গল্প: ওহে হৃদয়ের রজনীগন্ধা (০৬)

লেখক:DRM Shohag

পর্ব ০৬

 
 

——————-

 

হিমি একবার তার সাথে চেপে দাঁড়ানো রজনীর দিকে

তাকায়,

আরেকবার তার রাগান্বিত ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায়।

রজনীর মাথায় হাত বুলায় আর হৃদয়ের উদ্দেশ্যে বলে,

“তুই এখান থেকে যা হৃদয়, মেয়েটার হাত একদম কে’টে

দিয়েছিস!”

তখন-ই হৃদয়ের পাশে এসে দাঁড়ায় হৃদয়ের বন্ধু হাস্যজ্জ্বল

হাদি। হিমির কথা শুনে বিস্ময় কণ্ঠে বলে, “কি বলো হিমি

আপু? আমার বন্ধু হৃদয় কোনো মেয়েকে মে’রে’ছে? এটা

কিভাবে সম্ভব?”

হাদিকে দেখে হিমি অবাক হয়ে বলে,

“হাদি তুই? কত্তদিন পর দেখলাম, কখন এলি?”

হাদি হেসে বলে,

“এইতো একটু আগে। কিন্তু হৃদয় মা’র’লো টা কাকে হিমি

আপু?”

 

 

 
কথাটা বলতে বলতে হাদি হৃদয়কে পিছনদিকে টেনে
 
নিয়ে
 
যেতে থাকে। রজনী ভ’য়ে ভ’য়ে ভেজা চোখজোড়া তুলে
 
হৃদয়ের অবস্থান দেখার চেষ্টা করে। হৃদয়ের সাথে
 
চোখাচোখি হয়। রজনীর বাদামি চোখের মণি দু’টো
 
চোখের পানিতে চিকচিক করছে। হৃদয়ের শ’ক্ত চোয়াল
 
মুহূর্তেই শিথিল হয়ে আসলো। এই ফাঁকে হাদিও হৃদয়কে
 
টেনে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
 
হৃদয়কে টানতে টানতে একেবারে হৃদয়ের ঘরে এনে
 
হৃদয়কে ছেড়ে দেয় হাদি। হৃদয় রে’গে হাদিকে ধাক্কা দিয়ে
 
চেঁচিয়ে বলে,

 

“কি প্রবলেম তোর?”

 

 

“হৃদম ভাই মন খারাপ কইর না। আমি ভাবিকে বলব,
 
তুমি
 
এখন থেকে কম কম বি’কি’নি পরা মেয়েদের দেখবে।”
 
“হেহে, আসলে আমি তোমার উপকার করতে চাইছিলাম
আর কি!”

 

 
হাদি পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে বহুক’ষ্টে
 
চেপে রাখা হাসি রুমাল দ্বারা আড়াল করে বলে,
 
“বিলিভ মি, মারাত্মক ল’জ্জা লাগে হৃদম ভাই।”
 

হৃদম দাঁতে দাঁত চেপে বলে

 
 
“তাহলে লাগিস কেন?”
 
 
হিমি হতাশার শ্বাস ফেলে ইশারায় রজনীকে দেখিয়ে বলে,
 
“কাকে আবার, এইযে একে। কি মিষ্টি একটা মেয়ে।”
 
 
হাদি ভ্রু কুঁচকে তাকায় রজনীর দিকে।
 
এতক্ষণ কান্নার তোড়ে রজনীর চোখমুখ লাল হয়ে আছে।
 
হাদিকে দেখে মেয়েটার কান্না থেমেছে অনেক আগেই।
 
 মেয়েটা ভেজা চোখে চেয়ে আছে হাদি নামক হৃদয়ের
 
সমবয়সী সুদর্শন পুরুষের দিকে।
 
ছেলেটার পরনে ক্রিম কালারের
 
একটি গ্যাবার্ডিন প্যান্ট, গায়ে সাদা শুতি পাঞ্জাবি জড়ানো।
 
পাঞ্জাবির ফুলহাতা কব্জি পর্যন্ত ছেড়ে রাখা। গায়ের রঙ
 
হৃদয়ের থেকে আরেকটু চাপা। গালে চাপদাঁড়ি।

এদিকে হৃদয় আবারো রজনীর দিকে তেড়ে যেতে নিলে পাশে

দাঁড়ানো হাদির কাঁধে ধাক্কা লাগে। সে বাদিকে দু’পা সরে যায়।

হৃদয় বড় বড় পায়ে এগোয় রজনীর দিকে। রজনী ভ’য়ে

হিমির

দিকে আরেকটু সিটিয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে নেয়।

মেয়েটার

ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে, এক্ষুনি

মায়ের কাছে ছুটে চলে যেতে। হিমি হৃদয়ের উদ্দেশ্যে বলে,

 
 
“হৃদয় আমি বলেছি, এখান থেকে যা তুই। মেয়েটাকে আর
 
মা’র’বি না।”
 
 
হৃদয় শুনলে তো! সে তার মতো দৃঢ় পায়ে এগোয় রজনীর
 
দিকে। পিছন থেকে হাদি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে দৌড়ে এসে
 
পিছন থেকে দু’হাতে হৃদয়কে সাপ্টে ধরে। হাঁপানো কণ্ঠে বলে,
 
 
 
 
“বন্ধু আমার। কাকে ধরে পেটাচ্ছিস! চল রুমে গিয়ে আমরা
 
দু’জন মিলে বক্সিং খেলি৷ এসব মেয়ে মানুষকে পিটিয়ে
 
আবার পোষায় না-কি! চল চল!”
 
 
হাদি পাঞ্জাবির কলার তুলে বুকে মিছেমিছি থুতু দেয়ার ভান
 
করে, বা হাতে নিজের বুকে দু’টো থা’প্প’ড় দিয়ে বলে,
 
 
“আমার প্রবলেম না-কি তোর প্রবলেম? মেয়ে মানুষকে
 
পেটাচ্ছিস! জোরা লাগানো তারগুলো নিশ্চয়ই ছিঁড়েছে?”
 
হৃদয় চেঁচিয়ে বলে,
 
 
“ওই ম্যানারলেস মেয়েটা পুরো উইদআউট ড্রেসে বাইরে
 
বেরিয়ে গিয়েছিল। তোর কোনো আইডিয়া আছে, ওকে
 
কতজন দেখেছে?”
 
হাদি এগিয়ে এসে হৃদয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, মুখটা একদম
 
হৃদয়ের সামনাসামনি নিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলে,
 
 
“ওই মেয়েটাকে কতজন দেখেছে কথা সেটা নয়, কথা হচ্ছে,
 
মেয়েটাকে উইদআউট ড্রেসে আমাদের ভার্জিন হৃদয়হরণ
 
দেখে নিয়েছে। ছ্যাঁ ছ্যাঁ ছ্যাঁ তোর তো চোখের ভার্জিনিটি পুরো
 
ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে রে হৃদয়হরণ!”
 
 
এর প্রেক্ষিতে হৃদয় হুট করে কি বলবে বুঝল না। সে বিরক্ত
 
হয়ে হাদির হাতে কফির মগটা ধরিয়ে দিয়ে গায়ে একটি শার্ট
 
জড়াতে জড়াতে গম্ভীর গলায় বলে,
 
 
“নিজের জিনিস দেখলে কখনো চোখের ভার্জিনিটি ন’ষ্ট হয়
 
না।”
 
 
হাদি হৃদয়ের আধখাওয়া কফির মগে চুমুক দিচ্ছিল, হৃদয়ের
 
কথা শুনে প্রথম চুমুকেই বেচারার কাশি উঠে যায়। হাত
 
 
ফসকে কিছুটা কফি ছিটকে এসে সাদা পাঞ্জাবিতে লাগে।
 
কিন্তু হাদির সেদিকে মন নেই। সে হৃদয়ের কথাটা হজম
 
করতে পারছে না। বা হাতে মাথায় আলতো হাতে বারকয়েক
 
থা’প্প’ড় দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।
 
 
এদিকে হৃদয় শার্ট টি পরে, মানিব্যাগ পকেটে রেখে ফোনটি
 
মাত্র হাতে নেয়। ফোনের আলো অন ছিল, সাথে ফেসবুকে
 
লগ-ইন। ফলস্বরূপ ফোন হাতে নেয়ার সাথে সাথে ফোনের
 
স্ক্রিনে ভেসে উঠল রজনীর একটি ছবি। কিছুক্ষণ আগে
 
রজনীকে ঠিক যেভাবে আধা ড্রেসে রেলকনিতে দাঁড়ানো
 
দেখেছে, সেই ছবি। একটি ছেলে, তার আইডিতে রজনীর
 
ছবিটি ডে দিয়েছে। ছবির উপর ক্যাপশন লাগানো,
 
 
‘এরকম হট মাইয়া ছাড়া শা’লা বিয়েই করমু না।’
 
 
অন্য ছেলের ডে-তে রজনীর এহেন পিক সাথে লেখাটি পড়ে
 
হৃদয়ের মাথায় আ’গু’ন জ্ব’লে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা
 
রজনীর পিকের দিকে ভস্ম করা দৃষ্টিতে তাকালো। ডান
 
হাতের
 
মুঠোয় ফোন শ’ক্ত করে ধরে বা হাত উঠিয়ে শ’ক্ত হাতে ঘাড়
 
ডলল বারকয়েক। রা’গে ফোঁসফোঁস করতে করতে ঘাড়
 
দু’দিকে নাড়ালো দু’তিনবার। এরপর হঠাৎ-ই চোখের পলকে
 
হাতের ফোন গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে।
 
 
পিছে দাঁড়ানো হাদি ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। বুকে থুতু দিয়ে হতাশ
 
কণ্ঠে বলে,
 
 
“মামা তোর চোক্খের সামনে আমার মতো একখান মিসকিন
 
থাকতে তুই ফোনডা এইভাবে খানখান করতে পারলি?”
 
হৃদয় হাদির দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে চিৎকার করে বলে,
 
“ওই রাব্বির বাচ্চার সাহস কি হয়, মেয়েটার পিক এভাবে
 
আপলোড দেয়ার?”
 
 
হাদি ভ্রু কুঁচকে বলে,
 
“সেটা তো ওই রব্বিই বলতে পারবে। ওর বাপ-বাচ্চা কেউই
 
বলতে পারবেনা।”
 
 
হৃদয় হাদির দিকে তেড়ে গেলে হাদি অসহায় কণ্ঠে বলে, “এই
 
মামা আমাকে মা’র’বি না খবরদার। আমি হাদি কিন্তু
 
মারাত্মক
 
সত্যবাদি, হু!”
 
 
ততক্ষণে হৃদয় দু’হাতের শার্টের হাতা একটানে কনুই পর্যন্ত
 
উঠিয়ে হাদিকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেছে ঘর
 
থেকে। হৃদয়কে যেতে দেখে হাদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
 
কিন্তু
 
হৃদয়ের হাবভাব তো পুরাই উল্টে গিয়ে পাল্টে গিয়েছে। সব
 
 
 
গিট্টু ওই মেয়েটার সাথে গিয়ে লাগছে। কে রে এই মেয়ে?
 
ভাবনা রেখে হাদি কফি-মগ টেবিলের উপর রেখে ঘর থেকে
 
বেরিয়ে এলো।
 
নিচে নেমে আশেপাশে কাউকে দেখল না হাদি। ডায়নিং
 
টেবিলের এক কোণায় হৃদমকে বসে থাকতে দেখে হাদি
 
এগিয়ে এসে হৃদমের পাশের চেয়ার টেনে বসে। বাড়ির
 
ভেতরে
 
আসার সময় হৃদমকে এখানেই বসে থাকতে দেখে গিয়েছে।
 
তখনই হৃদমের কাছে হৃদমের দুঃখের বাণী শুনে গিয়েছে
 
হাদি। অর্থাৎ হৃদয় হৃদমকে হৃদমের বউয়ের সামনে ফাঁসিয়ে
 
দিয়েছে।
 
বেচারা হৃদম সেই থেকে এখানে বসে হা-হুতাশ করছে।
 
 হাদি বহুক’ষ্টে নিজের হাসি চেপে রেখে দুঃখী দুঃখী মুখ করে
 
বলে,
 
 
কথাটা কানে যেতেই যেন হৃদমের মনে হলো তার মাথায় যেন
 
 
গরম কিছু ঢেলে দেয়া হলো। এমনিতেই ছোট ভাইয়ের এই
 
মিথ্যা কথায় তার বউ ফুলেফেঁপে ঘরের দরজা আটকে বসে
 
আছে। তার উপর ভাইয়ের বন্ধু এসে সেই একই কথা রিপিট
 
করছে। কু’ত্তার দল সব তাকে কিভাবে অ’প’বা’দ দিচ্ছে।
 
অতঃপর হৃদম জ্ব’ল’ন্ত চোখে হাদির দিকে তাকায়। হৃদমের
 
দৃষ্টি দেখে হাদি মেকি হেসে বলে,
 
 
হৃদম রা’গের চোটে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে,
 
 
“রাখ তোর উপকার। বে’য়া’দ’ব কু’ত্তার বন্ধু তুই আরেক
 
কু’ত্তা। শা’লা বন্ধুর প্যারা খাবো না তাই জীবনে বন্ধু দেখলেই
 
দৌড়ে পালিয়েছি। সোখানে বাচ্চার বাপ হয়ে ওই শা’লা ভাই
 
নামের কু’ত্তা আমার এক দিক দিয়ে বাঁশ দেয়, তার বন্ধুরা
 
আরেকদিক দিয়ে বাঁশ দেয়। এই আমি যে তোদের থেকে ৯
 
বছরের বড় সে খেয়াল রাখিস? এতো বড়
 
 
ভাইয়ের পিছে লাগতে তোদের এক ফোঁটাও ল’জ্জা লাগেনা
 
রে?”
 
