গল্প: রাগে অনুরাগে (০৩)

গল্প:রাগে অনুরাগে

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

পর্ব:০৩


সকালের নাস্তা শেষ করেই তনিমাকে নিয়ে যাওয়া হলো রান্নাঘরে। রান্নাঘরে ঢুকেই খানিকটা ঘাবড়ে গেলো সে। বিশাল রান্নাঘর জুড়ে কাচা শাক সবজির কত আয়োজন।একপাশে বিশাল বড় তিনটা মাছ অন্য পাশে মাংসের কারবার। তনিমা তখন শুকনো হাসি দিয়ে তার শ্বাশুড়ি মাকে বললো,

‘মা,এত সব তরকারি ফ্রিজে না রেখে এখানে এইভাবে কেনো ফেলে রেখেছো? নষ্ট হয়ে যাবে তো।’

রিনা রহমান তনিমার কথার পিঠে কিছু বলার আগেই তার বড় জা শেফালি খাতুন পেছন থেকে বলে উঠল,

‘এটা আমাদের বাড়ির নিয়ম। বাড়ির নতুন বউ তার বিয়ের পরের দিন তার পছন্দ মতো সবজি কিংবা মাছ,মাংস যেটা তার পছন্দ সেটাই রান্না করে পুরো বাড়ির মানুষকে খাওয়াবে। বলতে পারো এটা তার জন্য একটা পরীক্ষা।'(তনিমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বাকি কথাটা বললেন তিনি)

তনিমা এবার একটু বেশিই ঘাবড়ে গেলো। এত মানুষের রান্না কি করে রাঁধবে সে? সে তো এত ভালো রান্না জানে না।তনিমার শুকনো মুখ দেখে জেঠী মা তার পান খাওয়া লাল দাঁত গুলো বের করে হাসলেন। যেনো তনিমার এই শুকনো মুখটা তাকে ভীষণ আনন্দ দিচ্ছে। হাতে থাকা পানের খিলিটা মুখে পুরে বললেন,

‘কি মেয়ে,ভয় পেয়ে গেলে নাকি?’

তনিমা কিঞ্চিত হাসলো,বললো,

‘না ভয় পাবো কেনো? আমি রান্না করবো, আপনাদের সবার জন্য আজ আমিই রান্না করবো।’

রিনা রহমান চিন্তিত কন্ঠে বললেন,

‘কিন্তু, মা এত রান্না তো তুই আগে কখনো করিসনি; এখন পারবি?’

তনিমা মুচকি হেসে বললো,

‘তুমি আমায় হেল্প করো তাহলেই হবে।’

কথাটা শেষ হতেই খেঁকিয়ে উঠলেন জেঠীমা। কাটকাট গলায় বললেন,

‘কেউ কোনো হেল্প করবে না।রান্না তোমাকে একাই করতে হবে। আমরাও এই পরীক্ষা দিয়েই এসেছি। ভবিষ্যতে তুমিও তোমার ছেলের বউয়ের কাছ থেকে এই পরীক্ষা নিবে। এখন যা করার তুমি একাই করো।’

তনিমা তখন মনে মনে বললো,’হু,জীবনেও না। আমি আপনার মতো দজ্জাল শ্বাশুড়ি হবোনা। পরীক্ষার নাম করে যে আমাকে অপদস্থ করার চেষ্টা করছেন সেটা আমি বেশ বুঝতে পারছি।’

রিনা রহমান তার জা কে বিনয়ের সুরে বললো,

‘বলছিলাম কি ভাবি,মেয়েটা তো ছোট; আর তাছাড়া এত রান্নাও আগে কখনো করেনি। আজ তো বাড়িতে অনেক মানুষ। এইভাবে হুট করে মেয়েটা কি করে এত মানুষের রান্না রাঁধবে বলুন? তাই বলছিলাম কি..’

কথার মাঝখানেই তাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দেন শেফালি খাতুন। শক্ত গলায় বললেন,

‘শুনো রিনা,আমাদের বিয়ের সময় আমরা কিন্তু ওর চেয়েও ছোট ছিলাম। তাও কিন্তু আমাদের শ্বাশুড়ি বিন্দুমাত্র ছাড় দেইনি। তাই আমরাও কোনো ছাড় দিবো না। তোমার বউমাকে প্রমাণ করতে হবে সে এই বাড়ির জন্য কতটা যোগ্য। আর রান্নায় হলো মেয়েদের যোগ্যতা প্রমাণের সর্বোচ্চ মাধ্যম। তাই এই ব্যাপার নিয়ে কেউ আর কোনো কথা না বলে একে একে সবাই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যাও।’

রিনা রহমান আবারও কিছু বলতে যাবে তার আগেই তনিমা বলে উঠে,

‘মা,তুমি কোনো চিন্তা করোনা। হয়তো আমি তোমার মতো অত ভালো রান্না করতে পারবো না তবে নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো।’

রিনা রহমান তনিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

‘আচ্ছা মা,বেশি টেনশন করিসনা যতটুকু পারিস ততটুকুই কর।’

‘আচ্ছা মা।’

‘তবে দেখো বউ, আজ যেনো আবার আমাদের না খেয়ে না থাকতে হয়!’

কথাটা বলে জেঠীমা পান চিবুতে চিবুতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যান। তনিমা একবার বিরক্ত চোখে সেদিকে তাকিয়ে তার শ্বাশুড়ি মাকে বললো,

‘মা তুমিও যাও। আমি পারবো সবটা।’

তনিমার শ্বাশুড়ি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মন নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার জা আজকে এই বাড়িতে না থাকলে তিনি তনিমাকে দিয়ে কখনোই এত রান্না করাতেন না কিন্তু এখন জা এর ভয়ে কিছু বলতেও পারছেন না।
.
.

‘ভাইয়া,জানিস কি হয়েছে?’

ফায়াজ বিরক্তের সুরে বললো,

‘না বললে জানবো কিভাবে?’

‘সেটাই তো কিভাবে জানবি? খেয়ে তো সোজা রুমে চলে এসেছিস ঐদিকে সবাই মিলে যে তোর বউকে বলির পাঠা বানিয়েছে সেটা কি তুই জানিস?’

ফায়াজ এবার কিছুটা নড়ে চড়ে উঠলো। কপাল কুঁচকে বললো,

‘মানে?’

‘আরে তুই জানিস না এই বাড়ির নিয়ম নতুন বউকে পরদিন সবার জন্য দুপুরের রান্না করতে হয় তো এখন সেই নিয়মানুসারে ভাবিকেও সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আজ দুপুরে আমাদের সবার রান্না ভাবি করবে।’

ফায়াজ বিচলিত কন্ঠে বলে,

‘বলিস কি,এত রান্না ও কি করে রাঁধবে? ও তো রাঁধতে জানে না।’

‘কি জানি? সেটাই তো বুঝতে পারছি না। আম্মু বললো ভাবি নাকি খুশি মনে এই দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। এখন ভাবিই জানে ভাবি কি করবে।’

ফায়াজ এবার কিছুটা রেগে যায়। এমনিতেই মেয়েটা রাঁধতে পারেনা তার উপর এত মানুষের রান্না সে কি করে করবে। না করে দিলেই তো হতো। তা না আগ বাড়িয়ে দায়িত্ব নিয়েছে।রান্না তো কিছু করবেই না উল্টো শরীর পুড়িয়ে রান্নাঘর থেকে বের হবে।

ফায়াজ দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে নিচে যায়। লিভিং রুমে সকলে বসা। ফায়াজ সেখানে গিয়ে বললো,

‘মা,তনু কে নাকি আজ দুপুরের রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?’

ফায়াজের মা কিছু বলার আগেই তার জেঠীমা পাশ থেকে বলে উঠে,

‘হ্যাঁ,দেওয়া হয়েছে।’

ফায়াজ এবার চেতে উঠে বলে,

‘আজব তো!মেয়েটা একা এত মানুষের রান্না কি করে করবে?’

জেঠীমা তর্জনী আঙ্গুলটা দিয়ে মুখে চুন পুরে বললো,

‘আমরাও করেছি।’

ফায়াজ এবার তার জেঠীমার কাছে এগিয়ে এলো,তার পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙ্গে বসে বললো,

‘দেখো,জেঠীমা তোমরা ঐ পরিবেশে বড় হয়েছিলে বলে এত মানুষের রান্না তোমাদের কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু তনিমার কাছে এটা অনেক বড় ব্যাপার। মেয়েটা এর আগে কখনো রান্নাঘরে গিয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। তার উপর রান্নাঘরে কেউ নেই ও একা কি করে সবটা সামলাবে?একটু বুঝার চেষ্টা করো।’

জেঠীমা তখন কর্কশ গলায় বললেন,

‘তোর বউয়ের তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাহলে তোর এত অসুবিধা কিসের?’

ফায়াজ এবার বিরক্ত হলো। সে খুব ভালো করেই জানে এই মহিলা ভীষণ ত্যাড়া। একে কিছু বুঝিয়েও লাভ নেই। ফায়াজ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

‘মা,তুমি একটু রান্নাঘরে যাও। অন্তত ওকে বলে তো দিতে পারবে কি করবে না করবে। ও একা পারবে না মা।’

‘না তোর মা কোথাও যাবে না। তনিমাকে একাই রান্না করতে হবে। যতটুকুই পারে সবটা সে একাই করবে। বাড়ির বউ ও,সব পরিস্থিতিতে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সবটা সামলানোর যোগ্যতা ওর থাকতে হবে। আর তুইও এখন তোর রুমে যা।সংসারের এত খুঁটিনাটি ব্যাপারে সবসময় নাক গলাতে আসবি না।’

ফায়াজ আর কিছু বলে না। তার মায়ের দিকে একবার ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগে বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে যায়। ফায়াজ চলে যেতেই তার জেঠীমা রিনা রহমানকে বলে,

‘শোনো রিনা,ছেলের মতিগতি কিন্তু ভালো না। বেশি দিন কিন্তু লাগবে না বউয়ের আঁচলের নিচে ঢুকতে তাই আগে থেকেই ছেলেকে নিজের আঁচলে ভালো করে বেধে নাও নয়তো পরে আফসোস করবে।’

রিনা রহমান হাসলেন,বললেন,

‘ভাবি,না চাইতেও আজ একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি।আপনি আপনার ছেলেকে আপনার আঁচলে এত শক্ত করে বেধেছিলেন যে আপনার ছেলের বউ আজ তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। আসলে সমস্যাটা বউমাদের মধ্যে না সমস্যাটা হলো আমাদের শ্বাশুড়িদের মাঝে। আমরা তাদের নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করি না অথচ তাদের থেকে মায়ের সম্মান পাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগি। আমাদের উচিত তাদেরকে মেয়ে ভাবা তবে তারাও আমাদের মায়ের সম্মান দিবে।’

রিনা রহমানের কথা শেফালী খাতুনের ঠিক পছন্দ হলো না।উনি চোখ বাঁকিয়ে একবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘অন্যের মেয়েকে নিজের মেয়ে ভাবা বোকামি। তুমি তাদের জন্য যাই করো না কেনো তারা তোমাকে কখনোই আপন করে নেবে না।’

জা এর কথার পিঠে রিনা রহমান মুচকি হাসলেন। তবে কিছু বললেন না। সবসময় সব কথার জবার মুখে দিতে নেই মাঝে মাঝে সেটা কাজে প্রমাণ করে দেওয়াই ভালো। রিনা রহমানও তাই মনে মনে ভাবলেন সময়ের সাথে সাথে শেফালী খাতুন নিজ থেকেই তার এই কথার জবাব পেয়ে যাবেন।

.

শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুজা। কপালের পাশে ছোট চুল গুলো ঘামে কপালের উপর লেপ্টে আছে। নাকের ঢগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। পিঠ অবধি লম্বা চুলগুলো পেছনে খোঁপা বাধা।যেনো এক বাঙালি বউ আটঘাট বেধে রাঁধতে নেমেছে। চুলার জ্বলন্ত আগুনের তাপে তনিমার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। এই রুপে যদি ফায়াজ এখন তনিমাকে দেখতো তাহলে নির্ঘাত সে আবারও প্রেমে পড়তো।

একটা একটা করে ইলিশ মাছ তেলে ছেড়ে দিল। বিশাল কড়াইটাতে এক সঙ্গে প্রায় বিশ পিস মাছ ভাজা যায়। ইলিশ মাছ তনিমার ভীষণ প্রিয়। বিশেষ করে এই তেলে ভাজা মচমচে ইলিশ। তাই আর কোনো মাছ রান্না না পারলেও এটা সে নিজের জন্য তার মার কাছ থেকে শিখে নিয়েছে।একপাশের চুলায় মাছ ভাজছে আর অন্য পাশের চুলাতে অনেক গুলো আলু সিদ্ধ হতে বসিয়েছে। উদ্দেশ্য তার আলুভর্তা বানাবে। তার ছোট মস্তিষ্ক তাকে বুদ্ধি দিয়েছে সহজ কিছু রান্না রাঁধতে যেনো কম পরিশ্রমে বেশি রান্না করা যায়। সেই হিসেবে সে বাড়ির প্রত্যেক মানুষের হিসেব করে একটা করে ইলিশ মাছ,আর বেশি করে আলুভর্তা আর বড় এক পাতিলে বেশি করে ডাল রান্না করে ফেলবে। আর তার সাথে ভাত। মোটামুটি এই রান্না গুলোই সে পারে। আর তাই পুরো উদ্যোমে নিজের কাজ করে যাচ্ছে যাতে করে যতটুকুই পারে ততটুকুতেই যেনো সবাইকে খুশি করতে পারে। তবে মনের এককোণে তার ভীষণ দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। ঐ রাগী জেঠীমা যা খারাপ। উনার যদি এসব পছন্দ না হয়, তাহলে সবার সামনে আবারো চিল্লাফাল্লা শুরু করবেন। উফ,তনিমা বুঝে না এই মহিলাটার এত কি সমস্যা? পান থেকে চুন ঘষলেই যেনো আর রক্ষে নেই। তবে এই ভেবে সে আবার শুকরিয়া আদায় করে এই মহিলা তার জেঠী শ্বাশুড়ি হয়েছে তার নিজের শ্বাশুড়ি হয়নি। নাহলে এই মহিলার সাথে তনিমা দুদিনও সংসার করতে পারতো না। আল্লাহ বাঁচিয়েছে তাকে,মায়ের মতো একটা শ্বাশুড়ি দিয়ে।

রান্নাঘরের একপাশে থাই গ্লাসের বিশাল একটা জানলা আছে। এই জানলা টপকে আবার সরাসরি বাড়ির বাগানে যাওয়া যায়। তনিমা হঠাৎ খেয়াল করে সেই জানলাটা বাইরে থেকে কেউ খুলছে। সেদিকে ভালোভাবে তাকিয়ে জানলার সামনে মানুষটাকে দেখে সে চমকে উঠে বলে,

‘তুই এখানে?’

চলবে…….

Loading spinner

1 thought on “গল্প: রাগে অনুরাগে (০৩)”

Leave a Comment