেখানে। দেখলো একটা ডানা বিহীন নীল পরী শাড়ির কুঁচি সামলে ধীর কদমে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। আহান নিজের দিকে তাকাল। একটা নরমাল কালো চেইক শার্ট পরনে। ক্লান্তিতে, কাজের প্রেসারে সকালের আয়রন করা শার্টটা কুঁচকে আছে। ঐশীকে এই রূপে দেখে নিজেকে এই আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশের সাথে কেমন যেন বেখাপ্পা ঠেকলো। জাহানারা হেসে উঠে এসে ঐশীকে টেনে আহানের পাশে বসালেন। ঐশীর চোখ আপন পায়ের পাতায় নিমগ্ন। আহান দন্তপাটি দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে চারদিকে এলোমেলো নেত্রে চাইল। অন্তঃস্থল হায়হায় করে উঠলো মেয়েটার সৌন্দর্য সুধা ভালোভাবে আস্বাদন করতে না পারার হুতাশে। বড়রা আর দেরী করতে চাইলেন না। যদিও জোবায়দা চৌধুরী খানিক নারাজ ভেতরে ভেতরে। ওনার মন বলছিল আবৃতি বিয়েতে অমত করবে না। তারপর অনেক বড় করে দুই ছেলেমেয়ের বাগদান অনুষ্ঠান সারবেন। কিন্তু হবু মেয়ে জামাইয়ের আবদারটাও ফেলতে পারলেন না। ছেলেটা আজই ঐশীকে আংটি পরিয়ে রেখে যেতে যায়। ভদ্রমহিলা হাসলেন মনে মনে। ছেলেটা ভয়ে আছে তার মেয়েকে নিয়ে। কিন্তু জোবায়দা চৌধুরী যে সেটা কস্মিনকালেও করবেন না। তার মেয়ের সুখ যেথায়, তিনিও হাসিমুখে সেথায়। আর মেয়ে জীবন সঙ্গী হিসেবে নিতান্তপক্ষে যোগ্য কাউকেই বেঁচেছে। তার নাকচ করার প্রশ্নই আসেনা। আবৃতি ভাইয়ের আরেক পাশে বসে ছিল। ওর ঠিক বরাবর বিপরীত পাশে বসে ছিল ঐক্য। বাসার ড্রেসআপ চেইঞ্জ করে একটা সাদা শার্ট পরে নেমেছে। আবৃতি আবিষ্কার করলো ঠিকই ওর মতো এই লোকটারও সাদা রঙ প্রিয়। ঐকয় দুই উরুতে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বসে আছে। বাচ্চারাও মহা আনন্দে তার ফোন দেখছে আর এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে। এর মধ্যে সজ্জিত ঐশীকে দেখে ওয়াফা উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

— পাপা আজ কি ডক্টর আঙ্কেলের সাথে পিপ্পির বিয়ে?

— না মা। আজ পিপ্পির এঙ্গেইজমেন্ট। বিয়েতে এখনো দেরী আছে।

কথাটা ঠিক আহানের বুকে গিয়ে লাগল। বিয়েতে দেরী আছে মানে?

— ওয়াফা তোমার পিপ্পি যে মামুর সাথে আমাদের বাসায় চলে আসবে জানো?

ওয়াফা ভ্রু কুঁচকে শুধায়,

— কেন? আমার পিপ্পি তোমাদের বাসায় কেন যাবে?

— কারণ সে আমার মামুর বৌ হবে। আর বৌরা তার জামাইয়ের বাড়িতেই থাকে।

ঐশী লজ্জায় কাঁচুমাচু করে নড়েচড়ে উঠলো। আহান হাসতে গিয়েও নিজেকে আটকালো। আবৃতি মাথা হেট করে বসে রইল। আরশানের বিজ্ঞের ন্যায় কথা শুনে মনে হচ্ছে এই ছেলেকে এসব কথা কেউ শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। উফঃ এর হাতে আর ফোন দেওয়া যাবেনা। সব শিখেছে এই যন্ত্রটা থেকে আবৃতি নিশ্চিত। ওয়াফা এত কিছু বুঝলোনা। ক্রমশ ওর বাচ্চা আননে আঁধার ছেয়ে গেল। ঐক্য বুঝলো ওয়াফা কান্নার প্রস্তুতি নিতে চলেছে। তাই আগাম প্রতিরোধ স্বরুপ মেয়ের কানে কানে কিছু বললো। ঐক্য কি বললো কেউ শুনলো না বা বুঝলোনা৷ কিন্তু সবাই দেখলো কথাটা শোনার পর থেকেই ওয়াফার মুখটা সূর্যের আলোর ন্যায় ঝলমলিয়ে উঠেছে। চোখ বড় বড় উৎসুক স্বরে শুধায়,

— পাপা সত্যি বলছো?

ঐক্য মাথা নাড়াল। ওয়াফা ফের শুধায়?

— একদম তিন সত্যি?

