লেখিকা:জান্নাত রাহমান হৃদি
পর্ব:০৪
ঘড়ির কাটায় এখন সকাল সাড়ে ছ’টা। আমি কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। সাতটায় আমার কোচিং আছে। দশটা থেকে ক্লাস। এক প্রকার তাড়াহুড়োতেই সকালে বের হতে হয়। সাদা কেডস জোড়া পায়ে গলিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে এলাম। সিঁড়ির নিচেই আমার সাইকেলটা রাখা থাকে। সাইকেল টা বের করতে গিয়ে দেখি; সাইকেলের হাওয়া নেই। এহেন কাজ কে করতে পারে খুব জানা আছে আমার। কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে চেপে ধরার মতো সময় আমার হাতে নেই। কলেজ থেকে ফিরে এসে তার ব্যবস্থাটা না হয় নেওয়া যাবে।
আজ ঘুম থেকে উঠে কার মুখটা দেখেছিলাম জানা নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে আজ আমার দিনটা খুব-ই খারাপ কাটবে। সাইকেলের চাকার হাওয়া তো একে ফুঁস হওয়ায় মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। এখন আবার একটা রিক্সা পর্যন্ত পাচ্ছি না। ইশ কি অপয়া একটা দিন। রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে না থেকে চিন্তা করলাম হেটেই রওনা দেই। পথে কোনো রিক্সা পেয়ে গেলেও পেতে পারি। ভাবনানুযায়ী জোড়ে জোড়ে পা চালিয়ে হাঁটছি। লিচু তলার মোড়ে আসতেই দেখা হলো তুষার ভাইয়ের সাথে। রাস্তার পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। পরনে তার একটা শর্টস এবং টিশার্ট। চুলগুলো উস্কোখুস্কো। মুখটা তৈলাক্ত। আমার ধারণা তিনি সকাল বেলা উঠে দাঁত ব্রাশটা পর্যন্ত করেনি। এত সকাল বেলা তিনি ঘুম থেকে উঠেন না। তবে আজ নিয়ম বদলে গেলো কেনো ভেবে পেলাম নাহ।
তুষার ভাইকে দেখেও আমি না দেখার ভান করে চলে আসতে নিলাম। হঠাৎ তুষার ভাই পিছু ডাকলেন আমাকে। “দাঁড়া মানসী!”
কন্ঠটা খুবই গম্ভীর টাইপের তার। আজ পর্যন্ত এরকম গম্ভীর শীতল কন্ঠে তিনি কখনো আমার সঙ্গে কথা বলেননি। আশ্চর্যজনক ভাবে তার এই “দাঁড়া মানসী” শব্দ দুটো শুনে আমি কেঁপে উঠলাম। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম জায়গায়। তুষার ভাইয়ের মুখটাও তাকিয়ে দেখলাম না। মনে হলো যেন আমি কোনো স্টাচু।
তুষার ভাইও আমার দিকে এগিয়ে এলেন না। নিজ জায়গাতে দাঁড়িয়েই শীতল কন্ঠে বললেন, ‘প্রেম করছিস?’
আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, ‘হ্যা! আপনি কি ভাবে জানলেন?’
-‘কাজটা কি ভালো করেছিস?’
-‘অবশ্যই! আপনাকে তো আমি আগেই জানিয়েছিলাম আমি প্রেমের সাধ পেতে চাই। মাঝখান থেকে আপনার মতো ধান্দাবাজের হাতে পরে আমার পুরো দু হাজার টাকা জলাঞ্চলি দিতে হলো।’
-‘প্রেম করা হারাম। জানিস সেটা?’
-‘আর প্রেমের ঘটকালি করাটা খুব সওয়াবের কাজ?’
-‘তর্ক করিস না মানসী। যা করেছিস কাজটা খুব খারাপ করেছিস। ওয়াহিদ ছেলেটা খুব একটা ভালো নয়; সাবধান করছি। পরে কিছু হলে কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে আসিস নে আবার।’
বিদ্রুপ হাসলাম আমি। ‘ফুটুন তো এখান থেকে। আমার ভালো নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।’ বলেই হনহন করে চলে এলাম আমি। কিছূদূর এসে মনে পড়লো আহারে সাইকেলের হাওয়া বের করার কারণে তো তাকে চেপে ধরা হলো না। ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিলো পুরো। যাক বাসায় ফিরে এসব নিয়ে ভাবা যাবে।
কলেজে পৌছাতে পুরো আধঘন্টা লেইট হলো। দরজায় দাঁড়িয়ে তপন স্যারের কাছে কৈফয়ত দিতে হলো কেনো লেইট হয়েছে। সোজা কথা মেরে দিলাম ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে। তপন স্যার ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলো ঠিক, তবে এক গাঁদা লেকচার দেওয়ার পর। কিন্তু তার লেকচার আমার কানে ঢুকলো না। আমি হাবাতের মতো তাকিয়ে রইলাম দ্বিতীয় সারির প্রথম বেঞ্চে বসা ছেলেটার দিকে। ইশ এই সুন্দর ছেলেটা নাকি আমার বয়ফ্রেন্ড। ভাবতেই তো আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে আমার। পুরোটা সময় তাকে দেখেই কেটে গেলো আমার। তপন স্যারের ক্লাস টাইম শেষ হলেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। তপন স্যারের হাতে বারতি টাইম না থাকায় তিনি ইন্টার ফাষ্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ার দুইটা ব্যাচকেই আইসিটি সাবজেক্ট টা একসঙ্গেই পড়ান।
.
সকালের কোচিং শেষ করে আধঘন্টার জন্য বিরতি পেয়েছি। দশটায় আবার ক্লাস শুরু হবে। তাই মাঝখানের সময়টা কাটাতে কলেজের পাশে শিমুল গাছটার নিচে এসে বসে আছি। সঙ্গে সাদিয়া আছে। সাদিয়ার সঙ্গে যদিও আমি ভার হয়ে আছি,কথা বলছি না,ইগনোর করছি পুরো। কিন্তু এই সাদিয়ার বাচ্চা আমার পিছু ছাড়ছে না। আমি যে বেঞ্চে বসছি, সেও সেখানে বসছে। আমি যেথায় যাচ্ছি, সেও যাচ্ছে। বিরক্ত লাগছে খুব। এই যে শিমুল গাছটার নিচে এসে বসেছি একটু শান্তির জন্য, কিন্তু এখানেও ওকে দেখে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। সাদিয়া আমার এই কঠিন মুখটা দেখে ব্যগ্র গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো,
‘কি সমস্যা তোর? মুখটাকে বিচুটি পাতার মতো করে আছিস কেন?’
আমি গরম চোখে তাকিয়ে বললাম,
‘কেনো জানিস না? কোনোদিন তো আমাকে ডাকতে যাস না। কাল গিয়েছিলি কেনো? তোর জন্য ক্রাশের সামনে মান ইজ্জতের ফালুদা হয়েছে আমার। আম্মুর জুতো মারার সিনটা পুরো দেখে ফেলেছে।’
সাদিয়া চোখ পিটপিট করে তাকালো আমার দিকে। অবাক গলায় জানতে চাইল, ‘তোর ক্রাশ কে?’
‘ওয়াহিদ ভাই!’
সাদিয়া এবার উচ্চশব্দে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বলল, ‘ঐ রাঙা মুলা তোর ক্রাশ হলো কবেরে?’
‘যেদিন হওয়ার হয়েছে। তোর কিরে? তুই এটা বল আম্মুর সামনে গিয়ে সবসময় আমাকে কেস খাওয়াস কেনো?’
‘আরে আমি বুঝেছিলাম নাকি যে তুই মামি কে মিথ্যে বলে ক্লাস মিস করেছিস। ভেবেছি অসুস্থ টসুস্থ কি-না আবার। আর তাছাড়া তুষার ভাইয়ের কাছেও দরকার ছিলো একটু। তাই গিয়েছিলাম ওখানে।’
তুষার ভাইয়ের কাছে দরকার শুনে আমি ভ্রু কুঞ্চিত করলাম। জানতে চাইলাম,‘কেন কেন..তার কাছে তোর কি কাজ? তুইও কি তাকে দিয়ে প্রেম ঘটকালি করাতে চাস না- কি?’
‘ধূর! প্রেম ঘটকালি করাবো কেনো? আমি তো তার সঙ্গেই প্রেম করতে চাই।’
‘ইয়াক ছিহ! তুই ঐ বদমাশকে পছন্দ করিস? তোর রুচি যে এত খারাপ জানতাম না তো।’
‘রুচি খারাপ মানে? তুষার ভাইয়ের মতো একটা পুরুষকে পছন্দ করার জন্য তুই আমার রুচির দোষ দিচ্ছিস? তুই জানিস? আমাদের ক্যাম্পাসের সকল মেয়েরা তার উপর ফিদা। সিনিয়র জুনিয়র সবাই। শোন মানসী! তুই অন্তত রুচির কথা বলিস না। তোর থেকে আমার রুচি ঢের ভালো আছে। পছন্দ করেছিস তো এক সাদা মুলা কে। দেখতে লাগে পুরা লুইচ্চা লুইচ্চা। তুই জানিস সাদা চামড়ার ছেলেরা লুচু হয় বেশি।’
একাধারে কথাগুলো বলেই সাদিয়া প্রস্থান ঘটালো। এদিকে আমার সদ্য হওয়া বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে এতগুলো কথা শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। বসে বসে তুষার ভাইকেই গালি গালাজ দিতে লাগলাম। সব দোষ এই তুষার মানবের। তার জন্যই এতগুলো কথা শুনিয়ে গেলো সাদিয়া। কিন্তু সাদা চামড়ার ছেলেরা কি আসলেই লুচু হয়? ইশ সাদিয়া তো চিন্তায় ফেলে দিলো আমাকে। পরক্ষনেই ভাবলাম ব্যাটা যেমন-ই হোক! আমার কিহ? আমি তো আর তাকে বিয়ে করবো না। অতএব কোনো ধরনের প্যারা না খেয়ে আমার জীবনের প্রথম প্রেমটা উপভোগ করা উচিত বলে মনে হলো। পরবর্তীতে যা হবে দেখা যাবে।
.
ছুটির ধ্বনি বাঁজছে টুং টুং করে। হুড়মুড় করে সব ছাএছাএীরা ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি বসে আছি। শুধু শুধু বসে নেই। আমাকে এখানে একটা মানুষ অপেক্ষা করতে বলে গিয়েছে, তাই তার জন্য অপেক্ষা করছি বসে বসে।
বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হলো না আমার। তিন মিনিটের ভেতরেই কাঙ্খিত ব্যক্তিটি এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। সাদা ইউনিফর্ম গায়ে। সার্টটা ঘামে ভিজে লেপ্টে রয়েছে তার গায়ের সঙ্গে। আমি তাকে দেখছি নিঁখুত ভাবে। আমার এই দেখার মাঝে বাগড়া দিলো ওয়াহিদ। বলল, ‘তুমি কি আমার উপর নজর লাগাতে চাচ্ছো?’
তার কথায় লজ্জা পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম আমি। ওয়াহিদ মৃদু হেসে বলল, ‘থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। তোমার নম্বরটা দেও। কাল নেওয়া হয়নি। রাতে খুব কথা বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো। অথচ নম্বরটাই নেওয়া হয়নি।’
দপ্তরি রুমের দরজা লাগাবেন। তাই ক্লাসরুমটা থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন আমাদের। ওয়াহিদ এবং আমি রুম থেকে বের হয়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম।
তার উদ্দেশ্যে বললাম, ‘আমারো খুশিতে নম্বর দিতে আর মনে ছিল না।’
-‘এত খুশি ছিলে?’
-‘হবো না?’
-‘তুমি আমাকে খুব পছন্দ করো তাই না?’
নিচু স্বরে জবাব দিলাম,
-‘হ্যা।’
‘বুঝতে পেরেছিলাম আগেই। আমি সামনে এলে আমাকে দেখতে গিয়ে তুমি কতবার অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছো। কখনো দেয়ালে বারি খেয়েছো, কখনো বা গাড়ির নিচে পড়তে নিয়েছো।’
লজ্জা মাখা স্বরে বললাম, ‘আপনি এসব ও খেয়াল করেছেন?’
-‘হ্যা! কারণ তোমাকেও আমার খুব পছন্দ হয়েছিল।’
-‘সত্যি?’
-‘হ্যা!’
‘তার মানে আমরা দুজন- ই দুজনকে আগে থেকে পছন্দ করতাম? অথচ আপনার সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে দু হাজার টাকা জলে গেলো আমার।’
ওয়াহিদের হয়তো কথাটা বোধগম্য হলো না। প্রশ্ন করলো, ‘দু হাজার টাকা গেলো মানে?’
‘ও কিছু না।’এরপর প্রসঙ্গে এড়াতে বললাম,‘আপনি আমার বাসা চিনলেন কি করে?’
‘পিছু নিয়েছিলাম একদিন তাই।’
কথা বলতে বলতে আমরা কলেজের গেইটের সামনে পৌছে গিয়েছি। ওপাশে কম্পিউটারের দোকানের সামনে চোখ পড়তেই দেখলাম তুষার ভাই একটা মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। হয়তো কারো প্রেম ঘটকালির কাজে ব্যস্ত তিনি। ওয়াহিদ আমাকে বলল, ‘চলো তোমায় বাসা পর্যন্ত পৌছে দেই।’
আমি তুষার ভাইয়ের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলাম। ‘প্রয়োজন নেই, আপনি চলে যান। আমার একটু কাজ আছে।’
‘-কিন্তু নম্বরটা তো দিলে না।’
– ‘দিই নি? ভুলে গিয়েছিলাম। দেখি হাতটা বাড়ান তো।’
ওয়াহিদ হাত বাড়ালো। আমি দ্রত আমার ফোন নম্বরটা তার হাতে লিখে দিয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলাম। তুষার ভাই ততক্ষনে কথা বলে বিদায় নিয়েছেন। আমি মেয়েটার কাছে গিয়ে ধীরস্বরে ডাকলাম। ‘এক্সকিউজ মি আপু।’
মেয়েটা ফিরে তাকালো। -‘জ্বী! আমাকে ডাকছেন?’
-‘হ্যা আপনাকেই। একটু কথা বলা যাবে আপনার সঙ্গে?’
-‘বলো।’
-‘একটু আগে যে ছেলেটার সঙ্গে কথা বললেন দাঁড়িয়ে। সে আপনাকে কি বলেছে?’
মেয়েটা কপাল কুঁচকে বলল, ‘তা তোমাকে কেনো বলবো?’
-‘আমার ধারণা তিনি কোনো প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন আপনাকে। এবং এটাও বলেছেন যে তার কোনো বন্ধু আপনার জন্য সুইসাইড অব্দি করতে গিয়েছিলো।’
মেয়েটা চকিত কন্ঠে বলল, ‘তুমি জানলে কি করে?’
আমি নির্বিকার কন্ঠে জবাব দিলাম,
‘কারণ সে একই কথা সব মেয়েকে বলে।’
মেয়েটা এবার আমাকে বলল, ‘ মানে? যা বলার স্পষ্ট করে বলো।’
‘আমি মেয়েটাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। সবকিছু বলতেই মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে গেলো। বলল, ‘উনি এভাবে ব্যবসা করেন? মানে এভাবেও ব্যবসা করা যায়?’
‘উনার মতো লোক। সব ধরনের ধান্দার ব্যবসা করতে পারেন। তবে আমি চাই উনার এই ধান্দার ব্যবসা বন্ধ করতে। আপনারা সহায়তা করলে হয়ে যাবে।’
-‘কিভাবে সহায়তা করবো?’
-‘আমরা কলেজ ক্যাম্পাসের সকল মেয়েদেরকে সর্তক করে দিতে পারি। তুষার ভাই কারো প্রেম প্রস্তাব নিয়ে তাদের কাছে আসলে তারা যেনো তা তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করে দেয়।’
-‘ঠিক আছে। কালকে কলেজে তাড়াতাড়ি আসবে তুমি। আমরা কয়েকজন একএিত হয়ে প্রত্যেকটা ক্লাসের মেয়েদের কানে তুষার ছেলেটার কৃতকর্মের কথাগুলো ছড়িয়ে দিবো।’
মেয়েটার সঙ্গে এ ব্যাপারে আরো কিছুক্ষন পরামর্শ করে আমি খুশিমনে বাসায় ফিরলাম। পুরোটা খুশি এখনো হতে পারছি না যদিও। যেদিন তার এই ব্যবসায় সম্পূর্ন রুপে লাল বাত্তি জ্বালিয়ে দিতে পারবো। সেদিন আমি সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নারগিসের গানে নাচবো। ডিশিসন ফাইনাল।