 
হাদি একইভাবে উত্তর করে,
 
 
“কারণ আমাদের সব বন্ধুদের গরু নয়, গাধাকে চড়াতে হেব্বি
 
লাগে।”
 
কথাটা শুনে হৃদম হতভম্ব চোখে তাকালো। কিহ্! সে গাধা?
 
তার ভাই আর তার বন্ধুরা তাকে গাধা ভাবে? এই ছিল
 
কপালে? হৃদম রাগান্বিত স্বরে বলে, “শা’লা তোদের কারো
 
কপালে বউ জুটবে না দেখিস। কু’ত্তার দল সব। বা’লের
 
বাড়িতে আর আসবোই না।”
 
কথাগুলো বলে হৃদম রা’গে গজগজ করতে করতে বাড়ি
 
থেকে বেরিয়ে যায়। হাদি এবার মুখ থেকে রুমাল সরিয়ে শব্দ
 
করে হেসে দেয়। উফ! এই বাড়ি বিনোদনের একটা আস্তানা।

_______________

 
 
হৃদয় তাদের বাড়ির ঠিক সামনে বরাবর তিনটে বাড়ি পাড়ে
 
 
একটি বাড়ির মেইন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে দারোয়ানের

 

উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে, “চাচা বাড়ির মালিকের ছেলে
 
রাব্বিকে ডেকে দিন তো।”

 

 
 
আধবয়সী লোক হৃদয়কে খুব ভালোভাবেই চেনে। শুধু
 
সে
 
না, এই রংপুর জেলার পুরো এলাকা জুড়ে প্রায় সকলেই
 
হৃদয়কে চেনে হৃদয়ের বাবার সুবাদে। হৃদয়ের বাবা
 
আজাদ নওরোজ একসময় এই এলাকার বিএনপির
 
এমপি ছিল। সামনের ইলেকশনে আবারও এই জেলা
 
থেকে ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছে। এজন্যই আজাদ নওরোজ
 
এর পাশাপাশি হৃদয় নওরোজকে চেনেনা এমন মানুষ খুব
 
কম আছে। গেটের দারোয়ান হৃদয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
 
“ভেতরে যাও বাবা। রাব্বি বাড়িতেই আছে।”
 

হৃদয় বিরক্তি নিয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,

 
 
“আমি কারো বাড়ি আপ্যায়ন নিতে আসিনি। আপনি
 
রাব্বিকে ডেকে দিন। বলবেন আমি আর্জেন্ট ডাকছি।
 
এক
সেকেন্ডও যেন লেট না করে।”
ভদ্রলোক আর কথা বাড়ালেন না। হৃদয়ের খিটখিটে
 
মে’জা’জে বলা কথা মেনে সে ভেতরে যেতে যেতে বেশ
 
কয়েকবার হৃদয়ের দিকে তাকালো। হৃদয়ের চোখ দু’টো লাল
 
হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে হৃদয় রে’গে আছে। কথাগুলোও
 
কিভাবে যেন বলল! আবার ভাবলো, হৃদয়কে সবসময়
 
দেখতে একইরকমই লাগে। কথাবার্তা-ও এরকমই। তাই
 
ভদ্রলোক খুব বেশি মাথা ঘামালেন না। তিনি ভেতরে চলে
 
গেলেন রাব্বিকে ডাকতে।

 

হৃদয়ের বা হাতে চেয়ারের ভাঙা পায়া, যেটি আসার সমনে
 
বাগানের পাশ থেকে তুলে এনেছে। একটি দিয়ে রজনীকে
 
লজেন্স নামক মা’র দিয়েছে, আরেকটি পায়া রাব্বিকে
 
শায়েস্তা করতে এনেছে। চেয়ারের পায়াটি রাস্তায় ঠেকিয়ে
 
রেখে ঘোরাতে ঘোরাতে অতি বিরক্তির সাথে রাব্বির জন্য
 
অপেক্ষা করতে লাগলো। শ’ক্ত চোয়ালে ঘেরা কঠিন দৃষ্টি
 
এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে।
 
 
দু’মিনিটের মাথায় রাব্বি হতদন্ত পায়ে বেরিয়ে আসে
 
বাড়ি
 
থেকে। ছেলেটার বয়স এবার ২৩। একে তো হৃদয়ের
 
বাবার নামডাক আছে এই এলাকায়, তার উপর হৃদয়
 
এলাকার বড় ভাই। ছেলেটা হৃদয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে
 
 
ভদ্রতাসূচক সালাম দেয়, “আসসালামু-আলাইকুম ভাই।”
 
 
হৃদয় ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকায় রাব্বির দিকে। মুহূর্তেই চোয়াল
 
শ’ক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে সালাম এর উত্তর নিয়ে বলে,
“বাইরে এসো। ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে।”
 
 
কথাটা বলে হৃদয় উল্টোঘুরে এগোয়। রাব্বি নিরবে হৃদয়ের
 
পিছু পিছু যায়। হৃদয়ের হাতে লাঠির মতো কিছু দেখে
 
ছেলেটার কপালে ভাঁজ পড়ে। সে ঢোক গিলে হৃদয়ের
 
উদ্দেশ্যে বলে,
 
 
“ভাই কিছু বলব…..
 
রাব্বি তার কথা শেষ করতে পারেনা। তার মাঝেই হঠাৎ-ই
 
হৃদয় ঝড়ের বেগে উল্টো ঘুরে ডানহাতে রাব্বির শার্টের
 
কলার
ধরে টেনে ছেলেটাকে তার সামনে এনে বা হাতের চেয়ারের
 
পায়া দ্বারা রাব্বির বাম গালসহ মাথায় জোরেসোরে
 
জোরেসোরে একটা আ’ঘা’ত করে। রাব্বি
 
 
এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বেচারা এক বারি
 
খেয়ে কয়েক হাত দূরে সরে গিয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে
 
যায়। সোজা হয়ে হৃদয়ের দিকে তাকানোর আগেই হৃদয়
 
বাম পা তুলে রাব্বির বুক বরাবর একটা লাথি মা’রে।
 
রাব্বি পাকা রাস্তায় একেবারে শুয়ে পড়ে ব্য’থায়
 
আ’র্ত’না’দ করে ওঠে।

 

 

হৃদয়ের চোখ দিয়ে আ’গু’ন জ্ব’ল’ছে মনে হলো। সে বা
 
 
হাতের চেয়ারের পায়া সামান্য উপরে উঠিয়ে আবারও
 
 
ধরে নিয়ে রাব্বির দিকে এগোতে এগোতে হুংকার ছেড়ে

 

বলে,

 

 

 

“কি বলছিলি যেন? হট মেয়ে লাগবে তোর তাইনা?”

 

রাব্বি তার দু’র্বল শরীর কোনোরকমে তুলে বসে বসেই

 

পিছনদিকে সরে যায় আর কম্পন কণ্ঠে বলে, “ন.ন না

 

ভাই।”

 
 
হৃদয় হাতের চেয়ারের পায়া দিয়ে রাব্বির মুখসহ মাথা
 
বরাবর আরেকবার আ’ঘা’ত করে।
 
রাব্বি উল্টে পড়ে। মুখ
 
থেকে একদলা র’ক্ত বেরিয়ে রাস্তায় পড়ে। ছেলেটা তবুও
 
নিজেকে সামলে পিছনদিকে সরতে সরতে হৃদয়ের দিকে
 
চেয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
 
“ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। আমি কি করছি ভা….
কথার মাঝেই হৃদয় রাব্বির মাথায় আরেকটা আ’ঘা’ত
 
করে। এরপর সাথে সাথে বাম পা দ্বারা বুক বরাবর
 
আরেকটি লাথি মে’রে রাব্বিকে আবারো শুইয়ে দেয়।
 
এরপর বা পা এগিয়ে এনে রাব্বির গলায় পাড়া দিয়ে
 
রাগান্বিত স্বরে বলে,
 
“হট মেয়ে দিব তোকে, তার আগে আমার ডোজ নে।
 
ডোজ ছাড়া হট মেয়ে পাবিনা।”
 
রাব্বির মুখ মাথা ফেটে র’ক্তা’ক্ত হয়ে গেছে। ছেলেটা
 
ছটফট করতে করতে থেমে থেমে আওড়ায়, “না না,
 
আমার হট মেয়ে লাগবে না। আমার ঠান্ডা মেয়ে হলেই
 
হবে। আমাকে আর মাইরেন না।”
 
ছেলেটার কথা অস্পষ্ট, তাই সেভাবে শোনা গেল না। আর
 
না তো হৃদয় রাব্বির গলা থেকে পা সরালো। মনে হচ্ছে
 
আজ একে না মে’রে হৃদয় দম নিবেনা।
 
আশেপাশের অনেকে বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে হৃদয়
 
আর রাব্বির দিকে। কেউ এগিয়ে আসছে না৷ ওই যে
 
হৃদয়ের বাবার নামডাক অনেক। কারো সাহস নেই
 
হৃদয়কে কিছু বলার। সবাই কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে
 
ছেলেটার শোচনীয় অবস্থা।
ওদিকে হিমি রজনীর হাতে মলম দিয়ে রজনীকে কিছু
 
খাবার দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রজনী আবারও
 
বেলকনিতে এসেছিল। তখন ঠিকঠাক দেখতে পারেনি।
 
জায়গাটি তার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু বেলকনিতে
 
আসার পর চোখে পড়ে হৃদয় একজন নিরীহ ছেলেকে
 
কতটা নি’র্ম’মভাবে মা’র’ছে। মেয়েটা ভ’য়ে শ্বাস নিতে
 
ভুলে গেছে। চোখ দু’টো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে। দু’হাতে
 
মুখ চেপে ধরে এতক্ষণ হৃদয়ের নি’র্দয় আচরণ দেখলেও
 
শেষবার গলায় পাড়া দেয়ার ব্যাপারটি সে আর দেখার
 
পেল না। মেয়েটা ভ’য়ে কাঁপতে কাঁপতে একদৌড়ে
 
বেলকনি থেকে ঘরে চলে আসে। এরপর ঠাস করে
 
বেলকনির দরজা লাগিয়ে দেয়। সে কাউকে এভাবে মা’র
 
খাওয়া নিজের চোখের সামনে তো দূর, সিনেমাতেও
 
দেখেনি। অতিরিক্ত ভ’য়ে মেয়েটা কেঁদে ফেলে। দরজার
 
সাথে হেলান দিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে,
“আব্বা এই বাড়ির ছেলে গু’ন্ডা। আমারে নিয়ে যাও
 
এইখান থেকে।”

 

___________________

 
 
বেলা অনেক বেড়েছে। কিন্তু রজনীর বাবা মায়ের উনুনে
 
আজ আর আ’গু’ন জ্ব’লে নি। গতরাত থেকে তারা
 
মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছেনা। ঘরে শান্তি নেই। কি করে মুখে
 
ভাত তুলবে? তাদের সহজ সরল মেয়েটা রাত থেকে নেই।
 
মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল? গতরাত থেকে সারাগ্রাম
 
খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও পায়নি। রজনীর মা ঘরের দুয়ারে
 
বসে একটু পর পর শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছছে।
 
মেয়েটাকে ছাড়া এক বেলা তো দূর, এক ঘণ্টাও কখনো
 
থাকেনি। সেখানে কাল রাত থেকে কত ঘণ্টা হয়ে গেল,
 
সে তার মেয়ের কোনো খোঁজ জানেনা। ভদ্রমহিলা
 
নিজেকে সামলাতে পারেনা। থেকে থেকে ফুঁপিয়ে ওঠে
 
তার নারী ছেড়া প্রথম ধন রজনীর জন্য। ভদ্রমহিলা
 
একপর্যায়ে ভাঙা গলায় বলেন,
 
 
“ওই চেয়ারম্যান এর পোলা ভালো না, আমি তোমারে
 
কইছিলাম। তুমি শোনোনি। আমার মাইয়ার জীবন ধ্বং’স
 
কইরা দেয়ার জন্য কতকি করলা। শেষমেষ আমি আমার
 
মাইয়াটারে হারায়া ফেললাম। আমার মাইয়ারে আমার
 
আঁচলে আইনা দাও রজনীর আব্বা।”
উঠানের এক কোণায় রজনীর বাবা বসে আছে।
 
পরনে একটি
 
সেন্ডোগেঞ্জি। গলায় গামছা ঝোলানো। অন্যদিন হলে আরও
 
ঘণ্টা তিন আগে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে যেত। কিন্তু আজ
 
