গল্প: কে ছিলো সে (০২ & শেষ)

শেষ পর্ব
========

শুনসান সড়ক, রাস্তাঘাটে মানুষ তো দূরের কথা, কাকপক্কিও নেই। জসীম সিএনজির পেছনের সিটে বসে ফোন টিপছিলো। কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর তার মনে হলো বাড়ির কাছে হয়তো চলে এসেছে সে। ফোনের স্ক্রিন থেকে মাথা তুলে তাকালো সে। কিন্তু একি? এই কোথায় চলে এসেছে সে। চারদিক ঘন জঙ্গলের ঘেরা। জসীম জায়গাটা ভালো করে খেয়াল করলো। এটাতো শশ্মানঘাটার রাস্তা, সে ড্রাইভারকে বলল___”” ভাই আপনে এই রাস্তা দিয়া কই যাইতাছেন? এইডা তো শশ্মানের রাস্তা””
সিএনজি চালক গাম্ভীর্যপূর্ণ গলায় বলল__”” এইডাই সঠিক রাস্তা৷””
___””কী কইতাছেন ভাই, আমার বাড়ির রাস্তা আমি চিনুম না।?””
___”” কইছি না, এটা সঠিক রাস্তা। কথা না বইলা চুপ কইরা বসেন।””
জসীমের বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠলো। তবে কী এই চালক তাকে ছিনতাই করার পায়তারা করছে না তো। জসীম ড্রাইভারকে বলল___”” ভাই গাড়ি থামান, আমারে এখানে নামাইয়া দেন।””
জসীমের কথা সিএনজি চালকের কান পর্যন্ত পৌঁছালো কী না কে জানে তবে গাড়ির গতি আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গাড়ির দুই সাইটের পর্দা পতপত করে উড়ছে। শীতল বাতাসে জসীমের শরীরে কাঁপুনি ধরেছে। মিনিট পাঁচেক পরেই থামলো সিএনজি। জসীম লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। শশ্মানের একদম ভেতরে সে। অন্ধকার অমাবশ্যার রাত তবু শশ্মানের ভেতরটা আলোকময়৷ চারদিকে কুয়াশার মতো সাদা ধোঁয়ার কুন্ডলী। যে সিএনজিতে করে সে এখানে এসেছিলো সিএনজিটা নেই। মূহুর্তের মধ্যে কোনো এক দৈববলে সিএনজিটা যেনো উধাও হয়ে গেছে। জসীম ধীরে ধীরে পা বাড়ালো সামনের দিকে। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মড়মড় করছে। চারদিকে বৃষ্টি হলেও এদিকটায় যেনো তার লেশমাত্র নেই। কিছুটা পথ যেতেই জসীম খেয়াল করলো সেই সিএনজিটা দাঁড়িয়ে আছে। জসীম দৌড়ে গেলো সিএনজির পাশে। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল__”” কী রে ভাই, এই শশ্মানঘাটায় আমারে নিয়া আইছস ক্যান?””
____”” তোর রক্ত খামু বলে।”” কথাটি বলে অদ্ভুদ ভঙ্গিতে হেসে উঠলো লোকটি৷ তারপর ফিরে তাকালো জসীমের দিকে। নিগুঢ় কালো দুইটি চোখ, চেহারা রক্তহীন ফ্যাকাশে। লাফ দিয়ে সে নামলো সিএনজি থেকে। জসীম ভয়ে দৌড় দিলো৷ কিছুটা পথ যেতেই দেখতে পেলো ভয়ংকর সেই পিশাচ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। কুচকুচে কালো দাঁত বের করে হাসলো সে, ভয়ংকর হাসি। লম্বানখ যুক্ত হাত দিয়ে চেঁপে ধরলো জসীমের গলা৷ জসীমের নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। এরপর পিশাচটি তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো মাটিতে। একটি পাথরের উপর গিয়ে পড়লো তার মাথা৷ ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখলো সাদা তোব পরা এক ব্যাক্তি এগিয়ে আসছে তার দিকে। মুখভর্তি সাদা দাঁড়ি হাতে ঝুলছে বড় একটা তাসবিহ। মাথার প্রচন্ড ব্যাথায় তখনি জ্ঞান হারালো জসীম।

রাত ১ টা প্রায়। বুড়ো হাতেম আলী শুয়ে আছেন বিছানায়৷ তার শিয়রের পাশের টেবিলে একটা কূপিবাতি টিমটিম করে জ্বলছে। চোখে ঘুম নেই, চিন্তার ভাঁজ কপালে। একমাত্র ছেলে এখনো বাড়ি ফিরে নি। একদিকে ছেলের চিন্তা আরেক দিকে ঠান্ডায় কাঁশি বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ।
রুবিনা বসে বই পড়ছিলো। ভাই বাসায় না ফেরায় তার চোখেও ঘুম নেই। কিছুক্ষণ পর দরজায় নক করলো কেউ। হাতেম আলী খক খক কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে মেয়ে ডাক দিলে__”” রুবি, রুবি, দেখতো জসীম আইলো নাকী?””
দরজায় কড়া নাড়া দেওয়ার শব্দ রুবিনাও পেয়েছে। বইটা বিছানায় রেখে দরজা খুলতেই দেখলো জসীম অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। রুবিনা ভাইয়া বলে চিৎকার করে উঠলো। হাতেম আলী অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানা থেকে নেমে এলেন৷ বাবা মেয়ে মিলে জসীমকে ধরে কোনো রকমে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শোয়ালেন। অনেক্ষণ চেষ্টার পর তার জ্ঞান ফিরলো। রুবিনার দিকে তাকিয়ে সে ইশারায় পানি দিতে বলল। রুবিনা একগ্লাস পানি এনে দিলো তাকে। পানি খাওয়ার পরে আবারো চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো সে। হাতেম আলী মেয়েকে বললেন__”” তুই যাইয়া ঘুমা এখন৷ আমি আছি তার পাশে।”
বাবার কথায় রুবিনা রাজি হলো না। বাবার সাথে সেও সারারাত জেগে রইলো ভাইয়ের পাশে। সকাল ৭ টার দিকে ঘুম ভাঙে জসীমের। তাকিয়ে দেখে বাবা আর বোন তার পাশে বসে বসে ঘুমাচ্ছে। জসীম বাবা আর বোনকে ডাক দিলো। হাতেম আলী চোখ মেলে তাকালেন। হাতের তালুতে ছেলের দুই গাল চেপে ধরে বললেন__”” বাপজান তোর কী হইছিলো রাতে। দরজায় অজ্ঞান হইয়া পইড়াছিলি ক্যান?””
বাবার কথা শুনে জসীম অবাক হলো। রাতের ঘটনা সে মনে করার চেষ্টা করলো। বাবাকে সব খুলে বলল সে। সব শুনে হাতেম আলী জ্বীভে কামড় দিয়ে বললেন___শশ্মানের পিশাচ, তুই বড় বাঁচা বাঁচছস বাপ। ওই শশ্মানের পিশাচের খপ্পের যে পড়ে তাকে জীবিত পাওন যায় না। তোরে আল্লাহ বাঁচাইছে, শুকরিয়া।
জসীম নিরব হয়ে বসে রইলো। সে বাড়ি এলো কী করে সেটাই মনে পড়ছে না। সর্বশেষ সে কোনো এক বৃদ্ধকে দেখেছিলো যার হাতে ছিলো তাসবীহ, মুখভর্তি সাদা লম্বা দাঁড়ি। তার দিকে এগিয়ে এসে তাকে ধরেছিলেন।
তার কঠিন বিপদে এগিয়ে এসেছিলো। জসীমের মনে একটাই প্রশ্ন___””কে ছিলো সে, কে?

____সমাপ্ত

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments