গল্প:হৃদয়ের আশ্রয়(০৭)

 পর্ব:০৭

লেখিকা:নুসরাত পুতুল

 

বাবা এক কথা না করে দিলেন,  কোথাও যাবে না ছামির,  ।

তবুও মামা আবারি বুঝালেন,

” রুমি দেখতে চাচ্ছে ওরে।  তাছাড়া  ও ছোট মানুষ,  বোন হয়েছে৷ একবার দেখবে না নিজের বোনকে?

আমি ভয়ে ভয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম

” যাই না বাবা, মায়ের কথঅ খুব  মনে পরে

অমনি বাবা দিল এক ধমক

” চুপ,  বেশি বুঝো নাকি। কোথাও যাবে না। শোনতে পাওনি?

দাদি আমাকে ঘরে নিয়ে গেল। আমায় বুঝচ্ছে মা ভালো না, অন্য কারো সাথে লাইন আছে তার।  আরও কতো কথা।

দাদির কাছ থেকে ছুটে নিজের জন্য  বরাদ্দ রুমপ এসে

সজোরে কাঁদছি  আমি।

মা চলে যাওয়ার পর বহুবার কেঁ*দেছি।  তবে এমন শব্দ  করে আজই প্রথম কাঁ*দছি

র*ক্তের টান পরছে বোধহয় আমার শরীরে, একবার ও দেখতে না পারা বোনটার প্রতি মনের দুর্বলতা কাজ করছে ইতোমধ্যে ।

ইচ্ছে  করছে ছোট ছোট হাত গুলো গিয়ে একবার ছুঁয়ে দিতে।

যখন শোনপছিলাম আমার বোন হবে, তখনই কতো স্বপ্ন  দেখতাম। বোনকে কোলে নিব, বোনের জন্য খেলনা আনব কিনে। কিন্তু  আমার কি ভাগ্য,  আজ সে বোনকে একবার দেখতেও পারছি না।

আমার কা*ন্নার শব্দে বিরক্ত  হলো নাদিম ভাই। তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

আমায় ধমকে বললেন,

” কানের কাছে ভেড়ার মতো ভ্যা ভ্যা করিস না তো ছামির। শোনতে ছাগলের ডাকের মতো লাগে।

এতো বড় ছেলে হয়ে কি না কাঁ*দতেছিস, লোকে শোনলে হাসবে।

নাদিম ভাইয়ের কথায় হিতাহিত জ্ঞান আসে আমার,

প্রখর করে দেখলাম। সত্যি আমার কা*ন্নার শব্দ টা সুন্দর  না। কিছু মানুষ কাঁদলেও মধুর মতো লাগে,আমার বেলায় তা না।

কা*ন্না থামিয়ে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াতে দেখলাম  মামা চলে যাচ্ছে,  তার হাতে মিষ্টির পেকেট নেই।

মনে পরতেই আজ হাসি পাচ্ছে,

আজব মানুষ আমার দাদি ফুফু।

যে বাড়ির মেয়েকে সংসারে রাখতে পারছে না, সে বাড়ির মিষ্টির প্যাকেট ঠিক রেখেছিল সে দিন।

আজ বিশ বছর পর এসে সত্যি হাসি পাচ্ছে,  ধিক্কার জানাই আমি আমার এমন পরিবারকে,

কল্পনার জগতে ডুবে ডুবে যখন নিজের অতীত নিয়ে ভাবছি,

ঝুমুর তখন ওড়নায় মুখের ঘাম মুছতে মুছতে গরম  পায়েসের বাটি হাতে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

” ছোট বেলায় আমার মায়ের হাতের পায়েস ছিল আমার সব থেকে প্রিয় ডেজার্ট।  মায়ের হাতে পায়েসের বাটি দেখলে মুখটা চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠত

কিন্তু আজ ২০ বছর পর বউয়ে হাতে পায়েস দেখে আনন্দ হচ্ছে  না। বরং রাগ হচ্ছে,  শক্ত গলায় বললাম,

” চেয়েছি নাকি আমি পায়েস?

ঝুমুর কেঁ’পে উঠছে

এ প্রথম এতোটা জোড়ে ধমক খেয়েছে তো। তাই দিকপাশ বুঝে উঠতে পারেনি। ঝুমুরের মুখের দিকে তাকিয়ে  মায়া হলো আমার।

কিছু বলতে যাব তার আগেই সশব্দে আমার হাতের ফোন টা বেঝে উঠেছে,

নাদিম ভাইয়ের কল।

ফোনের স্কিনে নাদিম ভাইয়ের নামটা দেখতেই আবারও মনে পরলো সে অতীতের কথা

স্কুলে যাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি,

একটা রিক্সা আসলে ভাইয়া রিক্সা ওয়ালাকে জিগ্যেস করে,

” মামা বাস স্টেশন যাবেন?

রিকশা ওয়ালা যাবে জানালে এক লাফে রিকশায় উঠে বসে ভাইয়া,

আমি তখনও ভেবলার মতো ডেবডেব করে তাকিয়ে আছি,

” কি হলো উঠে আসছিস না কেন?

” আমরা স্কুলে যাব না? বাস স্টেশন কেন যাচ্ছো?

” জাহা*ন্নামে যাব। উঠতে বলেছি উঠে আয়।  আর নয়তো তোকে ফেলেই চলে যাব আমি।  বাড়ি গিয়ে বসে থাক।

এই মামা চলেন।

বাড়ি চলে গেলে দাদি হাজারটা প্রশ্ন করবে।  তাই বললাম

” দাঁড়াও নিয়েই যাও আমাকে,

আমিও উঠে বসে পরলাম তার পাশে। মনের ভিতর খসখস করছে।  কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে? কিন্তু সাহস সঞ্চয় করে আর প্রশ্ন করা হলো না,

রিকশা ভাড়া মিটিয়ে ভাইয়া বাসে উঠলো,

রাস্তায় অনেক গাড়ি, হাতটা শক্ত  করে ধরে রেখেছে আমার।  এতোটাই শক্ত করে ধরেছে যেন র’ক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।

বাসে উঠে বসার পর যখন হাতটা ছাড়লো,

সাদা চামড়ার উপর দিয়ে দেখতে পেলাম, হাতের রং গুলো নীল হয়ে ফোলে গেছে স্বাভাবিক এর তুলনায়,

আমি চুপচাপ বাসের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখায় মন দিলাম।

গাছপালা গুলো দৌড়াচ্ছে,  যেন খুব তাড়া।

কারন ছাড়াই আনমনে হেসে উঠতেই খেলাম আরেক ধমক।

” ছাগলের মতো হাসবিনা বাসের মধ্যে।  লোকে পা*গল এর পলেব দিবে গায়,

আমার আরও এক ধাপ হাসি পেলো কেন জানি,

নাদিম ভাইয়ের কাছে আমি একটা ছাগল। তাই আমার হাসি কা*ন্না সবই তার কাছে ছাগলের মতো লাগে হয়তো।

মুখ টিপে হাসি থামালাম।

অনেক্ক্ষণ এর যাত্রা শেষে বাস এসে থামলো।

এলাকাটা আমার বহু চেনা।  কতোশতো বার এসেছি,  এ রাস্তায় হেঁটেছি বহুবার।

কিন্তু পার্থক্য একটা জায়গায়, এর আগে যতোবারই এসেছি সাথে মা ছিল।

আর আজ মা নেই।

মনে পরতেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হাটা ধরলাম।

” তোর নানির বাড়ি তো এ এলাকাতেই,  তাইনা?

” হুম।

” কোনটা তোর মামাদের ঘর?

অনেকদিন আগে এসেছিলাম।  ঠিক মনে নেই  আমার। তুই চিনিস তো?

” হ্যা চিনি। একটু সামনেই দু মিনিট লাগবে।

” কয় মিনিট লাগবে তা জিগ্যেস করছি?  চুপচাপ হাট আমার আগে আগে।

” আমরা কি মায়ের কাছে যাচ্ছি?

” না তোর নানির কাছে,

”  আমার নানি তো মা*রা গেছে অনেক আগে ।

” তাহলে আবার প্রশ্ন করছিস কেন কার কাছে। কাল তো ভেড়ার মতো কাঁ*দছিলি,  আজ যখন নিয়ে আসলাম তখন এতো প্রশ্ন কেন করছিস?

আমি আর প্রশ্ন করলাম না, গতো মাসে ছয় বছর পেরিয়ে সাত বছরে পরেছে আমার বয়স৷ মাকে ছাড়া এ কয় মাসে বয়স বেড়ে গেছে দ্বিগুণ ।  বয়সের থেকে বুঝটা বেড়েছে বেশি।

হাঁটতে হাঁটতে  এসে পৌঁছে  গেলাম মামা বাড়ি,

সবার প্রথমে মামি সামনে পরলো,

আমি সালাম দিলাম,

মামি সালামের উত্তর নিয়ে অপত্যশিত দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। যেন আমার আগমন টা ঠিক  হজম করতে পারলেন না তিনি।

” তুমি এখানে,? কাল তো তোমার বাবা ফুফু ফেরত দিয়েছে তোমার মামাকে। তা আজ কোন সরমে পাঠিয়েছে এ বাড়ি?

মামির কথার দাচ টা ঠিক কেমন যেন। অন্য  সময় আসলে মামি কোেলে তুলে নিতু। কতো আদর করতো। আর আজ এমন করে কথা বলছে যেম আমার আসাতে খুশি নয় তিনি।

আমি জবাব দেওয়ার আগে নাদিম ভাই বললো,

” মামা,খালা ওরা পাঠায়নি। ছামির কাদছিলে। তাই আমি নিয়ে এসেছি।

” নিয়ে যে এসেছ তোমার বাড়ির লোকেরা জানে তো? নাকি জানার পর আবার উল্টো দেষ চাপবে আমাদের উপর।

” ছেলে তার মায়ের কাছে এসেছে, এখানে অন্য  কারো অনুমতি নেওয়ার দরকার  মনে করি নাই আমি,

মামি মা কোথায়?

এসবের মাঝে মামা বেরিয়ে এলে।

” আরে ছামির আয় ঘরে আয়। সাথে নাদিম ভাইয়াকে ও ডাকলেন।

আমরা চলে গেলাম ভিতরে।

মা আমায় দেখে মহা খুশি।

বোনকে কোলে নিলাম,

” মা বোনের নাম রেখেছ?

মা আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

” না তুই  রেখে যা। তুই  বল কি নাম রাখব।

আমি ভাবছি, মা কি জন্য  বাইরে গেলপন একটু।কয়েক মিনওট ধরে ভেবেও যখন আমি নাম পাচ্ছিনা, তখন নাদিম ভাই এসে আমার কোল থেকে বোনকে কোলে নিতে নিতে বলল,

” ছাগলের মতো এতো ভেবে নাম বের করতে হয়?

তনিমা রেখে যা।

নামের মধ্যে একটা মায়া আছে ঠিক ছোট বাবিটার মতে।

বলতে বলতে একজোড়া রুপার নুপুর তনিমার পায়ে পরিয়ে দিল নাদিম ভাই।

আমি হা করে তাকিয়ে আছি,

মা দেখে বললো,

” নুপুর  কেন আনলে নাদিম?

” এমনি, জমানো টাকা ছিল, তাই আনলাম।

মা আর কিছু  বলল না

দুপুরে খাবার সময় মা নিজ হাতে খায়িয়ে দিয়েছে আমাকে।

বোনকে সারাক্ষণ  আমি আর নাদিম ভাই কোলে রেখেছি।

২ টা বাজতেই নাদিম ভাই তাড়া দিল।

” তারাতাড়ি কর স্কুলের সময় শেষ হয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে হবে।

আমরা সকলের থেকে বিদায় নিলাম।

বের হতে যাব তখনই মা পিছন থেকে ডেকে উঠল।

” ছামির,

চলবে ইনশাআল্লাহ


সবাই রেটিং দিয়ে কমেন্ট করবেন😾

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x