লেখিকা: ফাতেমা তুজ নৌশি
পর্ব:০৩
তেমন মাছ পেল না শিমাত। কিছু চুনো পুটি আর দুটো কৈ মাছ। মাছ রেখে সে গোসল করে নিল। গোসল শেষ করে খেতে বসার সময় দেখল কৈ মাছ দুটো বিলকিস আর বিনির প্লেটে ঠাই পেয়েছে। ওর খুব খারাপ লাগল। মাছ খাওয়ার জন্য না বরং নিজের প্রতি হওয়া অবিচারের জন্য। নিজের মা হলে নিশ্চয়ই এমনটা হতো না। চুনো পুটি দিয়ে ভাত খেল শিমাত। তারপর বারান্দায় বসল। এখন কিছুটা রোদ উঠেছে। চুল গুলো মেলে দিয়ে বসল সে। বিলকিস হাতের কাজ শেষ করে গোসল করে এলেন। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে।
“শিমাত,একটু আয় তো।”
শিমাত উঠে এল। বিলকিস খাটে আধ শোয়া হয়ে বসেছে।
“মাথায় মালিশ করে দে।”
বিলকিসের কথা মতো মালিশ করতে লাগল শিমাত। অন্যদিকে বিনি কানের সামনে গান বাজাচ্ছে।
“অন্য ঘরে যা।”
বিনি বিরোধ করে বলল,”নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তুমি অন্য ঘরে যাও।”
বিলকিস চোখ মুখ কুঁচকে ফেললেন। মেয়েটা খুব বেড়েছে। ইচ্ছে করছে ঠা স দুটো করে চ ড় লাগাতে। তবে মাথা যন্ত্রণা করছে বিধায় তিনি ঝামেলা করলেন না। এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন আসরের আজান পড়ছে। খানিক আগে মেঘ উঠে বৃষ্টি নেমেছিল। তাই আকাশটা কেমন পরিষ্কার দেখায়। দু চোখ মেলে দিয়ে দৃশ্যটি দেখে নিল শিমাত। উঠানে তার লাগানো জবা ফুল গাছ। লাল লাল জবা ফুটেছে। ভারী মিষ্টি লাগে দেখতে। শিমাতের লাল রঙ খুব প্রিয়। ওর খুব শখ একটা লাল শাড়ি পরার। পাশের বাসার শিলা ভাবির লাল শাড়ি আছে। বিয়ের দিন পরেছিল। কি সুন্দর সেটা। শিমাতের চোখে এখনো ভাসে। ওর খুব ইচ্ছে ওমন একটা লাল শাড়ি হবে। সন্ধ্যায় পড়তে বসল শিমাত। পাশের ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। বিলকিস মেয়েকে খুব বকাবকি করছেন। সে মাধ্যমিকে ফেইল করেছে। এদিকে শিমাত কলেজে পড়ছে। বই কেনার টাকা নেই দেখে পুরনো বই নিয়ে এসেছে। বকা খাওয়ায় বিনির খুব রাগ হলো। সে রাতের আঁধারে শিমাতের সমস্ত বই ছিঁড়ে ফেলল। সকালে ঘুম থেকে উঠে এ কান্ড দেখে শিমাতের দু চোখ ভেসে গেল। সে কাঁদতে লাগল অবিরত। ছেঁড়া বই গুলো বুকে টেনে নিল। বিলকিসের অবশ্য খারাপ লাগছিল। তিনি বললেন,
“উঠ,কান্না করে লাভ নাই। ভালো করে রাখবি না। ঘরে ইঁদুরের অভাব নাই।”
শিমাত খুব বুঝতে পারে এটা ইঁদুরে কাটা নয়। তবে অভিযোগের উপায় নেই। সেদিন সকালটা কান্না করে কাটাল সে। তবে দুপুর হতেই মায়ের কাজে সাহায্য করতে হলো। বিনি টইটই করে ঘুরছে। মনসুরের সাথে দেখা করতে হবে। লোকটার খুব পয়সা। জুয়া, ম দে র ব্যবসা।
দুপুরে ভাত খেল না শিমাত। শুয়ে রইল। তার ভালো লাগছে না। বিলকিস তাকে ডাকল না। তবে বিনিকে খুঁজে পাচ্ছে না। মেয়েটা এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। লোকজন আজেবাজে কথা বলে প্রায়শই। তবে বিলকিস পাত্তা দেয় না। কিন্তু মনের ভেতর যে সন্দেহ আছে সেটা ও ঠিক। তিনি মেয়েকে খুঁজতে বের হলেন। আশে পাশে খুঁজেও পেলেন না। সন্ধ্যার দিকে ফিরল বিনি। হাতে জিনিস পত্র। তিনি চোখ রাঙালেন।
“এসব কই থেকে আনছিস?”
“দোকান থেকে।”
“টাকা পেলি কোথায়? চুরি করছিস?”
ভেংচি কাটল বিনি। বিলকিস মেয়েকে টেনে ধরলেন।
“কথা বল। টাকা চুরি করছিস?”
হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল বিনি। কেকের প্যাকেট খুলে বলল,”সব সময় চুরির কথা কেন বল? আমি কি শিমাত?”
বিলকিস এতে চুপ রইলেন না। প্রায়শই টাকা পয়সা নেয় বিনি। সেটা তিনি জানেন। তবে মেয়েকে চড় থা প্পড় দিতেও পারেন না। আজ খুব রাগ হচ্ছে। এই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি শঙ্কায় আছেন। পড়াশোনা করছে না, টাকা পয়সা জমানোর ও অভ্যাস নেই। রাগে দুটো চড় মে রে ই বসলেন। বিনি কাঁদতে লাগল। শিমাত বেরিয়ে এসেছে। তার মাথায় ঘোমটা টানা।
“আম্মা, আর মে রো না।”
বিনি রাগে রি রি করতে করতে ঘরে চলে গেল। বিলকিসের চোখে দাবানল। তিনি বুঝতে পারেন না এই মেয়েটাকে নিয়ে কি করবেন। শিমাত পুনরায় ঘরে এসে বসল। তার কিছু ভালো লাগছে না। বই গুলো হারিয়ে ফেলায় পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু ভাবতেও পারছে না। হয়ত এখানেই লেখা পড়াটা সমাপ্তি দিতে হবে।
পরদিন পুনরায় বই এর খোঁজে বের হলো শিমাত। অন্য মনস্ক ভাবে এদিক সেদিক চলছিল। গাড়ির হর্ন শুনতে পায় নি। যখন শুনেছে তখন অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। সে ভয় পেয়ে লাফিয়ে সরতে গিয়ে উল্টো পড়ে গেল। নীল গাড়ি থেকে দুটো পুরুষ বের হয়ে এল। একজন ইয়াজ আর অন্যজন রেহান।
“আরে,কথা শুনতে পান না নাকি?”
রেহান মেয়েটির কাছে এসে দাঁড়াল। ইয়াজ চোখ মুখ গরম করে আছে। তার মেজাজ সামান্য কারণেই চটে যায়।
“উঠুন।”
হাত বাড়িয়ে দিল রেহান। তবে শিমাত একাই উঠে এল। মেয়েটির মুখশ্রী নজরে এলেই রেহান মাথায় হাত দিয়ে বলল,”ও মাই গড! তোমার সাথে আবার দেখা হলো। লাগে নি তো?”
শিমাত হু না কিছুই বলছিল না। রেহান নিজ থেকেই দেখল হাতটা কে টে গিয়েছে। সেখান থেকে র ক্ত ঝরছে। ছেলেটা হয়ত কিছুটা গায়ে পড়া। তাই অনুমতি না নিয়েই হাতে স্পর্শ করল।
“ইস, অনেকটা কে টে গিয়েছে। ট্রিটমেন্টের দরকার।”
শিমাত বিরোধ করে বলল,”না। দরকার নেই। আমি বাসায় যাচ্ছি।”
“এটা বললে হয় নাকি। ব্রো গাড়িতে কিছু আছে?”
“আনা হয় নি।”
“আমি ঠিক আছি। আপনাকে ধন্যবাদ।”
শিমাত পুনরায় বিরোধ করল রেহান ও পুনরায় জোর করতে লাগল। এদের কান্ডে সব থেকে বিরক্ত হলো ইয়াজ। এক পর্যায়ে রাজি হলো শিমাত।
ইয়াজ দূর থেকেই বলল,”সামনে,ফার্মেসী আছে?”
প্রশ্নটা শিমাত কে করা হয়েছে। তবে শিমাত কিছু বুঝল না। রেহান বলল,”সামনে ফার্মেসী আছে?”
“আছে।”
তারপর ওরা হেঁটে ফার্মেসীর কাছে এগোল। ব্যান্ডেজ করানো হলো। তুলো দিয়ে ক্ষ তটা পরিষ্কার করার সময় ভীষণ জ্বলছিল। শিমাত দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল। ইয়াজ ব্যথা কমানোর ঔষধ নিয়ে বলল,”এটা খেলেই হবে।”
শিমাতের কেমন যেন লাগছে। এই পুরুষটিকে তার ভয় হয়। কেমন যেন গম্ভীর স্বরে কথা বলে। অন্য পুরুষটি কতটা ভিন্ন। বেরিয়ে এসে শিমাত বলল,”সেদিনের টাকাটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। তবে আপনি চলে গিয়েছিলেন। আমার কাছে এখন নেই।”
রেহান হেসে উঠল। ওর হাসি খুব সুন্দর। ইয়াজ একটু দূরে দাঁড়ানো। এই পরিবেশটা তার পছন্দ নয়।
“টাকা ফেরতের জন্য তো দিই নি। তোমার জামাটা নোংরা হয়েছিল।”
“আহামরি কিছু ছিল না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। সেসব রাখো। ঔষধ গুলো মনে করে খেও।”
“জি, ধন্যবাদ।”
মেয়েটির সাথে অতিরিক্ত কথা বলছে রেহান। ইয়াজ একটু কঠিন স্বরে বলল,”রেহান লেট হচ্ছে।”
সেদিন ঐটুকুতেই শেষ হলো ওদের কথা। শিমাত বাড়ি ফিরে দেখল বিনি বারান্দায় শুয়ে ফোন চাপসে। আর মিটিমিটি হাসছে। সে সেদিকে আর তাকাল না। ঘরে এসে বসে রইল। মাথায় য ন্ত্র ণা হচ্ছে। বই গুলো হয়ত আর পাওয়া হবে না। টাকা ছাড়া কেউ তার পুরনো বই ও দিতে চায় না। অথচ ওর কাছে সামান্য টাকাও নেই।
চলবে…