পর্ব – ১৪ [এনগেজমেন্ট স্পেশাল 💍]
লেখা – আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
বিনীতা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। সারাদিনের শপিং, হাঁটাহাঁটি, ঠাণ্ডা বাতাসে ভেজা— সব মিলিয়ে শরীর বড্ড ক্লান্ত। দুদিন পরে এনগেজমেন্ট— সেটার জন্যও কিছুটা নার্ভাসনেস কাজ করছে। পুরো ব্যাপারটা কেমন হুট করেই এতোটা এগিয়ে গেছে…
বিনীতা গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে এসব হাবিজাবি চিন্তা করছিল। এমন সময় পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে অর্ণবের নাম দেখে এক মুহূর্ত ইতস্তত করল ও। একটু আগেই তো ওর সাথে দেখা হয়েছে, এখন আবার?
ফোন ধরতেই অর্ণবের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— কী করছেন?
বিনীতা চোখ বন্ধ রেখেই আলগোছে উত্তর দিল,
— এখনই ঘুমিয়ে পড়বো ভাবছিলাম।
অর্ণব একটু চুপ করে থাকল, যেন ওর কণ্ঠস্বর পর্যবেক্ষণ করছে, তারপর বলল,
— ঘুমাবেন? কিছু খেয়েছেন?
— আম্মু ডেকে গেছে খাওয়ার জন্য; খেতে ইচ্ছে করছে না।
অর্ণবের গলা মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠলো,
— গলা এত ক্লান্ত শোনাচ্ছে কেন? শরীর ঠিক আছে?
— হুঁ, একদম ঠিক আছি! আপনি এত চিন্তা করছেন কেন?
— চিন্তা করব না? সারাদিন বাইরে, তার ওপর বৃষ্টিতে ভিজেছেন! রাতে যদি জ্বর চলে আসে, তখন কিন্তু সমস্যা হবে। শরীর গরম লাগছে?
বিনীতা আলগোছে কপালে হাত রাখল,
— না তো! ঠিক আছি।
অর্ণবের কণ্ঠ এবার কিছুটা অন্যমনস্ক শোনাল, যেন পুরোপুরি ওর কথায় আশ্বস্ত হতে পারছে না,
— ঠিক করে দেখুন তো! আপনার গলা শুনেই মনে হচ্ছে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে।
বিনীতা হাসল,
— আপনার কি মনে হয়, আমি নিজেই টের পাব না?
— আপনি এত জেদ করেন কেন, হুম? একটু সাবধানে চললে কী হয়?
অর্ণবের কণ্ঠে চিন্তার সুর।
— আমি আসলেই ঠিক আছি!
অর্ণবকে আশ্বস্ত করতে চাইলো বিনীতা।
— সত্যি?
— হুম…
— গলা শুকনো লাগছে? নাক বন্ধ?
— উফফ! আপনি ডাক্তার না গোয়েন্দা?
বিনীতার হাসি পেল এবার।
অর্ণব একটু হাসল, তবে গলায় এখনও চিন্তার ছাপ,
— দুইটাই। আর এখন আপনার কন্ডিশন শুনে মনে হচ্ছে, আপনাকে গরম কিছু খেতে হবে।
বিনীতা এবার মুখ ফুলালো,
— আমি কি ছোট বাচ্চা, যে আমাকে এমন শাসন করছেন?
— আপনি ছোট বাচ্চা হলে ব্যাপারটা বরং সহজ হতো! একটা চকলেট দেখিয়ে যা বলতাম তাই করিয়ে নিতে পারতাম।
মুচকি হাসলো অর্ণব।
বিনীতার মুখের হাসিটাও এবার গভীর হলো। ও নিজেও বুঝতে পারল, হাসিটা একটু বেশি সময় ধরে মুখে লেগে আছে। অর্ণবের যত্ন নেওয়ার এই স্বভাবটা… কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছে।
— আচ্ছা, বাবা! কাল থেকে আপনার কথামতো চলব, হলো?
— তাহলে এখনই উঠে কিছু খাবেন, তারপর কম্বলের নিচে গিয়ে শুয়ে পড়বেন। আর শুনুন, রাতে যদি শরীর খারাপ লাগে, সঙ্গে সঙ্গে ফোন দেবেন, ঠিক আছে?”
— ঠিক আছে!
— খেয়ে তারপর আমাকে মেসেজ দেবেন। নাহলে আমি আবার ফোন করবো কিন্তু!
একটু হুমকি দেওয়ার স্বরে বলল অর্ণব।
— উফফ্, ডাক্তার সাহেব! আপনি দেখি একদম পাগল হয়ে গেছেন!
হাসতে হাসতে বলল বিনীতা।
— আপনার জন্য ম্যাডাম!
বিনীতা চুপ করে গেল এবার।
অর্ণবের শেষ কথাটা মজার ছলে বলা হলেও, ওর কণ্ঠের যে গভীরতা— সেটা এড়ানো মুশকিল।
ফোনের ওপাশ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে অর্ণব আবার ডাকলো,
— বিনীতা?
বিনীতা দ্রুত নিজেকে সামলে নিল,
— হুম, শুনছি। আচ্ছা ঠিক আছে, এখনই উঠে খেয়ে নেব।
অর্ণব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল,
— গুড। এখন যান।
বিনীতা বুঝতে পারল, অর্ণব ওর নার্ভাসনেসটা বুঝে ফেলেছে। তারপর মৃদু কন্ঠে বলল্ ও,
— গুড নাইট, অর্ণব।
— গুড নাইট, ম্যাডাম!
ফোনটা কেটে গেল, কিন্তু বিনীতা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
অর্ণবের কথাগুলো এখনও কানে বাজছে।
“আপনার জন্য, ম্যাডাম!”
ও ধীরেধীরে উঠে বসলো। মনে হলো, সত্যিই যেন শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে। ক্লান্তির চেয়েও বেশি, একটা অদ্ভুত গরম-ঠান্ডা মিশ্রিত অনুভূতি। তবে সেটা কি আসলেই ঠান্ডা লেগে যাওয়ার কারণে, নাকি অন্য কিছু?
বিছানা থেকে উঠে ধীরপায়ে রান্নাঘরের দিকে গেল ও। সত্যিই গরম কিছু খাওয়া দরকার।
ভারী কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। দুধ চিনি দিয়ে এক কাপ গরম কফি বানিয়ে নিল বিনীতা।
কফির কাপে হাত রেখে ভাবল—
অর্ণব কি সবসময়ই এমন? নাকি শুধু ওর জন্য?
ভাবতে গিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল ওর পুরো শরীর জুড়ে।
মোবাইলটা টেবিলে রাখা। বিনীতা ফোনটা হাতে নিল, কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর দ্রুত একটা মেসেজ টাইপ করলো— খেয়ে নিচ্ছি, ডাক্তার সাহেব! এবার নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে?
সেন্ড করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পরেই রিপ্লাই এলো,
— গুড গার্ল! এরপর থেকে একটু সাবধানে চলবেন, বুঝলেন?
বিনীতা ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে হেসে ফেলল।
এই অর্ণবকে… হয়তো ও বুঝতে শুরু করেছে— একটু একটু করে।
_________________________
চারপাশে ছোট ছোট ফেইরি লাইটস, মাথার ওপর তারাভরা আকাশ, আর এক ফালি চাঁদ; একপাশে ছোট্ট স্টেজ— তাতে লাইটিং এর সঙ্গে সাদা ফুলের সাজ, একটা স্লো মিউজিক বাজছে ব্যাকগ্রাউন্ডে— সব মিলিয়ে এক স্বপ্নময় সন্ধ্যা। বিনীতা-অর্ণবের এনগেজমেন্টের আয়োজন করা হয়েছে ঢাকার নামকরা এক রেস্তোরাঁর গার্ডেনে।
বিনীতা দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে। শুভ্রতায় মোড়ানো সাদা রঙের শাড়ি পড়নে— চিকন সোনালি বর্ডার, কানে টানা দুল, কানের পাশে গোঁজা দুটো সাদা গোলাপ। বুকের কাছে হাত রেখে নিজেকে আয়নায় দেখছে বিনীতা। আসন্ন মুহূর্তের কথা চিন্তা করতেই একটা অদ্ভুত শিহরণ কাজ করছে ওর শরীর জুড়ে।
“তোর হাত ঠান্ডা কেন?” রূপন্তি একপাশে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুচকে তাকালো ওর দিকে।
“কই নাতো! আমি তো একদম রিলাক্স!”
বিনীতা হাসার চেষ্টা করল, নার্ভাসনেসের কারণে ওর আঙুলগুলো অল্প অল্প কাঁপছে।
রূপন্তি চোখ টিপে বলল, “হুমম… বেশ বুঝতে পারছি, কেমন রিলাক্স!”
তারপর হেসে ওর কাঁধে আলতো চাপ দিল। “একটু দম নে তো! এমন ভাব করছিস, যেন তোর এনগেজমেন্ট না, ভাইভা দিতে যাচ্ছিস!”
বিনীতা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে হালকা হওয়ার চেষ্টা করল। আঙুলের কাঁপুনি একটু কমলেও বুকের ধুকপুকানি কমছে না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিল মিথিলা। “কিরে, আর কতক্ষণ লাগবে? সবাই অপেক্ষা করছে!”
রূপন্তি হাসিমুখে বলল, “হয়ে গেছে, চল!”
“বিনীতাকে আজকে যা লাগছে.. অর্ণব ভাই না আবার অজ্ঞান হয়ে যায়!” ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলল মিথিলা, মুখে দুষ্টু হাসি।
বিনীতা চোখ ছোট ছোট করল।
“অজ্ঞান হবে কেন?”
মিথিলা এক হাত কোমরে রেখে উদাস ভঙ্গিতে বলল, “অজ্ঞান হওয়ার মতো ব্যাপার তো আছেই! এমনিতেই উনি চুপচাপ মানুষ, তার ওপর তোকে দেখে মুখ ফুটে প্রশংসা করতে না পেরে যদি মাথা ঘুরে পড়ে যায়? তখন কি হবে!”
রূপন্তি হাসতে হাসতে বলল, “তাহলে তুই কি চাস, আমরা অর্ণব ভাইয়ের জন্য একটা স্ট্রেচার রেডি রাখি?”
ওদের দুজনার বলার ভঙ্গি দেখে বিনীতাও এবার হেসে ফেলল। তারপর আয়নার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো শাড়ি আর মাথার ফুলটা ঠিক করে নিলো। এক ফালি চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে ওর গালে মৃদু ছায়া ফেলেছে। বুকের মধ্যে সেই অদ্ভুত শিহরণ আবার ফিরে এলো ওর।
মিথিলা ওর হাত টেনে ধরল, “চল! অর্ণব ভাই অপেক্ষা করছে!”
রূপন্তি, মিথিলা দুপাশ থেকে ওর হাত ধরে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
____________________________________
গার্ডেনে ঢুকতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস বিনীতার শরীর স্পর্শ করল। ওর গায়ে হঠাৎই কাটা দিল যেন। ফুলের মোহনীয় গন্ধ, ফেইরি লাইটের আলো, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা স্লো মিউজিক— সব মিলিয়ে বিনীতার মনে হল হঠাৎ যেন ও কোন রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছে।
আসমা বেগম এগিয়ে এলেন বিনিতার কাছে।
“মাশাআল্লাহ! কি সুন্দর দেখাচ্ছে আমার বৌমাকে!”
বিনীতা লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারলো না আসমা বেগমের এমন সম্বোধনে।
রাহনুমা বেগম এগিয়ে এসে মেয়ের হাত ধরেলেন,
“আমার মেয়েটা আজ সত্যিই রাজকন্যা হয়ে গেছে।”
আসমা বেগম সায় দিলেন, “ঠিক বলেছিস, রাহানুমা!”
তারপর বিনীতারা এগিয়ে গেল সাদা ফুলে সজ্জিত স্টেজের দিকে।
স্টেজের কাছাকাছি যেতেই অর্ণবকে দেখা গেল, অর্ণবও বিনীতার সাথে মিলিয়ে সাদা পাঞ্জাবি পড়েছে। পাঞ্জাবির ওপরে রুপালি কাজ করা কোটি। চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করে রাখা। চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে এদিকেই।
বিনীতার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে দ্বিগুণ হলো এবার। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সত্যিই কি ও পুরোপুরি প্রস্তুত?
অর্ণব ততক্ষণে স্টেজের উপর থেকে হাত বাড়িয়ে আছে ওর দিকে। অর্ণবের বাড়িয়ে রাখা হাত দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল বিনীতা। বুকের ভেতরটা কেমন যেন এলোমেলো লাগছে। হাতের আঙ্গুলগুলো আবারও কাঁপতে শুরু করেছে ওর।
বিনীতার এক মুহূর্তের দ্বিধা লক্ষ্য করেই হয়তো অর্ণব একটু এগিয়ে এলো।
“হাতটা ধরুন?”
বিনীতা চোখ তুলে তাকালো, তারপর আস্তে করে হাতটা অর্ণবের হাতে রাখল।
পেছন থেকে এবার শোনা গেল রাহাত তুহিনদের সম্মিলিত চিৎকার।
“ওওওওওও….”
“হাউ রোমান্টিক!”
রুপন্তি মুগ্ধ চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল। একটু আস্তে বললেও ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাফিন সেটা শুনে ফেলল সহজেই।
“তাই নাকি? আমি এর থেকেও বেশি রোমান্টিক! দেখবে?”
সাফিন চোখ টিপলো।
রুপন্তির গাল দুটো লাল হয়ে উঠল সহসাই।
“উফ্! তুমি…”
“বল, বল! আমি কি?” সাফিনের কন্ঠে দুষ্টুমি।
“ধ্যাত! কিছু না।” অন্যদিকে মুখ ঘুরালো রূপন্তি।
“আমাদেরও এই মুহূর্ত খুব তাড়াতাড়িই আসছে। বি রেডি বেইবি..”
__________________________________
“নার্ভাস?” বিনীতার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল অর্ণব।
“একটু…” হাসার চেষ্টা করল বিনীতা।
রাহাতের ডাকে ঘোর কাটলো সাফিনদের।
“কিরে রূপন্তি! এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস? স্টেজে আংটি নিয়ে যেতে হবে না!”
রূপন্তি যেন এমন কিছুরই অপেক্ষা করছিল। সাফিনের হাত থেকে বাঁচার জন্য তড়িঘড়ি করে বললো, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! চল!
এনগেজমেন্টের অ্যানাউন্সমেন্ট করলেন বিনীতার বাবা ফারুক সাহেব। রাহাত আর রুপন্তি এনগেজমেন্ট রিং নিয়ে উঠল স্টেজে।
__________________________________
স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্ণব বিনীতার দিকে একনজর তাকালো। তারপর, হঠাৎ করে কিছুটা পেছনে সরে গিয়ে, ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসলো বিনীতার সামনে। এক মুহূর্তের জন্য পুরো গার্ডেন জুড়ে নেমে এলো পিনপতন নিরবতা। তার পর মুহুর্তেই রুপন্তি-সাফিন, মিথিলাদের মিলিত চিৎকারে কান প্রায় তালা লাগার জোগাড়!
বিনীতা চমকে উঠে অর্ণবের দিকে তাকাল, চোখে বিভ্রান্তি আর লজ্জার মিশেল।
সবার সামনে এভাবে!
ইশ্!
এই অর্ণবটা পুরোই পাগল!
আব্বু-আম্মু, আন্টি-আঙ্কেল কি ভাবছে কে জানে!
বিনীতার গাল দুটো ধীরে ধীরে রাঙা হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর কোথাও যেন অচেনা এক শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে। যে অনুভূতির নাম জানা নেই ওর।
“উইল ইউ বি মাইন, ফরএভার? মাই সানফ্লাওয়ার?”
স্টেজের মাঝে যেন আরেকটা বোম ফাটালো অর্ণব।
বিনীতা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল এবার। চারপাশের হাসি-চিৎকার, ফিসফাস সব এক মুহূর্তে যেন ফিকে হয়ে গেল ওর কানে। স্টেজের ঝলমলে আলোয় অর্ণবের চেহারাটা স্পষ্ট, গভীর দৃষ্টিতে আটকে রেখেছে ওকে।
রুপন্তিদের এক দফা চিৎকারের পরে গার্ডেন জুড়ে আবারো নিস্তব্ধতা, একপাশে দাঁড়িয়ে রূপন্তি-মিথিলারা দম আটকে তাকিয়ে আছে। সাফিন তো ইতিমধ্যেই ফোন বের করে রেকর্ড করা শুরু করে দিয়েছে!
বিনীতা হতবাক!
এই ছেলেটা একদম পাগল!
এভাবে সবার সামনে?
বিনীতার গলা শুকিয়ে এলো।
সানফ্লাওয়ার…
ও অর্ণবের সানফ্লাওয়ার?
অর্ণব তখনও হাঁটু গেড়ে, একইভাবে হাত বাড়িয়ে রেখেছে ওর দিকে, অপর হাতে ধরে রেখেছে ডায়মন্ড রিংটা। অর্ণবের ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা মৃদু হাসি।
কিন্তু এই মুহূর্তে বিনীতার মাথায় কিছুই কাজ করছে না! কী করবে এখন? কী বলা উচিত?
বিনীতার ঠোঁট কাঁপল এক মুহূর্তের জন্য, কিন্তু শব্দ বের হলো না।
তারপর বিনীতার ঠোঁটের কোণে একটা অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠলো। খুব আস্তে ফিসফিস করল ও, “ইয়েস…”
তারপর অর্ণবের বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে বাড়িয়ে দিল নিজের হাত।
অর্ণব যেন কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। বিনীতার ঠোঁটের কোণে ওই হাসিটা— সত্যি?
সত্যিই কি ও বলল— “ইয়েস…”
চারপাশের শব্দ যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল অর্ণবের কাছে। তারপর…
“ওহ মাই গড! বিনীতা ‘হ্যাঁ বলেছে’!” রূপন্তির উচ্ছ্বাসিত কন্ঠস্বর সর্বপ্রথম ভাঙলো সে নীরবতা।
পরের সেকেন্ডেই যেন বিস্ফোরণ ঘটল গার্ডেনে! মিথিলা, তুহিন আর বাকিরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। হাততালির শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ।
কিন্তু অর্ণব কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
ও শুধু দেখল— বিনীতার চোখ।
ওর দিকে তাকিয়ে আছে, একটু লজ্জা, একটু ইতস্তত আর কিছুটা… আবেগে ভরা?
অর্ণব নিঃশব্দে হাসল।
একটু ঝুঁকে, যত্ন নিয়ে রিংটা পরিয়ে দিল বিনীতার আঙুলে।
একটু কেঁপে উঠল বিনীতার আঙুল, অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল সারা শরীরে।
“এখন আপনার পালা, ম্যাডাম!”
অর্ণব উঠে দাঁড়িয়েছে বিনীতার সামনে।
বিনীতা রিং হাতে নিল, একটু ইতস্তত করে তারপর ধীরে ধীরে পরিয়ে দিল অর্ণবের হাতে।
চারপাশে আবারো চিৎকার-করতালির শব্দ, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ।
কিন্তু ওদের দুজনের কাছে যেন এই মুহূর্তটায় পৃথিবী থমকে গেছে।
অর্ণব হঠাৎই ওর দিকে ঝুঁকে নিচু কন্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“এবার আর পালাতে পারবে না, মাই সানফ্লাওয়ার!”
বিনীতার গাল দুটো আবারো রাঙা হয়ে উঠল কৃষ্ণচূড়ার রঙে। হৃদস্পন্দন তাল হারিয়ে ফেলল মুহূর্তের জন্য। ওই গাঢ় বাদামি চোখ জোড়ায় ও আটকে যেতে চায়— সারা জীবনের জন্য।
To be continued…
বি:দ্র: আজকের সুন্দর পর্বটা উপলক্ষ্যে আমি কি আপনাদের কাছ থেকে কিছু দারুন গঠনমূলক মন্তব্য আশা করতে পারি…?