পর্ব – ১২
লেখা – আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে বিনীতা যতটা সম্ভব ধীর গতিতে রেডি হচ্ছিল। যদিও দেরি করেও লাভ নেই, আজকে ওরা বের হবেই!
ওদিকে, অর্ণব আর আসমা বেগম ইতোমধ্যেই বের হয়ে পড়েছে। বিনীতা আর রাহনুমা বেগমকে বিনীতাদের বাসার নিচ থেকে পিক করতে আসার কথা ওদের।
বাইরে গাড়ির হর্ন বাজতেই রাহনুমা বেগম তাড়া দিলেন বিনীতাকে, “বিনীতা, তাড়াতাড়ি নিচে নামো, তোমার আন্টিরা এসে গেছে!”
বিনীতা ধীর পায়ে বেরিয়ে এল গেট দিয়ে; পিছে পিছে রাহনুমা বেগমও।
গাড়ির সামনের সিটে বসে আছেন আসমা বেগম, আর ড্রাইভারের সিটে অর্ণব।
আসমা বেগম ওদের দেখে হাসিমুখে বললেন, “এই তো, দেরি হয়নি তেমন! উঠো, তারাতাড়ি যাওয়া যাক!”
বিনীতা আস্তে করে পেছনের সিটে উঠে বসল, পাশে রাহনুমা বেগম। গাড়ি চলতে শুরু করল, আর বিনীতা জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকল বাইরের দিকে।
অর্ণব ড্রাইভ করছিল আর মাঝেমধ্যে আসমা বেগমের কথার জবাব দিচ্ছিল। বিনীতা একবার আড়চোখে তাকানোর চেষ্টা করল রেয়ার ভিউ মিররে।
একি!
অর্ণবও তাকিয়ে আছে ওর দিকেই!
হায়!
বিনীতা ধরা পড়ে গেল বুঝি!
বিনীতা এমনভাবে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে বাইরে দিকে তাকালো, যেন বাইরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য মিস করে ফেলবে!
__________________________________
শপিং মলের সামনে গাড়ি থামতেই বিনীতার মা আর আসমা আন্টি অতি উৎসাহী হয়ে ভেতরে ঢুকে গেছেন। অর্ণব গাড়ি পার্ক করতে পার্কিং লটে চলে গেলে বিনীতাও আস্তে ধীরে ওদের পিছু পিছু ঢুকলো শপিং মলের ভেতর।
ওরা প্রথমেই ঢুকলো একটা শাড়ির দোকানে। ঢুকেই আসমা বেগম দোকানদারকে বলেছেন সবচেয়ে সুন্দর শাড়িগুলো বের করতে। ওনার হবু বৌমার বলে কথা!
বিনীতা একপাশে একটু জড়োসরো হয়ে বসে আছে।
ওদিকে অর্ণবও এসে দাঁড়িয়েছে একটু দূরে, কিছুটা বিরক্ত! মেয়েদের শাড়ির দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার মত ধৈর্য ওর নেই!
“আচ্ছা, তুই এখানে বসে থাকবি নাকি শাড়ি দেখবি?” রাহনুমা বেগম এক ঝটকায় বিনীতাকে বাস্তবে ফেরালেন।
বিনীতা ইতস্তত করে দু একটা শাড়ি উল্টে পাল্টে দেখল। দোকানদার রংবেরঙের বাহারি শাড়ি খুলে বসেছেন; এত রঙে চোখ একেবারে ধাঁধিয়ে যাওয়ার অবস্থা! এত রঙের শাড়ির ভিড়ে বিনীতা মন বসাতে পারছে না কিছুতেই। একটু দূরে দাঁড়িয়ে অর্ণব আড়চোখে তাকিয়ে আছে এদিকেই, সেটাই ওর সবচেয়ে বড় অস্বস্তি!
মা ও আন্টি দুজনেই ওকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে শুরু করেছেন, তাই ও বাধ্য হয়ে সামনে মেলে রাখা একটা প্যাস্টেল পীচ রঙের কাতান শাড়ি হাতে নিল।
ঠিক তখনই—
“এটা না,” অর্ণব হঠাৎ বলে উঠল। কখন যে ও বিনীতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কেউই খেয়াল করেনি।
সবাই একসঙ্গে তাকাল ওর দিকে। সবাই একসঙ্গে তাকিয়েছে দেখে অর্ণব প্রথমে একটু থতমতো খেয়ে গেল।
“না মানে.. এটা বোধহয় বেশি মানাবে বিনীতার গায়ে!”
বিনীতা অবাক হয়ে ওর হাতে থাকা লাল টুকটুকে জামদানি শাড়িটার দিকে তাকাল। উপরের সোনালী সুতোর কাজ; সৌন্দর্যে চোখ একেবারে ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।
রাহনুমা বেগম বললেন, “দেখলি! ছেলেরা মেয়েদের চেয়েও ভালো বোঝে!”
আসমা বেগম হাসলেন, “অর্ণব দেখি নিজের বউয়ের জন্য সবচেয়ে সেরাটা পছন্দ করেছে।”
অর্ণব কাশি দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল, আর বিনীতা শাড়ির দিকে এমনভাবে মনোযোগ দিল, যেন ওর আশেপাশে শাড়ি ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই। কিন্তু মুখের লালচে আভাটা ঠিকই ওকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে!
“এই নাও, শাড়িতে একবার ট্রায়াল দিয়ে দেখো,” আসমা আন্টি একপ্রকার জোর করেই শাড়িটা ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন।
বিনীতা একটু ইতস্তত করে আসমা বেগমের হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে ট্রায়াল রুমের ভেতরে চলে গেল।
বিনীতাকে ভেতরে পাঠিয়ে রাহানুমা বেগমরা ভাবলেন, হাতে সময় বেশি নেই; বিনীতা ট্রায়াল দিয়ে আসতে আসতে ওনারা পাশের দর্জির দোকান থেকে ঘুরে আসবেন।
রাহানুমা বেগম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ণবকে বললেন,
“তুমি এখানে থাকো; বিনীতা বের হতে হতে আমরা পাশের দোকান থেকে ঘুরে আসছি।”
অর্ণব সামান্য প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলো,
“আন্টি বিনীতা বের হবার পর একেবারে গেলে হতো না?”
আসমা বেগম সায় দিলেন বান্ধবীর কথায়, “দেরি হয়ে গেছে তো! আমরা এতক্ষণে একটা কাজ এগিয়ে রাখি। তুমি থাকো এখানে।”
অর্ণব আর কিছু বলার আগেই দুজন পাশের দর্জির দোকানের দিকে চলে গেলেন। শপিং মলের কোলাহলে ওদের কথাবার্তা মিলিয়ে যেতে যেতে অর্ণব অনুভব করলো— ট্রায়াল রুমের বাইরে ও এখন একা দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে বিনীতা!
নিজের উল্টাপাল্টা ভাবনা সরিয়ে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল বিনীতার বের হবার।
আরও মিনিট পাঁচেক পর ট্রায়াল রুমের দরজা খুলল আস্তে করে। বিনীতা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।
অর্ণব এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলো!
ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা কি সত্যি? নাকি কোনো পুরোনো কাব্যের পাতায় আঁকা এক নিখুঁত শিল্পকর্ম?
লাল জামদানিটার ভাঁজে ভাঁজে আলো ঠিকরে পড়ছে, সোনালি কাজগুলোর চিকচিক করা শপিং মলের ঝলমলে আলোয়। ওর কপালের ছোট্ট টিপটা, কানের দুল,
খোলা চুল— সব মিলিয়ে কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে অর্ণবের কাছে।
মনে হচ্ছে আজকে ওর শপিংয়ে আসাটা সার্থক!
বিনীতা ভয়ংকর অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। বাইরে এসে প্রথমে এদিক-ওদিক তাকিয়ে মাকে খুঁজল, কিন্তু ওরা যে নেই সেটা বুঝতে দেরি হলো না।
তারপরই অর্ণবের দিকে চোখ পড়ল।
অর্ণব ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
বিনীতা বেজায় অস্বস্তিতে হাতের আঁচলটা ঠিক করার চেষ্টা করতে করতে বললো, “আম্মুরা কোথায় গেল?”
অর্ণব ঠোঁটের কোণে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো, “পাশের দোকানে গেছে, বলেছে আমি যেন এখানে থাকি।”
“ওহ্…”
ছোট্ট করে বলল বিনীতা! বলার মত আর কিছু খুঁজে পেল না ও। আম্মুরা যে কোন আক্কেলে ওকে এখানে একা অর্ণবের সামনে ফেলে গেছে কিছুতেই বুঝে পেল না ও!
তারপর হুট করেই অর্ণব একটু এগিয়ে এলো বিনীতার দিকে; একটু ঝুঁকে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে তাকালো,
“কি ব্যাপার ম্যাডাম, সেদিনের পর থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন?”
বিনীতার গলার কাছে কী যেন একটা আটকে গেল!
“ককই…না তো!”
অর্ণব ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল, “ও, তাই? তাহলে আমাকে দেখলেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছেন কেন?”
বিনীতা আবারো দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
অর্ণব ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার চওড়া হলো যেন,
“এই যে, আবার চোখ সরিয়ে নিলেন!”
বিনীতার গাল দুটো মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে টমেটোর রং ধারণ করছে!
দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টানোর চাইল বিনীতা,
“আপনি এতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসতে পারতেন!”
অর্ণব কাঁধ ঝাঁকাল, “আপনাকে দেখার সুযোগটা মিস করতাম তাহলে!”
বিনীতার চোখ বিস্ফারিত হলো এবার, “কি?!”
অর্ণব হেসে দিল, “শাড়িটায় কিন্তু আপনাকে সত্যিই খুব মানিয়েছে!”
বিনীতার মুখের লালচে আভা আরেকটু গাঢ় হলো এবার, অস্বস্তিতে কথা বলতে ভুলে গেল যেন।
অর্ণব ওর এই অস্বস্তি বেশ উপভোগ করছে বোধহয়; আবারো একটু হাসল ও, “কি ব্যাপার! আপনার গালের রং দেখি শাড়ির রঙের সাথে মিলে যাচ্ছে!”
বিনীতা দম বন্ধ হয়ে গেল এবার! এই অর্ণবটা কি শুরু করেছে? বিনীতা যে ভয়াবহ লজ্জা পাচ্ছে সেটা কি দেখতে পাচ্ছে না নাকি!
“এই… আপনি কি শুরু করেছেন…!”
মিনমিন করে বলার চেষ্টা করল বিনীতা।
অর্ণব নিরীহ মুখে কপাল কুঁচকে তাকালো ওর দিকে,
“কিন্তু, আমি তো মিথ্যা বলিনি!”
বিনীতা কিছু বলার আগেই ওদের মায়েরা ফিরে এলো পাশে দোকান থেকে। আসমা বেগম বিনীতাকে দেখে খুশি খুশি গলায় বললেন, “বাহ! বেশ মানিয়েছে তো! এইটাই নিয়ে নেই, কী বলিস রাহনুমা?”
রাহনুমা বেগমও সায় দিলেন, “ফাহাদের পছন্দ তো! ভালো হওয়ারই কথা!”
কেনাকাটা শেষ করতে করতে বিকেল শেষ হয়ে এসেছে। আরো কিছু টুকিটাকি কেনা বাকি, সেসব অন্য একদিন এসে কেনা যাবে। শপিং মল থেকে বের হতেই গায়ে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল গায়ে। আকাশ কালচে মেঘে ঢেকে গেছে, দোকানপাটের ঝলমলে আলোয় এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারপাশে।
To be continued…
বি:দ্র:এই ওয়েবসাইটের রিচ একদম ডাউন হয়ে গেছে 🤕
পোস্ট সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না 😓
সবাইকে আজকের পর্ব সম্পর্কে মন্তব্য করার অনুরোধ..
এক লাইন হলেও! প্লিজ!Happy reading! 💜