(বাংলা অনুবাদ)
Author : Solche
পর্ব ৩
_______
পশ্চিম আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় গোলাপি আভায় রঙিন হয়ে উঠতেই লায়লা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলো। পেছনের দরজা দিয়ে, যা গোলাপ বাগানের সঙ্গে যুক্ত, বাইরে বেরোতেই সে এক সতেজ হাওয়ার ছোঁয়া পেল। ডান হাতে সোনার মুদ্রাটি শক্ত করে ধরে, সে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হাঁটছিল।
কিন্তু তার সেই উচ্ছ্বাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ক্লডিন সেখানে ছিল। সে ফুলে ভরা লতানো গোলাপের নিচে থাকা পার্গোলার তলায় বসে তার কাজিনদের সঙ্গে হাসিখুশি গল্প করছিল। লায়লাকে দেখামাত্রই আগের সেই সূক্ষ্ম হাসিটা আবার তার মুখে ফুটে উঠল, আর সে বলল, “বাই, লায়লা।” তার আশেপাশে থাকা কয়েকজন তরুণও লায়লার দিকে তাকাল। সৌভাগ্যক্রমে ডিউক হেরহার্ড্ট সেখানে ছিলেন না। লায়লা কিছু না বলে কেবল মাথা নোয়াল। ক্লডিন এ জন্য তাকে কোনো সমালোচনা করল না, যা থেকে বোঝা গেল যে এটা শিষ্টাচারের বিরুদ্ধ নয়।
লায়লা ছোট ছোট দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল, যতক্ষণ না তারা তার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। তারপর সে দৌড়াতে শুরু করল। সে আর অপেক্ষা করতে পারছিল না এই অদ্ভুত, অচেনা জগত ছেড়ে আঙ্কেল বিলের কটেজে ফিরে যেতে। কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে, সেদিনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তার সঙ্গে ঘটল।
বাগান আর জঙ্গলের পথের মাঝের পাথর বসানো সীমানা পার হওয়ার সময় সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। তার হাত থেকে সোনার মুদ্রাটি ছিটকে পড়ে মাটিতে গড়িয়ে গেল, তারপর কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির জুতার আগায় গিয়ে ঠেকল। মুদ্রাটি ঘুরতে ঘুরতে থেমে যাওয়ার মুহূর্তে সে তাকিয়ে রইল। লোকটি অনায়াসে তার জুতার সামনের অংশ তুলে মুদ্রার ওপর রাখল, আর সেটাকে থামিয়ে দিল। লায়লার চোখ ধীরে ধীরে সেই মানুষের চকচকে জুতা থেকে উঠে তার লম্বা পা বেয়ে তার মুখে গিয়ে থামল, যে মুখটি নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে ডিউক হেরহার্ড্ট!
চমকে উঠে লায়লা স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাফিয়ে দাঁড়াল। তার সাদা পোশাক এখন ময়লা আর হাঁটুর ক্ষত থেকে ঝরা রক্তে দাগ পড়েছে। ডিউক শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ঠোঁটের কোণে যেন এক চিলতে হাসি ফুটে উঠছিল। নিজের ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ রেখে, লায়লা তার পোশাক থেকে ময়লা ঝাড়তে লাগল। এটা করতে করতে, ডিউক হেরহার্ড্ট ধীরে এক পা পিছিয়ে গেলেন। তার জুতার নিচে থাকা মুদ্রাটি সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করে উঠল। লায়লার পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু আগে মুদ্রাটা তুলে নিতে চাইল, তাই সে ডিউকের দিকে এগিয়ে গেল। মুদ্রাটা তুলতে নিচু হওয়ার সময় হঠাৎ তার মনে পড়ল, বিদায়ের সময় ক্লডিন কী বলেছিল, “ও তো একটা কুকুরছানার চেয়েও অকর্ম।”
ওই কথাগুলো তাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। সে মুদ্রাটা তুলে নিয়ে শক্ত করে হাতে ধরল এবং ডিউক হেরহার্ড্টের সামনে ভদ্রভাবে মাথা নোয়াল। একবার মাথা নোয়ানোর পর সে আর মাথা তুলতে সাহস পেল না। নিঃশ্বাস আটকে রেখে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে থাকল। হঠাৎ সে বুঝতে পারল, পড়ে যাওয়ার ফলে শরীরজুড়ে যে ব্যথা ছিল, তা আর অনুভব করছে না। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল। সে আবার দৌড়াতে শুরু করল, ডিউক হেরহার্ড্টকে পেছনে ফেলে। হাঁটুতে ব্যথা থাকায় আগের মতো দ্রুত দৌড়াতে পারছিল না, তবুও থামল না। তার ভেতরে কিছু একটা জমে উঠছিল। জঙ্গলের পথ পেরিয়ে কটেজ থেকে বের হওয়া আলো দেখতে পাওয়ার পরই সে বুঝতে পারল সেটা কী….সেটা ছিল দুঃখ।
____
“এটা আপনি নিতে পারেন, আঙ্কেল।” লায়লা তার দুঃখ চেপে রেখে সোনার মুদ্রাটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
বিলের ঘন ভ্রু ধীরে কুঁচকে গেল। “ওটা কী?”
“একটা সোনার মুদ্রা।”
“ওটা তো আমি জানি। কোথায় পেয়েছ?”
“মিস ক্লডিন আমাকে দিয়েছে।”
“ক্লডিন? আহ, হ্যাঁ, সেই তরুণ অভিজাত মেয়েটা।” তিনি মাথা নেড়ে বললেন।
লায়লা প্রাসাদে যাওয়ার পর এই দুই দিন ধরে সে মনমরা হয়ে ছিল। তার কথা বলতে ইচ্ছে করত না, এমনকি বন বা বাগানে ঘুরতেও না। এই দুই দিনেই বিল বুঝতে পেরেছিলেন, ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে তার প্রতিদিনের জীবনে তিনি কতটা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। এখন সে চুপচাপ হয়ে যাওয়ায়, তার জীবনও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। আর এই নিস্তব্ধ জীবন তার মোটেও ভালো লাগছিল না। সে যেখানে বসেছিল সেই টেবিলের দিকে একটু ঝুঁকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু তুমি এই টাকা আমাকে দিচ্ছ কেন?”
লায়লা নিজের ভঙ্গি সোজা করে আঙ্কেল বিলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ আমার মনে হয় এটা অনেক দামী।”
“সেটা ঠিক বলেছ।”
“হ্যাঁ, তাই আমি ভাবিনি এটা ফেলে দেওয়া উচিত, যদিও এটা পেয়ে আমার খারাপ লেগেছে। কিন্তু ভাবলাম যদি এটা আপনাকে দিই, তাহলে আপনি আমার জন্য যা যা করেছেন, তার একটু হলেও প্রতিদান দেওয়া হবে।”
“ধুর!” তিনি হঠাৎ আবেগে বলে ফেললেন। লায়লা একটু চমকে উঠল, কিন্তু কিছু মনে করল না।
প্রাসাদ থেকে এলোমেলো অবস্থায় লায়লাকে দৌড়ে ফিরে আসতে দেখে তিনি তখনই বুঝেছিলেন, তার সঙ্গে এমন কিছু ঘটেছে যা তাকে ভেতর থেকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। তিনি অভিজাতদের স্বভাব জানতেন। তিনহ কিছু জিজ্ঞেস করেনি, কারণ ভয় ছিল। জিজ্ঞেস করলে মেয়েটা কেঁদে ফেলবে। কিন্তু এখন নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে উঠছিল।
“লায়লা?” তার নাম শুনতেই সে এতক্ষণ ধরে, ধরে রাখা পরিণত ভাবটা মিলিয়ে গেল, আর তার মুখে আবার শিশুসুলভ অভিব্যক্তি ফিরে এল। “তুমি এই টাকা উপার্জন করেছ, তাই এটা তোমারই রাখা উচিত।”
“আমি উপার্জন করেছি?”
“ঠিক তাই। তুমি কাজ করে এটা পেয়েছ। তুমি এক বিরক্তিকর অভিজাত মেয়ের মুখোমুখি হয়েছিলে। কাজটা বাজে ছিল, কিন্তু তুমি খুব ভালোভাবে করেছ, তাই গর্ব করে তোমার পারিশ্রমিকটা গ্রহণ করা উচিত। এটাই ঠিক।”
লায়লা ভ্রু কুঁচকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। বিল তার দিকে তাকিয়ে এক ঢোক বিয়ার খেল, যখন সে চিন্তায় ডুবে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর সে মাথা কাত করে মুদ্রাটায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
“অবশ্যই।” সে হাতার সাহায্যে দাড়ির ফেনা মুছে বলল।
“আমি উপার্জন করেছি… আমি উপার্জন করেছি…” এই ভাবনাটা বারবার তার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, আর তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“প্রাপ্তবয়স্কদের জগতে স্বাগতম, লায়লা।” বিল বলল, তার প্লেটে বড় এক টুকরো মাংস তুলে দিতে দিতে।
“প্রাপ্তবয়স্ক? আমি?”
“যে নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করতে পারে, সে-ই প্রাপ্তবয়স্ক। তুমি ঠিক সেটাই করেছ।”
“কিন্তু আমি তো মাত্র একটা সোনার মুদ্রাই পেয়েছি…”
“এই দুনিয়ায় তোমার চেয়ে কয়েকগুণ বড় এমন অনেক মানুষ আছে, যারা এটুকুও ঠিকমতো করতে পারে না। তুমি দারুণভাবে শুরু করেছ। আমি নিশ্চিত তুমি বড় হয়ে খুব ভালো করবে।” তিনি তার প্লেটের বাকি জায়গাটা রুটি আর ভাজা সবজি দিয়ে ভরে দিল।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। “আঙ্কেল, এটা তো অনেক বেশি।”
“গত কয়েকদিন তুমি পাখির মতো খাচ্ছ। আজ রাতে তোমাকে ভালো করে খেতে হবে।”
“কিন্তু…”
“মনে নেই? আমি এমন বাচ্চাদের পছন্দ করি যারা গরুর মতো খেতে পারে।”
সে হেসে উঠল। “আঙ্কেল, আমি যদি ভালো করে খাই, তাহলে আমি কি বড় হব?”
“অবশ্যই। কেন জিজ্ঞেস করছ? কেউ কি তোমাকে খাটো বলেছে?”
“না, আমি শুধু মনে করি আমি খুব ছোট দেখাই। এটা আমাকে বিরক্ত করে।”
“কারণ তুমি সত্যিই ছোট।” এই কথাটা প্রায় বলে ফেলছিলেন বিল, কিন্তু নিজেকে থামালেন। লায়লা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাংস কাটতে শুরু করল। তার দিকে তাকিয়ে বিল বুঝতে পারলেন, এই কয়েক মাসে সে অনেক বড় হয়ে গেছে। আর আগের মতো কঙ্কালসার নেই। এখন তাকে বেশ ভালোই লাগছে। তার স্বাভাবিক গঠন ছোট আর পাখির মতো সরু, তাই সে খুব লম্বা বা বড় হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবুও তার কোনো সন্দেহ নেই যে একদিন সে এক সুন্দরী নারী হয়ে উঠবে। এই ভাবনাটা হঠাৎ তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।
দারিদ্র্যে থাকা মেয়েদের জন্য সৌন্দর্য এক বিপজ্জনক জিনিস, যা সহজেই তাদের বিপদে ফেলতে পারে। তিনি জানতেন তাকে কোথাও নিরাপদ জায়গায় পাঠাতে হবে, কিন্তু অনাথাশ্রম কি বিশ্বাসযোগ্য? অনাথাশ্রম যেন এমন জায়গা, যেখানে কাউকে পাঠালে তার জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবী আর এর ভেতরের সব খারাপ মানুষদের তিনি মনে মনে গালি দিলেন। তারপর যারা মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়েছে আর তার কাছে ফেলে গেছে, তাদের প্রতি ক্ষোভ পুষে তিনি নিজের বিয়ার শেষ করলেন। তিনি তার আগের জীবনের কথা ভাবলেন, যেখানে তার একমাত্র চিন্তা ছিল ফুলগুলো যেন সুন্দরভাবে ফোটে আর ফলগুলো যেন সুস্বাদু হয়। তার জীবন কীভাবে এমন দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠায় ভরে গেল?
“আঙ্কেল, এটা যদি আমার টাকা হয়, তাহলে আমি কি এটা খরচ করতে পারি?” লায়লা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল।
“অবশ্যই। তুমি কিছু কিনতে চাও?”
“হ্যাঁ। আমার নোটবুকে লেখার জায়গা শেষ হয়ে গেছে। আমি নতুন একটা কিনতে চাই।”
“তাহলে কিনে ফেলো।”
“আমি কি কিছু রঙ পেন্সিলও কিনতে পারি?”
“অবশ্যই পারো।”
“আপনার কিছু দরকার আছে, আঙ্কেল?”
“কেন? তুমি কি আমাকে কিছু কিনে দিতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
“যদি আমি তোমাকে খুব দামি কিছু আনতে বলি?”
“তাহলে আমি অনেক টাকা জমাবো আর আপনার জন্য সেটা কিনব।” সে গম্ভীর মুখে বলল। যখন সে গম্ভীর হয়, তখন তার চোখের সবুজ রঙটা আরও গাঢ় লাগে, যা তাকে বুদ্ধিদীপ্ত ও মায়াবী দেখায়।
বিল জোরে হেসে উঠলেন, তারপর আরেক গ্লাস পানীয় ঢাললেন। এরপর লায়লার সামনে এক গ্লাস আপেলের রস রেখে দিলেন। সে গ্লাস তুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিলো, যেন গ্লাস ঠোকাতে চায়। বিল খুশিমনে সাড়া দিলেন। উজ্জ্বল হাসি হেসে সে এক নিঃশ্বাসে রসটা খেয়ে ফেলল। হঠাৎ বিলের মনে হলো, এভাবে চলতে থাকলে মেয়েটা হয়তো মদ্যপ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মাথা নেড়ে ভাবলো সে তো এখানে সাময়িকভাবেই আছে। তারপর তিনি নিজের গ্লাস খালি করলেন।
___
অনেক দিন ধরে বিল অনেক কিছু নিয়ে ভাবলেন। কেন তিনি আর লায়লার যত্ন নিতে পারবেন না, সেই কারণগুলো ভাবলেন। কোথায় তাকে পাঠানো সবচেয়ে ভালো হবে, এই হঠাৎ তার জীবনে এসে পড়া, সুন্দর কিন্তু ঝামেলাপূর্ণ মেয়েটির জন্য।
এইসব ভাবনার মাঝেই লায়লা অনেক বড় হয়ে উঠল। তার নতুন পোশাকগুলো দ্রুত ছোট হয়ে গেল, তার সরু পাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। যেটা সে অস্থায়ী থাকার জায়গা হিসেবে দিয়েছিল, সেটাই ধীরে ধীরে এক আরামদায়ক, নারীর উপযোগী ঘরে পরিণত হলো। একসময় যে ছোট্ট মেয়েটিকে তিনি বনপথে লাফাতে লাফাতে খেলতে খেলতে যেতে দেখতেন, সেই দৃশ্য এখনও তার মনে টাটকা। কিন্তু এখন সেই একই পথে ফিরে আসা মানুষটি যেন এক পরিপূর্ণ তরুণী, যে নরম পায়ে হাঁটে, যেন পানির ওপর ভেসে চলছে।
বারান্দার চেয়ারে বসে বিল বিস্মিত চোখে লায়লার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যখন সে এগিয়ে আসছিল। ঝুড়িভর্তি রাস্পবেরি হাতে সেই তরুণী তাকে হাত নেড়ে ডাকছিল। “আঙ্কেল! আপনি আজ তাড়াতাড়ি ফিরেছেন।” সে নাচের মতো হালকা পায়ে দৌড়ে তার দিকে এল। তার সুন্দর স্বর্ণালি চুল ফ্রেঞ্চ বেণিতে বাঁধা, যা তার খড়ের টুপির নিচে দুলছিল। তার হালকা লালচে গালগুলো ঠিক বিলের লাগানো উন্নত মানের গোলাপের মতোই সতেজ লাগছিল।
“দেখছি তুমি আবার বনে গিয়েছিলে।” তিনি বললেন।
“হ্যাঁ! দেখুন তো, কত কিছু সংগ্রহ করেছি!” সে ঝুড়ি তুলে ধরে বলল। “আগামীকাল আমি আরও তুলব। আমি অনেক রাস্পবেরি জ্যাম বানাবো!”
“তুমি কি জ্যামের ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবছ?”
“খারাপ আইডিয়া না।” মিষ্টি হেসে সে তার পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।
হঠাৎ তার খেয়াল হলো, এখন তার বারান্দায় দুটি চেয়ার আছে। শুধু চেয়ারই নয়, যদিও তিনি এখনও ঠিক করেননি লায়লার ব্যাপারে কী করবেন, তবুও তার কটেজের সবকিছু এখন দুইজনের জন্য সাজানো।
লায়লা ঝুড়িটা মেঝেতে রেখে খুঁজতে লাগল। শেষে একটা পিচ ফল বের করে বিলকে দিল। বিল সঙ্গে সঙ্গে ফলটা দু’ভাগ করে অর্ধেক তাকে দিলেন। তারা পাশাপাশি বসে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে পিচ ফলটা ভাগ করে খেল। হাওয়ায় পাতার মর্মর শব্দ তাদের কানে মৃদু সুরের মতো লাগছিল। দূরের পাখির ডাক লায়লার কণ্ঠের মতোই মসৃণ শোনাচ্ছিল।
“আবার গ্রীষ্ম চলে এলো।” বিল ধীরে বলে উঠলেন।
শান্তভাবে হাসতে হাসতে লায়লা তার টুপিটা খুলে ধীরে ধীরে হাত দুটো প্রসারিত করল। বিল লক্ষ্য করতেই পেট ধরে হেসে উঠলেন, তার হাঁটুর নিচে ঝুলে থাকা পুরনো টুল ব্যাগটা দেখে। মেয়েটি প্রথম যখন এসেছিল, সেই বছরই সে এটা তাকে দিয়েছিল।
“তুমি কি এই জঞ্জাল জিনিসটা একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছ নাকি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার ভালো লাগে, কাঁধে আরাম লাগে। এখনও তো একদম ব্যবহারযোগ্য।” সে তার সঙ্গে হেসে বলল।
সে হাসতেই ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো টুংটাং শব্দ করল, আর বিল কোনো চেষ্টা ছাড়াই বুঝে গেলেন ভেতরে কী কী আছে। একটা টিনের পেন্সিল কেস। একটা ছোট ছুরি। একটা পুরনো খাতা। কিছু সুন্দর পালক আর ফুলের পাপড়ি। কিছু কিছু দিক দিয়ে, সে একটুও বদলায়নি।
এটা ছিল একেবারে সাধারণ এক সন্ধ্যা। বিল কাঠ কেটে রাখছিলেন, আর লায়লা কাপড় ভাঁজ করে গুছিয়ে নিচ্ছিল। বিল মুরগি আর ছাগলগুলোকে খাবার দিলেন, আর লায়লা দক্ষ হাতে রাতের খাবার তৈরি করল। তারা যখন টেবিলের দুপাশে বসে পড়ল, তখন সূর্য ইতিমধ্যে ডুবে গেছে।
“কাইল কাল আসবে। আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করব, তারপর সে রাতে এখানেই খাবে। এতে কি আপনার আপত্তি আছে?” লায়লা সুগন্ধি খাবার টেবিলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল।
“এই ছেলেটা কেন সবসময় আমার বাড়িতে এসে আমার খাবার খায়, যখন তার বাবাই একজন ধনী ডাক্তার?”
“আপনি তাকে পছন্দ করেন, যদিও এমন কথা বলেন।”
সে নাক সিটকালো। “হয়তো একটু।”
হালকা হাসি দিয়ে লায়লা তার সামনে অর্ধেক ভরা এক গ্লাস বিয়ার রাখল।
“এটা কী? অর্ধেক কেন?”
“আপনার স্বাস্থ্যের জন্য কম পান করা উচিত।”
“ইটম্যান পরিবারের ওই অলস ছেলেটা কি তোমাকে এটা বলেছে?”
“আঙ্কেল!”
“একটা অকর্মণ্য।” বিল বিড়বিড় করে বললেন, তারপর অনিচ্ছায় অর্ধেক ভরা গ্লাসটাই মেনে নিলেন।
—
রাত আরও গভীর হয়ে উঠল, তারা আরামদায়ক ডিনার শেষ করল। লায়লা বাসন ধুয়ে নিল, ধীরে সুস্থে গোসল করল, তারপর নিজের ঘরে ফিরে এল। তার ঘুম পাচ্ছিল, তবুও সে বাতি জ্বালিয়ে ডেস্কে বসল। সামনে পরীক্ষা, আর সে জানত ভালো ফল করতে পারলেই তার গ্রীষ্মটা আনন্দময় হবে।
রাতের হাওয়ায় ভেসে আসা পাখির ডাক তার ঘরে ঢুকে তার পেন্সিলের খসখস শব্দের সঙ্গে মিশে গেল। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর তার চোখে চাপ পড়ল, মাথাও হালকা ব্যথা করতে লাগল, তাই তাকে পেন্সিল নামিয়ে রাখতে হলো। তার দৃষ্টিশক্তি কখনোই খুব ভালো ছিল না, কিন্তু সম্প্রতি সেটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই কখনো কখনো পরিষ্কার দেখতে চোখ কুঁচকাতে হতো। এখন সে প্রায় সবসময়ই চোখ কুঁচকে থাকে। সে বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আর একটু টাকা জমাতে পারলেই চশমা কিনতে পারব। মাত্র বিশ বোতল রাস্পবেরি জ্যাম… অথবা তিরিশটা? যাই হোক, প্রায় হয়েই গেছে।
সে জানত, যদি সে আঙ্কেল বিলকে তার চোখের সমস্যার কথা বলে, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তার জন্য চশমা কিনে দেবেন। কিন্তু সেই কারণেই যেন তাকে বলা আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। সে ইতিমধ্যেই তার কাছ থেকে এত কিছু পেয়েছে, অথচ তার প্রতিদান দেওয়ার কোনো উপায় নেই। যখন আঙ্কেল বিল বলেছিলেন তিনি লায়লাকে স্কুলে পাঠাবেন, তখন অনেকেই হাসাহাসি করেছিল। তারা বলেছিল, একটা এতিম মেয়েকে পড়াশোনা শেখানোর কোনো মানে নেই। বড় হলে সে হেরহার্ড্ট পরিবারের গৃহপরিচারিকাই হতে পারবে। কিন্তু আঙ্কেল বিল দৃঢ় ছিলেন। তিনি প্রতিদিনই তাকে বলতেন, সে একদিন অসাধারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হবে।
চোখ বন্ধ করতেই তার মাথাব্যথা কিছুটা কমে এল। কিন্তু যত বেশি ঘুমানোর চেষ্টা করছিল, ততই ঘুম উধাও হয়ে যাচ্ছিল। এমন রাতগুলোতে তার মাথায় অদ্ভুত সব চিন্তা ঘুরপাক খেত, ফিরে আসা পাখিরা, তার গ্রীষ্মের পরিকল্পনা, দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হওয়া রহস্য উপন্যাসের অপরাধী, আর ডিউক হেরহার্ড্ট। তার নাম মনে আসতেই তার চোখ খুলে গেল। অন্ধকারে চোখ সয়ে যাওয়ায় জানালার বাইরে রাতের দৃশ্য সে দেখতে পেল, হালকা বাতাসে দুলতে থাকা গাছের ডাল, আর তার ওপরে তারাভরা আকাশ আর চাঁদ। সেই ফ্যাকাশে আলোয় তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে অজান্তেই শ্বাস আটকে রাখল।
কলেজ শেষ করার পর ডিউক রাজকীয় সামরিক একাডেমিতে গিয়েছিলেন, তারপর পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপরই তাকে বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়, তাই গত এক বছরে তিনি একবারও এস্টেটে আসেননি। ফলে এই সময়টা বনপাখিদের জন্য যেমন শান্ত ছিল, তেমনি লায়লার জন্যও। কিন্তু এই গ্রীষ্মে তিনি ফিরে আসবেন… আরভিসের লর্ড, ডিউক হেরহার্ড্ট।
চলবে….?