— হুম মা ইনশাআল্লাহ একদম আট সত্যি। এখন আর কিছু বলোনা নাহলে সারপ্রাইজ নষ্ট হয়ে যাবে।

জোবায়দা চৌধুরী বললেন,

— আপা আংটি বদলটা সেরে নেওয়া যাক। দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে।

জাহানারা বললেন

— জি আপা। আব্বা? ঐশী মাকে আংটিটা পরিয়ে দে।

আহান নিজের পকেট হাতড়ে আংটির বক্সটা বের করলো। তার সামর্থের মধ্যে সে এটা কিনেছে। বক্সটা খুলে আংটিটা হাতে নেয়। আবৃতি ঐশীকে বললো,

— ঐশী হাতটা বাড়াও।

ঐশী কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিল। আহান স্বাভাবিক ভাবেই ওই নরম হাতটা এক হাতে আঁকড়ে ধরে আরেক হাতে ঐশীর অনামিকা আঙুলে ছোট্ট সোনার রিংটা পরিয়ে দিল। ছোট দু’জনে সাথে সাথে হাততালি দিল। ঐক্য হেসে বললো,

— দাঁড়াও এখনো কনে রয়ে গিয়েছে না। পরে হাততালি দিও।

কথাটা বলে ঐক্য নিজেও সাথে করে আনা বক্সটা জোবায়দা চৌধুরীর দিকে বাড়িয়ে দিল। জোবায়দা চৌধুরী বক্স খেলে একটা প্লাটিনামের আংটি বের করলেন। ছেলদের যেহেতু সোনা পরা হারাম। সেই হিসেবেই ঐক্য প্লাটিনাম অর্ডার করে এনেছে। জোবায়দা আংটিটা ঐশীর হাতে দিয়ে বললেন,

— এটা জামাইকে পড়িয়ে দাও।

ঐশী আংটিটা নিয়ে কাঁপা হাত বাড়িয়ে আহানের আঙুলে পরিয়ে দিল। চোখ উঁচিয়ে এক পলক আহানের দিকে চাইল। দেখলো আহানের ক্লান্ত বদনে পরিতৃপ্তির হাসি। মুগ্ধ চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে ঐশীর পেলব চেহারার আনাচে কানাচে। সবার আলহামদুলিল্লাহ ধ্বনিতে ওদের পিলে চমকে উঠলো। সহসা দু’জন দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। জোবায়দা চৌধুরী আর কাউকে বসে থাকতে দিলেন না। তাড়া দিলেন লাঞ্চের জন্য। সাথে ঐশীকে বললেন,

— আহানকে ওয়াশরুম দেখিয়ে দিতে।

ঐশী ঢোক গিলে আপনমনে বিড়বিড়ায়,

— এইরে এবার ওনাকে ফেইস কিভাবে করবে?

ঐশী আহানকে নিয়ে নিজের রুমের ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিল। আহান চুপচাপ ফ্রেশ হতে চলে গেল। বাথরুমে প্রবেশ করতেই মেয়েলি সুবাস ওর নাসারন্ধ্র ছেয়ে গেল। বুক ভরে সেই শ্বাস টেনে আপনমনে হাসলো। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখলো ঐশী বিছানায় বসে নিজের হাতটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। আহানের ঠোঁটে আলতো হাসির রেখা দেখা দেয়,

–তো মিস ঐশী হাউ ডাজ ইট ফিল ফ্রম মেডিকেল পার্টনার টু বি আ লাইফ পার্টনার?

ঐশী চমকে উঠে। দেখে বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে তার সুদর্শন হবু স্বামী। ঐশী নিজেকে ধাতস্থ করে। আহানের সুদর্শন চেহারায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মোহনীয় স্বরে উত্তর করলো,

— যেন ডক্টর আহানকে নয় গোটা পৃথিবী জিতে নিয়েছি।

আহানের কি হলো জানা নেই। হঠাৎ ছুটে এসে মেয়েটাকে ঝাপটে ধরলো। ঐশীকে দুনিয়ার সবটুকু সুখ দিয়ে ফিসফিস করে আওড়াল,

— লাভ ইউ ঐশী। লাভ ইউ সো মাচ।

খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে সবাই একটু বিশ্রামে বসলো। এই ফাঁকে ঐশী সবার জন্য নিজ হাতে ফ্রুট কাস্টার্ড বানিয়ে নিয়ে আসলো। সবাইকে দেওয়া শেষে আহানকে দিতে নিল। আহান বাটিটা নিতে নিতে দুষ্ট হেসে ঐশীর হাতটা ছুঁয়ে দিল। ঐশী চোখ দিয়ে মৃদু শাসাল। এই ছেলেটা হঠাৎ নির্লজ্জ অবতার ধারণ করলো কেন আজিব? ওয়াফা আরশান নিজেদের ড্রেস নষ্ট করে ফেলছিল। তাই আবৃতি নিজের বাটি রেখে ওদের দুজনকে খাওয়াতে বসলো। জোবায়দা চৌধুরী সেদিকে খানিক চেয়ে আলাদাভাবে জাহানারাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। ঐক্য বাইরে একটা ফোনকল রিসিভ করতে গিয়েছিল। ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই চোখে বিঁধে নয়নাভিরাম দৃশ্যটি।

.

— আপা দয়া করে আপনি আবৃতিকে একটু বুঝিয়ে বলবেন। আমার ছেলেটাকে বিয়ে করলে ঠকবেনা ও। দুনিয়ার সব ছেলে যদি একই রকম হতো তাহলে ভালবাসা নামক কোন শব্দই পৃথিবীতে অস্তিত্ব থাকতোনা।

জোবায়দা চৌধুরী ওনার হাতের উপর হাত রেখে আকুল গলায় বললেন। জাহানারা ওনাকে আশ্বস্ত করে বললেন,

— চিন্তা করবেন না আপা। মেয়ে যদি বিয়ে করতে রাজি হয়, তবে ওর জীবনসঙ্গী একমাত্র ঐক্যই হবে নিশ্চিত থাকুন।

— আপনার কথায় অনেক হালকা হলাম আপা। জানেনই তো নানারকম অসুখ শরীরে দানা বেঁধেছে। কখন উপরওয়ালা ডাক দেয় বলা যায়না। মেয়েটাকে তো আপনাদের হাওলা করে দিলাম। এবার আমার মনভাঙা ছেলেটা আর অবুঝ মা হারা নাতনিটার জন্য কাউকে চাই। ছেলেটার জীবনটা গুছিয়ে না দিয়ে যে আমি মরেও শান্তি পাব না।

বলতে বলতে গলা ধরে আসে ওনার। জাহানারা ওনাকে আগলে বলেন,

— চিন্তা করবেন না আপা। ভরসা রাখুন। আমার মেয়েটার মন খুব নরম। দেখবেন রাজি না হয়ে পারবেনা। এখন হয়তো লজ্জার কারণে চুপ আছে।

.

অবশেষে বিদায়ের পালা এলো। আহান ঐশীর বিয়ে আপাতত বছর খানেক পরে। ঐশী এমভি ভিএস ফাইনাল এক্সাম শেষ হলেই আনুষ্ঠানিক ভাবে ওদের চার হাত এক করে দেওয়া হবে। সবাই এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হলেও আহানকে একটুও খুশি দেখা গেলনা। লটকানো মুখে ও ঐক্যর পাশের সিটে বসে পড়ল। জাহানারা সবার থেকে বিদা নিয়ে নাতিকে নিয়ে পেছনের সিটে উঠে বসলেন। আরশান জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওয়াফাকে টা টা দিল। বলাবাহুল্য দু’টোতে এখন খুব গলায় গলায় ভাব লক্ষ করা যায়। আবৃতি ঐশীর সাথে আলিঙ্গন করে জেবায়দা চৌধুরীকেও আলিঙ্গন করলো। তিনি আবৃতির মুখটাতে হাত বুলিয়ে বললেন,

— আল্লাহ তোমাকে শীঘ্রই আমার ঘরের আলো করে পাঠাক মা।

আবৃতি মাথা নুইয়ে সামান্য হাসলো। তারপর ওর আঁচল ধরে থাকা ওয়াফাকে ঝুঁকে আদর করে দিল।

— সুইটি আন্টিকেও কিসি দাও মা।

ওয়াফা ঠোঁট এলিয়ে হেসে আবৃতির দুগাল ধরে টপাস টপাস করে দুটো চুমু খেল।

— আমি আসছি মা। বাই।

— বাই বাই মাম্ম..

পুরো কথাটা ওয়াফা শেষ করলোনা। আবৃতি তবুও বুঝলো ওয়াফা কি বলতে চেয়েছিল। আর তাতেই ওর হৃৎস্পন্দনের হার বৃদ্ধি পায়। গাড়িতে উঠে মায়ের পাশে চুপটি করে বসে। ঐক্য গাড়ি স্টার্ট দিলে আবৃতি চট করে জানালার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেয়। দেখে ওয়াফা কেমন ছলছল চোখে এদিকে তাকিয়ে আছে। আবৃতির মনটা কেঁদে উঠে বাচ্চাটার মুখটা দেখে। মনের দোলাচালে ঝুলতে থাকা সিদ্ধান্তটা একটু পাকাপোক্ত হয়।

চলমান…..

 

[আসসালামু আলাইকুম পাঠক। আজ অনেক বড় পর্ব দিয়েছি। আর আরেকটা কথা আমার তেমন পাঠক নেই যে পেইজটা সচল থাকবে। আপনারা যে গুটিকয়েক মানুষ আছেন তারা দয়া করে রেসপন্স করবেন। পেইজের রিচ এভাবে কমতে থাকলে তো মেটা পেইজ খেয়ে দেবে। সবাই পারলে দু’তিনটে কমেন্ট করবেন আর শেয়ার করে দেবেন।]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x