লেখিকা:রিক্তা ইসলাম মায়া
পর্ব:০৫
সকাল আটটার টিভি নিউজ চ্যালেঞ্জ দেখছেন শহিদুল রহমান। সঙ্গে গরম চা আর বিস্কুট। উনার বউ ফাতিমা বেগম সকালের নাশতা বানাচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের জন্য। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে শহিদুল রহমানের সুখী পরিবার। বড় ছেলে রাসেল। অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছে। ছোট মেয়ে টিয়া রহমান। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন তাঁরা। পৈতৃক নিবাস আশুগঞ্জ। কিন্তু ভদ্রলোক চাকরির সুবাদে বিগত ছয় বছর ধরে ঢাকায় থাকছেন। যখন টিয়া পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠবে, তখন শহিদুল রহমানেরও ট্রান্সফার হয় ঢাকাতে। সেই থেকে শহিদুল রহমানের পরিবার ঢাকায় থাকছেন। বয়স্ক শহিদুল রহমান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সকাল দশটায় উনার অফিস। এখন আটটা বাজে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নয়টায় বের হয়ে যান অফিসের জন্য। রোজকার মতো আজও তিনি হলরুমে বসে সময় টিভিতে সকাল আটটার খবর দেখছিলেন। ফাতিমা বেগম রান্নাঘরে রুটি বেলছিলেন আর ফাঁকে ফাঁকে চুলায় দক্ষ হাতে রুটিও সেঁকে নিচ্ছেন। শহিদুল রহমান এর ফাঁকে উঁচু গলায় ডাকলেন…
‘ কই গো শুনছো? আমাকে এক গ্লাস পানি দিয়ে যাও।
ব্যস্ততায় ফাতিমা বেগম রান্নাঘর হতে বেরোতে পারছেন না। রুটি পুড়ে যাচ্ছে। তিনি উঁচু গলায় ডাকলেন নিজের মেয়েকে…
‘টিয়া? এই টিয়া, তোর বাপকে এক গ্লাস পানি দিয়ে যা তো।
টিয়া ডাকে উত্তর দিল মায়া। টিয়া তখনো ঘুমে। জায়গা পরিবর্তন হওয়ায় মায়া রাতে ঘুমাতে পারছে না বিগত দুদিন যাবত। মায়া শহিদুল রহমানকে পানি দিয়ে চলে যেতে চাইলে শহিদুল রহমান মায়াকে থামিয়ে সোফায় বসতে বললেন। মায়াকে বিস্কুটের প্লেটটি এগিয়ে দিয়ে বললেন…
‘ বিস্কুটগুলো খাও তো মা।
‘আমি নাশতা করেছি আঙ্কেল।
মায়া রিনরিনে গলায় উত্তরটা করল।
মায়া রিদের সাথে ঝগড়া করে দু’দিন আগে টিয়াদের বাসায় উঠেছে। টিয়া, মায়া একই কলেজে পড়াশোনা করে। প্রাইমারি একসঙ্গে পড়েছিল দুজন। হাইস্কুল মায়া আশুগঞ্জে থেকে, আর টিয়া ঢাকা থেকে শেষ করে। এরপর কলেজ মায়া প্রথমে চট্টগ্রাম পরে ঢাকা ট্রান্সফার হওয়ায় কপাল ভালো থাকায় মায়া একই কলেজে টিয়াকে পেয়ে যায়। দুজন বাল্যকালের বান্ধবী, সঙ্গে একই এলাকার মানুষ হওয়ায় টিয়ার বাবার সঙ্গে মায়ার বাবারও একটা পারিবারিক সম্পর্ক আছে। শহিদুল রহমান টিভি দেখতে দেখতে মায়াকে প্রশ্ন করে বললেন…
‘আমি শুনেছিলাম তোমার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। তোমার শ্বশুরবাড়ি কোথায় মায়া?
মায়া বেশ আমতা আমতা করল শহিদুল রহমানের প্রশ্নের উত্তর দিতে। মায়া স্বামীর সাথে রাগ করে এখানে এসেছে, সেটা টিয়া ছাড়া তার পরিবারের কেউ জানে না। সবাই জানে মায়া এখানে বেড়াতে এসেছে কয়েক দিনের জন্য। মায়া আমতা আমতা করে উত্তর দিয়ে বলল…
‘জি, চট্টগ্রামে।
‘সে তো মেলা দূরে। শফিক ভাই তোমাকে এত দূরে বিয়ে দিলেন কেন? তোমার কি এটা পছন্দের বিয়ে ছিল মায়া?
বাবার বয়সী শহিদুল রহমানকে সত্যিটা জানাতে মায়া সংকোচ বোধ করল। মেয়ের বয়সী মায়া চাইলে একজন মুরুব্বি গুরুজনকে পছন্দের বিয়েটা সম্পর্কে সবকিছু জানানো যায় না। এতে লোকটা মায়াকে খারাপ ভাবতে পারে। তাই মায়া কথা ঘুরিয়ে জবাব দিয়ে বলল…
‘আমার আপার ভাসুরের কাছে আমাকে বিয়ে দিয়েছেন।
লোকটা যেন খানিকটা অসন্তুষ্ট হলো। আপত্তিকর গলায় ফের প্রশ্ন করে বললেন…
‘তোমার আপার ভাসুরের কাছে বিয়ে দিয়েছে, মানে, তোমার স্বামী তোমার থেকেও অনেক বয়স্ক হবে। এত বয়স্ক লোকের কাছে তোমার আব্বা তোমাকে বিয়ে দিতে রাজি হলো কেন? তোমাকে আরও কয়েক বছর পড়াতে পারত। শুনেছিলাম তোমার নাকি আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেবের ছোট ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, তাহলে সেই বিয়েটা দিলো না কেন শফিক ভাই? এত বয়স্ক লোকের কাছে বিয়ে দিলো কেন তোমার বাপ?
মায়া এবার বেশ ইতস্তত বোধ করল শহিদুল রহমানের পরপর প্রশ্নে। লোকটা মায়ার আর নাদিমের বিয়ে ঠিক হওয়ার ব্যাপারটা জানে। তাহলে মায়া যে এরপর বদনাম হয়ে, মানসিক রোগে বাড়ি ত্যাগ করেছিল—সেটা জানে না? নাকি নাদিমের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার অবধিই জানে? মায়া বেশ অস্বস্তি বোধ করল অতীত নিয়ে কথা বলতে। কিন্তু একই এলাকার মানুষ, সাথে যদি কোনো একদিন কারও হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, তাহলে সে লোক চৌদ্দ গোষ্ঠীর খবর নেওয়া শুরু করে দেয়। মায়ার সাথেও ঠিক তাই হচ্ছে। শহিদুল রহমান গ্রামে থাকে না বলে মায়ার থেকে গ্রামের খোঁজখবর নিচ্ছেন। মায়াকে চুপ থাকতে দেখে লোকটা ফের বলল…
‘তোমার শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামে হলে তুমি ঢাকা পড়ছ কোথা থেকে? হোস্টেলে থাকো?
মায়া জড়তার অবস্থায় উত্তর দিবে তক্ষুনি টিভিতে দৃশ্যমান হলো মায়ার একটি ছবি। টিভির নিচে হেডলাইন দিচ্ছে মায়ার নিখোঁজ হওয়ার খবরটা। সংবাদ উপস্থাপনকারী মেয়েটি খুবই দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করছে মায়ার নিখোঁজ বার্তাটুকু। যে বা যারা মায়ার সঠিক তথ্য দিতে পারবে, তাদেরকেও বেশ মোটা অঙ্কের টাকা পুরস্কৃত করা হবে। সংবাদ পাঠিকার উপস্থাপন আর টিভিতে দৃশ্যমান মায়ার ছবি দেখে মায়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল মূহুর্তে। আতঙ্কে মায়ার হাত-পা থরথর করে কেঁপে উঠল ভয়ে। শহিদুল রহমানের অবস্থাও বিস্ফোরণের মতো। তিনি বেশ অবাক, হতবাক, হতবুদ্ধি আর আচম্বিত হয়ে পড়েন। মায়ার নিখোঁজ এই খবরটি টিভিতে দেখাচ্ছে। তিনি ভারি আশ্চর্য স্বরে মায়াকে বললেন…
‘সে কী! তোমাকে টিভিতে নিখোঁজ দেখাচ্ছে কেন মায়া? তুমি বাসা থেকে বলে আসোনি এখানে?
মায়া উত্তর করল না। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। আতঙ্কিত মায়া ভয়ে হঠাৎ দৌড়ে পালিয়ে গেল টিয়ার রুমে। শহিদুল রহমান মায়াকে পিছন থেকে বেশ কয়েকবার ডাকলেন, কিন্তু মায়া শুনল না। শহিদুল রহমান বুঝলেন, মায়া নিজের পরিবারকে না জানিয়ে এখানে এসেছে। তিনি দ্রুত টিভিতে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করতে ফোন তুললেন। এর মাঝে ফাতিমা বেগম স্বামীর জন্য প্লেটে করে রুটি আর সবজি নিয়ে আসলেন। শহিদুল রহমানকে অস্থির ভঙ্গিতে টিভি থেকে নাম্বার তুলতে দেখে তিনি সেদিকে তাকাতে উনার চোখে পড়ল মায়ার ছবি। ফাতিমা বেগম হাতের প্লেট সোফার টেবিলে রাখতে রাখতে অবাক গলায় শুধালো বললেন…
‘এটা আমাদের মায়া না? ওকে টিভিতে দেখাচ্ছে কেন?
শহিদুল রহমান অস্থির গলায় উত্তর দিয়ে বললেন…
‘মায়া ওর পরিবারকে না জানিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছে খুব সম্ভবত। সেজন্য ওর পরিবার নিখোঁজ বার্তা টিভিতে দেখাচ্ছে। আমি টিভিতে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করে ওর পরিবারকে জানিয়ে দিচ্ছি যে মায়া আমাদের বাড়িতে আছে। নিশ্চয়ই শফিক ভাই মায়ার জন্য অনেক টেনশনে আছেন। আজকালকার বাচ্চারা কী বোঝে আল্লাহ জানেন। বাবা-মায়ের কথা চিন্তা না করেই একা বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। মায়া নিশ্চয়ই বাবা-মায়ের সঙ্গে রাগ করে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে এখানে এসেছে।
‘আল্লাহ, কী বলো! মায়া তো আমাকে এসব বিষয়ে কিছু বলেনি। টিয়া তো আমাকে বলল, ও নাকি মায়ার বাবা-মায়ের থেকে পারমিশন নিয়ে এখানে এনেছে বেড়াতে।
‘তোমার মেয়ে যত নষ্টের মূল। এখন পুলিশ আসলে তোমার মেয়েকে না, আমাকে ধরে নিয়ে যাবে দেখিও।
স্বামীর কথায় আতঙ্কিত হলেন ফাতিমা বেগম। রাগে তেড়েফুঁড়ে গেলেন টিয়াকে ইচ্ছামতো ধোলাই করতে। কিন্তু দরজা ভিতর থেকে লক করে থাকায় ফাতিমা বেগম চিল্লাচিল্লি করে দরজা ধাক্কিয়েও লাভ হলো না। টিয়া বা মায়া দুজনেই ভয়ে কেউ দরজা খুলল না। শহিদুল রহমান ফাতিমা বেগমকে থামিয়ে বললেন…
‘ফাতেমা, তুমি আপাতত ওদের সাথে চিল্লাচিল্লি করিয়ো না। ওরা ভয় পাচ্ছে। আমি মায়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওদের এখানে নিয়ে আসছি। তুমি ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দাও, যেন ওরা কোথাও বেরোতে না পারে।
শহিদুল রহমান টিভি থেকে নেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করতে করতে ঘর থেকে বেরোতে ফাতিমা বেগম ভিতর থেকে ফ্ল্যাটের দরজা আঁটকে দিলেন। মাথায় হাত দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে সোফায় বসে রইলেন অনেকক্ষণ। ফাতিমা বেগমের অর্ধেক রান্না সেইভাবেই রইল। অতিরিক্ত টেনশনে আর কিছুই রান্না হলো না। প্রায় চল্লিশ কি পঞ্চাশ মিনিট পর পুনরায় ফ্ল্যাটের দরজায় উচ্চ স্বরে কয়েকটি হাতের একত্রিত থাপ্পড় পড়ল। ফাতিমা বেগম সোফা হতে ধড়ফড়িয়ে দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে। প্রথমে দরজা খুলতে ভয় পাচ্ছিলেন। দরজার বাইরে অনেকগুলো মানুষের কলরব আর হৈচৈ শোনা যাচ্ছিল। ফাতিমা বেগম ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁপতে লাগলেন। মায়া নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটাকে ঘিরে পুলিশ তাঁদের বাড়িতে হামলা করেছে কিনা—সেই ভয় পাচ্ছেন। শহিদুল রহমান নিচে গিয়েছিল মায়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, নিশ্চয়ই তাঁকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন উনাদের জন্য পুলিশ আবার এসেছে, যেহেতু মায়া তাঁদের ফ্ল্যাটে আছে, তার মানে তাঁরাই আসল আসামি। ভয়ার্ত ফাতিমা বেগম যখন দরজা খুলছেন না, তখন দরজার ওপর থাপ্পড়গুলো আরও জোরালো হলো। বাহির থেকে অনেকগুলো মানুষ হৈচৈ করে ডাকছে আর বলছে…
‘এই! ভিতরে কে আছেন, দরজা খোলুন। নয়তো আমরা দরজা ভেঙে ফেলব। দরজা খোলুন।
ফাতিমা বেগম আতঙ্কিত ভঙ্গিতে খানিকটা সাহস জুগিয়ে বললেন…
‘কে আপনারা? কাকে চান এখানে?
তক্ষুনি শোনা গেল শহিদুল রহমানের কণ্ঠস্বর। তিনি বললেন…
‘ফাতেমা, দরজা খোলো। আমার সাথে মায়ার পরিবারের লোক এসেছে।
স্বামীর গলা পেয়ে ফাতিমা বেগম চট করে দরজা খুলে দিতেই এক ঠেলায় প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন লোক একত্রে ঘরে ঢুকে গেল। দশ-বারোজন পুলিশের সঙ্গে নিহাল খান, আরাফ খান, রাদিফ, আরিফ, শফিকুল ইসলাম, জামাল ইসলাম, আসিফ—সকলেই এসেছে রিদের সঙ্গে। রিদের ছেলেপেলে বিল্ডিংয়ের নিচে ভিড় জমিয়ে এলোমেলো ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছু ছেলেপেলে রিদের সঙ্গে শহিদুল রহমানের ফ্ল্যাটে এসেছে। খবর পেয়ে সুফিয়া খানও ছুটে এসেছেন। বিল্ডিংয়ের লিফট না থাকায় তিনি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন। শহিদুল রহমান টিয়ার ঘর দেখালেন, বললেন মায়া এই ঘরে আছে। রাদিফ, আরিফ, শফিকুল ইসলাম, নিহাল খান সকলেই পালাক্রমে ডাকল মায়াকে দরজা খুলতে। পরিচিত মানুষের গলা পেয়ে মায়া ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। মায়ার মতো অস্থির, উত্তেজিত, দিশেহারা টিয়াও। বান্ধবীর উপকার করতে গিয়ে যে এইভাবে বিপদে পড়ে যাবে, সেটা টিয়া নিজেও ভাবেনি।
এবার দরজা ভাঙার উপক্রম হলো। যখন মায়া বা টিয়া কারও ডাকে দরজা খুলছিল না, তখন রিদের ছেলেপেলে দরজা ভাঙতে চাইল। দরজার বিকট শব্দে দেয়াল কেঁপে কেঁপে উঠছিল, তখন আতঙ্কিত মায়া দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই মায়ার নিঃশ্বাস আঁটকে এলো। কেউ একজন মায়ার গলা চেপে ঠেলে পিছিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। মায়া পিঠ দেয়ালে ঠেকে যেতে মায়া আতঙ্কিত ভঙ্গিতে গলায় রিদের হাতটি ধরে অনবরত কাশতে লাগল। আকস্মিক আক্রমণে সকলে হতবিহ্বল। কেউ বুঝে উঠার আগেই রিদ মায়ার গলা চেপে হিংস্র গর্জনে বলল…
‘ পালাইলি কেন? আমারে তোর মানুষ মনে হয় না বেয়াদবের বাচ্চা? আমি খুঁজে পেলে তোকে কী করব, সেই চিন্তা মাথায় আসে নাই? বউ বলে ছাড় পেয়ে যাবি? কলিজা নড়ে না ভয়ে? মরার পাখা গজাচ্ছে?
আসিফ, আরিফ, রাদিফ, শফিকুল ইসলাম, জামাল ইসলাম, নিহাল খান, আরাফ খান—সকলেই এগিয়ে আসল আকস্মিক আক্রমণে রিদকে থামাতে। মায়া কাশতে কাশতে ছটফট করে চোখ উলটে দিচ্ছে, নিঃশ্বাস আটকে। সকলে একত্রে রিদকে ঝাপটে টেনে ধরে পিছিয়ে যেতেই মায়া শরীর ছেড়ে ঢলে পড়তে নিলে সুফিয়া খান দৌড়ে এসে মায়াকে আঁকড়ে ধরেন, পড়া থেকে বাঁচিয়ে। তিনি ঘরে ঢুকতে রিদের গর্জন আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে এদিকটায় দৌড়ে আসেন। কাল থেকে মায়ার খোঁজে রিদ দিশেহারা। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম সবকিছু হারাম করে মায়াকে পাগলের মতোন খোঁজে চলেছে। রিদের সুগারের সমস্যা হয় না খেয়ে থাকলে। তাছাড়া রিদের মাথার এক্সিডেন্টের ফলে আজও রিদকে রেগুলার মেডিসিন নিতে হয় তার জন্য। কিন্তু মায়ার টেনশনে সবকিছু ভুলে রিদ শুধু মায়ার খোঁজে দিশেহারা ছিল। মায়াকে খুঁজে পেলে রিদ কী করবে, সেই চিন্তা সুফিয়া খানের মাথাতেও ছিল। মায়া অন্যায় করেছে, তিনি মানছেন; মায়ার কাউকে কিছু না বলে এভাবে হঠাৎ পালিয়ে যাওয়াটা উচিত হয়নি, কিন্তু তাই বলে রিদ মায়াকে এভাবে আঘাত করবে—সেটাও ঠিক নয়। সুফিয়া খান মায়াকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলেন। মায়া সুফিয়া খানের ওপর শরীরের ভার ছেড়ে বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। রাদিফ রিদকে ঝাপটে জড়িয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল…
‘ভাই, প্লিজ থামো। শান্ত হও। ভাবি ভয় পাচ্ছে।
রিদকে জড়িয়ে ধরে আছে সকলেই। শফিকুল ইসলাম আর জামাল সাহেব রিদকে ছেড়ে দিয়েছেন ততক্ষণে। মায়াকে রিদ ভালোবেসে বিয়ে করেও এভাবে আঘাত করতে পারে, সেটা তাঁদের ধারণাতেও ছিল না। শফিকুল ইসলাম আর জামাল সাহেব তো মায়ার নিখোঁজের সংবাদ পেয়ে সবকিছু ভুলে ঢাকায় ছুটে এসেছেন। রিদের বাসায়ও থাকছেন। মায়া এই বাড়িতে আছে এই সংবাদটা পেয়ে উনারা সবার সাথে ছুটে এসেছিলেন মায়াকে দেখতে, কিন্তু মায়াকে দেখার আগেই রিদের আক্রমণ। উনাদের মনে হলো মায়া রিদের কাছে ভালো নেই। সুফিয়া খান রিদের তোলপাড় দেখে রাগান্বিত ভঙ্গিতে বললেন…
‘রিদ, শান্ত হও। মেয়েটাকে আঘাত করছ কেন?
রিদ হুংকার ছেড়ে সবার থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে গর্জে উঠে বলল…
‘ছাড় আমারে। বেয়াদবের বাচ্চার কত বড় কলিজা হয়েছে, আজ আমিও মেপে দেখব। আমার অবাধ্য হয়? আমার? ওর সাহসের দাঁত আজ আমি ভাঙব। ওর কোন বাপ ওকে আজ বাঁচায় সেটাও আমি দেখব।
‘রিদ!
ধমকে উঠলেন সুফিয়া খান। এর মাঝে মায়া রিদকে পাল্টা উত্তর দিতে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল…
‘অসভ্য লোক, বেশ করেছি পালিয়েছি। আরও পালাব। আমাকে খালি মারেন। আমি যাব না আপনার বাড়িতে। করব না আপনাকে বিয়ে। খাব না আপনার ভাত। যান আপনি।
মায়ার পাল্টা জবাবে রিদের রাগে ঘি পড়ল যেন। রিদ হিংস্রত গর্জে উঠে সবাইকে নিয়ে মায়ার দিকে তেড়েফুঁড়ে যেতে চাইল। মায়া ভয়ে সুফিয়া খানের পিছনে আশ্রয় নিল। রিদ দাঁতে দাঁত পিষে গর্জনে বলল…
‘তোর সাথে সংসারের মাইরে বাপ! তোর মতো বেইমান নারীর জন্য রিদ খানের দরজা চিরতরে বন্ধ। তুই তোর বাপের বাড়ি চলে যাবি। আমার সাথে তোর সব সম্পর্কের ইতি। যে নারী স্বামীর মন বোঝে না, সে রিদ খানের যোগ্য নয়। ছাড় আমারে।
রিদ শরীর ঝাঁকিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে নিল। যে হিংস্রতা নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল, সেই একই তেজে বেরিয়েও গেল। রিদের পিছন পিছন আসিফ দৌড়ে গেল। বাকিরা সকলেই হতভম্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কী থেকে কী হলো—কিছু বুঝল না কেউ। সুফিয়া খান কপাল কুঁচকে রিদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বউয়ের প্রতি কত দিশেহারা পাগল হয়ে এখানে ছুটে এসেছিল রিদ, সেটা মায়া কেন, উপস্থিত কেউ বুঝতে পারেনি। রিদ ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না বলে রাগ দেখায়। রিদের ভালোবাসা প্রকাশ পায় রাগের মাঝে। রাগান্বিত রিদের সঙ্গে তর্ক করলে তখন রিদ আরও রেগে যায়—এটা মায়া জানা সত্ত্বেও কেন তর্ক করল? কারণ কী? সুফিয়া খান পিছন ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মায়ার দিকে। মায়া সুফিয়া খানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুঝে নত মস্তক হলো। সুফিয়া খান সকলকে বেরিয়ে যেতে বলে তিনি মায়াকে প্রশ্ন করে বলল…
‘তোমার হয়ে আমরা কথা বলছিলাম, তাহলে তুমি রিদের সঙ্গে তর্ক করলে কেন? রিদ তর্ক পছন্দ করে না, সেটা জানো না?
নত মস্তকের মায়া মিনমিন করে উত্তর দিল…
‘জানি।
‘তাহলে তর্ক করলে কেন?
‘আমি তর্ক না করলে উনি এখান থেকে যেতেন না। বরং আব্বা-চাচাদের সামনে আরও হাইপার হয়ে যেতেন। এটা নিয়ে পরে আরও ঝামেলা হতো। এমনিতেই দুই পরিবারের ঝামেলা কমছে না। উনি আমার পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঠিক করতে চাচ্ছেন না। এখন আবার উনার বাজে ব্যবহারের আব্বা, চাচার মন ক্ষুণ্ণ হতো। উনারা ভাবতো আমি ভুল ডিসিশন নিয়েছি আপনার ছেলেকে জীবন সঙ্গী হিসাবে বাচাই করে।
মায়ার কথার মানে চতুর সুফিয়া খান চট করে বুঝে গেলেন। তিনি মায়াকে ফের প্রশ্ন করে বলল…
‘এখন যে তর্ক করলে, এখন সম্পর্ক ঠিক থাকবে মনে করছ? রিদ তোমাকে মারবে?
মায়া দৃঢ়তায় উত্তর দিয়ে বলল…
‘মানবে। আমি আপনার ছেলের রাগ পরে ভাঙাব। আপনি আমাদের বিয়েটা ভাঙতে দেবেন না আম্মু। আমি আজ আশুগঞ্জ চলে গেলেও আপনি বিয়ের ডেটটা ঠিক রাখবেন। নয়তো পরে আপনার ছেলে আবার বেকে বসবে।
‘ এখন বেকে বসবে না? রিদ মানবে এই বিয়ে টা?
‘মানবে। আর যদি না মানে, তাহলে আমি চলে আসব। তারপরও আপনি বিয়ের ডেটটা ঠিক রাখবেন আম্মু। নয়তো পরে দুইপরিবারের মাঝে সম্পর্কটা আরও নষ্ট হয়ে যাবে যদি বিয়েটা ভেঙে যায়।
মায়ার কথায় সুফিয়া খানের কপালের ভাঁজ শীতল হলো। তিনি মায়ার ওপর অসন্তোষ্টি প্রকাশ করে গম্ভীর গলায় আবারও বলল…
‘সবকিছুতে ছেলেমানুষি করতে নেই মায়া। আমার ছেলে মুখ ফুটে সবকিছু প্রকাশ করতে পারে না বলে, তার মানে এই না যে আমার ছেলের কষ্ট হয় না। কাল থেকে রিদ খাওয়া-দাওয়া, ঘুম হারাম করে তোমার খুঁজে দিশেহারা, পাগল পাগল হয়ে পুরো ঢাকা শহরে তল্লাশি করেছে। তোমার বান্ধবী রাফার শ্বশুরবাড়িতেও পুলিশ ফোর্স পাঠিয়েছে। নাদিম গোটা একদিন জেলে ছিল। তোমার খোঁজ পাওয়ার পর নাদিমকে আজ সকালে ছাড়া হয়। তোমার ছেলেমানুষির জন্য অনেকগুলো মানুষ ভুক্তভোগী।
‘সরি আম্মু।
‘সবসময় সরিতে কাজ হয় না। আমাদের বুঝে শুনে কাজ করা উচিত।
চলবে…….