Story: Cry Or Better Yet Beg(02)

(বাংলা অনুবাদ)

Author : Solche

পর্ব ২

___

ম্যাথিয়াস তার সিটে গভীরভাবে বসে ছিলেন, ঘোড়ার গাড়িটির জানালার বাইরে তাকিয়ে। আর তার বাটলার হেসেন তার পরিবারের সব ঝুলে থাকা কাজের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তাকে জানাচ্ছিল। এই বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল, আর্ভিসে গ্রীষ্ম কাটাতে আসা কিছু আত্মীয়ের আগমন, কয়েকটি সামাজিক সমাবেশ, আর পরের মাসে যাত্রা করা বাণিজ্য জাহাজের বীমা সংক্রান্ত সমস্যা। ম্যাথিয়াস ছোট ছোট উত্তর বা মাথা নেড়ে বোঝাচ্ছিলেন যে তিনি শুনছেন।

ব্যবসার কাজগুলো পরিচালনা করতেন পরিচালকরা, আর পারিবারিক বিষয়গুলো সামলাতেন বাড়ির দুই নারী, ম্যাথিয়াসের মা এবং দাদী। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় ম্যাথিয়াসকেই নিতে হতো। এই দায়িত্ব সে বহন করে আসছে মাত্র বারো বছর বয়স থেকে। হেসেন তার রিপোর্ট শেষ করল ঠিক তখনই, যখন তারা প্লাটানাস রোডে পৌঁছালো, যেটা হারহার্ড এস্টেটের দিকে নিয়ে যায়।

ম্যাথিয়াস মাথা হেলিয়ে বসে ছিলেন, পরিচিত দৃশ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি উঁচু গাছ, যেগুলো একে অপরের দিকে ঝুঁকে আছে, যেন হাত ধরে আছে। দুলতে থাকা পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো রাস্তার উপর সুন্দর ছায়ার নকশা তৈরি করছিল।

এস্টেটে ঢোকার পরই একটি সাদা প্রাসাদ চোখে পড়ল, যার ছাদ গাঢ় নীল রঙের। ম্যাথিয়াসের মা এবং দাদী প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, পরিবারের প্রধানকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত। ম্যাথিয়াস তার আগে থেকেই সোজা থাকা টাইটা আরও একবার ঠিক করলেন, তখনই গাড়ি থামল এবং দরজা খুলে গেল।

“স্বাগতম, ম্যাথিয়াস।” হাসিমুখে বললেন ফার্স্ট লেডি ডাউয়াজার ক্যাথারিনা ভন হেরহার্ড্ট, তার নাতিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে।

ম্যাথিয়াস মাথা নত করলেন এবং তার দাদীর কাছ থেকে একটি চুম্বন গ্রহণ করলেন। তার মা, এলিস ভন হেরহার্ড্ট, একটু সরাসরি ভঙ্গিতে তাকে অভিবাদন জানালেন। হালকা করে জড়িয়ে ধরে হেসে বললেন, “দেখছি, তুমি বড় হয়ে গেছ।” তার কালো চুল, যা তার ছেলের মতোই, গ্রীষ্মের শুরুর সূর্যালোকে ঝলমল করছিল।

ম্যাথিয়াস একই হাসি দিয়ে তার দিকে তাকালেন। তারপর সে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চাকরদের প্রতিও একইভাবে অভিবাদন জানালেন। তার প্রতিটি কথা আর কাজে নিখুঁত ভদ্রতা ও শিষ্টাচার ফুটে উঠছিল। এমন মুহূর্তে, তিনি একজন পুরুষ নাকি এখনও একটি ছেলে, এই প্রশ্নটাই অর্থহীন হয়ে যায়। তিনি শুধু ডিউক হেরহার্ড্ট। এই পরিবারের নিখুঁত প্রধান। মা আর দাদীকে দুই পাশে নিয়ে, তিনি সামনে এগিয়ে প্রাসাদের প্রধান হলরুম অতিক্রম করলেন। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার আগে, তিনি উপরে তাকিয়ে বিশাল ঝাড়বাতিটা দেখলেন, যা দিনের বেলাতেও জ্বলছিল। তার ওপরে ছাদের মধ্যে খোদাই করা ছিল হেরহার্ড্ট পরিবারের প্রতীক।

তিনি একজন হেরহার্ড্ট। এই পারিবারিক নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমত্তা, মার্জিত আচরণ, আর আত্মসংযম। ডিউক হেরহার্ড্ট হিসেবে নিজের জীবনের ব্যাপারে ম্যাথিয়াসের কখনো কোনো সন্দেহ বা অভিযোগ ছিল না। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন এই জীবন তার কাছ থেকে কী চায়, আর তিনি তা সহজেই মেনে নিয়েছিলেন। এটা তার কাছে শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক, আর ততটাই সহজ। আবার দৃষ্টি নামিয়ে, তিনি বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন।

তাদের লর্ড প্রাসাদে প্রবেশ করার পর অবশেষে কর্মচারীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারল। চডিউক হেরহার্ড্টকে স্বাগত জানানোর জন্য কয়েকদিন ধরেই পুরো আর্ভিস জুড়ে ব্যস্ততা চলছিল। তার আগমনের দিন সবকিছু নিখুঁত হতে হবে। এমনকি বাড়ির কর্মচারীদেরও। এমনকি নিম্নপদস্থ চাকররাও, যাদের দিকে যদিও ডিউক কখনো তাকাবেন না, তাদেরও মর্যাদা ও শালীনতার সঙ্গে আচরণ করার দায়িত্ব ছিল। আর্ভিসের অনাহূত অতিথি লায়লা লিউয়েলিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

“ডিউক কি এসে গেছেন? এত তাড়াতাড়ি?” সে একটু হতাশ গলায় বলল, কয়েকজন চাকরের পাশে দাঁড়িয়ে। বিল তার জন্য যে সাদা পোশাকটা কিনেছিল, হাঁটার সময় সেটার স্কার্ট দুলছিল।

“তুমি তাকে বনে অনেকবার দেখতে পাবে। তখন তার অনুমতি নিতে হবে।” বিল সরাসরি বলল। তারপর সে হাঁটা শুরু করল। লায়লা তার পেছনে পেছনে প্রায় দৌড়ে চলল তাল মেলাতে।

“ডিউকও কি বন জঙ্গল পছন্দ করেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি শিকার করতে পছন্দ করেন।”

লায়লার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। “শিকার? বনে?”

বিল নাক সিটকালো আর মেয়েটার দিকে তাকাল। “জঙ্গলটাই তো পরিবারের শিকার করার জায়গা, এটা কি স্বাভাবিক না?”

“তাহলে… তিনি কি পাখিও শিকার করেন?”

“আমার মনে হয় পাখি শিকারই ডিউকের সবচেয়ে প্রিয়।” বিল সহজভাবে বলল। এই কথা শুনে লায়লা হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দিল, বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে। বিল যখন তার প্রতিক্রিয়ার কারণ বুঝতে পারল, তখন সে অস্বস্তিভাবে গলা খাঁকারি দিল। সে ভেবেছিল তাকে সান্ত্বনা দিতে একটা মিথ্যা বলবে, কিন্তু জানত তাতে লাভ নেই। এখন মিথ্যা সান্ত্বনা দিলে, কয়েক দিনের মধ্যেই যখন ডিউক শিকারের মাঠে আসবেন, তখন সে আরও বেশি ধাক্কা খাবে। কিছু একটা বলার প্রয়োজন বোধ করে সে বলল, “তুমি ডিউকের গুলি করার দক্ষতা দেখে অবাক হয়ে যাবে। তিনি তরুণ, কিন্তু তবুও অসাধারণ নিশানাবাজ।” নিজের কথাই শুনে সে বুঝল, এটা বোধহয় তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কথা হয়নি। নিচে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা ইতিমধ্যেই কান্নার কাছাকাছি।

“তিনি পাখি শিকার করেন কেন?” লায়লা জিজ্ঞেস করল, “প্রাসাদে তো ইতিমধ্যেই এত খাবার আছে…”

“শিকার করা অভিজাতদের একটা বিনোদন। তারা যে সব প্রাণী শিকার করে, তার মধ্যে পাখিই সবচেয়ে মজার, আর—” বিল থেমে গেল বুঝতে পেরে, সে আবার ভুল কিছু বলে ফেলেছে।

লায়লা বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। বিল বিরক্ত হয়ে উঠল। এই ছোট মেয়েটার সামনে তাকে এত সাবধানে কথা বলতে হচ্ছে। প্রতিটা বিষয় ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে, যেন তার অনুভূতিতে আঘাত না লাগে। এটা তার ভালো লাগছিল না। সে প্রায় চিৎকার করেই বলতে যাচ্ছিল, “তুমি পাখিগুলো এত পছন্দ করো কেন?!” কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুপ থাকাই ঠিক মনে করল। সে জানত, আর একটা শব্দ বললেই মেয়েটা হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়বে, আর সেটা সামলানোর কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। সে কান্নাকাটি করা বাচ্চাদের একদম পছন্দ করত না। একটু দ্বিধা করার পর, সে আবার হাঁটা শুরু করল।

কাঁধ ঝুলে পড়া অবস্থায়, লায়লা দুর্বল পায়ে তার পেছনে হাঁটতে লাগল। একটু আগেও নতুন পোশাক নিয়ে যে উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছিল, সেটা আর নেই। আনন্দে লাফাতে লাফাতে হাঁটার সেই দৃশ্যটা সত্যিই দেখার মতো ছিল। দীর্ঘ নীরবতার পর, সে আন্তরিকভাবে বিলের দিকে তাকিয়ে সতর্কভাবে বলল, “আমি প্রার্থনা করবো, যেন ডিউক শিকার করা বন্ধ করে দেন। তোমার কি মনে হয়, এটা হতে পারে?”

কী উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে, বিল শুধু ঘাড়ের পেছনে হাত বুলাল।

লায়লার মনে হতে লাগল, তার প্রার্থনা বুঝি কবুল হয়েছে। ডিউক ফিরে আসার পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে, তবুও তিনি এখনও শিকারের মাঠে যাননি। অবশ্য এটা স্বাভাবিকই ছিল, কারণ তাকে দেখার জন্য অসংখ্য অতিথি প্রাসাদে ভিড় করেছিল। প্রাসাদে প্রতিদিনই ছিল হৈচৈ আর আনন্দে ভরা পার্টি। কিন্তু জঙ্গলটা রয়ে গিয়েছিল শান্ত। গ্রীষ্ম এখন পুরোপুরি জমে উঠেছে। মা পাখিরা যত্ন করে যে ডিমগুলো তা দিচ্ছিল, সেগুলো এখন ফুটে বাচ্চা বের হয়েছে। বুনো গোলাপের কুঁড়িগুলো ফুটে এখন পুরোপুরি প্রস্ফুটিত। লায়লা প্রায়ই জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, চারপাশের এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো দেখে ভীষণ খুশি হয়ে উঠত।

“বেশি দূরে যেও না, লায়লা!” একদিন চিৎকার করে বলল আঙ্কেল বিল। যখন লায়লা আবার কটেজ ছেড়ে ঘুরতে বের হচ্ছিল।

“যাব না! আমি শুধু একটু নদীর ধারে যাচ্ছি! পরে দেখা হবে, আঙ্কেল!” সে উত্তর দিল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড়ে বনের ভেতরে ঢুকে গেল, দৌড়াতে দৌড়াতে তার হাত দুটো এদিক সেদিক দুলছিল। কাঁধে ঝোলানো পুরনো চামড়ার ব্যাগটা তার প্রতিটি পদক্ষেপে লাফাচ্ছিল।

জঙ্গলের গভীরে পৌঁছে, সে প্রথমেই গাছের ডালে থাকা চিকাডি পাখির বাচ্চাদের একটা বাসার দিকে তাকাল। পালকহীন ছোট ছোট ছানাগুলো তাদের মায়ের অপেক্ষায় ছিল, খাবার নিয়ে ফিরে আসার জন্য। সে গাছ থেকে নিচে নেমে তার ব্যাগে রাখা ছোট নোটবুকে বাচ্চা পাখিগুলোর বর্ণনা লিখে রাখল। যতটা পারে তাদের ছবি আঁকার চেষ্টাও করল।

জঙ্গলে যা কিছু দেখত, সবকিছু নোটবুকে লিখে রাখার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তার। এই জায়গাটা তার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, আর সে সবকিছু মনে রাখতে চায়। যেদিন তাকে এই এস্টেট ছেড়ে চলে যেতে হবে, সেদিন সে তার নোটবুক খুলে আবার সবকিছু দেখতে পারবে। এতে চলে যাওয়ার চিন্তায় তার দুঃখ কিছুটা কমে যেত।

নদীর দিকে যাওয়ার পথে হাঁটতে হাঁটতে, সে জঙ্গলের সব দৃশ্য নিয়ম করে লিখে রাখছিল। সুন্দর রঙের ফুলের পাপড়ি নোটবুকের পাতার মাঝে রেখে দিল, আর পথের ধারে থাকা কিছু রাস্পবেরি তুলে খেয়ে নিল। যখন সে ঝকঝকে নদীর ধারে পৌঁছাল, তখন সূর্য ঠিক মাথার ওপরে।

সে একটা বিশাল গাছে উঠে বসল, যেটা জঙ্গল আর নদীর সীমানায় দাঁড়িয়ে ছিল। এটা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় গাছ। এর লম্বা ডালগুলো এতটাই মোটা যে সেগুলোতে বসা যেন চেয়ারে বসার মতো আরামদায়ক। ঠিক যখন সে তার নোটবুক খুলছিল, তখন নদীর ওপার থেকে হালকা ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পেল।

সে তাড়াতাড়ি নোটবুকটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। এরই মধ্যে দৌড়ানোর শব্দটা কাছে চলে এসেছে। সে ভয় পেয়ে গেল। শ্বাস আটকে গাছের কাণ্ড জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর, চকচকে বাদামী রঙের এক ঘোড়া দেখা দিল। তার পিঠে একজন মানুষ বসে ছিল। সে এসে ঠিক সেই গাছের নিচেই থামল, যেটায় লায়লা ছিল। লায়লার ইচ্ছে হচ্ছিল গাছ থেকে নেমে আসতে, কিন্তু অচেনা লোকটা এখন গাছের গায়েই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। সে অস্থির হয়ে পড়ল, বুঝতে পারছিল না তাকে কী বলা উচিত। এদিকে লোকটা তার টুপি খুলল। ঠিক তখনই, কাঁধে ঝোলানো তার ব্যাগটা ডালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে শব্দ করে উঠল। এরপর কী হয়েছিল, সেটা তার স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আছে।

লোকটা হঠাৎ উপরের দিকে তাকাল, আর লায়লা তার মুখটা দেখতে পেল। তার নীল চোখ দুটি যেন স্বচ্ছ কাঁচের মতো, কপালের ওপর ঝরে পড়া কালো চুলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। লায়লা যখন নিজেকে সামলে নিতে পারল, ততক্ষণে তিনি তার বন্দুক বের করে তার দিকেই তাক করে ফেলেছেন। বন্দুকের লম্বা নলটা তার দিকে ভীতিকরভাবে চকচক করছিল। সে একদম স্থির হয়ে রইল, এখনও শক্ত করে গাছটা জড়িয়ে ধরে। তার পুরো শরীর কাঁপছিল।

লোকটা তাকে কিছুক্ষণ দেখার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং ধীরে ধীরে তার শিকারের বন্দুকটা নামিয়ে ফেললেন। ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচু গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”

“আমি… লায়লা…” সে উত্তর দিল, কষ্ট করে কান্না চেপে রেখে। নদীর দিক থেকে আসা বাতাসে তার সোনালি চুল দুলছিল।

লোকটার চোখ সরু হয়ে গেল। “কি?”

গাছটা এত জোরে ধরে রেখেছিল যে তার হাত ব্যথা করছিল, তবুও সে বলল, “লায়লা। লায়লা লিউয়েলিন।”

“আঙ্কেল! আঙ্কেল বিল! আঙ্কেল!” হাঁপাতে হাঁপাতে লায়লার চিৎকার জঙ্গলের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

বিল তার ছোট ঘরের সামনে বসে বাগানের একটা যন্ত্র ধার দিচ্ছিল। তার আতঙ্কিত চিৎকার শুনে সে অবাক হয়ে তাকাল, আর দেখল লায়লা দৌড়ে তার দিকে আসছে, মুখ একেবারে লাল হয়ে গেছে।

“কি হয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল।

শ্বাস নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সে তাড়াতাড়ি বলল, “জঙ্গলে একজন আছে! লম্বা একজন মানুষ!”

“শোনে মনে হচ্ছে তুমি শিকারে বের হওয়া ডিউকের সাথেই দেখা করেছ।” বিল সহজভাবে বলল, পরের যন্ত্রটা হাতে তুলে নিয়ে।

“তার কালো চুল, আর নীল চোখ… তার গলার আওয়াজটা যেন হাঁসের পালকের মতো মসৃণ।”

“নিশ্চিতভাবেই, ওটাই ডিউক হেরহার্ড্ট।” বিল হেসে বলল।

লায়লা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শ্বাস ঠিক করার চেষ্টা করল। সুন্দর দেখতে কিন্তু ভীতিকর সেই মানুষটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তারপর কিছু না বলেই চলে গিয়েছিলেন। তিনি যখন আবার ঘোড়ায় উঠছিলেন, তখন আরও দুজন লোক এসে হাজির হয়েছিল, সম্ভবত তার সঙ্গী। তারপর তিনজন একসাথে জঙ্গলের আরও ভেতরে চলে যায়। পুরোপুরি চোখের আড়ালে চলে যাওয়ার পর, লায়লা তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে কটেজের দিকে দৌড়ে যায়।

“তার মানে ডিউক এখন…”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই, হঠাৎ একটা গুলির শব্দ জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে দিল। চমকে উঠে লায়লা শব্দের দিকে তাকাল। জঙ্গলের দূরের দিক থেকে একঝাঁক ভয় পাওয়া পাখি উড়ে উঠছিল। তাদের মধ্যে একটা উপরে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে গাছের মধ্যে পড়ে গেল। এরপর আরও কয়েকটা গুলির শব্দ শোনা গেল।

বিল তার কাজ থামিয়ে উঠে দাঁড়াল। লায়লা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, দূরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে। “লায়লা,” তিনি ডাকলেন, তার কাঁধে হাত রেখে। অনেকক্ষণ পর, সে অবশেষে তার দিকে তাকাল। সেই মুহূর্তে, বিল নিজের নিঃশ্বাস আটকে ফেললেন। ছোট্ট মেয়েটা কাঁদছিল।

“Slayer of beautiful birds” এই নামটাই লায়লা ডিউক হেরহার্ড্টকে দিয়েছিল। অবশ্য এটা ছিল শুধু তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি। এস্টেটের সবাই, বিল আঙ্কেল সহ, তাকে একজন নিখুঁত অভিজাত হিসেবে প্রশংসা করত। অসাধারণ প্রতিভা, ডিউকের উপযুক্ত মর্যাদা, শান্ত ও মার্জিত আচরণ, সব মিলিয়ে সবাই যেন সত্যিই ডিউক ম্যাথিয়াস ভন হেরহার্ড্টকে ভালোবাসত ও শ্রদ্ধা করত। সবাই!! শুধু লায়লা ছাড়া।

ডিউক প্রথম দিন শিকারে যাওয়ার পর থেকেই মা চিকাডি পাখিটা আর ফিরে আসেনি। তার নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চাগুলো দুর্বল হয়ে সব মারা গেল। অসংখ্য অন্য পাখিও হারিয়ে গেল।

শুরুর দিকে লায়লা ভাবত, ডিউক কেন বড় খাওয়ার উপযোগী প্রাণীর বদলে ছোট, সুন্দর পাখিগুলো শিকার করে? এক মাস ধরে এই প্রশ্ন ভাবার পর, সে মনে করল সে উত্তরটা বুঝে ফেলেছে। ডিউকের কাছে পাখিরা ছিল শুধু জীবন্ত, চলমান লক্ষ্যবস্তু। যত ছোট, তত কঠিন, তত মজার শিকার। একটা পাখি গুলি করে ফেলার পর, সে শুধু সেখান থেকে চলে যেত, মৃত পাখিটার দিকে ফিরেও তাকাত না। যেদিন ডিউক শিকারে যেত, সেদিন লায়লা ঠান্ডা, রক্তাক্ত পাখিগুলো নিজ হাতে তুলে নিয়ে কবর দিত।

ব্যাং!

দূরে আবার একটি গুলির শব্দ শোনা গেল।

____

একদিন রোদ ছিল তীব্র, কিন্তু গাছের ছায়ার নিচের জায়গাটা ছিল শীতল ও মৃদু বাতাসে ভরা। লায়লা একটি চাদরের উপর বসে ছিল, হাঁটু জড়িয়ে দুই হাত পেঁচিয়ে। বিল এবং অন্য মালীেরা ব্যস্ত ছিলেন শুকিয়ে যাওয়া একটি গোলাপ গাছ তুলে ফেলে তার জায়গায় দেরিতে ফোটা গোলাপের চারা রোপণ করতে। প্রাসাদের পেছনের বাগানটি যেন পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের গোলাপের সমাহার। গোলাপ ছিল বার্গ সাম্রাজ্যের জাতীয় ফুল, এবং ডিউকের মা ও দাদীরও প্রিয়তম ফুল।

সেই দিন সকালেই, বন থেকে ভেসে আসা আরও কিছু গুলির শব্দ শোনার পর লায়লার মনে অস্থিরতা দানা বেঁধেছিল। স্থির হয়ে বসে থাকতে না পেরে সে কটেজের ভেতর উদ্বিগ্নভাবে এদিক সেদিক পায়চারি করছিল। বিল তা দেখে তাকে হাত বাড়িয়ে দেয়, আর লায়লা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার হাতে নিজের হাত রাখে। এরপর সে লায়লাকে নিয়ে বাগানে আসে। ধীরে ধীরে গুলির শব্দ মিলিয়ে গেলে লায়লাও শান্ত হয়।

“আঙ্কেল বিল যখন এই রোদে কাজ করছে, তখন আমি কি সত্যিই এভাবে বসে থাকতে পারি?” নিজের মনে ভাবতে ভাবতে সে অস্বস্তিভাবে বিলের দিকে তাকাল। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল।

বিল তাকে বলেছিলেন, সে যদি কাজে সাহায্য করতে চায়, তাহলে তিনি বিপদে পড়বে। তিনহ আরও বলেছিলেন, যারা কথা শোনে না, এমন বাচ্চাদের তিনি একদম পছন্দ করেন না। তাই নিজের ভেতরের অপরাধবোধ সত্ত্বেও লায়লার কিছু করার ছিল না, তাকে বসেই অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে সে চোখ খুলতেই চমকে উঠল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা ছেলে।

ছেলেটি পরিপাটি পোশাক পরা, এবং দেখতে তারই সমবয়সী মনে হয়। চোখাচোখি হতেই সে মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যালো।” তার সোনালী চুল আর আকর্ষণীয় হাসি। চারপাশে একবার তাকিয়ে সে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি এখানে থাকো?”

“হ্যাঁ। আমি আঙ্কেল বিলের সঙ্গে থাকি।” লায়লা চোখ কুঁচকে উত্তর দিল।

“মিস্টার বিল? ওই ভয়ংকর গার্ডেনার লোকটা?”

“সে ভয়ংকর নয়।”

ছেলেটি মাথা কাত করল। “সত্যি? আমার তো ভয়ংকরই মনে হয়।” সে অনায়াসে লায়লার পাশে বসে পড়ল। লায়লা এখনো নিশ্চিত নয়, ছেলেটিকে বিশ্বাস করা যায় কিনা।

“তুমিও কি এখানে থাকো?” সে জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটি মাথা নেড়ে হেসে বলল, “না। আমি আমার বাবার সঙ্গে এসেছি। তিনি হেরহার্ড্ট পরিবারের ডাক্তার। আজ ডাউয়াজার হেরহার্ড্টকে দেখতে এসেছেন। মাঝে মাঝে আমি তার সঙ্গে আসি। তিনি বলেছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই।”

“বুঝলাম।” লায়লা বলল।

“তোমার বয়স কত?” ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।

“বারো।”

“আমারও। কিন্তু তুমি তো অনেক ছোট!” সে হেসে উঠল।

লায়লা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “তুমিও ছোট।”

“না, আমি কিন্তু আমার ক্লাসে সবচেয়ে লম্বা।” সে বুক সোজা করে বলল। দেখে সত্যিই মনে হয় সে তার বয়সী অন্যদের চেয়ে একটু লম্বা।

“ঠিক আছে, কিন্তু… তুমি আঙ্কেল বিলের মতো লম্বা নও।” লায়লা ধীরে বলল, আত্মবিশ্বাস কিছুটা কমে গিয়ে।

ছেলেটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার হেসে উঠল। সে যেন খুব সহজেই হাসে। “আরে, উনি তো অনেক লম্বা। কোনো বাচ্চাই তার চেয়ে লম্বা না। হয়তো বড়রাও না।”

“আমি তেমন নিশ্চিত নই।” লায়লা বলল। এখন সে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল। চাদরের পাশে থেকে এক মুঠো ঘাস ছিঁড়ে হাতে নিল, আঙুল সবুজ হয়ে গেল। সে আশা করছিল ছেলেটি শিগগিরই চলে যাবে, কিন্তু তার তেমন কোনো লক্ষণ নেই। হঠাৎ চাদরের পাশে রাখা একটি পীচ ফলের দিকে চোখ পড়তেই সে বলে উঠল, “পীচ ফল খাবে?”

ছেলেটি আগ্রহভরে মাথা নাড়ল। সে শুধু হাসিখুশি নয়, বেশ সাহসীও।

লায়লা ব্যাগ থেকে একটি ছোট ছুরি বের করে পীচটি কাটতে শুরু করল।

 ছেলেটি খিলখিল করে হেসে বলল, “তুমি বেশ মজার! একটা মেয়ের ব্যাগে ছুরি আছে, বিশ্বাসই করতে পারছি না!”

“আঙ্কেল বিল দিয়েছে। মজা করো না।” নাক সিটকিয়ে বলল লায়লা।

সে একটি অর্ধেক অংশ ছেলেটিকে দিল। মিষ্টি গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।

ছেলেটি খাওয়া শেষ করে জিজ্ঞেস করল,

“তোমাকে এত মনমরা লাগছে কেন? কিছু হয়েছে?”

লায়লা বিষণ্ন কণ্ঠে বলল,

“ডিউক আর তার বন্ধুরা পাখি শিকার করছে।”

ছেলেটি অবাক হয়ে বলল,

“তাতে সমস্যা কী?”

“তারা আনন্দের জন্য পাখি মেরে ফেলছে।”

“শিকার করার উদ্দেশ্য তো সেটাই, তাই না?”

লায়লা সবুজ চোখ তুলে গম্ভীরভাবে তাকাল।

“তুমিও কি এমন করো?”

ছেলেটির চেহারা দেখে মনে হয় না সে বন্দুক তুলতেই পারবে। “না… মানে… না।” সে বলল, তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে দৃঢ়ভাবে বলল, “না, আমি তা করি না। আমি প্রাণীদের জন্য দুঃখ পাই।”

এই কথা শুনে লায়লার মুখের বিষণ্নতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে হাসিতে রূপ নিল। “আরেকটা পীচ খাবে?” সে উচ্ছ্বসিত স্বরে জিজ্ঞেস করল।

আবারও ছেলেটি আগ্রহভরে মাথা নাড়ল।

লায়লা দ্বিতীয় পীচটি কাটল বেশ অসমানভাবে, এবং বড় অংশটি ছেলেটির দিকে বাড়িয়ে দিল। ছেলেটির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।

তার আধা-আনুষ্ঠানিক পোশাকে সে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিল বলেই মনে হচ্ছিল। হঠাৎ দূর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো। “কাইল! কাইল!”

ছেলেটি, যে ইতিমধ্যেই তার দ্বিতীয় পীচের টুকরোটি খেয়ে শেষ করেছে এবং এখন বিচি নিয়ে খেলছিল, সেই ডাক শোনা মাত্র লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। “আমাকে এখন যেতে হবে।”

“ঠিক আছে, বিদায়।”

“কাইল ইটম্যান।” ছেলেটি বলল, তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে।

“এটাই আমার নাম। তোমার নাম কী?”

“আমি লায়লা। লায়লা লিউয়েলিন।” সে বলল, কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে তার হাত ধরতে ধরতে। দুজন শিশু, যাদের হাত তখনও পীচের রসে আঠালো, তবুও গম্ভীরভাবে করমর্দন করল।

“বিদায়, লায়লা। পরে দেখা হবে। পরেরবার আমি খাবার নিয়ে আসব!” সে দৌড়াতে দৌড়াতে পিছন ফিরে চিৎকার করল।

লায়লা ভাবল তাকে বলে দেবে যে হয়তো তাদের আর দেখা হবে না, কারণ সে শিগগিরই এখানে থেকে চলে যেতে পারে, কিন্তু পরে সে মন পরিবর্তন করল এবং শুধু লাজুকভাবে হাত নাড়ল। এই সম্ভাবনার কথা উচ্চস্বরে বলা তার একদমই ভালো লাগত না। এটা বললেই তার মনে অজানা এক উদ্বেগ ভর করত।

এখন কাইল চলে যাওয়ায়, লায়লার পৃথিবী আবার শান্ত হয়ে এলো।

সে গোলাপের সুবাসময় হাওয়ায় বসে রইল, বিলের কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। একসময় সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। যখন সে শুনল বিল তার নাম ধরে ডাকছে, তখন সে চোখ মেলে দেখল যে দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনটি ইতিমধ্যেই শেষের পথে। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, তার ব্যাগটি তুলে নিল, এবং চাদরটি গুটিয়ে নিল। সে দৌড়ে বিলের কাছে গেল, আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভার দেখাচ্ছিল তাকে।

“আঙ্কেল, আমি আজ একটা ছেলের সাথে দেখা করেছি, আর…” সে তার কথা শেষ করার আগেই, দূরের বনভূমির দিক থেকে বেরিয়ে আসা কিছু মানুষের ছায়া দেখতে পেল। সে স্থির হয়ে গেল। ওরা ছিল ডিউক হেরহার্ড্ট এবং তার বন্ধুরা।

ম্যাথিয়াস গোলাপ বাগানের মাঝখানে এসে থামলেন। তিনি দেখলেন, রুক্ষ স্বভাবের গার্ডেনার বিল রেমার তার সামনে মাথা নত করে আছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি খেয়াল করলেন যে, মিস্টার বিল রেমারের পেছনে একটি ছোট মেয়ে লুকিয়ে আছে।

“অনেকদিন পর দেখা, মিস্টার রেমার।” তিনি বললেন, হালকা মাথা নেড়ে। শিকারদলের বাকিরা ম্যাথিয়াসের পেছনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইল।

“এই বাচ্চাটা কিছুদিনের জন্য আরভিসে থাকবে।” বিল বললেন, তার মুখে এক অস্বস্তিকর ভাব নিয়ে। তারপর সে লায়লার পিঠে আলতো চাপ দিল, আর লায়লা দ্বিধাগ্রস্তভাবে সামনে এগিয়ে এল।

ম্যাথিয়াস যখন তার ঝলমলে সোনালি চুল দেখলেন, তখনই তাকে চিনে ফেললেন। এই সেই মেয়ে, যে গাছের উপর ছিল, যাকে তিনি পাখি ভেবে প্রায় গুলি করে ফেলেছিলেন।

“আমি লেডি এলিস এবং ডাউয়াজার হেরহার্ড্টের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি, কিন্তু আপনাকেও জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।” বিল আবার মাথা নত করল। লায়লা, যে তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, সেও তার অনুসরণে মাথা নত করল।

ম্যাথিয়াস ধীরে নিচের দিকে তাকালেন। যখন তার সাথে মেয়েটির চোখাচোখি হলো, মেয়েটি কেঁপে উঠল, কিন্তু চোখ সরাল না। তিনি দেখলেন তার কুঁচকানো চোখ আর শক্ত করে চেপে রাখা ঠোঁট।

এটাই সেই অভিব্যক্তি, যেভাবে সে প্রথম দেখা হওয়ার সময় তার দিকে তাকিয়েছিল বনের মধ্যে।

“তুমি সেই মেয়েটা না? বনের মধ্যে যে থাকে?” ম্যাথিয়াসের কাজিন রিয়েট হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।

লায়লা লজ্জায় লাল হয়ে গেল এবং আবার বিলের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। সে ঠিক সেই একইভাবে আচরণ করছিল, যেভাবে সে বনে শিকারদলকে দেখলে করত। সে সবসময় তাদের দিকে কটমট করে তাকাত, তারপর কোনো গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ত। তারা শিকার শেষ করে চলে গেলে, সে মৃত পাখিগুলো খুঁজে বের করত এবং কাঁদতে কাঁদতে সেগুলো মাটিচাপা দিত।

“আচ্ছা, ঠিক আছে, মিস্টার রেমার।” ম্যাথিয়াস বললেন, হালকা হেসে।

গার্ডেনার যদি একটি শিশুকে দেখাশোনা করতে চায়, তাতে তার কিছু আসে যায় না।

“ধন্যবাদ, ইউর গ্রেস।” বিল আবার মাথা নত করে বললেন।

ম্যাথিয়াস সামান্য মাথা নেড়ে সাড়া দিলেন, তারপর আবার হাঁটা শুরু করলেন।

তারা চলে যেতে শুরু করার পরেই লায়লা মাথা তুলল। ডিউকের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা তার পেছনে অনুসরণ করছিল। গরম আবহাওয়ার কারণে তারা সবাই কোট খুলে ফেলেছিল এবং হাতা গুটিয়ে নিয়েছিল। শুধুমাত্র ডিউক হেরহার্ড্ট নিজেই তার সম্পূর্ণ শিকারি পোশাক পরে ছিলেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল তার টুপি, যা তিনি খুলে হাতে ধরে রেখেছিলেন।

প্রধান দলের পেছনে কিছু চাকর হাঁটছিল। লায়লা গভীরভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে হঠাৎ আতঙ্কে পিছিয়ে গেল, যখন দেখল তারা শুধু শিকারের বন্দুকই নয়, কয়েকটি প্রাণীর মৃতদেহও বহন করছে। রক্তের তীব্র গন্ধ তার নাকে এসে লাগল। সে কাঁধ গুটিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। লায়লাকে কাঁপতে দেখে বিল তার কাঁধে হাত রাখল।

এটি ছিল কিছুটা অপ্রস্তুত, কিন্তু আন্তরিক এক স্নেহময় স্পর্শ।

___

চিবুকের নিচে হাত রেখে ক্লডিন একের পর এক বাড়িয়ে বলা দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। তার কোঁকড়ানো বাদামি চুল প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে দুলছিল। কাউন্টেস ব্রান্ট তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ক্লডিন, দয়া করে ভদ্রমহিলার মতো আচরণ করো।” তার কণ্ঠে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।

যদিও ক্লডিন এখনো ভদ্রমহিলা বলার মতো বড় হয়নি, পরিস্থিতি তাকে সেইভাবেই আচরণ করতে বাধ্য করছিল। তার মেয়ের পক্ষে এটি কতটা কঠিন, তা বুঝে কাউন্টেস ব্রান্ট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি খুব একা আর বিরক্ত লাগছে।” ক্লডিন গজগজ করল।

টি-টেবিলে বসে থাকা অন্য ভদ্রমহিলারা তার দিকে তাকাল। মেয়ের শিশুসুলভ আচরণে লজ্জা পেয়ে কাউন্টেস ব্রান্ট বললেন, “তাহলে ছেলেদের সঙ্গে গিয়ে খেলো।”

কিন্তু ক্লডিন নড়ল না। “ওরা আমাকে যেন দেখেই না, আর এমন সব কথা বলে যা আমি বুঝতেই পারি না।”

ক্লডিনের অসহায় মুখভঙ্গি অন্য ভদ্রমহিলাদের হালকা হাসি এনে দিল।

“অবশ্যই তার বিরক্ত লাগবে। তার তো সমবয়সী কোনো বন্ধু নেই।” মাথা নেড়ে বললেন এলিস ভন হেরহার্ড্ট, তার কোলে বসে থাকা কুকুরছানাটিকে আদর করতে করতে।

“দেখলে তো মা? লেডি হেরহার্ড্ট বুঝতে পারছেন!”খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল ক্লডিন। এরপর সে বাগানের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর সে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করল, “ওই মেয়েটা কে?”

ভদ্রমহিলারা তার দেখানো দিকে তাকালেন, এবং দেখলেন, একটি ছোট মেয়ে গার্ডেনারের পেছনে পেছনে হাঁটছে, সে গোলাপ গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে।

“আমি কি ওর সঙ্গে খেলতে পারি?” ক্লডিন জিজ্ঞেস করল। “ওকে আমার সমবয়সীই মনে হচ্ছে।”

“আমি জানি না, ক্লডিন… এটা কি সেই বিদেশি অনাথ মেয়েটা না? ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ঠিক হবে না।” কাউন্টেস ব্রান্ট বললেন।

“কিন্তু আমার কোনো সমস্যা নেই, মা। আমি নিশ্চিত, সে একটা কুকুরছানার চেয়ে অনেক বেশি মজার হবে।” নিজের বয়সের তুলনায় অদ্ভুত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল ক্লডিন। এবার কাউন্টেস ব্রান্ট এতটাই লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন যে তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল।

এলিস ভন হেরহার্ড্ট আনন্দে হেসে উঠলেন এবং একটি ঘণ্টা বাজালেন একজন পরিচারিকাকে ডাকার জন্য। “ওই মেয়েটিকে এখানে নিয়ে এসো, যাকে মালীটি দেখাশোনা করছে।”

পরিচারিকা লায়লাকে নিয়ে এলো এক সম্পূর্ণ অচেনা জগতে, একটি জগৎ, যেখানে চাকচিক্যময় মানুষজন উজ্জ্বল, মিষ্টি রঙের পোশাক পরে বাতাসে দুলতে থাকা সাদা ছাউনির নিচে বসে আছে।

“আহা, কী মিষ্টি ছোট্ট মেয়ে।” একজন অপূর্ব সুন্দরী ভদ্রমহিলা বললেন। লায়লার দিকে তাকানো থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি পাশের বাদামি চুলের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলো, ক্লডিন? তোমার ভালো লেগেছে?”

“ধন্যবাদ, লেডি হেরহার্ড্ট।” হেসে মাথা নেড়ে বলল ক্লডিন।

এই কথোপকথনের মধ্যে দাঁড়িয়ে লায়লার মাথা যেন ঘুরে উঠল।

সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে মরিয়া হয়ে আঙ্কেল বিলের কটেজে ফিরে যেতে চাইছিল, কিন্তু কেউ তার অনুভূতির দিকে কোনো মনোযোগ দিচ্ছিল না। একজন ভদ্রমহিলা, যাকে লায়লা অনুমান করল ডিউকের মা, একজন পরিচারিকা মেয়েটাকে কিছু বললেন। যে পরিচারিকা লায়লাকে বাগান থেকে নিয়ে এসেছিল, সে তাকে আরেকজন পরিচারিকাকে হাতে তুলে দিল, আর সেই মেড তাকে নিয়ে চলে গেল। লায়লা এখনো বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। নিজেকে জীবনের প্রথম এত বিলাসবহুল স্নানঘরে পেয়ে, সে গোসল করল। তারপর তাকে একটি আশ্চর্যজনকভাবে নরম সাদা পোশাক পরতে দেওয়া হলো।

পরিচারিকাটি যখন তার জটপাকানো চুল আঁচড়াতে লাগল, তাতে খুব ব্যথা হচ্ছিল, কিন্তু সে ঠোঁট কামড়ে সব সহ্য করল। সে ভয় পাচ্ছিল, যদি সে অভিযোগ করে বা বিরক্ত হয়, তাহলে আঙ্কেল বিলের জন্য সমস্যা হতে পারে।

“মিস ক্লডিন হলেন কাউন্ট ব্রান্টের মেয়ে। তার সামনে ঠিকভাবে আচরণ করবে। বুঝেছ?” দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া মেডটি সতর্ক করল।। লায়লা স্বভাবতই মাথা নাড়ল।

পরিচারিকা ধীরে দরজাটি খুলে দিল, ড্রয়িং রুমের। ক্লডিন তাদের অভ্যর্থনা জানাল, যতটা সম্ভব প্রাপ্তবয়স্কের মতো আচরণ করে। “হ্যালো। তোমার নাম কী? বয়স কত?” সে মাথা নিচু করে লায়লার চোখের দিকে তাকাল।

“আমার নাম লায়লা লিউয়েলিন, মিস। আমার বয়স বারো।”

“সত্যি? তুমি তো এত ছোট যে আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার চেয়ে ছোট।”

এটা ছিল লায়লার সবচেয়ে অপছন্দের কথা, কিন্তু সে চুপ করে রইল। মনে মনে সে বারবার “আঙ্কেল বিলের জন্য” কথাটা আওড়াতে লাগল। এতে তার ধৈর্য একটু বাড়ল।

ক্লডিন নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়াকে প্রয়োজনীয় মনে করল না।

সে শুধু ঘুরে দাঁড়াল এবং হাঁটতে শুরু করল। লায়লা কাঠের মতো শক্ত হয়ে তার পেছনে পেছনে চলল। ক্লডিন নানা ধরনের খেলার প্রস্তাব দিল, পিয়ানো বাজানো, গান গাওয়া, কাগজের ফুল বানানো। লায়লা মাথা নাড়ল। সে এসব কিছুই জানে না। তারপর ক্লডিন পাশা খেলা, শব্দ খেলা, দাবা, এসবের প্রস্তাব দিল। লায়লা সেগুলোও জানে না।

ক্লডিন টেবিলভর্তি খেলনা আর লায়লার দিকে পালা করে তাকাল।

“বেচারা তুমি।” সে মৃদু হেসে বলল। তারপর সে হতাশ হয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

লায়লা অপরিচিত জিনিসপত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে গভীর অসহায়তা অনুভব করল।

ক্লডিন তার সামনে এসে দাঁড়াল এবং বলল,

“তুমি কিছুই জানো না।”

লায়লা বুঝতে পারছিল, ক্লডিন যতটা সম্ভব কোমলভাবে বলার চেষ্টা করছে, যেন তার বিরক্তি প্রকাশ না পায়। কিন্তু তাতেই তার অপমানবোধ আরও বেড়ে গেল। সে মনে করছিল তার কিছু বলা উচিত, কিন্তু কী বলা ঠিক হবে তা সে জানত না। সৌভাগ্যবশত, ক্লডিন কোনো উত্তর না চেয়েই ঘুরে চলে গেল। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল, “বিশ্বাসই হচ্ছে না… সে তো একটা কুকুরছানার চেয়েও অকর্ম।”

লায়লা ঐ বিলাসবহুল ড্রয়িং রুমে একা রয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হয়তো অন্য মেয়েটি ফিরে আসবে। কিন্তু উজ্জ্বল বিকেলের আলো ধীরে ধীরে গভীর সোনালি রঙে রূপ নিলেও, ক্লডিন আর ফিরল না। যখন তাকে সেখানে নিয়ে আসা মেডটি আবার এল, তখন ইতিমধ্যেই সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

“এখন তুমি যেতে পারো।” সে আগের চেয়ে অনেক নরম স্বরে বলল।

“মিস ক্লডিন বলেছেন, তুমি এই পোশাকটি রাখতে পারো। আর এটাও।” সে একটি ঝকঝকে সোনার মুদ্রা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। “নাও। তোমার থেকে উচ্চস্থানে থাকা কেউ কিছু দিলে, তা সৌজন্যের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। বুঝেছ?”

চলবে…?

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x