মেয়েকে
 
হারিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই দিশেহারা। ভদ্রলোক বউয়ের
 
কথা শুনে নিজেও দাম আটকে বসে থাকে। গতরাত থেকে
 
আজ সকাল পর্যন্ত রিয়াদের নামে অনেককিছু শুনছে,
 
দেখছে। রজনী পালানোর পর সব বুঝেছে। কিন্তু ততক্ষণে যে
 
দেরি হইয়া গেল। তার রজনী মা যে হারায় গেল। ভদ্রলোক
 
অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,
 
 
“আমি মেলা বড়ো ভুল করছি। আমি আর আমার মাইয়ারে
 
বড়লোক পোলার সাথে বিয়া দিমুনা গো রজনীর মা। ওরে
 
আমি কোনো কৃষক নয়তো আমার মতো ভ্যানওয়ালার সাথে
 
 
বিয়া দিমু। আমার ঘরের কোণে রাখমু। আমি আর লোভ
 
করমু না। আমার রজনী মা কই হারাইলি তুই? ফিরা আয়।
 
আমি তোর সব কথা শুনমু মা।”
 
 
হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠে রজনীর বাবার কান সজাগ হয়। সে দ্রুত
 
উঠানের সাথে লাগানো কাঁচা রাস্তায় নজর করলে নীতিক
 
চোখে পড়ে, যে কথা বলতে বলতে এদিকে আসছে। রজনীর
 
বাবা এক সেকেন্ড-ও দেরি না করে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে
 
নীতি আর নিলয়ের সামনে দাঁড়ায়। নীতির সামনে দাঁড়িয়ে
 
দু’হাত জমা করে আকুতির স্বরে বলে,
 
 
“মা তুমি জানো, আমার রজনী কই?
 
তুমি জানলে আমারে কইয়া দাও মা।
 
আমার রজনীটারে সারাগ্রামের কোথাও পাইলাম না।
 
 তুমি জাইনা থাকলে আমাকে কইয়া দাও আমার রজনী কই।
 
আমি আমার মাইয়াটারে ছাড়া থাকবার পাইনা।”
রজনীর বাবাকে নিলয় অতটা না চিনলেও নীতি খুব ভালো
 
করেই চিনল। রজনীকে সারারাতেও কোথায় পায়নি শুনে
 
নীতি বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। চিন্তা হয় মেয়েটার। রজনী এই
 
গ্রামে না থাকলে কোথায় চলে গেছে? নীতি ঢোক গিলে বলে,
 
 
“চাচা আমি তো জানিনা ও কোথায়। আমার ওর সাথে
 
আর কথা হয়না।”
 
 
রজনীর বাবা হতাশ চোখে চাইলো৷ চোখের কোণ ভেজা।
 
 
নিলয় ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। এই রজনী মেয়েটার সাথেই
 
রিয়াদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল না? সে তো তাই জানে।
 
মেয়েটা তো পালিয়েছে।
 
কিন্তু এই মেয়েকে নীতি কিভাবে চেনে নিলয় বুঝল না।
 
 
রজনীর বাবা নীতির কাছে আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে ধীরে
 
ধীরে উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করে।
নিলয় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “রজনী মেয়েটাকে তুই
 
চিনিস?”
 
নীতি মৃদুস্বরে বলে,
 

“চিনি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল।”

“ছিল? এখন নেই?”

নীতির ছোট উত্তর, “না।”

নিলয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”

নীতি মলিন গলায় বলে,

“জানিনা তো। হঠাৎ একদিন রজনী আমাকে এসে বলল, তুই

চেয়ারম্যান এর মেয়ে। আমি ভ্যানচালকের মেয়ে৷ আমরা বন্ধু

পাতলে লোকে মন্দ বলবে। তারপর থেকে ও আর আমার

সাথে কথা বলেনা।”

নিলয় একটু ভেবে বলে,

“যদিও, ও যেটা বলেছে, সেটা ঠিক নয়। কিন্তু তুই ভবিষ্যতেও

আর ওর সাথে মিশবি না। ভালো ঘরের মেয়েরা কখনো বাড়ি

থেকে পালায় না। যদি আলগা পিরিত দেখিয়ে ওই মেয়ের

সাথে ঘুরেছিস, তবে ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”

নীতির মলিন মুখখানা আরও মলিন হলো। সে হ্যাঁ না কিছুই

বলল না। ভেতর থেকে শুধু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

এদিকে রজনীর বাবা হাঁটছিল তো হাঁটছিল-ই। হঠাৎই পিছন

থেকে রিয়াদ তেড়ে এসে রজনীর বাবার গেঞ্জি টেনে ধরে

ভদ্রলোককে তার দিকে ফিরিয়ে চিৎকার করে বলে,

“কু’ত্তার বাচ্চা, তুই জানিস না আমার রজনী কই? তুই

কিভাবে ভাবলি, তুই মিথ্যা কথা বানাইয়া আমার ভাইবোনরে

শুনাইলেই আমি গলে যাবো? সত্যি করে বল, আমার

রজনীকে কই লুকাইছিস? নয়তো তোরে গে’ড়ে দেব একদম।”

আচমকা রিয়াদের আক্রমণে রজনীর বাবা থরথর করে

কাঁপতে থাকে। ওদিকে নিলয় আর নীতি হতভম্ব চোখে চেয়ে

আছে। রিয়াদ রজনীর বাবাকে চুপ দেখে আবারও চিৎকার

করে বলে,

“কিরে ক, রজনীকে কই লুকায় রাখলি? বউ বাচ্চার প্রাণের

মায়া নাই? এতোবার সাবধান করার পরও তোর মেয়ে

পালাইছে, আমারে বিশ্বাস করতে কস? তোরে তো….

কথাটা বলতে বলতে রিয়াদ মুষ্টিবদ্ধ ডানহাত তোলে রজনীর

বাবাকে মা’রার জন্য। কিন্তু তার আগেই নিলয় দৌড়ে এসে

রিয়াদকে একটা ধাক্কা মে’রে রজনীর বাবার থেকে তাকে দূরে

সরিয়ে দেয়৷ নিলয়ের শ’ক্ত ধাক্কা খেয়ে রিয়াদ কয়েকপা

পিছিয়ে যায়। সে কিছু বলার আগেই নিলয় রাগান্বিত স্বরে

বলে,

“খবরদার এগোবিনা রিয়াদ। তোর মাথায় কি প্রবলেম? উনি

আমাদের থেকে বয়সে কত বড়! দেখেছিস? কোন আঙ্কেলে

এতো গুরুজন একজন ব্যক্তির সাথে এরকম বিহেভ

করছিস?”

রিয়াদ তেড়ে এসে নিলয়ের গালে শ’ক্ত থা’প্প’ড় মে’রে

রাগান্বিত স্বরে বলে,

“সুশীলের বাচ্চা, শহরে পড়ে তুমি বেশি সুশীল হইছ তাইনা?

আর তাই ভাইয়ের পক্ষ না নিয়ে একটা ভ্যানওয়ালার পক্ষ

নাও।”

নিলয় জ্ব’ল’ন্ত চোখে রিয়াদের দিকে তাকায়। একে তো

রিয়াদের উচ্ছৃঙ্খল বিহেভ সাথে তাকে মা’রা থা’প্প’ড়

কোনোটাই হজম হলো না। সে কয়েক সেকেন্ড শান্ত নদীর

ন্যায় রিয়াদকে দেখল, এরপর হঠাৎ-ই রিয়াদের উপর ঝাঁপিয়ে

পড়ে রিয়াদকে মাটিতে ফেলে সমানে রিয়াদের নাক বরাবর

ঘু’ষি মা’র’তে থাকে। রাগান্বিত স্বরে বলে,

“শা’লা জা’নো’য়া’র, তোর বাপ তোকে শিক্ষা দিতে পারেনি

বলে আমাকে সুশীল বলে গা’লি দেস? তোর সাহস তো কম

না! আমি সুশীল সুশীলদের জন্য। তোর মতো প’শুর জন্য

আমি বিন্দুমাত্র সুশীল না। খাড়া তোরে প্রমাণ দেখাই।”

কথাগুলো বলতে বলতে রিয়াদের মুখে সমানে ঘু’ষি মা’র’তে

থাকে নিলয়। রিয়াদের নাকমুখ দিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে।

দু’ভাইয়ের এই অবস্থায় রাস্তায় অনেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু

কেউ এগোনোর সাহস পায়না। দু’জনেই তো চেয়ারম্যান

বাড়ির পোলা। তাদের দিকে পা বাড়ানোর সাহস এই গ্রামের

কার আছে? এদিকে নীতি নিজের ভাইকে এভাবে মা’র খেতে

দেখে প্রায় কেঁদে দিয়েছে। দৌড়ে এসে নিলয়কে ঠেলতে ঠেলতে বলে,

“নিলয় ভাই, আমার ভাইকে ছাড়ো। নিলয় ভাই ছাড়ো রিয়াদ

ভাইয়াকে। আর মাইরো না। এভাবে মা’র’লে ও তো ম’রে যাবে!”

নিলয়ের দু’চোখ বেয়ে যেন আ’গু’ন ঝরছে। সে নীতির

কথাগুলো বোধয় শুনলো না। নীতি না পেরে নিলয়কে

আটকানোর জন্য দু’হাত এগিয়ে দেয় নিলয়কে থামানোর

জন্য। আর তখনই নিলয়ের দু’টো ঘুষি এসে লাগে নীতির

হাতে। মেয়েটার মনে হলো, জীবন বে’র হয়ে গেছে। সে তীব্র

আ’র্ত’নাদ করে ওঠে। এ পর্যায়ে নিলয় থেমে গিয়ে নীতির

দিকে তাকায়। বা হাতে নীতির গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে

বলে,

“এই অ’জাতের বাচ্চার জন্য এতো দরদ দেখাস? মা’র

একটাও মাটিতে পরবে না নীতি। যা এখান থেকে।”

কথাটা বলে নীতিকে একটা ধাক্কা দেয়। সাথে সাথে রিয়াদ

সুযোগ পেয়ে উঠে পর পর তিনটে ঘুষি মে’রে দেয় নিলয়ের

মুখে। নিলয় পিছনদিকে উল্টে পড়ে যায়। নীতি দু’হাতে মুখ

চেপে ধরে। কি হচ্ছে এসব? তার মাথা ভনভন করে ঘুরছে।

রিয়াদ নিলয়ের উপর থেকে উঠে ডান হাতে র’ক্তমাখা মুখ

মুছে সে-সহ নীতির হাত ধরে দাঁড়িয়ে নিলয়ের উদ্দেশ্যে বলে,

“আমার বোন আমার জন্য ভাববে না-কি তোর মতো ফা’ল’তু

সুশীল এর কথা ভাববে? তোর শহরে তুই যা। তোর সাথে

আমার বোন কোথাও যাবে না। এই গ্রামে বহুত ভালো কলেজ

আছে। ওরে আমি এইখানেই ভর্তি করাবো।”

কথাটা বলে রিয়াদ নীতির হাত ধরে বাড়ির দিকে পথ ধরলে

নিলয় সাথে সাথে উঠে এসে নীতির সামনে দাঁড়ায়। শ’ক্ত

গলায় বলে,

“নীতি হাত ছাড় ওই জা’নো’য়া’রের। তুই আমার সাথে যাবি।”

নীতি মাথা নিচু করে ফোঁপাচ্ছে। রিয়াদ চেঁচিয়ে বলে, “আমি

বললাম না, ও তোর সাথে কোথাও যাবে না। ওর বড় ভাই যা

সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই হবে।”

নিলয় রিয়াদের দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“আমি তোর সাথে কথা বলছি না। নীতি তোর মতো

অ’জাতের বাচ্চার কথা মানে না-কি আমার কথা মানে সেটাই

জানতে চাইছি। তুই এর মাঝে কথা বলবি না।”

রিয়াদ ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলয়ের দিকে চেয়ে নীতির

উদ্দেশ্যে বলে,

“নীতি ওকে বলে দে, তুই তোর বড় ভাইয়ের কথা কখনো

অমান্য করিস না।”

নিলয় রিয়াদকে মা’রার জন্য হাত মুঠো করল, কিন্তু নিজের

ইচ্ছেকে আপাতত চাপা দিল। এখন সে নীতিকে নিয়ে এখান

থেকে চলে যেতে চায়। আর তাই ঝামেলা বাড়াতে চাইলো না৷

এজন্য শেষে রিয়াদের হাতে মা’র খেয়েও রিয়াদকে কিছু

বলেনি৷ সে নীতির উদ্দেশ্যে ধমকের সুরে বলে, “নীতি আসবি

তুই?”

নীতি মাথা তুলল না। সে বহুক’ষ্টে নিজের ফোঁপানি থামিয়ে

থেমে থেমে বলে,

“আমি গ্রামেই পড়ব নিলয় ভাই, তুমি শহরে যাও।”

কথাটা বলতে দেরি হলেও নিলয়ের শ’ক্ত থা’প্প’ড় নীতির ডান

গালে পড়তে দেরি হয়নি। নীতি রিয়াদ কেউই প্রস্তুত ছিল না

এটার জন্য। ফলস্বরূপ নীতির হাত ভাইয়ের হাত থেকে ছুটে

গিয়ে সে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নিলয় তাকে সারাজীবন

জ্বালিয়ে এসেছে, কিন্তু আজকেই প্রথম এভাবে মা’রলো।

দুঃ’খে অভিমানে মেয়েটার দু’চোখ বেয়ে জল গড়ায়।

নিলয় নীতির দিকে জ্ব’ল’ন্ত চোখে চেয়ে রা’গে ফুঁসতে ফুঁসতে

বলে,

“বে’ঈ’মা’ন কোথাকার! আমার বাপ মায়ের বাড়ি তো আমি

আসবোই। কিন্তু তোকে যদি আমার সামনে দেখেছি, তবে

তোকে নিজ হাতে খু’ন করে যমুনায় ভাসিয়ে দিয়ে আসবো।

নিলয় পাটোয়ারীকে চিনবি এবার।”

কথাগুলো বলে নিলয় আর এখানে দাঁড়ায় না। হনহন করে

উল্টোপথে এগিয়ে যায়। রিয়াদ নিলয়কে মা’রতে গিয়েও

এগোলো না। দ্রুত নীতির কাছে হাঁটুগেড়ে বসে নীতিকে

আগলে নেয়। নিলয়ের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে,

“তোর কপালে অনেক দুঃ’খ আছে নিলয়। আমার আর

আমার বোনের সাথে কাজটা করে তুই ভালো করলি না।”

নীতি ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ফোঁপায়। সে জানে তার ভাই

মানুষ ভালো নয়। এর জন্য তার দুঃ’খ-ও হয়। কিন্তু তার

খাতায় ভাই হিসেবে রিয়াদকে সে পিছিয়ে রাখতে পারবে না।

তার ভাই তাকে ছোট থেকেই খুব আদর যত্ন করে। সে তার

ভাইয়ের মুখের উপর কি করে না করবে? সেই সাহস বা শ’ক্তি

কোনোটাই তার নেই। কিন্তু নিলয় ভাই? তাকে শহরে নিয়ে

যাওয়ার জন্য নিলয় ভাই অনেক চেষ্টা করেছে, সে জানে।

তারও খুব শখ ছিল শহরের কলেজে পড়ার। কিন্তু হঠাৎ কি

থেকে কি হয়ে গেল! নিলয় ভাই কি তার সাথে আর কখনো

কথা বলবে না?

 

__________________

হৃদয় বাইরে থেকে এসে শাওয়ার নিয়ে সকালের নাস্তা করতে

ডাইনিং টেবিলে বসেছে। পরনে একটি নেভিব্লু রঙের প্যান্ট।

শরীর উদাম। মনোযোগ দিয়ে পাস্তা খেতে ব্যস্ত সে। টেবিলের

একপাশে আরমান নওরোজ, আরেকপাশে হাদি।

হাদি নাস্তা করেছে, সে চুপচাপ ফোন ঘাটছে৷ আর হৃদয় আর

তার দাদু একসাথে নাস্তা করছে।

হঠাৎ-ই বাইরে থেকে হৃদয়ের বাবা আজাদ নওরোজ হনহন

করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে সরাসরি এসে বাবার পাশে

দাঁড়িয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“বাবা তোমার ছোট নাতিকে কিছু বলো। ও সামনের বাড়ির

ছেলেকে এতো বা’জেভাবে পিটিয়ে এসেছে। ছেলেটা মৃ’ত্যুর

সাথে লড়াই করছে। ইলেকশনের আগে এরকম করলে

আমাকে কে ভোট দিবে বলো?”

ছেলের কথায় আরমান নওরোজের কপালে ভাঁজ পড়ে।

সামনে বসা ছোট নাতির দিকে তাকায় সে। যে মনোযোগ দিয়ে

খাবার খাওয়ায় ব্যস্ত। যেন এখানের কোনো কথা সে শুনতে

পায়নি। আরমান নওরোজ গলা ঝেড়ে বলে,

“হৃদয় দাদুভাই, এসব কি শুনছি আমি?”

হৃদয় তাকালো না দাদুর দিকে। সে মাথা নিচু রেখেই উত্তর

দিল,

“তোমার ছেলের চামচিকা আমার বউয়ের দিকে কু’নজর

দিয়েছিল। তাই একটা প্লেন নাপার ডোজ দিয়েছি।”

কথাটা আজাদ নওরোজ স্বাভাবিকভাবে নিলেও আরমান

নওরোজ আর হাদি নিল না। হাদির বিস্ময়ের পরিমাণ

মারাত্মক। বেচারা এতো অদ্ভুদভাবে তাকালো হৃদয়ের দিকে,

যেন এই ইহজীবনে এমন কথা সে দু’টো শোনেনি।

আরেকদিকে আরমান নওরোজ তো জানেই, সে ইচ্ছে করে

মিথ্যা বলে রজনীকে হৃদয়ের বউ বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু হৃদয়

সেটা এতো সহজে মেনে নিল কেন? আবার বলছে, মেয়েটার

জন্য না-কি একজনকে পিটিয়েও এসেছে। ভদ্রলোক গলা নিচু

করে চোখ ছোট ছোট করে বলে,

“তুমি বিয়ে কবে করলে দাদুভাই?”

হৃদয় প্লেটে বিদ্যমান শেষ পাস্তাটুকু মুখে পুড়ে নিয়ে দাদুর

দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে চেয়ে পাস্তাগুলো গিলে একগ্লাস পানি

খেয়ে নেয়। এরপর তার দাদুর দিকে এগিয়ে গিয়ে গলা

নামিয়ে বলে,

“তুমি আমার বিয়ে দিয়ে তুমিই আমার বউয়ের কথা ভুলে

গেলে? দিস ইজ নট ফেয়ার দাদু! অবশ্য বা’স’র ছাড়া বিয়ে

হয়েছে তো, তাই তুমি মনে রাখতে পারছ না, আমি বুঝেছি।

চিন্তা নেই, বিয়ে আমার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হলেও বা’স’রটা খুব

ধুমধাম করেই হবে। আর তুমি আমার বাচ্চার বড় আব্বুও খুব

জাঁকজমকপূর্ণভাবেই হবে।”

নাতির কথায় আরমান নওরোজ কেশে ওঠে। খুব বুঝল তার

এই ধুরন্ধর নাতি তার কাটা তুলে তাকেই ফুটিয়ে দিচ্ছে। সে

গলা ঝেড়ে বলে,

“খবরদার বিয়ে ছাড়া রজনী দিদিভাইকে একদম টাচ করবে

না।”

হৃদয়ের ভাবলেশহীন উত্তর,

“স্যরি দাদু! আমি একবারের বেশি বিয়ে করিনা।”

আরমান নওরোজ হতভম্ব হয়ে আওয়াজ করে চেঁচিয়ে ওঠে,

“কিহহ্?”

এতোক্ষণ দাদু নাতির ফুসুরফাসুর হাদি বা আজাদ নওরোজ

কেউ শুনতে পায়নি, কিন্তু আরমান নওরোজকে এভাবে

চেঁচাতে দেখে দু’জনেই ভ্রু কুঁচকে তাকায় ভদ্রলোকটির

দিকে।

হৃদয় পাত্তা দিল না। সে চেয়ার থেকে উঠে বাবার সামনে

দাঁড়িয়ে বাবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে,

“এসব টোকাই দল করে ভোট পাওয়ার চেয়ে ভিক্ষা করে

খান। আই থিংক, ওতেই আপনাকে ভালো মানাবে। থালা শর্ট

পড়লে আমাকে বলবেন, একটা না, দশটা থালা কিনে দিব

আপনাকে।”

আজাদ নওরোজ রাগান্বিত স্বরে বলেন,

“ভাষা সংযত কর হৃদয়।”

হৃদয় উত্তর করল না। সে আজাদ নওরোজকে পাশ কাটিয়ে

বেসিনে গিয়ে হাত মুখে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিয়ে ঘরে যাওয়ার

জন্য সিঁড়ির দিকে এগোলো।

আজাদ নওরোজ রা’গে ফুঁসতে ফুঁসতে তার ঘরের দিকে

গেলেন। ক্ষমতায় আ’ঘা’ত লাগলে মাথা গরম হয়ে যায়। আর

এদিকে রাজনীতির টপিক নিয়ে কথা হলেই হৃদয় তার সাথে

এভাবে খোঁচা মে’রে কথা বলে। তাতে আজাদ নওরোজ

আরও তেঁতে ওঠে।

আরমান নওরোজ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। বেচারা

ছেলের ভোট নিয়ে নয়, নাতির কারবার নিয়ে চিন্তিত। এ

ছেলের যা চালচলন, এ যদি বিয়ে ছাড়াই রজনীর সাথে কিছু

করে তবে তার মানসম্মানটা কোথায় যাবে? কথাটা ভেবেই

ভদ্রলোকের গলা শুকিয়ে এলো।

এদিকে হাদি হৃদয়ের মুখে বউয়ের স্বীকৃতি শুনে অবাক হবে

নাকি বাপকে বলা ছেলের কথা শুনে হাসবে বুঝল না। সে

কনফিউজড । বেচারা দু’হাতের পাঞ্জাবি কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। তার সম্মুখ বরাবর একটি দরজায়

চোখ পড়তেই মনে হলো, ঘরের পর্দার আড়াল থেকে কেউ

তাকে দেখছিল। কিন্তু হাদির চোখ সেদিকে পড়তেই মেয়েটি

সাথে সাথে পর্দা পুরোটা টেনে দেয়। হাদি পর্দার দিকে চেয়ে

গাল চুলকে বিড়বিড় করে,

“বিচ্ছু মেয়ে! দাঁড়াও, তোমার হৃদয় ভাইরে বিচার দিয়ে

তোমার ব্যবস্থা করছি। নাক টিপলে দুধ বের হবে। সে মা’রে

আমারে লাইন।”
.
.

হৃদয় বিকাশে চেক করল, তার একাউন্টে আপাতত বিশ

হাজার টাকা আছে। এরপর সে গোসল শেষে বেছে বেছে

রাখা বিভিন্ন চকলেটের পেইজগুলোর মাঝ থেকে সবচেয়ে

ভালো এবং বিশ্বস্ত পেইজ থেকে একটার পর একটা চকলেট

বক্স অর্ডার করল। বিভিন্ন আইটেমের চকলেট। মনে হয় না

কোনো চকলেটের প্রকার বাদ দিয়েছে। সবগুলো চকলেট

অর্ডার শেষে হিসাব করে দেখল প্রায় ১৫ হাজার টাকা বিল

এসেছে। হৃদয় টাকা সেন্ডমানি করে দেয়। এরপর মেসেজ

করে,

‘আজ রাতের মধ্যে লাগবে। ইট’স আর্জেন্ট!’

ততক্ষণে হৃদয় সিঁড়ির মাথায় উঠে এসেছে। সবকাজ শেষে সে

তার ফোন পকেটে ভরে মাথা তুলে তাকায়। তিন হাত দূরে

রজনীকে দেখে হৃদয়ের পা থেমে যায়।

রজনী মাত্র ঘর থেকে বেরিয়ে দাদুকে বলতে চেয়েছিল, সে

গ্রামে ফিরতে চায় এক্ষুনি। এই গু’ণ্ডা বাড়িতে সে একদমই

থাকতে চায়না। গ্রামে গিয়ে যা হওয়ার হবে। কিন্তু মাঝপথে

হৃদয়কে দেখে মেয়েটার পা থেমে যায়, এখান থেকে পালানোর

আগেই হৃদয় তাকে দেখে নেয়ায় মেয়েটা ভ’য়ে থরথর করে

কেঁপে ওঠে। বারবার চোখের সামনে ভাসছে কিছুক্ষণ আগে

হৃদয়ের সেই পা’ষ’বিক মা’র। মেয়েটার কাঁপুনি বাড়ে।

রজনীকে এভাবে কাঁপতে দেখে হৃদয়ের কপালে ভাঁজ পড়ে।

বিরক্ত-ও হলো একটু। বলে,

“অ’টি’স্টি’ক তুমি? এভাবে কাঁপছো কেন?”

রজনীর পরিবর্তন নেই। তার মনে হচ্ছে এই বুঝি হৃদয় তাকে

মা’র’লো যেভাবে ওই ছেলেটাকে মে’রেছিল।

এদিকে রজনীকে একইরকম দেখে হৃদয়ের কপালে চিন্তার

ভাঁজ পড়ে। সে রজনী আর তার মাঝের তিন হাত দূরত্বের

আড়াই হাত দূরত্ব কমিয়ে এনে রজনীর সামনে দাঁড়ায়। চিন্তিত

কণ্ঠে বলে,

“এনি প্রবলেম?”

হৃদয়ের কথা রজনীর কানে গেল না। হৃদয়কে এতো কাছে

দেখে মেয়েটি ভ’য়ে হঠাৎ-ই বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিয়ে বলে,

“আমাকে মা’র’বেন না। আমি বাড়ি যেতে চাই।”

হঠাৎ রজনীকে এভাবে কাঁদতে দেখে হৃদয় থতমত খেয়ে

তাকায়।

চলবে …….

 

🟥[শব্দসংখ্যা : ৪২০০+]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments