গল্প:মাই বিলাভড সানফ্লাওয়ার(০৮)

 

 লেখিকা: আসফিয়া রহমান 

 পর্ব - ০৮ [বসন্ত স্পেশাল 🍂]


-


অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌


-----------------
 

আজ ৪ঠা ফাল্গুন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্ত বরণ উৎসব। 
পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সেজে উঠেছে বসন্তের রঙে। রংবেরঙের শাড়ি পাঞ্জাবি পরিহিত তরুণ-তরুণীদের পদচারনায় মুখরিত পুরো ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ। বিনীতা, রূপন্তি, মিথিলা তিনজনই আজ হলুদ শাড়ি পড়েছে। তুহিন আর রাহাত পড়েছে সাদা পাঞ্জাবি। 

বসন্ত বরণের আয়োজন হিসেবে গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজকের অনুষ্ঠানে রাহাতের একটা পারফরম্যান্স আছে, সেটার জন্য ওরা সবাই অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। আর একটা পারফরম্যান্সের পরেই রাহাতের পালা। স্টেজের পেছনে সবাই জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে, উত্তেজনা বিরাজ করছে ওদের মাঝে। 

"আজকে আমার গান দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিব দেখিস!" রাহাত বলল, ওর চোখে উচ্ছ্বাস।

"হু, আজকে রাহাতের রিহার্সেল যা হয়েছে..." মিথিলা পুরো কথাটা শেষ করল না।

রূপন্তি ওর কথায় তাল মেলালো, "একদম!"

ওরা সবাই কথা বলতে বলতে তুহিন বলল, 
"রাহাতের পারফরম্যান্সের তো আরো কিছুক্ষণ আছে, তোরা এদিকে থাক, আমি একটু আসছি।" 

বলে স্টেজের উল্টা দিকে হাটা ধরল ও।
_________________________________

"চল না অর্ণব! ঢাবির বসন্ত বরণ অনেক সুন্দর হয়।"

"হ্যাঁ, তুই বসন্ত বরণ দেখতে যাবি না কী দেখতে যাবি সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে। তুই যা! আমি যাব না। আমার কাজ আছে।" ভ্রু কুচকে বলল অর্ণব।

"উফ্! আজকে একদিন কাজ রাখ তো। কাজ করতে করতেই তুই বুড়ো হয়ে গেলি!" সাফিন বড্ড বিরক্ত।

"আরে বাবা এই ইন্টার্নশিপের শেষ দিকে যে কাজের প্রেসার যাচ্ছে সেটা তো তুইও বুঝছিস, তাহলে?" অর্ণবের ক্লান্ত গলা।

সাফিন ওর হাত টেনে ধরে বলল,
"আরে ধ্যাত! চল নারে ভাই!!"  

"তুমি তো যাবা গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে। আমি কেন যাব? আমাকে কেন টানছিস যে বাবা?" অর্ণব ওর দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে।

সাফিন চোখ টিপ দিল,
"তুই গেলে তুইও একটা গার্লফ্রেন্ড খুঁজে পাবি। চল তো!" 

অর্ণব এক ভ্রু উঁচু করে তাকালো,
"আমি গার্লফ্রেন্ড খুঁজে চাইছি?" 

"চাস নাই... কিন্তু আমার তো একটা দায়িত্ব আছে, তাই না? বুড়ো হয়ে যাচ্ছিস, এখন প্রেম না করলে কবে করবি!!" হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বললো সাফিন।

অর্ণব এবার গম্ভীর মুখে বলল,
"আর প্রেম! মা তো এখন থেকেই বিয়ের তোড়জোড় করার চিন্তা করছে।"

"সে কি! আগ বলিস নি তো?" উত্তেজনায় সাফিনের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।

"আমি নিজেই কেবল জেনেছি!" অর্ণবের নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল।

"কবে? কোথায়? কখন? কার সাথে?" পুরো বিষয়টা সাফিন যেন এখনো হজম করতে পারছে না। 

"জানিনা! শুধু বলেছে সামনের সপ্তাহে বাড়ি যেতে, মেয়ে দেখতে যাবে।" খুবই স্বাভাবিকভাবে বলল অর্ণব।

এ পর্যায়ে এসে নাটকীয়ভাবে মাথায় হাত চাপড়ে সাফিন বলে উঠলো,
"মাই গড! জীবন যুদ্ধ তো তুই এগিয়ে গেলি বন্ধু!"

অর্ণবের কন্ঠে হতাশা,
"জীবনটা মনে হচ্ছে সিরিয়াল হয়ে গেছে! এসব প্রেম-বিয়ে আমার মত মানুষের জন্য না। আমার প্রোফেশনটাই আমার প্রেম!"

সাফিন বিজ্ঞদের মত বলল,
"জীবনে কাজের বাইরে অন্য দিকেও একটু চোখ দে..! শুধু কাজ নিয়ে পড়ে থাকলেই হয় না।" 

"তোর এসব দার্শনিক মার্কা কথাবার্তা রাখ তো!" অর্ণবের চোখে বিরক্তি।

"যাই হোক, এসব জীবন নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অনেক সময় পড়ে আছে। এখন তাড়াতাড়ি চল, প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেছে বোধহয়।"

এক প্রকার জোর করেই ওকে টেনে নিয়ে চলল সাফিন।
__________________________________

গেটের ভেতর ঢুকেই সাফিন বলল, 
"অর্ণব, একটু দাঁড়াতো। ওদিকে ফুল বিক্রি হচ্ছে, ওদিকে চল, ফুল কিনব।"

ফুলের দোকানে সামনে যেতেই ওরা দেখলো অনেক রকম ফুলের সমারোহ। গাঁদা, বেলি, গোলাপ, রজনীগন্ধাসহ আরো অনেক ফুল। রূপন্তির জন্য সাফিন নিল একটা রজনীগন্ধার গাজরা আর কয়েকটা লাল গোলাপ। অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে পাশেই,
"আমাকে দুটো বেলি ফুলের মালা দিন তো।" 

সাফিন সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকালে ওর দিকে,
"কার জন্য নিচ্ছিস?"

ভ্রু কুঁচকে তাকালো অর্ণব,
"কার জন্য আবার? নিজের জন্য!"

ফুল কেনা শেষ হতেই ওরা স্টেজের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর এগোতেই সাফিন খেয়াল করল, টাকা দেয়ার সময় ও রজনীগন্ধার গাজরাটা দোকানেই ফেলে এসেছে। ও তৎক্ষণাৎ অর্ণবকে বলল, 
"তুই স্টেজের দিকে আগা, আমি গাজরাটা নিয়ে আসছি।" 

বলে সাফিন আবার ফিরে গেল ফুলের দোকানের কাছে। অর্ণব সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।

___________________________________

চলমান পারফরমেন্সটা শেষ হতেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক পরের অংশগ্রহণকারীর নাম ঘোষণা করল। এর পরেরটাই রাহাতের পারফরম্যান্স। এর মধ্যে রুপন্তি খেয়াল করল তুহিন এখনো ফেরেনি। 

"এই তুহিনটা আবার কোথায় গেল? এক্ষুণি রাহাতের পারফরম্যান্স! মিস করে ফেলবে তো!"

রুপন্তির কথায় একটু চিন্তিত হয়ে বিনীতা বলল,
"দাঁড়া আমি দেখছি।"

মিথিলা সাবধান করলো ওকে,
"ওকে খুঁজতে যেয়ে তুইও আবার মিস করে ফেলিস না।তাড়াতাড়ি আয়।"

"হ্যাঁ, আসছি।" 

ওদেরকে আশ্বস্ত করে শাড়ি সামলে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল বিনীতা। স্টেজের সামনের জটলা থেকে বের হয়ে ও বেশ জোরে হাঁটছে। তুহিনকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

বিনীতা আশেপাশে তাকাতে তাকাতে হাঁটছে; তুহিন নেই কোথাও। হঠাৎ করে সামনে শক্ত কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল ও। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বলিষ্ঠ পুরুষালী হাত ওকে পড়ে যাওয়া থেকে আটকালো। 

ভয়ে ও চোখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। কিছু সময় যেতেই যখন অনুভব করলো ওর হাতটা একটা শক্ত হাতের বন্ধনে আটকা পড়েছে, ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো ও। বুকের ধুকপুকানি এতটাই প্রবল যে, বাইরে থেকেও বোধহয় শোনা যাচ্ছে। 

প্রথমেই ওর চোখ গেল হাতের দিকে। একটা সুগঠিত পুরুষালি হাত ওর হাত ধরে রেখেছে ভীষণ শক্ত করে; যেন ওকে পড়তে দেবে না কিছুতেই। হাতের মালিককে দেখার জন্য উপরে তাকাতেই দেখা মিলল এক অর্ধ পরিচিত মুখ।

"এভাবে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছেন?" 

"আপনি হঠাৎ এখানে?" বিনীতার অবাক কণ্ঠস্বর।

"হ্যাঁ আপনাদের প্রোগ্রাম দেখতে চলে এলাম। কেন আসা বারণ বুঝি?"

"একদমই না! বারণ কেন হবে!" দ্রুত বলে উঠলো বিনীতা।

বিনীতার হাত তখনো অর্ণবের হাতের মুঠোয়। বিনীতা একটু থমকে গিয়ে ফের তাকালো ওর হাতের দিকে। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে অর্ণবও এবার তাকালো। ব্যপারটা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিল হাতটা।

"বললেন না তো কোথায় যাচ্ছিলেন?" যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল অর্ণব।

"আমার একটা ফ্রেন্ডকে খুঁজতে যাচ্ছিলাম। আপনি স্টেজের দিকে যান। আমার আরেক ফ্রেন্ড এর পারফরম্যান্স আছে এখনই।" নার্ভাসনেসে বিনীতার দৃষ্টি ঘুরছে এদিক ওদিক।

"ওহ আচ্ছা... আর শুনুন, শাড়ি পরে এত দৌড়াদৌড়ি করবেন না!" 

