লেখনীতে প্রিয়াংশি চৌধুরী
পর্ব:০৬
কায়রাভকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তৎক্ষনাৎ। সঙ্গে কাবিরও ছিলো। গাড়ির পেছনের সিটে কায়রাভকে ধরে বসে ছিল কাবির দু’হাতের জাপটে। ভেঙে পড়তে দেয় নি মানুষটাকে। বহুদিন পর কায়রাভ কাবিরকে সামনে পেয়ে ভীষন আবেগী উঠল। এই কাবির’টা ইচ্ছে করলেই দেখা দেয় না, যাকে পাওয়া মানেই সবসময়ের বিরলতা। এদিকে অসহ্য যন্ত্রণায় ব্যাথা চিরে শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, তবু চোখ সরাতে পারছিল না কাবিরের মুখ থেকে। কি করবে, রক্তের সম্পর্ক তো! যতই দূরে থাকুক, গভীর টান অনুভব হয়। কাবির ইচ্ছে করেই কখনো বড় ভাইয়ের সামনে আসে না। আজ এসেছে, তাও এই অবস্থায়! এদিকে কায়রাভের নজরে আসলো কাবির তার জন্য দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ছে। এই অনুভূতিটাই কায়রাভকে কিছুটা শক্ত করে ধরেছিল। কাবির খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে বলল,
” এই তো আইসা গেছি। খুব বেশি কষ্ট হইতাছে?”
কায়রাভ আর উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। গাড়ি থেকে নামিয়ে মুহূর্তেই তাকে স্ট্রেচারে তুলে ইমার্জেন্সির রুমের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। যাওয়ার আগে অস্পষ্ট স্বরে কায়রাভ বলেছিলো,
“আগেই চলে যাস না, কাবির? কথা আছে আমার।”
কিন্তু বাইরে তখন হুলস্থুলের আওয়াজে কাবিরের কর্নগোচর হলো না কথাটা। নেতার গুলি লেগেছে! তাই প্রেস আর মিডিয়ায় হাসপাতালের সামনের চত্বর ভরে উঠল। সাংবাদিকেরাও চমকপ্রদ ব্রেকিং নিউজ বানাতে উঠে পড়ে লাগলো।
কায়রাভ ভেতরে চলে গেলে রক্তে ভেজা শার্ট পরা অবস্থাতেই কাবির বাইরে এসে স্থির হয়ে বসে রইল। হাসপাতালের ভেতরে আর থাকল না সে। সবকিছু তার কাছে মুহূর্তেই এলোমেলো, ভারী লাগছিল।
কিছুক্ষণ পর কায়েশী আর কায়রা ছুটে এলো। কায়রার কোলে ছোট্ট কায়ান। কায়রা কাউকে খেয়াল না করেই কায়ানকে নিয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। কিন্তু কায়েশী হাসপাতালে ঢুকতে গিয়েও থমকে গেল, চোখ পড়লো বাইরে বসে থাকা কাবিরের ওপর। বিস্মিত নজরে তাকিয়ে ভাবলো, কতদিন পর মানুষটাকে দেখছে! রক্তে ভেজা শার্টটা দেখে বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল। একটু এগিয়ে গিয়ে কাবিরের সামনে দাঁড়িয়ে আবছা স্বরে ডাকল,
” কা’বি’র…”
কাবির মাথা তুলে একবার তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নামিয়ে ভারী গলায় বলল,
“আপনার স্বামী ভেতরে। কেবিন নম্বর একশ সাত।”
আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না কায়েশী। ছুটে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ততক্ষণে গুলি বের করা হয়ে গেছে ডাক্তারদের। একটা গুলি কাঁধের উপরের অংশ ছুয়ে বেরিয়েছে আর আরেকটা বাহুতে আটকে ছিলো। একটুর জন্য বুকে লাগেনি। বড় বাঁচা বেঁচেছে। ডাক্তাররা বাইরে এসে বলেছে, কায়রাভ আউট অফ ডেঞ্জার। তাকে কেবিনে দেওয়া হলো একটু পরেই। হাসপাতালের বেডে সাদা গেঞ্জি গায়ে, তার ওপর হালকা শাল জড়ানো। আপাতত ব্যান্ডেজের জন্য জামা পড়াতে নিষেধ করেছে ডাক্তার। তাই সাদা গেঞ্জির উপরেই শাল জড়িয়েছে, কারণ শীতের সময় এভাবে শুধু গেঞ্জি পরে থাকা প্রায় অসম্ভব। এদিকে অপারেশনের পর কাবিরের কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গেছে।
ইতিমধ্যেই কায়রাভের দলের ছেলেপেলেরা কেবিনে ঢুকতে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। অবাক হওয়ার কারণ, অদ্ভুত রকমের দৃশ্য! কায়রাভ অতি শান্ত ভঙ্গিতে বেডে বসে আঙুর খাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি। সামনে বসে তার দলের আরও কয়েকজন ছেলে।
দু’জন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, ঠিক আছেন তো?”
কায়রাভ হেসে নিজেকে দেখিয়ে বলল,
“দেখ শা/লা, একদম ফিট আমি। চিল কর। এই গুলি-টুলি কায়রাভকে কাবু করতে পারবে না।”
পরক্ষণেই পাশ থেকে একজন ছেলে মাথা নিচু করে জানাল,
“ভাই, সমাবেশের সময় দু’জন ছেলে গুলি করে পালিয়েছে। অল্পের জন্য ধরতে পারিনি। সন্দেহ হচ্ছে আলতাফের কাজে এইটা!”
কায়রাভ সিংহের ন্যায় থা’বা দেখিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“সন্দেহ কিসের? আলতাফ কুত্তার*ই কাজ এইটা! আর বেহু’দা চামচা*দের ধরে কী হবে? ধরবো তো সোজা আলতাফকেই। আপাতত চুপ থাক বিষয়টা নিয়ে। সামনে নির্বাচন, বুঝেশুনে কাজ করতে হবে। নির্বাচনটা হয়ে যাক শুধু, একদম থা’বা মেরে ধরব সবকটা’কে। তারপর ওর চ্যাপ্টার দি এ’ন্ড!”
ছেলেগুলো মাথা নেড়ে বাঁকা হাসল। এই সময় ফিরোজ ঢুকলো। কায়রাভের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষ, যে শুরু থেকেই তার পাশে আছে। ডাক্তারের থেকে রিপোর্ট আনতে গিয়েছিলো। এইমাত্র কেবিনে এসে বলল,
” ভাই, ভাবী আর বোন এসেছে। পাঠিয়ে দেবো?”
কায়রাভ হেসে বেডে হেলান দিয়ে বলল,
“পাঠিয়ে দে।”
এরপর ছেলেগুলো সবাই বেরিয়ে গেল। কায়রা কায়ানকে নিয়ে ঢুকলো, পেছনে কায়েশী। বাবাকে দেখে কায়ান এক লাফে তার কোলে উঠে মুখ গুঁজে দিলো বুকে। কায়রা আটকাতে গেলে কায়রাভ চোখের ইশারায় মানা করলো। এত মানুষ দেখে বাচ্চাটা ভয় পেয়ে গেছে। সচরাচর এত মানুষ একসাথে দেখেনি কায়ান। ধরা গলায় কায়রা বলল,
“ভাইজান, এসব কী? খবরে দেখেই ছুটে এলাম। আর একটু হলে দম বেরিয়ে যেতো। তুমি এসব ছেড়ে দাও না কেন? পরিবারকে চিন্তায় রাখতে এত ভালো লাগে?”
কায়রাভ হাত বাড়িয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বলল,
“বাচ্চা মেয়ে বাচ্চাই থাক। বড় সাজতে হবে না। এই, বিকেল চারটায় না তো তোর পরীক্ষা! সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। দেরি করিস না আর। আমি একদম ঠিক আছি, দেখে নে। যাওয়ার সময় আমার গাড়ি নিয়ে যাস।”
কায়রা মাথা নাড়িয়ে আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেলো। সত্যি তার দেরি হয়ে যেতো। ভাই ঠিক আছে দেখে আর দেরি করলো না। এদিকে কায়েশী ভেজা চোখে কেবিনের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলো। কায়রাভ ইশারায় কাছে ডাকলো। কায়েশী এগিয়ে এসে বেডের পাশে বসলো অতি ধীর ভঙ্গিতে। কায়রাভ মৃদু হেসে বলল,
“তোমার দোয়া কবুল হতে হতেও হলো না। আফসোস!”
কায়েশী এতক্ষন চুপ থাকলেও আর পারলো না। সবসময় এই লোক তাকে চেতিয়ে দেবেই। তাই তীব্র কণ্ঠে বলল,
“আপনি আসলে কী চান? আমাকে বারবার কষ্ট দিয়ে কী এত পৈশাচিক শান্তি পান? বাচ্চাটা টিভিতে আপনাকে রক্তাক্ত দেখে কেঁদে বাবা বাবা বলে চিৎকার করেছিলো! জানেন কি অবস্থা হয়েছিল আপনাকে ওভাবে দেখে?”
কায়রাভ কিছু না বলে কায়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে মাথায় চু’মু দিয়ে বলল,
“এইতো বাবা, ঠিক আছি আমি। এই যে দেখেন, একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন।”
কায়ান বাবার গলা জড়িয়ে চুপচাপ বসে রইল। কথা বলল না কোনো। বাচ্চাটা সত্যি ভয় পেয়েছিলো বাবাকে ওভাবে দেখে। কেবিনের ভেতর নীরবতা জমে রইলো খানিকটা সময়। নিরবতা ভেঙে কথা বলল কায়রাভ নিজেই,
“সবার অবস্থা তো শুনলাম, তোমার কথা বলো? “
কায়েশী সে কথা বেমালুম অগ্রাহ্য করে শান্ত গলায় বলল,
“কায়ানকে আমার কোলে দিন। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। আপনার ব্যাথা লাগবে কাঁধে, দিন আমায় ওকে। “
কায়ানকে কায়েশীর কোলে তুলে দিয়েই কায়রাভ ক্রুদ্ধ চোখে তাকালো। গলার স্বরটা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো,
“কথা এড়িয়ে যাচ্ছো কেন? তুমি ভয় পেয়েছিলে, তাই না? আমার জন্য কেঁদেছিলে!”
কায়েশী কায়ানকে বুকের কাছে জড়িয়ে রেখে ফিসফিস করে বলল,
“আস্তে কথা বলুন! বাড়িতে গিয়ে কথা হবে। এখানে দয়া করে সিনক্রিয়েট করবেন না।”
কায়রাভ অস্থির হয়ে উঠলো,
“সিনক্রিয়েটই করব! কারও পরোয়া করি না আমি! আমার উত্তর চাই। তোমার চোখ ভেজা ছিলো কেন? কি ভেবেছো দেখিনি আমি? “
কায়েশী ঠান্ডা স্বরে বলল,
“আশ্চর্য, বাচ্চাদের মতো জেদ করছেন কেন? শুনতে চান? সহানুভূতি! উত্তর পেয়েছেন তো? সহানুভুতিতে কেঁদেছি। চার বছর শত্রুর সাথে সংসার করলাম মায়া তো জন্মাবেই তাইনা! ওই মায়াতেই কেঁদেছি!”
কায়রাভ এই মেয়ের একগুঁয়েমিতে অবাক হয়ে যায় মাঝে মাঝে। তবু মুখে কিছু না বলে কায়ানকে কায়েশীর কোল থেকে নিয়ে নিজের পাশে মাথায় বালিশ দিয়ে শুইয়ে দিলো। তারপর কায়েশীকে টেনে এনে কোমরে হাত রাখলো,
“তাহলে কায়ান তোমার লজিক অনুযায়ী আকাশ থেকে পড়েছে? অবশ্য… তোমার সেই সিক্রেট’টা আমি জানি, বাকিরা জানে না।
নাও, আবার শুরু হয়ে গেছে এই লোক! কায়েশী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“সিক্রেট মানে? কিসের সিক্রেট?”
কায়রাভ দুষ্টু হাসি ঠোঁটে এনে কায়েশীর কানের কাছে ঝুঁকে পড়ল, কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃদু গলায় বলল,
“সিক্রেটটা হলো, দিনে সবাইকে দেখিয়ে শত্রুর সঙ্গে ঝগড়া করো। যাতে প্রমাণ হয় তুমি জিতেছো, তোমার কোনো ফিলিংস নেই। কিন্তু রাতে ঠিকই আমার সাথে…”
আর কিছু বলার আগেই কায়েশী ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলো,
“অসভ্যের মতো কথা বলবেন না। আপনি এখন অসুস্থ, সেটা ভুলে যাবেন না।”
কায়রাভ নিজের দিকে ইশারা করে বিকারগ্রস্তের ন্যায় বলল,
“একদমই অসুস্থ না আমি। অসুস্থ বলে ক্ষেপিয়ো না আমায়, কায়েশী! বিশ্বাস না হলে কাছে আসো, প্রমাণ দিচ্ছি।”
কায়েশী ছিটকে আরও দূরে সরে গিয়ে বিরক্ত স্বরে বলল,
“ছি্ঃ! “
কায়রাভ এবার জোরেই হেসে উঠলো। পরমুহূর্তেই আচমকা আর্তনাদ করে বসলো। কায়েশী এইবার সব ভুলে হন্তদন্ত হয়ে একদম কাছে এসে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল,
“কোথায় ব্যথা হচ্ছে? এজন্যই তো বলি চুপ করে থাকুন। দাঁড়ান, ডাক্তারকে ডাকি….”
কায়রাভ তার হাত টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিয়ে কায়েশীর বুকে মাথা রেখে শ্বাস ফেলে বলল,
“কোথাও ব্যথা নেই। শুধু কিছুক্ষণ আমাকে জড়িয়ে রাখো। অনিচ্ছুক হলেও… ঘৃণা হলেও।”
কায়েশী তাকে জড়িয়ে ধরলো না, কিন্তু কায়রাভকে জড়িয়ে ধরতে বাধাও দিলো না। অন্য সময় হলে সে ছটফট করতো। মুক্তি পেতে অধৈর্য্য হতো! কিন্তু আজ সে ধীর, স্থির, নিশ্চল। ঠিক কোনো বদ্ধ ঘরের মতোই, যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভূতিগুলোই বেশি ভারী লাগে।
******************
বিকেলের নরম আলো বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আলোতেই ডিভানে আধশোয়া হয়ে প্রিহা ল্যাপটপ খুলে বসে আছে। স্ক্রিনের পর্দায় চলছে কাবির সিং মুভি। যেখানে দেখা যাচ্ছে শাহিদ কাপুরের অস্থির ভালোবাসার উন্মাদ রুপ। আর ল্যাপটপের পাশে রাখা কাপে চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে।
প্রীতিষা ভার্সিটি থেকে ফিরেই গোসল সেরে বেরোয়। ভেজা চুলে তোয়ালে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুছতে মুছতে বারান্দায় চোখ পড়ে। প্রিহাকে দেখে সে হালকা হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
” কী করছিস, প্রিহা?”
প্রিহা পেছন ফিরে তাকিয়ে বলে,
” মুভি দেখছি, মণি। তুমিও এসো না, একসাথে দেখি।”
প্রীতিষা বলে,
“আসছি, দাঁড়া। চুলটা মুছি আগে ভালো করে। আচ্ছা, প্রীভান কোথায়?”
ল্যাপটপের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই প্রিহার উত্তর আসে,
“ও তো ওর বন্ধুদের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতে গেছে।”
কিছুক্ষণ পর চুল আঁচড়ে পরিপাটি হয়ে প্রীতিষা এসে প্রিহার পাশে ডিভানে বসে পড়ে। পর্দার দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় বলে,
“এইটা তো শাহিদ কাপুরের মুভি? কি মুভি এটা? “
প্রিহা মুচকি হেসে বলে,
“হ্যাঁ, কাবির সিং মুভির নাম। দেখোনি আগে? এটা তো অনেক পুরোনো মুভি!”
“কাবির সিং” শব্দ দুটো প্রীতিষা শুনে মনে মনে দু’বার উচ্চারণ করলো। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। তার বুনো ষাড়ের নামও তো কাবির! কি বিচিত্র সব চিন্তাভাবনা হচ্ছে আজকাল! কিন্তু তার মুচকি হাসার কারণ কি? এইটা তো খুব চেনা এক অনুভূতির কথা ভেবেই হওয়া উচিত। প্রিহা প্রীতিষাকে হাসতে লক্ষ্য করে চোখ কুঁচকে বলে,
” কী হলো মণি, এমন করে হাসছো কেন?”
প্রীতিষা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে,
” আরে… কিছু না। চল, দেখি। মুভিটার কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু হিন্দি মুভি তেমন দেখা হয়নি।”
তারপর দু’জনেই চুপচাপ পর্দার দিকে মন দেয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, গল্প এগোয়, গান বাজে, আবেগ জমে ওঠে। দুই ফুফু-ভাস্তির নিরিবিলি সময়টুকু মুভির সাথে সাথে সমাপ্তি ঘটে। মুভি শেষে যে যার ঘরে ফিরে যায়। প্রিহা নিজের ঘরে গিয়ে পড়াশোনার পাতায় ডুবে দেয়। আর প্রীতিষা কফি বানিয়ে আবার এসে বারান্দায় বসে। কফির কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে তার মনটা কোথায় যেন সরে যায়। তার তথাকথিত বুনো ষাড়টার কাছে, নতুন সৃষ্ট হওয়া অনুভুতির কাছে।
অলীক ভাবনার মাঝে হঠাৎই নিচ থেকে কিছু চেচামেচির আওয়াজ উঠে আসে। যার কারণে প্রীতিষার ধ্যান সে মুহূর্তে ভেঙে যায়। দোতলা বারান্দার রেলিং ধীরে ছুঁয়ে সে নিচে তাকায়। তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় ছোট্ট এক চায়ের দোকান, আর সেই দোকানের সামনেই কিছু লোক জড়িয়ে পড়েছে। ঝগড়া চলছে, পাওনা আদায়ের ঝগড়া। কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তাই বুঝলো প্রীতিষা যে ঝগড়াঝাটি চলছে। কিন্তু তা অতি সাধারণ ঘটনা মনে হয়ে চোখ ফেরাতে চাইলো কিন্তু তখনই নজর কাড়ে এক মোটা চেহারার লোকের সরে যাওয়ার পরের দৃশ্য দেখে। যখন ঝগড়া করতে করতে সে সরে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ালো পেছনের পরম পরিচিত পুরুষালী অবয়ব তখন চমকালো প্রীতিষা। প্রীতিষার চোখে যেন মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। লক্ষ্য করলো, কাবিরের পরনের শীতের জ্যাকেটটা অত্যন্ত সাধারণ, জিন্স প্যান্টও সাধারণ, তবুও কেমন যেন অদ্ভুত আকর্ষণ ছড়াচ্ছে। যা সুদর্শন, মোহনীয়।
কাবির চায়ের দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চে বসে অত্যাধিক আরামে কাচের চায়ের কাপ থেকে পরপর চুমুক দিচ্ছিল। প্রীতিষার চোখে তখন ঘোর, মাতাল ভাব। মনে হচ্ছে ঘোরটা কেবল কাবিরের জন্যই। সে নিজেও অজান্তে কফির কাপ থেকে চুমুক নিল, ঠিক যেভাবে কাবির চা-য়ে চুমুক দিচ্ছে সেভাবেই। প্রীতিষার চোখগুলো যেন ঘোরে কাবিরের দিকে আটকে। তার কাছে এখন চারপাশের সবকিছু অজানা, ঝাপসা, অস্পষ্ট। শুধু কাবির স্পষ্ট এবং জীবন্ত।
প্রীতিষা নিজেই বিস্ময়ে ভাবল, এ কি হলো তার? এই অনুভূতির নাম কি দেবে? হৃদয়ের ভিতরে অজানা এক উত্তেজনা, অচেনা আকর্ষণ, আর অল্প ভয়ের মিশ্রণ। সবকিছু মিলিয়ে একরকম অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে বুনো ষাড়টার প্রতি। কাবিরের উপস্থিতি এত প্রভাবিত যে বাস্তবতা অজানা, ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে প্রীতিষার কাছে।
ঘোর ধীরে ধীরে কমতে লাগলো আর প্রীতিষার মনে হল নিচে যাওয়া প্রয়োজন। এক নজর সামনে থেকে দেখে আসা যাক। ভাবা মাত্রই কাজ শুরু। একখানা চাদরে নিজেকে জড়িয়ে সে নিঃশব্দে বারান্দা থেকে নেমে এল চায়ের দোকানের দিকে। কাবিরের বসা বেঞ্চেটাতেই সে বসলো কিন্তু নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে।কাবিরকে না দেখার ভান করে দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
” মামা, এক কাপ চা দিন। এক চামচ চিনি দিয়ে।”
কাবির পরিচিত নারীসুলভ কণ্ঠ পেয়ে পাশে তাকালো। চোখ বড় করে চমকে উঠলো। বলল,
” তুমি, এইখানে?”
প্রীতিষা হালকা চমকানোর ভান করল, তারপর ভদ্রভাবে উত্তর দিল,
“ওহ, আপনি! আমি তো চা খেতে এসেছিলাম। আমার বাসা সামনেই, ওইযে দোতলা বাড়িটা। মাঝে মাঝে আসি এখানে চা খেতে।”
কাবির শুধু মাথা নাড়াল। তখনি দোকানের পুরোনো রেডিওতে ভেসে আসলো একটি গানের সুর,
আমি পাথরে ফুল ফোটাবো,
শুধু ভালোবাসা দিয়ে….
আমি সাগরের ঢেউ থামাবো,
শুধু ভালোবাসা দিয়ে….
তুমি যদি থাকো, আমারি পাশে।
প্রীতিষা গানের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলো। কি অদ্ভুতভাবে মিলে গেলো। প্রীতিষাকেও তো পাথরে ফুল ফোটাতে হবে! অনেক কঠিন কাজ! বুনো ষাড়টার পাথর মন গলাতেই হবে তাকে! নিজ ভাবনার মাঝে কাবিরের রুক্ষ, কর্কশ গলার আওয়াজ শোনা যায়,
“এই বয়সে কিহের প্রেম পিরিতির গান শুনেন, মামা! লক্ষন তো ভালো না? গান ঘুরায় দেন, কিসব কয় না কয়! ভালোবাসা দিয়া পাথরে ফুল ফুটাবো, সাগরের ঢেউ থামাবো! যতসব আউল-ফাউল কথাবার্তা! “
দোকানদার লোকটি হতবাক হলো এমন কথায়। আবার পরক্ষনেই লজ্জিত হয়ে রেডিও বন্ধ করে দিলো, আর কোনো গানই চালালো না। আবার কি না কি বলে বসে এই ছেলে! এই ভয়ে। এদিকে প্রীতিষা দীর্ঘশ্বাস ফেলল হাতাশায়। এই ষাড়টাকে মানুষ বানাতে বড্ড বেগ পোহাতে হবে বুঝলো।
দোকানদারও হঠাৎ হাসতে হাসতে বলে উঠল,
” আচ্ছা, আম্মা! এইটা কি কইলা তখন! তুমি আবার কবে আমার দোকানে আইলা? আমি তো জীবনেও দেখি নাই তোমারে! “
প্রীতিষা কিছুটা থতমত খেলল, ধরা খেয়েছে বোঝা যাচ্ছে। কাবির সরু চোখে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো,আর প্রীতিষা ধরফরিয়ে বলে উঠল,
” আরে মামা, আপনি তখন ছিলেন না বোধহয়… মানে, আমি যখন চা খেতে আসতাম। বাদ দিন না। চা কি বানানো হয়ে গেছে?”
দোকানদার চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
” এই যে হইয়া গেছে, নেন আম্মা।”
প্রীতিষা চা হাতে নিয়ে ধীরে চুমুক দিতে দিতে কাবিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” আপনার কাজের কি খবর?”
কাবির সাধারণভাবে বলল,
“ভালোই।”
তারপর চা খাওয়া শেষে উঠে গিয়ে দোকানদারের দিকে টাকা বাড়িয়ে দিয়ে চলে যেতে গেলে প্রীতিষাও দাঁড়িয়ে মৃদু গলায় পেছন থেকে বলল,
” দাঁড়ান। এখনই চলে যাবেন?”
কাবির ঘুরে তাকাল শান্ত হয়ে। তারপর কড়া গলাতেই বলল,
“এইখানে থাইকা কি করমু? আমার জানামতে, করার তো কিছু নাই!”
প্রীতিষা হঠাৎ চট করে বলে উঠল কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়া,
” করার ইচ্ছে থাকলে অনেক কিছুই করা যায়।আসুন, আমরা লু’ডো খেলি।”
কাবির চোখ কপালে তুলে অল্প বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
” কি’হ্?”
প্রীতিষাও ভরকে গেলো। এ কি বলে ফেলল সে? এইরকম বেহুদা কথাবার্তা কস্মিনকালেও তার কল্পনাতে ছিলো না। বুনো ষাড়টার পাল্লায় পরে নিজের বোধ-বুদ্ধি হারিয়েছে সে, একেবারে হারিয়েছে। কাবিরের সন্দিগ্ধ মুখাবয়ব লক্ষ্য করে সেই স্থানে আর দাঁড়ালো না প্রীতিষা। বিদ্যুৎগতিতে দৌড়ে নিজের বাড়িতে চলে গেলো।
চলমান…….
{রেসপন্স না পেলে এই গল্প কন্টিনিউ করা সম্ভব না। আপনাদের জন্যই লিখি। আমার আরেকটি রানিং ভালোবাসার বহুভুজ গল্পে মোটামোটি রিয়েকশন আসে, মন্তব্য করে। কিন্তু এই গল্পে তেমন মন্তব্য বা রিয়েক্ট কিছুই নেই। এখন আপনাদের উপরই নির্ভর করবে সব।}