লেখনীতে:লুনা আক্তার নূর
পর্ব:৫
__:- এই কে রে। ছাড় আমার হাত। তোর এত বড় সাহস আমার হাত ধরিস। তোকে তো আমি…
আর বলতে পারলো না লোকটা তার আগেই ইভান লোকটির নাক বরাবর একটা ঘু’ষি মে’রে দেই। লোকটি তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়। তার নাক দিয়ে গল গল করে র’ক্ত বের হচ্ছে।
লোকটা নিজেকে সামলিয়ে উঠে দাড়াই আর ইভানের দিকে তেড়ে আসে। ইভান লোকটিকে তেড়ে আসতে দেখে লোকটার পায়ের একটা লা’থি মা’রে যাতে লোকটি পড়ে যায়।
__:- তোর এত বড় সাহস তুই আমাকে মা’রি’স। তোকে তো আজকে আমি শেষ করেই দেবো। আমার গায়ে হাত তোলা। তুই আমাকে চিনিস না।
ইভান:- তোর সাহস তো কম নয়। একা একটা মেয়ে কে পেয়ে কি করতে চাইছিস তুই।
__:- এই কে রে তুই। আমার কাজে একদম নাক গলাবি না। যা তো এখান থেকে যা।
বলেই লোকটা আবার আইরার দিকে এগোতে থাকে। লোকটা আইরাকে ছুঁতেই যাবে এমন সময় ইভান লোকটার হাত পিছন থেকে মু’চ’ড়ে দিয়ে বলে,
ইভান:- তুই ও আমাকে চিনিস না। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা ও নেই। তোকে শেষ করে দিতে আমার ১ সেকেন্ড ও সময় লাগবে না। এই ইভান রহমানের একটা ফোনেই তোর জীবন শেষ।
ইভান রহমান নামটা শুনেই আইরার বুকের ভিতর মো’চ’ড় দিয়ে উঠলো।
আইরা:- ইভান রহমান। উ..উনি আবার ফিরে এসেছেন, কিন্তু কেনো। আম্মু যে বলল উনি আসেন নি। আম্মু কেনো আমাকে মি’থ্যা বললো? তাহলে কি এবার একেবারে এই সম্পর্ক টা শেষ করতেই কি ফিরে এসেছেন উনি? (মনে মনে)
ইভানের নাম শুনে লোকটি একটুও ভয় পাই না। লোকটা অপর হাত দিয়ে নাক থেকে র’ক্ত পরিষ্কার করে ইভানকে বলে,
__:- তাই নাকি। তাহলে দেখি তোর কত শক্তি।
বলেই লোকটি ইভান কে মা’র’তে যায় তবে ইভান তাকে আটকে ফেলে। ইভান একটা ডে’ভি’ল স্মাইল দিয়ে বলে,
ইভান:- মনে হচ্ছে তুই এলাকায় নতুন। নাহলে আমাকে চিনিস না। আমায় এক নামে সবাই চেনে আর তুই চিনিস না। সমস্যা নেই তবে চল তোকে চিনিয়েই দি যে আমি কে আর আমার ক্ষমতা ঠিক কত টুকু। (দাঁতে দাঁত চে’পে)
বলেই ইভান লোকটির হাত আরো জোরে মু’চ’ড়ি’য়ে দেওয়ালের সাথে চে’পে ধরে। এতে লোকটা একটা চি’ৎ’কা’র করে উঠে। ইভান লোকটির হাত এমন ভাবে মু’চ’ড়ে ধরেছে যে তার হাতের হাড় হয়তো এখনই ভে’ঙ্গে যাবে মনে হচ্ছে। ইভান আরেকটু জোরে চে’পে ধরে। এবার লোকটি আর সহ্য করতে না পেরে বলে,
__:- আমাকে ছেড়ে দিন আমার লাগছে। ওরে বাবা মনে হচ্ছে হাতের হাড় ভে’ঙ্গে গিয়েছে। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন স্যার। আমি আর কোনোদিনও কোনো মেয়ের দিকে তাকাবো না। আল্লাহ গো আমার হাত টা শেষ হয়ে গেলো।
ইভান:- তাকাবি তো তখন যখন দেখার জন্য তোর চোখটা থাকবে। খুব সাহস হয়ে গিয়েছে না তোর। তোর সাহস এখন কোথায় গেলো।
__:- আমাকে প্লিজ মাফ করে দেন। আমি আর কোনোদিনও এমন কাজ করবো না।
ইভান এবার লোকটিকে ছেড়ে দেই।
ইভান:- যা আজকের মতো ছেড়ে দিলাম তোকে। আর যদি তোকে এই বাড়ির ত্রি সীমানায় দেখেছি না তো তোর খবর আছে।
ইভানের বলতে দেরি কিন্তু লোকটার পালাতে দেরি হয় না। লোকটি চলে যেতেই ইভান, আইরার কাছে আসে। আইরা এখনো নিচেই বসে আছে। ইভান তার কাছে গিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দেই।
কিন্তু আইরা তো আর চোখে দেখতে পাই না তাহলে সে কিভাবে বুঝবে যে ইভান তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আইরা, ইভানের হাত ধরেছে না দেখে ইভান বলে,
ইভান:- এই যে মিস হাত টা ধরছ না কেনো। আমাকে ও কি ঐ লোকটার মতো খা’রা’প ভাবছো। দেখো আমি কিন্তু একদমই খা’রা’প নয়। যদি খা’রা’প ই হতাম তাহলে তোমাকে ঐ লোকটার থেকে বাঁচতাম না। তাই আমার ওপর ভরসা করতেই পারো।
আইরা এবার বুঝতে পারে যে ইভান তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সে এখন ভাবছে যে সে কি ইভানের হাত ধরবে নাকি না। কারণ সে যদি হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে ইভানের ধরে তাহলে ইভান তাকে সন্দেহ করতে পারে।
তখনই জারা হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে আসে আর বলে,
জারা:- তুমি এখানে। আমি তো তোমাকে সেই কখন থেকে খুঁজছি।
জারার গলা পেয়ে আইরা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আইরা বলে,
আইরা:- আপু আমাকে একটু উঠতে হেল্প করো না। আমি উঠতে পারছি না।
জারা:- কি হয়েছে আ….
বলতে গিয়েও থেমে যায় জারা, কারণ এতক্ষণ সে ইভান কে খেয়াল না করলেও এখন সে ঠিকই ইভান কে খেয়াল করেছে। তাই জারা আর আইরার নাম মুখে নেই না। সে আইরার কাছে গিয়ে তাকে উঠিয়ে বলে,
জারা:- এ মা তুমি পড়ে গেলে কিভাবে??
ইভান:- আর বলো না ভাবী। একটা বাজে লোকের নজর পড়েছিল ওর ওপর। তার থেকে বাঁচতে দৌড়াতে গিয়েই হয়তো পড়ে গিয়েছে। বলছি যে তুমি কোথাও ব্য’থা পাওনি তো??
আইরা:- না না। আমি একদম ঠিক আছি।
আইরা যতই বলুক সে ঠিক আছে তবে সে পায়ে প্রচুর ব্য’থা পেয়েছে। ঠিক মতো দাঁড়াতেও পারছে না। তাও আইরা নিজেকে বাইরে থেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করে।
জারা:- কি বলছ ইভান, বাজে লোকের নজর মানে।
তারপর ইভান, জারা কে সব খুলে বলে।
জারা:- আল্লাহ আজকে যদি তুমি না থাকতে তো মেয়েটার যে কি হতো। আসলে আমারই ভুল হয়েছে ওকে ঐখানে একা রেখে যাওয়া টা আমার একদমই ঠিক হয়নি। যদি ফুপি এই সব জানতে পারে তো….
জারা পুরো কথা শেষ করার আগেই মিসেস শারমিনের কথা মনে পড়ে যায়, তাই সে পুরো কথা শেষ না করেই আইরা কে নিয়ে চলে যেতে লাগে। তখনই ইভান পেছন থেকে বলে উঠে,
ইভান:- এক মিনিট ভাবী। তুমি একটু আগে কি বললে। যদি ফুপি এই সব জানতে পারে তো মানে। তুমি কি মমের কথা বলছ! মম জানতে পারলে কি হবে? আর এই মেয়েটা কে?
জারা:- আ আ মানে ব্যাপারটা হলো কি যে।
ইভান:- হ্যাঁ, বলো কি ব্যাপার। সেটাই তো জানতে চাইছি। তোমরা কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ। (সন্দেহের গলায়)
জারা:- কি বলছ ভাই আমরা আবার কি লুকাবো। কিছুই লুকাচ্ছি না। (মেকি হেসে)
ইভান:- তাহলে সত্যি টা বলো।
আইরা:- আমি বলছি। আমি নওমির ফ্রেন্ড। আর আমার আম্মু কে জারা আপু ফুপি বলে ডাকে। কি আপু ঠিক বললাম তো।
জারা:- হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছে ও। একদম ঠিক বলেছে। আচ্ছা ইভান তাহলে আমরা এখন যাই, হ্যাঁ।
ইভান আর কিছু বলতে যাবে তার আগেই জারা, আইরা কে নিয়ে যেতে লাগে। ইভান খেয়াল করলো যে আইরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
ইভান কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না তার আগেই জারা, আইরা কে নিয়ে নিচে চলে যায়। ইভান ও আর দাঁড়ায় না সেও নিচে চলে যায়।
আসলে এতটা পথ জার্নি করে আসার ফলে ইভানের শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছিল। তাই সে রুমে যাওয়ার জন্য এইদিক দিয়েই যাচ্ছিল আর তখনই আইরার চি’ৎ’কা’র তার কানে ভেসে আসে।
,,,,,,,,,,,,,,
আইরা নিজের রুমে বসে আছে। মিসেস শারমিন, আইরার জন্য খাবার আর মেডিসিন নিয়ে রুমে আসেন। মিসেস শারমিন রুমে ঢুকে দরজাটা চা’পি’য়ে দিয়ে আইরার পাশে বসেন।
ছাদে আইরার সাথে যা যা হয়েছে সেটা মিসেস শারমিন জানেন না। মিসেস শারমিন কেনো কেউই জানে না শুধু ইভান, আইরা আর জারা ছাড়া। জারা, মিসেস শারমিন কে সবটাই বলতে চাইছিল তবে আইরা বারণ করাই সে কাউকে কিছুই বলতে পারেনি।
রুমে এসে পায়ে ব্য’থাটা বেড়েছিল। মিসেস শারমিন জিজ্ঞেস করাই আইরা তাকে মি’থ্যে বলে যে সে ওড়নায় পা বেধে পড়ে গিয়েছিল।
এতে অবশ্য মিসেস শারমিন, জারা কে বেশ ব’কা’ঝ’কা করেছিলেন, তবে আইরা সবটা সামলিয়ে নিয়েছে। আইরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে মিসেস শারমিন যদি সত্যিটা জানতে পারে তো তুলকালাম কাণ্ড ঘটাবে।
এমনিতে সকালে যা করলো। পড়ে গিয়ে পায়ে লেগেছে বলে জারা কে এত কথা শুনিয়েছে তাহলে আসল ঘটনা জানলে তো আর কারোরই র’ক্ষে নেই।
মিসেস শারমিন খাবার মাখিয়ে আইরার মুখে তুলতে যাবে তখনই তিনি দেখতে পান যে আইরার চোখ গুলো ছল ছল করছে। তিনি খাবার আইরার মুখের কাছে থেকে সরিয়ে বলেন,
__:- কি হয়েছে মা। তোর চোখে পানি কেনো?? পায়ে কি বেশি ব্য’থা করছে? তোর বাবাই কে কি ডাকবো?
আইরা:- উনি দেশে ফিরেছেন তাই না আম্মু? সকালে তুমি আমাকে মি’থ্যে কেনো বললে? আমি তাহলে ঠিকই ছিলাম তাই না, আম্মু!!
আইরার কথা শুনে মিসেস শারমিন স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি বলে,
__:- উ..উনি মানে।
আইরা:- তোমার ছেলে আম্মু।
__:- কি যা তা বলছিস তুই। ইভান কেনো দেশে ফিরতে যাবে। (তোতলাতে তোতলাতে বলেন)
আইরা:- আমি চোখে দেখতে পাই না বলে তোমরা সবাই এত বড় একটা কথা আমার থেকে লুকিয়ে গেলে আম্মু। আমাকে অন্তত একবার বলতে পারতে। (কাঁপা কাঁপা গলায়)
__:- আইরা এই সব তুই কি বলছিস।
আইরা:- ঠিকই তো বলছি আম্মু।
আইরা এবার কেঁদেই ফেলে। মিসেস শারমিন, অন্য হাত দিয়ে আইরার চোখের পানি মুছে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
__:- এই জন্যই তোকে আমি কিছু বলতে চাইনি। দেখেছিস তুই কতটা ক’ষ্ট পাচ্ছিস। সকালে ও ওর কথা শুনে কাঁদছিল।
আইরা:- উনি আমাকে ডি’ভো’র্স দিতে এসেছেন তাই না আম্মু। (কাঁদতে কাঁদতে)
__:- আমি জানি না ও কেনো আবার দেশে ফিরেছে। তবে ও যদি তোকে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিতে আসে তাহলে বলব ভালোই হবে। তোকে আর এই অসুস্থ সম্পর্ক টাকে বয়ে বেড়াতে হবে না, আর ক’ষ্ট ও পেতে হবে না। আমি তোর জন্য রাজকুমারের মতো একটা ছেলে দেখে বিয়ে দেবো। যে তোকে বুঝবে, তোকে সব সময় আগলে রাখবে, তোকে সম্মান করবে বুঝছিস। নে এখন খেয়ে নে।
আইরা:- না আম্মু আমি আর বিয়ে করতে চাই না। আমার জীবনে আর নতুন করে কাউ কে চায় না আমার।
মিসেস শারমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
__:- আচ্ছা ঠিক আছে বাদ দে এইসব কথা এখন চুপ চাপ খেয়ে নে। কালকে অনেক সকাল সকাল উঠতে হবে। আর তুই ইভান কে নিয়ে ভাবিস না। ওকে নিয়ে যত ভাববি কষ্ট টা ততই বাড়বে বৈ কমবে না।
,,,,,,,,,,,,,,,
ইভান:- মেয়েটা কে? যদি ও নওমির ফ্রেন্ড হয় তবে ওর আম্মু কে ভাবী ফুপি কেনো বলবে?? আর ও ই বা ভাবীকে ভাবী না বলে আপু বলে কেনো ডাকছে? নওমি তো ভাবীকে ভাবী বলে। সব কিছু কেমন যেনো গুলিয়ে যাচ্ছে। সবাই আমার থেকে কিছু তো লুকাচ্ছে। কিন্তু কি সেটা?? আরিয়ান কে একবার জিজ্ঞাসা করবো। না থাক কালকেই না হয় জিজ্ঞাসা করবো। এখন এত রাত হয়ে গিয়েছে সবাই হয়তো ঘুমাচ্ছে।
ইভান নিজের রুমে পায়চারি করছে আর এই সব কথাই ভাবছে। আসলে ইভান যখন আইরা কে দেখে তখন কেনো যেন তার ভেতর একটা অদৃশ্য টান কাজ করছিল। যেই টানের জন্য সে কানাডা থেকে চলে এসেছে, ঠিক সেই টানই ইভান আইরার জন্য ফিল করছিল তখন। তাই তো ঐ লোকটাকে ছেড়ে দেওয়ার পর ও শান্তি হয়নি ওর।
সে নিজের লোক লাগিয়ে ঐ লোক কে খুঁজে বের করে তার উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে। ঐ লোকের চোখ গুলো উপড়ে নিয়েছে ইভান। কারণ ঐ লোকটা আইরার দিকে কু’ নজর দিয়েছে। কিন্তু ইভান কেনো এইসব করেছে সে বুঝতে পারছে না। তার ঐ সময় প্রচুর রা’গ হচ্ছিল ঐ লোকের ওপর।
ইভানের ভাষ্য মতে কেনো ঐ লোকটা আইরার গায়ে হাত দেবে, কেনো তার দিকে কু’ নজর দেবে।
ইভান:- এ বাবা মেয়েটার নাম টাই তো জানা হলো না। তবে যাই হোক না কেনো মেয়েটা খুব মায়াবী। ওকে দেখে কেনো যেন আমি একটা অদৃশ্য টান অনুভব করছি। কিন্তু কেনো এমন হচ্ছে। ধুর এত ভেবে কি হবে। আমি যার জন্য দেশে ফিরেছি সেই কাজ টা তাড়াতাড়ি করতে হবে।
ইভান আর বেশি না ভেবে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে আর নিজের পাশে হাত বোলাতে বোলাতে বলে,
ইভান:- আর বেশি দিন আমার পাশের জায়গাটা ফাঁকা থাকবে না। ৫ বছর আগে যেই ভুলটা করেছি সেটা শুধরানোর সময় এসে গিয়েছে, তবে এই ভুল শুধরাতে আমাকে বেশ কাঠখড় পড়াতে হবে মনে হয় পিচ্চি।
বলেই মুচকি হাসে ইভান।
চলবে…….
{ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন 😊😊}