বলেই অর্ণব ওর দিকে আর না তাকিয়ে হাঁটা দিল স্টেজের দিকে।

_____________________________________

রাহাতের পারফরমেন্স শেষ হতেই রাহাত এসে দাঁড়িয়েছে বন্ধুদের মাঝে।

তুহিন উচ্ছ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল,
"একদম ফাটিয়ে দিয়েছিস রাহাত!" 

"দারুন হয়েছে!" মিথিলাও ওর সাথে তাল মেলালো।

"বলেছিলাম না? আজকে সবাইকে একদম তাক লাগিয়ে দিব!" 

কথাবার্তার মাঝে রাহাত খেয়াল করল ওদের বন্ধুদের সাথে দাঁড়ানো দুটো অপরিচিত মুখ। জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে ও তাকালো বন্ধুদের দিকে। রূপন্তি পরিচয় করিয়ে দিল ওকে।

"ও সাফিন; আর উনি অর্ণব ভাই, সাফিনের ফ্রেন্ড।"

সাফিন আগে কথা বলল, একগাল হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল,
"হ্যালো! তুমি কিন্তু দারুণ গান গাও!"

রাহাত একটু লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকে হাসল,
"থ্যাঙ্ক ইউ! এমনিতেই টুকটাক গাওয়া হয় আরকি!"

এবার কথা বলল অর্ণব, 
"তুমি কিন্তু আসলেই ভালো গাও।"

রাহাত আবারও হেসে ফেলল, মাথা একটু কাত করে বলল,
"আপনাদের কথা শুনেছি।"

সাফিন হালকা মাথা নেড়ে বলল,
"আমিও রূপন্তির কাছে তোমাদের কথা শুনেছি।"

কথার মাঝেই অর্ণবের ফোনে কল এসেছে। ও একটু দূরে গেল কল রিসিভ করতে। কথা শেষে পকেটে ফোনটা ঢুকানোর সময় খেয়াল হলো, তখনের কেনা বেলি ফুলের মালাগুলো এখনো ওর শুভ্র পাঞ্জাবির পকেটে চাপা পড়ে আছে। পকেট থেকে মালা দুটো বের করল ও। তখনই বিনীতা ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রূপন্তি পাঠিয়েছে; ওকে ডেকে আনতে। 

"এগুলো বেলি ফুলের মালা?"

অর্ণব এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বিনীতার প্রশ্নের জবাবে মাথা নেড়ে বলল, "হুম, কিছুক্ষণ আগে কিনেছিলাম।"

বিনীতা এক পলক মালাগুলোর দিকে তাকাল, তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল, "কিনলেন কেন?"

অর্ণব একটু হাসল, 
"ভালো লেগেছে; তাই নিয়ে নিলাম।"

"হুম..." বিনীতা সন্দিহান চোখে তাকাল ওর দিকে, কিন্তু বেশি কিছু বলল না।

বাতাসে বেলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, পেছন থেকে কোন গ্রুপের আড্ডার শব্দ ভেসে আসছে।

"রূপন্তি আমাকে পাঠিয়েছে, আপনাকে ডেকে আনতে। সাফিন ভাই নাকি আজ ট্রিট দেবে আমাদের..." বলে বিনীতা তাকাল ওর দিকে।

অর্ণব ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল, "তাই নাকি...! তাহলে তো যেতেই হবে।"

এক মুহূর্ত ভেবে, কিছুটা দ্বিধা নিয়েই মালাগুলো এগিয়ে দিল বিনীতার দিকে।

"আপনার জন্য!"

বিনীতা অবাক হয়ে তাকালো, "আমার জন্য?"

অর্ণব কাঁধ ঝাঁকালো, 
"আমার পকেটে থেকে চাপা হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আপনার খোঁপায় ওদের দারুন মানাবে।"

বিনীতা কয়েক সেকেন্ড মালা দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর ধীরে হাতে নিল। বেলি ফুলের মিষ্টি গন্ধটা নাকে এসে লাগছে, তার সাথে একটা অদ্ভুত অনুভূতি। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে এক হাতে চুল সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের খোঁপায় মালা দুটো গুঁজে নিল ও।

অর্ণব চুপচাপ দেখছিল। ওর চোখে স্পষ্ট মুগ্ধতা,

"আপনাকে মানিয়েছে..." শান্ত গলায় বলল অর্ণব।

"ধন্যবাদ!" আস্তে করে বলল বিনীতা।

অর্ণব কিছু না বলে মুচকি হাসল। তারপর বলল, "চলুন, বাকিরা অপেক্ষা করছে।"

দুজনে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বাকিদের দিকে। বসন্তের বাতাসে মিশে রইলো এক নাম না জানা অনুভূতির সুবাস...





To be continued...

আজকের বসন্ত স্পেশাল পর্ব আপনাদের কেমন লেগেছে কমেন্টে জানান! 🍂
আপনাদের সুন্দর সুন্দর কমেন্টস আমাকে লিখতে উৎসাহিত করে 💜

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments